শিলাজিৎ
মতুয়া সম্প্রদায়ের ইতিহাসে একটি অদ্ভুত নীরব স্রোত বহুদিন অগোচরে বয়ে চলেছে — এ স্রোত কোনো একমাত্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধী দীক্ষার ইতিহাস নয়, বরং বহু-ধর্মীয় সহবস্থানের সূক্ষ্ম আত্মিক বিন্যাস। হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের জীবন ও শিক্ষার পশ্চাতে যে এক আন্তঃসাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের নীরব আলোকরেখা জ্বলে রয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে বাঙালি মুসলমান সমাজের সহমর্মিতা, শরণদাতার ভূমিকা এবং অনুশীলিত মানবতাবোধ — যা মূলধারার ইতিহাসচর্চা প্রায় সর্বাংশে উপেক্ষা করেছে।
চণ্ডীদাসের ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ উচ্চারণ যেমন মধ্যযুগীয় বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উন্মেষের শিকড় গেঁথে দিয়েছিল, তেমনই হরিচাঁদ ঠাকুরের মানবধর্মের সঙ্কেত গ্রামবাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলিত-নীচুজাত সম্প্রদায়কে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছিল — যেখানে ঈশ্বরের সঙ্গে জুড়ে ছিল প্রতিবেশী, আচারবহির্ভূত দৈনন্দিন মানুষ। এবং এই দৈনন্দিন মানুষদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন মুসলমান কৃষিজীবী, তাঁতি, কামার, কুমোর, মাঝি-মল্লাহ ইত্যাদি।
হরিচাঁদের নিকটবর্তী অঞ্চলে, বিশেষত ফরিদপুর–গোপালগঞ্জের গ্রামীণ সমাজে, মতুয়া আন্দোলনের বিকাশ মুসলমান পল্লির উপস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না; বরং এই সংস্পর্শ আন্দোলনকে যে মানবিক বাস্তবতার ভিত দিয়েছিল তা আজ বহু গবেষণাতেই অপ্রচলিত। কৃষিকাজে পারস্পরিক সহায়তা, মৌসুমি বন্যার সময় একে অপরের প্রতি নির্ভরতা, গ্রামীণ আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি অবস্থান — এই সবকিছুই মতুয়া ধর্মযুক্ত ভাবনাকে এক ধরনের অ-বিচ্ছিন্ন, বহুস্বরিক চরিত্র দিয়েছে।
হরিচাঁদ ঠাকুর যখন নির্যাতিত দলিত-অবহেলিতদের জন্য মুক্তির নৈতিক পথরেখা আঁকলেন, তখন তাঁর মৌল বাণীতে মুসলিম সমাজের শ্রমজীবী মানুষের প্রতি একটি অদ্ভুত সহমর্মিতা লক্ষ্য করা যায়। প্রচলিত জাতপাত-অন্তরায় ভেঙে ফেলতে তিনি যে একেশ্বরবাদী, সাম্যকেন্দ্রিক, আচারবিরোধী চিন্তা নির্মাণ করেন, তা মুসলমান সম্প্রদায়ের বহু মানুষের কাছে সহজে গ্রাহ্য হয়ে ওঠে। কারণ ইসলামি সংস্কৃতির মধ্যেও একটি স্বতঃসিদ্ধ সাম্যধর্মী মূল্যবোধ বিরাজমান ছিল। ফলে স্থানীয় মুসলমানদের একাংশ মতুয়া উৎসবে এসে সহযোগিতা করতেন — মঞ্চ বাঁধা থেকে শুরু করে সমবেত ভোজনের খাদ্যসামগ্রীর জোগান পর্যন্ত। এগুলো ইতিহাস-বৃত্তে উল্লিখিত হয় না, কিন্তু গ্রামীণ ভাষ্যে এখনো লোকস্মৃতির মতো বাঁচে। এমনকি অনেক অঞ্চলে গোষ্ঠীভুক্ত মুসলমান বাদ্যকাররা বার্ষিক হরিবোল ও কীর্তনে ঢোল-করতাল বাজিয়ে অংশ নিতেন। তাঁরা এটিকে ধর্মীয় আচার ভেবে নয়, বরং পাশের বাড়ির মানুষের উৎসব হিসেবে গ্রহণ করতেন — এক ধরনের কলকব্জাবিহীন মানবিক সহমিলন। মতুয়া ধর্মের ‘অভিষেক’, ‘মহামেলা’, কিংবা ‘বার্ষিক উৎসব’-এর ভিড়ে মুসলমান পল্লীর অংশগ্রহণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং গ্রামীণ সমাজের অভিন্ন সাংস্কৃতিক বুননে এই সখ্য একধরনের সহাবস্থানের নিজস্ব স্বর তৈরি করেছিল।
মতুয়া সম্প্রদায়ের ভিতর দিয়ে মুসলিম প্রভাব যেভাবে প্রবাহিত হয়েছে, তা ধর্মতত্ত্বীয় স্তরে নয় — প্রাত্যহিক সহাবস্থানের স্তরে। মুসলিম কৃষকের ধান সিঁচে দেওয়া জল যেমন মতুয়া পরিবারের ঘরোয়া দেবতার অর্ঘ্য হয়ে উঠেছে, তেমনি মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোজনভাত নিয়ে পাশের মুসলমান পরিবারে উৎসবের দিন দাওয়াত পৌঁছে গেছে। কাটতির মৌসুমে মুসলমানের গোলার ধান মতুয়ার বাড়ির চালের অভাব মিটিয়েছে; আবার মতুয়ার ঘরের দাওয়ায় শুকনো ছাগলমাংস বা ইলিশ ভাজা গিয়ে পড়েছে মুসলমান ভাইয়ের প্লেটে। এই জীবন-সম্পর্কের ধারাই মতুয়া সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে এক সামাজিক-আত্মিক পরিচয় দিয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক বিরোধিতা থেকে দূরে এই উৎসব-সংস্কৃতি একটি উত্তরাধিকারমূলক মানবধর্ম নির্মাণ করেছে, যা একধরনের অঘোষিত, কিন্তু গভীরতর ‘ধর্মান্তর’। কারো ধর্ম পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু হৃদয়ের অভিভাবকত্বে পরিবর্তন এসেছে। হরিচাঁদের ‘সৎসঙ্গ — যা মূলত সমঅধিকারের আধ্যাত্মিক সম্প্রদায়—মুসলিম জনসাধারণের স্থানিক সহানুভূতি ছাড়া এত দ্রুত বিস্তার লাভ করত কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
