Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

অন্নপূর্ণার প্রায়শ্চিত্ত

অজয় কুমার রায়

ধর্মনগর, ত্রিপুরা, ভারত

বুড়ি সিঙাড়া খায় পেছন ফিরে, পাছে কেউ চায়! ডান হাত দিয়ে, অচল বাঁ হাতটিকে অতি কষ্টে ফেলে রাখে সিঙাড়ার ঠোঙায়। একটু একটু করে মুখে দেয় আর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, দেখে ফেলল না তো কেউ! অন্য সময় গোঁজ হয়ে বসে থাকে আর বিড়বিড় করে কী যেন বলতে থাকে । এমনিতে বোঝা যায় না, তবে খানিকক্ষণ কান পেতে থাকলে পরিষ্কার হয়। ‘তরে আনলাম প্যাডের ভিতরে কইর‍্যা। চক্ষের আড়াল হইতে দিছি না। হেই মাইয়ায় কিনা কয়- মা, তুমি যেন আমরারে দ্যাহ না! তোমার চক্ষে কেবল দাদা ভাসে! – কস কী তা! তুই কী আমার প্যাডে হইছস না? চুল ফালাইয়া, ফ্রকের বদলে হাফশার্ট পরাইয়া, শার্টের বাইরা যেহানে শরীল দ্যাহা যায়, হেই হানে, মুহে, হাতে-পায়ে কালাছালি ঘইস্যা তরে আনছি! তানরা ধলারে বালা পায়, কালারে না। জগতে ধলারই চল, কালা দুয়োরাণী ! পোলাডারে বাচাইয়া রাহন লাগব, বংশে বাতি দিব! কম সহ্য করা লাগছে! পরপর পাচডা মাইয়া! তিনডা আতুড় ঘরের বাইর‍্যা আইতে পারছে না। লোকে কয়, মাইয়া মাইনষের জান, কইমাছের লাগান – যে কাডে তারে দ্যাহে, যে রান্‌ধে তারেও! কই দেখল না দেহি! ধাই বেটি কয়, ভালই হইছে আগেই মরছে, হেই বাইচ্যা থাইক্যাও তো মরণ লাগল অইলে! শ্বাশুড়ি’এ কাঁদ্যে, আমি ভাবি, নাতিনের শোকে বুঝি! তান ননদের লগে কথা শুইন্যা বুঝি, তান কান্না নাতিনের লাগিনা, না হওয়া নাতির শোকে। ‘ওলো যমুনা, তর ভাইপুতের আবার বিয়া দ্যাওন লাগব। মাইয়া দ্যাখ। সুলক্ষণা, শরীলে পদ্মপাতার গন্ধ, মাডির থিকা চোখ তুলে না, বছরে বছরে পোলা বিয়ায়। এই মাগীর ঘরে খালি মাইয়া ছাওল। অরে, আমি মরলে ছাতি ধরব কে?,’ ডুকরে ওঠে শ্বাশুড়ি।

‘মাকে সিঙ্গারা দিয়েছে কে?’ ঘরে ঢুকেই ছেলেকে ‘শুদ্ধ বাংলায়’ বেশ জোরে জোরে প্রশ্ন করে জীবন, যাতে বৌ-ও শুনতে পায়। এইটেই এখন চল। ছেলেমেয়ের সাথে ‘শুদ্ধ বাংলায়’ কথা বলা। তাতে সিঙাড়া, যদি সিঙ্গারা হয় ক্ষতি নেই। ছেলের উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে বলে চলে, ‘যারা এই সব হাবিজাবি খাওয়ায়, তারা কি জানে না যে এগুলো মায়ের সহ্য হয় না। বারেবারেই বিছানা ভরিয়ে দেয়। ধোবে কে? লোক তো ওই একটাই! কথাটা জোরে জোরে বললেও তেমন জোর থাকে না কারণ সত্য এটা নয়। তার বৌ কোনদিনও মায়ের ময়লা কাপড়-চোপড় ধোয় না। কল্পনা সোজাসুজি বলে দিয়েছে, কখনই সে শ্বাশুড়ির বমি-পায়খানা ধুতে পারবে না, তাতে যে যা মনে করে করুক।পালা করে এই কাজটা করে যায় তার বড় বোন আর ছোট বোন। সে প্রতিবাদ জানাতে পারে না। সে জানে বৌ ছাড়াতার চলবে না রাতে, বৌ-ও জানে সে কথা। স্বাভাবিক নারী চেতনায় সে বুঝে গেছে – তার খুঁটি এই লোকটিই এবং শরীরই পুঁজি তাকে বাগে রাখতে। দুজনের দরকারেই তারা ব্যবহার করে একে অন্যকে।

দুপুর বেলা বাড়ির কাজ সেরে মেয়েরা আসে, হয় বড়জন কিংবা ছোটজন। ছেলে কিংবা বৌ ভুলেও তার পাশে এসে বসে না। নাতিটা মাঝে মাঝে বসলে ওনার ভালো লাগে। কিন্তু বাবা-মা দেখলেই বলে- ওখানে বসবে না ভোম্বল, ব্যাক্টেরিয়া আছে। বোনেরা কেউ না কেউ এসে বিছানার ওপরে পাতা রাবার ক্লথটা ধুয়েমুছে আবার পেতে দিয়ে যায়, চাদরটা বদলে দিয়ে যায়। সারাদিন পরে মেয়েদের দেখলে তার দুঃখটা উথলে ওঠে। তখনই দু-চারটে কথা হয়। কথানা বলে তাকে বিলাপ বলাই ভালো।   

‘রোজই তো লোক মরতাছে, আমি মরি না কেন?’

