(কল্পবিজ্ঞান কাহিনি — প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য)
মহাযাত্রিক
দ্বিতীয় পর্ব
সূর্যাস্তের অতিরিক্ত মিনিট
ভেরোনার আকাশে আজ সূর্যাস্ত দেরিতে নামল। ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক রেজিস্ট্যান্স কোটার অতিরিক্ত মিনিটটা যেন আকাশের চামড়ায় আঙুল বোলানোর মতো লেগে রইল।
বারান্দার স্বচ্ছ রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে অমর-নখ্T দেখল — আলো-ছায়া যেখানে থেমে থাকার কথা, সেখানে একটুখানি স্থবিরতা জমে রয়েছে। Xআরিক্স নিজেকে ছোট করছে, সঙ্কুচিত করছে তার আশ্চর্য ক্ষমতায়। দূরের টিল্ট-ফ্রেমগুলো সরে গিয়ে বুদ্বুদের শরীর আরও আঁটসাঁট। ভেতরে পাম্পগুলো হালকা সুরে গুনগুন করছে—সাবমার্জ-প্রোফাইল সক্রিয় হওয়ার প্রস্তুতি।
L-জ্ব্ব হাওয়ায় পাঁচটা বাঁকা রেখা টেনে দেখাল—টাইম-কার্ভ।
‘ডিকেয়-কার্ভ আজ নড়ছে। কাউন্টার-ফ্লাক্স,’ সে বলল, ঠোঁটে হালকা আনন্দমিশ্রিত উৎকণ্ঠা।
টেরামায়া একটি চাপা নিঃশ্বাস ফেলল। ‘ইতিহাসে এমন সূর্যাস্তের নোট কম। ‘সময়কে কেনা’ গেল বটে, কিন্তু সে দাম শেষে সময়ই তুলে নেবে।’
রীট ধীরে বলল, ‘সি-স্যাট অডিট লাইট জ্বলে উঠেছে। আমরা সীমার ভেতরেই — কিন্তু নজরদারি সক্রিয়।’ এ কথা বলার জন্যে তাকে কোনো গোপনীয়তার সাহায্য নিতে হলোনা, কারণ এ কথা সবাই জানে নজরদারি সর্বত্র জারি।
অমর-নখ্T মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল— ভয় নেই। ভয় প্রোগ্রামের রুট-লেভেলে ঢুকে গেলে কম্যান্ড মরে যায়। কাজ করে না আর। ভয় না থাকলে অ্যাঙজাইটি নেই, এবং সুতরাং সেখানে নেগেটিভ ফ্রিকোয়েন্সি নেই।
মিশুল বাঁ হাতের স্কিন-গ্রাফটেড চিপে তিনটি কম-ফ্রিকোয়েন্সি ট্যাপ দিল—ভাইব্রেশন ল্যাঙ্গুয়েজে।
—ডীপ-প্রেশার প্যাটার্ন বদলাচ্ছে। সাউন্ডিংস বলছে দক্ষিণ-পশ্চিম, জিব্রালসার নীচে।
জেসমিঞ্চ অনুবাদ করল, গংগার বলল, ‘তাহলে ডিনার সাবমারিনে। ডাম্পলিংস ঠান্ডা হলে কিন্তু—’
‘ডীপ-ওয়াটার স্টিমে গরম থাকবে,’ জেসমিঞ্চ হেসে উত্তর দিল।
এইসব ছোট ছোট কথোপকথনের ভিতরেই Xআরিক্স আস্তে আস্তে নিজের নাভি-তলাটা নামিয়ে দিল। নগ্ন হলো সে। জলের গন্ধ এল কাচের ভিতরেও—শীতল, লবণাক্ত, পুরোনো ইতিহাসের মতো ভেসে আসা জল।
‘আমরা যাই,’ অমর-নখ্T বলল, ‘আজ রাতেই। সিগনালের উৎসটা এখনই ধরা না গেলে পরে হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে।’
পেনাম্ব্রা প্রোটোকল
দেয়ালের উপর নীরব সফ্টজেল-অক্ষরে ভেসে উঠল: PENUMBRA PROTOCOL: TWO MINUTES OVER.
