জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
হাজার বছরেরও আগের কথা,
যখন বঙ্গদেশের ভাষায় ছিল পবিত্র নিরবতা,
চর্যাপদ এর স্বপ্নভূমি ছুঁয়ে কবিতা হেঁটে বেড়াতো নদীর তীরে,
সবুজে ঘেরা জনপদে, মানুষের মুখে মুখে।
ঠিক তখনই—
একজন ভিক্ষু, এক কবি, এক যাত্রী
গ্রাম থেকে গ্রামে, নগর থেকে নগরে
পদ্য লিখে ফিরতেন, মগ্ন থাকতেন সৃজনের আনন্দে।
তিনি বঙ্গীয়, তিনি থের, তিনি বঙ্গীশ—
ভগবান বুদ্ধের আশ্চর্য সেই শিষ্য,
যিনি শুনতেন ধর্মকথা, আর গাঁথাকারে তা লিপিবদ্ধ করতেন।
যেন শব্দ নিজেই গড়ে তুলতো অভিজ্ঞতার এক মায়াবী মিনার।
তিনি বলতেন—
“যে বাক্যের দ্বারা নিজেকে অনুতাপ করতে হয় না, অন্যের প্রতি হিংসার প্রকাশ হয় না, সেরূপ বাক্যই সুভাষিত বাক্য।
যে কথা অন্যকে ক্লেশ দেয় না, যা শুনতে প্রিয় ও অন্যের দ্বারা নন্দিত, তাই অমৃত।
সত্যই সনাতন। সত্যের মধ্যেই ধর্ম অর্থ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত।
বুদ্ধ তাকে বলেছিলেন— পটিভান কবি। অর্থাৎ সেই কবি, যিনি তাৎক্ষণিক সত্যকে, পদ্যে রূপ দেন।
যা, জ্বলন্ত প্রদীপের মতন স্পষ্ট, উজ্জ্বল, সংবেদনশীল।
প্রথম জীবনে বঙ্গীশ এর ছিল এক বিরল গুণাবলী,
তিনি কোনো মানুষের খুলি দেখে বলে দিতে পারতেন তার পুনর্জন্মের ঠিকানা।
একদিন, তার সাথে হয় ভগবান বুদ্ধের সাক্ষাৎ । বুদ্ধ প্রদত্ত,
এক মৃত মানুষের খুলি হাতে—
তিনি নির্ণয় করতে চাইলেন তার নতুন জন্মের ঠিকানা।
তবে সে ছিল একজন অরহত,
আর অরহতের সুকৃতির ফলে হয় না, কোনো পুনর্জন্ম।
সেই প্রথম, বঙ্গীশ থের বুঝলেন—
জ্ঞান যেখানে থামে, বোধের অভিযাত্রা সেখান থেকে শুরু ।
সকল অহংকার ভুলে ভগবান তথাগতের কাছে সমর্পণ করেন নিজেকে।
সেই দিন থেকেই তিনি আর শুধুই কবি নন,
তিনি পথিক—মুক্তির পথে এক অগ্রণী প্রাণ।
যতদূর চোখ যায়, তিনি কেবল নিজের ছায়াকেই অনুসরণ করতেন,
যেন আত্মার গভীরতাকে ছুঁয়ে ফেরা একজন শব্দসাধক।
বঙ্গীশ লিখেছিলেন—
“আমি কামরাগে দগ্ধ হচ্ছি,
ওগো আনন্দ, আমায় রক্ষা করো!”
সেই দহন থেকে, ধ্যান তাঁকে মুক্ত করেছিল,
তাঁকে করেছিল অরহত, করেছিল অন্তর্মুখী দীপ্তিময় এক কবি।
তিনি বলতেন—
“কাব্যে মত্ত ছিলাম একদিন, অহংকারও জেগে উঠেছিল,
তবু লিখে গেছি নিজেকে সতর্ক করে—
অহংকারের পথ প্রেমকেও ভাঙে।
সেই পথে অনেকেই চিরকাল অনুতপ্ত হয়।”
অপাদান গ্রন্থ বলছে – বঙ্গের ইশ বা মহাপুরুষ বঙ্গীশ এর কবিতা ছিল আয়নার মতো—
যেখানে শুধু অন্যের মুখ নয়,
নিজের দ্বিধা, দুর্বলতা, দহন, দৃষ্টিকোন—সব হতো স্পষ্ট।
তাঁর কবিতা ছিল আত্মজিজ্ঞাসার আলো,
যার ছায়াতেও ছিল মুক্তির প্রশান্তি।
আজ, হাজার বছর পর—
যখন বঙ্গদেশে অগণিত কবির লেখনি বয়ে চলে,
আমরা হয়তো ভুলে যাই—
ভারতবর্ষের কোনো এক প্রাচীন জনপদে বৃষ্টিভেজা দিনে একজন বাঙালি কবি পালি ভাষায় লিখেছিলেন —
শব্দই মুক্তি, বাক্যই বোধি।
আর সেই কবিতাই হয়ে উঠেছে অমলিন এক আলোকবর্তিকা।
ঋদ্ধ পরম্পরার নান্দনিক অভিজ্ঞান।
ভালোবাসার মানবিক দর্পণ।