সারিকা
হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ
‘উঠোনের এই রোদটাতে বসে তোমার ননদের চুড়িদারের পাজামা গুলো জলে গরম সার্ফ গুলে ভালো করে রগড়াও।’
এই শুনে আলেয়ার চোখের কোনে জল। বিয়ের পর আজ এবাড়িতে তার দ্বিতীয় দিন। ঘুম থেকে তার উঠতে দেরী হয়ে গেছে। সাড়ে আটটা বেজে গেছে। শাশুড়ি দরজার কাছে এসে ডেকে দিল। আলেয়া রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে তার শাশুড়ি বলল,
‘উঠতে এত বেলা করলে তোমার শ্বশুর রেগে যাবে। সকালে উঠে উঠোনে ঝাড়ু দেবে। নাও এবার উঠোন ঝাড়ু দিয়ে বাসন মেজে নাও। তারপর চা খেয়ে রোদে বসে কাপড়গুলো কেচে দিও।’
‘কী কাপড়?’ আলেয়া জিজ্ঞাসা করল।
তার শ্বাশুড়ি বলল, ‘তোমার ননদের, শ্বশুরে্ আমার কাপড়, কালকের স্নান করে রাখা কাপড় আর কিছু বাইরে ব্যবহারের জামা কাপড় আছে। পাজামার পায়ের কাছে সার্ফ দিয়ে ঘষা হয়ে গেলে তবেই পুরো পাজামাটা কাচবে।’
ননদের বয়স কুড়ি বছর। পূর্ণ অ্যাডাল্ট। শাশুড়িও হেঁটে বি গার্ডেন গোটা ঘুরতে পারে এতটা সুস্থ। অথচ তারা তাদের স্নানের জামা কাচতে দিয়েছে আলেয়াকে। আলেয়া সেগুলো কাচতে লাগল। আর তার মনে নানান এলোমেলো প্রশ্ন ঘুরছে। যদি ননদ বারো তেরো বছরের বাচ্চা হত। যদি শাশুড়ি বিছানা শয্যা হত তাহলে তার মনে এত প্রশ্ন উঠত না। সে কি তবে এবাড়ির কাজের লোক? তার কি কোনো মান সম্মান নেই? সুস্থ মানুষের স্নানের জামা তাকে কাচতে হবে। তার দাদীকে এই কাজ করতে হত সে শুনেছে দাদীর মুখে। ননদ-শাশুড়িদের পরা কাপড় ধোয়া, চুল আঁচড়ে দেওয়া, খেতে দেওয়া। কিন্তু এই ২০২০ সালে দাঁড়িয়ে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি সে যেন কিছুতেই মানতে পারছিল না।
আলেয়া বাংলায় অনার্স করে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে। কম্পিউটারএ বেসিক কাজ জানে। বিয়ের আগে একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়াত। বাবা চাকরী করেন। মা গৃহবধূ। আলেয়ার আরো দুই দাদা আছে। একজন প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ার। অন্যজন শিক্ষক। আলেয়া তার জীবনে নিজের দাদীকে দেখেছে, মা-কাকিদের সংসার আলাদা হয়েছে আলেয়ার শৈশবেই। কিন্তু দাদী বেঁচে ছিল আলেয়ার বিয়ের আগে পর্যন্ত। সে কখোনো দাদীকে দেখেনি তার কোনো মা-কাকির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে। কিন্তু দাদীর শাশুড়ি এটা দাদীর সঙ্গে করেছিল। তাই আলেয়ার কাছে বৌমাকে অপমান অসম্মান করা বা কাজের লোকের মত ট্রিট করা কেবল শোনা কথা। চোখে দেখেনি সেভাবে। ছোটো চাকরি ছেড়ে দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে আলেয়া সংসার করতে আসে।ভেবেছিল বিয়ের বছর দুয়েক পর আবার চাকরি করবে সে।
