মতিয়ূর রহমান
পাঠানখালি, সুন্দরবন, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা, পশ্চিমবঙ্গ
_____
জীবনে প্রথমবার গোলপাতা দর্শন করে দর্শনার্থীরা হতাশ হয়ে ভাবতেই পারে—গোলপাতার গোল পাতাটি কোথায় রে বাবা! যে পাতা মোটেও গোল নয়, তারই নাম হল ‘গোলপাতা’! ‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন’—সে তো আকছারই হয়, তা বলে পুরো লম্বা পাতার এক গাছের নাম কিনা গোলপাতা! কী করে তা মানা যায়!
“চিকিৎসা-সঙ্কট” গল্পের তারিনী কবিরাজের অমর স্রষ্টা রসসাহিত্যিক রাজশেখর বসুর কাছে পরিপূর্ণ ঋণ রেখেই বলতে হচ্ছে — হয়, এইরকম অনেক কিছুই হয়, লোকে কেবল zanti পারে না!
সুন্দরবনের অসংখ্য উদ্ভিদের মধ্যে একটি বিশেষ উদ্ভিদ হল ‘গোলপাতা’। এর বিশেষত্ব নানা কারণে। কীভাবে বা কী করে যে এর এমন গোলমেলে নাম হল, তা জানতে পারিনি। পৃথিবীর যেখানে যেখানে এরা জন্মায়, সেখানকার আঞ্চলিক ভাষা অনুযায়ী এদের ভিন্ন ভিন্ন নাম আছে। এই নামটি ভাটির দেশের অবিভক্ত সুন্দরবন-লাগোয়া মানুষের দেওয়া নাম। তবে এ কথাও ঠিক—নামের আবার কারণ-অকারণ কী! নাম হল, যাকে বলে নাম! আর কে জানে, নামে কী এসে যায়! আমার তো মনে হয়—নাম হয় কারণে, আবার নাম হয় অকারণেও।

সারা দুনিয়া জুড়ে এই সঙ্কটের জন্য জীববিজ্ঞানে দ্বিপদ নামকরণ বা বিজ্ঞানসম্মত নামটাই প্রচলিত, যা সংশ্লিষ্ট জীবটির বিশ্বপরিচয় বহন করে। যাতে বিশ্বের সবাই ওই একটি নামের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জীবটিকে সনাক্ত করতে পারে। সে কারণে বিজ্ঞানের আলোচনায় এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিবরণে বিজ্ঞানসম্মত নামটির গুরুত্ব অনেক।
‘গোলপাতা’ হল সুন্দরবনের একটি একবীজপত্রী উদ্ভিদ। গোলমেলে ব্যাপারটা হল এই যে—এর পাতা এবং গাছ উভয়ের নামই ‘গোলপাতা’। এর পাতাকে কেউ বলে না ‘গোলপাতা পাতা’ অথবা ‘গোলপাতার পাতা’। যেমন— “গোলপাতা ম্যানগ্রোভ অরণ্যের এক সহবাসী ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ। ছাউনির কাজে গোলপাতার উৎকৃষ্ট ব্যবহার আছে। এইরকম আর কী…”
তালপাতা, নারকেলপাতা বললে বোঝা যায় তাল এবং নারকেল — এই দুটি গাছের পাতার কথাই বলা হচ্ছে, অন্য কিছুর কথা নয়। কিন্তু এখানে ‘গোলপাতা’ — গাছ না তার পাতা, কোনটা ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই প্রশ্নটা ঝুলেই থাকে। এ কথাও ঠিক যে, গোলপাতা গাছের পাতাই সব। বাহ্যিক দৃষ্টিতে পাতাটাই যেন সম্পূর্ণ গাছ, এবং বস্তুত তাই। আবার এর ফলকে লোকে বলে ‘গোলফল’। তখন কিন্তু বলে না যে, ‘গোলপাতা গাছের ফল’ অথবা ‘গোলপাতা ফল’। যদিও সে ফল দেখতে মোটেও গোল বা গোলাকার নয়, তবুও। ফলের নামেই মনে হতে পারে গাছটার নামই যেন ‘গোল’। যার কোনো কিছুই গোল নয়, এমনকি পাতাও নয়, তার নাম কিনা ‘গোলপাতা’। তাই এ গাছের নামটা যে অনেকখানি গোলমাল বাধিয়েছে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