‘কী করে মরবে! এত পাপ করলে কী মানুষ মরে!’

‘পাপ করছি! কী পাপ করলাম আবার! জাইন্যা তো কাউরে কষ্ট দিছি না!’

মেয়েরা বলে, ‘দিয়েছ, ভাইকে দেখেছ একচোখে আর আমাদের অন্য চোখে! খেতে দেওয়ার সময় ওর পাতে সবচেয়ে বড় মাছটা দিয়েছ। দাদা কোন রান্না ভালো হয়েছে বললে নিজের জন্য না রেখেও তাকে দিয়েছ। আর আমরা চাইলে, ‘মেয়েরার অলা জিহ্বা বালা না’, বলে দাও নি বা দিলেও তরকারিতে ডুবিয়ে হাতাখানা ঝেড়ে দিয়েছ, তাতে এক আধটা আলু কিংবা অন্য কিছু পড়লে পড়েছে কিংবা পড়েনি! আর মুখখানা যা বানাতে তখন!’

শরীর ভালো থাকলে হেসে ফেলেন, ‘আমার মুখের কথা কইলি, হে কত রকমের মুখই না বানাইত, তরকারি চাওনের বেলায়। মনে আছে নি তর! কখন আবার কইত, ‘তোমারে বড় ভাল লাগতাছে লাল পাড় শাড়ি আর সিন্দুর টিপে!’ বোঝতাম আরও কিছু লাগে!’

‘তুমি ওর ছলটা বুঝতে! বুঝতে যে দাদা নিজেরটা বেশ বোঝে, আর অন্য সময় অবুঝ সেজে থাকে!’ 

‘ও মা, বোঝতাম না আবার!’

‘তাহলে দিতে কেন! অবাক হয় রেবা।’

‘মাইয়ামানুষ ত এইখানেই মরছে! মিথ্যা জাইন্যাও বিশ্বাস করে পুরুষের ছলনায়, খাওন তো তুচ্ছ, নিজের সর্বস্ব দিয়ালয়। মাইয়্যা হইয়া বোঝ’স না তুই!’

দীর্ঘশ্বাস পড়ে রেবার! হাড়ে হাড়ে সত্যি! মাঝে মাঝে মনে হয় সব ছেড়ে চলে যায় যেদিকে দুচোখ যায়। স্বামীর একটা ভালো কথা শুনে আঁকড়ে ধরে আবার!

মুখে বলে, ‘যাই মা, গিয়ে আবার স্নান করতে হবে। বলুর স্কুল থেকে ফেরার সময় হল, কিছুক্ষণ পরে বলুর বাবাও ফিরবে অফিস থেকে।’

‘অখনই যাইবে! আরও অল্প বস না কেনে।’

‘না, এখন আর বসব না,’ বলে উঠে দাঁড়িয়েও আবার বসে পড়ে, ‘তুমি খেয়েছ।’

‘কী জানি কইতাম পারি না! খাইছি নি?’

‘কী করে বলব, আমি তো এলাম খানিক আগে। তোমার ক্ষিদে পায় না?’

‘পায় ত! তখন হ্যারারে ডাহি। হ্যারা কখনও শোনে, কখনও শোনে না। বৌ কয়, আপনে খাইছেন, আমি নিজের হাতে আপনেরে দিয়া গেছি! তাইলে বোধহয় খাইছি! আবার ঘুমাইয়া পড়ি।’

– তুমি তো হাঁটতে পারো একটু একটু। তাহলে যাও না কেন রান্নাঘরে?’

‘ডর লাগে, বৌ-এ মুখ করে। ভাবি, বাথরুমে যাবার ক্ষমতাটা জমাইয়া রাখি। তাইলে বিছানাটা ভরে কম। তরার কষ্টডা কমে!’

 দুঃখে চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে। এই ঘরের প্রতিটি বাঁশে, বেড়ায় যার নাম লেখা আছে সেই মানুষটিই এই ঘরে হাঁটতে ভয় পায়। মানুষ যত বাড়তে থাকে তার জায়গা ততই সঙ্কুচিত হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে তার নিজের গড়া ঘরে সে একদিন বর্জ্য পদার্থ হয়ে যায়। পড়ে থাকে এক কোণে অতি সন্তর্পণে, ফেলে দেবার অপেক্ষায়। সামান্য নড়াচড়া করতেও ভয়, কখন জানি উড়ে আসে কথার হুল!   

কিন্তু সিঙাড়াটা খাওয়ার পর কোনভাবেই শেষরক্ষা করতে পারলেন না, কাপড়ে-চোপড়ে হয়ে গ্যালো! বুঝতে পারেননি প্রথমটায়, ময়লার মধ্যেই পড়েছিলেন। অন্য অনেক বোধ তাকে ছেড়ে গেলেও পরিষ্কার থাকার বোধটি তাকে এখনও পীড়া দেয়। ছেলের বৌকে ডেকে ফেলেন, ‘অ বৌ, আমার কাপড়খান বদলাইয়া দিয়া যাও না।’ যাকে বলা সে তাকে এই অবস্থায় দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারে না, দুর্বল বাঁ হাতটাকেই জোরে মুচড়িয়ে দেয়। যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠেন তিনি, ও মাগো!

