সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ
ঢাকা, বাংলাদেশ
পাথরঘাটা থেকে স্টিমারে ঢাকায় ফিরছিল শায়ক। রুদ্র শায়ক। সদ্য বিদেশ থেকে ফেরা যৌবনোত্তীর্ণ একজন মানুষ। ভোর সাড়ে পাঁচটায় স্টিমার পাথরঘাটা থেকে ছেড়েছে, সন্ধ্যে নাগাদ সদরঘাটে পৌঁছে যাবে।
পদ্মা সেতু হওয়ায় এখন অনেক সুন্দর রাস্তা হয়ে গেছে। মনে হয় বিদেশি কোনো রাস্তা। গাড়িতে ঢাকায় যেতে অনেক কম সময় লাগে। তারপরও রুদ্র স্টিমারে ঢাকায় যাচ্ছে। পুরনো অভ্যাস। জীবনে কত বার যে স্টিমারে পাথরঘাটা থেকে ঢাকায় গেছে এসেছে তার ইয়াত্তা নেই। তবে, তখন যেত ডেকে। ডেকে কাঁথা মুড়ি দিয়ে দিতো একটা লম্বা ঘুম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতো স্টিমার সদরঘাটে পৌঁছে গেছে।
এবার আর ডেকে যাচ্ছে না। এসি কেবিনে। সারাদিন কেবিনে শুয়ে-বসে, বই পড়ে, টিভি দেখে বোর হয়ে যাচ্ছিল। এসি কেবিন হওয়ায় কিছুটা রক্ষে। যে গরম পড়ছে! নদীর বাতাসও গরম হয়ে গেছে। এসি না থাকলে গরমে আলুসেদ্ধ হয়ে যেত। কেবিনের জানালা দিয়ে নদীর দু-পাশের সৌন্দর্য উপভোগ করেছে। যদিও চির-চেনা দৃশ্য। চব্বিশ বছর পরেও একটুও বদলায়নি।
স্টিমার চাঁদপুর ছেড়ে এসেছে অনেক আগে। তখন মেঘনার পশ্চিমাকাশ সূর্যাস্তের রবির রক্তিম আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। আর একটু পরেই সন্ধ্যে নামবে।
এখন গরম একটু কমেছে। কেবিন থেকে বাইরে এলো রুদ্র। ডেক-এ রেলিং-এ ভর করে দাঁড়ালো। সামনে তাকালো। পানি আর পানি! যদ্দূর চোখ যায় শুধুই অথৈ পানি। সীমাহীন পানি।
কতদিন পর, আবার কতদিন পর মেঘনার খোলা হাওয়ায় নিজেকে মেলে দিলো। আহ! কী আরাম।
‘কত বছর হবে?’ নিজের মনের কাছে প্রশ্ন করলো রুদ্র।
তা হবে দু-যুগ।
দুই যুগ মানে চব্বিশটা বছর পর আবার সেই মেঘনার উন্মুক্ত ডেকে দাঁড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে দু’চোখ ভরে নদীর দু’পারের দৃশ্য দেখছে, বুক ভরে প্রশান্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছে। যেমন নিত চব্বিশ বছর আগে।
চব্বিশ বছর আগে শেষবার এই স্টিমারে ঢাকা থেকে আমতলি গিয়েছিল রুদ্র। সেবার ওর পাশে ছিল শ্রেয়শী। ওর ক্লাসমেট যাকে ও মন-প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসেছিল। বিয়ে করবে বলে ঠিকও করে ফেলেছিল।
তখন ওর মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ। কথা ছিল, গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরে ওরা রেজিস্ট্রিটা করে রাখবে। তারপর একটা চাকরি-বাকরি জুটে গেলে ছোট্ট সুখের নীড় বাঁধবে। তারপর ওরা দুজন দুজনার, শুধুই দুজনার।
শ্রেয়শীকে আমতলি পৌঁছে দিয়ে পাথরঘাটা গেল রুদ্র। সপ্তাহখানেক গ্রামে থেকে ঢাকায় ফিরে চাকরি খুঁজতে লেগে গেল। যে করেই হোক ওকে একটা চাকরি জোগাড় করতেই হবে। নইলে ওর জীবনের সব স্বপ্ন তছনছ হয়ে যাবে।
