Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

মিলন ও ভ্রাতৃত্বের শুভ উৎসব 

ভ্যালেন্তিনা অপর্ণা গমেজ

উৎসব মানেই উল্লাস এবং আনন্দ উদযাপন। আর এই উৎসবকে ঘিরেই থাকে বিশাল প্রস্তুতির আমেজ।সবাই এক একটা কাজ বা দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেয় তাই সকল কাজ সময়মত সম্পন্ন হয়।একেক ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন পার্বণ যা আমাদের দেশে সারা বছর আনন্দপূর্ণ আমেজে পূর্ণ রাখে।মুসলমানদের জন্য ঈদ, হিন্দুদের জন্য পূজা আর খ্রিষ্টানদের জন্য ইস্টার এবং খ্রিষ্টমাস। এই সকল অনুষ্ঠান খুব ধুমধামের সাথেই পালিত হয়। এইসব আয়োজনে আত্মীয়-স্বজন বন্ধু বান্ধব ছাড়াও পাড়া প্রতিবেশি সকলেই সম্মিলিত হয়। তৈরি হয় চমৎকার ভ্রাতৃত্ব মিলন মেলা।সবাই আনন্দমুখরতায় ভুলে যায় কে কোন জাত, কে কোন গোষ্ঠীর। ষড়ঋতুর মতই এক একটা মাস একেক রকম উৎসবের আনন্দময় সুবাতাস বয় সারা পাড়াময়।

আসন্ন বড়দিনের প্রস্তুতি আরম্ভ হতে চলেছে খুব শিগগিরই। আলাপ আলোচনা করে কীভাবে সেই আয়োজনকে পরিপূর্ণ করা হবে চলছে তার ধারাবাহিক প্রস্তুতি। একটা উৎসবকে সম্পূর্ণভাবে সাজাতে অনেক মানুষের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। যাদের যেদিকে জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা বেশি থাকে তারা সেইসব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেয়। যেখানে সকলের সহযোগিতা থাকে, সেখানে উৎসব দ্বিগুণ আনন্দে ভরপুর হয়। খ্রীষ্টমাস খৃিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। খ্রীষ্টরাজা যিনি স্বয়ং ঈশ্বর পুত্র হয়েও জন্ম নিয়েছেন দীনবেশে গোয়াল ঘরে।  যিনি এক আশ্চর্য শক্তির অধিকারী হয়েও থেকেছেন সাধারণবেশে, গরীব অসহায়দের মাঝে জীবন অতিবাহিত করেছেন।তাঁর আগমনী সেতো মহা আড়ম্বরের সাথেই পালিত হওয়া উচিত। তবে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন কালচারে তাদের নিজ নিজ স্বকীয়তায় পালিত হয় খৃীষ্টমাস। 

আমাদের গ্রামাঞ্চলে বড়দিনের সময় পুরো মাসব্যাপী প্রস্তুতিপর্ব চলে। পিঠে বানানো, ঘর সাজানো, ক্লাব সাজানো ধর্মপল্লী মানে মিশনের গির্জা ঘর সাজানো,বাচ্চাদের কীর্তন, গ্রামের আলাদা আলাদা গান কনটেস্ট আরো অনেক অনুষ্ঠান থাকে যার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি আবশ্যক। 

