Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

যে ক্রিয়া বাক্যের শেষে বসে না

প্রবাল দাশগুপ্ত

কলকাতা

ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে সবাই দেখেছি যে ক্রিয়াপদ ইংরেজি বাক্যের মাঝখানে বসে, কিন্তু বাংলা বাক্যের শেষে। ‘দিলীপ উইল হ্যাভ অ্যান অমলেট’, ‘দিলীপ অমলেট খাবে।’ ইংরেজির তুলনায় অবশ্য বাক্যবিন্যাসের স্বাধীনতা বাংলায় বেশি। ‘দিলীপ অ্যান অমলেট উইল হ্যাভ’ হয় না, কিন্তু ‘দিলীপ খাবে অমলেট’ বলতেই পারি আমরা। বাংলা ক্রিয়া বাক্যের শেষে বসা পছন্দ করলেও তার টিকিটে ইংরেজির মতো আসনসংখ্যা লেখা থাকে না।

তবে আমরা অনেকেই খেয়াল করিনি যে বিশেষ জাতের কিছু ক্রিয়া বাংলা বাক্যের শেষে নয়, মাঝখানেই বসে। আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় বিশেষ অর্থে প্রযুক্ত ‘হল/হচ্ছে’। আবশ্যিক মধ্যবর্তী অবস্থানের উপর জোর দেবার জন্যে ওদের বলব ত্রিশঙ্কু  ক্রিয়া: ‘ডেনমার্কের রাজধানী হল (বা হচ্ছে) কোপেনহাগেন’। বিশেষ অর্থ বলতে? অবিকল ওই চেহারার ক্রিয়াপদ বাক্যের শেষে বসালে দেখবেন অন্যরকম মানে পাচ্ছেন: ‘কোপেনহাগেন পঞ্চদশ শতাব্দীতে ডেনমার্কের রাজধানী হল’, অর্থাৎ রাজধানীর মর্যাদা পেল। ‘কোপেনহাগেন ডেনমার্কের রাজধানী হচ্ছে কী করে?’, মানে, আপনি এরকম অদ্ভুত কথা বলছেন কেন? কিন্তু ত্রিশঙ্কু প্রয়োগে (অর্থাৎ ‘ডেনমার্কের রাজধানী = কোপেনহাগেন’ বোঝাতে চাইলে) ‘হল’ বা ‘হচ্ছে’ শব্দটা বাক্যের মাঝখানেই বসবে।

অবস্থানের ব্যাপারে অন্যান্য ক্রিয়াপদের সঙ্গে ত্রিশঙ্কু ক্রিয়ার এত বড়ো তফাত, কী ব্যাপার? ভাষাতত্ত্বের যে শাখা বাক্যবিন্যাসের হিসেব কষে সেই বাক্যতত্ত্ব এর জবাব খুঁজতে গিয়ে লক্ষ করে অন্য কী কী শব্দ একইরকম মধ্যবর্তী অবস্থানের পক্ষপাতী। বাংলায় বিশেষ এক জাতের অব্যয় ওই জায়গায় বসে: ‘পল্টু তো পালের গোদা’, ‘তিমি কি সত্যিই একরকম মাছ?’, ‘হাবুল নাকি কারুর কথা শোনে না’, ‘তোমাকেই বা বাদ দিল কেন?’। ওই ‘মেজাজ-কণিকা’-গুলো বাক্যের মাঝখানে বসতেই ভালোবাসে। বাক্যতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের প্রথম খসড়া বলবে, ক্রিয়ার মতো দেখালেও ত্রিশঙ্কু শব্দ আসলে ক্রিয়া নয়, একটা বেয়াড়া মেজাজ-কণিকা, যার গায়ে ক্রিয়ার বিভক্তি লাগানো যায়।

কিন্তু মেজাজ-কণিকা বিভিন্ন বাক্যে নানাবিধ কাজ করে থাকে। সেই বৈচিত্র্যে ত্রিশঙ্কু ক্রিয়ার রুচি নেই। সে একঘেয়ে একতারা বাজিয়ে চলে দিনরাত। মেজাজ-কণিকাকে ঘিরে রচিত ইতিবাচক বাক্য ‘পল্টু তো পালের গোদা’-র নেতিবাচক প্রতিরূপও বলতে পারছি, ‘পল্টু তো পালের গোদা না’। কিন্তু ত্রিশঙ্কুর বেলায় দেখুন, ‘কোপেনহাগেন হল ডেনমার্কের রাজধানী’-র নেতিবাচন করে ‘কোপেনহাগেন হল না সুইডেনের রাজধানী’ বলবার জো নেই। তাছাড়া মেজাজ-কণিকার পাশে প্রশ্নবাচক পদ থাকতে পারে, যেমন ‘তোমাকেই বা কারা নেমন্তন্ন করেছে?’ অথচ ‘কোপেনহাগেন হল কোন্ দেশের রাজধানী?’ বলতে গেলে দেখতে পাই ত্রিশঙ্কুর পাশে প্রশ্নবাচককে বসালেই ঝগড়া বাধে, বাক্যটা ভেস্তে যায়।