তাল, খেজুর, সুপারি ও নারকেল — এই জাতীয় গাছগুলোকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে পামি (Palmae) বলে। আসলে এরা অ্যারিকেসি (Arecaceae) গোত্রের একবীজপত্রী উদ্ভিদ। সুন্দরবনে মাত্র দুই প্রকারের পামি পাওয়া যায়। স্থানীয় নামে যা হেঁতাল বা হেন্তাল এবং বিজ্ঞানসম্মত নামে Phoenix paludosa। আবার এরই স্থানীয় নাম হল বোগড়া।
অপর পামি উদ্ভিদটির স্থানীয় নাম গোলপাতা, যা আলোচ্য উদ্ভিদ। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম Nypa fruticans। Nypa গণ (Genus)-এর এই একটি মাত্র প্রজাতি (Species) — fruticans — কেবলমাত্র পৃথিবীর যে কোনো জোয়ার-ভাটা অরণ্যে, ম্যানগ্রোভ অরণ্যে, যেমন সুন্দরবনে, জন্মায়। ম্যানগ্রোভের চরিত্র থাকায় এদেরকে ম্যানগ্রোভ সহবাসী বা সহবাসী ম্যানগ্রোভও বলা হয়।
প্রথমবার নামটা শুনলে মনে হতেই পারে যে, এই গাছের পাতা গোল বা গোলাকার হবে। এইরকম গোলমেলে প্রত্যাশা আমিও করেছি উদ্ভিদটিকে যখন প্রথম চিনি এবং জানি। পাতার কথা যখন উঠলই, তখন সকাল সকাল বলে নেওয়া ভালো যে, এর পাতা প্রায় নারকেলপাতা সদৃশ। যার সোজাসরল অর্থ হল—গোলপাতা মোটেও গোল বা গোলাকার নয়। বাস্তবে তা বিস্তর লম্বা বটে, এমনকি নারকেলের থেকেও।

গোলমালের কিন্তু এখানেই শেষ নয়, আরও আছে। প্রায় সমস্ত ‘পামি’ বা পামজাতীয় উদ্ভিদে শক্ত ও কাষ্ঠল গুঁড়ি বা কাণ্ড দেখা যায়। বয়সের সাথে সাথে তার কাণ্ডটি বাড়ে এবং লম্বাও হয়। তাল, খেজুর, নারকেল, সুপারি ও পান্থপাদপ—সব রকমের পামে যেমনটি হয়ে থাকে। গোলপাতা হল আমার দেখা এবং জানা একমাত্র ব্যতিক্রমী পামি, যার এইরকম কাণ্ড হয় না। পামির রাজ্যে এ এক ব্যতিক্রমী ও অদ্ভুত কাণ্ডকারখানাও বটে।
গোলপাতার কাণ্ড কলাগাছের কাণ্ডের মতো মৃদু ও গ্রন্থিকাণ্ড। একটি কথা এখানে না জানালে বিষয়টি পরিষ্কার হবে না। তা হল—কলাগাছের কাণ্ড বাইরে থেকে দেখা যায় না। মাটির মধ্যে যে শক্ত ও গোলাকার ফুটবলের মতো অংশ থাকে এবং যার থেকে মূল বা শিকড় বের হয়, ওটাই হল কলাগাছের কাণ্ড। বাইরে থেকে যা দেখা যায়, তা প্রকৃতপক্ষে মরে যাওয়া, ঝরে যাওয়া কিংবা পুরোনো ও নতুন সব পাতার প্রলম্বিত ও একত্রিত পত্রমূল, যা ওই কাণ্ডসদৃশ গঠনটি সৃষ্টি করেছে কেবল তার পাতাগুলোকে উপরে মেলে ধরার জন্য। তা না হলে কলাগাছের পাতা মাটির সাথে ঘষত এবং তা গবাদিপশুর পেটেই চলে যেত। কলাগাছকে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন এবং নিজের হাতে কখনো তা ছাড়িয়েছেন, তাঁরা এ কথার সত্যতা জানেন বা ভালো বুঝবেন।
পরিণত গোলপাতা গাছের মাটির মধ্যে থাকা এই গ্রন্থিকাণ্ডের ব্যাস কমবেশি দুই ফুটের মতো। এর থেকেই বের হয় পর পর নতুন পাতা আর সময়কালে পুষ্পমঞ্জরিও। যার থেকে ধরবে গোলফলের কাঁদি। হ্যাঁ, অন্যান্য পামির মতো এদেরও কাঁদি হয় এবং তা আসে এর মাটির মধ্যের কাণ্ড থেকেই। কী কাণ্ড দেখুন তো, গোলপাতা কাণ্ড নিয়ে সাতকাণ্ডের এক প্রকাণ্ড কাণ্ডবর্ণন কী যথেষ্ট কাণ্ডজ্ঞানের পরিচায়ক হতে পারে! যতসব অদ্ভুত কাণ্ড!
