পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
_____
ধরুন, রাত তিনটের সময়ে ভূত এসে যদি আপনার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়, আর আড্ডা দেবার চেষ্টা করে, আপনার কেমন লাগে বলুন তো?
আমার তো একেবারে বিচ্ছিরি লাগে। মানে, রাগে আমার রগগুলো রগরগ করে। আর ইচ্ছে হয় … ওই যে কী যেন বলে, যাক এখন ঠিক মনে পড়ছে না। পড়লে বলবো।
মোট কথা, খুব রাগ হয়। আর আমার রাগ হলেই ভূতটা হাসে। হাস্যকর ভূত একটা।
আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এতো হাসো কেন, হ্যাঁ? এতো হাসো কেন? তোমার নাম কি হেঁসো?’
ভূতটা যেন একেবারে বিনয়ের অবতার। ঘাড় টাড় চুলকে বলেছিলো, ‘আজ্ঞে কী যে বলেন, আমার নাম ভুলো।’
বলে, আমাকে একটা ক্যাডবেরি দিয়েছিলো। এমনিতে লোকটা বেশ ভালো। কিন্তু তাকে দেখতে পাওয়া যায় না ঠিকমতো। ছায়া ছায়া। ভূতের ব্যাপার!
ভূতের হাতের ক্যাডবেরি! জানিনা কেমন হবে। ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘এটা খাওয়া যাবে? পেট ছাড়বে না তো?’
ভূত বললো, ‘এজ্ঞে কী যে বলেন, বলে কিনা ফেক্টারি থেকে তুইল্যে আনলাম এই সবে।’
বোঝো একবার ভূতের কারবার! এবারে সেই ফেক্টারিতে চোর ডাকাতের বদলে ভূতের জন্যে সিকিউরিটি গার্ড রাখতে হবে!
আমি বলেছিলাম, ‘তোমার নাম ভুলো কেন?’
সে বলেছিলো, ‘আজ্ঞে আমি খুব ভুইলে যাই কিনা সবকিছু। তাই পিসীমা আমার নাম রেখেছিলো ভুলো।’
তারপর বিড়বিড় করে বলেছিলো, ‘নামটা পিসীমা রেখেছিলো কি? এই দেখুন, এইটেই ঠিক মনে কত্তে পাচ্ছিনা। মনে হয় রাধুবাবু রেখেছিলো। নাকি, ছিরুর মা?’
বলে, কোথায় যেন ফস করে কেটে পড়েছিল। ইস্টুপিড একটা।
টাইমের কোনো সেন্স নেই। যখন তখন আসে। আর আমার ঘুমটা ভাঙিয়ে দেয়। দাঁত বের করে বলে, ‘হেঁ হেঁ কিছু মনে কইরবেন না সার, হঠাৎ কইরে এসে পড়লাম। মানে, টাইমটা ঠিক খেইয়াল করতে পারিনি। আমার পকেট ঘড়িটা কোথায় যে ভুলে ফেলে এইলাম।’
ভূতের আবার পকেটঘড়ি! পকেটই নেই, তা পকেটঘড়ি। জামা নেই, শার্ট নেই, মানে, ইয়ে … কিছুই নেই। … একেবারে যা তা!
রাগে গা জ্বলে যায়! পিটিয়ে ভূত করে দিতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু ভূতকে আর ভূত করব কী করে? সে তো আগেই ভূত হয়ে বসে আছে।
আমি একদিন আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ইয়ে … কী বলে। শোনো … একটা কিছু তো পরে আসতে পারো। একেবারে এরকমভাবে সবার সামনে …’
ভুলো নামের ভূতটা একহাত জিভ কেটে বললো, ‘এই যাহ, সক্কালে উঠে প্যান্টটা পরতেই ভুইলে গেছি।’
তারপর লজ্জা পেয়ে শুধু মাথাটা জাগিয়ে রেখে ছায়া শরীরের বাকিটা লুকিয়ে ফেললো।
সে তখন আর এক বিচ্ছিরি ব্যাপার। শূন্যে শুধু একটা মাথা ভেসে বেড়াচ্ছে, আর আমি তার সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছি।
তখন রাত গভীর। বলে কিনা সক্কালে উঠে! যাকগে, মরুকগে ওর টাইম নিয়ে। আমার কী?