প্রথমেই উল্লেখ করছি পিঠে বানানোর বিষয়টা। সে এক চমৎকার পরিবেশ। আত্মীয় স্বজনদের কিংবা পাড়া প্রতিবেশী ছাড়া এ আয়োজন যেন পরিপূর্ণই হয়না। নিজেদের মধ্যে প্রথমে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কে কার বাড়িতে কখন পিঠা বানাবে। আমাদের সময়ে মানে আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখতাম কীভাবে সবার সহযোগিতায় উৎসবের সব কাজ সম্পন্ন হতো। মাসি, কাকি, পিসি সবাই একত্রে মিলেমিশে পিঠে বানাতো।পিঠে বানানোর আগের রাতে নারকেল, গুড়, ময়দা, তেল, কাঠের পিড়ি, নেল, বেলুন এ-সব রেডি করে রাখত। সকাল হতেই তারা বসে যেত পিঠা বানাতে।বিশেষ পিঠাগুলোর মধ্যে ছিল পাকন,কাটাকুলি,সেদ্ধকুলি। পিঠার পাশাপাশি সবার ঘরে কেক বানানো হতো তবে এক এক জনের চয়েস একেক রকম থাকে। প্রায় সবার বাড়িতেই বড় কাঠের পিঁড়ি থাকতো।সেই পিঁড়ির দুই দিকে দুজন বসতো।একজন রুটি বেলতো আরেকজন পিঠার ভেতরে নারকেল গুড়ো ভরে পিঠা কেটে চালনে রাখতো। এই চালনটা হচ্ছে বাঁশের তৈরি গোলাকার।একজন বসতো চুলায়। বড় কড়াইতে তেল গরম করে পিঠা ভাজতো। বেশি করে পিঠা বানানো হতো,শুধু পরিবার আত্মীয় স্বজনদের জন্য নয়, এই পিঠাগুলো ভিক্ষুকদেরও দেওয়া হতো। বড়দিন এলে ঢাক বাজিয়ে বাজনা ওয়ালারাও আসতো পিঠা তুলতে। তাহলে কি পরিমান পিঠা বানাতে হতো। এ জন্যই বোধহয় কথাটা প্রযোজ্য “ধর্ম যার যার উৎসব সবার”। এ যেন আনন্দ সহভাগিতার শুভ সময়। এভাবে পর্যায়ক্রমে চলত পিঠা বানানোর ধুম।আজ পিসির বাড়ি, কাল মাসির বাড়ি,পরশু মামীর বাড়ি। কখনো কখনো প্রতিবেশীরাও আসতো। হৈ হুল্লোড়ে মুখর একটা পরিবেশ। কনকনে শীতের সময় চলত সব কাজ। পাশাপাশি চলত ঘর সাজানো। সেই সময়ে ঘর সাজানোর জন্য এখনকার মত এত চয়েস ছিল না। থাকার মধ্যে ছিল রঙিন কাগজের ঝালর। যেটাকে টিনের সাঁচে কেটে ডিজাইন করা হতো। সবার বাড়ির উঠোনে বড় বাঁশের মাথায় তারা বানিয়ে ঝুলানো হতো ভেতরে বাতি দিয়ে। দূর থেকে রাতের অন্ধকারেও তারাটি দেখা যেত মিটমিট করে জ্বলতো। যীশুর জন্মের উপহার নিয়ে পন্ডিতরা যে তারাটিকে অনুসরণ করেছিল তারই স্মরণে বড়দিনে এই তাঁরা বানানো হয়। 

গ্রামের বাচ্চাদেরকেও কীর্তনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। বড়দিনের পরের দিন থেকে বাচ্চাদের কীর্তনে সারা গ্রাম মেতে ওঠে উল্লাসে। মনে হয় যেন সারা পাড়াতেই অফুরন্ত আনন্দের স্রোত বয়ে যায়। এ আনন্দ যেন কারো একার নয়। সবাই মিলেমিশে সেই মুহূর্তটাকে উপলব্ধি করে। সবার বাড়ির উঠানে গোবরের জলে লেপ দেয়া থাকে, চমৎকার সাজ সজ্জায় বাড়ির আঙ্গিনা নতুন সৌন্দর্যে পূর্ণ হয়। প্রবাস থেকে পরিবারের সাথে আনন্দ করতে ছুটে আসে আত্মীয়রা। গ্রামের মতই শহরেও পালিত হয় বড়দিনের উৎসব। হয়তো গ্রামের মত হয় না তবে ভিন্নভাবে তারাও আনন্দ অনুষ্ঠানে মেতে ওঠে। ঘরে ঘরে পিঠা বানানো হয়, ঘর সাজায়,ক্লাবের ছেলেরা দলবেঁধে কীর্তন করে। ২৪ তারিখ মিড নাইটে সবাই চার্চে যায়। গ্রামে তো সবাই দলবেঁধে হৈ হুল্লোড় করতে করতে একসাথে চার্চে যায়। সেই রাতে চার্চের ভেতরে এবং বাইরে যেন ঝলমল করে আলোতে। খুব চমৎকারভাবে সাজানো হয় চার্চটিকে। এই আলোকিত পরিবেশ সবার মনে এক অকৃত্রিম আনন্দে পরিপূর্ণ করে। পুরো মাস ধরে চলে এ আনন্দ উদযাপন।রবিবারে সকালে চার্চে মিসা (mass) শেষ হলে সবাই সবার সঙ্গে খুশি বিনিময় করে। সবাই যার যার আত্মীয়দের বাসায় বেড়াতে যায়। কেক পিঠা পরিবেশনে আপ্যায়নের কমতি থাকে না। বড়দিন উপলক্ষে বড়দিনের ম্যাগাজিন বের করা হয় বিভিন্ন ক্লাব থেকে আলাদা আলাদা করে। 

বলাবাহুল্য এই উৎসবে শরীক হন আমাদের আশেপাশের সব ধর্মের মানুষ। তাঁরাও নিমন্ত্রিত হন, তাঁরাও আনন্দ করেন একত্রে। খ্রীষ্ট ধর্মের মূল বাণী হলো মিলন ও ভ্রাতিত্ব। প্রতিবেশীকে নিজের মতো করে ভালবাসা। 

মনের সব কালিমা ভুলে একে অপরের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে, দীর্ঘ সময়ের যত ভুল বোঝাবুঝি ক্ষমা করে দিয়ে আবার একত্রিত হবার উত্তম সুযোগ হচ্ছে এই উৎসব। মনের সব ধোঁয়াশা শীতের কুয়াশায় কেটে গিয়ে তৈরি হয় নতুন বন্ধন।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x