আজকের দিনে মতুয়া মেলাকে অনেকে শুধুই রাজনৈতিক সমাবেশ বা পরিচয় রাজনীতির ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন, কিন্তু এই মেলার আদিম রূপ ছিল সম্পূর্ণভাবে ধর্মসীমা অতিক্রমী। শোনা যায়, গুরুচাঁদ ঠাকুরের বার্ষিক উৎসবে এক সময় মুসলমান গাইদল (বাউলশিল্পী) এসে গান শুনিয়েছেন — যেখানে একসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে ‘হরি’ আর ‘আল্লাহ’ শব্দ — দু’টিই ঈশ্বরের দুই দিকে ওঠা শ্বাসের মতো, আলাদা করা যায় না। এমনকি বহু মতুয়া গ্রামে দেখা যায়, শ্রীশ্রী হরিলীলা উৎসবের দিন মুসলমান বাড়ির নারীরা আলপনা এঁকে দিয়েছেন — কারণ তাঁরা কর্মসূত্রে মতুয়ার ঘরের সদস্যদের সঙ্গে অচ্ছেদ্য সম্পর্ক বহন করেন। অনেক মুসলমান পরিবারের তরুণেরা মতুয়ার মেলাকে নিজেদের এলাকার উৎসব হিসেবেই দেখেছেন, কারণ মাঠ সাজানো, আলোর মালা লাগানো, ঢোল বাজানো, শোভাযাত্রার গাড়ি টানা — এসব ছিল সকলে মিলে করার কাজ। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে এক ধরনের স্বদেশি সাম্প্রদায়িক সহযোগের চর্চা গড়ে ওঠে, যা আধুনিক ইতিহাসের দলিলে নেই।
কলোনিয়াল আমলে, বিশেষত ভূমিদস্যু জোতদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে মতুয়া কৃষিজীবী ও মুসলমান চাষিরা একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ঝাঁজালো নথিপত্র যতই তৈরি হোক, চাষির আঙুলে লেগে থাকা একই মাটির গন্ধ আলাদা করা যায়নি। মতুয়া আন্দোলনের এই সম্প্রদায়-অতিক্রমী চরিত্র আসলে বাংলার এক ধূলিধূসর নৈতিক ভুবনকেই পুনঃব্যাখ্যা করে — যেখানে ধর্ম পরিচয় নয়, বরং প্রতিবেশী-সম্পর্কই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। হরিচাঁদের উপাসনাপদ্ধতির সমন্বয়ধর্মী গঠন — যেখানে কীর্তনের তাল ছন্দে মিশে যায় গ্রামের মুসলমান বাদ্যশিল্পীর রিদম, যেখানে সৎসঙ্গের আড্ডায় সমান স্বরে উচ্চারিত হয় মানুষের দুঃখকথা, সেখানে ধর্মের বিভেদ গলে গিয়ে একটি উপমহাদেশীয় মানবধর্মের জন্ম নেয়।
অতএব, মতুয়া সম্প্রদায়ের ইতিহাস বলতে গেলে একটি গোপন সহাবস্থানের ইতিহাস। এখানে মুসলমান প্রভাব কোনো আধিপত্য নয়, বরং সমানতালে বয়ে চলা এক মানবিক ধারার অংশীদারিত্ব। এই অংশীদারিত্বই মতুয়া উৎসবকে কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা না রেখে, একধরনের সমাজচর্চা, প্রতিবেশী-রাজনীতি এবং দৈনন্দিন মানবধর্মের আচার-অনুষ্ঠান করে তুলেছে। আজকের মেরুকৃত সময়েও সেই পুরোনো মতুয়া উৎসব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় — বাংলার গ্রামজীবনে ধর্মের রেখা কখনোই সীমানা টানেনি; বরং মানুষের দোরগোড়ায় এসে মিশে গেছে। হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের শিক্ষা তাই শুধু মতুয়ার নয় — একটি বহু-ধর্মের সম্মিলিত বাংলার স্মৃতি-সঞ্চয়।
এই স্মৃতি যতদিন থাকবে, ততদিন মতুয়া সম্প্রদায় ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর অদৃশ্য কিন্তু অনিবার্য বন্ধন বাংলার সমাজজীবনে এক গোপন আলোর মতো জ্বলতে থাকবে—নিঃশব্দে, অথচ অনিবার্যভাবে।
* তথ্যসূত্র :-
১)রথীন বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ জীবনচরিত, দে’জ পাবলিশিং।
২)অভিজিৎ দাস, মতুয়া মহাসংঘ: ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব, ২০১৯।
৩)নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, দে’জ পাবলিশি
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মনোগ্রাহী লেখা