মুকুল মুখোপাধ্যায়
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
উত্তরের টান
অনেকদিন পর গত সেপ্টেম্বরে (২০২৪) কলেজ স্ট্রীট গেছিলাম একটা কাজে। উত্তর কলকাতায় গেলে আজকাল একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। বিগত প্রায় একুশ বছর যাদবপুরে থাকি। তার আগে প্রায় ওই রকম সময় (শৈশব, কৈশোরও পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে ঢোকার পর প্রথম কয়েক বছর) চন্দননগরে। সে দিক থেকে দেখতে গেলে উত্তর কলকাতায় আমার একেবারে শৈশবের প্রথম চার পাঁচটা বছর কেটেছিল বাবার পৈতৃক বাড়ি কলেজ স্ট্রীট- শিয়ালদহ এলাকায়। সে স্মৃতি খুব আবছা মনে পড়ে; কিছু বিশেষ দুষ্টুমি; আবদার বা শাস্তির মুহূর্ত সেগুলো। সন্দেহ নেই সেগুলো আমার কাছে খুব মূল্যবান সম্পদ।
আজও কোন বিশেষ কারণে উত্তরের বা বলা ভাল মধ্য কলকাতার শিয়ালদা কলেজ স্ট্রীট এলাকার প্রতি একটা টান অনুভব করি। একটা বয়সের পর স্মৃতিচারণ মনে হয় মানুষের একটা অভ্যাসে পরিণত হয়। হবারই কথা। কারণ জীবনের রাস্তায় অনেকটা পথ না হাঁটলে, অনেক পথ চলতি মানুষের সাথে পরিচয় না হলে জীবন ঘটনাবহুল হবেই বা কীভাবে? আর জীবন যত ঘটনাবহুল; স্মৃতির ক্ষণিকের উঁকিঝুঁকি তত বেশি। যাইহোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।
আচ্ছা, কেন এমন মনে হয় এতদিন দক্ষিণে থাকার পরেও, যে উত্তরে কিছু একটা আছে যেটা দক্ষিণে নেই?
দক্ষিণ থেকে গিয়ে শিয়ালদা উড়ালপুলের ওপর দিয়ে বাঁ দিকে ঢালু হয়ে যাওয়া রাস্তা দিয়ে কিছুদূর এগিয়ে গেলে অবস্থাটা সত্যিই কিছুটা সোনার কেল্লার ‘মুকুল’এর মতো হয় আমার। বাবার পৈতৃক বাড়িতে থাকার সময় একদম শৈশবে বাবার সঙ্গে বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়তাম। একটা শর্টকাট সরু গলি, যেখানে অন্য দিক থেকে আসা মানুষের জন্য জায়গা করে দিতে চাইলে নিজের পাশে হাঁটা মানুষটাকে এগিয়ে বা পিছিয়ে যেতে হয়। সেইরকম একটা গলি দিয়ে ছিল আমাদের নিত্য যাতায়াত। আমাদের ছোটবেলার আবদার শুনলে এখনকার প্রজন্ম খুব হাসবে, ভাববে এটাও একটা আবদার!? আমার আবদার ছিল বেরোলে একটু সাদা বা কালো কোল্ড ড্রিংকস ( Limca আর Coca cola); ছোট খেলনার গাড়ি এইসব। একটা দোকানে ঢুকে বাবা আমাকে কোল্ড ড্রিংকস খাওয়াতেন, আর নিজেও খে্তেন। আজ ঐ এলাকার চারপাশ দেখলে কোনো বিশাল পরিবর্তন চোখে পড়ে না। যেটুকু পড়ে সেটুকু কালের গতির তালে সাজসজ্জার আধুনিকতা ও আলোর ঝলকানির পরিবর্তন। কোনো বিশাল শপিং মল ওখানে স্থানীয় বাড়িঘর ভেঙে তার ওপর মাথা তুলে দাঁড়ায়নি বা কোনো দশ তলা বাড়ী ঐ পুরোনো ঘেঁষাঘেঁষি করে, প্রায় গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলোর ফাঁক দিয়ে আকাশপানে উঁকি দেয়নি। হয়তো সেই জন্যই জায়গাটাকে চেনা চেনা লাগে।
