ফরিদুল ইসলাম নির্জন
ঢাকা, বাংলাদেশ
আমিন বাজার বেইলি ব্রীজের পাশে দাঁড়িয়ে। হাতে ছোট পানির বোতল, পকেটে চিরকুট। সচরাচর সবাই যেভাবে সুইসাইড নোট লেখে, আমিও লিখেছি। ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ি নয়। হতাশায় নিজেকে ডুবিয়ে ফেলেছি। তার থেকে রেহাই পেতে, মৃত্যুকে বরণীয় করতে, ঘুমের ওষুধ খেয়ে চলে গেলাম পৃথিবী থেকে। ভালো থেকো পৃথিবী, ভালো থেকো পৃথিবীর মানুষ। ক্ষমা করো আমাকে প্রিয় বাবা-মা। সুষমা ভালো থেকো, তোমার বর্তমান প্রেমিককে নিয়ে।’
নিজেকে নিঃশ্বেস করে দেব, ভাবতেই খুব বেশি দুখানুভূতি হচ্ছে না হৃদয়ে। বরং সুখানুভূতি বহমান। দুখেরা আর কখনো আমাকে হানা দেবে না। হতাশায় কখনো বিপদগ্রস্থ পথে নামতে বাধ্য করবে না। শুনেছি আত্মহত্যা নাকি মহাপাপ! এই কথার বিপরীতে নিজেকে উল্টো মেরুর দিকে নিয়ে চলেছি। আত্মহত্যা ছাড়া বেঁচে থাকাটাই পাপ। চারদিক বিষাদের চাদর ঘিরে ধরেছে আমাকে। চোখের সামনে সিঁড়ি। কিছু ঘুমের ওষুধ কিনেছি। সকল পাখির নীড়ে ফেরা শেষ হলে, দিনের আলো ফুরিয়ে গেলে, নিকষ কালো আঁধার নেমে এলে, দেব নিজেকে মিলিয়ে।
আসলে একসময় আত্মহত্যা নিয়ে কত বয়ান দিতাম। মানুষের অর্থ বিত্ত, সৌন্দর্য, বাড়ি গাড়ি থাকলেই কী সে সুখী! পৃথিবীর সেরা আবেদনময়ী নারী অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো। তাঁর খ্যাতি, যশ, প্রেমিক, সম্পদের কোনো কিছুর কমতি ছিল না। কিন্তু কোনো এক রজনীতে, নিজের জীবন নিজেই থামিয়ে দেয়। দরজা খুলে দেখা যায় বেডের উপর তার লাশ উপুর হয়ে পড়ে। কেউ কেউ বলেন অতিরিক্ত নেশা বা ঘুমের ওষুধে তার মৃত্যু। আহারে মনরো! কত মানুষ কেঁদেছিল, শোকের মাতমে স্তম্ভিত হয়েছিল। কিন্তু সে নিজেকে আর সবার সামনে আনতে পারেনি। এই নগরীতে অনেকেই মেরিলিন মনরোর চেয়ে বেশি বেদনায় কাতর। তবুও নিজেদের বাঁচিয়ে রেখেছে জোর করে। তাদের প্রাচীন ধারণা আত্মহত্যার মাঝে কোনো সুখ থাকতে পারে না। বরং বেঁচে থেকে লড়াই করার নামই মানব জনম। এই প্রথার বিরোধী একজন মানুষ। তবে পৃথিবীর অন্যতম সেরা কমেডিয়ান রবিন উইলিয়ামসের আত্মহত্যার খবরে সবাই অবাক। যাঁর টেলিভিশন শো, অভিনয় দেখে মানুষ হাসতে বাধ্য। আমেরিকাতে ‘মোর্ক এন্ড মাইন্ডলি’ টেলিভিশন শো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সবার কাছে কমেডিয়ান অভিনেতা হিসেবে পায় খ্যাতি-যশ। সবার হতাশা, নিরাশা দূর করতে নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে বিনোদন দিতেন, হাসা্তেন। অথচ সেই মানুষটির নিজের হাসির আড়ালে বেদনা লুকিয়ে ছিল! একদিন হঠাৎ করে ফাঁসির রশিতে লটকে যান রবিন উইলিয়ামস। সবাই বেশ কেঁদেছিল সেই সময়ে।