অর্থাৎ বিশ্লেষণের প্রথম খসড়ায় বাক্যতাত্ত্বিক নিবেদন করবে, “ত্রিশঙ্কু শব্দ আদতে বিভক্তি-পরা ইতিবাচক মেজাজ-কণিকা; ‘হল, হচ্ছে’ এই দুরকম আপাত-ভিন্ন চেহারা থাকলেও তার খুঁটি বর্তমান কালের মাটিতেই।”

ভাষাতত্ত্ব বিষয়টা তথ্যনির্ভর; অতএব তত্ত্বনবিশের অন্যতম কর্তব্য নিজের প্রত্যেকটা প্রস্তাবের ছিদ্রান্বেষণ। বাঙালি হলেও এ দায়িত্ব ‘বন্ধুদের’ ঘাড়ে চাপাতে নেই। প্রথম খসড়ার একটা ছিদ্র দেখতে পাচ্ছি: কোনো বাক্যেই একাধিক মেজাজ-কণিকা থাকে না; ত্রিশঙ্কু যদি নিজেই মেজাজ-কণিকা হয় তাহলে তার পাশাপাশি সমগোত্রীয় কণিকার উপস্থিতি সে বরদাস্ত করবে কী করে? অথচ এই বাক্যগুলো দেখছি অনায়াসে বলা যাচ্ছে: ‘এটা তো হচ্ছে তোমার গল্পের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা’, ‘ওটা তো হল তোমার সেই বিখ্যাত ডাকবাক্স।’ ত্রিশঙ্কু ক্রিয়ার সঙ্গে মেজাজ-কণিকা ‘তো’-র এই সহাবস্থান আটকে যাওয়া উচিত কিন্তু আটকাচ্ছে না।

ছিদ্র দেখতে পাওয়ামাত্র বিশ্লেষণ নির্বিচারে ফেলে দেওয়াও অবশ্য কাঁচা কাজ। যে মেজাজে আমরা ‘ওটা তো হল তোমার সেই বিখ্যাত ডাকবাক্স’ বলি সেভাবে একেকটা বাক্যকে টেনে আরো লম্বা করি মাঝে মাঝে। দিব্যি বলতে পারি, ‘ওটা তো হল গিয়ে, মানে, সেই ডাকবাক্স যেটার কথা তুমি বলেছিলে, তাই না?’ এখানে ইতস্তত করার, থেমে থেমে কথা বলার লক্ষণ খুবই স্পষ্ট। দেখুন, ইতস্ততর ব্যাকরণ হয় না। অতএব ‘ওটা তো হল’ বা ‘এটা তো হচ্ছে’-র মতো বাক্যের অস্তিত্বকে আমাদের ভাষ্যের ত্রুটি ভেবে আঁতকে ওঠার দরকার নেই। ব্যাকরণের সূত্রবিশেষের ব্যতিক্রম নয়, এই উদাহরণগুলো ব্যাকরণের বাইরে নিয়ে গেছে আমাদের।

দ্বিতীয় একটা ছিদ্র খুঁজে পেয়েছি। যে যে বাক্যে ‘হল/হচ্ছে’ বলা যাচ্ছে সেখানে ‘দাঁড়াল/দাঁড়াচ্ছে’-ও বলা চলে: ‘সাঁইত্রিশকে ছয় দিয়ে গুণ করার ফল দাঁড়াচ্ছে দুশো বাইশ’। এই জিনিসকে কেউ মেজাজ-কণিকার বিভক্তি-পরানো ছদ্মবেশ ভাববে কি? তা ভাববে না ঠিকই, কিন্তু ‘দাঁড়াল/দাঁড়াচ্ছে’-র সঙ্গে তুলনাটা মাঝপথে গিয়ে আটকে যায়। বাক্যের শেষে ক্রিয়াটাকে বসিয়ে ‘…গুণ করার ফল দুশো বাইশ দাঁড়াচ্ছে’-ও বলতে পারছি, প্রশ্নপদ সহযোগে ‘হিসেবটা কী দাঁড়াল?’-ও বলা সম্ভব হচ্ছে, অর্থাৎ ‘দাঁড়াল/দাঁড়াচ্ছে’-কে ত্রিশঙ্কু বলে মানতে পারছি না, বড়োজোর দ্বিশঙ্কু বলতে পারি।