সেই ট্রামলাইন আজও আছে। বৈঠকখানা বাজার কাছে বলে আছে মানুষে টানা সবজি বোঝাই ভ্যানের ছড়াছড়ি। আর আছে শিরা উপশিরার মতো সরুসরু গলি আর তারই মধ্যে দোকান। সবই খুব চেনা লাগে। কিছুটা সেই শেখ ওয়াজেদ আলীর ‘ভারতবর্ষ’এর মতো; ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে, কোথাও তার পরিবর্তন ঘটে নি।’
আমহার্স্ট স্ট্রিটের কচুরি আর তরকারির স্বাদ পেলে মনে হয় সেটা কেবল উত্তরেই পাওয়া যায়। রাস্তার ওপর সাধারণ একটা মিষ্টির দোকানেই সেই স্বাদ মেলে। বলরাম মল্লিক বা কামধেনু ছেড়েই দিলাম; নিদেনপক্ষে দক্ষিণের যে কোনো পাড়ার জনপ্রিয় মিষ্টির দোকানের তুলনায় উত্তরের ঐ রাস্তার ওপরের দোকানটার চেহারা নিতান্তই সাধারণ; কিন্তু দোকানদারের ব্যবহার আর খাবারের মান দুটোই মনে রাখার মতন।
রবীন্দ্রনাথের ‘মাধো‘ কবিতার শেষ লাইনটা খুব মনে পড়ে উত্তরে গেলে:
‘ছেঁড়া শিকড় পাবে কি আর পুরোনো তার মাটি’ –
সেই আমার চার বা পাঁচ বছর বয়সে উত্তর কলকাতার বাবার পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র নানা জায়গায় বসবাস শুরু; শেষমেশ চন্দননগরে থিতু হলাম আমরা; সেটা ১৯৭৬ সাল। আজ যখন আমি জীবনের মাঠে হাফ সেঞ্চুরি করে ইনিংস চালিয়ে যাচ্ছি; তখন সেই শৈশবের পাড়ায় এলে মনের অনুভূতির ঢেউ তো অশান্ত হবারই কথা! সেই প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের যে শেকড় মাটি থেকে উপড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল; আজ সেই শেকড় পরিণত বয়সে সেই পুরনো মাটির চেনা গন্ধে বুকভরে নিশ্বাস নেবে এটাই তো স্বাভাবিক!
এরকম ই থেকো উত্তর। আমার পুরোনো মাটি। এখানে এলে যেন তোমাকে ঠিক এমনি দেখতে পাই। সেই সরু গলিটা দিয়ে যেতে গিয়ে শেখ ওয়াজেদ আলী সাহেবের মতো আমার যেন মনে হয়, ‘কোন মায়ামন্ত্রবলে সেই সুদূর অতীত আবার ফিরে এল নাকি!’
হ্যাঁ, অতীত ফিরে আসে বৈকি। যেখানে আমাদের শৈশব কাটে, বাল্যকাল কাটে, সেখানে তো আমাদের মন অতীতকে খুঁজবেই। সেইজন্যই মনে হয়; উত্তরে যেন কী একটা আছে যেটা দক্ষিণে নেই। উত্তরের দোকানের অচেনা মানুষগুলোর মুখের কথায় আন্তরিকতা ঝরে পড়ে। মনে থাকবে আমার সারাজীবন সেই ছবির দোকানের মালিক ভদ্রলোকের কথা। বাবার শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের জন্য বাঁধানো ছবিটা প্যাকিং করতে করতে সেই ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমাকে বললেন:
“__আপনাকে একটা কথা বলব, শুনবেন?