*****
তা, আমি একটু ঘুমোতে ভালোবাসি। আমি রাতে ঘুমোই। আমি দিনের বেলাতেও চান্স পেলেই একটু ঘুমিয়ে নিই। তারপর অনেক সময় ঘুম থেকে উঠে আমার খুব খিদে পায়, আর খেতে গিয়ে ভীষণ পরিশ্রম হয়। মানে, সেই ভাত চিবোও রে, মুখে গরাস তোলো রে, আবার ডাল মাখো রে, মাছ বাছো রে। সে হাজার ঝামেলা। এর চেয়ে ভূতের খাওয়া অনেক ভালো। শূন্যে হাতটা ম্যাজিসিয়ানের মতো একবার ঘুরিয়ে নিল, আর সঙ্গে সঙ্গে নানারকমের ভাল ভাল পোলাও মাছ মাংস চাটনি রসগোল্লা দই। ইস, ভাবলেই জিভ দিয়ে জল পড়ে। উল্লুস!
ভূতেরা এমনি খায়। হাত টাত থালা বাটি চামচ কিচ্ছু লাগেনা। কিন্তু আমাদের মানুষদের খাওয়া ভীষণ পরিশ্রমের। খেতে গেলেই আমার ভীষণ পরিশ্রম হয়।
তখন বিশ্রাম নেবার জন্যে ওই শিবরাম স্যারের মতো আমি আর একটু ঘুমোই। দুবার ঘুমোনোর পরে মাঝখানের টাইমটাতে যখন আমার কিছু করার থাকে না, আর খুব আলস্য লাগে, তখন আমি আর একবার টুক করে ঘুমিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি।
এইসব করি বলে আমার পিসীমা আদর করে আমার নাম দিয়েছে সোনাদা। মানে, দার্জিলিঙে ঘুম বলে একটা জায়গা আছে, তার পাশেই সোনাদা। দার্জিলিং, ঘুম বা কালিম্পঙ তো আর কারুর নাম দেওয়া যায় না। তাই তার কাছাকাছি সোনাদা। মানে, ঘুমের এত কাছেই যখন, আর ভীষণ ঠাণ্ডা, ওখানেও নিশ্চয়ই সব্বাই ঘুমোতে ভালবাসে। পিসীমা তাই অনেক ভেবেচিন্তে আমার নাম দিয়েছে সোনাদা।
আমার পিসীমা ঐরকম। বেথুন কলেজে পড়েছিল কিনা! খুব পণ্ডিত। পিসীমার ভাল নাম জ্ঞানগর্ভা দেবী।
অবশ্য আমার আসল নাম তন্দ্রাহরণ। কিন্তু সে নামটা শুধু পরীক্ষার খাতায়।
*****
একবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে যাওয়ার ঠিক আগে আমার অ্যাডমিট কার্ড হারিয়ে গেল। সে এক হুলুস্থূলু কাণ্ড!
আমি লাফাচ্ছি পরীক্ষা দিতে দেবে না সেই ভয়ে। আমার বাবা লাফাচ্ছে আমার ওপর রাগ করে। আর বলছে, ‘কী যে করিস, কী যে করিস, কী যে করিস, ধ্যাৎ!’
