পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
_____
ঘোষ, হক, ব্যানার্জী, চ্যাটার্জী, ভট্টাচার্য, রায়, শর্মা, আলম, হোড়, ভুঁইয়া, সেন, দে, রক্ষিত, দাস, দত্ত, গুপ্তা, সাউ, জয়সওয়াল, চৌধুরী, ইসলাম, খাতুন, আহমেদ, রহমান, মাইতি, বেরা, জানা, মণ্ডল, মুর্মু, মুণ্ডা, পাঁজি, পান, মাল, বল বটব্যাল পাকড়াশী সামন্ত কিংবা সালাম … আরো যারা আছে তাদের সবার কথা।
যেখানেই যারা বাংলায় কথা বলছে — বরিশাল থেকে বনগাঁ, বনশ্রী থেকে বনের পুকুর, বার্সিলোনা থেকে এই ব্রুকলিন — সবার জন্যেই এই সেতুবন্ধন।
ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখা যাক। অবশ্য আজকের এই ধর্মান্ধতা আর স্বেচ্ছা-মূর্খতার যুগে ভাবা ব্যাপারটাই আউট অফ ফ্যাশন। যেভাবে যে ভাবে — সেভাবেই সে ভাবে। সুতরাং, ফেসবুক জাতীয় মাধ্যমে লিখে ফেস থেকে বুকে প্রবেশ করবে, সে ভরসা নেই। এক্স এখন একটা হ্যান্ডল। সে হ্যান্ডল ভয়ঙ্কর দৈত্যের হাতে।
তাও লিখছি। দু চারজনের বুকে যদি গিয়ে পৌঁছোয়। সেই আশাতেই সবাই মিলে বুক বেঁধে পথে নামা।
সলিল চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘পথে এবার নামো সাথী, পথেই হবে এই পথ চেনা।’ আমরা পথে নামলাম আজ — এই শারদীয়া অনলাইন দ্বিতীয় বৃত্ত পত্রিকা নিয়ে। আমাদের প্রথম সংখ্যা। প্রচুর লেখা। অভাবিত, ইতিবাচক সাড়া পেলাম দুই বাংলা থেকে, সারা পৃথিবী থেকে।
সহ-পথচারী পেলাম আপনাদের। যাঁরা এখনো বাংলা ভাষায় কথা বলতে গর্ববোধ করেন। নিজেদের নাম বলার সময়ে আগে ভাবেন না ধর্মের কথা, জাতের কথা, দেশের কথা। আমরাই পারি আমাদের ভাষাকে, চেতনাকে, ইতিহাসকে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনদের হাত থেকে রক্ষা করতে। রক্ষা করতেই হবে এই আগ্রাসনের দিনে।
সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এবারে এগিয়ে চলা সামনের দিকে। আলোর দিকে। আলোর পথযাত্রী আমরা। এই আলো বিশ্ব-মানবতার আলো। আধুনিকতার আলো। প্রগতির আলো। বিজ্ঞানের আলো। সত্যের আলো। ধর্ম যার যার, সত্য সবার। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ — আমাদেরই কবি বলেছেন, বার বার।
আর একজন বলে গেছেন, ‘যত মত তত পথ।’ একেবারেই বৈপ্লবিক সে বাণী।
এই আধুনিকতা, আন্তর্জাতিকতা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন আমাদের শিক্ষকেরা, আমাদের মহাকবি। এই বিশ্বায়িত বাঙালিত্ব আমাদের আধুনিকতা, প্রগতিশীলতা। আমাদের অহঙ্কার। অন্ধকার গুহা থেকে আমরা আলোয় বেরিয়ে এসেছি বহুকাল আগেই। আমাদের পথিকৃৎ রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার, লালন, সিরাজ, রোকেয়া, রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার, সুনীতিকুমার, নীহাররঞ্জন, শহীদুল্লাহ। প্যারীচরণ থেকে হরিচরণ। ডিরোজিও থেকে মাইকেল থেকে বঙ্কিম থেকে দীনবন্ধু থেকে গিরীশ থেকে বিনোদিনী। জগদীশচন্দ্র, নজরুল, বিভূতিভূষণ, সুনীল, শঙ্খ, শামসুর, হুমায়ুন, অমর্ত্য, নবনীতা, পূর্ণেন্দু পত্রী। মতি নন্দী থেকে রমাপদ থেকে জ্যোতিরিন্দ্র থেকে এই সেদিন চলে যাওয়া প্রফুল্ল রায়।
ভগবান শ্রীচৈতন্যদেব। যাঁর মামার বাড়ি দেখে এলাম এই গত বছর বাংলাদেশে।
এক হাজার বছর আমরা একসঙ্গেই ছিলাম। মাত্র পঁচাত্তর বছরে সে ইতিহাস কি ভুলে যাওয়া, ভুলিয়ে দেওয়া সম্ভব?