__বলুন
__আপনি চাদর টা গায়ে ভাল করে জড়িয়ে নিন। এই সময়টাতে আমাদের নিজেদের শরীরের দিকে খেয়াল থাকে না। ঠান্ডা লেগে যাবে।
__হ্যাঁ ঠিক বলেছেন। “
সদ্য পিতৃহারা শোকে মূহ্যমান আমি কিছুটা অবাক হয়ে মানুষটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আজ ও মানুষ অন্যের জন্য এত ভাবে!!!
হ্যাঁ নিশ্চই ভাবে। উত্তরের মানুষ তো ভাবেই!
নাহ্, একদিন আসতেই হবে আমাকে আমার পুরোনো শিকড়ের উৎস সন্ধানে; আমার ঠাকুরদার বাড়িতে। বড় জেঠু, জেঠিমা, জেঠতুতো দিদি সবাই না ফেরার দেশে; শুধু জামাইবাবু আর ভাগ্নি আসে বলে শুনেছি। আর একটা অংশে থাকেন বাবার খুড়তুতো ভাই ও তাঁর পরিবারের লোকজন। তো সে যেবা যারাই থাকুক না কেন, একবার আমাকে আসতেই হবে ওই বাড়িতে। জন্মের পর ওই বাড়িতেই কেটেছে আমার শৈশবের বছর চারেক। আসতেই হবে আমাকে ফিরে! দেখা যাক কবে ইচ্ছাপূরণ হয়!
ফিরে আসা
সেদিনের পর কেটে গেছে প্রায় মাস সাতেক। এর মধ্যে মেয়েকে পাত্রস্থ করার দায়িত্ব পালন করলাম। আর তার পরেই নতুন বছর। ভাবিনি নতুন বছর আমার প্রতি এতটা নিষ্ঠুর হবে। ২৬ শে জানুয়ারি (২০২৫) আমি মাতৃহারা হলাম। একমাত্র সন্তানের কাছে মা-বাবা ছাড়া পৃথিবীটা যে কতখানি কঠিন লাগে সেটা সেদিন থেকে বুঝতে শুরু করলাম। এখন প্রায় ছয় মাস অতিক্রান্ত হয়েছে মা চলে যাবার পর; কিন্তু এখনও সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। জানিনা কবে পারব! আমাকে শূন্যতার সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে মা চলে গেছে!
যাই হোক, আসতে আসতে মূলস্রোতে ফেরার চেষ্টা করছিলাম। আজকাল কিছু অদ্ভুত ভাবনা মাথায় ঘোরে। ৫০ পেরোবার পর; আর বিশেষ করে মা-বাবাকে হারানোর পর কেন জানি না নিঃশ্বাসকে খুব একটা আর বিশ্বাস করতে পারি না। কখন যে সে শেষবারের মত শরীর ছেড়ে বেরিয়ে আর শরীর মুখো হবে না, সে শুধু তিনিই জানেন। তাই আজকাল মনে হয় যা কিছু করতে ইচ্ছে হয় করে ফেলা দরকার; হাতে হয়তো খুব বেশি সময় নাও থাকতে পারে। পরে সময় থাকলে না হয় সেই সময় কাটানোর উপায় ভাবা যাবে‘ খন।
অনেকদিন ধরেই মনের মধ্যে একটা ইচ্ছে উঁকি দিচ্ছিল যে আমার ঠাকুরদার বাড়িটা একবার দেখতে যাব। ১৯৯২ সালে বড়জেঠুর মৃত্যুর সময় গেছিলাম মাএর সাথে। ওটাই শেষ; তারপর থেকে আর যাওয়া হয় নি। অর্থাৎ ৩৩ বছরওই বাড়িতে যাওয়া হয়নি আমার। শেষমেষ বেরিয়েই পড়লাম শুক্রবার, ৩০শে মে ২০২৫, দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে।
১/৪বি জাস্টিস মন্মথ মুখার্জি রো – বাড়ির ঠিকানা। দক্ষিণ থেকে গিয়ে শিয়ালদহ উড়ালপুল অতিক্রম করে অনতিদূরে বাঁদিকে কর্পোরেশনের পথ নির্দেশক বোর্ড দৃশ্যমান – জাস্টিস মন্মথ মুখার্জি রো। যাদবপুর থেকে ড্রাইভ করে গিয়ে শিয়ালদহ উড়ালপুল ক্রস করে এ. পি. সি. রায় রোডের ওপরবাঁদিকে সাইড করে গাড়িটা রাখলাম। বেশ ঘিঞ্জি এলাকা; কিন্তু অদ্ভুত ভাবে গাড়ি রাখার খুব সহজে ব্যবস্থা হয়ে গেল। অনতিদূরে সিগন্যাল। সিভিক ভলান্টিয়ার এসে শুধু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কতক্ষণ লাগবে আপনার?’
