রাশেদ রউফ
ঢাকা, বাংলাদেশ
_____
১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিদ্যালয়টি ‘পাঠভবন’ নামে পরিচিত। প্রাথমিক পর্বে অত্যন্ত ছোট্ট পরিসরে প্রতিষ্ঠানটির সূচনা হলেও বর্তমানে এ এক সুপ্রতিষ্ঠিত ও প্রাচীন বিদ্যালয়। পুরো পশ্চিমবঙ্গের বহু শিক্ষার্থী এখানে প্রতিবছর ভর্তি হয়। মাত্র পাঁচ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে শুরু করেছিলেন এই বিদ্যালয়। কিন্তু এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল কবির? এ বিষয়ে নানা গুণীর নানা মত। কেউ বলেন ‘তৎকালীন শাসকদের তৈরি স্কুলে তাঁর নিজের যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা একটা কারণ’। আবার কেউ কেউ বলেন ‘বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে কবির আপন সন্তানদের শিক্ষিত করার ভাবনা নিহিত ছিল’। কেউ বলেন, ‘স্কুল শিক্ষার ক্ষেত্রে দূরদর্শী রবীন্দ্রনাথ একটি আদর্শ স্থাপনে উৎসাহী ছিলেন’। সমস্ত মত ও ব্যাখ্যার মধ্যে হয়তো কিছু সত্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ ছোটোদের বড় করে তুলতে চেয়েছেন নিজের মনের মতো করে। ‘আশ্চর্য মানুষ রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে ঠাকুরবাড়ির বধূ হেমলতা দেবী লিখেছেন :
‘প্রথমেই স্বীকার করি কবিকে শিক্ষাব্রতী রূপে। শিক্ষাগুরু রূপেই আমরা তাঁকে প্রথম পেয়েছি। তিনি শুধু আমাদের শিক্ষাগুরু নন, বহুজনের। তাঁর গুরুগিরি পাঠ মুখস্থ করিয়ে বিদ্যা গিলিয়ে শিক্ষার্থীকে বুলি আওড়ানো তোতাপাখি করে তোলা নয়। নিজের সচেতন মন দিয়ে অন্যের মনকে জাগিয়ে তোলার সোনার কাঠি ছিল কবির অবচেতনার মধ্যে। যার মনকে তিনি স্পর্শ করতেন তার অবচেতনায় সাড়া জাগত। এক কথায় কবিকে মন জাগানো গুরু বলা যেতে পারে। এ ব্যাপারে তাঁর আরও একটু নূতনতর বিশেষত্ব ছিল। শিশু, বালক, বৃদ্ধা, যুবা, সকলের মনে সাড়া জাগিয়ে তুলতে পারতেন তিনি তার মনের মতো হয়ে। গোড়ায় ধরা যাক শিশুদের মনের কথা ফোটানো নিয়ে। শুধু শিশু বইখানি লিখে তিনি শিশুদের মনের খোরাক জোগান নি – কত ভালোবাসা দিয়ে তিনি তাদের মনকে গড়ে তুলেছিলেন যারা তাঁর শিক্ষালয়ের শিশুদের প্রতি ব্যবহার দেখেছে তারাই তা জানে।’
কবি চেয়েছিলেন পাঠভবন প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদর্শে উজ্জীবিত হোক। নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির কোলে আশ্রয় নিয়ে পরিবার সুলভ পরিবেশে শিক্ষাগ্রহণই ছিল মূল লক্ষ্য। শান্তিনিকেতন এমন এক জায়গা, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি মিলে একাকার। এখানে প্রতিষ্ঠিত পাঠভবনের শিক্ষার্থীরা প্রতিটি ঋতুর রূপ-বৈচিত্র্যকে অনুভব করতে পারত। সেখানে রোদ নামতো, বৃষ্টি নামতো, চাঁদ নামত। শিশুরা রোদে পুড়তে পারত, ভিজতে পারত বৃষ্টিতে, চাঁদনী রাতে জোছনা খেতে পারত মন ভরে। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষাকে কখনো পেশাগত এবং আরামদায়ক জীবনের লক্ষ্য হিসেবে মনে করেন নি। তাই বিদ্যালয়ের পাঠ্য বিষয়গুলির সাথে সাথে যুক্ত করেছিলেন সংগীত, নৃত্য ও খেলাধুলা। শিক্ষাকে তিনি ব্যক্তির বুদ্ধি, সংবেদনশীলতা ও শারীরিক ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে স্বতন্ত্র প্রতিভার বিকাশ হিসেবে উপলব্ধি করেছেন। তিনি মনে করতেন শিক্ষায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনো স্থানে নেই, শিক্ষাগ্রহণে কোনো আপসও নেই, আনন্দ-অনুভূতির মধ্য দিয়েই প্রকৃত শিক্ষা আহরণ সম্ভব। তিনি লিখেছিলেন:
‘আকাক্সক্ষার বাতাবরণে আমি বড় হয়েছিলাম – মনুষ্য প্রবৃত্তির বিস্তারের আকাক্সক্ষা। বাড়িতে মাতৃভাষায় আমাদের শক্তির স্বাধীনতা ছিল, সাহিত্যে কল্পনার স্বাধীনতা ছিল, ধর্মাচরণে আত্মার স্বাধীনতা ছিল, আর সামাজিক বাতাবরণে চিত্তের স্বাধীনতা ছিল। এভাবেই শিক্ষার শক্তির উপর আমার আত্মবিশ্বাস দেখা দিয়েছিল। যা জীবন তাই বাস্তব, শিক্ষা স্বাধীনতার ধারাবহ। মানব জগতের জন্য যা সব থেকে প্রযোজনীয় তা হল বিশ্বজগতের মাঝে নৈতিক যোগাযোগের স্বাধীনতা।’
শিক্ষা জানার ক্ষেত্রে এমন সুযোগ আনে, ‘যার ফলে মানুষ ও প্রকৃতি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, সাহিত্য ও চারুকলার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন’ সম্ভব হয়। পাঠভবনে অধ্যয়নরত শিশুদের যত্ন করতে চেয়েছেন কবি প্রাণ ভরে। যেখানে নিজের হাতে নাওয়াতে খাওয়াতে পারতেন না, সেখানে প্রতিমুহূর্তে ‘মাতৃজাতির অভাব’ অনুভব করতেন গভীরভাবে। শিশুরা তাদের মনের কথা সবসময় ব্যক্ত করতে পারে না। কিন্তু কবি এই অব্যক্ত কথাগুলো আবিষ্কার করতে পারতেন এবং ‘খুঁজে পেতেন তাদের মনের ভাষা’। কেউ যদি শিশুদের আদর করতেন, স্নেহ দিতেন, তখন কবি খুব খুশি হতেন। এক আত্মীয়কে লেখা কবির এক চিঠির বক্তব্যে তা স্পষ্ট প্রত্যক্ষ করি আমরা। তিনি লিখছেন:
‘ছেলেদের যত্ন করিতেছেন ও বিদ্যালয়ের জন্য চিন্তা করিতেছেন আপনার পত্রে এই সংবাদ পাইয়া আমি অত্যন্ত আনন্দ লাভ করিলাম। তাঁহাকে আমার আশীর্বাদ জানাইবেন’।
রবীন্দ্রনাথের মন ছিল মাতৃস্নেহে ভরা। শান্তিনিকেতনে বসবসাকালে বর্ষায় অজস্র বৃষ্টিধারার মধ্যে কবি ছাতা মাথায় বেরিয়ে যেতেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবস্থা দেখার জন্য।
সেই সময় আশ্রমের ছাত্রদের বাসঘরগুলো ছিল কাঁচা, খড়ের তৈরি। বৃষ্টিতে ছাত্রদের বিছানাপত্র, বই-পুস্তক, কাপড়-চোপড়-কোনোকিছু ভিজছে কিনা, তা দেখার জন্য অস্থির থাকতেন তিনি। যখন দেখতেন সবকিছু ঠিক আছে, সবাই ঘুমিয়ে আছে ভালভাবে, তখন তিনি নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফিরেন। শিশুদের যত্ন-আত্তির ব্যাপারে তিনি যে কত সচেতন ও আন্তরিক, তা বোঝা যাবে আরেকটা চিঠিতে। ব্রহ্মচর্যাশ্রমের গোড়ার দিকে সেই সময়ের আশ্রম-অধ্যক্ষকে তিনি লিখেছিলেন :
