এমি ঘোষ
ইমিগ্রেশন অ্যাটর্নি, লস এঞ্জেলেস, যুক্তরাষ্ট্র
_____
(১)
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অননুমোদিত বিদেশিদের গণহারে বহিষ্কারের নীতি গ্রহণ করেছে। মার্কিন সরকার মনে করছে, প্রায় ১৮,০০০ ভারতীয় নাগরিক বর্তমানে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে।
তবে বাস্তবে কতজন ভারতীয় অভিবাসী অবৈধভাবে আছেন?
মার্কিন জনসংখ্যার আনুমানিক ৩ শতাংশ অননুমোদিত অভিবাসী। তাঁদের মধ্যে বিদেশে জন্মগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ২২ শতাংশ। ভারতীয় অননুমোদিত অভিবাসীদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টার ও সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ (CMS) অনুযায়ী, ২০২২ সালে অবৈধ ভারতীয় অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৭ লক্ষ। এর ফলে ভারতীয়রা মেক্সিকো ও এল সালভাদরের পরে তৃতীয় বৃহত্তম অননুমোদিত অভিবাসী গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। অপরদিকে, মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট (MPI) বলছে এই সংখ্যা প্রায় ৩.৭৫ লক্ষ, যেখানে ভারত রয়েছে পঞ্চম স্থানে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (DHS) সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে অবৈধ ভারতীয় অভিবাসীর সংখ্যা ছিল আনুমানিক ২.২ লক্ষ। এই পরিসংখ্যানগুলোতে যে ফারাক রয়েছে, তা থেকেই বোঝা যায়—ভারতীয় অননুমোদিত জনসংখ্যার প্রকৃত সংখ্যা এখনো অনিশ্চিত।
তবে স্পষ্টতই, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় অননুমোদিত অভিবাসীর সংখ্যা সামগ্রিক অননুমোদিত জনসংখ্যার চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম।
যদি Pew Research ও CMS-এর অনুমান সঠিক হয়, তবে দেখা যাবে প্রতি চারজন ভারতীয় অভিবাসীর মধ্যে একজন অবৈধভাবে অবস্থান করছেন—যা এই গোষ্ঠীর সাধারণ অভিবাসন প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে যেখানে ভারতীয় অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ৬ লক্ষ, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ লক্ষে।
DHS-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে যেখানে ভারতীয় অননুমোদিত অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ৫.৬ লক্ষ, ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২.২ লক্ষে—অর্থাৎ ৬০ শতাংশ হ্রাস। তবে ২০২৩ সালে সীমান্তে ভারতীয়দের উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ায় বাস্তব সংখ্যা এখন আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে কতজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে?
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ১৬,০০০ ভারতীয়কে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ওবামা প্রশাসনের আমলে বছরে গড়ে ৭৫০ জন, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে প্রায় ১,৫৫০ জন, এবং বাইডেনের আমলে প্রায় ৯০০ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বহিষ্কারের হার বাড়লেও, সর্বোচ্চ বহিষ্কার হয়েছিল ২০২০ সালে—প্রায় ২,৩০০ জন।
২০২৫ সালের শুরুতে সীমান্তে প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাইডেন প্রশাসন আশ্রয়প্রার্থী ও মানবিক অভিবাসীদের জন্য একটি অ্যাপ (CBP One) চালু করেছিল, যার মাধ্যমে তারা নির্দিষ্ট বন্দর দিয়ে প্রবেশের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে পারতেন। ট্রাম্প প্রশাসন পুনরায় ক্ষমতায় এসে এই অ্যাপ বন্ধ করে দেয়, এবং প্রায় ৩০,০০০ পূর্বনির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করে দেয়।
এছাড়াও, CBP Home নামের নতুন এক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু হয়েছে, যেখানে অভিবাসীরা স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করার আগ্রহ (intention) জানাতে পারেন।