‘এই বড়জোর আধ ঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট।’
‘ঠিক আছে; থাকুক।’ ভলান্টিয়ার নিজের কাজে চলে গেলেন।
সামনে একটা খালি ভ্যানে একজন বিহারী বসে; তিনি আবার আমায় গাড়িটা পার্ক করতে নিজেই সাহায্য করলেন। খোদ এ.পি.সি. রায় রোডের ওপর বিকেলবেলায় ব্যস্ত সময়ে সুন্দরভাবে গাড়ি রেখে দিলাম।
গাড়ি থেকে নেমে কয়েক পা হেঁটেই ঢুকে গেলাম আমার সেই বহু আকাঙ্খিত জাস্টিস মন্মথ মুখার্জি রো গলিতে। গলির মুখে ডানদিকে একটা মুসলিম খাবারের দোকান। মাএর মুখে শুনেছিলাম “আমজেদিয়া হোটেল” এর কথা ওই বাড়ির কাছেই। খুব জনপ্রিয় ছিল সেই সময়। আজ এই হোটেলের অন্য নাম; তবে জানিনা এই হোটেলটাই সেই আমজেদিয়া হোটেল কিনা! আস্তে আস্তে হাঁটছি চারদিক দেখতে দেখতে। একটু দুরেই ডানদিকে সাদা রঙের মসজিদ। রাস্তার নম্বর মেলাতে মেলাতে মিনিট দুয়েক হাঁটার পর ডানদিকে একটা মিষ্টির দোকান – ‘রাজহংশ মিষ্টান্ন ভান্ডার’ । সেটা অতিক্রম করে চলে যেতেই দেখি নম্বর বেড়ে গেছে; অর্থাৎ আমি বেশি রাস্তা চলে এসেছি। ১/৪ বি নম্বর টা তখনও চোখে পড়েনি আমার। মিষ্টির দোকানে ডাকতেই একজন গৌরবর্ণ মানুষ বেরিয়ে এলেন; প্রায় আমারই বয়সী।
‘নমস্কার; আচ্ছা ১/৪বি টা কোথায় বলুন তো।’
‘কাদের বাড়ি যাবেন? কী নাম?’
-‘ঐ মুখার্জি বাড়ি; অম্বিকা চরণ মুখার্জি; আমার ঠাকুরদা। আসলে ওটা আমার বাবার পৈতৃক বাড়ি; ওখানে আমার ছোটবেলা কেটেছে।’
‘ঐ তো সামনের দরজা’ – মিষ্টির দোকানের পাশের দরজাটা দেখিয়ে বললেন ভদ্রলোক।
‘ওহ আচ্ছা!’ তাকিয়ে দেখি দরজার ওপর দুটো নম্বর লেখা; ১/৪এ এবং ১/৪বি। দরজায় তালা ঝুলছে।
‘আপনি পঞ্চানন মুখার্জি কে চিনতেন?’
