(১)
অন্যের বাড়ি
অর্ধেক জীবন গেলো, অন্যের বাড়িতে কাটালাম
সে কখনো বলেনি, “আর কত, এবারে আসুন না হয়,”
কখনো হয়নি রাগত।
মোড়া পেতে, থালাবাটি, পঞ্চান্ন ব্যঞ্জন, হাসিমুখ
খাঁটি দুধ, পুরুষ্টু শবরী কলা, বাসমতী, গুণকীর্তন।
প্রকৃতই ভদ্রলোক, সদাশয়, অতিথিপরায়ণ।
দুই হাতে বরাভয়।
তবু আমি অকৃতজ্ঞ।
চিরকাল, অর্ধেক জীবন
এতো সুখ, রেশমী চাদর, আর কোমল বিছানা
উচ্চমান, গুরুদক্ষিণা।
কিছু হয়, হয়েছে অনেক,
কিন্তু তবু আগন্তুক, আর কিছু নয়,
এ বাড়ি নিজের বাড়ি নয়।
(২)
এখনো ছন্দের কাছে মাথা নত করি
এখনো ছন্দের কাছে মাথা নত করি।
এখনো আকাশ, চাঁদ, মেঘকাটা ঘুড়ি
লাল চাঁদিয়াল।
এখনো বলয়, বৃত্ত, বারোমাস্যা, বৃতি
পুরোনো বাংলা ভাষা, বিভূতিভূষণ।
নীলু বিলু তিলু, ইছামতী।
দূর থেকে ভেসে আসা কল্পলোক মাঝিদের গান।
পাশের বাড়ির ছেলে টুলু
কোলে নিয়ে চুম্বন করেছি স্নেহভরে
টলটলে শিশু।
এখন সে রক্তচক্ষু পার্টির মাস্তান
প্রোমোটার মাফিয়া তাকে দিবারাত্র এসেমেস করে।
ওদিকের ফ্ল্যাটে জোড়া খুন।
দুঃস্বপ্নে বন্ধু, প্রতিবেশী, মায়ের মৃত্যুদিন দেখি।
তবুও আকাশ দেখি মাঝে মাঝে অবাক বিস্ময়ে
ধূসর ক্লান্ত বুক। নীল নয়, জোনাকিও নয়।
হয়তো পাণ্ডুলিপি।
বুকের জঠরে আছে ইচ্ছেমতি স্বপ্নের বাস।
ব্যর্থ রাতের শেষে আবার নতুন করে ফিরে পাওয়া প্রেমের আশ্বাস।
ফিরে পাবো ভাষা, হয়তো নিছকই ভালোবাসা।
বেঁচে আছি এই দুটো সুখে।
একদিন মরে যাবো অমরত্ব-আশা নিয়ে বুকে।
(৩)
ঘর
স্বপ্নে দেখি স্তব্ধ চরাচর
জেগে দেখি দোরবন্ধ ঘর।
স্বপ্নে দেখি লাউয়ের মাচা জুড়ে
রঙিন গলার চড়ুই খেলা করে।
চড়ুই তো নয়, বাদাম গলার কাক
ঘুমের মধ্যে হেঁড়ে গলার ডাক,
হঠাৎ যেন কান ফটফট ডানা
উড়তে চাইছে, শিকল পরা, মানা।
মুখটি গুঁজে বসেই থাকে পাখি
ঘরের মধ্যে ঘরকে আমি ডাকি,
কী যেন এক বাবুই পাখির বাসা
কী যেন এক পুরস্কারের আশা।
এর মধ্যেই স্বদেশ, স্বজন, নদী
তেপান্তরের স্বপ্ন দেখি যদি —
স্বপ্নে আবার ঘরে ফেরার ডাক
ফিরেই আসে অবাধ্য সেই কাক।
ঘরের মধ্যে তেল ফুরোনো আলো,
চরাচরে বিদ্যুৎ চমকালো
দোরবন্ধ, গৃহস্থ রাতকানা,
ঠাণ্ডা মাদুর, নিদ্রালু বিছানা।
এ ঘর থেকে ওঘরের পথ চেনা
ধান বেচা, আর শীতের ফসল কেনা,
স্বপ্নে থাকুক লাউয়ের মাচা, পাখি
ঘরেই থাকি, ঘরেই আমি থাকি।
(৪)
যাওয়া, ফিরে আসা
ট্রেন থেমে গিয়েছিলো অস্পষ্ট স্টেশনে।
এখানে ওখানে কিছু ছড়ানো ছিটোনো কিছু দুর্বোধ্য ব্যক্তিগত কথা,
রেলিংএর কোলে শোয়া নিরীহ ছাগলছানা, পাশ ফিরে ঘুমোনো যাত্রী বৌ,
পানের পিকের দাগ সাইনবোর্ডে সাদা নীল আধখানা চাঁদে।
বাংলার আধখানা ঘুম ঘুম ভুলে থাকা গ্রামে।
দলে দলে রিফিউজি নামে
গামছা নিংড়োয় তারা, ঘামে
তিনছটাকের দ্বীপে, বাঘমারী উপজেলা
চামটা নামক ব-দ্বীপে
নিয়ে গেছে মণ্ডলপাড়ার মাঝি কেষ্টপদ, অথবা নিতাই মৃধার ছেলেটাকে
ফিরে এলে হিসেবের খাতা দেখে বোঝা যাবে আসল সন্দেহ।
এখন অবশ্যই ফিরে না গেলেই নয়। ফিরে যেতে হয়।
সবাইকে এইভাবে চলে যেতে হয়,
আজ, কাল, পরশুর আধখানা চাঁদে।
আমরাও ফিরে যাবো
আবার আসিব ফিরে — এ কথা বলার মতো আজকাল বেসাহস নেই।
পুঁজি নেই, পুঁথিতেও সঠিক লেখেনি
কোন জেলা, উপদ্বীপে বেরিয়ে পড়েছে বড় বাঘ,
অপেক্ষায় বসে আছে কেষ্টপদ, নিতাই মণ্ডল
কাদের আলির ছেলে, কাদের নৌকোয় তুমি গেলে,
ফিরে আসবেই বলেছিলে।
শেষ ট্রেন চলে গেলো, স্টেশনের নাম পাল্টে যায়,
এরকমই হয়, বয়ে যায় বসন্ত, শরৎশেষের হিম মাঘ,
স্টেশনের রেলিঙে সেই পুরোনো পুরোনো লাল দাগ,
ফিরে যায় আবার মাঝির দল, অনেকের নৌকো ফিরে আসে
শেষরাতে খেয়াঘাটে নোঙরের গভীর জলের শব্দ
ঘাই দেওয়া মাছের শব্দ, বৈঠা টানার শব্দ
ভেসে আসে, ভেসে ভেসে আসে।
আমরাও একদিন ফিরে যাবো,
ট্রেনে, বাসে, কাদের মাঝির সাথে
নিঃশব্দে, চাপা নিঃশ্বাসে।
কবিতাগুলি “জল পেরিয়ে নিরুদ্দেশ” নামক কবিতার বই থেকে নেওয়া হয়েছে। প্রকাশক — অভিযান, কলকাতা, ২০২৫ বইমেলা।