একেবারে র্যাপের মতো। ‘কী যে করিস, কী যে করিস, কী যে করিস তুই। ধিন তা না না, ধিন না ধিনা, ধিন ধিন ধিন ধুস।’
আর কিছু বলছেও না, আর কার্ডটা যে একটু আদর করে খুঁজবে, তাও না। শুধু লাফাচ্ছে তিড়িং বিড়িং করে। সে এক দেখবার মতো দৃশ্য। একটা পঞ্চাশ বছর বয়েসের বুড়ো লোক পনেরো বছরের মোহনবাগান সাপোর্টারের মতো লাফাচ্ছে। বাবা মোহনবাগান।
আর আমার ইস্টবেঙ্গল মা ওদিকে বসে এক হাতে কাঁদছে, আর এক হাতে ঠাকুমার মাথায় জলপটি দিচ্ছে। ঠাকুমাও কিছু না জেনেশুনেই অজ্ঞান।
ওই আমার ঠাকুমার আর এক মুদ্রাদোষ। কথায় কথায় অজ্ঞান। আর মার কাজ হলো কাঁদতে কাঁদতে ঠাকুমার মাথায় জলের পটি দেওয়া। এই দেখে আসছি সারা জীবন। আর দেখে আসছি কিছু একটা হলেই বাবার মোহনবাগান নাচ।
আর ওদিকে আমাদের জ্ঞানগর্ভা দেবী হেডস্যারের মতো গম্ভীর মুখে পায়চারি করে যাচ্ছেন বারান্দার এদিক থেকে ওদিক। আর মাঝে মাঝেই বলছেন, ‘হুঁহ, হুঁহ, একটা যদি কিছু খুঁজে পাওয়া যায় পরীক্ষার সময়ে।’ বলে, আবার আরো গম্ভীরমুখে পায়চারি করছেন।
তিনি আবার সাহেবি কেতায় বাড়িতেই বুটজুতো পরেন। হাঁটছেন, আর খটাস খটাস করে শব্দ হচ্ছে মোজেইক করা বারান্দায়। সারা বাড়িতে কে যেন হাতুড়ি পিটছে।
*****
এইসব ভীষণ কাণ্ডের সময়ে আমাদের রোগা প্যাংলা পৈতেঅলা রান্নার ঠাকুর সরু গলায় বলল, ‘আপনার কাঠ কি কয়লার ঘরে রেখেছিলেন দাদাবাবু?’
বাবা নাচ আর লাফ থামিয়ে বিরক্ত বিরক্ত মুখ করে, ভ্রু কুঁচকে আর চোখ বন্ধ করে বললো, ‘কী যে বলো না যজ্ঞেশ্বর! কাঠ তো কয়লার ঘরেই থাকবে। নয়তো কি শোবার ঘরের সিন্দুকে থাকবে? নাকি আমার ধুতির আলনায় থাকবে? যত্তোসব।’ বলে শুরু করলো আবার নাচ আর লাফ। ধিন না ধিনা।
এই উদয়শঙ্কর আর মিলখা সিংয়ের কম্বিনেশনকে আমি আর আমার বন্ধু জটিলাক্ষ বলি নাফ। মানে, নাচ আর লাফ দুটোই। বাবার নাফ শুরু হলেই আমরা গলিতে গিয়ে গুলি খেলি। আর হাসি প্রচণ্ড। নিঃশব্দ অট্টহাসি। অনেকটা টিভিতে বাজে হিন্দি সিনেমায় গব্বর সিংয়ের অট্টহাসি যদি কেউ সাউন্ডটা বন্ধ করে দিয়ে দেখে, সেই রকম। এই হাসিটার নাম আমরা দুজন দিয়েছি নিট্টহাস্য। মানে, নিঃশব্দ অট্টহাস্য। আমরা দুজন ছাড়া কেউ জানেনা।
এই নিট্টহাস্যটা আমরা দুই বন্ধু মিলে মাঝে মাঝে প্র্যাকটিস করে থাকি। আমার বাবার নাম কার্তিককুমার। চিৎপুরে যাত্রার পোস্টারে এরকম নাম থাকে।
আজকে জটিল এসে জুটল একটু পরে। বাড়ির সবার নাচ টাচ একটু দেখল মন দিয়ে। তারপর ব্যাপার স্যাপার দেখে আর শুনে বলল, অনেকটা সেই শ্রীনাথ বহুরূপী গল্পের ইন্দ্রর মতো, ‘মেসোমশাই, জগাঠাকুরের কথাটা কিন্তু একটু ভেবে দেখতে পারতেন।’ বলে মোটা চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে আমার কানে কানে একটা কথা বলল ফিসফিস করে।
আমি ভ্যাঙ্কোর অবাক হয়ে বললাম, ‘সিরিয়াস্লি?’