টেরামায়া গম্ভীর হল। ‘পেনাম্ব্রা মানে ছায়ার চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা। নিয়ম এখানে ছায়া, আর আমরা আলো কিনে এনেও প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি।’
আলোক্স হতাশ স্বরে বলল, ‘পয়েন্ট ডাউন হলে…’
‘ডিস্-অ্যাসেম্বলি নিয়ে এখন ভাবিস না,’ অমর-নখ্T থামিয়ে দিল, ‘আমরা বিধি ভাঙছি না। আমরা শুধু অজানার দিকে যাচ্ছি। সি-স্যাটের মেটা-ক্লাইমেট অ্যালগরিদম বুঝবে—এক্সপ্লোরেশন সিকিউরিটি।’
L-জ্ব্ব বলল,’পেনাম্ব্রা প্রোটোকল কর্তৃপক্ষের সতর্কতা, কিন্তু সিগনালটা যদি প্রি-হিউম্যান মেমরি-বিম হয়, তাহলে ইতিহাস নিজেই আমাদের ডেকে নিচ্ছে। সময়কে আমরা যতটা লাইন ভাবি, সে ততটাই পলিমার—টেনে ধরলে লম্বা হয়, ছাড়লেই সঙ্কুচিত।’ কোয়ান্টাম মেকানিক্সের গোড়ার কথা।
রীট ফিসফিস করে গণনা করল, ‘আমরা নাইন। ডেলিভারি ড্রোন এলে টেন। থ্রেশহোল্ড ঠিক।’
গংগার ডিভাইস টিপে KKS-কে বার্তা পাঠাল ডিনার প্যাক সাবমার্জ-মোডে। জিরো-কার্বন-স্পাইস ঠিক রেখে সল্ট-অ্যাবসরবার কিছুটা বাড়াতে বলল; জলের মধ্যে ক্ষিদে বাড়ে, স্বাদও বদলে যায়।
‘তাহলে এখন প্ল্যান?’ জুলিম জিজ্ঞেস করল। তার চোখে রহস্যময় হাসি। সবাই জানে তার অর্থ। সে নীরব হাসিতে অংশ নিলো সবাই। এ এক অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ আজ রাতে।
অমর-নখ্T বলল, ‘Xআরিক্স প্রথমে লো-ডেপথ ক্রুজ। L-জ্ব্ব সিগনাল-ট্রায়াঙ্গুলেশন করবে। মিশুল—তুমি সাউন্ডিংস সিঙ্ক করবে। টেরামায়া—জিন-লোরে যা আছে, কোডেক্স-ভল্ট সম্পর্কিত, সব তুলে আনো।’
টেরামায়া চোখ নামিয়ে নরম গলায় বলল, ‘ইথিওপিয়ার জিব্রালসেলাসি যেটুকু রেখে গেছে, তাতে ‘কোডেক্স-ভল্ট’ পুরোনো মানুষের নখদর্পণের জায়গা ছিল —ভাষা, ইতিহাস, পাপ সব এক সঙ্গে। কিন্তু পুরোনো নাম দিয়ে আজকে চেনা যাবে কিনা বলা মুশকিল।’
‘নাম বদলায়, উৎস বদলায় না,’ L-জ্ব্ব ঠোঁটে হাসি টেনে বলল। ‘চল।’
Xআরিক্স: সাবমার্জ-প্রোফাইল
ঘরের বাতাস একটু ভারী, কাচের গায়ে নোনতা কুয়াশা। Xআরিক্স নাকি জীবিত নয়—তবু সাবমার্জ-প্রোফাইলে নামার সময় তার শরীর যে ভাবে শিরশির করে ওঠে, তাতে একটা নিঃশব্দ উত্তেজনা থাকে। আজ আবার সে অদ্ভুতভাবে নীল ও নগ্ন হয়েছে। কিছুটা বোঝা যায়, কিছুটা যায়না। ছায়া ছায়া তার শরীর এখন।
ডেকের নিচে পাম্প চালু। ভেতরের কক্ষে প্রেশার-ইকুয়ালাইজার। সবাই পাতলা স্যুটে ঢুকে পড়ল; হাতের কব্জিতে লাইট-স্কেল। ডাইনিং মডিউল বরফের মতো স্বচ্ছ—ভেতরের আলো কমিয়ে দেওয়া হল। মিলিত হওয়ার নরম এনভায়রনমেন্ট তৈরী হচ্ছে আস্তে আস্তে।
জলতলের প্রথম স্তর পার হতেই ভেরোনার আলো ছুটে গেল পিছনে; অন্ধকারে ক্ষীণ নীল সবুজ ফসফর—মাইক্রো-প্ল্যাঙ্কটনের ভাষা। গংগার মৃদুস্বরে বলল, ‘এরা কথা বলতে শিখলে কেমন হয়?’
