মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায়
বীরভুম, পশ্চিমবঙ্গ
_____
বাংলা ভাষার জন্য আর কি কেউ মরবে? কিংবা মরতে চাইবে? বছরে একদিন ‘অমর একুশে’র জন্য যে আকুলতা ছিল এখন কুসুমে কুসুমে ভাগ হয়ে গিয়ে এপারের বাঙালি আর ভাবে না। বাংলাভাষারও হিন্দু-মুসলমান হয়ে গেল। একসময় মনস্বী অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন “ভুল হয়ে গেছে বিলকুল। আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে, ভাগ হয়নিকো নজরুল।” পরে এক সময় অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে তাঁকেও বলতে হয়েছিল “এতদিন পরে ধর্মের নামে ভাগ হয়ে গেছে নজরুল।” তবুও বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে দুই দেশের বাঙালি অমর একুশের জন্য আকুল হয়েছে, বারবার স্মরণ করেছে ভাষা শহীদদের, শুধু বাংলা নয় স্মরণে এসেছে অসমের বরাক উপত্যকার ভাষা শহীদদের। কিন্তু আজ সেই অসমে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন আদমশুমারিতে বাংলা মাতৃভাষা লিখলেই নাকি বিদেশী চিহ্নিত করা সহজ হবে। বকলমে হয়তো এটাই বলতে চাইছেন যে ভারতে থাকলে বাংলা ভাষা বলা যাবে না।
বাঙালিদের চূড়ান্ত বিপর্যয় কিন্তু হঠাৎ ঘটেনি। বরাবরই ভদ্রবিত্ত বাঙালি অন্য ভাষার তাঁবেদার। একদা নিজেদের ইঙ্গ বঙ্গ সমাজের ভেবে তারা আহ্লাদিত হতেন, বিলিতি শাসকের এটিকেট শিখতেন আর দেশের ঠাকুর ফেলে বিদেশের কুকুরকে কোলে করে নিতেন। এর মধ্যে নবজাগরণ দেশাত্মবোধ জাতীয়তা সব হল। কীভাবে যেন হই হই করে এসে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অতঃপর জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন পাওয়ার পথ স্পষ্ট হল। বাঙালি বাংলাকে ভালবাসতে শিখল। তারপর তেরো নদী সাত সাগরের জল গঙ্গায় পদ্মায় মিশতে মিশতে বোঝা গেল ভাষার চেয়ে ধর্ম বড়। অতঃপর কুরু পাণ্ডবের আস্ফালন, বিনা যুদ্ধে নাহি দিব। বাংলা ভাগ হল, এক ফালি থাকল বৃহৎ ভারতে। আরেক ফালি একরকম ঝুলেই রইল পাকিস্তানে। কিন্তু তাঁরাই প্রমাণ করেছেন ধর্মের চেয়ে ভাষা ও সংস্কৃতি অনেক বড়।
রফিক-বরকত-জব্বারের পথ বেয়ে সে এক অন্য লড়াই। চূড়ান্ত নিপীড়নে জর্জরিত হয়েছে সেদিন আপামর বাঙালি, খেটে খাওয়া কৃষক শ্রমিক। শেষ পর্যন্ত মেয়েরাও বন্দুক নিলেন কাঁধে। বহু রক্তপাত, বহু লাঞ্ছনা, বহু অত্যাচারের পথ পেরিয়ে এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হল। শুধু বাংলা ভাষার জন্য তৈরি হল নতুন দেশ। এপারেও সেদিন উচ্ছ্বাস জেগেছিল সবার মনে – জয় বাংলা।
মহাত্মা গান্ধীর নাতি শ্রী গোপাল গান্ধী তাঁর সদ্যপ্রকাশিত স্মৃতিকথায় লিখেছেন বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার সময় মুজিব যখন ভারতে এসেছিলেন তখন বিশাল জনসভায় হয়তো বা এই একবারই সমবেত জনতা তাঁকে বাংলায় কথা বলতে অনুরোধ করেছিলেন, যদিও সে জনতার বেশির ভাগই বাঙালি ছিলেন না। তিনি লিখেছেন যে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে লন্ডন থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে শেখ মুজিবুর রহমান দিল্লিতে থেমেছেন আর দিল্লিতে বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন ‘ম্যাডামপ্রাইম মিনিস্টার’ বলে, কিন্তু সেই বিপুল জনস্রোত তাকে থামিয়ে দিয়ে বাংলায় বলতে বললেন। হিন্দি-ভাষীদের এক মহাসমুদ্র বক্তাকে বলছেন বাংলায় বলতে! আজ মনে হয় অবিশ্বাস্য। তিনি সেই মুহূর্তে বলে উঠলেন, ‘আমার ভাই বোনেরা’, সঙ্গে সঙ্গে আকাশ জুড়ে গর্জন উঠলো ‘জয় বাংলা’। বাংলাদেশের প্রতি এই ছিল ভারতের সম্মান ও ভালবাসা। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, আজ সেখানে এত বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে। স্মরণ করি এই মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে বাংলা তথা বাঙালিকে পৃথিবীর এক বিশিষ্ট জাতিতে পরিণত করেছিল। একুশে ফেব্রুয়ারি তাই হয়ে গেল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