ঠামকে মেরো না গো মা! ভোম্বলের কথায় তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলে কল্পনা, না মারব না, আদর করব! যা দৌড় দিয়া, তর ছুট পিসিরে ডাক দিয়া নিয়া আয়। তার জামাইয়েই না আদর কইর‍্যা শ্বাশুড়িরে সিঙারা খাওয়াইছে, এখন পরিষ্কার করুক! মরেও না মরাডা! এখন আর শুদ্ধ ভাষা নয় নিজের দেশের ভাষায় বিষ উগরে, দুম দুম করে পা ফেলে চলে যায় রান্নাঘরে।

ভোম্বলের মুখে সব কথা শুনে নিজের বাড়ির সব কাজ ফেলে প্রায় ছুটেই বেরিয়ে আসে রেবা। বুকটা ক্রমাগত মোচড়াতে থাকে মারের কথাটা ভেবে। মাকে ধোয়াতে ধোয়াতে মনে হয় দুটো কথা শুনিয়ে দেয়, তারপরেই আবার মনেহয় কী হবে শুনিয়ে! এতে নিজের জ্বালা কিছুটা কমবে হয়তো, কিন্তু মায়ের ওপর অত্যাচারটাই বাড়বে! বড়দি কিন্তু ছাড়ত না, কথা শোনাতই। সবাই ওকে ভয় করে এই জন্যই। কিন্তু শুনিয়েই বা কী হতো, কিছু তো করতে পারতো না, এক কামরার ভাড়া ঘর। তবুও একবার ভেবেছিল যে রান্নাঘরেই কোনরকমে একটা ব্যবস্থা করবে। কিন্তু বাড়ির মালিক রাজি হলেন না কিছুতেই। বড়দির অবস্থা তো আরও খারাপ, দুবেলা ভাত জোটাতেই হিমসিম! মায়ের এই যন্ত্রণা সে সইতেও পারছে না আবার কোন সুরাহাও করতে পারছে না, এই দোটানায় সে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে এবং পুরো রাগটাই গিয়ে পড়ে দাদার ওপরে, কেন সে কিছু বলে না বউদিকে, মায়ের ওপরে এই জুলুম করার জন্য! অগত্যা রাগেশোকে দুঃখে সে কাঁদতে থাকে, সেই তপ্ত অশ্রু মায়ের ওপরেই ঝরে পড়ে, মেয়ের গালে হাত দিয়ে তিনি অনুভব করতে চেষ্টা করেন মেয়ের দুঃখটা,

‘কাঁদ্যিস না, তরাও পাপ করছস আমার প্যাটে জন্মাইয়া! না অইলে তরার এত কষ্ট ক্যান!’

‘কীসের পাপ! আমি তোমার কষ্টে কাঁদি, কিছু করতে পারি না তাই কাঁদি! বৌয়ের গোলামটার ওপর রাগে কাঁদি!’

‘কাউরে দোষ দেই না, সবই আমার কপালের লিখন!’ দীর্ঘশ্বাস পড়ে তাঁর। একটু পরে আবার বলেন, ‘তরা আমারে প্রায়শ্চিত্ত করা। তাইলেই মরমু আমি!’

‘কীসের প্রায়শ্চিত্ত!’ বলে রেবা কথাটা উড়িয়ে দিলেও সেটি বেশ মনে ধরে তার বৌদির। এতক্ষণ আড়ি পেতে সে শুনছিল ওদের কথাবার্তা। তার বিরুদ্ধে শ্বাশুড়ি নালিশ জানায় কিনা!  রাতে সুযোগের নিপুণ ব্যবহার করে সে কথাটি জীবনের কানে তোলে। সেই সময় হ্যাঁ বললেও, পরে সে যথারীতি ভুলে যায়। কিন্তু তার বৌ ভোলে না। পরপর দু-তিনদিন বলার পরও কাজ না হওয়ায় ভোম্বলকে মাঝখানে শুইয়ে অন্য পাশে শুয়ে থাকে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে। ডাকাডাকি বা গলা খাঁকারিতেও কাজ হয় না। অগত্যা সে অফিস থেকে ফিরে, কমল পন্ডিতের বাড়িতে গিয়ে প্রায়শ্চিত্তের কথাটা পাড়ে। পন্ডিতের মুখ থেকে কথা সরে না কিছুক্ষণ, অবাক হয়ে চেয়ে থাকেন তার দিকে, ‘তোমার জননীর মৃত্যু কামনায় প্রায়শ্চিত্ত করাতে চাও। ‘হ্যাঁ কাকু, আমরা আর পারছি না, বিশেষ করে আপনার বৌমার কষ্ট আর চোখে দেখা যাচ্ছে না।’ এই পরিবারটির সাথে তাঁর ওদেশে থাকতেই পরিচয়। নিজের চোখে দেখছেন কী প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় এরা নিজেদের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন, আর তাতে এই মহিলাটির ভূমিকা কী ছিল। নিজে উপবাসী থেকেও অন্যদের খাইয়েছেন। তাই তিনি বলতেন, ‘আপনার অন্নপূর্ণা নাম সার্থক! নামে আর কাজে এমন মিল দেখা যায় না।’ সেই মায়ের পুত্র আজ মায়ের মৃত্যু কামনা করছে! চোখে জল আসতে চায় এই নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের।নিজেকে সামলিয়ে বলেন, ‘প্রায়শ্চিত্তের বিধান দিতে হলে পাপের নিশ্চয় করতে হয়। কেননা অজ্ঞাত পাতকে প্রায়শ্চিত্তের অনুপপত্তি। তোমার মায়ের পাপের বিবরণ জানা আছে তোমার?’ আমতা আমতা করে জীবন বলে, ‘ভগবান যে তাকে টেনে নিচ্ছেন না, এত কষ্ট দিচ্ছেন সেটা কী পাপের কারণে নয়?’ তাঁর অন্তর ক্রোধে মথিত হতে থাকে, কিন্তু সংযম তাঁর দীর্ঘ বছরের সাধনার ফসল। ক্রোধকে নিবৃত্ত করে বলেন, ‘তোমার জননী তোমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন, এই কারণে তাকে অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। তোমার বোনেরা এখনও তাকে এইজন্য খোঁটা দিয়ে থাকে। তোমাদের পরিবারের সাথে বিশেষ ঘনিষ্ঠতার কারণে এই সব আমার জানা।’