দিনের কাজ সেরে দুপুরে সাড়ে তিনটের সময় বিছানায় শুতে এসেছে আলেয়া। নতুন বৌ। দুপুর আর রাতের অপেক্ষা করে।কখন দরজা বন্ধ করবে। সুখ দুঃখের কথা বলবে দুজনে। বরের সঙ্গে গল্পের সূর তুলেছে। দরজায় কড়া নাড়ছে কেউ। আওয়াজ এলো, মামিমা ওঠো আমার আব্বা আসছে, নানিমা বলল নারকেল কুরতে হবে। পিঠে হবে। মন ভার করে বরের পাশ থেকে উঠে এল আলেয়া। কিন্তু বাইরে কাওকে কিচ্ছুটি বুঝতে দিল না।
সন্ধ্যার সময় মাকে ফোন করবে আলেয়া। ডাক এল পাশের ঘর থেকে, ‘বেতো চুল তুলে দাও তো।’ একটার পর একটা চুল তুলছে।ভাবছে এবার বলবে থাক। হাত ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে সে থামতে বলছেনা। নটা বেজে গেল। শাশুড়ি বললেন, ‘আমার কোমর আর পিঠটা মালিশ করে যাও, তরকারি গরম করো ভাত রেডি করো। তোমার শ্বশুরের জন্য খামীর করে চারটে রুটি করো।আরো বলল; ঠিক সাড়ে ন’টাতেই খাবার রেডি করে দেবে আমাদের।’
আলেয়ার মাকে ফোন করা আর হলনা। সবাই খেয়ে উঠে গেল এঁটো বাসন নিয়ে এসে গুছিয়ে রাখল আলেয়া।’
সেদিন আলেয়ার ননদের ছেলে স্কুলে যাবে। সে মামা বাড়িতেই প্রায় থাকে।মামা বাড়ি থেকেই স্কুলে যাবে। আলেয়ার বর পৌঁছে দেবে তাকে। শাশুড়ি সেদিন বাড়িতে নেই। বাড়ি ফিরে জানতে পারে সাতজন মানুষের খাওয়া বাসন মেজে ঝাড়ু দিয়ে দশটার মধ্যে রান্না করতে পারেনে আলেয়া। শাশুড়ি বলে ওঠে, ‘এটা যদি আমার বাপের বাড়ি হত, আমার ভাবিরা যদি আমার ছেলের সঙ্গে এমন করতে,ঘর থেকে বার করে দিতে আমার বাপ। আমাদের মত শ্বশুর শাশুড়ি পেয়েছো বলে বেঁচে গেলে।’
আলেয়া শান্ত গলায় বলে, ‘আমি তো চা পর্যন্ত খাইনি।’
তার শাশুড়ি পুণরায় বলল, ‘তুমি না খেয়ে থাকলেও আমার কিছু যায় আসে না কিন্তু ছেলেটা না খেয়ে স্কুলে চলে গেল।’
আলেয়া মনের কোনে কোথাও তখনো স্বপ্ন ছিল। শ্বাশুড়ি একদিন ভালোবাসবে।
প্রচন্ড শীতে আলেয়ার বিয়ে হয়েছে। ডিসেম্বর মাস। ঠান্ডাটাও জমিয়ে পড়েছে। কিন্তু জলের কাজ বন্ধ নেই আলেয়ার। আলেয়া মাছ বেছে কাটছে। তার শ্বাশুড়ি বলল, ‘তোমার মাছ কাটা হয়ে গেলে হাতটা সাবান দিয়ে ধুয়ে তোমার ননদের গা থেকে কম্বল টা তুলে গুছিয়ে দাও। তাকে ডেকে দাও। সাড়ে এগারোটা বাজে। ওকে তুলে ওর জন্য চা টা রেডি করবে।’
বিয়ের পর পর হানিমুনে যায়নি আলেয়া। বিয়ের দু মাস পর হানিমুনে গেছে। আলেয়ার শাশুড়ি ফোন দিয়ে বলছে, ‘চারদিন পুরীতে থাকার কী দরকার? চারদিন কেউ থাকে? কালকে চলে এসো।’ যদিও আলেয়ারা চারদিন পরই ফিরেছিল।