তাঁকে মানুষ ভুলে গেছে। আর আমি আত্মহত্যায় মারা গেলে কে মনে রাখবে? কোনো বন্ধু হয়তো ফেসবুক স্ট্যাটাসে আবেগে ভেঙ্গে পড়বে, রুম থেকে শোক প্রকাশ জানাবে। হয়তো আমার লাশও দেখতে আসবে না। ইন্টারনেটে অনেকেই মেসেঞ্জারের কথপোকথন ফাঁস করে দেবে। মৃত্যুর খবর অনলাইনে ছড়িয়ে যাবে। আত্মহত্যার খবর ভাইরাল হতে দেখে, অনেকেই নিজে ভাইরাল হবার জন্য স্ট্যাটাস দেবে।
ইচ্ছে ছিল উইলিয়ামসের মত রুমের ফ্যানে রশিতে ফাঁস নেয়া। কিন্তু পুলিশের লোকজন পরিবারকে ঝামেলায় ফেলতে পারে। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলি, আমিনবাজার বেইলি ব্রীজের পাশে ওষুধ খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দেব।
ওষুধের পাতা পকেটে। চারদিকে আঁধার ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু লোকজন কমছে না। এক বয়স্ক ভিক্ষুক, হাত-পা নেই। তবুও বেঁচে আছে। এসব দেখে মায়া না হয়ে ঘৃণা জন্মে। তোর এত দুঃখ নিয়ে বেঁচেঁ থাকার দরকার কী! জাতিকে দেবারতো কিছু নেই, নিজেকে দেবারও কিছু নেই। তারপরও বেঁচে থাকে কোন অধিকারে? ব্রীজের আশে পাশে মানুষেরউপস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত আবার পরিবর্তন করে ফেলি। সামনের দিকে এগোতে থাকি। কিছুদূর এগোতেই ময়লার স্তুপ দেখতে পাই। ভাবলাম নদীতে না মরে, এখানে ওষুধ খেয়ে পড়ে থাকি। আমার লাশ সনাক্ত সহজ হবে। বাসায় খুব সহজেই মৃত্যুর খবর পৌঁছে যাবে। এবার ওষুধ সব হাতে নেই। পানির বোতলের মুখ খুলতেই পাশে একটা শব্দ শুনতে পাই।প্রথমে ভেবেছি আমার মতো কেউ হয়তো মারা যেতে চলেছে, কাছে গিয়ে মৃত্যুর জন্য সাহায্যেও হাত বাড়াই। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে দেখি, একটি বক্সের ভেতর থেকে শব্দ আসছে। বক্স খুলে দেখি একটা শিশু। পাশেই খাঁচায় বিড়ালের মিউ মিউ শব্দ। কি করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। স্ট্যাচুর মত থমকে যাই। আমি মরতে চাই, এই শিশু আর বিড়াল কিনা বাঁচার জন্য আকুতি করছে। একজন পবিত্র নিষ্পাপ শিশু। তাকে এভাবে ফেলে আমি কিভাবে মরে যাই। শিশুটার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনের ভেতর এক অন্যরকম প্রশান্তির বাতাস বহমান। দ্রুত তাকে নিয়ে হাসপাতালে চলে যাই, খাঁচার বিড়ালকেও সঙ্গে নিই। ৯৯৯ ফোনে পুলিশকে খবর দিই। তাঁরা আসেন। বেশ আন্তরিকতায় শিশুটির দায়িত্ব নেন। আমাকে ধন্যবাদ জানান।