‘এই কারণেই কাকু আপনার কাছে আসা। আপনি তো সবই জানেন……’                        

তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলেন, ‘সেই জন্যই বলছি, জ্ঞানত তাকে কোন পাপ করতে আমি দেখিনি। অবশ্য তোমাকে বিশেষ স্নেহ করাটা যদি পাপ হয়ে থাকে, সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমি করাতে পারব না। আমার সন্ধ্যা রতির সময় হয়েছে, আমি এবার উঠব।’ হতাশ হয়েই ঘরে ফেরে সে। বৌ কিছু বলার আগেই জামা-কাপড় খুলতে খুলতে সেবলে, কমল পন্ডিত রাজী হলেন না। একটু দমে গেলেও কল্পনা বলে, ‘তুমি চিন্তা কোর না, ধর্মনগরে পন্ডিতের অভাবনেই, রাজেন পন্ডিতই তো আছে। তার কাছে যাব, কালকেই যাব! দেখিয়ে দেব কমল পন্ডিতকে!’

রাজেন পন্ডিত ঘাগু লোক, আড়ালে তাকে লোক অনেক কিছু বলে এবং সেটা যে প্রশংসা করে বলে না সেটা তিনি জানেন, কিন্তু গায়ে মাখেন না। এও জানেন যে, ধর্মনগরের মানুষ আগে কমল পন্ডিতকে খোঁজে, ব্যর্থ হলে তার কাছে আসে। তিনি ক্ষুব্ধ হন, প্রকাশ করেন না। ক্ষোভ পুষিয়ে নেন অন্যভাবে। জীবনকে স্ত্রী সহ দেখে তিনি বুঝলেন সমস্যাটি জটিল। তাদের বসতে বলে  বাড়ির ভেতর থেকে কাউকে পানের ডাবরটা দিয়ে যেতে বললেন। এটাই রীতি এখানকার। পানটি হাতে নিয়ে তখুনি মুখে দিলেন না, কাপড়ের খুঁটে সেটিকে মুছে, বাঁ হাতের চেটোয় রেখে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে চুনটিকে এমনভাবে ঘষতে লাগলেন, যেন পৃথিবীতে এর চেয়ে জরুরী কাজ আর কিছু হতে পারে না। এটা তার পরীক্ষা যজমানকে। ধীরে সুস্থে তিনি পান মুখে দেন ও যজমানের উৎকন্ঠায় উল্লসিত হন। তার এই নীরবতা বা উপেক্ষা সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তারা নিজেরাই আসার উদ্দেশ্যটা বলে ফেলে। প্রয়োজনটা যে তাদের, সেকথাটা বোঝাতে পেরেছেন দেখে তিনি প্রীত হন। এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয় না। তারা প্রায়শ্চিত্ত করানোর কথাটা বলে ফেলে। তিনি বোঝেন শ্বাশুড়ির মৃত্যু চায় বৌ, শিরদাঁড়াহীন স্বামী বিরোধিতা করতে পারে না। তিনি ক্রুদ্ধ হন কিন্তু সেটা প্রকাশ হতে দেন না। বলেন, ‘খুবই কঠিন কাজ। আগে পাপের বিবরণ জানতে হয়, তারপরে বিধান। জীবনের মুখ শুকায়, একই কথা বলেছিলেন কমল পন্ডিত। তার এই ভাবান্তরটুকু দৃষ্টি এড়ায় না তার, কিন্তু তিনি থামেন না, ‘জানতে হয় উদ্দিষ্ট ব্যক্তি অতিপাতক, মহাপাতক কিনা! তারপর প্রাজাপত্যাদি ব্রত করতে হয়। আদিপদে পরাক ব্রতচান্দ্রায়ণ, কৃচ্ছ চান্দ্রায়ণাদি করার আজ্ঞা আছে। তবে ……,’ তিনি একটু বিরাম নেন।

‘এত কিছু করতে হয়!’ হতাশ দেখায় তাদের। তাদের কথার রেশ ধরে বলেন,’করতে হবে না! প্রায়শ্চিত্তের মানে জানো? এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে মানুষ ঈশ্বরের সাথে মিলিত হয়, শরীরে মনে পাপমুক্তি না ঘটলে কী তাঁর সাথেমিলিত হওয়া যায়?’ তারা মুষড়ে পড়েছে দেখে তিনি খানিক থেমে বলেন, ‘এ আমার কথা নয়, শাস্ত্রের কথা। তবে এরও বিধান আছে শাস্ত্রে।’ একটু যেন আশার আলো দেখতে পায় জীবনরা, কিন্তু কিছু বলতে সাহস পায় না। তখন তিনিই বলেন, ‘কলিযুগে মানুষের এই সব কঠিন ব্রতাদি করার শক্তি নেই দেখে শাস্ত্রে ধেনু দান করার অনুজ্ঞা দেওয়াহয়েছে।’

‘ধেনু মানে গরু দান, সে তো অনেক টাকার ধাক্কা!’ অসহায় জীবন কাতরভাবে বলে। কিন্তু তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে প্রায় ধমকে ওঠে তার বৌ, ‘থামো তো তুমি, গরুর টাকা আমি চেয়ে আনবো মায়ের কাছ থেকে।’ জীবনের কাছ থেকে কোন উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে বলে যায়, ‘পন্ডিত মশাই, আপনি দিন ঠিক করুন, আমি সব ব্যবস্থা করছি।’