ওদিকে শ্রেয়শী সেই যে বাড়ি গেছে আর ফেরার নাম নেই। দিন গেল, সপ্তাহ গেল; মাস গেল শ্রেয়শী আর ঢাকায় ফিরল না।
শ্রেয়শীকে চিঠি লিখলো রুদ্র। উত্তর এল না। আবার লিখল। এবারও কোনো উত্তর পেলোনা। শ্রেয়শীর বিরহে পাগল-প্রায় হয়ে উঠল রুদ্র।
চাকরি খুঁজতে গিয়ে একদিন মতিঝিল অফিস পাড়ায় বন্ধু হাসান মাসুদের সাথে দেখা। মাস্টার্স করে ওর মতোই চাকরি খুঁজছে। হাসান মাসুদের কাছে জানলো, শ্রেয়শীর বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামীর সাথে এখন চিটাগাং থাকে। শ্রেয়শীর হাজবেন্ড চিটাগাং ইউনিভার্সিটির টিচার।
হাসান মাসুদের কাছে শোনা কথাটা পুরোপুরি বিশ্বাস হল না। খবরটা শুনে রুদ্রর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। এ জন্যে বুঝি ওর চিঠিরও কোন উত্তর দেয় না শ্রেয়শী।
এরপর চাকরি খোঁজা বন্ধ হল রুদ্রর। বাসা থেকে বের হওয়া বন্ধ করল। রাগে-ক্ষোভে-অপমনে তাবৎ বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন; বাইরের পৃথিবীর সাথে সব সম্পর্ক ছেদ করে দিল। কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। উদভ্রান্তের মতো দিন কাটাচ্ছিল। একটা অগোছালো জীবন বেছে নিয়েছিল।
এ সময় হঠাৎ করেই ইউরোপ যাওয়ার একটা সুযোগ পেয়ে গেল রুদ্র। ফিনল্যান্ডে। সুযোগটা হাতছাড়া করল না। শ্রেয়শীহীন এ শহর ওর বড্ড অচেনা মনে হচ্ছিল। আর ভাল্লাগছিল না। তারচে’ এই ভালো। এই শহর থেকে অনেক দূরে চলে যেতে চায়। যেখানে শ্রেয়শী নামে কোনো নারী নেই।
এই শহর, এই দেশ, বন্ধু-বান্ধব; আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে চলে যাবে দূরে, বহু দূরে। যেখানে কেউ ওকে চিনবে না। কোনো বন্ধু থাকবে না। চেনা পৃথিবীর সাথে আর কোন সম্পর্ক থাকবে না। শ্রেয়শী নামে কোনো মেয়ের স্মৃতি ওকে তাড়িয়ে ফিরবে না।
যা ভাবা তাই কাজ। একদিন সত্যি সত্যি চিরচেনা এই দেশটা ছেড়ে চলেও গেল সেই সুদূর ফিনল্যান্ডে। তারপর কেটে গেল একে একে চব্বিশটা বছর। চব্বিশ বছর পর এই প্রথম ওর দেশে ফেরা।
দেশে ফিরেই গিয়েছিল পাথরঘাটায়। ওর অনেক স্মৃতি বিজড়িত গ্রামের বাড়িতে। সেখান থেকেই ঢাকায় ফিরছিল।
ওর পাশে একজন ভদ্র মহিলা-ও স্টিমারের রেলিংয়ে ভর দিয়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে সান্ধ্যরবির অস্ত-গমন দেখার অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে অনেকক্ষণ ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
ভদ্র মহিলার পুরো মুখটা দেখা যাচ্ছে না। মুখের একপাশ দেখতে পাচ্ছে রুদ্র। অনেকটা শ্রেয়শীর মতো। ওর বুকের ভেতোরটা ধক্ করে ওঠে। এক অজানা ব্যথায় মোচড় দিয়ে ওঠে। কিন্তু শ্রেয়শী এখানে আসবে কোত্থেকে?