বাঙালিত্ব ব্যাপারটা কী? সে ব্যাটা কোথায় থাকে? শহরে, না গ্রামে? এদিকে, না ওদিকে? সেখানে কী খায়, কী মাথায় মাখে?
একটা বিষয় নিশ্চয়ই ভাষা। যে ভাষার জন্যে ঢাকার রাস্তায়, আর ওদিকে বরাক উপত্যকায় বাঙালি রক্ত দিয়েছিল। বাহান্ন থেকে একাত্তর — একটা দেশে লক্ষ শহীদ। আর আমরা যারা রক্ত দিইনি, যাঁরা রক্ত দিয়েছেন, তাঁদের জন্যে গলা ফাটিয়েছি চিরকাল।
ঠিক যেমন গলা ফাটিয়েছি সূর্য সেন, প্রীতিলতা, কল্পনা, বীণা, বিনয়-বাদল-দীনেশ, বাঘা যতীন, কানাই সত্যেনের জন্যে। বীরসার জন্যে। মাতঙ্গিনীর জন্যে। মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য শহীদের জন্যে। নারীদের জন্যে। ওঁরা প্রাণ দিয়েছেন, আমরা দিতে পারিনি। কিন্তু ওঁরা প্রাণ দিয়েছেন দেশকে একটা ঐতিহাসিক অবিচার, অত্যাচার, লুন্ঠন ও আগ্রাসনের হাত থেকে উদ্ধার করার জন্যে — এই ভেবেই আমরা অহঙ্কার করেছি।
আমরা বলেছি, আমাদের ভাষা শহীদ। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামী। আমাদের চট্টগ্রাম। আমাদের সেলুলার জেল। আমাদের সুভাষ বোস। গায়ে কাঁটা দেয়।
এই অহঙ্কার আমাদের বাঙালিত্ব। এই অহঙ্কার আজ ওই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনরা কেড়ে নিতে চায়।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিভূতিভূষণ, জীবনানন্দ, জসীমউদ্দীন, কীর্তন বাউল জয়দেবের মেলা বিষ্ণুপুরের গোপেশ্বর থেকে আজকের রবিশঙ্কর, আলী আকবর অন্নপূর্ণা আর গুরুর গুরু – বাবা আলাউদ্দিন তো আছেনই। কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সঙ্গীতকারের লম্বা আশ্চর্য উজ্জ্বল লিস্ট। সেখানে হাজার এক্সপেরিমেন্ট। মহীনের ঘোড়াগুলি থেকে বিজন-শম্ভু থেকে উৎপল দত্ত থেকে তৃপ্তি মিত্র থেকে শাঁওলী মিত্র থেকে অজিতেশ রুদ্রপ্রসাদ কেয়া শোভা, উদয়শঙ্কর থেকে সত্যজিৎ থেকে মৃণাল সেন থেকে জহির রায়হান থেকে ঋত্বিক বুদ্ধদেব থেকে গৌতম ঘোষ থেকে অপর্ণা সেন থেকে তারেক মাসুদ। এসব তো আছেই। বাঙালিত্ব আর কোথায় খুঁজে পাবে এঁদের ছাড়া?