‘তা আমি করছি। কিন্তু আর একটা কথা তোমাদের অবগতির জন্য বলছি। আমি প্রায়শ্চিত্ত করালে উপ-চার বেশিলাগে ঠিকই, সে জন্য আপাতদৃষ্টিতে খরচটাও বেশি লাগে। কিন্তু কম উপ-চারে অনুষ্ঠান করলে দেবতা তুষ্ট হন না, তাই উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হয় না। অনেক পুরোহিত এর চেয়ে কমে প্রায়শ্চিত্ত করায় কিন্তু উদ্দেশ্য সাধন হয় না – পাপমুক্ত হয়ে মানুষ ভগবানের শ্রীচরণে আশ্রয় নিতে পারে না। নিজের মুখে বললে বড় কথা হবে তবুও বলছি, আমি প্রায়শ্চিত্ত করালে সাতদিনও পার হয় না……।’    

এক মায়ের মৃত্যু কামনার ব্রতর খরচ আসবে আরেক মায়ের কাছ থেকে! রাজেন পন্ডিতের মতো কঠিন প্রাণব্যক্তিও বিচলিত হন মনে মনে কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ না করে বলেন, ‘ঠিক আছে আমি দিন দেখে তোমাদের জানিয়ে দেব।’

‘একটু তাড়াতাড়ি করবেন পন্ডিত মশাই।’ উঠতে উঠতে বলে যায় জীবনের বৌ। মনে মনে হাসেন পন্ডিত, করুণাও হয় এদের দুজনের প্রতি! ছেলের বৌ শ্বাশুড়ির মৃত্যু ত্বরান্বিত করার জন্য অধীর, ছেলে তার প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা, প্ৰকারান্তরে সমর্থনই করে যাচ্ছে! কী অদ্ভুত!

রোজই যেমন যায় তেমনিভাবে মাকে পরিষ্কার করাতে গিয়ে ভোম্বলকে মায়ের কাছে বসে থাকতে দেখে রেবা খানিকটা অবাকই হয়।

‘কী রে তুই যে এখানে বসে আছিস, তোর মা বকবে না?’

‘মা তো বাড়িতে নেই, পানি সাগর গেছে।’

‘তোর মামাবাড়ি? হঠাৎ কী হলো! কারো শরীর খারাপ নাকি?’

‘মা তো ধেনু আনতে গেছে!’

থতমত খেয়ে রেবা বলে, কী বললি? ধেনু? তুই ধেনু মানে বুঝিস?’

‘বুঝি তো – গরু। মা ব’লেছে!’

‘তোরা গরু পুষবি নাকি?’

‘না, না। মৃত্যুপূজা হবে তো, তাই গরু লাগবে।’

‘মৃত্যুপূজা কী রে?’

‘মা বলছে এই পূজা না করলে ঠাম নাকি আর মরবে না। আর বলেছে, কাউকে না বলতে।’

সে আর কিছু বলতে পারে না, শরীরের সমস্ত শক্তি যেন নিঃশেষিত হয়ে যায়। পড়ে যাবার আগে সে সমস্ত শক্তি দিয়ে মায়ের বিছানাটাকে আঁকড়ে ধরে পতন সামলায়। একটি শীর্ণ হাত তার হাতের ওপর এসে পড়ে। ‘কানতাছস! কাঁদ্দিসনা – আমিই তো কইছি প্রায়শ্চিত্ত করাইতে। তর সামনেই ত কইছি!’ এতক্ষণের অবরুদ্ধ কান্না প্রবল ধারায় বর্ষিত হতে থাকে মায়ের শীর্ণ হাতটির ওপরে, যার ওপরে উপুড় হয়ে পড়েছিল সে। ‘ও পিসী, তুমি কাঁদছ কেন, কী হয়েছে?’ পিসীর সাথে সেও কাঁদতে থাকে।

বৌকে গাড়িতে তুলে দিয়ে ঘরে ঢুকেই দুজনকে এইভাবে কাঁদতে থেকে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় জীবন। কী বলবে ভেবে পায় না সে। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল যে, যেটা তারা লুকোতে চাইছিল সেটা প্রকাশ হয়ে গেছে। গত রাতে ব্যাপারটা নিয়ে তার বৌ-এর ওই আনন্দের আতিশয্য তার ভালো লাগে নি, কিন্তু সে কিছু বলতে পারে নি, কোনদিনও পারে না। বৌ-এর সামনে এলেই সে কেমন যেন দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু এখন এই দুজনের কান্না দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করতে থাকে। কিন্তু সেটা ক্ষণিকের! সে জীবনে বস্তুর প্রয়োজন খুব ভালোভাবে বোঝে। বোঝে, ভাব দিয়ে আর যাই হোক প্রয়োজন মেটে না। চাহিদা পূরণের জন্য ভয় দেখানো, স্তুতি করা, অনুনয় বিনয় ইত্যাদি যেকোন পথ অবলম্বন করে এসেছে একদম ছোটবেলা থেকেই। জীবনের অন্যান্য অনুভূতিগুলি নেহাতই তাৎপর্যহীন।মানুষের মৃত্যু একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া – এর জন্য শোক করা বৃথা। নিজের মা-বাবা ও ছেলের অসুখের বেলায় সে বলে, ‘পুরানোরা সরে যাবে নতুনরা আসবে- এটাই বিকাশের নিয়ম।’ তাই যত্ন নিতে হবে নতুনদের, তাই নিজের ছেলেকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। বোনেরা অবাক হয়, গালাগাল দেয় তাকে। সে নির্বিকার থাকে! বোনেরাই বাবা-মাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়।

