মৌমন মিত্র
নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র
অষ্টমীর অঞ্জলির শেষ আর দুই ঘন্টা পর সন্ধি পুজো এখন সবাই কি করবে? কেউ ছবি তুলছেন। কেউ প্রসাদ খেতে খেতে স্টেজ রেডি করছেন সান্ধ্য অনুষ্ঠানের জন্য। বুলু কাকিমা, শ্রেয়া দিদি, সুন্দর দিদা, সবাই কত ব্যস্ত!
আমি এই কমপ্লেক্সে নতুন। বছর দুই হল এসে উঠেছি ভাড়া বাড়ি থেকে।
আমার বাবার একটা ফ্ল্যাট বাড়ি আছে। এই কমপ্লেক্সে। সেই সূত্রেই সবাই আমাকে, আমার স্বামী ঋদ্ধি আর আমার মেয়ে চূর্ণীকে চেনে। নয়তো এত বড় কমপ্লেক্সে আমরা পাত্তাই পেতাম না।
‘গতকাল অনুষ্ঠান ভাল হয়েছিল’ আমার পিঠে হাত রেখে বলল অরুণিমাদি।
আনন্দে আমার মনটা ভরে গেল। অরুণিমাদি ভাল বলছে? তাহলে নিশ্চয়ই কিছুটা পেরেছে চূর্ণী। অরুণিমাদির কাছে ভরতনাট্যম শিখছে আমার মেয়ে। দু’বছর হল। এক মাস আগে পৌলমীদি বলল, ‘তোর মেয়েটাকে দিবি? আমি একটা নৃত্যনাট্য করব দুর্গা পুজোয়।’
পৌলমীদিকে আমি তেমন চিনি না। ফর্সা। গোলাপি ঠোঁট। খাদির শাড়ি পরে। দিনরাত ব্যস্ত। স্বভাবে বেশ রাশভারী একটা ব্যাপার রয়েছে। কড়া দিদিমণির মতো চাউনি। দেখলেই ভয় করে।
‘অরুণিমাদিকে জিজ্ঞেস করে নিই? ও তো অরুণিমাদির কাছে শিখছে।’ আমি আমতা আমতা করে বলেছিলাম।
পৌলমীদি বলেছিল, ‘বেশ। জানাস। পরের সপ্তাহ থেকে রিহার্সাল শুরুকরব, কেমন?’
অরুনিমাদি রাজি হয়েছিল। বলেছিল, ‘দে না। ভাল তো। এখন বয়স কম। শিখুক। যত নাচবে তত ফ্রি হবে মঞ্চে।’
সে না হয় শিখল। কিন্তু, এই আট বছরের চূর্ণীকে নিয়ে কত জায়গায় দৌড়ব? আজ অরুণিমাদির ক্লাস। আগামীকাল রিহার্সাল। পরশু চেস ক্লাস। তার পরের দিন সাঁতার। ঋদ্ধি তো অফিস ট্যুরে অর্ধেক সময় শহরের বাইরে। আমাকেই দৌড়তে হয় সর্বত্র।
যাই হোক। মনে মনে কিন্তু আমি নেচে উঠেছিলাম! পৌলমীদির ট্রুপে মঞ্চে নাচ করার মধ্যে একটা আলাদা আভিজাত্য রয়েছে!
আজ অরুণিমাদি প্রশংসা করল। আমার খাটুনি সার্থক। চূর্ণীকে একথা বললেই ও কোমরে হাত দিয়ে পাকাবুড়ির মতো বলবে, ‘তোমার খাটুনি? আচ্ছা? আর আমি কিছু করি না বুঝি?’ যা এক একটা প্রশ্ন করবে এই বয়সে, আমি তো আমার ছোটবেলায় সেই তুলনায় গাধা ছিলাম মনে হয়।
‘তবে কী জানিস, একটা কথা বলি। তুই যতই পৌলমীদি পৌলমীদিকর, ও কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত বোঝে না। ওর নাচের স্টাইলটা সুন্দর। পপুলার স্টাইল বলা যায়। অনুষ্ঠানেও বহুশ্রুত গান বেছে নেয় নাচের জন্য।’ আমাকে অরুণিমাদি কথাটা বলল কেন? ও কি টের পেয়েছে আমি পৌলমীদির সঙ্গে বেশি বন্ধুত্ব করছি আজকাল? করব নাই-বা কেন বলুন? পৌলমীদি কমপ্লেক্সে অনেক বেশি বিখ্যাত। অনুষ্ঠান করে প্রচুর। এই তো, এই তো মাস তিনেক পরে আবার অনুষ্ঠান করবে। আমাকে বলেও রেখেছে।
‘চূর্ণীকে দিস। ও ভাল তৈরি হচ্ছে। ওর ভেতরে নাচ আছে। নার্চার কর। বুঝলি?’ অন্যদিকে অরুণিমাদির নাচের স্টাইল ভীষণ সেকেলে। আর, অত খুঁটিনাটি শিখে হবেটাই বা কী!
