আরণ্যক শামছ
সিলেট, বাংলাদেশ
বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের এক প্রবাদপ্রতিম এবং বিতর্কিত পুরুষ কমল কুমার মজুমদার। তাঁর লেখনী যেমন ভাষার নিপুণ কারুকার্যে ভাস্বর, তেমনই তাঁর সাহিত্যদর্শন এক গভীর তাত্ত্বিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি— ‘হাটে-বাজারে, বাড়ির লোকজনের সাথে আমরা যে ভাষায় কথা বলি, সে ভাষায় সাহিত্য রচনা উচিত নয়। সাহিত্য হচ্ছে সরস্বতীর সঙ্গে কথা বলা, তার জন্য সম্পূর্ণ নতুন ভাষা তৈরি করে নিতে হবে।’ এই মন্তব্যটি কেবল কমল কুমারের ব্যক্তিগত সাহিত্যিক বিশ্বাসকেই প্রকাশ করে না, বরং বাংলা তথা বিশ্বসাহিত্যের এক চিরকালীন দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে আসে: সাহিত্যের ভাষা কি জীবনের প্রতিচ্ছবি হবে, নাকি জীবনকে অতিক্রম করে এক শৈল্পিক, নির্মিত এবং উন্নীত রূপ পরিগ্রহ করবে? এই প্রবন্ধে কমল কুমার মজুমদারের এই উক্তিটিকে কেন্দ্র করে বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের আলোকে এর পক্ষে ও বিপক্ষে বিস্তারিত যুক্তি, পাল্টা-যুক্তি এবং প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি সহ আলোচনা করা হলো।
উক্তির প্রেক্ষাপট: কমল কুমার মজুমদারের সাহিত্যদর্শন:
কমল কুমার মজুমদারকে বলা হয় ‘লেখকদের লেখক’। তাঁর গদ্যশৈলী প্রচলিত পথের অনুসারী ছিল না। ‘অন্তর্জলী যাত্রা’, ‘গোলাপ সুন্দরী’ বা ‘সুহাসিনীর পমেটম’-এর মতো উপন্যাসে তিনি যে ভাষার ব্যবহার করেছেন, তা দৈনন্দিন জীবনের ভাষা থেকে শত হস্ত দূরে অবস্থিত। সংস্কৃত শব্দ, অপ্রচলিত তৎসম পদের ব্যবহার, প্রাচীন গদ্যরীতির প্রতি আকর্ষণ এবং বাক্যের জটিল ও পরীক্ষামূলক বুনন তাঁর শৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সাহিত্য একটি স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম, যার নিজস্ব ভাষা থাকা আবশ্যক। তাঁর মতে, আটপৌরে ভাষা জীবনের স্থূলতা ও সাধারণতাকে বহন করে; কিন্তু সাহিত্য সেই সাধারণতার ঊর্ধ্বে এক অপরূপ নান্দনিক জগত নির্মাণ করে। এই নির্মাণকার্যের জন্য প্রয়োজন এক বিশেষ, মার্জিত, এবং কখনও কখনও দুরূহ ভাষার, যা পাঠককে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার জগৎ থেকে শিল্পের তুরীয় লোকে উত্তরণ ঘটাতে সাহায্য করবে। ‘সাহিত্য হচ্ছে সরস্বতবীর সঙ্গে কথা বলা’ – এই উক্তির মাধ্যমে তিনি সাহিত্যকে এক পবিত্র সাধনা বা আরাধনার পর্যায়ে উন্নীত করেছেন, যেখানে সাধারণ বা লৌকিক ভাষার প্রবেশাধিকার নেই।
পক্ষে যুক্তি: সাহিত্যের জন্য নির্মিত ভাষার আবশ্যকতা
কমল কুমার মজুমদারের দর্শনের সমর্থনে একাধিক যুক্তি উপস্থাপন করা যেতে পারে, যা বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন ধারার মাধ্যমে সমর্থিত।
১. ভাষার নান্দনিক ও শৈল্পিক উৎকর্ষ:
সাহিত্যের একটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো নান্দনিকতা বা সৌন্দর্য সৃষ্টি। যে ভাষা আমরা হাটে-বাজারে ব্যবহার করি, তার মূল উদ্দেশ্য ভাবের আদান-প্রদান, তথ্যের বিনিময়—সৌন্দর্য সৃষ্টি নয়। এই ভাষায় বাহুল্য থাকে, পুনরাবৃত্তি থাকে এবং ব্যাকরণের শৈথিল্য থাকে। কিন্তু সাহিত্যিক যখন কলম ধরেন, তিনি ভাষার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি যতিচিহ্ন নিয়ে সচেতন থাকেন। তিনি ভাষার মাধ্যমে এক বিশেষ আবহ, এক গভীর ব্যঞ্জনা তৈরি করতে চান।