তারপর সেই বিড়ালের খাঁচাটি সঙ্গে নিয়ে বাসাতে ফিরি। বাবার মুখ অগ্নিমূর্তি। হাজারো প্রশ্নের বুলেট ছুড়ে মারে। এর ভেতর কী? তোর কাজই ঝামেলা যুক্ত। চাকরি-বাকরি নাই। সারাদিন শুধু ঘুরে সময় পারকরা।’ মা এগিয়ে এসে বলল, ‘এবার থামো। সারাদিন ছেলেটা বাইরে ছিল। এখন ঘরে ফিরেছে। একটু ফ্রেশ হতে দেবে তো।।’ তারপর মা বলল, ‘যা বাবা রুমে। ফ্রেশ হয়ে খেতে আয়।’
আমি ঘরে ফিরে বিড়ালটিকে খাঁচা বন্দি থেকে রেহায় দিই। ওয়াশ রুমে গিয়ে, ফ্রেশ হয়ে রুমে আসি। বাচ্চাটির মুখ আমার চোখের সামনে শুধু ভেসে বেড়াচ্ছে। তবে এবার মনে মনে বিড়াল নিয়ে ভাবি কীভাবে খেতে দেব। নিজের খাবার দাবারের ঠিক নেই। আবার বিড়ালের আশ্রয়! ডাইনিং টেবিলে খেয়ে, ছোট্ট একটা বাটিতে ভাত আর ঝোল নিয়ে রুমে ফিরি। আমার খাবার থেকে একটু মাছ আড়ালে রাখি। সেটাও মাখিয়ে বিড়ালের সামনে দেই। সে খেতে থাকে। বিছানায় নিজের শরীর বিছিয়ে দিতেই সুষমার কথা মনে পড়ে। কি ছলনাময়ী মেয়ে। বিয়ে শেষে আমেরিকাতে পাড়ি দিয়েছে।
সেদিনের ঘটনাটি আমাকে বারবার আহত করে হৃদয়ে। সন্ধ্যাবেলায় সুষমা ফোন দিয়ে জরুরিভাবে বাসায় ডাকে। তার মা-বাবা বেড়াতে গেছে সিলেটে। বাসায় তার এক কাজিন ছাড়া কেউ নেই। আমিও চলে যাই তার বাসাতে। সেই রাতে তার বাসায় গিয়ে অবাক। তার কাজিন প্রেমিককে নিয়ে এসেছে। রাতভর তার সাথে পার করবে এক রুমে।
আমি আর সুষমা আরেক রুমে। কেরু মদের বোতল এনেছে। একসাথে ড্রিংকসে রাত্রী যাপন। আমাকে বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে ওঠে। মাঝেমধ্যে তার বান্ধবীর সাথে এভাবে সময় যাপন করে থাকে। এতে কোনো সমস্যা নেই, ক্ষতি নেই, জল জাতীয়, শরীর ফিট থাকে, ঘুম ভালো হয়। পেটে সমস্যা হয় না। আমি প্রথমে রাজি হইনি। পরে তার অনুরোধে রাজি হয়ে যাই। কাঁচা মাংসে মিশে যাবার টানে সম্মতি দেই। তারপর সে রুমে বসতে বলে। বিভিন্ন কিছু রেডি করে আনতে পাশের রুমে যায়। হঠাৎ তার ফোন বেজে ওঠে। কাছে গিয়ে দেখি হোয়াটসএপে ফোন। ‘হি ৩’ নামে সেভ করা। ফোনটি হাতে নিতেই মেসেজ এল। ‘কী জান পাখি ফোন ধরছো না কেন?সেদিনের রাতটি দারুণ উপভোগ্য ছিল। এমন রজনী বারবার উপভোগ করতে চাই।’
মেসেজ সিন করে প্রিভিয়াস মেসেজ দেখতে থাকি। মাথা পুরো নষ্ট হয়ে যায়। তার সাথে কয়েকবার শারীরিক সম্পর্ক, রেগুলার যোগাযোগ।অথচ আমি তার শরীরে স্পর্শ করলেই বলে বিয়ের পর সব কিছু। আরো নানান রকম যুক্তি উপস্থাপন। ফোনে আরো দুজন ছেলের সাথে চ্যাটিং ইতিহাস দেখলাম। এসব দেখে মাথার মগজ বেরিয়ে আসতে থাকে।তখনি মারা যেতে ইচ্ছে করে। সুষমার পায়ের আওয়াজে আমি ফোন সেখানে রেখে দেই।