‘হ্যাঁ অবশ্যই; সিইএসসি তে চাকরি করতেন’
‘উনি আমার বড় জেঠু।’
‘ওহ আচ্ছা। ওনার মেয়ে তো রুবু।’
‘হ্যাঁ ও তো আমার দিদি। রুবু ও তো সিইএসসি তেই চাকরি করত; হঠাৎ মারা গেলো অল্প বয়েসে। বড় জেঠু ও তো হঠাৎ হার্ট এ্যাটাক এ মারা গেলেন।’
‘হ্যাঁ আমরাই তো ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলাম; তার আগেই চলে গেলেন।’
‘আমার বাবা সবার ছোট ছিলেন। এই দেখুন ছবি- মোবাইল থেকে বাবার মালা পড়া ছবিটা দেখিয়ে বলি, বাবা ২০১১ তে চলে গেছেন।’
‘ঐ যিনি সিটি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন?’
‘না না, উনি বাবার ঠিক ওপরের দাদা; আমার সেজজেঠু; গৌরীশংকর! আমার বাবা ও অধ্যাপক ছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ ও অন্য সরকারি কলেজে পড়াতেন।’
‘ওহ আচ্ছা, বুঝেছি।’
‘এখন কি ভোম্বল কাকুরা থাকেন এখানে?’
‘হ্যাঁ ওনারাই থাকেন। এখন বেড়াতে গেছেন। মঙ্গলবার ফিরবেন।’
‘রুবুর হাজব্যান্ড তাপসদা তো আসেন শুনেছি?’
‘হ্যাঁ উনি মেয়েকে নিয়ে আসেন প্রায়ই।’
‘আচ্ছা বাবা খুব হাত দেখাতেন অশোকদাকে; উনি জ্যোতিষী ছিলেন। ওনারভাই অজয় বাবার সুরেন্দ্রনাথ স্কুলের বন্ধু ছিলেন। ওনাদের বাড়িটা?’
‘ঐতো ওই বাড়িটা – মিষ্টির দোকানের উল্টোদিকের বাড়িটা দেখিয়ে বললেন ভদ্রলোক।’
‘ওহ তাই; ঐখানে দাঁড়িয়ে বাবা একতলা থেকে ডাকতেন – অশোকদা! অশোকদা!’
‘হ্যাঁ; সব ভাই মারা গেছেন। সবচেয়ে ছোট ভাই একমাস আগে মারা গেলো।’
‘খুব ভাল লাগল আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে।’
আমি হাত জোড় করে নমস্কার জানাতে সৌজন্যমূলক হাসি হেসে মানুষটি দোকানের ভেতরে চলে গেলেন।
আমি বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাম অবাক হয়ে। ওই বাড়ির নাতি আমি। হলুদ রঙের তিনতলা পুরোনো আমলের বাড়ি; বাইরে বেরিয়ে থাকা কড়ি বরগা একতলা ও দোতলা কে আলাদা করে চিনিয়ে দিচ্ছে। জানলা গুলো সেই আগেকার দিনের adjustable opening এর সুবিধে যুক্ত। গাঢ় সবুজ রঙের সদর দরজা ও জানালা। তেত্রিশ বছর আগে শেষ এসেছিলাম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর “অর্ধেক জীবন” মনে পড়ে যাচ্ছে।
ওই সদর দরজা দিয়ে ঢুকে সরু দালানের শেষে আর একটা দরজা; সেটাই আসল দরজা ছিল। ঢুকে ডানদিকে চৌবাচ্চা; উঠোন আর দালান। একতলায় দুটো ঘর; একপাশ দিয়ে ওপরে যাবার সিঁড়ি।
যতদূর মনে পড়ে তিনতলায় আমরা থাকতাম। মা থাকলে সব বলে দিত; কিন্তু মা তো এখন না ফেরার দেশে। ফলে এখন মায়ের মুখে শোনা গল্পের স্মৃতিই ভরসা। শেখ ওয়াজেদ আলীর ভাষায় ‘কোনো মায়ামন্ত্রবলে সেই সুদূর অতীত’ যদি আবার ফিরে পেতাম; কী ভালই না লাগত!