প্রায়শ্চিত্তের আগের দিন সংযম-নিরম্বু উপবাস। পুরোহিতের বিধান অমান্য করে মাকে অন্নগ্রহণ করাতে সাহস করেনি বোনেরা । কিন্তু বারেবারে সরবত করে খাইয়েছে, জীবনের বৌয়ের তির্যক মন্তব্য সত্ত্বেও- খুব তো খাওয়ানো হচ্ছে, কাজের সময় যদি কাপড়চোপড় ভরায় তখন সামলাবে কে! রেবা উত্তর না দিলেও বড়দি ছাড়ে না, ‘সে চিন্তা তোমার করণ লাগব না! কোনদিন যখন করছ না, আইজও লাগত না। একটা মোক্ষম জবাব খুঁজছিল সে, কিন্তু বড়দির পরের কথাটি তার উদ্যত ফণাকে নুইয়ে দেয়। নাকি মানুষটার মরণের জন্য তর সইতাছে না! কথাটা তো হাড়েহাড়ে সত্যি! তাই সুড়সুড় করে সেখান থেকে চলে যায় সে। নির্জলা উপবাস না হলে যে দক্ষিণা বাড়বে, সেটাও বলতে পারে না!,

খুব সকাল সকাল রাজেন পন্ডিত জীবনের বাড়ি পৌঁছে যান। এটা তার অভ্যাসও বটে। ধর্মীয় কোন অনুষ্ঠান নিখুঁত ও শাস্ত্র অনুযায়ী পালনীয় বিধি অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করারও করানোর ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত কঠোর এবং সেটা বোঝানোর চেষ্টায় কোন ত্রুটি রাখেন না। তিনি জানেন এজন্য কমল পন্ডিতের সাথে তার তুলনা হয় এবং মানুষ তাকে ভয়ও করে এবং আড়ালে কসাই বলে। তবু তিনি কোন আত্মগ্লানিতে ভোগেন না, বরং আত্মপ্রসাদই লাভ করেন। উঠোনে ঢুকে তার চোখে পড়ে, রঞ্জু নাপিত মাটি থেকে লম্বা লম্বা চুল তুলে জায়গাটিকে পরিষ্কার করছে। আরজীবনের দুই বোন হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে তাদের মাকে ধরে স্নান করাতে নিয়ে যাচ্ছে। বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে আসা ইস্তক তার ঘন কুঞ্চিত কেশরাশি অনেকেরই ঈর্ষার বিষয় ছিল। পিঠ ছাপিয়ে তা কোমর পর্যন্ত ঝুলে থাকতো। তারসাথে মানানসই বড় করে একটি সিঁদুর টিপ দিয়ে তিনি যখন ঠাকুর প্রণাম করে বেরিয়ে আসতেন তাকে মা ছাড়া আর কিছু মনে হতো না। স্বামীর সাথে সিঁদুর টিপও গিয়েছে, শরীরও অশক্ত হয়েছে কিন্তু তার কেশরাশি প্রায় আগের মতোই। গোছা কিছুটা আলগা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখনও একহাতে ধরতে কষ্ট হয়। চুলের জন্যই মাথাটা অনেক বড়দেখাত। এখন সেই কেশরাশির বিসর্জনে তার মাথাটিকে ছোট শিশুর মতো মনে হচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে রঞ্জুও চোখের জল ধরে রাখতে পারে না, আপন মনেই গজ গজ করতে থাকে-এ কেমন বিধান বুঝি নে বাপু, মানুষের মরার জন্যও পূজো করতে হবে! মেয়েছেলের চুল ফেলতে হবে!

সূর্য ওঠার আগেই মস্তক মুন্ডন কর্মটি সম্পন্ন করার, আদেশটি পালিত হয়েছে দেখে তিনি প্রসন্ন হন।প্রায়শ্চিত্তের জন্য উপাচারগুলি সাজিয়ে রাখা হয়েছে তার আসনের সামনে, ধেনুটিকেও বেঁধে রাখা হয়েছে একপাশে।ছোট হলেও বেশ হৃষ্টপুষ্ট, এটিও তাকে খুশি করে। সেই প্রসন্নতা ঝরে পড়ে রঞ্জুর সাথে তার কথায়,

‘তোর আবার কী হলো রে, কার সাথে কথা বলিস তুই?’

‘এই তোমাদের কথাই বলছি ঠাকুরদা, মরার জন্যও তোমাদের পূজো করাতে হয়!’

‘দূর ব্যাটা, পূজো কীসের, এ তো প্রায়শ্চিত্তির, পাপ করলে করতে হয়! অবশ্য তোকে এ সব বলে কী হবে, তোদের ঘরের বৌ-ঝিরা তো গন্ডায় গন্ডায় বিয়োচ্ছে তাই মরার হিসেব রেখে কী করবি?’