বাংলা সাহিত্যের দিকে তাকালে এর সার্থক উদাহরণ মেলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গদ্যে। বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে এক সুশৃঙ্খল, সুগঠিত এবং প্রাঞ্জল রূপ দিয়েছিলেন, যা ছিল মূলত সংস্কৃত ব্যাকরণ ও পদবিন্যাসের দ্বারা প্রভাবিত। তাঁর ‘শকুন্তলা’ বা ‘সীতার বনবাস’-এর ভাষা নিঃসন্দেহে তৎকালীন সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ছিল না, কিন্তু তা এক গম্ভীর ও ক্লাসিক্যাল মহিমা অর্জন করেছিল। বঙ্কিমচন্দ্র সেই ধারাকে আরও উন্নত করে এক সাবলীল অথচ গুরুগম্ভীর সাহিত্যিক ভাষার জন্ম দেন। তাঁর ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের সূচনাংশ স্মরণীয়:
‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?’
এই একটা বাক্য পাঠককে তৎক্ষণাৎ এক রোমান্টিক, রহস্যময় জগতে প্রবেশ করায়, যা সাধারণ কথ্য ভাষায় সম্ভব হতো না। এই নির্মিত ভাষাই সাহিত্যকে সাধারণ কথন থেকে পৃথক করে এক উচ্চতর শিল্পের মর্যাদা দেয়।
২.বিষয়বস্তুর গভীরতা ও গাম্ভীর্য প্রকাশ:
সকল সাহিত্য জীবনের লঘু বা সাধারণ দিক নিয়ে আলোচনা করে না। দর্শন, আধ্যাত্মিকতা, অস্তিত্বের সংকট বা রাষ্ট্রনীতির মতো গুরুগম্ভীর বিষয় প্রকাশের জন্য আটপৌরে ভাষা অনেক সময়ই অপ্রতুল। ভাষার গভীরতা ও ওজন বিষয়বস্তুর সমতুল্য হওয়া প্রয়োজন। কমল কুমার যেমন সরস্বতীর আরাধনার কথা বলেছেন, তেমনই বিশ্বসাহিত্যে টি. এস. এলিয়ট (T. S. Eliot) তাঁর “Tradition and the Individual Talent” প্রবন্ধে সাহিত্যের এক impersonal বা নৈর্ব্যক্তিক তত্ত্বের কথা বলেছেন, যেখানে লেখকের আবেগ নয়, বরং ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ এবং শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতাই মুখ্য। এলিয়টের ‘The Waste Land’-এর ভাষা জ্ঞাতসারেই পাণ্ডিত্যপূর্ণ, বহুভাষিক উদ্ধৃতিতে ভরা এবং জটিল, কারণ তিনি আধুনিক সভ্যতার আধ্যাত্মিক বন্ধ্যাত্ব ও সাংস্কৃতিক সংকটের মতো এক বিরাট বিষয়কে ধারণ করতে চেয়েছিলেন। সাধারণ ভাষা এই ভার বহন করতে পারত না।
৩. ডি-ফ্যামিলিয়ারাইজেশন (Defamiliarization) বা অপরিচিতিকরণ:
রুশ রূপতাত্ত্বিকদের (Russian Formalists) একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হলো ‘অপরিচিতিকরণ’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সাহিত্যের কাজ হল পরিচিত জিনিসকে অপরিচিত করে তোলা, যাতে আমাদের ভোঁতা হয়ে যাওয়া অনুভূতি পুনরায় সজাগ হয়ে ওঠে। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ভাষা আমাদের কাছে এতটাই পরিচিত যে তা আমাদের চেতনায় কোনো অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে না। কিন্তু যখন একজন লেখক ভাষাকে নতুনভাবে গঠন করেন, শব্দকে নতুন বিন্যাসে সাজান, তখন সেই ভাষার দিকে আমাদের মনোযোগ আকৃষ্ট হয়। কমল কুমারের গদ্য ঠিক এই কাজটিই করে। তাঁর জটিল বাক্যগঠন পাঠককে থামতে, ভাবতে এবং ভাষার অন্তর্নিহিত অর্থের গভীরে প্রবেশ করতে বাধ্য করে। এটি পাঠককে এক সক্রিয় পাঠ প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত করে।
বিপক্ষে যুক্তি: জীবনের ভাষাই সাহিত্যের প্রাণ
কমল কুমার মজুমদারের মতবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি শক্তিশালী ধারাও বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যে প্রবলভাবে বিদ্যমান। এই ধারা বিশ্বাস করে যে সাহিত্যের ভাষা হবে জীবনের দর্পণ। হাটে-বাজারের ভাষাকে বাদ দিয়ে সাহিত্য রচনা করলে তা কৃত্রিম, প্রাণহীন এবং গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে বাধ্য।