বৈজ্ঞানিক জ্যোতিষ্কর মধ্যে আপাদমস্তক বাঙালি সেই প্রফুল্লচন্দ্র, রাজশেখর, সত্যেন বসু, মেঘনাদ সাহা, মহলানবীশ। এই সেদিন নোবেল পাওয়া অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ। বাঙালিত্ব এঁরাও শিখিয়ে গেছেন। সারা পৃথিবীতে সাড়া জাগিয়েও ঈশ্বর মিল লেনের একতলার ঘরে বসে আচার্য্য সত্যেন্দ্রনাথ ঢাকাইয়া ভানু ব্যানার্জীর সঙ্গে বাংলায় আড্ডা দিচ্ছেন। বাঙালিত্ব।
তারপর সেই হেমন্ত মুখার্জী থেকে দেবব্রত বিশ্বাস থেকে সুচিত্রা মিত্র থেকে আজকের কবীর সুমন, নচিকেতা, অঞ্জন, মৌসুমী ভৌমিক থেকে মাটির ময়নার মমতাজ। আমার হারিয়ে যাওয়া গীতিকার বন্ধু স্বপ্নাভ। হারিয়ে যাওয়া কবি বন্ধু দেবাশিস। গান নিয়ে, কলা নিয়ে কত হাজার পরীক্ষা-নিরীক্ষা। যেন একটা চির-বহমান গভীর স্রোতস্বিনী। তার অতলে রত্নরাজি। তার চারপাশে বাংলার সবুজ শ্যামল।
আচ্ছা, বাংলায় তিন পুরুষ থাকা সাউ, রামাস্বামী, জয়সওয়াল, গুপ্তা — এরাও কি বাঙালিত্ব বোঝে? নিজের চোখে দেখেছি। আমাদের অনেক তথাকথিত শিক্ষিত ব্যানার্জী, চ্যাটার্জী, মুখার্জী, রয়্যাল ব্লাড সেন, সেনগুপ্ত, রায়চৌধুরী, দাশগুপ্তর থেকেও এদের অনেকেই অনেক বেশি বাঙালি। সবাই নয়। কিন্তু অনেকেই। বাংলা বাঁচাও করতে গিয়ে বাংলায় দীর্ঘকাল থেকে একেবারেই বাঙালি হয়ে যাওয়া গুপ্তা, রাস্তোগি, ডালমিয়া, লাঠ — এঁদের যদি কেউ উৎখাত করে দেওয়ার কথা বলে, আমাকে বলবেন। আমার ঘরের দরজা এই “অবাঙালিদের” জন্যে সবসময়ে খোলা। ঠিক যেমন আমার বন্ধু প্রকাশক ঢাকার মেসবাহউদ্দীনের মা দাঙ্গার সময়ে তাঁর বাড়িতে অসহায় হিন্দুদের আশ্রয় দিতেন। তাঁকে ডিঙিয়ে বর্বর ঘাতকের দল বাড়ির ভেতরে ঢোকবার সাহস পায়নি কখনো।
এই হলো বাঙালিত্ব।
যারা কখনো রক্ত দেয়নি, শুধু রক্ত নিয়েছে — তারা এই বাঙালিত্ব কখনো বুঝতে পারবে না।
কলকাতার রাস্তায়, ঢাকার রাস্তায়, বর্ধমান, যশোরের রাস্তায় এখনো পথ হারিয়ে গেলে বাঙালি পথ খুঁজে দেয়। জিজ্ঞেস করে না, কোন ধর্ম, কোন জাত।
‘আজকে অনেক পথ খুঁজে, পৃথিবী শুয়েছে চোখ বুজে, হেলিয়ে হৃদয়,
শিয়রে শিমুল শুধু একা চুপ করে রয়।
পথ খুঁজে যারা হয়রান, কোনোদিন সেই ময়দান তারা পেয়ে যায়।’
এই খোলা ময়দানই বাঙালিত্ব। অন্ধকার সুড়ঙ্গের অন্ধ সাপেরা সে বাঙালিত্ব বুঝবে কী করে?