আমার ওতোর-চাপানের দ্বৈরথে তৃতীয় ছিদ্রনির্দেশ খোদ ‘হল’-কেই নিশানা করবে। ‘পল্টু হল পালের গোদা’-র উপর দুখানা কণিকা চাপিয়ে যেই বললাম ‘পল্টু হলই বা পালের গোদা’, তখনই ত্রিশঙ্কুদশা ত্যাগ করে ক্রিয়াটা এদিক ওদিক লাফিয়ে বেড়াতে লাগল। বাক্যের শেষে গিয়ে বসল: ‘পল্টু পালের গোদা হলই বা’। সামনের আসন দখল করে অট্টহাসি হাসল: ‘হলই বা পল্টু পালের গোদা’। অবাক কাণ্ড, ‘ই-বা’ কণিকা-দুটো শুধু ‘হল’-র সান্নিধ্যই পেতে পারে। ‘হচ্ছে’-র সঙ্গে ওদের আড়ি। বৈয়াকরণ আপনার মাথায় বন্দুক ঠেকালেও ‘পল্টু হচ্ছেই বা পালের গোদা’ উচ্চারণ করতে রাজি হবেন না আপনি। পরান যাবে তবু জবান যাবে না। ‘হল’-কেও দ্বিশঙ্কু ভাবব নাকি? ত্রিশঙ্কুর মর্যাদা কি তাহলে কেবল ‘হচ্ছে’-রই প্রাপ্য?

ওতোর-চাপানের নাটক থেকে সরে এসে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সূত্রধর বলছে, বাক্যকে নিছক কথার পিঠে কথা জুড়ে গেঁথে ফেলা একেকটা মালার মতো ভাবাটাই আসলে ভুল। আপনি কী বলতে পারেন অথবা পারেন না তার অনেকটাই নির্ভর করে বাক্যের স্বরন্যাসের উপর। স্বরন্যাস হচ্ছে সুরের আর গলার জোরের ওঠা-নামার ক্রমাগ্রগতিরেখা। এমনিতে ‘সুর’ বলতে লোকে নরম সুর কড়া সুর বোঝে, সেইজন্যে ‘স্বরন্যাস’-এর মতো নতুন শব্দ ছুড়ে মারছি। বলতে চাইছি টোন নয়, ইনটোনেশন। দেখুন, ইতস্তত করারও একরকম বিশিষ্ট স্বরন্যাস রয়েছে, যেকেউ চিনতে পারে।

স্বরন্যাসের গুরুত্ব এবং তিন-তিনটে ছিদ্রের কথা মাথায় রেখে খসড়া-বিশ্লেষণটা কী করে শোধরানো যায়? এই প্রশ্নের মোকাবিলা করার প্রথম ধাপে স্বরন্যাসের সঙ্গে বাক্যতত্ত্বের সম্পর্ক নিয়ে একটু ভাবা দরকার।

দেখুন, গোটাকতক বাঁধা-ধরা স্বরন্যাসের হিসেব করা আছে বাক্যতত্ত্বের খাতায়। ভাষাতত্ত্বের এই শাখায় আমরা ধরে নিই, ‘তোমাদের প্রধান সমস্যা হল ওষুধের অভাব’-এর মতো বাক্যের প্রথমার্ধে থাকে পূর্বপরিচিত বিষয়ের উত্থাপন বা পুনরুল্লেখ; ওই জায়গাটাকে বলে বাক্যের ‘কেতন’ (বর্তমান দৃষ্টান্তে ‘তোমাদের প্রধান সমস্যা’)। বাক্যের দ্বিতীয়ার্ধের একটা কিছু অপেক্ষাকৃত জোর গলায় বলা হয়; সেইটাকে বলি বাক্যের ঝলক বা ফোকাস (আলোচ্য দৃষ্টান্তে ‘ওষুধের অভাব’।) তবে ঝলক-কণিকা ‘ই’ জুড়ে আপনি বাক্যের গোড়ার দিকেও বসাতে পারেন ঝলককে: ‘ওষুধের অভাবই হল তোমাদের প্রধান সমস্যা’। খেয়াল করুন, দ্বিশঙ্কু ‘দাঁড়ানো’-কে ধরে এনে ‘ওষুধের অভাবই দাঁড়াল তোমাদের প্রধান সমস্যা’ বলা যাচ্ছে না। ত্রিশঙ্কু থেকে দ্বিশঙ্কুর সূক্ষ্ম তফাতগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ছকা বাক্যতত্ত্বের একার কলকবজার সাধ্যে কুলোবে না দেখতেই পাচ্ছি। যুগপৎ বাক্যতত্ত্বের জাবদা খাতার হিসেব আর স্বরন্যাসের সূক্ষ্ম তরঙ্গধর্মিতাকে একই অঙ্গে ধারণ করতে ভাষাতত্ত্বের কোনো প্রকরণ পারবে কি?