আমি অপ্রুস্তুত একখানা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বললাম, ‘কী যে বলো অরুণিমাদি! আমি আবার কোথায় পৌলমীদি পৌলমীদি করি? রিহার্সাল এর পর যেটুকু কথা হত।’
‘আমি সব বুঝি।শোন। তোকে আমি বড় দিদির মতন ভালবাসি। আমি জানি। রবীন্দ্রসঙ্গীত অন্তর থেকে ভাল না বাসলে তোর কাছের মানুষ হওয়া কঠিন। বুঝেছিস?’ ব’লে অরুণিমাদি খিলখিল করে হেসেউঠল।
ঠিক তখন ঋদ্ধি কোথা থেকে এসে হাজির। ‘তোমরা এক সঙ্গে দাঁড়াও। সাদা লাল পাড় শাড়ি পরে আছ। ছবি তুলে দিই।’ আমি আজ অরুণিমাদির জন্য একটা শাড়ি এনেছি। ব্যাগটা অরুণিমাদিকে দিয়েবললাম, ‘এটা ধরো। তারপর ঋদ্ধিকে পোজ দাও। জলদি করো। ও যা ছটফটে! দুম করে অন্যদিকে চলে যাবে। খুঁজেই পাওয়া যাবে না।আমাদের ছবিও তোলা হবে না।’ অরুণিমাদি শাড়ির ব্যাগটা পাশের চেয়ারে রেখে আমাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘আয়। খুব মিষ্টি দেখাচ্ছে তোকে।’
‘লাল টিপ পরেছি। দ্যাখো। তুমি সব সময় বলো, টিপ পরিস না কেন। টিপ পরিস না কেন। আজ অষ্টমী। ভাবালাম আজ পরি।’
‘বেশ করেছিস। কী মিষ্টি লাগছে মুখখানা।’ ব’লে অরুণিমাদি আমার গাল টিপে ধরল। অরুণিমাদি শ্যামবর্ণা। চোখে অদ্ভুত দীপ্তি! হাসিতে ব্যক্তিত্ব ছড়িয়ে থাকে। আমরা গা ঘেঁষে পোজ দিলাম দু’জন।
এই মুহূর্তটা খুব সুন্দর একটা অ্যাঙ্গেল থেকে তুলেছিল ঋদ্ধি। একটি স্বতঃস্ফূর্ত ক্লিক।
এর কয়েক মাস পর জানতে পারলাম, অরুণিমাদি বিদেশে চলে যাবে। লন্ডন। কাজের সূত্রে। শুনেই আমার তো কী মন খারাপ! এই এত বড় কমপ্লেক্সে আমি একা ভীষণ হয়ে যাব। সারাক্ষণ কি আর মায়ের সঙ্গে ঘুরতে ভাল লাগে? তা ছাড়া মায়ের বন্ধুত্ব সব বয়স্ক কাকিমাদের সঙ্গে। আমাকে ওই বৃত্তে মোটেও মানায় না।
মা ফোনে কথা বললে, অথবা মায়ের সঙ্গে দেখা হলে আজকাল কথা বলি কম। ভাল লাগে না। আবার ভাবি, এই এত বড় পাড়ায় একমাত্র অরুণিমাদি থাকবে না বলে এত হেদিয়ে মরছি কেন, কে জানে!