এদের পাতার গোড়া বা পত্রমূল নারকেলপাতার মতো কাষ্ঠল এবং বেশ প্রশস্ত। কিন্তু সমগোত্রীয় উদ্ভিদের মতো এদের কাণ্ডটি মাটির উপর আসে না। আর সে জন্য তা বেড়ে লম্বা হওয়ার প্রশ্নও ওঠে না। যে কারণে গোলপাতাকে জঙ্গলে সব সময় একইরকম লাগে এবং মনে হয় গাছ মোটেও বাড়েনি। এই ভুল আমি নিজেও করেছি প্রথম প্রথম। পর পর তিনটে শীতকালে একই স্থানে গিয়েও দেখি গাছ একটুও বাড়েনি, কিন্তু ঝাড় বেড়েছে অনেকখানি। মাটির উপর শুধু দেখা যায় উদ্ভিদটির পাতার গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত। গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত এদের পাতার সর্বাধিক দৈর্ঘ্য নয় মিটার বা ত্রিশ ফুটের মতো, যা সাধারণভাবে অন্যান্য পামির তুলনায় অনেক বেশি লম্বা।
গোলপাতা গাছের গ্রন্থিকাণ্ডটি রসাল। ফুল-ফলের সময় এলে অন্যান্য পামির মতো এদেরও পুং ও স্ত্রী—দুই রকমের পুষ্পমঞ্জরি বা মোচ আসে। তালের মোচ কেটে তার থেকে যেমন রস সংগ্রহ করা হয়, তেমনি এদের মোচ কেটে তার থেকে সুমিষ্ট রস সংগ্রহ করা হয় থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশ ইত্যাদি দেশে। এই রস থেকে অ্যালকোহল (Alcohol) ও চিনি উৎপাদন হয়ে থাকে, যা হেক্টরপ্রতি আখের জমির উৎপাদনের তুলনায় অনেক বেশি। ভারতীয় বা পশ্চিমবঙ্গীয় সুন্দরবনে এই উদ্ভিদ থাকলেও তা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। মিষ্টি জলের স্বল্পতা ও অন্যান্য ভৌগলিক কারণে তার স্বাস্থ্য ও বাড়বাড়ন্ত তুলনামূলকভাবে বেশ খারাপ। বাংলাদেশের সুন্দরবনের গোলপাতা ও তার জঙ্গল অনেক স্বাস্থ্যবান। কারণটা হল যমুনা, পদ্মা, মেঘনা ও বুড়িগঙ্গা ইত্যাদি নদীর মিষ্টি জলের প্রভাব। মিষ্টি জলের পরিবেশে ও প্রভাবে গোলপাতার স্বাস্থ্য ও বংশবিস্তার ভালো হয়। এই কারণে সেখানে এর এতটাই শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে।
গোত্র ও জ্ঞাতিভাইদের মতো এই উদ্ভিদের ফল হয় কাঁদিতে। পর পর সাজানো বহু ফল থাকে একেকটি কাঁদিতে। ফল দেখতে অনেকটা কাঁঠালের বড় বড় কোয়ার মতো। ফলধরা ও কাঁদি আসা সবই নারকেল বা সুপারির মতো। তবে এরা তাল বা খেজুরের মতো একলিঙ্গ উদ্ভিদ নয়। সুপারি বা নারকেলের মতো এদের একই উদ্ভিদের পুষ্পমঞ্জরিতে পুং ও স্ত্রী—দুই রকমের ফুল হয়, দুটি আলাদা আলাদা পুষ্পমঞ্জরিতে।
