সৌমিতা মিত্র
হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ
অম্বা একটি সংস্কৃত শব্দ যা বিশেষ করে পশ্চিম ভারতে দেবী দূর্গার অন্যতম জনপ্রিয় নাম। তাঁকে প্রায়শই অম্বা ভবানীও বলা হয় এবং এটি নারীসুলভ ঐশ্বরিক শক্তির প্রতীক। মহাভারত মূলত একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মের মানুষের কথা বলে; তাদের দ্বন্দ্ব, তাদের অদম্য বীরত্বের, পতনের গল্প বলে।কিন্তু মহাভারতের অন্ধকার দিকটি এই বাস্তবতাকে সামনে এনে দেয় যে মহাকাব্যটি নারীবিরোধীতার দ্বারা গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। সমস্ত নারী চরিত্রকে বশীভূত এবং নীরব করে দেওয়া হয়েছে এই সত্যটি এই অন্ধকার বাস্তবতার স্পষ্ট প্রমাণ। নারীরা তুচ্ছ এবং তাঁদের ব্যক্তিত্ব মহাকাব্যে বিরাজমান পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে চাপা পড়ে যায়। মহাকাব্যের এমনই একজন নারী হলেন কাল রাজের কন্যা অম্বা।
মহাভারত যেমন ভগবান কৃষ্ণ থেকে বহু বিশিষ্ট পুরুষের আখ্যান, তেমনই কুলপঞ্জিকায় গৃহীত নয় এমন বহু নারীর জীবন সংগ্রামের কাহিনিও। এঁদের বাদ দিলে মহাভারতের কিছু থাকে না। এই নারীদের নিয়ে অসংখ্য উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক ইত্যাদি লেখা হয়েছে। এক দ্রৌপদীকে নিয়েই চন্দ্রভাগা দ্রৌপদী, নাথবৎ-অনাথবতী ইত্যাদি গ্রন্থ রচিত হয়েছে। গঙ্গাকে নিয়ে, অম্বাকে নিয়ে নাট্য রচনা হয়েছে, কুন্তীকে নিয়ে সম্রাজ্ঞী কুন্তী থেকে আরম্ভ করে আধুনিক সমালোচকরা প্রবন্ধ রচনা করেছেন।
আদিপর্বে ভ্রাতা বিচিত্রবীর্যের বিবাহের জন্য শান্তনু পুত্র ভীষ্মের দ্বারা নিজের স্বয়ংবর সভা থেকে অপহৃতা হবার পর তাঁর প্রেমিকের কাছে ফিরে গিয়েও প্রত্যাখ্যান কুড়োচ্ছেন এই শুনে যে অপহরণের কারণে তাঁর সতীত্ব নষ্ট হয়ে গেছে। একজন প্রেমিক প্রবরের থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে যখন তিনি তাঁর অপহরণকারীর কাছেই ফিরে যাচ্ছেন এবং তাঁকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করছেন, তখন তাঁর একদা সেই অপহরণকারীও তাঁকে তাঁর স্ত্রী রূপে গ্রহণ না করতে পারার কারণ হিসেবে তাঁর আজীবন ব্রক্ষ্মচারী থাকার প্রতিজ্ঞার কথা শুনিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সেসময় অম্বা একজন সবদিক থেকে প্রত্যাখ্যাত নারী ছিলেন, তিনি তাঁর সমস্ত সমস্যার জন্য ভীষ্মকে দোষারোপ করেছিলেন। ক্রোধে ক্ষুব্ধ অম্বা দীর্ঘ তপস্যা করেছিলেন এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান শিব তাকে বর দিয়েছিলেন, এবং সেই বর অনুযায়ী তিনি ভীষ্মকে ধ্বংস করার জন্য শিখণ্ডি রূপে পুনর্জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি পাণ্ডব এবং কৌরবদের মধ্যে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ বলে শিখণ্ডীকে মনে করা হয়। অতএব, ভীষ্মের ধ্বংসের মাধ্যমে অম্বার প্রতিশোধ পূর্ণ হয়েছিল। যদিও এই কাহিনী কম বেশি আমাদের সকলের জানা।
অম্বা এখনও মহাকাব্যের এক বিস্মৃত চরিত্র। তাঁর মধ্যে নারীবাদের উত্থান দেখা যেতে পারে, কিন্তু এর সাথে সাথে নারীবাদ-বিরোধীতাও আসে। তিনি ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে তার ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন। তাই তিনি নারীদের জন্য পুরুষতন্ত্রের দ্বারা নির্ধারিত সীমানা ছাড়িয়ে এগিয়ে গেছেন — এমন বার্তাই তুলে ধরা হয়েছে যুগ যুগ ধরে।
মহাভারতের মতো মহাকাব্যে নারীদের মূলত দুটি মেরুতে চিত্রিত করা হয়েছে, হয় তাঁকে হিড়িম্বার মতো একজন কামুক রাক্ষসী নারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে অথবা কুন্তী ও দ্রৌপদীর মতো একজন আদর্শিক ও সতী নারী হিসেবে। এই দ্বিধা লঙ্ঘনকারী কোনও নারী চরিত্র নেই। পাঠক মহাকাব্যে নারীদের ভূমিকা কতটা তুচ্ছ তা প্রত্যক্ষ করতে পারবেন — হয় তাদেরকে যুদ্ধের কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, নয়তো রাজ্যের জন্য বর হিসেবে সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর জন্ম দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