অ্যাডমিট কার্ডটা পাওয়া গেল রান্নাঘরের পাশে কয়লার ঘরের তাকে।
মিলখা সিং ওরফে উদয়শঙ্কর কার্তিককুমার ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই কী যে করিস না সোনাদা! ওখানে কেউ পরীক্ষার কার্ড তুলে রাখে?’ বলে বাজার করতে চলে গেলো দুটো থলে দুহাতে ঝুলিয়ে। যেন কিছুই হয়নি। আমার বলে আর একটু হলেই পরীক্ষাটাই দেওয়া হতো না! আর কার্তিককুমারকে দেখো!
পিসীমা বারান্দায় অবিরাম খটখটাখট হাতুড়ি-হাঁটা প্রতিযোগিতা থামিয়ে বললো, ‘এই বাড়িতে কোনো নিয়মকানুন বলে কিছু নেই। আন-সিভিলাইজড।’ বলে, কী একটা বাকসোর মতো বই নিয়ে ইজিচেয়ারে বসে পড়ল। যজ্ঞেশ্বর ঠাকুর পিসীমার জন্যে নিয়ে এল পালং শাক আর বাদাম দেওয়া কফি।
ওদিকে, ঠাকুমাকে জলের পটি দেওয়া বন্ধ করে মা আবার এক হাতে একটু কেঁদে নিলো। এবারে কার্ড পাওয়া গেছে, সেই আনন্দে।
যজ্ঞেশ্বর ঠাকুর সরু গলায় বললো, ‘নাও দাদাবাবু, ভাত খেয়ে নাও। আজকে তোমার জন্যে রুইমাছের ঝোল করেছি ডালের বড়ি দিয়ে।’
*****
পরীক্ষা দিয়ে ফিরে আসার পরে আমি ভুলো ভূতের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আজকে ওকে পেলে আমি সত্যি পিটিয়ে ভূত করে ছাড়বো। ওইসব ঝামেলায় একটা কম্পালসারি কোশ্চেন দেখতেই পাই নি।
ধুস!
কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও সে এলনা। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। তখন সে এল রাত ঠিক তিনটের সময়ে। আমাদের বারান্দার দাঁড় করানো আদ্যিকালের ঘড়িতে শুধু ওই তিনটের সময়েই ঘন্টাটা বাজে। বিকেলবেলায় একবার, আর রাতে একবার। বাকি ঘন্টাগুলো কবে খারাপ হয়ে গেছে। বাজে না। একেবারে বাজে একটা ঘড়ি। কিন্তু কার্তিককুমার আর আমার ঠাকুমা আলুলায়িতা দেব্যা সে ঘড়ি ফেলতে দেবে না। নাকি জমিদার বংশের লক্ষ্মী সেটা।
জমিই নেই, তার আবার জমিদার! এইসব কথা ভেবেই আমার আবার ঘুম পেয়ে যায়।
‘যত্তসব খারাপ কুসংস্কার হইসে।’ মা মাঝে মাঝেই বলে নিজের মনে।
‘খারাপ কুসংস্কার বলে কোনো কথা হয়না বউদি।’ জ্ঞানগর্ভা সংশোধন করে দেন পাশের ঘর থেকে। “ব্যাকরণটা একটু পড়ো।”
আমার মা ঐরকমই কথা বলে চিরকাল। ‘পাশের বাড়ির নেবারদের zaলায় দুপুরবেলায় একটু দিবানিদ্রা দিবো তার zo নাই,’ মাঝেমাঝেই শুনি বাবাকে বলছে।
ব্যাকরণ জানে না মোটেই। অবশ্য, মায়েরা ঐরকমই হয়ে থাকে। আমার প্রাণের বন্ধু জটিলের মাও ঐরকম। এই নিয়েও আমরা সাইলেন্ট গব্বর সিংয়ের নিট্টহাস্য দিয়ে থাকি।
যাক গে সে কথা এখন। ভুলোকে ধরলাম।
আমি বললাম, ‘তুমি আজ সকালবেলায় এই কাণ্ডটা বাধালে কেন, শুনি?’
