কাকলি সেন
আজ ২২ শে শ্রাবণ। সকালে উঠে স্নান সেরে Rehearsal এর ঘরে রাখা রবিঠাকুরের ছবিতে একটি মালা পরিয়ে হাত জোর করে প্রণাম করে সুকান্ত। রথী বোধহয় এখনো ঘুমোচ্ছে। কাল অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশুনো করেছে। আজ হয়তো স্কুলে যাবে না। আসলে আজকের দিনটা বাবা-ছেলে একসাথে একান্তে- কাটাবে তারা। আজকের দিনেই তো তিনবছর আগে মালবিকা তাদের ছেড়ে অজানার দেশে পাড়ি দিয়েছিল।
আস্তে আস্তে মালবিকার ছবিটাতেও একটা রজনীগন্ধার মালা পরিয়ে দেয় সুকান্ত। মনে পড়ে যায় সেই শুভদৃষ্টি, মালা বদলের মুহূর্তগুলো।
সুকান্ত তখন বিশ্বভারতীর সঙ্গীতভবনের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। প্রথম দেখেছিল মালবিকাকে চিত্রাঙ্গদায় সুরূপার ভূমিকায়। প্রথম দর্শনেই প্রেম। তারপরের দিনগুলি যেন ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায়…’ পরবর্তীকালে সুকান্ত রবীন্দ্রভারতীতে lecturer হয়ে join করল আর মালবিকাও Birla স্কুলের নাচের শিক্ষিকা। দুই বাড়ি থেকে কোন আপত্তির প্রশ্নই ওঠে না। ধুমধাম করে চার হাত এক হল।
কিন্তু রথী তখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। মারণরোগে ধরল মালবিকাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুকান্ত। দুজনে মিলে সাজিয়ে ছিল সোনার সংসার। সল্টলেকের লাবনীতে সুন্দর ছোট্ট বাড়ি। সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে বাগান। প্রতি বছর সরস্বতী পুজোর দিন সকাল থেকেই চলত ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা। মালবিকার কড়া নির্দেশ ছিল সব্বাইকে হলুদ পোশাক পরতে হবে। দুই বাড়ির মা হলুদ শাড়ি পরে কোমর বেঁধে লেগে যেতেন খিচুরি রান্নায়। আজকের দিনটাও তারা ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে কবিকে স্মরণ করতেন। পাড়ির ছাদে হই হই আড্ডা, গরম গরম বেগুনি, কলকাকলিতে ভরে উঠত সারা বাড়িটা। মালবিকা চলে যাওয়ার পর আর কিছুই ভালো লাগে না। বিরাট এক শূন্যতা যেন গোটা বাড়িটাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।
দুই বাড়ির মা পালা করে এসে থাকেন। রথীকে সে বড় করতে হবে। দুজনে মিলে অনেক স্বপ্ন দেখেছিল তাদের রথীকে নিয়ে। ছেলেটাও ঠিক মার মতো। মুখ ফুটে কিচ্ছুটি চাইবে না। সুকান্ত দেখেছে এখনো সে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে।
সুকান্তর মাও একজন সঙ্গীত শিল্পী। তার হাতে খড়ি মায়ের কাছেই। সেবার যখন বাংলাদেশে চিত্রাঙ্গদার Call show পেল মালবিকা, নিজে পছন্দ করে দুই মায়ের জন্য নিয়ে এসেছিল বাংলাদেশি ঢাকাই। সুকান্তর মার সেকি আনন্দ। আশীর্বাদ করেছিলেন- ‘দীর্ঘজীবি হও’।
মৃত্যু শয্যায় এই মায়ের কাছেই মেয়ে যখন আবদার করেছিল ‘মা, একবার যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন… গাও না”। হ্যাঁ মেয়ের আবদার মা পূরণ করেছিলেন। কিন্তু সুকান্ত দেখেছে তারপর দীর্ঘক্ষণ তাঁর মা ঠাকুরঘরে বসে কেঁদেছেন।
‘স্যার’- সম্বিৎ ফিরে পায় এক মহিলা কন্ঠের ডাকে। “কে কে…?” আমি শ্যামা স্যার। কেমন আছেন? কে বলতো…। সুকান্ত মনে করতে পারে না। সেই যে ম্যাডামের কাছে নাচ শিখতাম। হ্যাঁ, হ্যা মনে পড়েছে। বোসো বোসো- সুকান্ত চেয়ারটা এগিয়ে দেয়। কেমন আছেন স্যার? একটাই উত্তর ‘আছি’। আজকের দিনটাতে কত অনুষ্ঠান হতো… মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সুকান্ত উত্তর দেয় ‘মালবিকা চলে যাবার পর আর কিছুই ভালো লাগে না। কিন্তু তুমি তো আমেরিকায় চলে গেছিলে না? হ্যাঁ, স্যার আমার Husband এর একটা project এর জন্য এখন চারমাস এখানেই থাকব। দুঃসংবাদটা আগেই পেয়েছিলাম। একটা কথা বলব স্যার। হ্যাঁ হ্যাঁ, সুকান্ত বলে ওঠে। আমি বেশ কিছুক্ষন আগেই এসেছি। আপনি দিদির ছবিটার দিকে একদৃষ্টে দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন। জানেন আমার রবিঠাকুরের সেই গানটার কথা মনে পড়ে গেল “তুমি কি কেবলই ছবি…” স্যার গানটার শেষ লাইনটা? যখন কবি লিখছেন ‘নও ছবি, নও ছবি, নও শুধু ছবি’। আসুন না স্যার, আমরা সবাই মিলে আবার দিদিকে আমাদের মধ্যে ফিরিয়ে আনি। সেটাই হবে রথীর পথের পাথেয়। “কিন্তু” আমতা আমতা করে সুকান্ত।
চোখের দুটি কোণ চিকচিক করছে। কোনো কিন্তু নয় স্যার। ওরা সব্বাই বাইরে অপেক্ষা করছে।