একবার আলেয়া অসুস্থ ছিল। জ্বর। বিছানা শয্যা। ইঞ্জেকশন দিতে হবে কয়েকদিন। Every alternative day তার ইঞ্জেকশন হবে। শাশুড়ি তার ছেলেকে বলল, ‘তুই ওকে ওর বাপের বাড়ি রেখে আয়। উঠতে পারবে না এখানে থেকে কী করবে।’ আলেয়া বলেছিল, ‘এখানেই থাকব।’ আসলে ওর বর তো আর বাপের বাড়ি গিয়ে থাকবে না, অসুস্থ অবস্থায় বরের কাছে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছিল বলেই যেতে চেয়েছিল না। কিন্তু এতটাই অসহযোগিতা পায় আলেয়া বাধ্য হয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই বাপের বাড়ি চলে আসে।
আলেয়ার শাশুড়ি বলে, ‘আমার শাশুড়ি আমাকে খেতে দিত না। আমি ওরকম শাশুড়ি নই যে তোমাকে খেতে দেব না।’ অথচ রোজগার তো করত আলেয়ার বর। রান্না করত আলেয়া,তাহলে শাশুড়ি খেতে দিচ্ছে কীভাবে এই সমীকরণ আলেয়া বুঝেতে পারেনি কোনোদিন।
আলেয়া তার বরের জন্য অপেক্ষা করত খাওয়ার সময়। বর এলে একসঙ্গে খেত। আলেয়ার বর দেখত তার ব্উয়ের পাতে মাছের সবচেয়ে ছোটো পিস। মাংসের ছোটো পিস, তার বর তখন নিজের পাতের মাছ মাংস আলেয়ার পাতে তুলে দিত। কিন্তু অভিমানী আলেয়া তা খেতে চাইত না। তার মনে হত, ‘আমার জন্য যখন এটাই বরাদ্দ আমি তখন অন্যের খাবার কেন খাব।’
আলেয়ার ননদের বাচ্চা হয়। এই বাচ্চাটা গর্ভে থাকাকালীন নানারকম ফল ও নানা রকম বাদাম নিয়ে আলেয়ার মা বাবা আলেয়ার ননদের সঙ্গে দেখা করতে আসে। তখন আলেয়ার শাশুড়ি আলেয়ার মা বাবাকে বলেন, ‘আমাদের আমরা ভাগ্য খারাপ এমন বৌমা পেয়েছি, প্রায় অসুস্থ। কোনো কাজে লেগে না। এরপর বাচ্চা হতে আলেয়ার দুই দাদা বাচ্চাকে দেখতে আসে, তখন আলেয়ার শাশুড়ি বলেন, ‘তোমার দাদারা আসছে পোলাও করছো করো, কিন্তু আমাদেরকে বেলা এগারোটার মধ্যে একবার গরম ভাত দেবে। তারপর বেলায় পোলাও খাব আমরা।’ ননদের বাচ্চা হ্ওয়ার পর আলেয়ার শাশুড়ি আলেয়াকে বললেন,’এখন থেকে তোমার ননদ রাতে ভাত খাবে না। তুমি রাতে একদিন রুটি-আলুভাজা করবে, একদিন পরোটা-ডিমভাজা করবে। এইভাবে ওর রুটিন চলবে।’ আলেয়া তাই করতে থাকে।
ইতিমধ্যেই একদিন আলেয়ার জ্বর হয়, তাকে ডাক্তার রক্ত পরীক্ষা করতে দেন। আলেয়া সকাল আটটার সময় না খেয়ে বেরিয়ে পড়ছিলো, কিন্তু এই সময়ের মধ্যে সে কেন বাসন মেজে যায় নি,তাই নিয়ে আলেয়ার বেরোনোর আগেই তুমুল চেঁচামেচি শুরু করে আলেয়ার শাশুড়ি। আলেয়ার নতুন মা হ্ওয়া শিক্ষিত ননদ বলল, ‘ভাবি যে বাসন না মেজে চলে যাচ্ছে! বাসনাটা তাহলে কে মাজবে?’