আমি ড্রিংকস করবো না বলে রুম ত্যাগ করার সিদ্ধান্তের আগে তাকে মেসেজ দেখে ফেলার কথা বলে ফেলি। সে জানায়, ‘আমি এমনি। তোমার ভাল লাগলে থাক, না লাগলে চলে যাও।’ আমি এক আকাশ অভিমান নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যাই কমলাপুর রেলস্টশনে। সেখানে দশ টাকা দিয়ে গাঞ্জা খেয়ে সটান হয়ে শুয়ে পড়ি ঘাসের ওপর। আকাশের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নেই আত্মহত্যা করার। এর মাঝেই সুষমার মেসেজ পাই। জড়িয়ে ধরা অন্য কারো সাথে ছবি। সাথে মেসেজ দিয়েছে, ‘তোমার মত নপুংশক কে জীবনসঙ্গী করিনি। এটা আমার জীবনে এক বড় ভালো সিদ্ধান্ত। আমার সাথে কখনো যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। ব্লক ইউ, অনলাইন এবং অফলাইন থেকে।’
আমি মেসেজ দেখে আরেকটি গাঞ্জার পুরো নিলাম। ঘাসের উপর শুয়ে ভাবলাম ট্রেনের নীচে পড়ে মারা যাই। কিন্তু মাথা চক্কর খেয়ে কখন ঘুমিয়ে যাই, বুঝতে পারিনি। যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন দেখি ভোর হয়ে গেছে। ফোনে মার অসংখ্যবার মিসড কল। দ্রুত ফোনে জানতে পারি, বাবা স্ট্রোকে আক্রান্ত! পিজিতে ভর্তি করা হয়েছে। আমি তড়িঘড়ি চলে যাই। আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলি।
বাবা সুস্থ হবার পর আবার আমি সিদ্ধান্ত নেই আত্মহত্যা করব। আসলে এইটা আমাকে দিন দিন একটা ট্রমা সৃষ্টি করে। বাধ্যগত হতে থাকি। তখন শুধু নিজের ভেতর হতাশা আর হতাশা। কেন জব হচ্ছে না, কেন বাবা-মা আমাকে অবহেলা করছে, কেন আমি এভাবে প্রতারিত হলাম? দিনরাত্রী নেশাগ্রস্ত হতে থাকি। গভীর রাতে বাড়ি ফেরা নিয়ে বাবার সাথে তুমুল বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে যেতে থাকি। এসব থেকেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিই।
কিছুক্ষণ পর দেখি বিড়ালটি আমার পাঁয়ের কাছে এসে ঝুঁকছে। তখন যেন আমার টনক নড়ে। আমি বেরিয়ে যাই সেসব জগৎ থেকে। শুয়ে থেকে মনের মধ্যে অনেক প্রশ্নের ঘুরপাক। উত্তরটা নিজেকে নিজেই দিচ্ছি। বাবাকে সারাক্ষণ বলে বেড়াই,‘আমার জন্য তুমি কিছুই করোনি।’ অথচ বাবা কতো কষ্টে বড় করেছে। লেখাপড়া শিখিয়েছে। সেই নিষ্পাপ শিশুর মত ছিলাম। সেখান থেকে আজ আমি কত বড় হয়েছি, বাবা-মায়ের বন্ধনে। অথচ তাদের জন্য আমি কিছুই করিনি। ভাবলাম একটা জব খোঁজা জরুরি। জীবন নিয়ে সিরিয়াস হতে হবে। সকালে উঠেবাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব। দোয়া চাইব।
এভাবে জব খুঁজতে থাকি। চাকরির পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াই। আসলে যাকেই সিভি দিই, সে মানুষটি ভীষণ আশা দেয়। পরবর্তীতে যোগাযোগ করলে সব ভুলে যায়। মনে রাখে না। এই সমস্যা, সেই সমস্যা, চাকরির বাজার ভীষণ রকমের খারাপ, এসব বলে সময় পার করে দেয়।