স্বাধীন ভারতে হিন্দি চাপানোর চেষ্টা প্রথমেই ঠোকর খেয়েছিল দক্ষিণে। থমকে যেতে হল তাই। যে দাবিই করা হোক, কখনোই ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি হয়নি। কিন্তু ১০০ বছর ধরে যারা হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুত্বের স্বপ্ন দেখে এসেছে, কাজ করে এসেছে গোপনে গোপনে, দেশ জুড়ে তাদের ভাবনাতেই তিল তিল করে হিন্দি ভাষা চটুল বিনোদনের মাধ্যম হয়ে গোটা দেশে ছড়িয়ে গেছে। সেটা এখন হিন্দু ধর্মাচরণের ভাষাও বটে। সংস্কৃতের পরেই তার স্থান। টিভির সামনে ধূপধুনো নিয়ে বসে বাঙালির বছরভর রামায়ণ দেখা থেকে শুরু। সে রাম কৃত্তিবাসের নয়, রামানন্দ সাগরের। তারপর এল মহাভারত। চারিদিকে শ্রীর ছড়াছড়ি। পিতাশ্রী, মাতাশ্রী, ভ্রাতাশ্রী।
ক্রমশ মধ্যবিত্ত সমাজও ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের একমাত্র উপায় হিসেবে বেছে নিল ইংরেজি মাধ্যম। চারিদিকে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠল ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। ঐতিহ্যবাহী বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো ছাত্র-ছাত্রীর অভাবে ধুঁকতে লাগল। ‘ছেলের আমার বাংলাটা ঠিক আসে না’, এই কথাটি বলে কত আনন্দ। তারপরে দেখা গেল ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে অনায়াসে বাঙালি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি শিখছে। বাংলা তৃতীয় ভাষার জায়গাও হয়তো পাচ্ছে না। কিন্তু আবার সংস্কৃতিও চাই। ইদানীং যত রকম নাচ গানের শো তার চার ভাগের তিন ভাগ আজ বাংলার সঙ্গে হিন্দি গানের মিশেল। সবকিছুকে ছাপিয়ে গেল সম্প্রতি চন্ডালিকার সাথে হিন্দি গানের ফিউশন। বল্ মা তারা দাঁড়াই কোথা!
হিন্দি বলয়ের ধার করা নেতারা বাংলায় হিন্দি হিন্দুত্ব চাপানোর জন্য ভাষার সর্বনাশ করে সেরেছেন। অত্যন্ত কুরুচিকর ভাষা এখন রাজনীতিতে অনায়াসে চলে। পাড়ার উঠতি নেতা-নেত্রীরাও সে ভাষা স্বচ্ছন্দে বলে হাততালি পান। ভদ্রবিত্তের মুখেও সেই একই কথা শোনা যায় যা এসেছে মিডিয়া থেকে। মিডিয়া অর্থাৎ গোদী মিডিয়া। বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষাকারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোলে বসে থাকা এই মিডিয়ায় অহরাত্র মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ এবং তথাকথিত হিন্দুরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য নানাভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। আজকাল মানুষ ভাল থাকে না, ‘বিন্দাস’ থাকে। ঘোষক বা সূত্রধর এখন এঙ্কার হয়ে নোঙ্গর ফেলে বসে আছেন এবং এই বিচিত্র মিশেল ভাষায় অনর্গল বকে চলেছেন। হাতে হাতে মুঠোফোনের দৌলতে এখন তা হাটেমাঠে ঘাটে সর্বত্রই অতি কুৎসিত ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
যাইহোক এই আলোকিত পুলকিত হিংলিশ বাঙালিরা এবার আরেক বিপর্যয়কে দেখবে, যদিও এখন ভদ্রলোক বাঙালি জল মেপে চলেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে বৃহত্তর ভারতে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুত্বের ভারতে বাংলা ভাষার উপর ভয়াবহ আক্রমণ নেমে এসেছে। বাংলা বললেই এখন নাকি বাংলাদেশে যেতে হবে। সে আপনি হিন্দু মুসলমান যাই হোন না কেন। আপনি বাংলাদেশী, আপনি রোহিঙ্গা, আপনি দেশদ্রোহী। এমনি করেই স্বদেশ আমাদের হারিয়ে যাচ্ছে।
গত এক মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খবর আসছে যে বাঙালি অভিবাসী শ্রমিকদের নির্যাতন, মারধর, গ্রেপ্তার, বাংলাদেশে নির্বাসন চলছে এবং তাদের সমস্ত পরিচয়পত্র দেখানোর পরেও মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না। তাদের একমাত্র দোষ হল তারা তাদের মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলেন। কিছু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
