Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

বাংলা নববর্ষ ও পান্তা- ইলিশ ফ্যাশন নিয়ে দুটি কথা 

হাবিব আহমেদ দত্ত চৌধুরী 

হে নুতন , এসো তুমি সম্পূর্ণ গগণ পূর্ণ করি 

পুঞ্জ পুঞ্জ রূপে ‘l….

          -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

দিন ,রাত,  মাস, বছর গড়িয়ে বাঙালির দরজায় কড়া নাড়ে বৈশাখ l বাংলা সনের প্রথম দিন l এসো হে বৈশাখ এসো এসো ‘ চির নূতনের ডাক দিয়ে পহেলা বৈশাখের ভোরে জেগে উঠে নগর-গ্রাম-মফস্বলl উদ্দীপনা, উচ্ছাস , আবেগ আর উল্লাসে সব বয়সের মানুষ বাংলা নববর্ষ বরণে জেগে উঠে প্রাণের আনন্দে lপুরাতন বছরের জীর্ন ক্লান্ত রাত্রির ‘ অন্তিম প্রহর সমাপ্ত হয় lতিমির রাত্রি ভেদ করে পূর্বদিকে উদিত হয় নুতন দিনের বার্তাবাহী জোতির্ময় সূর্যl প্রকৃতির নিসর্গ মঞ্চে ধ্বনিত হয় নব জীবনের সংগীত. পত্রে পত্রে তার পুলক শিহরণl গাছে গাছে তার আনন্দ- উচ্ছাস lপাখির কণ্ঠে নব প্রভাতের বন্দনা-গীতি -দিকে দিকে মানুষের বর্ষ বরণের উৎসব আয়োজন আর গুঞ্জরণ l নুতন দিনের কাছে আমাদের অফুরন্ত প্রত্যাশা, আর প্রার্থনা দুঃখ জয়ের l

নব বর্ষের মূল উৎস কিন্তু পল্লী বাংলা lশ্বাশত বাঙালির গ্রামীণ জীবনের শাশ্বত নৈমিত্তিক আচার-অনুষ্ঠানই পহেলা পহেলা বৈশাখ তথা নববর্ষের মূল ভিত্তি, যার মাধ্যমে নগরজীবনকে গ্রামীণ গ্রামীণ জীবন জানায় উদাত্ত আমন্ত্রণ l মোদ্দা কথা – নববর্ষের উৎসব গ্রামীণ জীবনের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িতl ফলে পল্লী বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ l নববর্ষে পল্লী অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে চিরায়ত নিয়মে বেশ বর্ণাঢ্য মেলা বসে l আর এসব মেলাই আমাদের বাঙালি সংষ্কৃতিতে ‘ বৈশাখী মেলা ‘ নামে বিশেষ পরিচিত l মেলার বিচিত্র আনন্দ-অনুষ্ঠানে , কেনা-বেচার বাণিজ্যিক লেনদেনে, মিলনে অমলিন খুশিতে অবারিত অন্তর প্রীতি স্পর্শে নববর্ষের বিশেষ দিনটি মুখর হয়ে ওঠেl এই পুন্যদিনেই শুরু হয় ব্যবসায়ীদের হালখাতার শুভ মহরতl প্রায় প্রতিটি বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে ক্রেতাদের মিষ্টান্ন আপ্যায়ন করা হয়l সর্বত্রই এক মধুর প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ l গৃহস্থরা তাদের বৌ-ঝিদের নিয়ে দিনটিকে স্মরণীয় করায় মেতে ওঠে i পল্লীর কোথাও কোথাও রচিত হয় নববর্ষ উদযাপনের উৎসব মঞ্চ l সেখানে অনুষ্ঠিত হয় নানা সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান l তাছাড়া নববর্ষ কে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা যা আমাদের সার্বজনীন শাশ্বত লোকজ মেলা l এ মেলা আনন্দঘন পরিবেশে হয়ে থাকে l 

