Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

বাহা পরব

গোপাল মার্ডি

মহুলি, বোলপুর -শ্রীনিকতন ব্লক

বীরভূম 

বাহা কথার অর্থ হলো ফুল। আদিবাসীরা প্রকৃতিকে পূজা করেন, তাই এই বাহা পরব। ‌ আমরা সবাই জানি, ফুল ছাড়া ফল সম্ভব নয়। আদিবাসীদের জীবন জীবিকা ছিল জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল। জঙ্গল ছিল তাদের কাছে মায়ের সমান। তাঁরা অন্যান্য প্রাণীর কথা ভাবতেন যেমন পাখি ,কীটপতঙ্গ ,বিভিন্ন প্রাণী। তারা যাতে সবাই ভালোভাবে প্রকৃতিতে বেঁচে থাকতে পারে তার জন্যই এই বাহা পরব বা পূজা। এই বাহা পরব হয় মূলত ফাল্গুন মাসে। সাঁওতালরা বিশ্বাস করে যে এই সময়টিতে গাছগুলি প্রজননশীল থাকে এবং তাদের কুড়ি ফুল পাতা এবং ডাল উপড়ে বা কেটে তাদের শরীর ও আত্মাকে বিরক্ত করা উচিত নয়। তাই সাঁওতালরা বাহা পরব উদযাপনের আগে কখনো নিম, পিপল গাছের পাতা ছেঁড়েন না। মহিলারা এই সময় তাঁদের চুলে শাল ফুল সাজসজ্জার জন্য ব্যবহার করেন না।

সাঁওতালদের এই বাহা পরব বা উৎসব দুই দিন ধরে পালিত হয়। 

প্রথম দিন: জাহের থানে ছোট্ট একটা ছিটে বেড়ার মত ঘর বানানো হয় এবং তাতে খড় বা বেনার গাছ দিয়ে ছাউনি করতে হয়। তারপরে বেদীটিকে গোবর দিয়ে লেপা বা পরিষ্কার করা হয়। উৎসবের প্রধান উদযাপনকারী নয়কে বা গ্রামের পুরোহিত প্রথম দিনে স্নান করে নতুন পোশাক পরে এবং উপবাস করে নিজেকে শারীরিক বা মানসিকভাবে প্রস্তুত করে ,তিনি সেই রাতে বাড়িতে একা ঘুমান তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে ।সাঁওতালদের প্রধান পূজা গ্রামের বাইরে জাহের থানে অনুষ্ঠিত হয়।

দ্বিতীয় দিন: 

দ্বিতীয় দিনের সকালে প্রধান ব্যক্তি গ্রামের যুবকদের শাল ফুল সংগ্রহের জন্য বনে পাঠান। তারপর নাইকে (পুরোহিত),গ্রামের প্রবীনদের সাথে মাঝি হাড়াম (গ্রামের প্রধান ), যোগ মাঝি (সহকারী প্রধান), কুডাম নাইকে ( সহকারী পুরোহিত), এবং গডেত (আহ্বান নায়ক) সবাই মিলে গ্রামবাসীদের সঙ্গে জাহের থানে যান। গ্রাম থেকে সংগৃহীত ১৬ টি মোরগ ছানা নিয়ে তারপর গ্রাম এবং তার আশেপাশের আত্মার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। নৈবেদ্য প্রদানের সময় জল দিয়ে নাইকে আত্মাদের পূর্বপুরুষদের কাছে প্রার্থনা করেন, যাঁরা মৃত্যুর পর আমাদের দানশীল আত্মাদের সাথে যোগ দিয়েছেন। নাইকে সমস্ত গ্রামবাসীদের জন্য শিশু যুবক প্রতিদিন যাঁরা মাঠে, বনে এবং নদীতে যান, সমস্ত প্রাণীর জন্য প্রার্থনা করেন যাতে তাদের জীবন নিরাপদ থাকে এবং দানশীল আত্মারা তাঁদের সমস্ত মন্দ আত্মাদের রক্ষা করতে পারেন। পরে নাইকে এবং গ্রামবাসীরা খিচুড়ি তৈরি করে এবং খায়।

বিকালে নাইকে তার সঙ্গীদের সাথে নিয়ে সমস্ত পরিবারের সাথে দেখা করে এবং শালফুল বিতরণ করে। বাড়ির মহিলারা পুরোহিতের পা ধুয়ে দেন। পুরোহিতের কাছ থেকে শাল ফুলটি গ্রহণ করেন। একজন অবিবাহিত যুবক তাঁর কাঁধে জল বহন করেন এবং তার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর মহিলার কাঁধে জল ছিটিয়ে দেন। ফুলটি সংগ্রহের পর মহিলারা তাঁদের চুলে এবং পুরুষেরা তাঁদের কানের পিছনে গুঁজে রাখেন। বাকি ফুলগুলি খড়ের চালে বা টালির ছাদের সিলিং এ রাখা হয়। এটা প্রমাণ করে যে গ্রামে বাহা পরব উদযাপন হচ্ছে। পুরুষ এবং মহিলারা গান করেন এবং নাচ করে আনন্দ করতে পারেন।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x