দেবরাজ গোস্বামী
গুজরাট, ভারত
১৮৪৪ সালে ইংরেজ শিল্পী উইলিয়াম টার্নার এঁকেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ছবি রেইন, ষ্টীম এন্ড স্পীড। এই ছবিতে দেখা যায় একেবারে ডান দিক ঘেঁষে নদীর ওপরে একটি পুল, এবং সেই পুলের ওপর দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে ধোঁয়া ছেড়ে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে প্রথম যুগের ষ্টীম ইঞ্জিন চালিত একটি যাত্রীবাহী রেলগাড়ি। বৃষ্টির ফোঁটা, ইঞ্জিন থেকে নির্গত বাস্প ধাবমান রেলগাড়ির গতি মিলেমিশে এক অদ্ভুত রহস্যময় ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে। রেলগাড়িটা যেন সেই ধোঁয়াশার মধ্যে থেকে বাইরে বেরিয়ে আসছে। যারা টার্নারের ছবির সঙ্গে পরিচিত তাঁরা জানেন এই রহস্যময় কুয়াশা ঘেরা ধোঁয়াটে আবহ নির্মাণ করা টার্নারের ছবির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট। ছবির বাম দিকে সেই ধোঁয়াশার মধ্যে দিয়ে আবছা ভাবে দেখা যায় নীচে নদী, ভাসমান নৌকা এবং দূরে আরও একটি পুল। টার্নারের আঁকা এই ছবিটি পৃথিবীর শিল্পকলার ইতিহাসে একটি অন্যতম মাস্টারপিস হিসেবে গন্য করা হয়।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের জমিদারী ছিল অবিভক্ত বাংলার সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে। নিকটবর্তী উল্লাপাড়া রেলস্টেশন দিয়ে পৌঁছতে হত সেখানে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে বাংলায় রেলগাড়ি চালু হয় ১৮৫৪ সালে, অর্থাৎ টার্নার তাঁর ছবিটি আঁকার দশ বছর পরেই। ১৯২৭ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর শাহজাদপুরে থাকাকালীন সেখানকার বিস্তীর্ণ নদী এবং গ্রামাঞ্চলের দৃশ্য নিয়ে অনেকগুলি ল্যান্ডস্কেপ এঁকেছিলেন যা শাহজাদপুর ল্যান্ডস্কেপ সিরিজ নামে পরিচিত। এই সিরিজেরই অন্যতম একটি ছবি হল ‘উল্লাপাড়া ষ্টেশন’। শাহজাদপুরে আঁকা অন্যান্য ছবিগুলোর মতই এই ছবিটিও অবনীন্দ্রনাথের নিজস্ব ‘ওয়াশ’ পদ্ধতিতে আঁকা। যদিও মনে করা হয় যে এই ওয়াশ’ পদ্ধতির উদ্ভাবনের পিছনে দূর প্রাচ্যের শিল্পকলার অনুপ্রেরনাই কাজ করেছিল, কিন্তু বিশেষ করে এই উল্লাপাড়া ষ্টেশনের ছবিটা দেখলে বোঝা যায় এই পদ্ধতি নির্মাণের ক্ষেত্রে ইংরেজ শিল্পী টার্নারের শিল্প ভাষারও অনেকখানি প্রভাব ছিল। উল্লাপাড়া ষ্টেশনের ছবি আঁকার সময় যে ‘রেইন, ষ্টীম এন্ড স্পীড’ ছবিটি অবনীন্দ্রনাথের মাথায় ছিল সেটা ছবির কম্পোজিশন এবং ট্রিটমেন্ট দুইয়ের মধ্যেই বেশ প্রতিফলিত। অবনীন্দ্রনাথের ছবির একেবারে বাম দিক ঘেঁসে ধোঁয়াটে, রহস্যময় পরিবেশের মধ্যে উল্লাপাড়া ষ্টেশন ছেড়ে এগিয়ে আসে একটি ষ্টীম ইঞ্জিনে টানা রেলগাড়ি। ছবির ডানদিকে বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে নদীর ঘাট এবং আবছা কুয়াশার মত পরিবেশে সেই ঘাটে দুটো নৌকো। কম্পোজিশনের দিক থেকে অবনীন্দ্রনাথের ছবিটা যেন টার্নারের ছবির মিরর ইমেজ। জলরঙের ওয়াশ পদ্ধতির ব্যবহারও যেন অনেকটাই টার্নারের অনুসারী।

এই দৃশ্যগত সাযুজ্য কাকতালীয় ঘটনা বলে মনে করবার কোনো কারণ নেই।

শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যেহেতু বেঙ্গল স্কুলের প্রধান নেতা বলে মনে করা হয়, ফলে তাঁর শিল্প চর্চা সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। বেঙ্গল স্কুলের চিত্রকলা চর্চার সঙ্গে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটা ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে, তাই স্বতঃসিদ্ধ ভাবেই ধরে নেওয়া হয় যে এই ধারার নেতৃস্থানীয় শিল্পী হিসেবে অবনীন্দ্রনাথ কেবলমাত্র ইউরোপের প্রভাব থেকে মুক্তই ছিলেন না, সেই সঙ্গে তিনি ইউরোপীয় শিল্পধারার সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। কিন্তু অবনীন্দ্রনাথের শিল্পচর্চা বিষয়ে কিছুটা অনুসন্ধান করলেই দেখা যায় তিনি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ইউরোপীয় শিল্পকলা থেকে শুধুমাত্র অনুপ্রাণিতই হননি, রীতিমত নিজের ছবি আঁকার ক্ষেত্রে সেই প্রেরণাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। শাহজাদপুর ল্যান্ডস্কেপ সিরিজের ‘উল্লাপাড়া ষ্টেশন’ ছবিটি তারই এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।