স্থানীয় কৃষিজাত পণ্য , কারুপণ্য , লোকশিল্পজাত পণ্য , কুটির শিল্পজাত সামগ্রী , সকল প্রকার মৃৎ ও হস্তশিল্পজাত পণ্য এই মেলায় পাওয়া যায়l এছাড়া শিশু কিশোরদের খেলনা, গ্রামীণ মহিলা ও বালিকাদের সাজসজ্জার সামগ্রী বিভিন্ন উপাদেয় লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন চিড়া, মুড়ি, খই, বাতাসা ইত্যাদি সহ প্রকার মিষ্টির বৈচিত্রময় সমারোহ থাকে এ মেলায় l উৎসব মঞ্চে গ্রামীণ শান্তিপ্রিয় মানুষের যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গভম্ভীরা গান ও গাজীর গান সহ বিভিন্ন ধরণের লোক সংগীত, বাউল, মারফতি, মুর্শিদী, ভাটিয়ালি ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন লাইলী-মজনু, শিরি- রহাদ, ইউসুফ-জুলেখা,, চণ্ডীদাস-রজকিনী, রাধা-কৃষ্ণ প্রভৃতি আখ্যানও উপস্থাপিত হয় এসব গ্রামীণ মঞ্চেl গ্রামীণ খেলাধুলা, নাটক , লোকনৃত্য , পুতুল নাচ , সার্কাস ও নাগরদোলা এই মেলার আরেক বিশেষ আকর্ষণ l এছাড়া শিশু কিশোরদের আকর্ষণের জন্য থাকে বায়োস্কোপ l এই মেলা বাঙালিদের জন্য এক অনাবিল আনন্দের মিলনমেলায় পরিণত হয় l

বৈশাখী মেলা বাঙালির লোকায়ত সংষ্কৃতির ধারক l পহেলা বৈশাখ হলো বাঙালির প্রাণের অকৃত্রিম স্পন্দন l তবে হাল আমলে সেকালের মানুষের মতো মানুষের মনে নৈতমিত্তিক সুখ নেই lঅভাব অনটন , জরা ক্লান্তি , রোগ শোক , বিরূপ প্রকৃতি মানুষের মনের আনন্দ অনেকটা ছিনিয়ে নিয়েছে l মানুষের মনে নেই আগের মতো প্রাণ প্রাচুর্য lনানামুখী প্রতিকূলতা মানুষকে শহরমুখী করে তুলেছে , বিত্ত বৈভবের নেশায় মানুষ বিদেশগামী হতে নিয়ত ব্যস্ত l তাই নবর্ষের গ্রামীণ ঐতিহ্যের আজ অনেকটাই ম্রিয়মান l

অপরদিকে , বর্তমানে নগর সংষ্কৃতির আদলে অত্যন্ত উগ্র জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে নববর্ষ উদযাপিত হয় lপহেলা বৈশাখের প্রভাতে উদীয়মান সূর্য কে স্বাগত জানানোর মধ্যে দিয়ে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব lএসব কৃত্রিমতা দেখে মনে – হয় এ যেন এক ধর্মীয়  আরাধনা l কেউ সময় নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে উদ্যানের কোন বৃক্ষমূলে বা লেকের ধরে অতি প্রত্যুষে নগরবাসীর সমবেত হয় l নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শহরের আধুনিক সংগীত শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন lএদিন বিত্তবানদের মধ্যেই দেখাযায় নববর্ষ উদযাপনের ঘনঘটা l শহরে সকল শ্রেণীপেশার এবং সকল বয়সের মানুষ ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোষাক পরিধানের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে I নববর্ষকে স্বাগত জানাতে অট্টালিকার ললনারা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি , খোঁপায় ফুল, গলায় মাথায় ফুলের মালা ( একদিনের জন্য হলেও স্বর্ণালঙ্কার বাদ দিয়ে) এবং কপালে টিপ পরে; আর ধনীর দুলালরা ফ্যাশনেবল পাজামা ও পরেl শৌখিন পুঁজিপতিদের কেউ কেউ ধুতি-পাঞ্জাবিও পরে l এদিকে সকালবেলা পানি-মরিচ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া শহরের শৌখিন সমাজে সেদিনের জন্য এক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে,  আর সাথে থাকে ইলিশভাজা l আহারে বাঙালিয়ানায় একদিনেই উপচে পড়ে আমাদের সংষ্কৃতি প্রেম l