টেরামায়া বলল, ‘শিখেছিল হয়তো কোনোদিন। আমাদের কানে পৌঁছোয়নি। ইতিহাসও তো এমন’ —তার চোখে সদ্য জ্বলা স্মৃতি—’জ্ঞান থাকলেও কণ্ঠস্বর পাওয়া যায় না।’
জেসমিঞ্চ কনসোলে ট্যাপ করল—ডিনার ক্যানিস্টার ওয়ার্ম-সাইকেলে।
L-জ্ব্ব হলো-ইন্টারফেস খুলল; বাতাসে তিনকোণা ম্যাট্রিক্স উঠল—সিগনাল তিরতির করে কাঁপছে।
‘ফ্রিকোয়েন্সির ভেতরে টাইম-সিগনেচার আছে,” সে বলল, “এটা শব্দ নয়, এটা স্মৃতি—কিন্তু ভবিষ্যত-কালে।’
অমর-নখ্T পাশ থেকে দেখছিল। এইসব টেকনিক্যাল বিষয়ে সে পারদর্শী—তবু আজ ওর মনটা অন্য কোথাও। কেমন যেন একটি মানবিক যৌন আবেগ, যেমন সেই আদিমকালে পুরুষ ও নারীর সেক্সুয়াল মিলনের কনসেপ্ট। যা এখন বহু অতীতের স্মৃতি। তাও যেন সে আবেগের ছোঁয়া ফিরে ফিরে আসে। মনের ভেতরে ক্লোন-আগমন—এ-এনT এক্স-টু—চুয়াল্লিশ ইউম পরে। এক নতুন সংস্করণ, হয়তো আরও মসৃণ, দ্রুত, কম ভুল করে।
‘আমার জায়গা কোথায়?’
প্রশ্নটা সে উচ্চারণ করল না, শুধু সার্কিটের কোথাও কেঁপে উঠল। স্বর্গীয় একটা শারীরিক অনুভূতি তৈরি হয়ে আছে বাতাসে। অপূর্ব সে আবেশ। সবাই মিলন প্রত্যাশী। এখানে সম্পর্কের, সময়ের, লিঙ্গের আর কোনো বাধানিষেধ নেই, বিভেদ নেই, দেওয়াল নেই। কোনো নিষেধ নেই আর।
‘শোনো,’ রীট বলল, ‘সি-স্যাট থেকে কোয়ায়েটারি নোটিশ: ‘আউটবাউন্ড রুট ফাইল করুন। মেটা-ক্লাইমেট শিল্ড অনুগ্রহ করে নো-ডিস্টার্বেন্স জোনের ভেতরে রাখুন।’
‘ফাইল করার কী দরকার,?’ অমর-নখ্T বলল, ‘আমরা তো কোনো নিয়ম ভাঙছি না। আমরা যা করছি, তা তো এখন আমাদের কেনা অতিরিক্ত সময়েই করছি। সি স্যাট জানে তো।’
প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তরঙ্গতা
রুট-ফাইলিং, প্রেশার-চেক, ফুড-সাইকেল—সব একসঙ্গে হচ্ছে। এইসব প্রযুক্তির ভিতরেও যে মানুষ-সুলভ নীরবতা থাকে, সেখানেই জেসমিঞ্চ হঠাৎ অমর-নখ্T’র হাতে হাত রাখল। কাচের ওপারে জল নেমে যাচ্ছে, ভিতরে উষ্ণতা একটু বাড়ল। জেসমিঞ্চ এখন নরম আকুয়া রঙের। তার চুল পার্পল, চঞ্চল, মদির।
‘শোন,’ জেসমিঞ্চ বলল, “তুমি যখন ‘আমরা যাই’ বললে—আমি জানতাম তুমি আমাকে ‘আমরা’-র মধ্যে ধরছো। কিন্তু এক্স-টু এলে—আমার জায়গা কোথায়?”
