Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

বাঁদনা পরব বা বাঁধনা  পরব

সঙ্গীতা মাহাতো

পুরুলিয়া

 ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্য এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পুরুলিয়া জেলা, ঝাড়গ্রাম জেলা, বাঁকুড়া জেলা, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কুড়মি, বাউরী, রাজুয়ার ,সাঁওতাল ,নাপিত ,কুইরি, বাগাল, কুমহার, গোয়ালা প্রভৃতি জাতিদের কৃষিভিত্তিক উৎসব। এটি প্রতিবছর কার্তিক মাসের অমাবস্যার রাত্রে অনুষ্ঠিত কালী পূজার পরদিন পালিত হয়ে থাকে। এই উৎসবে এক ধরনের আঞ্চলিক গান গাওয়া হয় তাকে অহিরাগান বলা হয়। 

গঠপূজা: অমাবস্যার দিন গোয়ালের সবচেয়ে বৃদ্ধ গরু বা মোষের শিঙে  কুড়াল তেল মাখিয়ে গোয়ালের অন্য গরুদের শিংয়ে তেল মাখানো হয়। বিকেল বেলায় গ্রামের মোড়ে গরুগুলিকে একত্র করা হয়। মাঠে বাঁধন দড়ির পুজো করা হয়। এই পূজা কে গঠ পূজা বলা হয়। আলপনা আঁকা হয় এবং তার ভেতরের ডিম রেখে দেওয়া হয়। এরপর ঢাকঢোল প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র বাজানো হলে গরুগুলি ছোটাছুটি শুরু করে।‌ এর মধ্যে কোন গরুটি ডিম ভেঙ্গে দেয় সেই দিকে লক্ষ্য রাখা হয়। সেই গরুর মাথায় তেল সিন্দুর ও ধানের শীষ দিয়ে সাজানো হয় ,মাঠ থেকে বাড়ি এলে সমস্ত গরুর পা ধোয়ানো হয়।

কাঁচি জিয়ারী:  অমাবস্যার সন্ধ্যা বেলায় চালগুড়ো ও কাঁচা দুধ দিয়ে মেখে শাল বা কাঁঠাল পাতার মন্ড আকার করে তার ভেতরে সলতে দিয়ে প্রতিটি বাড়ির দুয়ারে দুই দিকে খেড় ঘাস বা মলন্দা নামক এক ধরনের ঘাস রেখে তার মাঝখানে পাট কাঠি দিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়। তুলসী তলাতেও দেওয়া হয়। সমস্ত চালের মন্ডগুলো তুলে নিয়ে এসে এই চালগুলোর পুরোটার পিঠে বানানো হয় এবং বাড়ির সবাই তা অল্প করে ভাগ করে খায়। তারপর পাট কাঠি নিয়ে মাঠে গিয়ে আগুন জ্বালিয়ে ছড়া বলে। ছড়াটি হল ‘ইঁজরে রে পিঞ্জরে খোওসা বুড়ির খোসরে দা-দা বুড়ির দাদরে’ এই বলে আগুনের চারপাশে ঘোরে। এইটাকে ইঁজেই পিঁজেই বলে।

জাগরণ: অমাবস্যার রাতে বাড়ির গৃহিণীরা কুলোয় ধান দূর্বা আমের পল্লব  ,হলুদ, জল ও ধুনো দিয়ে নতুন জামা কাপড় পরে ছড়া সুর করে গেয়ে গরুকে বরণ করে। এই রীতিকে গাই চুমানো বলা হয় ।রাতে গোয়ালে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালা হয় এবং উঠোনে কাঠের আগুন জেলে রাখা হয়। যুবকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গরুদের জাগিয়ে রাখেন এই  যুবকদের দলকে ধাঁগড় বলা হয়।  এই ধাঁগড় এর দল মাদল ,বাঁশি, বাজিয়ে  ‘লায়া’ অর্থাৎ পুরোহিতদের বাড়ি থেকে ‘ঝাঁগোড়’ বা জাগরণী গানের দল গ্রামের মধ্যে বেরিয়ে পড়ে। গ্রামের সব বাড়ি থেকে একজন করে পুরুষ এই দলে যোগ দেয়, তারা অহিরা গান করতে করতে বাজনা বাজিয়ে বাড়িতে গেলে স্বাগত জানানো হয়। ঝাঁগোড়া বা গানের দলটি এলে তাদের পিঠা দেওয়া হয়।‌এই পিঠা বানানো হয় ঢেঁকিতে কোটা চালের গুড়ি দিয়ে।

গর ইয়া বা গোয়াল  পূজা: অমাবস্যার পরের দিন লাঙ্গল জোয়াল প্রভৃতি চাষের যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে বাহির উঠানে তুলসীতলায় রাখা হয়। প্রতিটি বাড়ির পুরুষেরা জমি থেকে এক হাতে ধান কেটে এনে ধানের শীষ দিয়ে গহনা তৈরি করে গরু বা মহিষের শিং য়ে পরিয়ে দেয়। এরপর চাষের যন্ত্রপাতি গুলিকে পুজো করে ঘরের ছাদে রেখে আসা হয়।‌এগুলো মাঘ মাসের প্রথম দিন হাল পুনহা এর দিন নামানো হয়।

প্রতিপদের দিন সকালে হয় গোয়াল পূজা। পাইনালতা নামে জঙ্গলের এক ধরনের পিচ্ছিল লতা বেটে তার থেকে রস বের করে আতপ চালের গুড়ি মিশিয়ে উঠানের দরজা থেকে গোয়ালঘর ও প্রতিটি ঘরের সামনে আলপনা দেওয়া হয়। আলপনার মধ্যে সিন্দুরের ফোঁটা দেয়। বাড়ির কর্তা পুকুর থেকে ডাটা সহ শালুক ফুল তুলে আনে। বাড়ির মহিলারা দুধ দিয়ে চালের গুঁড়ো পিটুলি বানিয়ে মাটির নতুন চুলায় তৈরি করে ঘিয়ের ছাঁকা পিঠে।  দুধ, গুড়, আতপ চালের পিঠে দিয়ে গোয়াল ঘরে পুজো দেওয়া হয় -গরাম ,গাই গরয়া, মোষ গরয়া ।গরাম ঠাকুরের উদ্দেশ্যে লাল মোরগ ও ধরম ঠাকুরের উদ্দেশ্যে সাদা মোরগ পূজা দিয়ে শেষ হয় গরইয়া পূজা। 

গরু খুটা: গরইয়া পূজার পরের দিন গরু খুটা হয়। অনুষ্ঠানে কিছু গরু বা কাড়া নির্বাচন করে তাদের গায়ে লাল ছোপ দেওয়া হয় এবং কপাল ও শিঙে তেল ও সিঁদুর লাগিয়ে গলায় মহড়া যাধান গাছের শীষ দিয়ে তৈরি মালা বেঁধে তাদের খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়। এরপর গরুর সামনে চামড়া রেখে চারদিক থেকে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গরুগুলিকে উত্তেজিত করলে গরুগুলি চামড়া গুলিতে গুতো দেয় এবং সেই সঙ্গে অহিরা গান করে। গরু খুটার পরের দিন বাদনা পরবের শেষ হয়।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x