‘তীব্র শীতের হাওয়া বহিতে আরম্ভ করিয়াছে, এই সময়ে ছেলেদের স্বাস্থ্যের প্রতি একটু বিশেষ সতর্ক হইবেন। স্নানের সময় আপনারা কেহ উপস্থিত থাকিয়া ইহাই দেখিবেন যে স্নানের সময় তেল মাখিতে জল ঢালিতে কেহ যেন অনাবশ্যক বিলম্ব না করে। তেলটা খোলা হাওয়ায় না মাখিয়া ঘরে মাখিলেই ভালো হয়। সেই সময় ভালো করিয়া যেন গা ঘসে। এমন করিয়া গা ঘসা আবশ্যক যাহাতে কিছু পরিশ্রম ও শরীরে উত্তাপ সঞ্চার হয়। তাহার পরে দ্রুত আসিয়া জল ঢালিয়া খসখসে তোয়ালে দিয়া গা বেশ করিয়া ঘসিয়া ফেলে। উপাসনার বস্ত্রের সঙ্গে একটা গরম কাপড় পরা বিশেষ দরকার। স্নানের পর ঠাণ্ডা লাগানো কোনোমতেই হিতকর নয় ছেলেদের সর্দি হইলেই পায়ের তলোয় গরম সর্ষের তেল মালিশ করানো উচিত।’
শান্তিনিকেতনে বিকেল বেলা ছিল শুধু খেলার জন্য। প্রকৃতি পাঠ ছিল পাঠক্রমের অঙ্গ। চমৎকার পরিবেশে আম ও অন্যান্য রসাল ফলের গাছের ছায়ায় শিক্ষার্থীরা গুরুর কাছ থেকে শিক্ষা নিত। ক্লাসেও নিজ নিজ ভাবনার প্রকাশকে উৎসাহ দেওয়া হত। এই ছেলেগুলোই ছিল তাঁর প্রাণ। শেষ বয়সেও কবি শিশুদের সান্নিধ্যে থাকতে চেয়েছেন, চেয়েছেন তাদের সঙ্গে বাকি জীবনটুকু উপলব্ধি করতে। হেমলতা দেবীর স্মৃতিচারণে এর আভাষ পাওয়া যায় : ‘অশীতিপর বৃদ্ধ কবি শিশুদের মধ্যে থাকার জন্যে কতখানি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এই ঘটনায় সেটি প্রকাশ পেয়েছে। শেষ জীবনে দেহলীতে বাসের জন্য কবির কী ইচ্ছা! তাঁর ‘দেহলী’ বাড়িটিতে আমরা তখন বাস করছি। আমাদের কাছে বাড়ির চাবি চেয়ে নিয়ে এলেন নিশ্চয় দেহলীতে থাকবেন ভেবে। ঠাট্টা করে বললেন, মুনীশ্বর (দিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় ভৃত্য) লাঠি নিয়ে তাড়া করবে না তো আমাকে? দাও বাপু কিছুদিনের জন্য দেহলীটি আমাকে ধার। বললুম, দেহলী তো আপনারই – আমাদের আবার কবে হলো? আপনার বাড়ি আপনি থাকবেন – তার আবার বলার কী আছে? দেহলীতে থাকবেন, যখন ইচ্ছা শিশুদের দেখবেন, যখন ইচ্ছা তাদের ডাকবেন এই ছিল তাঁর অভিপ্রায়। বললেন, ‘শিশুদের আমি আবার পড়াব পূর্বের মতো – তাদের শেখানো আমার শেষ হয়নি।’ আরও বললেন- শিশুরা তো মনের কথা ফুটে বলতে পারে না, আমার কাছে যখন ইচ্ছা আসতে পারে না – তাই আমাকেই তাদের কাছে যেতে হবে। দেহলীতে বাস করা তাঁর পক্ষে এখন সম্ভব নয় আমরা জানতুম, কিন্তু এতটা চাওয়ার উপর কোনো কথা বলা চলে না ভেবে নিরস্ত হতে হলো। পাশে বসা একজন বলল, দেহলীর যে সিঁড়ি- ওঠানামা আপনার কর্ম নয়। কবি বললেন, নাইবা নামলুম – একবার উঠব আর নামব না।’
এখানে কবি রবীন্দ্রনাথের দরদী মনের আরেকটা পরিচয় আমরা পাই। ছোটোদের আপনজন হিসেবে, তাঁর কোনো তুলনা নেই। তিনি তাঁর সৃষ্টির মাঝে ছোটোদের যেমন বড় করে তুলেছেন, তেমনি জীবনের কঠোর বাস্তবতায়ও। তিনি ছোটোদের ভেতরে জাগিয়ে তুলেছেন শুভবোধ, ঢেলে দিয়েছেন প্রগতির আলো।
______
এই লেখাটি আমি আমার শান্তিনিকেতনের বাসিন্দা এবং বিশ্বভারতীর বন্ধু বান্ধবীদের সঙ্গে শেয়ার করছি। আজকের দিনে এই লেখার গুরুত্ব অসীম।