হঠাৎ এমন সময় আমার জীবনে কালো মেঘ নেমে আসে। মাথার উপর থেকে বটবৃক্ষ সরে যায়। বাবা ব্রেইন স্ট্রোকে মারা যান। আমার কোনো ভাই-বোন নেই। অনেকটাই ভেঙ্গে পড়ি। হতাশার মহাসাগরে ডুবে যাই। কিছুদিন পর মা মারা যান। আসলে বাবার মৃত্যু শোক মাকে বাঁচতে দেয়নি। আমি পুরোদমে এতিম হয়ে যাই। চারদিক থেকে ঘোর আঁধার নেমে আসে। খুব অসহায় হয়ে যাই।
বিড়ালটির সাথে সময় কাটে। তার সাথে খুনসুটিতে কষ্টগুলো দূর করতে থাকি। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে ভালো লাগে না। মনে হয় বিড়ালটি না খেয়ে আছে, কোন জায়গায় ঘুরতে যেতে মন চায় না, বিড়ালের কী হবে ভেবে। এক পর্যায়ে নিজেকে সেভাবে গড়তে থাকি। খুব সহজেই জবও পেয়ে যাই। হাতের অবস্থা কিছুটা ভাল হয়। বিড়ালের খাবার কিনতে থাকি। সকালে ওর মিউ মিউ শব্দে ঘুম ভাঙ্গে, রাতে ওর সাথে কথা বলে শুতে যাই। দেখা যায় আমাকে ঘর বিচ্ছিন্নতা থেকে, ঘুরমুখী করে এই বিড়াল।আমিও আদর করে নাম দিই – মিশি। মিশি নামটা কীভাবে রাখি তা মনে নেই। মিশি অসুস্থ হয়, ডাক্তারএর কাছে নিয়ে যাই। ডাক্তার বলেন ‘মাথায় টিউমার’। কিছুদিনের ভেতর ওষুধ খেয়ে সেরে যায়। সব মিলে মিশিকে নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে যাই। সামান্য বিড়ালের প্রতি মায়া, আবেগ, এত হৃদয়ের টান বুঝতেই পারিনি। এক সময় বন্ধু সুমন আর আবিদের সাথে জীবন নিয়ে পরামর্শে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিই।
জীবনসঙ্গী করে ফেলি শোভাকে। সে আমার এক দুর সম্পর্কের কাজিন। ছোটবেলা থেকে দেখেছি ভীষণ রকমের লাজুক ও বিনয়ী মেয়ে। জীবন অনেকটা গুছিয়ে তোলার অধ্যায় শুরু করি। সারাদিনের ব্যস্ততায় সেসব জীবনপাঠ ভুলে যেতে থাকি। চাকরির সময় বাড়ে, তাল মিলিয়ে ব্যস্ততা বাড়ে। তারপরও অফিসের ফাঁকে মিশির খোঁজ নিই। অভাব অনটনে মোটামুটি ইতি ঘটতে থাকে। কিন্তু সংসারের দিন বাড়ার সাথে, বাড়ে মনোমালিন্য। একটু আধটু কথা কাটাকাটি, মান-অভিমান। তেমন বড় ধরনের সমস্যা নয়। তারপরও কেন জানি দিন দিন বড় হতে থাকে। আমিতো অতীত সব ভুলে গেয়েছি। সেসব মনে রাখতে চাই না। শোভা আর মিশিকে নিয়ে সুখময় জীবন পার করতে চাই।
কিন্তু সে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়ায় মেতে ওঠে। এই যেমন ‘অফিসে পৌঁছে ফোন দাও না, যখন ফোন দাও, আমার খোঁজ না নিয়ে বিড়ালের খোঁজ নাও। বাসায় ফিরে আমার সাথে দুয়েক মিনিট না দাঁড়িয়ে, বিড়ালের কাছে চলে যাও। বিড়ালের খাবারের জন্য মরিয়া, কখনো আদর করে বলো না আমি খেয়েছি কিনা। সময় শুধু তার, আমার জীবনের কোনো সময় নেই।’ এমন ছোট ছোট অসংখ্য অভিযোগ। এমন অভিযোগ শুনে হাসব নাকি কাঁদব বুঝে উঠতে পারি না। সারাদিন ফোন দিই রিসিভ করে না। রাতে বাসা ফিরে দেখি, সে কোনো কথা বলছে না। ফোনে টেক্সট করে বলছে, ‘টেবিলে খাবার রেখে দেয়া আছে, খেয়ে নিয়ো। বিড়ালকে খেতে দিয়েছি, তার সমস্যা নেই। তবে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিড়ালকে রুমে রাখলে আমি থাকব না। কালকেই চলে যাব।’
