অভিষেক মাইতি
রোম, ইতালি
আজকাল প্রায়শই সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে জনমানসে নাড়া দেওয়ার মতো কিছু খবর দেখা যায়, যেমন – ডোমের চাকরির জন্য মাস্টার্স বা পিএইচডি ডিগ্রী প্রাপ্ত ছাত্র ছাত্রীদের আবেদন। কিংবা কোন কলেজে প্রতি ক্লাস পিছু ১৫০ টাকা অতিথি শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে যোগ্যতামান ধার্য করা হচ্ছে পিএইচডি ডিগ্রির সাথে অনান্য সর্বভারতীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।
ছোটবেলায় পড়া বা গুরুজনদের কাছ থেকে শোনা সেই প্রচলিত বাক্য ‘লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে’ কি তবে সম্পূর্ণই মিথ? পড়াশোনা বা আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে প্রথাগত উচ্চশিক্ষা কি তবে একটা কেলেঙ্কারি? এটাও কি তবে ‘বিগ আমেরিকান ড্রিম’ এর মতো অধরা মাধুরীতে (অন্তত বর্তমান পরিস্থিতির বিচারে) পরিণত হয়েছে? স্থায়ী কর্মসংস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চশিক্ষা (মূলত এক্ষেত্রে আমি পিএইচডি প্রাপকদের কথাই বলব, যেহেতু এটাই প্রথাগত উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ অর্জিত ডিগ্রি) এক চরম সংকটের মুখোমুখি।
প্রথাগত উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কি মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ, নাকি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ক্রমাগত জ্ঞান আহরণ সে বিষয়ে যাচ্ছি না। তবে এই উচ্চশিক্ষা একটা সুস্থির জীবনধারনের জন্য (মূলত খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান আর পরিবার প্রতিপালন) প্রয়োজনীয় আর্থিক নিরাপত্তা প্রদানকারী জীবিকা নির্বাহের সুযোগ করে দিতে পারে বলেই আমাদের ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়েছে। কিন্ত বর্তমানে আমার দেশ ভারতবর্ষে তদুপরি সারা বিশ্ব জুড়েই আপাত সাম্প্রতিককালে এই ব্যাপারটি ক্রমেই মিথএ পরিণত হচ্ছে। আমি আবারও এক্ষেত্রে আলোচনা বা বিশ্লেষণের পরিসর প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলিতে (পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান , গণিত এবং সংশ্লিষ্ট জীবিকা) এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত কর্মসংস্থানের বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখব।
যেহেতু বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বে অর্থই জীবনধারণের চালিকাশক্তি, তাই যে কোনো কর্মসংস্থানের/ জীবিকা নির্বাহের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য অর্থ উপার্জন। খুব সহজ বাংলায় বললে, নির্দিষ্ট দক্ষতা (skill) প্রদানের বিনিময়ে কোনো সংস্থা থেকে (সরকারি বা বেসরকারি) অর্থ উপার্জন বেতন হিসেবে। আর নিজস্ব ব্যবসার ( বড়, ছোট, মাঝারি) ক্ষেত্রে জনগণকে সুনির্দিষ্ট পরিষেবার বিনিময়ে অর্থ উপার্জন লভ্যাংশ হিসেবে। এটাই খুব সংক্ষেপে জীবিকার আর্থিক দিক। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? চাকরিপ্রার্থী (job seeker) এর অর্থ আয়ের মূল রাস্তা হল কোনো সংস্থার প্রদেয় পরিষেবার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন এবং তা সুচারুরূপে বিতরণ (delivery) করা। তাই দেখা যাচ্ছে স্কুল স্তর থেকে একেবারে গবেষণা পর্যন্ত যে জ্ঞান, দক্ষতা ( তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক) আমরা লাভ করি সেটা প্রয়োগের পর্যাপ্ত ক্ষেত্র প্রয়োজন তথাকথিত “job” প্রদান করার মাধ্যমে। উচ্চশিক্ষার (মূলত গবেষণা) সঙ্গে অর্জিত দক্ষতা ও সেগুলো প্রয়োগের উপযুক্ত পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্র কী কী আমাদের দেখতে হবে।