এই রাস্তায় আমার বাবার হাত ধরে বহু হেঁটেছি। খুব সম্ভবত ১৯৭৪ বা ৭৫সাল অবধি আমরা ঐ বাড়িতে ছিলাম। আমার মা ওই বাড়ির বউ হয়েআসেন ১৯৭০ সালে; আমার জন্ম ১৯৭১ সালে। রাস্তাটা একপ্রান্তে এ পি সি রোড থেকে শুরু হয়ে ভেতর দিক দিয়ে গিয়ে মহাত্মা গান্ধী রোড এ গিয়ে মিশেছে।সেখান থেকে ডানদিকে কিছুদূর গেলে কলেজ স্ট্রিট; বামদিকে শিয়ালদহ উড়ালপুল।
তন্ময় হয়ে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছি। চোখের সামনে জলছবির মতো কিছু স্মৃতি ভেসে উঠছে। খুব সামান্যই মনে পড়ে। আমার একটা তিন চাকার সাইকেল ছিল। তখনকার দিনে ওগুলো ছিল লোহার তৈরি। ওটা সারাক্ষণ চালাতাম। আরও টুক টাক স্মৃতি। দিদি রুবুর সাথে মারপিট আর বদমাইশি। তারপর মার আর বকুনি। বড়জেঠুরা দক্ষিণেশ্বর যাচ্ছেন; বায়না ধরলাম আমিও যাব। কেউ বাজার গেলেই বায়না ‘আমিও যাবো’ । এইসব কত অস্পষ্ট টুকরো টুকরো স্মৃতি!
তন্ময় হয়ে এইসব ভাবছি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। এই সময় একজন মুসলমান ভদ্রলোক গলির ভেতর দিক থেকে বেরিয়ে এলেন। পঞ্চাশের আশেপাশে বয়স; কাঁচাপাকা চুল ও দাড়ি; পরনে ফুল হাতা শার্ট ও ট্রাউজার। ভদ্রলোকের গন্তব্য এ পি সি রোডের দিকে। আমাদের বাড়ির ঠিক উল্টোদিকের বাড়ির পাঁচিলে শাসকদলের এক স্থানীয় বহু পরিচিত নেতার ছবি সহ একটা ছোট্ট বোর্ড আটকানো হয়েছে। সেইদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে তারপর আমার দিকে ফিরে ভদ্রলোক হাসিমুখে হঠাৎ বলতে শুরু করলেন:
‘আমাদের দেশে এদের এক নেতার পাঁচটা বউ, জানেন! ছেলেগুলো সব মেশিন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়; পুলিশ ওদের ভয় পায়।’
কিছুটা অবাক হয়ে শুনছিলাম। সাধারণভাবে অপরিচিত মানুষের সাথে কথাবলার সময় আমার মুখে একটা সৌজন্যমূলক হাসি রিফ্লেক্স একশন এর মত চলে আসে। একেবারে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। বললাম,
‘তাই! ছেলেগুলোকে পুলিশ ভয় পায়?’
‘অবশ্যই। না হলে আর বলছি কি! দেশে ওর বাড়ি দেখলে আপনার মাথাখারাপ হয়ে যাবে।’
‘তাই? বিশাল বাড়ি?’
(দুদিকের বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে) ‘এসব বাড়ি যা দেখছেন সেগুলো পায়খানা ওর কাছে। এইরকম (sine curve এর মত করে হাত ঘুরিয়ে) ভাবে সিঁড়ি উঠে গেছে নিচ থেকে ওপরে; পেল্লায় সে বাড়ি। কোথা থেকে আসে এতপয়সা? আর এইসব লোকগুলোকে নিয়ে সরকার কি করে চলেছে বলুন তো!’