আমাদের পেশার সংখ্যাগুরু সদস্যের প্রিয় যে আকৃতিসর্বস্ব বা ‘আকরণবাদী’ ভাষাতত্ত্ব, সেই কারবার আমলাতান্ত্রিক রীতিতে বড়োই বেশি স্বস্তি পায়। ওই ব্যাপৃতির ব্যাপারীরা শাখাগুলোকে ভাষা-গাছের গুঁড়ি থেকে কেটে আলাদা একেকটা ঘরে ডেস্কের সামনে বসিয়ে দিয়ে বলেন, ধ্বনিতত্ত্ব, পদাণুতত্ত্ব (ওরফে রূপতত্ত্ব), বাক্যতত্ত্ব, অনুধাবনতত্ত্বের সবাইকে নিজের নিজের চরকায় তেল দিতে হবে। ওভাবে আসল কাজ হয় কখনো?

ভাষাতত্ত্বের যে সংখ্যালঘু ঘরানায় আমি শামিল সেই ‘কায়াবাদ’-এর অন্যতম মূলমন্ত্র হল, প্রচ্ছন্ন এক সমন্বয়সাধক আয়োজনকে সচল রাখা। সেটার পোশাকি নাম সংকেততত্ত্ব, সেমিয়টিক্স; সে একরকম মেঘদূত বলতে পারেন। ব্যাকরণের শাখারা স্বতন্ত্র কাজ করে, সেই স্বাতন্ত্র্যে আমরাও বাগড়া দিই না। কিন্তু মেঘদূত শাখায় শাখায় ঘুরে বেড়ায়, এক শাখার গন্ধ পাশের শাখায় পৌঁছে দেয়। সাহিত্যরসিক মাত্রেই জানেন কবিতায় ছন্দ কীভাবে চলে ফেরে। ছান্দসিকের প্রিয় গুরু-লঘু-খচিত কঙ্কালের হিসেবের বিরুদ্ধে রক্তমাংসের ছোটো ছোটো বিদ্রোহের দিনপঞ্জিকা লেখে সে। কায়াবাদী ভাষাতত্ত্বের রোজনামচায় সংকেততত্ত্ব ঠিক সেইভাবে হিসেব আর বেহিসেবের সমীকরণ আঁকতে আঁকতে এগিয়ে চলে।

সংকেততত্ত্ব ওরফে মেঘদূত কীভাবে কাজ আর খেলা তাল মিলিয়ে চলে তার নমুনা আমার পেশাদার লেখাপত্রের দু-চার জায়গায় পাবেন। তবে সেসব লেখায় আজকের আলোচিত জট ছাড়ানোর উপায় বলা নেই। আপনাদের দেখিয়ে দেখিয়ে পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটতে যাব কোন্ দুঃখে? ত্রিশঙ্কু ইত্যাদি জট ছাড়াবার কাজে হয়তো এগিয়ে আসবেন বর্তমান প্রবন্ধেরই কোনো পাঠক। আপনি ভাষাতত্ত্বে দীক্ষিত হোন বা না হোন, নিজের মতো করে প্রশ্নটা নেড়ে-চেড়ে দেখতে দোষ কী। ব্যাকরণের শাস্ত্রের যাবতীয় নিয়ম মেনে নিজের অনুধাবনকে কুচকাওয়াজ করাতে হবে এমন কোনো আইন নেই। এমনকি আমাদের একুশে আইন অধ্যুষিত দুর্ভাগা দেশেও জারি হয়নি ওরকম কালা কানুন। যা প্রাণ চায় তাই ভাবুন না। সাধারণ নাগরিকের কাণ্ডজ্ঞান থেকেই সমস্ত বিশ্লেষণের উৎপত্তি। আপনি যাই ভাবুন না কেন, যদি মন দিয়ে, খানিকটা সময় খরচ করে সেই ভাবনা সাজাতে বসেন তাহলে দেখবেন একটা বিশ্লেষণের খসড়া দাঁড়িয়ে গেল। ‘দাঁড়িয়ে’ গেল? আবার সেই ‘দাঁড়ানো’ চলে এল ভাবনার প্রাঙ্গণে! আজকের আড্ডায় এখানেই ইতি টানা যাক। আসি।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x