আমরা যারা এখনো বুঝি, আর এই ভীষণ ধর্মান্ধতা, ঘৃণা, হিংসা, পরিকল্পিত বিভেদের দিনে একটা প্ল্যাটফর্ম খুঁজে বেড়াই, তাদের জন্যেই এই সেতুবন্ধন দ্বিতীয় বৃত্ত।
সবাইকে শারদীয়া শুভেচ্ছা, ভালবাসা, আর বন্ধুত্ব।
আসুন, হাতে হাত মিলিয়ে বাঙালি থাকি — সারা বিশ্বে। আসুন, নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাই।
তাদের কাছে উদারতা শিখি।
_____
আপনার ১লা সেপ্টেম্বরের বক্তব্য পুরোটাই শুনেছি। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত ছিলাম। আজকের বক্তব্যের সাথে আগের দিনের কথার সাযুজ্য রয়েছে। উদ্দেশ্যের সাথে একমত। এ প্রসঙ্গে দু একটা বলি। আমরা ত্রিপুরার ধর্মনগর থেকে উত্তর পূর্বাঞ্চল সাহিত্য সম্মেলন নামে একটি সংগঠন গড়ে ত্রিপুরার কৈলাশহর, আগরতলা এবং শিলচরের উদারবন্দে মোট চারটি সম্মেলন করেছিলাম ১৯৯০ -১৯৯৪ পর্য্যন্ত। আমি এই সংগঠনের অন্যতম আহ্বায়ক ছিলাম। আপনাদের উদ্দেশ্যকে কীভাবে আমরা সাহায্য করতে পারি জানাবেন। একটা কথা জানাই, আমাদের সংগঠন আগের মতো অটুট নেই, তবুও আমরা যারা এই উদ্যোগ নিয়েছিলাম তারা এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি। আমরা কীভাবে সাহায্য করতে পারি জানালে আমি আবার তাদের সাথে যোগাযোগ করব। ধন্যবাদ নেবেন।
আপনার সাহায্য দরকার। পত্রিকার লিংক বন্ধু পরিজন প্রতিবেশীর সাথে শেয়ার করুন। সবাইকে পড়তে বলুন, এবং ওয়েবসাইটে ডাইরেক্টলি কমেন্ট করতে বলুন। লেখা পাঠাতে বলুন পরের সংখ্যার জন্য। দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ।
ইতিমধ্যেই পাঠিয়েছি অনেক বন্ধুর কাছে। তাদের লেখা পাঠানোর কথাও বলব। কিন্তু পত্রিকাটি অন্যদের পাঠানোর কোন সহজ পদ্ধতি থাকলে আমাকে জানান । আমি মোবাইলের ব্যাপারে খুব একটা সড়গড় নই।
এই লিংকটা কপি করে ফোনে অথবা ইমেলে বা হোয়াটস্যাপে সবাইকে পাঠিয়ে দেবেন। আমি বয়ানটা লিখে দিলাম এখানে। *দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন শারদীয়া অনলাইন পত্রিকা “দ্বিতীয় বৃত্ত” পড়ুন এবং সবাইকে পড়ান। এই লিংকে ক্লিক করুন। https://secondcirclemagazine.com .*
আসাধারণ প্রত্যয় আর বিশ্লেষণ
চমৎকার!
অসাধারণ সম্পাদকীয়। অসম্ভব প্রাসঙ্গিক এই বার্তা। বিশুদ্ধ ও মানবিক এই আবেদন।