‘ঠিক বলেছ ঠাকুরদা, আমাদের হিসেব থাকে না। তা একটি কথা বলো দেখি, আমাদের ঘরে না বিয়োলে তোমাদের বোঝা টানবে কে? ওই যে গরুখানি দাঁড়িয়ে রয়েছে সেটি তোমার ঘরে পৌঁছবে কে! পূজা শেষে যে মোটখানি বাঁধবে, সেটি মাথায় করে নিয়ে যাবে কে! তুমি ঠাকুরদা ছাতাটি মাথায় নিয়ে আগে আগে যাবে আর পেছনে পেছনে যাবে আমাদের ছেলেরা। বাড়ি পৌঁছে, দুটো বাসাতা আর এক ঘটি জল দিয়ে তারে বিদায় করবে, আর খুব বেশি হলে ভুজ্যির চাল থেকে খানিকটা চাল আর আর আনা আষ্টেক পয়সা! তাই ঠাকুরদা আমাদের কাছে মানুষ মানে বাড়তি দুটো হাত-যে হাত দিয়ে কাজ হয়। তাই মানুষ আমাদের কাছে বোঝা হয় না বোঝা হালকা করে। কেউ মরে গেলে আমরা মনে করি দুটো হাত কমে গেলো!’ রাজেন ঠাকুর কুপিত হন, ‘তোর মতো মুর্খের সাথে কথা বলা আর ভস্মে ঘিঢালা একই ব্যাপার!’

পন্ডিতের এই রূপ দেখে প্রমাদ গোনে জীবন। না জানি কী আছে কপালে! তাকে অত ভোরে আসতে দেখে আগেই মনটায় কু ডেকেছিল। বলেছিলেন বটে সকাল সকাল আসবেন, তা বলে এত ভোরেই যে তিনি এসে পড়বেন এটা জীবন ভাবে নি। এরপর আবার এই গেরো! তাই কী করবে ভেবে না পেয়ে প্রথমে রঞ্জুকে ধমকে ওঠে, ‘বড় বড় কথা বাদ দিয়ে ভেতর থেকে চেয়ার এনে দে ঠাকুর কাকাকে’ এবং নিজে তার হাতে ফিল্টার সিগারেটের পুরো প্যাকেটটা ধরিয়ে দিয়ে কাঁচু-মাচু মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। এত রাজেন ঠাকুরের রাগ কিছুটা প্রশমিত হয়। তার অভিজ্ঞতায় তিনি বোঝেন যে, স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে জীবনের মাকে এখানে আনতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। এখনও সূর্যওঠেনি। আর উঠলেও তার খুব একটা কষ্ট হয় না। রৌদ্র প্রখর হলে তিনি তার গামছাখানি ভিজিয়ে দিতে বলেন কাউকে এবং সেই ভিজে গামছা মাথায় দিয়েই কাজ শেষ করেন।কিন্তু যখন বেলা বাড়বে তখন শুধুমাত্র একটি চাঁদোয়ার নীচে এই অশীতিপর  অসুস্থ বৃদ্ধা কী করে বসে থাকবেন এই চিন্তাটিই তার মধ্যে ক্রিয়া করছিল। তারওপর আবার এরা আবার সামবেদী এবং গোত্র-শান্ডিল্য। স্বভাবতই অনুষ্ঠান দীর্ঘায়িত হবে। কিন্তু এই চিন্তা তাকে বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারে না বিচলিতও করতে পারে না। তিনি জানেন, কার ভাগ্যে কী হবে সবই পূর্ব নির্ধারিত! অন্যরা নিমিত্ত মাত্র! তাই তিনি সিগারেট ধরিয়ে একটি দীর্ঘ টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে বলেন, ‘সবই নিয়তি, বুঝেছ জীবন, এই যে তোমার মাতৃদেবীর কেশমুন্ডন তোমাদের ব্যথিত করেছে আমি জানি।’

প্রায়শ্চিত্তের দিন স্থির করার পরই তিনি বলে দিয়েছিলেন করণীয় কী। মস্তক মুন্ডন করে স্নান করার পর পট্ট বস্ত্র পরিধান করাটা অবশ্য কর্তব্য। এখনআর কেউ পট্ট বস্ত্র পরে না, সূতির কাপড়ই পরে, তিনিও আপত্তি করেন না। বিধবার চুল রাখাও তিনি পছন্দ করেন না, শাস্ত্রে নিষেধ আছে-বিধবা কবরীবন্ধো বন্ধায় জায়তে পতেঃ / শিরসো মুন্ডনং তস্মাৎ কার্য্যং বিধবায়া সকেতি।(বিধবার কেশবন্ধনে তাহার পতির বন্ধন হয়, সুতরাং সর্ব্বদাই শিরমুন্ডন করা কর্তব্য)। কিন্তু মানুষ সেটাও মানে কই।কিন্তু এখানে তিনি কোন আপোষ করেন নি, কড়া করে বলে দিয়েছিলেন জীবন ও তার বৌকে। তাদের কোন’ আপত্তি থাকার কথা ছিলনা, আপদ যত তাড়াতাড়ি বিদায় হয় ততই ভাল। কিন্তু মেয়েরা সহ্য করতে পারেনি, বাধাও দিতে পারেনি ডুকরে কেঁদে উঠেছিল, মায়ের অত সুন্দর কোঁকড়া চুলগুলো নাপিতের ক্ষুরের সামনে দলা দলা হয়ে মাটিতে পড়তে দেখে।

তাকে চোখ বন্ধ করে সিগারেট টানতে দেখে জীবন কিছুটা সাহস পায় পন্ডিতকে জিজ্ঞেস করতে।

‘কাকাবাবু একটু চা খাবেন!’