না, ও নাম আর মনে করতে চায় না, রুদ্র। অচেনা নারীর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল রুদ্র।
চোখ ফিরিয়ে নিলেও মন ফেরাতে পারল না। চোখ আর মন তো কারো শাসন মানে না, রুদ্রর-ও না। আবার চোরা চোখে তাকাল রুদ্র। এরপর আবার অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল।
মেয়েরা না দেখেও সব বুঝতে পারে। ভদ্রমহিলা না তাকিয়েও বুঝতে পারছেন পাশের পুরুষটি ওঁকে দেখছে। দেখছে না বলে বলা যায়, ওর রূপ-লাবণ্য গোগ্রাসে গিলছে। এবার রুদ্রর দিকে তাকালেন ভদ্রমহিলা। চমকে উঠল রুদ্র! দেখল, শ্রেয়শীর মতো নয়; শ্রেয়শীই ।
চব্বিশ বছর পরও ওকে চিনতে এতটুকু কষ্ট হল না রুদ্রর। সেই একই রকম আছে। তবে, একটু যেন ফ্যাটি হয়ে গেছে, কিন্তু রূপ-লাবণ্য ঠিক ধরে রেখেছে। তেমনই সুন্দরী আছে।
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না রুদ্র। ও প্রতিজ্ঞা করেছিল, জীবনে আর কোনোদিন ওর মুখ দেখবে না। আজ নিজের প্রতিজ্ঞা নিজেই ভঙ্গ করল। মনে ভয়-সংশয়, দ্বিধা-সংকোচ নিয়ে শ্রেয়শীর কাছে এগিয়ে গেল রুদ্র শায়ক। বললো, ‘তুমি!’
শ্রেয়শী তো ওকে আগেই দেখেছিল। তাই একটুও চমকাল না। উত্তর দিল, ‘চিনতে পারছো না, নাকি স্ত্রীর ভয়ে চিনেও না চেনার ভান করছো?’
রুদ্র বলল, ‘ঠিক বুঝলাম না।’
;বুঝেছো ঠিকই। তা আমাকে না চেনার ভান করার মানে?’
‘না, মানে তোমার সাথে আর কেউ নেই তো?’
‘আর কেউ মানে? আর কেউ কে থাকবে?’
‘তোমার স্বামী, সন্তানেরা।’
‘বিয়ে হলেই না স্বামী-সন্তান!’
‘তাহলে হাসান মাসুদ যে আমাকে বলেছিল…’
‘কী বলেছিল?’
‘তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। তোমার হ্যাজবেন্ড নাকি চিটাগাং ইউনিভার্সিটির টিচার?’
‘তুমি ওর কথা বিশ্বাস করেছিলে?’
‘হ্যাঁ, মানে….’
‘মাসুদ তো আমকেও বলেছিল, তুমিও নাকি বিয়ে করে বউ নিয়ে বিদেশে চলে গেছো। তুমি ওর কথা বিশ্বাস করলেও আমি তো ওর কথা বিশ্বাস করিনি।’
‘তার মানে তুমি বিয়ে করনি?’
‘বিয়ে করলে খুশি হতে?’
‘তোমার কী তাই মনে হয়?’
‘ক্যানো, তুমি বিয়ে না করে থাকতে পারো আমি পারি না? ভালোবাসার সোল এজেন্সি কী তুমি একাই নিয়েছো নাকি? আমি তোমাকে ভালোবেসে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দিতে পারি না?’
শ্রেয়শীর এ কথার কোন উত্তর দিল না রুদ্র। দিতে পারল না। দু’চোখে একরাশ স্নিগ্ধ মুগ্ধতা নিয়ে অপলক নয়নে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। মাসুদের ওপর ওর খুব রাগ হলো।
তখন সূযর্টা পশ্চিমাকাশে লাল হতে হতে ফিকে হয়ে তলিয়ে যাচ্ছে মেঘনার নীল জলে। মেঘনার জলোচ্ছ্বাসের মতোই ওদের হৃদয়েরও দু-কূল ছাপিয়ে আছড়ে পড়ছে প্রণয়ের জলোচ্ছ্বাস। তখনও মুগ্ধ চোখে শ্রেয়শীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে রুদ্র। পলকহীন চোখে।
চমৎকার গল্প। হৃদয় থেকে উৎসারিত।