ভদ্রলোকের মুখে সৌজন্যমূলক হাসিটা কিন্তু লেগেই আছে। এই প্রসঙ্গে সেরকম কিছু তথ্য আমার কাছে নেই যাতে আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে। প্রসঙ্গটা পরিবর্তন করা দরকার। তাই মুখের হাসি বজায় রেখে আমাদের হলুদ বাড়িটাকে দেখিয়ে বললাম,
‘জানেন এই বাড়িতে আমার ছোটবেলা কেটেছে। এটা আমার বাবার পৈতৃকবাড়ি। আমার তিন বা চার বছর বয়েসে বাবা এই বাড়ি থেকে আমাকে আর মাকে নিয়ে বেরিয়ে গিয়ে অন্য জায়গায় বসবাস শুরু করেন।’
‘ওহ তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ! বাবা চলে গেছেন ২০১১ তে; মা ও চলে গেলেন এই জানুয়ারি তে। হঠাৎ মনে হলো আমাদের পুরোনো বাড়িটা যেখানে আমাদের বাবা; জেঠু আর ঠাকুরদারা ছিলেন সেটা একবার দেখে আসি। তাই আজ দেখতে এসেছি।’
‘খুব ভালো করেছেন। আমিও ছোটবেলায় এখানে থাকতাম। এখন মা বাবা দেশে থাকে। বাবা ১১৫ আর মা ১০০।’
‘তাই!!!! ওনারা জীবিত আছেন? আপনি খুব ভাগ্যবান। ঈশ্বরের আশীর্বাদ আছে আপনার ওপর।’
‘হ্যাঁ বলতে পারেন। এখন এখানে ব্যবসা করি। আর সপ্তাহের শেষে শিরাকোল চলে যাই। দেশে অনেক জমি জায়গা আছে।’
‘ফ্যামিলি? সবাই দেশে?’
‘হ্যাঁ। ওরা সবাই দেশে। চলুন কিছু খাওয়া যাক। কি হবে পয়সা! কিছুই তো নিয়ে যাব না।,
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। কয়েক সেকেন্ড পরে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললাম –
‘চলুন ওই তো পাশেই দোকান। মিষ্টি খাওয়া যাক।’
দুজনে গিয়ে মিষ্টির দোকানে বেঞ্চিতে বসলাম। উনি মিষ্টির দোকানের ছেলেটিকে বললেন,
‘ভালো দেখে মিষ্টি দাও আমাদের দুজনকে।’
বললাম,
‘আমি খাওয়াব কিন্তু!’
‘না না একদম নয়। আমি খাওয়াব।’
মিষ্টির দোকানের ছেলেটা বলে উঠলো,
‘ভালো ক্ষীরকদম আছে; দিই দুটো করে?’
‘হ্যাঁ দিন।’
বাড়ি থেকে মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে বেরিয়েছিলাম, ফলে অতটা ক্ষিদে ছিল না। তবুও মিষ্টিগুলো খেতে খুব ভাল লাগল। উত্তর কলকাতার মিষ্টি আর নোনতা দুই ই আমার বরাবরের প্রিয়। সিঙ্গারা পাগল আমি পাশে ঝুড়ি দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সিঙ্গারা আছে?’
‘হ্যাঁ আছে।’
‘খাবেন নাকি? আমি ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম।’
‘না না, আমি বিরিয়ানি খেয়েছি পেট ভরে।’
মনে পড়ে গেল ঐদিন ছিল শুক্রবার।
‘ও আচ্ছা! নামাজ পড়ে তারপর খেয়েছেন। আপনাদের তো রোজা শেষ হয়ে গেল কয়েকদিন আগে।’
‘হ্যাঁ। খুব ক্ষিদে পেয়ে গিয়েছিল। পেট ভরে বিরিয়ানি খেয়ে নিয়েছি।’
মিষ্টির দোকানে দাম মেটালেন উনি। কিছুতেই আমাকে দিতে দিলেন না।দুজনে বাইরে এসে দাঁড়ালাম আমাদের বাড়ির ঠিক সামনে। উনি বললেন,
‘চলুন না আমার ফ্যাক্টরিতে। এই কাছেই ক্যালকাটা লজ এর পাশেই। চলুন নিয়ে যাই আপনাকে।’