১. বাস্তবতা ও জীবনের প্রতি বিশ্বস্ততা:
সাহিত্যের যদি অন্যতম উদ্দেশ্য হয় জীবনকে চিত্রিত করা, তবে সেই জীবনের মানুষদের ভাষাকে অস্বীকার করার অর্থ বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। একজন কৃষক, একজন শ্রমিক বা একজন মাঝির মুখের ভাষা তার সামাজিক অবস্থান, তার সংস্কৃতি এবং তার চিন্তার প্রতিফলন। সেই চরিত্রকে যদি বিদ্যাসাগরী সাধু ভাষায় কথা বলানো হয়, তবে তা কেবল হাস্যকরই নয়, চরিত্রটির প্রতি এক চরম অবিচার।
বাংলা সাহিত্যে এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ (১৮৫৮)। এর ‘আলালী ভাষা’ ছিল চলিত এবং কথ্য রীতির এক অসামান্য প্রয়োগ। বঙ্কিমচন্দ্রও এর গুরুত্ব স্বীকার করে বলেছিলেন, “ইহা বাংলা সাহিত্যের এক চিরস্থায়ী কীর্তিস্তম্ভ।” এই উপন্যাসের ‘ঠকচাচা’-র মুখের ভাষা ছিল কলকাতার তৎকালীন কথ্য ভাষার এক বিশ্বস্ত প্রতিরূপ, যা চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলেছিল।
একইভাবে, বিশ্বসাহিত্যে মার্ক টোয়েন (Mark Twain)-এর ‘Adventures of Huckleberry Finn’ একটি যুগান্তকারী সৃষ্টি, কারণ তিনি আমেরিকান সাহিত্যে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ চরিত্র এবং দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে কোনো রকম সম্পাদনা বা পরিমার্জনা ছাড়া ব্যবহার করেছিলেন। হাক ফিনের মুখের ভাষা ছিল তার সারল্য, তার বিদ্রোহ এবং তার মানবিকতার পরিচায়ক। টোয়েন দেখিয়েছিলেন যে “অমার্জিত” ভাষাই কখনও কখনও সবচেয়ে শক্তিশালী ও সৎ অনুভূতির ধারক হতে পারে।
২. গণমানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন:
সাহিত্য যদি কেবল বিদগ্ধ সমাজের জন্য লেখা হয়, তবে তার আবেদন সংকীর্ণ হতে বাধ্য। ভাষাকে যদি দুর্বোধ্য ও দুরূহ করে তোলা হয়, তবে সাধারণ পাঠক সেই সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’ আন্দোলন এই ধারণার বিরুদ্ধেই এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ ছিল। তিনি ‘বীরবলের হালখাতা’-য় যুক্তি দিয়েছিলেন:
“সাহিত্যের বিষয় মানবজীবন, আর সে জীবন যার, সাহিত্যও তার। … সুতরাং যে ভাষায় লোক সাধারণে কথা কয়, সেই ভাষাতেই সাহিত্য রচনা করা বিধেয়।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও প্রথমদিকে সাধু ভাষার পক্ষে থাকলেও, প্রমথ চৌধুরীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে চলিত রীতির শক্তিকে স্বীকার করে নেন এবং তাঁর শেষ জীবনের গদ্যে ও সংলাপে কথ্য ভাষাকেই প্রাধান্য দেন। ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর লেখকেরা (যেমন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু) রবীন্দ্র প্রভাবের বাইরে এসে আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে নাগরিক জীবনের ক্লেদ, ক্লান্তি এবং ভাষাকে সরাসরি সাহিত্যে নিয়ে আসেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল জীবনের কর্কশ বাস্তবতাকে তার নিজস্ব ভাষাতেই তুলে ধরা।
৩. ভাষার গণতান্ত্রিকতা ও স্বাভাবিক বিবর্তন:
ভাষা একটি জীবন্ত সত্তা। এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। হাটে-বাজারের ভাষাই হলো ভাষার প্রাণশক্তি ও বিবর্তনের উৎস। সেখান থেকেই নতুন শব্দ, নতুন বাগধারা তৈরি হয়, যা ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। সাহিত্য যদি এই জীবন্ত ধারাকে অস্বীকার করে কেবল প্রাচীন বা নির্মিত ভাষার উপর নির্ভর করে, তবে তা একসময় জীবাশ্মে (fossil) পরিণত হবে।
বিশ্বসাহিত্যে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ (William Wordsworth) তাঁর ‘Lyrical Ballads’-এর বিখ্যাত ভূমিকায় (Preface) বলেছিলেন যে তিনি কবিতা লেখার জন্য “a selection of language really used by men” অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত ভাষাকেই বেছে নিয়েছেন। তিনি অ্যারিস্টোক্র্যাটিক কবিতার কৃত্রিম ও আড়ম্বরপূর্ণ ভাষার বিরোধিতা করে বলেছিলেন যে সাধারণ বা গ্রামীণ জীবনের মানুষদের ভাষায় আবেগের যে সততা ও গভীরতা আছে, সেটাই কবিতার প্রকৃত উৎস। ইতালির ‘ভেরিজমো’ (Verismo) বা ফ্রান্সের ‘ন্যাচারালিজম’ (Naturalism)-এর মতো সাহিত্য আন্দোলনগুলিও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন ও তাদের ভাষাকে সাহিত্যের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিল। এমিল জোলা (Émile Zola)-র মতো লেখকেরা বৈজ্ঞানিকের নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে সমাজের কদর্য ও বাস্তব চিত্র এঁকেছিলেন, এবং তার জন্য প্রয়োজন ছিল সেই সমাজের নিজস্ব, অপরিমার্জিত ভাষা।
কমল কুমার মজুমদার এই মন্তব্যটি বাংলা সাহিত্যের একজন খ্যাতিমান লেখকের হলেও, তা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করার যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান এবং প্রাসঙ্গিকও বটে। কারণ, সাহিত্যের পাঠক জনগণ, কেবল কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণি নয়। মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা, প্রেম, দুঃখ, সংগ্রাম এবং স্বপ্ন সাহিত্যের উপজীব্য। তাই ভাষা হতে হবে মানুষের হৃদয়ের ভাষা—সহজ, সরস, প্রাঞ্জল, কিন্তু গভীর। এই প্রবন্ধে আমরা এই ধারণার সপক্ষে বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের দৃষ্টান্ত ও ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরব।
বাংলা সাহিত্যে সাধারণ ভাষার শক্তি অপরিসীম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন: “সাহিত্যের ভাষা যত সহজ ও হৃদয়গ্রাহী হবে, ততই তার শক্তি বাড়ে।” তাঁর গীতাঞ্জলি কিংবা গল্পগুচ্ছ তার প্রমাণ।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। তিনি বলেছিলেন: “আমি তাদের জন্য লিখি, যারা বিদ্যালয়ে যায়নি, কিন্তু জীবনের পাঠশালায় পড়াশোনা করেছে।” তার ‘পথের দাবী’ বা ‘শ্রীকান্ত’ সাধারণ মানুষের ভাষায় লেখা, কিন্তু তা মানবিকতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত।
প্রমথ চৌধুরী যখন চলিত ভাষা চালু করেন, তখনও এ ভাবনা ছিল—সাহিত্যে সরলতার দরজা খোলা হোক।
হুমায়ূন আহমেদ, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিস্ময়, এমন ভাষায় লিখতেন যা শহরের রিকশাওয়ালার কাছেও স্পষ্ট, কিন্তু সেই ভাষায় গভীর দর্শন ও মনস্তত্ত্বের চিত্র তুলে ধরতেন।
সমরেশ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য, নিহার রঞ্জন গুপ্ত—এঁদের সৃষ্টিশীল ভাষা কখনো কঠিন বা কৃত্রিম হয়নি। বরং তাঁদের ভাষা জীবন্ত মানুষের ভাষা।
ভাষা ও দর্শন: কী বলেন ভাষাতাত্ত্বিক ও দার্শনিকেরা?