মনটা ভীষণ রকমের খারাপ হয়ে যায়। তার এই অভিমান আহত করে আমার হৃদয়। একবার মনে হয় তাকে চলে যেতে বলি। আমি কি একা থাকতে পারব না? পরক্ষণই আবার মনে হয় এভাবে না বলে, আমরা সমঝোতায় জীবন যাপন করি। ভালোবাসার মানুষটির কাছে ভরসায় বিশ্বাসী হয়ে ওঠি। সে খুব নরম দিলের মানুষ। সহজ ভাবে উপস্থাপন করলে, সে অবশ্যই বুঝবে। সংসারে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হল দুজনের আলাপন। তারপর আমি বলি, ‘শোভা তুমি বোঝার চেষ্টা করো। এই বিড়ালের কাহিনি তুমি জানো। এই বিড়ালের অছিলায় সৃষ্টিকর্তা আমাকে আত্মহত্যার পথ থেকে রক্ষা করেছে। তারপরও এমন করছো কেন?’ সে কোনো জবাব দেয় না। এক পর্যায়ে শোভার সামনে যাই।
তার অভিমান ভাঙ্গানোর জন্য বলি, ‘চোখের দিকে তাকাও। বেঁচে থাকার কসম, তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। বিড়ালকে হিংসে না করে, আমার হয়ে তার পাশে থাকো। তাকে খেতে দাও, তার যত্ন নাও।সারাদিন ইচ্ছে করলে, অবসর সময় তার সাথে কাটিয়ে দিতে পারো। তুমি যদি বলো, কালকে মিশিকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসব, তোমার সিদ্ধান্ত আমি মেনে নেব। কিন্তু আমার ভালোবাসার কাছে হয়ত পরিপূরক থাকবে না। আমার মা-বাবা কেউ নেই। তুমি একমাত্র বেঁচে থাকার প্রেরণা। জীবন পথ চলার সাথী। দুজনের কেন দূরত্ব হবে এই সামান্য বিড়াল পোষা নিয়ে। আমার সাথে অভিমান করলে, কাকে নিয়ে বাঁচব? কার কাছে এসব বেদনার কথা বলব? দূরত্ব দুজনকে শুধু দূরে রাখে না, দুজনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আমি বিচ্ছিন্ন হতে চাই না, তোমার হৃদয়ে আচ্ছন্ন হয়ে থাকতে চাই।’ কথাগুলো বলার পরই শোভা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। আমিও চোখের জল না ফেলে. থাকতে পারিনি। এক পর্যায়ে আমাদের সব অভিমানের ইতি ঘটে।কোনো দিন শোভা ফোন দিয়ে বলবে মিশি আজ খাচ্ছে না, তুমি অফিসে গেছো সেজন্য মিশিতো আমার কাছেই আসছে না, বাসায় ফিরতেই মিশি আজ আমাকে গান শুনিয়েছে, এই শোনো আজ সকালে মিশি আমার নাকের সাথে নাক মিলিয়েছে। এমন অসংখ্য খুনসুটি করে কাটে শোভার।
একসময় আমাদের নবাগত সন্তান হয়। তার সাথেও মিশির বেশ ভালো সময় কাটে। আসলে মিশির কারণে সংসারে সুখের প্রত্যাবর্তন আসে!