‘না না, আরেকদিন নিশ্চই যাব। আজ আমাকে আবার কলেজ স্ট্রিট যেতে হবে; কিছু কাজ আছে। ভীষণ ভাল লাগল আপনার সাথে পরিচয় হয়ে। আমি মুকুল মুখার্জি। আপনার নাম?’ হাত জোড় করে নমস্কার করার ভঙ্গিতে বললাম।
‘আমার নাম সাহাবুদ্দিন, এস এ এইচ এ বি ইউ ডি ডি আই এন।’
‘খুব ভালো থাকবেন। আবার দেখা হবে।’
‘আপনিও ভালো থাকবেন। শিরাকোলে চলে আসবেন অবশ্যই। একদম শহরের মাঝখানে। আমার নাম বললেই দেখিয়ে দেবে সবাই। সব ঘুরিয়ে দেখাব আপনাকে। চলি।’
‘নিশ্চয়ই আসব।’
সাহাবুদ্দিন এগিয়ে চললেন এ পি সি রোডের দিকে। মসজিদ পেরিয়ে গেলেন। একটু দূরে গিয়ে জন অরণ্যে মিলিয়ে গেলেন।
অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম সেইদিকে। জানি না আর কোনোদিন দেখা হবে কিনা। হয়তো হবে না। জীবনে যে কত বিচিত্র ঘটনা ঘটে যায় যার কোন ব্যাখ্যা হয় না। ঘটনাটা কি নেহাতই কাকতালীয়? তেত্রিশ বছর পর বাড়ির নাতি এসেছে; বাড়ির মানুষগুলো থাকলে তো মিষ্টিমুখ করাতেনই। সেই কাজটা সাহাবুদ্দিন করে চলে গেলেন। কি অদ্ভুত! সেদিন কি তবে বাবা কিংবা মা কিংবা বড় জেঠু কিংবা আমার কোনো স্বর্গীয় প্রিয়জন সাহাবুদ্দিনের মাধ্যমে আমাকে মিষ্টিমুখ করালেন? উনি কি আমার মা বাবার প্রেরিত দূত? কেনই বা সাহাবুদ্দিন হঠাৎ আমার সাথে হাসিমুখে গল্প করতে শুরু করলেন? বিশেষ করে আজকের এই স্বার্থান্বেষী পৃথিবীতে? অফিস যাওয়ার সময় ক্যাব এ দেখি যখন একজন চেঞ্জ এর অভাবে ভাড়া দিতে পারছেন না তখন কেউ এক টাকা দিয়ে সাহায্য করে না। সেখানে উনি আমাকে নিঃস্বার্থ ভাবে মিষ্টি খাইয়ে চলে গেলেন! নাহ, মানতেই হবে মা বাবা আমার সাথেই আছে; চুল্লীর আগুন শুধু শরীর কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু ওদের আত্মাকে নয়। সেইজন্যই তেত্রিশ বছর পর আমি আমার ঠাকুরদার বাড়ি এসে কিছু না খেয়ে চলে যাব; সেটা ওনারাও বরদাস্ত করতে পারেননি মনে হয়!
জীবনে হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই ধরনের ঘটনাগুলো যেন জীবনের ঘানি টানার একঘেয়েমির গুমোট গরমের মাঝে এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া। মনটা একটু ভাল করে দেয়। নিজের ও মনে হয় – মানুষ হিসেবে তাহলে খুব একটা খারাপ নই; নাহলে এভাবে ভালবাসা দরজায় এসে দেখা করে যেত না।
এইসব ভাবতে ভাবতে এ পি সি রোডের দিকে পা বাড়ালাম যেখানে গাড়ি রাখা আছে। কলেজ স্ট্রিট-এ বই কিনতে হবে; তারপর বাড়ি ফেরা। আজ এটাও উপলব্ধি করলাম কেন উত্তর আমাকে চুম্বকের মতো টানে।
Very nice description…..deep love and attachment with your parents…..you are still in that blues, and why not…….Only disconnect is why visiting ancestral house after long 33 years, staying so close at Chandannagore?
আরে সুদীপ, বহুদিন পর তোমার সাড়া পেলাম।ভীষণ ভালো লাগছে।
Narrated very well!! Proud to be your neighbour Mukul da.
থ্যাংক ইউ প্রসেনজিৎ।