Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

কেন ছবি তুলি

বিজয় চৌধুরী

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ

আমার ছবি তোলা বা ফটোগ্রাফির প্রসঙ্গ উঠলেই কলকাতা শহরের কথা ঘুরেফিরে চলে আসবেই। এই শহরটার সংস্পর্শে না এলে জানিনা আজ কী অবস্থায় থাকতাম! বিগত প্রায় চল্লিশ বছর ধরে আমার ফটোগ্রাফি চর্চার পেছনে এই শহরের অবদান কিছুতেই ভুলতে পারি না। এই শহরটাকে নিয়েই আমার ছবি তোলার আগ্রহ ছিল সব থেকে বেশি, যা এখনও পুরোমাত্রায় সজীব।

আমার কলেজ জীবন কেটেছে কলকাতার আর্ট কলেজে, ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের কাছে যা কিনা গভর্মেন্ট আর্ট কলেজ নামে পরিচিত। আর আমাদের বাসা ছিল এই শহর থেকে ঘন্টা দেড়েকের দূরত্বে এক গ্রাম্য পরিবেশে, কোন্নগরের নবগ্রামে। ধুলো-মাটির রাস্তা, বাঁশঝাড়, ধানক্ষেত ছিল আমাদের বিচরণক্ষেত্র।

এইসব নানা কারণেই হয়ত এক ঝুড়ি বিস্ময় নিয়েই এই কলকাতা শহরে আমি পা রেখেছিলাম।

কলকাতায় নিয়মিত যাতায়াত শুরু করার সময় থেকেই শহরটাকে দেখে, সব দিক থেকেই প্রতি মূহুর্তে খুব অবাক হতাম। — এত বড় শহর, রাস্তা, গাড়ি, ঘোড়া, অসংখ্য মানুষজন, বিশাল সব অট্টালিকা, বাজার-হাট, ঝলমলে দোকানপাট ! — সবমিলিয়ে কল্লোলিনী তিলোত্তমা আমাকে মোহগ্রস্ত করে তুলেছিল।

আর্ট কলেজের ছাত্র হবার জন্য সহপাঠীদের সঙ্গে শহরের বিভিন্ন রাস্তাঘাটে, গলিপথ গুলোতে ঘুরে ঘুরে ড্রয়িং, স্কেচ করতাম। এটা আমাদের নিত্যকার অভ্যাস ছিল। আর সে এক নির্মল আনন্দের দিন ছিল। এই চর্চার মাধ্যমে শহরটাকে কিছুটা হলেও অন্যভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়েছিল। এর ফলে কলকাতার প্রতি ক্রমশ গভীর ভাবে আকৃষ্ট হয়ে উঠছিলাম। বুঝতে পারছিলাম শহরের প্রতিটি ইঞ্চিতে বহমান ইতিহাসের গল্প-স্পর্শ- বর্ণের সঙ্গে আমিও যেন জড়িয়ে পড়েছি । এই কলকাতা শহরের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা, অন্য একটি কলকাতা যেন আমার সামনে ক্রমশ উন্মোচিত হতে থাকে। সে অন্য এক মজা।

এই ভাবেই কয়েক বছর কাটিয়ে দেবার পর কলেজের পাঠও একদিন শেষ হয়ে গেল।

পরবর্তী সময়ে, কলেজে শেখা ফটোগ্রাফি বিষয়টা আমার কাছে সৃষ্টির প্রকাশের এক বিশেষ মাধ্যম হয়ে ওঠে। সেই কারণে এই কলকাতা শহরই হয়ে ওঠে আমার ছবি তোলার অনুশীলন ক্ষেত্র তথা প্রাণকেন্দ্র।

এইবার শুরু হয় ক্যামেরা নিয়ে আমার একক অভিসার। ফ্রিল্যান্স ডিজাইনারের কাজকর্ম করে অল্প কিছু রোজগার করা আর বাকি সময় চলতো এই শহরের গলিঘুঁজিতে ঘুরে ঘুরে ছবি তোলা, ডকুমেন্টস করা। সেই সঙ্গে চলত বিভিন্ন আড্ডায় যোগ দিয়ে সময় কাটানো। এইসব ঠেকের সৃষ্টিশীল সদস্যদের বিভিন্ন রকম আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমি অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পেরেছিলাম। যা আজও আমার অমূল্য সঞ্চয়।

