বিকাশ সামন্ত।
১ লা অগ্রহায়ণ *বরানগর * কলকাতা -৩৬
আজ ১ লা অগ্রহায়ণ। গতকাল ছিল কার্তিকী সংক্রান্তি। অর্থাৎ কার্তিক মাসের শেষ দিন। এই দিনে দম্পতির সন্তান কামনার আশায় যেমন কার্তিক পুজো করা হয়, ঠিক তেমনি কৃষি ভিত্তিক গৃহস্থের আর্থিক শ্রী বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘মুঠ’ পুজো করা হয়। তাই এই সংক্রান্তি ” মুঠ ” সংক্রান্তি নামেও পরিচিত।
মুঠ পুজো মূলতঃ কৃষক পরিবারের এক বিশেষ রীতি এবং উৎসব। এক সময় আমি নিজেও মুঠ এনেছি। এখন জন্মভূমি থেকে বহু বহু দূরে, চাষবাস ও বন্ধ। তাই সে সব অতীত। স্মৃতির পাতা থেকে সেই অতীতের কিছু খন্ডচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
মুঠ শব্দটি এসেছে হাতের মুঠি থেকে। অর্থাৎ এক মুঠিতে যে পরিমাণ ধান গাছ ধরবে, তাকেই এক মুঠ ধরা হয়। এই মুঠ আনার মধ্য দিয়েই আমন ধানের শুভ গৃহ প্রবেশ ঘটে। সূচনা ঘটে আরো দুই কৃষি ভিত্তিক উৎসব নবান্ন এবং পৌষ আগলানোর তথা ” চাঁউড়ি বাঁউরি ” বাঁধার।
এই সব গ্রাম্য রীতির কোন বাঁধাধরা নির্দিষ্ট নিয়ম আছে বলে জানি না। এলাকা ভেদে কিছু ভিন্নতা থাকলেও থাকতে পারে। তবে আমাদের বাড়িতে যে রীতি মানা হতো বা যে রীতি মেনে আমি বা আমার দাদা, বাবা মুঠ এনেছেন, সেটাই এখানে উল্লেখ করছি।
কার্তিকী সংক্রান্তি তথা মুঠ সংক্রান্তির দিন সকালে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র তথা সুতির ধুতি বা গরদের ধুতি পরে খালি পায়ে মাঠে যেতাম মুঠ আনতে। সাথে করে নিয়ে যেতাম একটি পান, একটি সুপারি, একটি অক্ষ্যত্র (৭ বা ৯ টি দুর্বা ঘাসের শীষ ফেলে গোঁড়ায় কাপাস তুলো জড়িয়ে ) , একটি কলা, একটি মন্ডা বা বাতাসা, ছোট ঘটিতে এক ঘটি গঙ্গা জল, একটি শাঁখ, একটি এক মিটার মতো লাল কাপড়ের টুকরো বা অন্য কোন শুদ্ধ বস্ত্র এবং ধান কাটার জন্য একটি কাস্তে।
তারপর যে জমিতে লঘু বা লক্ষীশাল ধান লাগানো আছে, সেই জমির ঈশাণ কোনে ( উত্তর – পূর্ব কোন ) ধান গাছের গোড়ায় নিয়ে যাওয়া বস্তু সামগ্রী তথা পান, সুপারী, অক্ষ্যত্র, করা, মিষ্টি ও গঙ্গা জল দিয়ে শাঁখ বাজিয়ে শ্রদ্ধার সাথে মা লক্ষ্মীকে স্মরণ করে প্রনাম করতে হয়। তারপর হাত জোড় করে বলতে হয়, ” হে মা লক্ষ্মী তুমি আমায় দয়া করো। দয়া করে আমার ঘরে চলো। সেখানে অবস্থান করো “।
তারপর ঐ ঈশান কোন থেকে এক মুঠিতে যতটা পরিমাণ ধান গাছ ধরে, সেই পরিমাণ ধান গাছ ধরে নিয়ে যাওয়া কাস্তের সাহায্যে এক টানে কেটে পাশে নামিয়ে রেখে, দ্বিতীয়বারে একই পরিমাণ ধান গাছ একইভাবে সংগ্রহ করতে হয়।