এই পরিবর্তনের ফলে আশ্রয়প্রার্থী ও মানবিক অভিবাসীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বাইডেন আমলে আশ্রয় ব্যবস্থার অপব্যবহার বেড়ে যায়, যার ফলে অভিবাসন আদালত ও সীমান্তে চাপ বেড়ে যায়। তবে, জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন বিবেচনা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক শরণার্থী কর্মসূচি স্থগিত করে নির্বাহী আদেশ জারি করে। যদিও একটি সার্কিট কোর্ট প্রায় ১০,০০০ যাচাইকৃত ব্যক্তির প্রবেশ অনুমোদন করে, কিন্তু ফেডারেল তহবিল বরাদ্দ স্থগিত থাকায় শরণার্থী একীকরণ প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তায় পড়ে। ১৯৭৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বছরে গড়ে ৭৩,০০০ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। তবুও, আশ্রয়প্রাপ্তদের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সম্ভাবনা উত্থাপন করেছে প্রশাসন।
আইনি দিক থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও, বাস্তবে তারা অননুমোদিত অভিবাসী, আন্তর্জাতিক ছাত্র এবং এমনকি গ্রিনকার্ডধারীদের মধ্যেও ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে ২০২৪ সালে কানাডা ও মেক্সিকো ছাড়া অন্যান্য দেশ থেকে আগতদের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ১২% কমেছে।
*****
(২)
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি ও কথিত ইহুদি-বিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের ফলে ১,৮০০-এরও বেশি শিক্ষার্থী তাদের F-1 বা J-1 শিক্ষার্থী স্ট্যাটাস হারিয়েছেন — এমন তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবৃতিতে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, এই শিক্ষার্থীরা শুধু পড়াশোনার জন্য নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় ভাঙচুর, শিক্ষার্থীদের হয়রানি, এবং দখল-সহিংসতায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। যদিও কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে, বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই শান্তিপূর্ণ ছিলেন । তবুও তারা কেন স্ট্যাটাস হারালেন, তা অস্পষ্ট।
বর্তমানে, দেশজুড়ে অন্তত ১৬টি আইনি চ্যালেঞ্জ চলছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, স্ট্যাটাস হারালে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান বা কাজ করতে পারবেন না। ১৫ এপ্রিলের একটি মামলায় বলা হয়, এই বরখাস্ত “স্বেচ্ছাচারী, কৌতুকপূর্ণ, এবং সংবিধানবিরোধী”।
কিছু মামলায় আদালত শিক্ষার্থীদের পক্ষে রায় দিয়েছে, এবং ২৪ এপ্রিল থেকে ধাপে ধাপে SEVIS স্ট্যাটাস পুনরুদ্ধার শুরু হয়। SEVIS মানে হলো Student and Exchange Visitor Program ।
এখন পর্যন্ত, ২৯০ জনের বেশি ছাত্র ও সদ্য স্নাতক, যাদের স্ট্যাটাস বাতিল হয়েছে। ৬৫ জন মামলা লড়ছেন, যাঁদের বেশিরভাগই Optional Practical Training (OPT)-এর অধীনে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছিলেন। এঁদের মধ্যে অন্তত ১৪ জন, সম্ভবত আরও বেশি, আগামী ছয় মাসের মধ্যে স্নাতক হতেন। বরখাস্তের ফলে তাদের পড়াশোনা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে।
আদালতের ৩৫টিরও বেশি মামলায় বিচারকরা অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (TRO) দিয়েছেন, যাতে বলা হয়েছে—SEVIS স্ট্যাটাস পুনরায় সক্রিয় করতে হবে, এবং সরকার যেন আর কোনো ব্যবস্থা না নেয়। বিচারকদের মতে, সেমিস্টারের মাঝপথে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া “অপূরণীয় ক্ষতি” — এটা TRO জারির অন্যতম ভিত্তি। সবচেয়ে বড় মামলাটিতে ১৩৩ জন শিক্ষার্থী প্রতিনিধিত্ব করছেন। সেই মামলাতেও TRO অনুমোদিত হয়েছে এবং তাদের স্ট্যাটাস ফেরত দেওয়া হয়েছে।
আমরা ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর রেখে চলেছি। পরবর্তী সংখ্যায় আরো নতুন তথ্য যোগ করা হবে।
(চলবে)
অত্যন্ত প্রয়োজনীয় লেখা। আগ্রহী রইলাম H1B ভিসা সম্পর্কিত জটিলতার আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে জানতে। আমরা যারা ভিসায় এদেশে রয়েছি, তারা প্রায় মুখ বুঁজে এখন আগামী ৪ বছর অতিক্রম করার অপেক্ষায় বসে আছি। এ সম্পর্কে সবার জানা উচিৎ ।
তোমার মতো যারা আছে — উচ্চশিক্ষিত, কুশলী এবং পরিশ্রমী কিন্তু এই নতুন সিস্টেমের কারণে দুশ্চিন্তায় আছে, তাদের এই লেখাটা পড়িও। অনেকের উপকার হবে হয়তো।