বংশবিস্তার দুই ভাবেই হয়—বীজ থেকে, আবার ওই গ্রন্থিকাণ্ড থেকেই, ঠিক যেমন কলাগাছের চারা বা তেউড় বা তেড় বের হয়, তেমনভাবে অঙ্গজ জননের মাধ্যমে। এদের ফল মাতৃউদ্ভিদের সাথে যুক্ত থাকা অবস্থাতেই অঙ্কুরিত হয়, যাকে বলা হয় জরায়ুজ অঙ্কুরোদ্গম, যা ম্যানগ্রোভের এক বিশেষ চরিত্র। গাছ থেকে খসে পড়া ফল ভাসতে ভাসতে যেখানে আটকায়, সেখানে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে নতুন গাছ বা তার জঙ্গল সৃষ্টি হয়।
গোলপাতা সংগ্রহ ও তার ব্যবহারের ইতিহাস বহু প্রাচীন। ঘরবাড়ি, বৈঠকখানা, দোকানঘর ও গোয়ালঘরের চাল এবং দেশি নৌকার ছাউনিতে গোলপাতার ব্যবহার খুবই জনপ্রিয়। এর ছাউনি দেখতে সুদৃশ্য, তাপনিরোধক এবং খুবই টেকসই। একবার ছাউনি দিলে বহু বছর চলে যায়।
গোলপাতার জঙ্গল রয়েল বেঙ্গল টাইগারের খুব প্রিয় আশ্রয়স্থল। খুব সহজেই সে এখানে লুকাতে পারে। সুন্দরবনের অন্যান্য অনেক গাছের জঙ্গলে ঊর্ধ্বমুখী বর্শার মতো অজস্র শ্বাসমূল না থাকায় এখানে চলাফেরা যেমন অপেক্ষাকৃত সহজ, তেমনি দীর্ঘ এবং ঘন পাতার জঙ্গলে নিজেকে আড়াল ও গোপন করাও অনেক সহজ। কেননা গোলপাতা একেবারে মাটির উপর থেকেই আড়াল রচনা করে, যা অন্য উদ্ভিদ করে না। সুন্দরবনে কাঠ, মধু ও মোম, মাছ ও কাঁকড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে যত মানুষ বাঘের পেটে যায়, তার একটি বড় অংশ হল গোলপাতা সংগ্রহকারী। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দক্ষিণরায়ের সাথে এখানেই দেখা হয়। এদিক দিয়েও গোলপাতা ও তার জঙ্গলের বিশেষ এক খ্যাতি বা গুরুত্ব আছে। বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ যখন বলেছেন—
“দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর সবুজ ঘাসের দেশ”, তা হয়তো দেখা যায়…
কিন্তু বাংলার এই সুন্দরবনে ঘন সবুজ লম্বা গোলপাতার গোলমেলে ভয়ঙ্কর সুন্দর জঙ্গলেই অপেক্ষাকৃত বেশি দেখা মেলে হলুদ-কালো ডোরাকাটা রাজা, The Royal Bengal Tiger-এর সাথে। গোলপাতা কাটতে যাওয়া মানুষরা তাদের জীবন হাতে নিয়ে এই জঙ্গলের মাটিতে পা দেয় এবং অনেক সময় গোলপাতা সংগ্রহই হয় তাদের কারো কারো জীবনের শেষ সংগ্রহ ও শেষ জীবনসংগ্রাম।
_____