নোম চমস্কি, আধুনিক ভাষাতত্ত্বের জনক, বলেন:
“Language is not just a tool of communication; it is a window to human cognition.” অর্থাৎ “ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; তা মানুষের চিন্তার জানালা।”
সুতরাং, যে ভাষা মানুষ বুঝতে পারে না, তা মানুষের চিন্তার জানালা হয়ে উঠতে পারে না।
ভিটগেনস্টাইন বলেন:
“The limits of my language mean the limits of my world.” অর্থাৎ “ভাষার সীমাবদ্ধতা আমার কাছে পুরো পৃথিবীকেই সীমাবদ্ধ করে তুলে।”
তাই স্বাভাবিকভাবেই ভাষা যদি সবার নাগালের বাইরে থাকে, তবে সাহিত্যও মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়।
রোলাঁ বার্থ ‘লেখকের মৃত্যু’ তত্ত্বে বলেন, “পাঠকের অংশগ্রহণই সাহিত্যের মূল শক্তি। যদি পাঠকই না বোঝে ভাষা, তবে সেই সাহিত্য আত্মপ্রেম মাত্র।
আধুনিক বিশ্বসাহিত্যে সরলতার জয়গান লক্ষ্য করা যায়।
আর্নো এনো (Annie Ernaux), ২০২২ সালের নোবেল বিজয়ী ফরাসি লেখিকা, তাঁর আত্মজৈবনিক সাহিত্যে ভাষার সরলতা বজায় রেখেছেন। নোবেল কমিটি তার গদ্যশৈলীকে “Simple and short, her prose spare and unsparing” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
আলবেয়ার কামু, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, হারুকি মুরাকামি, খালেদ হোসেইনি, আরুন্ধতী রায়, মার্গারেট অ্যাটউড—সকলেই পাঠযোগ্যতা ও সাধারণ অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে ভাষা বেছে নিয়েছেন।
হেমিংওয়ে তাঁর আইসবার্গ থিওরিতে বলেন—“The dignity of movement of an iceberg is due to only one-eighth of it being above water.” অর্থাৎ “একটি বরফখণ্ডের চলাচলের মর্যাদা এর মাত্র এক-অষ্টমাংশ পানির উপরে থাকার কারণে নির্ধারিত হয়।”
তাই বলা যায়, ভাষা সংক্ষিপ্ত হতে পারে, কিন্তু তা গভীরও হতে পারে।
লিও টলস্টয় ও দস্তয়েভস্কি তাঁদের বিশাল সাহিত্যকর্মে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা সেই সময়ের সাধারণ মানুষের ভাষা। তাঁদের গল্প বা উপন্যাসের চরিত্ররা স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন।
সমন্বয় নাকি বিভাজন?
