ফিরোজ অনীক
মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
‘পাগলটার খুব বাড় বেড়েছে। ওর বেয়াড়াপনার শায়েস্তা দরকার। একটা জেল খাটা আসামির এত বাড় বাড়ন্ত? আমাদের সম্মান-টম্মান তো কিছু আছে নাকি?’ জেলা পরিষদের সভাধিপতি বলছিলেন।
‘কী হয়েছে? আবার আপনাকে ধরেছিল নাকি? ঐ বাঁশতলা দিয়ে না গিয়ে ঘুরে যান না কেন? জানেন তো … ‘ – – মাঠ পাড়ার পঞ্চায়েত প্রধান জাব্বার আলি বিরক্তি প্রকাশ করলেন।
‘আর বলবেন না চাচা, ওর ভয়ে আমি মাস্টারের বাড়ির রাস্তা ধরার চেষ্টাও করি না। ডাইরেক্ট কাঁচা খিস্তি দেয়। আপনি জানেন, কতটা ঘুরে রোড রাস্তায় যেতে হয়। তবুও যাই। কেন বলুন তো? ওকে এড়ানোর জন্য।’
‘লোকটা কেমন যেন হয়ে গেল। সত্তরের দশকে দেখেছি। কাঁচা পাকা খোঁচাখোঁচা দাড়ি। গম্ভীর মুখ। অসম্ভব ব্যক্তিত্বশালী। তখন কংগ্রেস সরকার। আমরা সবে কলেজে গেছি। ওই তখনই দেখেছিলাম তাকে ।জেলে যেতে হয়েছিল। বারো না চৌদ্দ মাস জেলও খেটেছিল। নকশাল টকশাল করত। মানুষ খুন করা নাকি ওদের কাজ ছিল। জেল থেকে বের হতে হতে শাসক বদলে গেল। লোকটা সময় সময় শান্ত হয়ে যায়। অদ্ভুত লোক।’ চিন্তান্বিত জাব্বার আলি বলেন।
এইতো কদিন আগের ঘটনা, সুরুজ্জামান শেখকে ধরেছিল রাস্তায়। পিরতলা ব্রিজের উপর। তেড়ে-ফুড়ে গালি দিয়ে নিলেন প্রথমে। লোক জুটে গেছে। মাস্টার সমানেই চেঁচিয়ে যাচ্ছন, ‘ এম এল এর আত্মীয়। সবাই জানে চাকরি চোর। তোর ছেলেকে চাকরি করে দিয়েছিস। ভড়ং মারিয়ে বেড়াস। সমাজসেবী হয়েছিস! মাজারের সেক্রেটারি হয়েছিস। স্টেশনের উন্নয়ন কমিটির নেতা হয়েছিস। শালা আবার সাংবাদিকের সামনে বলে ‘এডুকেশন’ ব্যাপারটা বোঝেনা। তুই বুঝিস না। ভন্ড! ধুরন্ধর! শয়তান! বদমাইশ। তোরা সবাই মিলিজুলি করেই এডুকেশনটার দফারফা করে দিলি। তোর ঘাড়ে মুতি । তোর চৌদ্দ পুরুষের মুখে মুতি ! শুয়োরের বাচ্চা! ধর তো রে! ওকে জবাই করব!’
শালা! বদলা নয়, বদল চাই! তোর বাপ চাই! তোর মা চাই! সিন্ডিকেট চাই! জমি চাই! স্কুল চাই! চাকরি চাই! সব দখল চাই।’
সাইকেল ফেলে দ্রুত পায়ে হাঁটা শুরু করেন এলাকার বিশিষ্ট সমাজ সেবী নুরুজ্জামান। অল্প একটু হেঁটেই মরি বাঁচি করে দৌড় লাগান।
আজিজুল মাস্টারও গাল পাড়তে পাড়তে উল্টো দিকের রাস্তা ধরে দৌড়াতে শুরু করল।
চায়ের দোকান এবং বাজারে আশপাশের সমস্ত লোক জড়ো হয়েছে। দুধার থেকে তামাশা দেখছিল।
নুরুজ্জামান চলে যেতে, ঠোঁটকাটা খয়ের মিস্ত্রি বলে উঠলো, ‘মাস্টার চাচাতো ভুল কিছু বুলছে না।’
ফতেপুর মাদ্রাসার বজলু হাফিজ বললেন, ‘লোকটা বড্ড বেহায়া । এভাবে মানুষকে গালাগাল করে। নাউজুবিল্লাহ!’