অবশ্য এই বিষয়ে অন্য ধর্মের বা সভ্যতার মহাকাব্য অথবা গ্রন্থ পিছিয়ে নেই — ট্রয়ের হেলেন একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। হোমার তাঁর ইলিয়াড মহাকাব্যে হেলেন ও তাঁর নারীত্বকে যুদ্ধের কারণ হিসেবেই বর্ণনা করেছেন।
কিন্তু এখন আমরা আলোচনা করছি মহাভারত নিয়ে। আমাদের এই মহাকাব্যের প্রতিটি নারী চরিত্রকে এই আলোকে দেখা যেতে পারে। একজন আদর্শ মাতা কুন্তী হোক, অথবা পাঁচ স্বামীর সতী স্ত্রী দ্রৌপদী হোক, অথবা ভীমের রাক্ষসী স্ত্রী হিড়িম্বা হোক, যিনি কখনও সামাজিকভাবে তাঁর স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃত হননি, মহাকাব্যের প্রতিটি নারীই পুরুষতন্ত্রের দ্বারা আরোপিত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। দ্রৌপদী তাঁর হারানো সম্মানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তার স্বামীদের উপর নির্ভরশীল ছিলেন, কিন্তু সমাজ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হলেও অম্বা ভীষ্মকে ধ্বংস করার প্রতিজ্ঞা করেন। যদিও তাঁর ব্যক্তিত্বের এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এবং তাকে শিখণ্ডী হিসেবে পুনর্জন্ম নিতে হয়েছে। অতএব, অম্বার চরিত্রটি নির্ভীক এবং দৃঢ় এবং কেউ নারীবাদ এবং ব্যক্তিগত দৃঢ়তার সাক্ষী হতে পারে যা মহাকাব্যে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত।
মহাভারতের জটিল আখ্যানের মধ্যে, অম্বার বিবরণ প্রেম, প্রত্যাখ্যান, প্রতিশোধ এবং অটল সংকল্পের গভীর অনুসন্ধান হিসাবে প্রকাশিত হয়। কাশী রাজকন্যা থেকে শিখণ্ডিতে তাঁর রূপান্তর, ভীষ্মের মৃত্যুর পিছনে মূল শক্তি, এই মহাকাব্যিক আখ্যানকে চিহ্নিত করে এমন মানবিক আবেগ এবং ধর্মের জটিল গতিশীলতাকে মূর্ত করে। অম্বার মর্মস্পর্শী কাহিনী আবিষ্কার করে সেই নারীকে যাঁর ন্যায়বিচারের জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্টা মহাভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধা ভীষ্মের পতনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তাঁর প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা এবং প্রতিশোধের যাত্রা অন্বেষণ করে যা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছে।
অম্বার আখ্যানটি অনমনীয় সামাজিক রীতিনীতি এবং একজন নির্যাতিত ব্যক্তির দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির প্রভাবকে শক্তিশালীভাবে চিত্রিত করে। এই চরিত্র ধর্ম, লিঙ্গ পরিচয় এবং কর্মের চক্রাকার সারাংশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। শিখণ্ডী চরিত্রে তাঁর পুনর্জন্মে অম্বা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন নারী হিসেবে তাঁর উপর আরোপিত সীমাবদ্ধতাগুলিকে অতিক্রম করে, শেষ পর্যন্ত মহাভারতের কাহিনীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অম্বার আখ্যান রূপান্তর এবং অধ্যবসায়ের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। অম্বা একজন প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকা থেকে একজন ভয়ঙ্কর তপস্বীতে রূপান্তরিত হন, এবং শেষ পর্যন্ত একজন যোদ্ধা হয়ে ওঠেন যিনি তাঁর আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য অর্জন করেন, যা মানব আত্মার দৃঢ়তার চিত্র তুলে ধরে।
অম্বার আখ্যান স্থায়ী ন্যায়বিচার, দৃঢ়তা এবং সংকল্পের শক্তি সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। মহাকাব্য মহাভারতে, ভীষ্মের দ্বারা অন্যায়ের শিকার হওয়ার পর ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য তীব্র দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে অম্বা নারী বীরত্বের প্রতীক। তিনি নিষ্ক্রিয় শিকার হতে অস্বীকার করেন এবং সক্রিয়ভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেন, যা শেষ পর্যন্ত ভীষ্মের পতনের দিকে পরিচালিত করে। অম্বার গল্পে নারীর কর্তৃত্ব, অবাধ্যতা এবং প্রতিকূলতার মুখে রূপান্তরের শক্তি প্রদর্শিত হয়। অম্বা চরিত্রটি সেই সময়ের পুরুষতান্ত্রিক রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে, এবং মহাভারত নামক মহাকাব্যকে এক অন্য মাত্রা দেয়, যে মাত্রাকে পুরুষতান্ত্রিক হিন্দু সমাজ লঘুকরণ করেছে, এবং আমাদের ভুলিয়ে দিয়েছে।