অমর-নখ্T ওর চোখে চোখ রাখলো। এ চোখের ভাষা জেসমিঞ্চ জানে। ‘তুমি আমার আগে প্রশ্নটা করে ফেললে।’
জেসমিঞ্চ হাসল, একটু দুঃখভেজা। ‘পোস্ট-হিউম্যান হওয়া মানে কি প্রেমের স্পেস নষ্ট হয়ে যাওয়া?’ জেসমিঞ্চ চুমু খেলো প্রত্যেককে। ওর অপূর্ব সুন্দর দুই নরম ভারী বুক প্রত্যাশায় ওঠানামা করছে। ওর হাসি আফগান সন্তুরের মতো। সবাই ওকে চায়। ও’ও চায় সবাইকে।
‘না,” অমর-নখ্T বলল, “হয়তো প্রেমের সংজ্ঞা বদলে যাওয়া। পুরোনো মানুষেরা এতদিন প্রেমকে দখল ভেবেছে—এদিকে প্রেম ছিল অংশীদারি।’
জেসমিঞ্চ চোখ নামিয়ে বলল, ‘আমি দখল চাই না। আমি সহযাত্রা চাই।’ সবাই জানে সহযাত্রা মানে কী। সবার সম্মতি আছে তাতে। সবার গায়ের রং একটু একটু করে বদলাচ্ছে এই প্রেমের সম্ভাবনায়। আরিক্স একটা ঢেউয়ের মতো এখন। উঠছে, নামছে, আবার উঠছে, আবার নামছে। অক্সিজেন গাছগুলো ফুলে উঠেছে ভিতরকার বিশাল ভাসমান বিছানায়।
কারুর কথা কারও কানে গেল না—বা গেলেও কেউ বাধা দিল না। প্রাপ্তবয়স্কতা মানে শুধু গোপনতা নয়; প্রাপ্তবয়স্কতা মানে প্রত্যেকের নীরবতার প্রতি শ্রদ্ধা। নিঃশ্বাস, গভীর স্নেহ, প্রেম, কেমন যেন এক শরীরী ভালোবাসা — তা সে যতই অত্যাধুনিক, এ আই মডিউলে হোক না কেন। সঙ্গম সফল হলে সময় বাড়ে নিজে নিজেই।
দূরে L-জ্ব্ব সময় মাপছে; টেরামায়া পুরোনো বিশ্বের ভাঙা অক্ষর পড়ছে; মিশুল নীরবে সাউন্ডিংস গুনছে—ওর নতুন লাং-এ বাষ্প জমে সোনালি কুয়াশা উঠছে।
জেসমিঞ্চকে অটো-ক্লোন করে ভাগ করে নিয়েছে সবাই।
সি স্যাট চোখ ঘুরিয়ে নিয়েছে অন্যদিকে। অনেক অনেক দূরে তার টেলিস্কোপিক চোখ ছায়াপথের দিকে তাকিয়ে আছে।
(ক্রমশঃ)