মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায়
শান্তিনিকেতন
“সংসারে প্রতিদিন আমরা যে সত্যকে স্বার্থের বিক্ষিপ্ততায় ভুলিয়া থাকি উৎসবের বিশেষ দিনে সেই অখণ্ড সত্যকে স্বীকার করিবার দিন–এইজন্য উৎসবের মধ্যে মিলন চাই। একলার উৎসব হইলে চলে না। ” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বারো মাসে তেরো পার্বণ, বাংলায় উৎসব মানেই এই কথাটি মাথায় আসে। প্রতিদিনের ছোট বড় নানান দুঃখ সুখের কান্নাহাসির দোলদোলানির মধ্যে আমাদের ভরিয়ে রাখে উৎসবের দিনগুলি। বাঙালি অস্তিত্বে উৎসব মানেই মিলন, সেখানে জাত ধর্মের কোনো বাধা নেই। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। এ কথাটাও তো আজ এই উপমহাদেশে একমাত্র বাঙালিই জোর দিয়ে বলতে পারে। কারণ আমাদের গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন একাকী—কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ!”
বাংলায় প্রধান ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি বরাবরই আছে কিছু স্থানভিত্তিক উৎসব, লোকায়ত পরম্পরার কিছু উৎসব, ফসল তোলার উৎসব যেগুলি একান্তই বাঙালির। বাঙালি যে ভূখন্ডেই থাকুন, তার উৎসবের দিন কখনো বিস্মৃত হয় না। এক চিলতে জমিও যার আজ নেই, সেও কিন্তু কৌম স্মৃতি বিজড়িত নবান্নের দিনে অন্নদাতাকে স্মরণ করে। উৎসবের হাত ধরে থাকে মেলা। যার জন্য সারাবছর মানুষ পথ চেয়ে থাকেন। প্রচুর মানুষের রুজি রোজগার জুড়ে আছে উৎসবের সাথে। আবার প্রবাসে সারাবছর যে লোকটি অফিসে কলম পিষে চলেন, তাঁকেই উৎসবের দিনে পুরোহিতের ভূমিকায় দেখা যায়। এ সময় পরিযায়ী মানুষেরা ঘরে ফেরেন, কোথাও বা বোনাস মেলে। যেভাবেই হোক নতুন পোশাক, একটু ভালো খাওয়া, সম্ভব হলে একটু বেড়ানো।
কিন্তু ইদানিং সম্প্রীতির বাংলায় কিছু বিভেদকামী শক্তি ধর্মীয় উৎসবের নামে কোথাও কোথাও বিভেদের আগুন লাগানোর চেষ্টা করছে। এই পৃথিবীর কোনো ধর্ম হিংসাত্মক আক্রমণের কথা বলে না। এই প্ররোচনার বলি হচ্ছেন নিরীহ জনগণ। অন্য জায়গা থেকে আমদানি করা কিছু নতুন ধর্মীয় উৎসব সুকৌশলে চাপানোর চেষ্টা চলছে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এক ধর্মান্ধ বিকারে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি। আর যাই হোক এমন তান্ডবকে উৎসব বলা যায় না। দুর্ভাগ্য যে বাংলায় কোনো কোনো অঞ্চলে এই রামনবমীর নামে নারকীয় উল্লাস এখন আমদানি হয়েছে, সেই বাংলায় একদা কাজী নজরুল ইসলাম রাম নাম নিয়ে সবচেয়ে সুন্দর গানটি লিখেছিলেন। “মন জপ নাম শ্রী রঘুপতি রাম/ নবদূর্বাদলশ্যাম নয়নাভিরাম।” রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিবেকানন্দ, মা সারদা, সুভাষচন্দ্র, চৈতন্য, লালন, হরিচাঁদ, চন্ডীদাস, রোকেয়ার বাংলায় সকলের কাছে অনুরোধ এই বিদ্বেষের রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেবেন না। উৎসবের আনন্দ যেন উগ্র ধর্মান্ধদের হাতে পড়ে কলুষিত না হয়। জয় হোক বাংলার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির।
এই ভাবনা থেকেই দ্বিতীয় বৃত্ত যা দুনিয়া জোড়া বাঙালিকে এক সূত্রে বাঁধার চেষ্টায় প্রকাশিত, তার এই সংখ্যাটি বাংলার উৎসব সংখ্যা। আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের সম্পাদকমন্ডলীর নিরলস প্রচেষ্টায় আমরা দুই বাংলার বহু রকমের উৎসবের খবর পেয়েছি, বিশেষ পাওয়া এখানেই যে অনেক নতুন লেখক, তরুণ প্রজন্মের বন্ধুরা কলম ধরেছেন এই সংখ্যায়। বাংলার ইতিহাস প্রাচীন। এখানে বসবাসকারি আদি বাসিন্দারাও আজ তাঁদের লোকায়ত উৎসবের কথা জানিয়েছেন।আমরা এই বহুত্ববাদী সংস্কৃতির চর্চাকে তুলে ধরতে চাই। সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বজুড়ে।