তবে কিছুদিন বাদেই একটা চাকরির সুযোগ পেয়ে কলকাতা শহর ছেড়ে চলে যাই অন্য এক শহরে — আমাদের স্বপ্ন দেখা বাণিজ্য নগরী, তৎকালীন ‘বোম্বাই’ শহরে। যোগদান করি বিখ্যাত এক মিডিয়া হাউসে। সেটা ১৯৯০ সাল। এর ফলে কলকাতা শহর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্নই হয়ে গেলাম।

বোম্বাই শহরে পা দিয়েই যা আমার এ যাবৎ পোষণ করা মানসিকতাকে প্রায় নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেটা হল এখানে সবাই যেন দৌড়ে চলেছেন নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যে। কেউ কোন দিকেই তাকাচ্ছেন না! যেন দৌড় প্রতিযোগিতা চলছে। পাশে কেউ যদি পড়েও যায়, হাত ধরে তোলবার কেউ নেই! — বেশি না ভেবে আমিও ওই দৌড়ে সামিল হওয়ার চেষ্টা শুরু করে দিলাম। ক্রমশ কিছুটা মানিয়ে নিয়েই অফিসের কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।

দেখলাম, এই বিশাল শহরের ঠাটবাটই আলাদা। দিনের আলো আড়ালে চলে গেলে এই শহরের উজ্জ্বলতা যেন লক্ষগুণ বেড়ে যায়। — তুলনায় কলকাতাকে মনে হবে কোন গ্রাম! আমাদের মিডিয়ার কাজ মিটে গেলেই শুরু হয়ে যেত হুল্লোড়-পার্টি-ফোয়ারা! — আমিও যেন মাটির যোগাযোগ ছিন্ন করে একপ্রকার ভেসে বেড়াতে থাকলাম সেই হুল্লোড় উৎসবে!

কয়েক মাস এই ভাবে চলার পর নিজের প্রতিই কেমন বিতৃষ্ণা জন্মাতে থাকল। মিডিয়া হাউসের “কল্যাণে” পাঁচতারা হোটেলের দামী ডিনারের থেকে ডেকার্স লেনের ঘুগনি ও স্যাঁকা পাঁউরুটির স্বাদটা যেন অনেক বেশি আপন মনে হতে লাগল।

বোম্বের ঘোর কাটাতে আর বেশিদিন সময় লাগল না! — ভেতর থেকেই নিজেকেই প্রশ্ন করা শুরু হয়ে গেল — “এভাবেই কি জীবন কাটাব? এই অসংযমী জীবনই কি আমি চেয়েছিলাম! প্রতি মুহূর্তে এই যে ভোগ্যপণ্যের সুতীব্র হাতছানি আর নিয়ন আলোর রঙিন হাতছানি — এর পেছনেই কি চিরকাল দৌড়ে যাব?’’ — নিজের অন্তর থেকে উঠে আসা প্রশ্নে ক্রমাগতঃ জর্জরিত হতে থাকি। এদিকে এই চিন্তাও আছে — এখান থেকে বেকার হয়েই কলকাতায় ফিরে যেতে হলে আগামীতে হবেটা কী!

এই সময়ে আর একটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে তাড়িয়ে বেড়াতে লাগল — সেটা হলো, কলকাতা শহরের সঙ্গে আমার দূরত্ব বা বিচ্ছেদ! যা আমার জন্য ছিল অনেকটা মাটি থেকে শেকড় শুদ্ধ উপরে ফেলা গাছের মতো। এক নিদারুণ, অসহায় অবস্থা।

কলকাতার পরিচিত মানুষজন, আড্ডা, রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ানো, ছেড়ে আসা শহরের অসংখ্য দৃশ্যের কোলাজ সারাক্ষণ যেন আমার চোখের সামনে ভেসে বেড়াত। মজার বিষয় হলো, কলকাতার প্রতি এই গভীর টান কিন্তু ওখানে থাকাকালীন কিছুতেই বুঝে উঠতে পারিনি। বরং এই কলকাতা শহরকে নিয়ে প্রতি মুহূর্তে বিভিন্ন অভাব অভিযোগ শুধু নয়, মনে মনে কত না তিরস্কার, গালিগালাজও করেছি!

নানা দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে শেষে একদিন সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলাম — কলকাতা ফিরে যাবার!