আসলে অরুণিমাদি শুধুমাত্র চূর্ণীর নাচের গুরু ছিল, এমন নয়। চূর্ণীর অভিভাবকও বলা যায়। সারাক্ষণ আমার নামে অরুণিমাদিকে নালিস করত চূর্ণী। আর, সে সব নালিস শুনে দি আমাকে বকলে চূর্ণী খুব মজা পেত। গুরু শিষ্য সম্পর্কের বাইরেও ওদের অনেকরকম ভাল মন্দ জুড়ে গিয়েছিল। আমার অজান্তে।
কয়েকদিন আমার মন মরা ভাব দেখে মা আন্দাজ করতে পারে খানিকটা। একদিন বাবা কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর আমাকে ঘরে ডাকল মা। গেলাম। মা তখন পুজো দিতে বসেছে। কাজের মাসি দরজা খুলে দিল। আমি ঘরে ঢুকতেই প্রশ্ন, ‘কী হয়েছে রে তোর? অরুণিমা চলে যাবে লন্ডন। তাই মন খারাপ?’
আমি ঘরে ঢুকে মায়ের নানা রকম পত্রিকাগুলো ঘাঁটছি। মা এখনও কতরকম পত্রিকা পড়ে! আমি তো আজকাল সবই ডিজিটালি পড়ে ফেলি।ভাল নয় অভ্যেসটা। মা আরও যেন কী সব বলে যাচ্ছে। আমি অন্যমনস্ক। মা ফের গলা চড়িয়ে জানতে চাইল, ‘কথার উত্তর দিচ্ছ নাকেন?’
‘কী বলব?’
‘জিজ্ঞেস করছি যে সেই থেকে, কী হয়েছে? এত মন মরা হয়ে থাকিস কেন আজকাল? অরুণিমা চলে যাবে বলে?’
আমি মাথা নাড়লাম। তার পর মায়ের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে বললাম, ‘শুধু সেটা কারণ নয় মা।’
‘তবে…?’
মা বেশ চিন্তিত।
‘আমরা ব্যাঙ্গালুরু চলে যাব।’
‘মানে?’ মা চমকে ওঠে আমার কথা শুনে।
‘মানে আর কী?’ আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার পত্রিকায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলাম।
‘এত সুন্দর ফ্ল্যাটটা কিনলি। ফাঁকা পড়ে থাকবে? কত দিনের জন্য চলে যাবি? কবে যেতে হবে?’
‘ঋদ্ধির একটা প্রমোশন হয়েছে। এটা যদিও ভাল খবর। মাস তিনেক পর বেঙ্গালুরুর অফিস ওকে জয়েন করতে হবে। এক দু’বছর মে বি।সময়টা বাড়তেও পারে। কমতেও পারে। জানোই তো। আই টি সেক্টরে চাকরির মাথা মুণ্ডু নেই। কবে যে কাকে কোথায় পাঠিয়ে দেয়, ঠিক নেই।’
উত্তরটা শুনে মা কী বলবে বুঝতে পারছে না বোধহয়। একদিকে জামাইয়ের প্রমোশনে খুশি হবে। অন্যদিকে মেয়ে দূরে চলে যাবে। মেজাজ খারাপ করে ঠাকুর পুজো দিতে দিতে আড়ালে মায়ের চোখে জল। সত্যিই! মায়েদের যে কী জ্বালা! মা হয়েই বুঝতে শিখছি।
২
ইতিমধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেল। ব্যাঙ্গালুরু যাওয়ার আগে তিন মাস পৌলমীদির সঙ্গে হঠাৎই দারুণ বন্ধুত্ব জমে উঠল। এক সঙ্গে কাফে যাওয়া। সিনেমা দেখা। মলে শপিং করা। ঋদ্ধি অবাক হয়ে একদিন বলল, ‘বাবা! তোমরা তো দেখছি হরিহর আত্মা হয়ে উঠছ! কী ব্যাপার? আজকাল মেয়েকে, আমাকে পাত্তাই দাও না। চূর্ণীও গতকাল বলল, মামমাম এখন সারাদিন শুধু পৌলমী মাসির গল্প করে। কেন গোবাবা?’
‘বললে না কেন, আমরা হয়তো তোর মামমামকে সময় দিই না। তাই…’
‘জানতাম। তুমি এটাই বলবে।’
‘তা হলে বলতে এসেছ কেন? … অ্যাই জানো তো। পৌলমীদি প্রেম করছে।’ গোপন প্রেমের কথা বলতে এখনও গলা কাঁপে। শরীরে শিহরণ হয়।
কিন্তু, কথাটা শুনে ঋদ্ধি শুনে বেশ নিরুত্তাপ। ল্যাপটপের একটা কর্ড কয়েকদিন হল চলছে না। সাড়াই করতে বসল আমার পাশে বসে। দিনের শেষ। চূর্ণীকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি। আমি রিমোট হাতড়ে ওয়েব সিরিজ খুঁজছি। দেখব।
সারাদিন প্যাকিং করেছি ঝুঁকে ঝুঁকে। কোমরটা ধরেছে। ঋদ্ধির প্রতিক্রিয়া না দেখে কনুই দিয়ে একখানা খোঁচা দিলাম। বললাম, ‘কী গো? কানে গেল কথাটা?’