তৃতীয় বারে অর্ধ মুষ্ঠি ধান গাছ কাস্তের অর্ধেক টানে কেটে সংগ্রহ করতে হয়। এরপর এই ধান গাছ গুলি একত্রে বেঁধে সাথে করে নিয়ে যাওয়া লাল বস্ত্র বা অন্য শুদ্ধ বস্ত্র জড়িয়ে মাথায় চাপিয়ে শাঁখ বাজাতে বাজাতে আনতে হয়। পথিমধ্যে কারো সাথে কোন বাক্যালাপ করা যায় না। পথিমধ্যে ভিড় থাকলে শাঁখ বাজিয়ে সংকেত দিতে হয়, যাওয়ার রাস্তা দেওয়ার জন্য।
অন্যদিকে বাড়ির মেয়েরা কেউ প্রস্তুত থাকেন ঐ মুঠ লক্ষীকে ঘরে বরন করে ঢোকানোর জন্য। যিনি মুঠ আনছেন, তিনি যদি বরনকারীর থেকে বয়সে বড় হন তাহলে বাড়িতে ঢোকার আগেই এক ঘটি জল দিয়ে পা ধুইয়ে দেন। অন্যথায় পা ধুইয়ে দেওয়ার রীতি হয় না। এরপর জলধারা এবং উলুধ্বনি দিয়ে বরন করে ঘরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট জায়গায় স্থাপন করা হয়। ঠাকুর মশাই ফল মিষ্টি সহযোগে নিয়ম মেনে সকালে এবং সন্ধ্যায় পূজা করেন। তার পরদিন ঐ ধান গাছ থেকে ধান আলাদা করে রাখা হয়, যা পৌষ সংক্রান্তির সময় লক্ষী পাততে ব্যবহার করা হয়। খড় গুলি সংরক্ষণ করে রাখা হয় পৌষ সংক্রান্তির রাতে চাঁউড়ি বাঁউরি বাঁধার জন্য।
এক্ষেত্রে আরো একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। মুঠ সংক্রান্তির পরদিন ধান কাটা শুরু করতে নেই। কিন্তু অনেক সময় নবান্নের জন্য সময়ের অভাব দেখা দেয়। সেক্ষেত্রে মুঠের ধানগাছ কেটে নেওয়ার পরপরই ঐ কাস্তে অন্য কারো হাতে তুলে দেওয়া হয়। তিনি সাথে সাথেই ধান কাটতে শুরু করেন। তাতে মুঠের পরদিন ধান না কাটার বাধা আর থাকে না। অনেকটা ব্রহ্ম মূহুর্তে পূজা শুরু করার মতো। যে ঘটনা ঘটেছিল ২০২৪ সালের শারদীয়া মহাসপ্তমীর দিন।
হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, সূর্যদয়ের পূর্বে কোন পুজো শুরু করা যায় না। সূর্যোদয়ের পূর্ব মুহুর্তের নাম রুদ্র মূহুর্ত। রুদ্র মূহুর্তে কোন শুভ কাজ শুরু করতে নেই। কিন্তু রুদ্র মুহুর্তের আগে ব্রহ্ম মূহুর্ত যে কোন শুভ কাজের জন্য প্রশস্ত। তাই ব্রহ্ম মূহুর্তে যে কোন শুভ কাজ শুরু করে রুদ্র মূহুর্তে চালিয়ে যাওয়া যায়। দুই দন্ডে এক মুহুর্ত। এক দন্ডের মেয়াদকাল ২৪ মিনিট। গত ২০২৪ সালে শারদীয়া মহাসপ্তমীর দিন এই সুযোগটা নেওয়া হয়েছিল।
কালের গতিতে জীবন জীবিকার পরিবর্তন ঘটছে। পরিবর্তন আসছে মানসিকতার। এইসব গ্রাম্য প্রাচীন রীতিনীতি আর কতদিন বজায় থাকবে, না বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যাবে, তাই সদুত্তর দেবে একমাত্র ভবিষ্যত।
খুবই দরকারি লেখা! অপেক্ষাকৃত স্বল্প চর্চিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ এথনগ্রাফিক তথ্য