‘তোমার স্ত্রী কি গতকাল থেকে সংযমে ছিলেন? তিনি কি স্নান করেছেন? করে থাকলে এক কাপ দিতে বলো। তবে তোমার মাকেও তাড়াতাড়ি নিয়ে আসার ব্যবস্থা করো।’               

অনুষ্ঠানে বসে প্রথমেই একটা বড় ভুল করে ফেলেছিলেন নিজের নামটাই মনে করতে পারছিলেন না। অসহায়ের মতো স্মৃতি হাতড়াচ্ছিলেন, থৈ পাচ্ছিলেন না। মা, ঠাম আর বুড়ি নামটাই বেশি করে শোনেন। ‘বুড়িটা মরেও না।, দিনের মধ্যে এইটেই বেশি।

স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে, এই বয়সে অনেকেরই হয়। পন্ডিত বলেন, ‘তোমরা কেউ নামটা বলে দাও।’

‘……শান্ডিল্য গোত্রস্যা অন্নপূর্ণা দেব্যা লোকান্তরে স্বাভীষ্টা ………, মহেশ পন্ডিত আবার শুরু করেন। এর পর আর বিশেষ কিছু হয়নি, পুরোহিতের সাথে মন্ত্র আওড়ে গ্যাছেন অস্পষ্ট গোঙানির মতো। ঠোঁটদুটো বারবার ভিজিয়ে নিতে চেষ্টা করেছেন। বড়দি, রেবা সবই বুঝতে পারছিল কিন্তু কিছু করতে না পারার দুঃখে তাদের বুকটা ফেটে যাচ্ছিল! কিন্তু যখন হেঁচকি তুলতে থাকলেন তখন বড়দিই থাকতে না পেরে বললেন, ‘ঠাকুর কাকা, একটু সরবত দেই।’ এমন একটা আর্তি ছিল এই কথাটিতে রাজেন পন্ডিতও না করতে পারলেন না, ‘দাও মা দাও, ওটুকু ত্রুটি ভগবান নিশ্চয়ই ক্ষমা করবেন।’ জীবনের বৌ কিছু বলতে যাচ্ছিল, তাকে হাত তুলে নিরস্ত করে বললেন, ‘নিয়মভঙ্গের জন্য মূল্য ধরে দেবার বিধান থাকলেও, এ ক্ষেত্রে তোমাকে তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।’

‘আর কতক্ষণ লাগবে ঠাকুর কাকা?’ জিজ্ঞেস করল রেবা। মায়ের জন্য মেয়ের এই উদ্বেগ স্পর্শ করল তাকেও, ‘আর সময় বিশেষ লাগবে না, তবে মা একটি কঠিন পরীক্ষা আছে – গো-গ্রাস প্রদান করা।’ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললেন ‘একটি ডালায় ঘাস, বাঁশপাতা, চালকলা ইত্যাদি আহার্য ভরে মাথায় করে নিয়ে গিয়ে গাভিটিকে প্রদান করতে হবে। খুশি মনে গাভিটি যদি সেই আহার্য গ্রহণ করে তাহলে প্রায়শ্চিত্ত সিদ্ধ হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। আর না হলে, আবার ……। চিৎকার করে ওঠে রেবা, ‘থাক্ ঠাকুর কাকা, আর কিছু বলতে হবে না!’ এক অসহনীয় নীরবতা নেমে আসে প্রায়শ্চিত্তস্থলে, সে সভয়ে তাকায় সাদা কাপড়ে আবৃত মানুষের পুঁটুলিটির প্রতি। মাথাটি দুই হাঁটুর মধ্যে গুঁজে রেখে তিনি বসে আছেন বেঁচে থাকার অপরাধের বোঝা মাথায় নিয়ে। বসে আছেন বললে ভুল হবে মৃত্যুকামনা করে চলেছেন অবিরত! আর করবেন নাই বা কেন? এ তো তারই মৃত্যু ত্বরান্বিত করার অনুষ্ঠান!

‘আর তো দেরী করা যায় না মা, সূর্যদেব মাথার ওপরে চলে আসছেন প্রায়। তাতে ওনারই কষ্ট বাড়বে।’

মুস্কিলটা হলো গো-গ্রাসের ডালাটি মাথায় নেওয়া নিয়ে। তাঁর অচলপ্রায় বাঁ হাতটি বহু চেষ্টায় এক আধটু নড়াতে পারলেও সেটি দিয়ে ডালা ধরা সম্ভব নয়। তাড়াতাড়ি বড়দি ধরতে গেলে রাজেন ঠাকুর বাধা দিলেন, ‘এটা ওনাকেই বইতে হবে। এ পথে ওকে একাই যেতে হবে।’ নিজের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করার তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে প্রায় দুদিনের উপবাসী অন্নপূর্ণা ডালা মাথায় নিয়ে কোনক্রমে উঠে দাঁড়ান। টলোমলো পায়ে কিছুটা এগিয়েও যান কিন্তু গাভিটির থেকে কয়েক হাত দূরে এসে তিনি উপুড় হয়ে পড়ে যান। গো-গ্রাসের ডালাটি পড়ে গিয়ে ‘ধেনু’টির সামনে। তাকে খাবার দেবার কথা কারো মনে ছিল না। সে গোগ্রাসে খেতে থাকে। কিন্তু অন্নপূর্ণা দেবী আর ওঠেন না।

জীবনে প্রথম বারের মত রাজেন ঠাকুর স্ব-কৃত অনুষ্ঠানের সদ্যসদ্য ফল দেখেও আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন না!

Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Ajoy Kumar Roy
Ajoy Kumar Roy
7 months ago

এই পরিকল্পনা এবং তাকে বাস্তবায়িত করাটা নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ কাজ। যাঁরা এই আপাত অসম্ভব কাজটি সম্পন্ন করেছেন তাঁদের আভূমি কুর্ণীশ।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
Admin
Reply to  Ajoy Kumar Roy

আপনাদের সাহায্য ও নৈতিক সমর্থন চাই এই পত্রিকাকে সবার কাছে পৌঁছে দিতে।

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x