গত ২৫শে মে ২০২৫, দিল্লি থেকে বীরভূমের ছয়জন অভিবাসী শ্রমিককে (২ শিশু সহ) বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। তাদের টাকা এবং ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়। ১৪ই জুন – মুর্শিদাবাদ এবং বর্ধমানের বাসিন্দা ৭-৮ জন বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিককে মহারাষ্ট্র পুলিশ থানে, মহারাষ্ট্র থেকে আটক করে সরাসরি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। বৈধ আধার এবং প্যান কার্ড দেখানোর পরেও তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়নি। তাদের সাথে নারী পুরুষ নির্বিশেষে অত্যন্ত অশালীন ও ভয়ঙ্কর ব্যবহার করা হয়েছে।
১১ জুলাই – ওড়িশার ঝাড়সুগুডায় ৪৪৪ জন বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক যারাঁ মালদা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, পূর্ব বর্ধমান, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁরা তাঁদের আধার এবং ভোটার কার্ড দেখিয়েও পার পাননি, তাদের জন্ম সার্টিফিকেট এবং স্কুলের নথি দেখাতে বলা হয়েছিল। দেখা হয়েছে তাদের ফোনে বাংলাদেশি নম্বর রাখা আছে কিনা। সাংসদ মহুয়া মৈত্র ও সামিরুল ইসলামের প্রচেষ্টায় আদালতে আবেদন করার পর তারা মুক্তি পেলেন।
এবছর ১১ জুলাই দিল্লির জয় হিন্দ কলোনির (বাঙালি অভিবাসী শ্রমিক অধ্যুষিত) বাসিন্দাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে, যাঁদের অনেকেই ৪০ বছর ধরে বাসিন্দা। তাঁদের তাদের জল এবং বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হয়েছে যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
ঘটনা শুধু মুসলমানদের সঙ্গে ঘটছে এমন নয়। চুঁচুড়ার বাসিন্দা দেবাশীষ দাস, ওড়িশায় কাজ করছিলেন। বাংলাদেশি সন্দেহে পুলিশ তাঁকে হয়রানি করেছিল। বৈধ কাগজপত্র দেখানোর পরেও তিনি ছাড়া পাননি। দেবাশীষ কোনওভাবে বাড়ি ফিরে আসেন। শুধু গ্রেপ্তারই করা হচ্ছে না, বাংলাদেশি সন্দেহে শারীরিক নির্যাতনও চালানো হচ্ছে, যেমনটি ওড়িশায় শমসেরগঞ্জের বাসিন্দা সুজন সরকারের সাথে ঘটেছে, কারণ তিনি একজন বাঙালি। ইতিমধ্যে মতুয়া সম্প্রদায়, যাঁদের অন্যান্য পরিচয়পত্রের সঙ্গে মতুয়া পরিচয়পত্র আছে তাঁদেরও কয়েকজনকে বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই বিষয়টি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেছেন, যা বাংলায় অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছে। তাঁদের হস্তক্ষেপের ফলেই অবশেষে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে নো ম্যানস ল্যান্ডে আটকে পড়া মানুষদের ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
বাঙালী কি এখনও জাগবে না! এক কলমের খোঁচায় এবং মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার ষড়যন্ত্রে বাংলা ভাগ হয়েছিল কোনো সঠিক নিয়ম না মেনে। শ্রী অমর্ত্য সেনের স্মৃতিকথায় পড়েছি যে মহান ইংরেজ মানচিত্রের উপর দাগ দিয়ে কয়েক কোটি লোককে ভিটে মাটি ছাড়া করেছিলেন, তিনি নাকি ভুলেও ভারতীয়দের সঙ্গে দেখা করতেন না। বোঝা যায়, তিনি নিজের কৃতকর্ম সম্পর্কে কতটা সচেতন ছিলেন।
আজ যখন বাঙালির অস্তিত্ব বিপন্ন, উপমহাদেশে আশ্চর্য এক সংস্কৃতির অধিকারী আমরা কি এক হয়ে লড়বো না? সেই ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের কালে আমাদের কবিগুরুর লেখা বারবার মনে পড়ে যায়। আমরা যেন ভুলে না যাই এই ভারতের প্রত্যেক বাসিন্দা তাঁর গানেই শ্রদ্ধায় উঠে দাঁড়ায়, সেটা বাংলাতেই লেখা। জনগণ মনের ভাষা বলার জন্য দেশ ছাড়তে হবে?
১২০ বছর পরে আবার সময় এসেছে।
‘বাঙালীর প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন
এক হউক, এক হউক, এক হউক, হে ভগবান।।’
_____
খুবই মনোগ্রাহী লেখা। বাংলা ভাষার উপর ঠিক কী কী রকমের আক্রমণ কোন কোন দিক থেকে নেমে আসছে এই বিষয়ে সমকালীন ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে একটা নীতিনিষ্ঠ আলোচনা হয়েছে এখানে।