কমল কুমার মজুমদারের উক্তিটি সাহিত্যের ভাষার বিতর্ককে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে স্থাপন করে। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এই দুই মেরুর মধ্যে একটি সেতুবন্ধন সম্ভব। সাহিত্যের ভাষা কী হবে, তা নির্ভর করে লেখকের উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু এবং ঘরানার উপর।
ঐতিহাসিক উপন্যাস বা পৌরাণিক আখ্যান রচনার সময় এক ধরনের গুরুগম্ভীর, নির্মিত ভাষার প্রয়োজন হতে পারে, যা পাঠককে সেই কালের আবহে নিয়ে যাবে। আবার, আধুনিক নাগরিক জীবনের সংকট বা প্রান্তিক মানুষের সংগ্রামকে তুলে ধরার জন্য তাদের নিজস্ব কথ্য ভাষাই সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম।
বস্তুত, একজন সার্থক সাহিত্যিক জানেন কোন বিষয় কোন ভাষার দাবি রাখে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে রাঢ় বাংলার আঞ্চলিক ভাষাকে ব্যবহার করে মাটির কাছাকাছি থাকা চরিত্রদের জীবন্ত করে তুলেছেন। আবার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ‘লালসালু’তে গ্রামীণ মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও শোষণের চিত্র আঁকতে গিয়ে একধরনের লোকজ ও ধর্মীয় অনুষঙ্গ মিশ্রিত গদ্য ব্যবহার করেছেন, যা একইসাথে বাস্তব ও প্রতীকী।
কমল কুমার মজুমদার যে “নতুন ভাষা তৈরি” করার কথা বলেছেন, তার অর্থ হয়তো কথ্য ভাষাকে সম্পূর্ণ বর্জন করা নয়, বরং সেই কথ্য ভাষার উপাদানকে শিল্পের প্রয়োজনে ভেঙে, গড়ে ও পরিমার্জিত করে এক নতুন শৈল্পিক রূপ দেওয়া। যে ভাষা আমরা প্রতিদিন ব্যবহার করি, তা কাঁচামাল (raw material)-এর মতো। শিল্পী সেই কাঁচামাল থেকেই তাঁর সৃষ্টির উপাদান সংগ্রহ করেন, কিন্তু তাকে অবিকৃত অবস্থায় ব্যবহার করেন না। তিনি তাকে নিজের কল্পনা, মেধা ও মননের ছাঁচে ফেলে এক নতুন শিল্পকর্ম তৈরি করেন।
সুতরাং, বিতর্কের শেষে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে সাহিত্যের ভাষা “হাটে-বাজারের ভাষা” হবে, নাকি “সরস্বতীর সঙ্গে আলাপের ভাষা” হবে—এই প্রশ্নটি ‘either/or’-এর নয়, বরং ‘both/and’-এর। মহৎ সাহিত্য কখনও জীবনের ভাষাকে অস্বীকার করে না, আবার কখনও তাকে অবিকৃতভাবে অনুকরণও করে না। সে জীবন থেকে তার রসদ সংগ্রহ করে, কিন্তু তাকে শিল্পের নিয়মে জারিত করে এক উন্নীত, ব্যঞ্জনাময় এবং চিরকালীন রূপ দান করে। কমল কুমার মজুমদারের উক্তিটি হয়তো এক রূঢ় অবস্থান, কিন্তু এটি আমাদের এই মৌলিক সত্যকেই স্মরণ করিয়ে দেয় যে সাহিত্য কেবল জীবনের অনুকরণ নয়, জীবনকে অতিক্রম করার এক শৈল্পিক সাধনাও বটে। এই সাধনার পথেই ভাষার যথার্থ রূপটি নির্ধারিত হয়।
উপসংহার:
সাহিত্য যদি মানুষের, মানুষের হৃদয়ের কথা বলার মাধ্যম হয়, তবে ভাষাও মানুষের হওয়া উচিত। সাহিত্যের ভাষা এমন হওয়া উচিত যা বোঝা যায়, ভালোবাসা যায়, অনুভব করা যায়। ভাষার সৌন্দর্য তার কৃত্রিম জটিলতায় নয়, বরং সহজ গভীরতায়।
কমল কুমার মজুমদার হয়তো এক ধরণের সাহিত্যিক আত্মধারণার কথা বলেছেন; কিন্তু আজকের পাঠকসংস্কৃতিতে সাহিত্যের ভাষা হতে হবে—সহজ, গভীর, প্রাণবন্ত এবং মানবিক।
আমি বিশ্বাস করি, সাহিত্য হলো হৃদয়ের নির্যাস। মানুষের অনুভব, আশা, ক্লান্তি ও ভালোবাসা যেভাবে গঠিত, সেই ভাষায় সাহিত্য না হলে তা পাঠকের হৃদয় ছুঁতে পারে না। সাহিত্য যেন মানবিক আত্মার প্রতিচ্ছবি হয়। আর সে আত্মা প্রকাশ পায় সহজ, প্রাঞ্জল ও জীবন্ত ভাষায়, যা প্রত্যেক পাঠক বুঝতে পারে, অনুভব করতে পারে এবং ভালোবাসতে পারে। সাহিত্য মানুষের জন্য। তার ভাষাও হতে হবে মানুষের ভাষায়।