সে অবশ্য তখন লজ্জায় অদৃশ্য। ওকে দেখতে পেলামনা। শুধু বুঝলাম, খুবই অনুতপ্ত। পায়ের ওপর একটা ভিজে ভিজে সোঁদা সোঁদা ছোঁয়া লাগলো ভিজে গামছার মতো। আর একটা আঁশটে গন্ধ।
আমি বললাম, ‘আজ কার্ডটা হারিয়ে গেলে আমার তো পরীক্ষা দেওয়াই হত না। তখন কী হত, শুনি?’
আঁশটে গন্ধটা আর একটু বেড়ে গেলো। জড়ানো জড়ানো সর্দিবসা গলায় ভুলো বললো, ‘সরি। আপনার পেন্সিল বাকসোতে না রেখে ভুল করে রান্নাঘরের তাকে রেখে এসেছিলাম।’
আমি বললাম ‘দ্যাটস ওকে। আর কখনো আমার এতো উপকার করতে যেওনা।’
লোকটার ওপর, মানে, ভূতটার ওপর কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে। পিটিয়ে তক্তা করে দিতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু করতে পারি না।
কতকালের চেনা ভূত। অনেকটা সেই পুরাতন ভৃত্যের মতো।
‘ভূতের মতন চেহারা যেমন, নির্বোধ অতি ঘোর।’ তারই হয়তো চতুর্দশ কিংবা পঞ্চদশ সংস্করণ। কে জানে!
আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
*****
বলছি বটে ভূতের মতন চেহারা, কিন্তু তার চেহারাটা আসলে যে কেমন, তাই কখনো ঠিকমতো বুঝতে পারলাম না।
জটিলের খুব বুদ্ধি। অঙ্কে একশোয় একশো পায়। একবার একশোতে একশো পাঁচ পেয়েছিল। নাকি দুরকম ভাবে পিথাগোরাস থিওরেম খাতায় করে দেখিয়েছিলো। আমাদের অঙ্ক-স্যার নির্বিকল্পবাবু সেই নিয়ে হেডস্যারকে বলেছিলেন, ‘স্যার, এই ছেলেটা খুব বুদ্ধিমান আর ব্রাইট ছেলে স্যার।’ যেন বুদ্ধিমান আর ব্রাইট দুটো আলাদা কথা। যত্তোসব!
জটিল আমাকে কানে কানে একটা পরামর্শ দিলো। এই ব্যাপারগুলো ওর মাথাতেই আসে ভালো। বুদ্ধিমান আর ব্রাইট কিনা।
ওই সারাদিনে একবার আর রাতে একবার বাজা ঠাকুর্দা ঘড়িটা যখন তিনবার বাজল, তখন আমার মশারির একটা কোণ উঠে গেল। আর আমার পা ধরে কে যেন নাড়া দিতে লাগল খুব আস্তে আস্তে। বুঝলাম, ভুলোবাবুর আগমন হয়েছে।
কারুকে দেখতে পেলাম না। সেই অ্যাডমিট কার্ডের ব্যাপারটা হওয়ার পর থেকেই সে খুব গা ঢাকা দিয়ে আছে কয়েকদিন ধরে।
আমি বললাম, ‘তোমাকে দেখতে কেমন আসলে? তুমি তো ওই ছায়াময়বাবু হয়েই থাকছো। একটু কায়াময়বাবু হতে পারো তো একদিন।’
ভুলো বাংলাটা মোটামুটি ভালই জানে। সেন্স অফ হিউমারও আছে একটু একটু — ভূত হলে কী হয়?