বিশেষ করে মিডিয়া হাউসের এই ফরমায়েশি ছবি তোলা কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না! কোন রাজনৈতিক নেতা মিটিংয়ে আসবেন আর ওঁর চার ঘন্টা দেরি হলেও আমাকে অপেক্ষা করতে হবে! আর সেই নেতাকে দেখা যাবে, খান ছয়েক মার্ডার ও অল্প কিছু নারী নির্যাতনের অভিযোগ থেকে সদ্য জামিন পেয়েছে।। এ ছাড়া বিখ্যাত সব সেলিব্রিটিদের ন্যাকামির ছবি তুলতে গিয়েও একপ্রকার ঘেন্না এসে যাচ্ছিল! — বেশ বুঝতে পারছিলাম, এই ভাবে চলতে থাকলে, ভাললাগার ফটোগ্রাফির প্রতি অনীহা শুরু হয়ে যাবে! যা আমি ভাবতেই পারি না!

আশপাশের লোকজন বারণ করলেও শুনলাম না। ক’দিন বাদেই সব ছেড়ে দিয়ে ফেরার টিকিট কেটে বোম্বাই মেলে চেপে বসলাম – যাত্রা বাড়ির উদ্দেশ্যে। সেদিন ট্রেনটা দাদার স্টেশন থেকে ছেড়ে দেবার পর মুহূর্তেই কী যে আনন্দ আর তৃপ্তি পেয়েছিলাম, তা আজও আমি ভুলতে পারিনি।

বাড়ি ফিরে কিছুটা ধাতস্থ হয়েই ফের কলকাতা শহরের বিভিন্ন জায়গার ঘোরাঘুরি শুরু করে দিলাম। ফিরে আসার পর থেকে এই শহরটাকে আমার আরও কাছের, আরও আপন, আরও যেন মায়াময় বলে মনে হতে থাকে। যেন মহানগর আমাকে আরও কাছে টেনে নিল।

আমার এই চল্লিশ বছরের ফোটোগ্রাফির কাজে নানা বিষয় নিয়ে ছবি তুলে থাকলেও কলকাতা শহরকে নিয়েই সব থেকে বেশি কাজ করেছি, এবং সে আগ্রহ আজও সব থেকে বেশি।

আমি অন্য কিছুতে সেই ভাবে দক্ষ নই। এই ফটোগ্রাফি বা ছবি’র মান নিয়ে আমার নিজেরও যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবে একটা বিষয় লক্ষ্য করে দেখেছি, ছবি তোলা বা ফটোগ্রাফির সংস্পর্শে থাকাটা আমাকে প্রচন্ডরকম মানসিক শান্তি দিয়ে থাকে। বিশেষ করে বর্তমান সমাজের ডিজিটাল জঞ্জালের উৎপাত থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে খুবই সাহায্য করে।

এখন সারা পৃথিবী জুড়েই প্রতিনিয়ত চলছে প্রবল হানাহানি। মানুষ মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাতে বসেছে। কিন্তু এই ফটোগ্রাফি সংক্রান্ত কাজকর্মে আমি বেশকিছু ভালো, গুণী মানুষজনের সংস্পর্শে এসেছি। এই ছবি তোলার কল্যাণে এটিও আমার বড় পাওনা।

ফলে নানা কারণেই এই ছবি তোলার চর্চা ক্রমাগত চলতেই থাকে। এর পর থেকে শহরের পথে-ঘাটে ঘুরে নানা সব দৃশ্যরূপ, মানুষজন, সম্মুখে ঘটে চলা ঘটনা – বিস্ময় প্রতিনিয়ত বেড়েই চলে। এছাড়া এই শহরের নানা বিষয়, মহল্লা, বাজার, জীবিকা যা শত বছর ধরে বহমান- আমাকে প্রচন্ডরকম আকৃষ্ট করে তুলেছিল। মাঝে মধ্যে মনে হত কোন জীবন্ত মিউজিয়ামের মধ্যে দিয়ে চলেছি।

সেই সব মুহূর্তগুলোকে ছবি তোলা বা ফটোগ্রাফির মাধ্যমে কিছুটা হলেও ধরে রাখতে চেষ্টা করি। – সেই অনাবিল আনন্দ বলে বোঝানো যাবে না। ক্রমাগত এই অভ্যাসটি আমার কাছে অনেকটা নিশ্বাস প্রশ্বাসের মতো হয়ে ওঠে। সেই কারণে এই ছবি তোলা আমার কাছে অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে।

আশা রাখি, এই ভাবেই হয়তো আগামী দিনেও ছবি তোলার প্রক্রিয়াটি চালিয়ে যেতে সক্ষম হব।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x