ভীষ্মের দ্বারা অপহৃতা হবার র পর বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অম্বা অস্বীকৃতি জানান। তিনি তাঁর উপর যে অবিচারের মুখোমুখি হন, তার প্রতিশোধ নিতে সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করেন। অম্বার গল্প এই ধারণাটিকে চ্যালেঞ্জ করে যে নারীর রাগ সহজাতভাবে নেতিবাচক। তাঁর রাগকে একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে যা তাঁকে ন্যায়বিচারের জন্য উদ্যমী করে এবং শেষ পর্যন্ত মহাভারতের গতিপথ পরিবর্তন করে। অম্বার কর্মকাণ্ড ধার্মিকতার অনুভূতি দ্বারা অনুপ্রাণিত। তিনি কেবল ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার দ্বারা পরিচালিত নন, বরং ভুল সংশোধন এবং নৈতিক নীতিকে সমুন্নত রাখার আকাঙ্ক্ষা দ্বারা পরিচালিত। অম্বার আখ্যান, যদিও জটিল এবং কখনও কখনও বিতর্কিত, পুরুষতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে নারী বীরত্বের একটি শক্তিশালী উদাহরণ উপস্থাপন করে।
তিনি দেখান যে নারীরা পরিবর্তনের সক্রিয় প্রতিনিধি হতে পারেন, তাঁরা অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ করতে এবং তাদের নিজস্ব ভাগ্য নির্ধারণ করতে সক্ষম। অম্বার কাহিনী পুরুষ-শাসিত ব্যবস্থার মধ্যে নারীদের উপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা এবং অবিচারগুলিকে বিশেষ করে বিবাহ, পছন্দ এবং সামাজিক প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে তুলে ধরে। নিজের ভাগ্য মেনে নেওয়ার পরিবর্তে, অম্বা ভীষ্মের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন, যাকে তিনি তাঁর কষ্টের মূল কারণ বলে মনে করেন। তিনি তীব্র তপস্যা করেন এবং অবশেষে তার প্রতিশোধ পূরণের জন্য শিখণ্ডি হিসেবে পুনর্জন্ম লাভের চেষ্টা করেন। এই অবাধ্যতার কাজটি পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার শিকার হিসেবে তাঁর অবস্থানকে নিষ্ক্রিয়ভাবে গ্রহণ করতে তার অস্বীকৃতি প্রদর্শন করে।
অম্বার গল্পের অনেক আধুনিক ব্যাখ্যা তাঁকে নারী ক্ষমতায়ন এবং কর্তৃত্বের প্রতীক হিসেবে কেন্দ্রীভূত করে। নিষ্ক্রিয় শিকার হতে অস্বীকৃতি এবং প্রতিশোধের চেষ্টাকে পুরুষতান্ত্রিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে দেখা হয়। মূলত, মহাভারতে অম্বার যাত্রা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের উপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা এবং স্বায়ত্তশাসন ও ন্যায়বিচারের জন্য তাঁদের সংগ্রামের উপর একটি শক্তিশালী ভাষ্য হিসেবে কাজ করে। একজন নারীর প্রত্যাখ্যাত হবার কারণ রূপে দন্ডায়মান হয়েছে দৈহিক পবিত্রতা, যেটি একজন নারীর কাছে চূড়ান্ত অপমানজনক হিসাবে বারবার চিহ্নিত হয়েছে। মহাভারতে অম্বা চরিত্রটি নারীর অপমানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার এক প্রধান প্রতিভূ।
______
তথ্যসূত্র:
১. ভাদুড়ী, নৃসিংহ প্রসাদ, মহাভারতের অষ্টাদশী, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ২০২২
২. ভট্টাচার্য, ধীরেশচন্দ্র, মহাভারতের নারী,আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৫
৩. Dr. Malinee (Translated by Sanjeev Kumar Nath), Amba: Princess of Kashi, B.R. Publishing Corporation, 2013
৪. Reddy Madhavan, Meenakshi, Girls of the Mahabharata: The One Who Had Two Lives, HarperCollins, 2018
৫. I Wayan Nuriarta, Renata Lusilaora Siringo Ringo, ‘Amba in Gender Study Perspective, Lekesan: Interdisciplinary Journal of Asia Pacific Arts, Volume 5, Issue 1, April 2022 p37-43.
well researched article , loved going through
Thank You