চায়ের দোকানী মাজবর চাচা হুঙ্কার ছাড়েন, ‘রাখেন আপনার নাউজুবিল্লাহ। আপনি কী জানেন আজিজুল ভাই সম্পর্কে? আমার দোকানে সপ্তাহে কমপক্ষে একবার তো আসেন! এত ভাল মানুষ আপনি রাজ্যে খুঁজে পাবেন না। সমাজের কোন অন্যায়ের প্রতিকার -প্রতিবাদ আপনি করেছেন বলতে পারেন, নাউজুবিল্লাহ আর সুবহানাল্লাহ ছাড়া! যান সবাই। কাজে অকাজে বেরিয়ে পড়েন।’
ভিড় ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে যায়। পথ চলতি মানুষ যে যার কাজে বেরিয়ে পড়ে।
আজিজুল মাস্টার। অদ্ভুত লোক।
কেন অদ্ভুত? কেমন অদ্ভুত? এই লোকটি কে?
লোকটা আজিজুল মাস্টার। গ্রামের সকলে মাস্টার চাচা বলে ডাকেন।মাস্টারের বয়স আর বাড়ে না। শোনা যায় জেল খেটে আসার পর থেকে গ্রামের এ মাথা থেকে ও মাথা চিৎকার করে বেড়াতেন,
বলতেন,
‘তোরা করেছিস সিঁড়ি
রক্ত! রক্ত! রক্ত গঙ্গা
জীবনের গড়াগড়ি।
শ্রমিকের ঘামে পার্টির কামে
বিকোয় মানুষ ক্ষমতার দামে,
আমাদের বুকে মেরিছিস ছুরি!
কমিউনিস্ট না! মিছরির ছুরি!’
তারপর দিতেন দৌড়।
ছুটতে ছুটতে গাছতলায় গিয়ে শুয়ে পড়তেন। মাঝে মাঝে একা একা বক্তৃতা করেন। কখনও কখনও লোকজন জড়ো করে স্মৃতি চারণ করেন।
গফুর মিঞা তাঁরই সমবয়সী, পাটের জমি নিড়ানি দিতে দিতে ছায়ায় জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। বললেন, ‘বড় ভাই এমন করেন কেন? আপনি শান্ত হন।আপনার কথা কেউ বুঝবে না। তিনকাল গেছে। আর কিছুটা সহ্য করুন। অযথা শরীরটাকে নষ্ট করছেন।’
মাষ্টার চাচার দুই চোখ বেয়ে গল গল করে জল গড়িয়ে পড়ল। খুবই শান্তকন্ঠে বললেন, ‘ আমরা তো মানুষ খুন করিনি। শোষক-শোষিত চিনিয়ে দিয়েছি। চিনেছি। মানুষ খুন করে আমাদের বদনাম করা হলো। আমাদের নামে ‘কংসাল’রা করেছে এসব। মানুষকে বিদ্বিষ্ট করা হল আমাদের বিরুদ্ধে। ফাঁক গলে বাস্তু ঘুঘুটা আমাদের রক্ত ঘাম উজাড় করে গড়ে তোলা আন্দোলনের প্রতিটি কণাকে হাইজ্যাক করে ক্ষমতা দখল করল। তিন দশক, হ্যাঁ হ্যাঁ, তিন দশক ধরে কমিউনিস্ট আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এরা, এই ক্ষমতা লোভী কমিউনিস্ট পার্টি। জন্মলগ্নের পাপের চিহ্ন বুকে নিয়ে আকাশে বাতাসে জলে স্হলে সমাধি হয়েছে এদের। তবু দম্ভ কত!’
তিড়িং করে লাফিয়ে ওঠেন মাস্টার। উচ্চস্বরে আবৃত্তি করতে করতে দৌড়তে থাকেন,
‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল
আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়্গ-কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত…’
ইনি পূর্ব বঙ্গের রাজশাহী থেকে চলে আসেন আটষট্টি সালের শেষ দিকে।উদ্বাস্তু হয়ে নয়, উনি নাকি বুঝতে পেরেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে থেকে কোনো আন্দোলন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনেও লড়াই করেছেন তিনি। শিক্ষকতা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ভাল বক্তৃতা দিতে পারতেন শোনা যায়। কয়েকটা বইও আছে তাঁর লেখা। এখন বদ্ধ উন্মাদ। কিন্তু রেডিও শোনেন মন দিয়ে। সেই পুরনো আমলের একটা রেডিও কাঁধে ঘুরে বেড়ান।
পর পর দুদিনের দুটো ঘটনা বেশ চমকপ্রদ। রুলিং পার্টির এক পরিষদীয় সদস্য পঞ্চায়েত এলাকার খোলা মাঠে বক্তব্য রাখছিলেন। আজিজুল মাস্টার যে কখন সভায় এসে মঞ্চের উপর উঠে পড়েছেন কেউ খেয়াল করেনি।
মঞ্চে তখন বক্তব্য চলছে – ‘আমাদের সরকার জনগণের সরকার, দুর্নীতি আমাদের কাজ নয়, আমাদের নেত্রী সততায় বিশ্বাস করে, আমরাও সত… ‘—কথা শেষ হবার আগেই সপাটে গালে থাপ্পড় পড়ে নেত্রীর। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মঞ্চের মাইক কেড়ে নেন – আজিজুল মাস্টার। মুখ বিকৃতকরে বলে ওঠেন – -” চোরের মায়ের বড় গলা, শালি ইইই…। বেকারত্বের হাহাকার তোদের চোখে পড়ে না? লুম্পেন গুলো কোথাকার! মানুষকে ডোল দিয়ে ভোট কিনিস?’