ও বলল, ‘হ্যাঁ, শুনলাম তো…’ আমি ভুরু কুঁচকে বললাম, ‘তা…শুনে কিছু বললে না?’
‘কী বলব? স্বাধীন ভারত। এখানে কার কী বলার আছে?’
‘ধ্যাত! তুমি বড্ড বেরসিক!’
‘তুমিও হও। ভবিষ্যতে কাজে দেবে।’
‘মানে?’
‘পৌলমীদির মতো রাশভারী মেয়ে পরকীয়া করছে। তার ওপর তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছে। আমার কেমন ঠেকছে বিষয়টা।’ ঋদ্ধি কথাটা বলে প্লাস দিয়ে জোরে একখানা মোচড় দিল ল্যাপটপের তারে।
‘কেন? আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব না করার কী আছে? কী বলতে চাইছ তুমি?’
‘দ্যাখো, আমি যতদূর দেখেছি, পৌলমীদির নিজস্ব একটি বড়লোক, এলিট গ্রুপ আছে বন্ধুদের। হঠাৎ তাঁদের ছেড়ে তোমার সঙ্গে… আইমিন, আমরা কি তত বড়লোক?’
‘বন্ধুত্বে এগুলো ম্যাটার করে বুঝি?’
‘চারপাশে দেখে আজকাল তাই তো মনে হয়। কিন্তু, তুমি বলছ ম্যাটার করে না?’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঋদ্ধি তারটা নিয়ে কী যেন করেই চলেছে। আমি আর কথা বাড়াইনি। কী বলব! এত ট্যারা বেঁকা কথা আমি বুঝি না। কিছুক্ষণ পর আমার কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে বলল, ‘আমি জটিল ভাবে ভাবছি, তাই মনে হচ্ছে না, সোনা?’ আমি মাথানিচু করে বললাম,’হ্যাঁ।’ টিভি দেখতে ইচ্ছে করছে না। শুয়ে পড়ব।
ও আমার কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল,’জীবনটা, এই পৃথিবীটা জটিল না হলেই ভাল। তুমি সরল। সরলই থাকো। খুব সহজে বিশ্বাস করে ফেলো তুমি মানুষকে। সেটা ভাল নয়। মনের ভিতর প্রশ্নগুলো রেখেদেবে। প্রকাশ করবে না। সময়ই সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেয়। বুঝলে ম্যাডাম?’ কী জানি! আমি অত বুঝি না।
তার পর আলো আঁধারি। রাতভর ঘুম।
আজ পঁচিশে বৈশাখ। কমপ্লেক্সে জলসা বসেছে। কত দর্শক! আমি যাইনি। ঋদ্ধিকে পাঠিয়ে দিয়েছি। চূর্ণীও গেল সঙ্গে। আমি কী করে যাব? টানা দু’বছর পর কলকাতার ফ্ল্যাটে ফিরলাম। আজই। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতে মা এমন এক খানা কথা বলল আমাকে!
পাড়া সুদ্ধ নাকি রটে গিয়েছে। পৌলমীদি আলাদা হয়ে গিয়েছে। এখন একা থাকে। সে হোক। আমি কী করব? মাকে জিজ্ঞেস করলাম। মা কড়া গলায় বলল, ‘তুমি কী করবে মানে? তুমি এখানে গুরুতর ভাবে জড়িত। তুমিই নাকি পৌলমীদিকে ইন্ধন দিয়েছ। বলেছ এই সিদ্ধান্ত নিতে। কথাটা সত্যি?’
আমি গলায় বিরক্তি এনে বললাম, ‘উফফ মা! তোমার এ সব গুজব বিশ্বাস হয়?’
‘হ্যাঁ। কেননা বার বার তোমাকে বারণ করা সত্ত্বেও তুমি তোমার ফ্ল্যাটের আর একটা এক্সট্রা চাবি দিয়ে গেলে কাকে? আদরের পৌলমীদিকে!’