স্কুল স্তর থেকে গবেষণা পর্যন্ত (এক্ষেত্রে মূলত বিজ্ঞানের বিষয়গুলির কথা বলছি আমি) কোনো একটা বিষয়ের সাধারণ স্তর থেকে শুরু করে আরও সুনির্দিষ্ট অংশে আমরা বিশেষভাবে আলোকপাত করি সেই সম্পর্কিত বিষয়ের আরও গভীর জ্ঞান আহরণের জন্য। এর জন্য যেসব তাত্ত্বিক জ্ঞান ( অবশ্যই তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরীক্ষালব্ধ) অর্জন করি তা আমাদের চারপাশের বিভিন্ন ঘটনার কারণ ও প্রসেস ( পদ্ধতি বা কার্যকারণ, কীভাবে ঘটছে) এবং তার ফলাফল, প্রয়োগ অভিমুখ সম্বন্ধীয় ধারণা প্রদান করে। আর ব্যবহারিক বিদ্যা মূলত আমাদের বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি বা প্রক্রিয়া চালানোর অভিজ্ঞতা প্রদান করে।
আগেই বলেছি, অর্থনৈতিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি পরিষেবা প্রদান জড়িত। এই পরিষেবা প্রদান যত মানুষের দৈনিক জীবনে বা আশু প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে ( এক্ষেত্রে বিনোদনকেও আমি প্রয়োজন হিসেবেই ধরব) ততই জীবিকার অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দিকটি সুদৃঢ় হবে। এখন দেখা যাচ্ছে জ্ঞান বিতরণ ( পড়ানো) ও গবেষণালব্ধ অর্জিত দক্ষতা ( একটু আগেই যা বলেছি) সরাসরি ,বলা উচিত তাৎক্ষণিক সমাজের প্রয়োজনে (যেমন নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক জিনিস) ব্যবহৃত হচ্ছে না।
বিজ্ঞান গবেষণা মূলত একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে সর্বদা ফলাফল সুনির্দিষ্ট থাকে না (মৌলিক গবেষণার ক্ষেত্রে তা আরো প্রযোজ্য) এবং সেই ফলাফল আশু মানবকল্যানে ব্যবহার করা যায় না। এক্ষেত্রে বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডের বিদ্যুৎ (Electricity) আবিষ্কারের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। Electricity আবিষ্কারের পর তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন “what is the usage of it ?” । তখন ফ্যারাডে উত্তর দিয়েছিলেন “What is the use of a new born baby? One day people will pay tax for it”. তাই উচ্চশিক্ষা ও বিজ্ঞান গবেষণা কখনোই প্রাথমিকভাবে মুনাফা লাভের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। এর উদ্দেশ্য চারপাশের ঘটনাবলীর সুস্পষ্ট যুক্তিপূর্ণ কারণ খোঁজা। তা খুঁজতে গিয়ে কোনো বিশেষ আবিষ্কার ঘটে, যাকে প্রযুক্তিগত রূপান্তর ঘটিয়ে মানবকল্যানে ব্যবহার করা।
সোজা কথায় বলতে গেলে উচ্চশিক্ষাকে সরাসরি সম্পূর্ণরূপে প্রোডাক্ট হিসেবে তৈরি করা যায়নি, যা প্রত্যক্ষভাবে বিপণনযোগ্য উপাদান হিসেবে পরিষেবা প্রদানে ব্যবহৃত হয়ে আর্থিক নিরাপত্তা দেবে। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। একজন পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র বা ছাত্রীর কাছে ইলেকট্রিক ফ্যান কীভাবে কাজ করে (কার্যকারণ পদ্ধতি), কেন ওখানে ধারক (capacitor) ব্যবহার করা হয় তার সঠিক জ্ঞান থাকলেও একটি পাখা খারাপ হয়ে গেলে নিজের হাতে সম্পূর্ণরূপে সারানোর (repair) দক্ষতা একজন ইলেকট্রিকের সাধারণ মিস্ত্রীর মতো থাকে না। ফলে একজন সাধারণ মিস্ত্রীর জীবিকার সঙ্গে আর্থিক দিকটা সরাসরি যুক্ত থাকলেও একজন উচ্চশিক্ষিত গবেষকের সেই সুযোগ নেই।
সুতরাং, অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের চটজলদি কোনো পরিসর নেই খুব নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র (সরকারি বা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, খুব যৎসামান্য কিছু ইন্ডাস্ট্রি; এক্ষেত্রে আমাদের দেশ ভারতবর্ষের কথাই বলা হচ্ছে) ছাড়া । যদিও বিজ্ঞান বিষয়ক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ফলের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তী ধাপে প্রকৌশলী বিদ্যা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রায় সমস্ত নিত্য ব্যবহারিক প্রোডাক্ট (মোবাইল, কম্পিউটার থেকে শুরু করে পাখা , এলইডি বাল্ব , সুগন্ধী ইত্যাদি) প্রস্তুত হয়। আরো ক্লাসিক উদাহরণ আজকের দিনে ক্যান্সারের মতো মারণ রোগ মোকাবিলার অন্যতম অস্ত্র রেডিওথেরাপির উদ্ভবই হতো না যদি ম্যাডাম মেরি কুরী গবেষণা করে তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার না করতেন। বর্তমানের বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ ফলাফল আগামী দিনের প্রকৌশলী বিদ্যার মাধ্যমে পরিমার্জিত হয়ে পরবর্তীতে সরাসরি মানবকল্যানে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে।