আলেয়া ধীরে ধীরে প্রতিবাদ করতে থাকে, বাড়ির সকলের কাজ বলতে রান্না করা ও বাসন মাজা পর্যন্ত করে। বাড়ির সবাইকে নির্দিষ্ট সময়ে খেতে দেওয়া, খাওয়ার পর এঁটো টেবিল পরিষ্কার করা, সকলের কাপড় কাচা, শাশুড়ির ঘর ঝাড়-পোঁছ করা, সবই আলেয়া বন্ধ করে দেয়। বাবার বাড়িতে যাওয়ার আগে শ্বশুর শাশুড়ির থেকে অনুমতি নেওয়ার পদ্ধতিও বন্ধ করে দেয় আলেয়া। কিন্তু আলেয়া যখন প্রতিবাদ করেনি তখন বলা হত সে কী কী কাজ করেনি, যখন প্রতিবাদ করল তখন থেকে সর্বক্ষণ বাড়িতে, প্রতিবেশীর সামনে আলেয়ার সমালোচনা করতে শুরু করল শ্বশুরবাড়ির সবাই। ইতিমধ্যে আলেয়ার একটি ফুটফুটে বেবি হল। তারপর আলেয়া চরম মানসিক অসুস্থ অবস্থায় ডাক্তার খানায় গেল, ডাক্তার বললেন আলেয়া শ্বশুরবাড়িতে থাকলে কখোনো সুস্থ হবে না। কিন্তু আলেয়া ছোটো চাকরি করত। সব ছেড়ে ভারতীয় সংস্কৃতির মত সংসার করতে গিয়েছিল, তার কাছে কোনো ক্যরিয়ার নেই।
বাবা নিজের বাড়িতে আলেয়াকে থাকতে বললেও বাবার বাড়ির পারিপার্শ্বিক লোকজন রোজ কথা শোনায় আলেয়া কেন সংসার করতে পারে না এই নিয়ে। আলেয়ার বর উচ্চ শিক্ষিত, সামাজিক,সভ্য, আলেয়ার কাজে সে অনেক সাহায্য করে, এর জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে বহু অপমান সেও সহ্য করে। সে আলেয়াকে বলে, আমি তো আমার পুরো পরিবারের মানসিকতা বদলাতে পারব না। আবার বাবা মাকে ছেড়ে বেরোতেও পারবনা। ওরা আমার ওপর নির্ভরশীল। তুমি ওদেরকে পাত্তা না দিয়ে নিজের মত বাঁচো, নিজের শ্বশুরবাড়িতেই থাকো।’
আলেয়া তার বরের কথা মত শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিজের সম্পর্কে নিন্দা শুনে দিন কাটে তার। এতে মানসিক যন্ত্রণার আলেয়ার বৃদ্ধি পায়। ধারাবাহিক কাউন্সেলিং করায় সে। সাইকোলোজিস্ট বলেন ক্যরিয়ার গড়ুন। আপনি অসুস্থ নন। ঐ পরিবেশে যে থাকবে সেই মানসিক যন্ত্রণার শিকার হবে। শুধুমাত্র ক্যরিয়ারই পারে এই যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দিতে। কর্মজীবনেও সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু সেই সমস্যা বেঁচে থাকার লড়াইএর অংশ। আর এখনকার সমস্যা অন্যায়ভাবে আরোপিত।
বত্রিশ বছরের আলেয়া নতুন করে ইন্টারভিউ দিচ্ছে, জব খুঁজছে, ব্যবসার পদ্ধতি নিয়ে বই পড়ছে। তবে কেউ জানেনা আলেয়া জব পাবে কি না, বা এই অবস্থা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে কি না।