একটু খিক খিক হাসির শব্দ পেলাম যেন।
‘ইয়ার্কি নয়,’ আমি একটু কড়া গলায় ধমক দিলাম। ‘জটিল আমাকে বলেছে তোমাকে না দেখতে পেলে আর কথাই বলব না তোমার সঙ্গে।’
ভুলো কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ‘মানে স্যার, একবারে ডাইভোস করে দেবেন?’
আমি বললাম, “ভুল ইংরিজি বোলোনা। তোমার সঙ্গে কি আমার ডিভোর্সের সম্পর্ক নাকি? যা তা!’
ভূত বললো, ‘সরি। ইংরিজিতে পাশ করতে পারিনি প্রবেশিকায়। এগারো পেয়েছিলুম।’
বুঝলাম সে মান্ধাতার আমলের। তখন প্রবেশিকা বলে একটা পরীক্ষা হত ইস্কুলের শেষে। পড়েছি রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার আর পরশুরামের লেখায়। শ্রীনাথ বহুরূপীর মেজদা। ওই যে যেখানে ছিল ইন্দ্র। কিন্তু ছি ছি, মাত্র এগারো? একেবারে গোমুখ্যু ভূত একটা!
আবার কায়দা করে বলে, সরি। উঃ!
আমি রাগ চেপে বললাম, ‘তুমি আসলে কেমন দেখতে, না জানলে তোমার সঙ্গে পরিষ্কার করে কথা বলা সম্ভব হচ্ছে না। মানে, তুমি কি ছেলে না মেয়ে, বড় না ছোট, যুবক না বৃদ্ধ? কিছুই তো জানি না। ওই ছায়াছায়া দেখেছি তোমাকে দু একবার। তাও আবার প্যান্ট না পরা তোমার মুণ্ডু। তোমার গলার আওয়াজ শুনেও কিছুই বোঝা যায়না ঠিকমতো।’
ভূত বললো দুঃখিত স্বরে, ‘ঠিক আছে স্যার। দেখতে পাবেন। কিন্তু আমাদের এদিকে সবকিছু একেবারে আলাদা।’
আমি শুধোলাম, ‘আলাদা মানে কী?’
সে বললো, ‘স্যার ওটা আপনি ঠিক বুঝবেন না।’
আমি বললাম, ‘আমার বন্ধু জটিলও তোমাকে দেখতে চায়।’
ভুলো বললো, ‘স্যার, ওর নাম যদি সরল হত, তাহলে দেখার কোনো অসুবিধে ছিলনা। তাছাড়া, আমি হলাম আপনাদের এই বংশের। আলুলায়িতা দেবীর ঠাকুমা বিষণ্ণপ্রভার আমি ছিলাম একটা ছেলে।’ তারপর একটু ভেবে বলল, ‘সেটাও ঠিক মনে পড়ছে না। মনে হয়, তাঁর জামাই আদরদুলাল আমার মেজোমামা।’
ধুর ছাই, এর সঙ্গে কথা বলাই এক ঝকমারি।
বললাম, ‘তোমার স্মৃতিশক্তি দেখছি বাঁধিয়ে রাখার মতো। প্রবেশিকা পাশ করেছিলে কী করে? বিভূতিভূষণ পড়ে তো মনে হয় পাশ করাই শক্ত ছিল। এখনকার মতো টুকে পাশ তো হত না।’
সে বললো, ‘ভুলে গেছি শেষ পজ্জন্ত পাশ করেছিলুম কিনা। আসলে আমার মেমারিটা ভালো ছিল না বলে ঠাকুদ্দার হোমিওপ্যাথিক ওষুধ খেতাম। তাতে কোনো কাজ হল না।’
ইংরিজিতে এগারো পেয়ে আর পাশ করবে কী করে?