এছাড়া উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অভিমুখ নির্দিষ্ট করে নিজস্ব লাভের জন্য রয়েছে কর্পোরেটের নিয়ন্ত্রণ। বর্তমান বিশ্বে কোথাও গিয়ে রাষ্ট্রের ওপরেও কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। তাই হয়তো বিশ্বব্যাপী গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার খাতে অর্থনৈতিক বরাদ্দ অত্যন্ত নির্দিষ্ট অভিমুখী যেখান কর্পোরেটের লাভ আছে (সরকারি অনুদানের অভিমুখ ও তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ)। গ্রাফিনের আবিষ্কর্তা নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আন্দ্রে জেম তাঁর নোবেল পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে এই ব্যাপারে সখেদে সোচ্চার হয়েছেন। (বক্তব্যটি ইউটিউবএ উপলব্ধ, Nobel Banquet Speech, Andre Geim, 2010 হিসেবে সার্চ করলেই পাওয়া যাবে)।
উচ্চশিক্ষার ও গবেষণার অভিমুখ নির্দিষ্ট করার পর সংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থানের সংকট ঠিক কোথায় সেটা এবার দেখা যাক। এই ধরনের শিক্ষায় যে দক্ষতা তৈরি হয় তা মূলত অধ্যাপনা ও গবেষণাকর্মী হিসেবে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ দেয়। এখন অভিমুখ নির্দিষ্ট করার অর্থ কেবল কিছু নির্দিষ্ট দিকের গবেষণাই আর্থিক সহায়তা পাবে । অন্যভাবে বলতে গেলে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকে জীবিকা হিসেবে দেখতে হলে একেবারে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের উপরেই কাজ/পড়াশোনা করতে হবে। অথচ বিজ্ঞান মুক্ত চিন্তা ও অনেকাংশেই কোন কিছু জানার কৌতুহল দ্বারা প্রভাবিত (curiosity driven )। এবিষয়ে আমার নিজের গবেষণার ক্ষেত্রে material science এর উদাহরণ দিতেই পারি। যেমন এই মুহূর্তে যাঁরা মূলত সৌরকোষ (solar cell ), লেজার, বা ব্যাটারী ইত্যাদি সংক্রান্ত গবেষণার সাথে যুক্ত, তাঁদের এবং সংশ্লিষ্ট জীবিকার অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দিকটা অনেকটা পোক্ত। কারণ তাঁদের কাছে আকাডেমিক ফ্যাকাল্টি (academic faculty ) নিয়োগপত্র না থাকলেও industry তে কোনো কোম্পানির সাথে যুক্ত হয়ে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ থাকছে। কারণ বাজার ও দৈনন্দিন জীবনের সাথে প্রোডাক্ট হিসেবে এর ( উপরোক্ত গবেষণার বিষয়গুলি ) সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। তাই কর্পোরেট বিনিয়োগ ও অনেক অনেক বেশি। কর্পোরেট একটাই জিনিস বোঝে, তা হলো মুনাফা। যেখানেই মুনাফা , সেখানেই বিনিয়োগ। কিন্ত এই সমস্ত ক্ষেত্র ( যেখানে বিনিয়োগ বেশি প্রোডাক্টের জন্য বৃহৎ আকারে নয়) এবং গবেষণার সমস্ত পরিষরে ( বিশেষত মৌলিক গবেষণার ক্ষেত্রে ) তা সম্ভবপর নয়।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে বর্তমানে উচ্চশিক্ষা তথা গবেষণার বিষয়বস্তু নির্ভর করছে মানুষের প্রয়োজন ও কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণের উপর। হায় কর্পোরেট! বিজ্ঞানের মতো সৃজনশীল ও মুক্ত চিন্তার বিষয়বস্তূ ও তোমাদের ইচ্ছায় নির্ধারিত হবে! মানুষের স্বাধীন চিন্তাভাবনার পরিসর যে এতে আরও সংকুচিত হচ্ছে। অথচ বিজ্ঞানের অনেক যুগান্তকারী আবিষ্কার আকস্মিক ভাবেই হয়েছে সে X-rayই হোক কিংবা superconductivityই হোক। এরকম আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে, যা পরবর্তীতে সরাসরি মানবকল্যানে ব্যবহৃত হয়েছে। এ নিশ্চিত ভাবেই বিজ্ঞান ও মুক্ত চিন্তার উপর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ, যা নিঃসন্দেহে এক অশুভ ইঙ্গিতের আভাস।
খুবই প্রাসঙ্গিক আলোচনা
daruun hyeche
তোমাদের দুজনের দুটো লেখাই খুব ভালো। আরো লেখো।