‘হ্যাঁ। তুমি আর বাবাই তো বলেছিলে, বৌদির ডেলিভারির সময় থাকবে না…।’ আমার কথা থামিয়ে মা আরও বড় তর্ক শুরু করে দিল।
‘হ্যাঁ। অবশ্যই বলেছি। আমি না গেলে তোমার ভাইয়ের সংসারে কে সামলাত সব? বোঝো না?’
‘বুঝব না কেন? সেইজন্যই পৌলমীদিকে চাবিটা দিয়ে দিয়েছি।’
‘বাহ বাহ। অমনি তুমি ঘরের চাবি যার তার হাতে তুলে দিলে? এবার ঠেলা সামলাও। পৌলমীর হাজবেন্ডের দিকে তাকাতে লজ্জা করে আজকাল।’ মা গলা চড়িয়েই যাচ্ছে। আমিও থামিনি।
‘যার তার হাতে চাবি দিয়েছি, কেন বলছ? তুমি আর বাবা কলকাতায় এই সময়টা থাকবে না শুনে পৌলমীদি তো নিজেই বলেছিল, ও চাবি রেখে দেবে। আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না। আমার ঘরের চাবির সঙ্গে পৌলমীদির আলাদা হওয়ার সম্পর্ক কোথায়?’
মা এবার আমার মাথায় স্বজরে গাট্টা মেরে বলল,’মাথায় গোবর ঠাসা তোমার? গোটা কমপ্লেক্সে স্ক্যান্ডাল। লোকজন বলছে পৌলমী নতুন প্রেমিকের সঙ্গে রাত কাটিয়েছে। তোমার ফ্ল্যাটে। ছিঃ ছিঃ! লজ্জায় আমার মাথা কাটা যায়…।’
‘’ আমি বিশ্বাস করি না। একদম বিশ্বাস করি না। ‘’
‘’ তা বিশ্বাস করবে কেন? চিরটাকাল মা তোমার শত্রু। চার মাস এদিক ওদিক একটা মানুষের সঙ্গে ঘুরলে, বেড়ালে। হয়ে গেল। তাকে বিশ্বাস করে ফেলতে পারো। আর মা? মা কিছু বললেই ভুল। খারাপ। ‘’
এত তর্ক, বিতর্ক ভাল লাগছিল না। ব্যালকানি থেকে ঋদ্ধি ডাকছিল।আমি যেই মাকে বলতে গেলাম, আসছি, মা রেগেমেগে জোর গলায় বলেদিল,’’ আমি আসছি। এসে গিয়েছ। নিজের ঘর নিজে সামলাও। বিপদে পড়লে মাকে ডেকো না।’’
মায়েরা অমনি বলে। আমিও মেয়েকে শাসন করার সময় অমন চমকাই। তাই বলে কি মা পাশে থাকবে না আপদে বিপদে? তা হয়? দূর!
মা চলে গেল। আমি মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে এ সব ভাবলাম মনে মনে। ঋদ্ধি আবার ডেকেছিল।
কী ব্যাপার? বার বার ডাকছিল কেন?
আমি ব্যালকানিতে গিয়ে দেখি, সে এক কাণ্ড! ব্যালকানি ভর্তি পায়রার ডিম।
‘এ কী! এ সব এল কোথা থেকে?’ আমি অবাক চোখে ঋদ্ধিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।
‘খড়খড়ি তো লাগানো ছিল গোটা ব্যালকানিতে। কে খুলেছে খড়খড়িগুলো?’
পৌলমীদি? না না। পৌলমীদি তো বলেছিল একদিনও আমার ঘরে আসেনি। তা হলে? তাহলে কি মায়ের সন্দেহটা ঠিক?
এ সব মনে মনে ভাবছিলাম। ঋদ্ধি একটা ঝাড়ু চাইছিল। ও ব্যালকানি পরিষ্কার করতে করতে বলল, ‘এসেই মায়ের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করলে? কী হয়েছে?’
আমি বিরক্ত গলায় বললাম, ‘মায়ের কথা ছাড়ো তো! পাড়াময় সবাই নাকি বলছে পৌলমীদি আমার ঘরে ওর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে রাত কাটিয়েছে। আমার ফাঁকা ফ্ল্যাটটা দিনের পর দিন ব্যবহার করেছে।’
ঋদ্ধি অল্প হেসে বলল, ‘পৌলমীদির সঙ্গে কথা হলে সরাসরি জানতে চেও। ও তোমার ভাল বন্ধু হলে সত্যিটাই বলবে।’
আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। চুপচাপ। ভাল লাগছে না। ঋদ্ধি বলল, ‘কী হল? চুপ করে গেলে?’