অথচ এসবই ছিল আমাদের শাশ্বত বাঙালির নৈমিত্তিক জীবনের এক কালের আচার-ব্যবহারিক অনুষঙ্গ, তা কেউ একবারও ভেবে দেখেন না l গ্রামের সেই কৃষকটি প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে গরু আর লাঙ্গল জোয়াল নিয়ে মাঠে যাওয়ার প্রস্তুতি নিত l অভাবের সংসার, তাই বউটি রাতের পানিতে ভেজানো বাসি ভাত আর সস্তায় কেনা ইলিশের একটি টুকরো ভেজে দিয়ে স্বামীকে খাইয়ে তাড়াতাড়ি মাঠে পাঠাতে প্রাণন্ত কর খাটুনি খাটতো l আজকাল অকালে যুগ l  তা দুঃখজনক ভাবে দৃঢ় কৃষকের একালের সহজলভ্য ইলিশটি শহরের বিত্তবানদের কৃত্রিম পান্তা-ইলিশ সংষ্কৃতির কবলে পড়ে মাছের রাজা খেতাবে ভূষিত হয়ে ধনত্রন্ত্রী বুর্জোয়াদের গৃহে ফ্রিজ-বন্দী হয়ে বিশ্বজয়ের নেশায় বিভোর l তাই বাজারে লেগে থাকে কৃত্রিম সংকট l আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই সেই কৃষকের পাতে দুই বেলা শাক ভাতই জুটছে না l কর্ষিণী বধূটি হয়তো ছেঁড়া শাড়ীটিতে জোড়া-তালি দিতে দিতে হয়রান l গ্রামের যে কৃষক কন্যাটি লালপেড়ে শাড়ি পরে গলায় শাপলার মালা ঝুলিয়ে খোঁপায় তারার ফুল গুঁজে পায়ে আলতা লাগিয়ে এ বাড়ি ও বাড়ি ছুটে চলত চঞ্চলা হরিণীর মতো, আজ হয়তো সেই তরুণীটি লজ্জা ঢাকতে এতটুকু কাপড়ের জন্য আহাজারি করছে l অথচ যান্ত্রিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত আজকালকার বিত্তশালীদের শহুরে কৃত্রিম বর্ণিল নববর্ষের আনন্দমেলায় , পান্তা ইলিশের উৎসবে আমাদের শাশ্বত বাঙালির সংষ্কৃতির জনক ও ধারক কৃষক ভাইটির কথা, কৃষ্ণণী বধূটির কথা, সেই চপলা কৃষক-কন্যার কথা কেউ কি ভাবে? না ! সবাই যান্ত্রিকi তাই নববর্ষে কথিত পান্তা-ইলিশ ভোজ-সংষ্কৃতি  আজ ধনতন্ত্রী  বুর্জোয়া সমাজে এমন এক ফ্যাশনে দাঁড়িয়েছে যা এককালের  বাজারের সহজলভ্য ইলিশের কৃত্রিম সংকট ঘটিয়ে গ্রামের সেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেই কটাক্ষ করছে l কই ? যারা পান্তা ইলিশ ভোজনের জন্মদাতা, গ্রামের সেই কৃষক সমাজে তো নববর্ষে দেখা যায় না পান্তা ইলিশে ভোজনের কৃত্রিম আনুষ্ঠানিকতা । তাহলে নিশ্চয় এটা আমাদের শাস্বত সংষ্কৃতির অঙ্গ নয়। 

যাই হোক, আজকের শহরের বিত্তবানদের কাছে আমার একটাই আকুতি । আপনারা শহরে একদিনের জন্য বসে যে শৌখিনতার গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে আনন্দমুখর হয়ে উঠেন, তার জন্মদাতা কিন্ত গ্রামীণ ঐ দরিদ্র কৃষক-শ্রমিক জনগোষ্ঠী। নববর্ষের দিনে তাঁদের কথা ভেবে তাঁদের জন্য যদি নূন্যতম একটা কিছু করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, তবে আপনাদের নববর্ষ যে শুভ ও সার্থক হয়ে উঠবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই । তাই আসুন, নববর্ষের এই শুভক্ষণে পহেলা বৈশাখের অরুণোদয়ের সাথে কবি সুকান্তের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে উঠিঃ 

‘যতক্ষণ এ দেহে আছে প্রাণ 

প্রানপনে এই পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল 

এ বিশ্বকে এই শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি 

নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ 

পাদটীকা – লেখক : মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান 

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x