*****
এ গপ্পের এখানেই মোটামুটি শেষ। কারণ, ভুলো ঠিকমত দেখা না দিয়েই কোথায় যেন সরে পড়ল পরের দিন থেকে।
কিন্তু একটা ব্যাপার হল আমাদের বাড়িতে। যা আমি ছাড়া আর কেউ দেখতে পায় নি।
ধরুন, ওই দুপুরবেলা বাবার ঘরে ঠাকুমা যখন অজ্ঞান হয়ে যেত ইচ্ছে হলে, আর মা এক হাতে কাঁদত আর অন্যহাতে জলপটি দিতো, তখন দেখতাম পিসীমার ঘরেও আর একজন ঠিক একরকম দেখতে ঠাকুমা অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে, আর ঠিক একরকম দেখতে একজন আমার মা এক হাতে কাঁদছে আর অন্যহাতে জলের পটি দিচ্ছে সেই ঠাকুমার মাথায়।
কিংবা হয়ত কার্তিককুমার কোর্ট থেকে ফিরছে, তখন বাড়ির অন্য দরজা দিয়ে আর একজন বাবার মতো দেখতে ঠিক সেই একরকম কালো পোশাক পরে সুটকেস হাতে বেরিয়ে গেল কোথায় যেন। জ্ঞানগর্ভা দেবী রাগ করে যখন খটাস খটাস করে হাতুড়ি হাঁটছে বারান্দার মোজেইকের ওপর, তখন ইজিচেয়ারে আর একজন জ্ঞানগর্ভা দেবী বসে বসে বাকসোর মতো একটা বই পড়ছে। সামনে রাখা পালং শাকের কফি।
এমনকি, আমাদের রান্নার ঠাকুর যজ্ঞেশ্বর যখন ভাত আর রুই মাছের ঝোল রাঁধছে রান্নাঘরে বসে বসে, তখন ওদিকে তার শোবার একচিলতে ঘরে আর একজন জগা ঠাকুর সরু গলায় রামায়ণ পড়ছে দুলে দুলে।
মানে ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত। কিম্ভুতও বলা যেতে পারে।
ব্রাইট আর বুদ্ধিমান জটিলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে বলল, ‘ওই তো। হাঃ হাঃ হাঃ।’
আমি বললাম, ‘ওই তো হা হা হা কী?’
সে মোটা চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি হাসল।
তারপর বলল, ‘ওই তো। ভুল করে এ আর সে। ইনি আর তিনি।’
লাস্টে বলল, “বুঝলে হে তন্দ্রাহরণ?”
বলে, ফস করে কোথায় যেন কেটে পড়ল।
_____
খুব ভালো লাগলো
অনেক ধন্যবাদ। আপনার ছাত্রছাত্রীদের কাছে এই পত্রিকা পৌঁছে দিন। আপনার লাইব্রেরিতে পৌঁছে দিন। সবাইকে অংশগ্রহণ করতে বলুন। লেখা, ছবি পাঠাতে বলুন। আমি চাই এই পত্রিকা গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দিতে। আপনি এই ব্যাপারে একটা বিরাট ভূমিকা নিতে পারেন দাদা।
অনেক ধন্যবাদ। আপনার ছাত্রছাত্রীদের কাছে এই পত্রিকা পৌঁছে দিন। আপনার লাইব্রেরিতে পৌঁছে দিন। সবাইকে অংশগ্রহণ করতে বলুন। লেখা, ছবি পাঠাতে বলুন। আমি চাই এই পত্রিকা গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দিতে। আপনি এই ব্যাপারে একটা বিরাট ভূমিকা নিতে পারেন দাদা।