‘তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি।’
‘কী?’
‘পৌলমীদি আলাদা হওয়ার পর থেকে আমাকে ফোন আর করে না।আমার খোঁজও নেয় না। আমার দুঃখ হয়েছে। ভেবেছি কলকাতায় ফিরে সরাসরি কথা বলব।’
ঋদ্ধি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,’তার আর প্রয়োজন হবে না।’
‘কেন? এভাবে বলছ কেন?’
‘পৌলমীদির সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে হবে না আর। একটু বুদ্ধি খাটিয়ে বোঝার চেষ্টা করো। আমি তোমাকে বলতে চাইনি। তুমি কষ্ট পাবে। কিন্তু, তোমাকেও বুঝতে হবে। জীবনে সহজ, সরল হলে ঠকতেহয়। মানুষকে অবিশ্বাস করা পাপ। কিন্তু অবিশ্বাস করে সামান্য যাচাই করার মধ্যে কোনও ভুল নেই……।’ একটু থেমে ঋদ্ধি আরও বলে যায়, ‘বেডরুমের আলমারির লোয়ার ড্রয়ারটা খুলতে হবে না। আমি আগামীকাল পরিষ্কার করে রাখব।’
‘কেন? কী দেখেছ ড্রয়ারে?’
‘পৌলমীদির কিছু গোপন জিনিসপত্র রয়েছে। কী রয়েছে, জানতে চেওনা।তোমার ভাল লাগবে না। কিছু সত্যি অজানা থাক।’
‘বলে দাও। তুমি আমাকে সতর্ক করেছিলে অতীতে। আমিই শুনিনি।’
এর পর অনেকগুলো পয়লা বৈশাখ, পুজো কেটে গেল।
ঋদ্ধি আমাকে কোনওদিন বলেনি লোয়ার ড্রয়ারে ও কী পেয়েছিল? আমিও ড্রয়ার খুলে খুঁজতে চাইনি। পৌলমীদি আমার চোখে ছোট হয়ে যাবে? আমাকে এভাবে সামান্য কারণে ব্যবহার করল দি? না না। থাক।আমার দেখার দরকার নেই।
এই ঘটনার কয়েক মাস পর পৌলমীদি নীচে রেসেপশন ডেস্কে আমার ঘরের চাবি রেখে চলে গিয়েছিল। সিকিউরিটি আমার ঘরে এসে দিয়ে গিয়েছিল। এরও বেশ কয়েক মাস পর অরুণিমাদি আমাকে ফোন করল। আমার জন্মদিন ছিল সেইদিন।
পৌলমীদির কথা ব’লে কেঁদে দিই। অরুণিমাদিকে বললাম, ‘পৌলমীদি আমাকে একবার বলতে পারত। ও আমার ঘরে ওর বন্ধুর সঙ্গে থাকতে…’
আমার কথা থামিয়ে অরুণিমাদি সামান্য হেসে বলল, ‘তোকে বলেছিলাম না, পৌলমী নাচ বোঝে। রবীন্দ্রসঙ্গীত নয়। দুটোর মধ্যে কী ফারাক আমি জানি না। তবে এ কথা ঠিক, রবীন্দ্রসঙ্গীত বুঝলে তোর মতো মনের মানুষটাকে ঠকানো যায় না… ’
সেইদিন মাঝ রাতে খুব জোরে বৃষ্টি নামল। ঘুম নেই চোখে। যে সব রাতে এরকম ঘুম আসে না, আমি গীতবিতান পড়ি। মা শিখিয়েছিল ছোটবেলায়। মা বলত, গীতবিতান পড়াটাও একটা শিল্প। কলা।
‘আমি তখন ছিলেম মগন ঘুমের ঘোরে
যখন বৃষ্টি নামল তিমির নিবিড় রাতে ’
আজ বই খুলে এই লাইনটা চোখে পড়ল। রাগ – কীর্তন।
কষ্টকে কীর্তন আঙ্গিক দিতে কতটা কষ্ট পেতে হয় কবি? কতটা কষ্ট পেতে হয়? ঠকতেও হয়, না?