কথা শেষ হবার আগেই নিমেষে মঞ্চের আশপাশের নেতারা লাফিয়ে ধরে ফেলেন আজিজুল মাস্টারের সাদা ছেঁড়া পাঞ্জাবী। কিল চড় লাথি ঘুষিতে অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারান আজিজুল মাস্টার। পুলিশ এসে ওকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়।
নেত্রী মারের ধাক্কা সামলে ফের মাইক ধরেছেন। ‘এই যে দেখুন বিরোধী দলের চক্রান্ত। আমার জীবন সংশয়। আজ আপনারা না থাকলে এই সন্ত্রাসী আমাকে মেরেই ফেলত। প্রশাসনিক তৎপরতায় আমি বেঁচে গেলাম। মাওবাদী কিষেণের লোক না, কে এ? নাকি নকশালের ভূত? পুলিশ ঠিক খুঁজে বের করবে। নিশ্চয়ই এদের গভীর চক্রান্ত। না এরা জীবন্ত জীবাশ্ম। নকশাল গুলো এখনও আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। কবেই তো মায়ের ভোগে চলে গেছে। তবু ওদের তেজ কমেনি।’
কাঁপতে কাঁপতে রাগে গরগর করতে থাকেন ডাকসাইটে জেলানেত্রী, ‘ প্রশাসনকে বলব এরকম মাতাল লম্পট দেশদ্রোহীর বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে।’
দিন কয়েক পর চায়ের দোকানে, পাড়ার মোড়ে মোড়ে গুঞ্জন চলছিল। এই সরকারও মাস্টার চাচাকে ছাড়ল না। সবাই বলছে পুলিশ পিটিয়ে মেরে দিয়েছে মাস্টার চাচাকে।
যেদিন নিয়ে গেল পুলিশ তার তিন দিন পরে লকাপে মারা যান আজিজুল মাস্টার।
তিনদিন ছিলেন লকাপে? এত সময়? কীভাবে? এই প্রশ্ন কে করবে? পাগলের তো কোনো দল হয় না। লাশ নেওয়ার কোনো লোক ছিল না। পোস্ট মর্টেম ঘর থেকেই লাশের পোস্ট মর্টেমের পর আজিজুল মাস্টারের দেহকে কুঁয়োতে ফেলে দেওয়া হয়। চিরতরে একটা অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হয়।
বেশ কিছুদিন পরে থানায় পৌঁছান মরিয়ম খাতুন। আজিজুল মাস্টারের সহধর্মিণী। অসুস্থ শরীরে তাঁর । তবুও অনেক কষ্টে এসেছেন। ওসি নেই। একটি বেঞ্চের এক কোণে চুপচাপ বসেছিলেন তিনি। তার এই জীবনে, বহুথানা পুলিশ সয়েছেন। অকথা কুকথা কত কিছু বলেছেন এই আইন রক্ষকরা। সে অন্য জামানা। তিন যুগের আখ্যান। ওসি তার ঘরে ঢুকতেই ধীরে ধীরে ওসির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন মরিয়ম ।
ওসি কিছু জানতে চাওয়ার আগেই বলিষ্ঠ কন্ঠে তিনি বলতে শুরু করলেন,
‘স্যার লোকটাকে মেরেই ফেললেন?’
থানার বড়বাবু কিছুই বললেন না। মিটিমিটি হাসছেন। সেন্ট্রিকে ডাকদিলেন।
বৃদ্ধা বললেন, ‘যাক, ভালোই করেছেন। আপনাদেরও ঝামেলা কমে গেল।’
চোখের কোণে জল গড়িয়ে পড়ছে। সামলাতে পারলেন না, হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন,
‘বিচারের আশা করি না। সবই তার ইশারা। স্যার ভালো করেছেন। ভালো করেছেন… বিকেলের শেষ রোদ হারিয়ে গেছে…।’ বলতে বলতে ধপ করে বসে পড়লেন। তারপর ঘাড় কাত হয়ে এলো। জ্ঞান হারালেন। ওসির নির্দেশে তার চোখে মুখে জলের ছিটা দিতেই চোখ খুললেন, ‘ স্যার উনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। মানুষটাকে আপনারা মেরে ফেললেন। এত ভয় আপনাদের? করেছেন…’ ফের চোখ বন্ধ হল। আর জলের ছিটায় কাজ হয়নি।
তিনিও বিদায় নিলেন চিরতরে। ঠিক তখনই পশ্চিম আকাশ লাল রেখে দিয়ে সূর্য ডুবে গেল।