আজমল হুসেন
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
_____
আমরা আজ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক বিভেদকে হাতিয়ার করে বাঙালি সমাজকে বিভাজিত করে রাখার এক ভয়ঙ্কর অপচেষ্টা চলছে। ভারত ও বাংলাদেশে গরিব ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু বাঙালির উপর প্রতিনিয়ত নির্যাতন চালাচ্ছে উভয় দেশের মৌলবাদী শাসক। দুটো দেশেই বাঙালির বিরুদ্ধে বাঙালিকে লড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে, এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই অপচেষ্টা কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফল হতেও দেখা যাচ্ছে। এভাবে দুটো দেশেই আমাদের অসাম্প্রদায়িকতার ঐতিহ্য আজ এক সংকটের মুখে।
এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো আমাদের আশু কর্তব্য। বাঙালির উপর, বাঙালিয়ানার উপর এই আক্রমণ প্রতিহত করতে হলে কেবল এই দুটো দেশেরই নয়, বিশ্বব্যাপী সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা সুস্থ চিন্তাধারার সমমনস্ক অসাম্প্রদায়িক বাঙালির একত্রিত হয়ে কাজ করা সময়ের দাবি। সেই দাবি পূরণের উদ্দেশ্য নিয়েই আমরা — অসাম্প্রদায়িক সমমনস্ক শান্তিকামী বাঙালিরা — পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একত্রিত হয়েছি এই দ্বিতীয় বৃত্তে।
প্রকৃত বাঙালি বলতে আমরা তাঁদেরকেই বুঝি, যাঁদের আছে আকাশের মতো উদার মন। যে মন দেশপ্রেমের নামে কখনো দেশে বিদেশে কাঁটাতার-সর্বস্ব দ্বেষ-বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দিতে চায় না। যে মন সকল সম্প্রদায়ের সরল ধর্মপ্রাণ মানুষকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে দেখতে চায়। যে মন ধর্মের নামে ধর্মান্ধতা কিংবা সাম্প্রদায়িক হিংসা-বিদ্বেষের মতো অধর্মকে প্রশ্রয় দেয় না। পক্ষান্তরে সীমান্তের এপার থেকে ওপারে, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অপার উদারতায় সবার সঙ্গে একাত্ম হতে শেখায়, সবাইকে আপন করে নিতে চায়, সবার আপনজন হয়ে থাকতে চায় সেই মন।
আমাদের অতি পরিচিত এক বাঙালি হিন্দু শিক্ষক তাঁর প্রাণপ্রিয় বাঙালি মুসলমান ছাত্রের অপেক্ষায় থাকেন খ্রীষ্টানদের উৎসব বড়দিনের ছুটির আনন্দ একত্রে উপভোগ করবেন বলে। এরকম শান্তিপূর্ণ সহমর্মী সহাবস্থানের ধারক-বাহক আমাদের বাঙালিয়ানা। এই বাঙালিয়ানার বলে বলীয়ান আমাদের হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথের বিশ্ব-মানবতা, চিন্তা-চেতনায় নজরুলের সাম্যবাদ আর হাজার বছরের পথ চলায় জীবনানন্দের জীবনবোধ সহ আরও অগণন বাঙালি মনিষীর মূল্যবান মতাদর্শ ও তাঁদের জীবন দর্শনের ইতিবাচকতা একত্রে অবস্থান করে। হাজার অশুভ শক্তি আমাদের চলার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালেও এই বাঙালিয়ানাকে আগলে রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর।
যে বাঙালিয়ানায় ফিরোজা বেগম আর ফেরদৌস আরার সুরেলা কণ্ঠে শ্যামাসঙ্গীত বিশ্বব্যাপী মুগ্ধতা ছড়ায়, সেই বাঙালিয়ানাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইকে আরও শক্তিশালী করতে এই দ্বিতীয় বৃত্ত। এই বাঙালিয়ানা নিয়েই কাদেরী কিবরিয়ার মধুর কণ্ঠে আমরা শুনি পূজা পর্যায়ের রবীন্দ্রসঙ্গীত – ‘সুন্দর বটে তব অঙ্গদখানি, তারায় তারায় খচিত’। এই বাঙালিয়ানাতেই সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুধাময় কণ্ঠ গেয়ে ওঠে, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ…’। বরেণ্য সব বাঙালির অনন্য সব সৃষ্টি! শিল্পীদের সুমধুর কণ্ঠ সেসব সৃষ্টিকে আলোর মতো ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্ব-ভুবন মাতিয়ে রাখে যে বাঙালিয়ানায়, সেই বাঙালিয়ানাকে বিশ্ব দরবারে চিরন্তন করে রাখাটাও আমাদের এই দ্বিতীয় বৃত্তের সংকল্প।
আমাদের ঐতিহ্য সেই বাঙালিয়ানা, যে বাঙালিয়ানায় একজন মুক্তমনা হিন্দু তাঁর নিজের জমির একাংশ মুসলমানের ইদ্গাহের জন্য অনায়াসে দান করতে পারেন, এক দরদী মুসলমান একজন হিন্দুর শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে নির্দ্বিধায় এগিয়ে আসতে পারেন। অথচ আজকাল কার নামের সঙ্গে ক’টা আরবি বা সংস্কৃত শব্দ জুড়ে রয়েছে, সেটা নিয়ে তথাকথিত শিক্ষিত মহলে বড্ড বেশি অকারণ কোলাহল! এরকম সংকীর্ণতা আর বিভেদকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে দীপাবলি আর খুশির ইদে একই উষ্ণতায় হিন্দু-মুসলমানের কোলাকুলি দেখতে চায় যে বাঙালিয়ানা, সেই বাঙালিয়ানার বার্তা এপার থেকে ওপারে অপার সহমর্মিতা আর উদারতায় সর্বত্র পৌঁছে দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে, আপনার-আমার-সবার ভাবনাকে সঙ্গী করে, সবার সহযোগিতাকে সম্বল করে আজকের ও আগামীর পথ চলতে চায় এই দ্বিতীয় বৃত্ত।
এই দ্বিতীয় বৃত্তের স্বপ্নটা প্রথম দেখেছিলেন আমাদের অগ্রজ বন্ধু লেখক, শিক্ষক ও মানবাধিকার কর্মী পার্থ বন্দোপাধ্যায়। তারপর আমরা একে একে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে সামিল হই, এটা আমাদেরও স্বপ্ন হয়ে যায়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আগামীতে আরও অজস্র মুক্তমনা বাঙালি এসে এই স্বপ্নে সামিল হবেন, আর এভাবেই এক পৃথিবী মুক্তমনা অসাম্প্রদায়িক বাঙালি এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে উদ্যোগী হবেন।
সবাইকে শরতের অপার শুভেচ্ছা, অকুণ্ঠ ভালবাসা ও অন্তহীন সহমর্মিতা।
আমরা সবাই যেন ভাল থাকি, সুস্থ থাকি, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক বাঙালি হয়ে থাকি, এটাই কামনা, এটাই আবেদন।
_____
অসাধারণ বিশ্লেষণ
অনেক অনেক ধন্যবাদ