Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

বাংলাদেশের চাকমা জনগোষ্ঠীর উৎসব এবং সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

লিটন চাকমা  

উৎসব বলতে সাধারণত সামাজিক ও ধর্মীয় এবং ঐতিহ্যগত প্রেক্ষাপটে পালিত আনন্দ অনুষ্ঠানকে বোঝানো হয় । সমাজ  মূলত এমন এক ব্যবস্থাকে বোঝানো হয় যেখানে একাধিক চরিত্র একত্রে কিছু নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠা করে একত্রে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলেন  । ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বলতে আধ্যাত্মিকতা ও অস্তিত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিশ্বাস ও অনুশীলন এবং মূল্যবোধকে বোঝানো হয়  আর ধর্মীয় প্রেক্ষাপট হলো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের সাথে সম্পর্কিত বিশ্বাস ও অনুশীলন এবং মূল্যবোধকে বোঝানো হয় যা একটি নির্দিষ্ট সময়ের সংস্কৃতি এবং সাহিত্যকে প্রভাবিত করে  আর একটি ঐতিহ্য হলো বিশ্বাস বা আচরণের একটি ব্যবস্থা  যা অতীতে উৎসের সাথে প্রতীকী অর্থ বা বিশেষ তাৎপর্য সহ একটি গোষ্ঠী বা সমাজের মধ্যে প্রবাহিত হয়  । বাংলাদেশের   ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকাংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম ,  ময়মনসিংহ ,  সিলেট ও রাজশাহী অঞ্চলে বসবাস করে থাকেন আর এদের মধ্যে রয়েছেন চাকমা,  গারো , মারমা ,  তঞ্চঙ্গ্যা ,  ম্রো ,  খেয়াং , চাক ,  বম ,  লুসাই , পাংখোয়া ,  ত্রিপুরা ,  সাঁওতাল এবং মনিপুরী ও হদি ইত্যাদি। মূলত বৈসাবি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান ৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজের বর্ষ বরণ উৎসব ও এটি তাদের প্রধান সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোর একটি আর এই উৎসবটি ত্রিপুরাদের কাছে বৈসুব বা বৈসু বা বাইসু ও মারমাদের কাছে সাংগ্রাই এবং চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের কাছে বিজু নামে পরিচিত । বর্ষবরণ হলো বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস বৈশাখের প্রথম দিনে বাংলা নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য অনুষ্ঠিত হয়  যেখানে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায়  নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার নানান আয়োজন  । পার্বত্য চট্টগ্রাম  দক্ষিণপূর্ব বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে তিনটি পাহাড়ি জেলা  যা খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি এবং বান্দরবান  আর ১৯ শতকে ব্রিটিশরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী  প্রধান যা চাকমা সার্কেল এবং মং সার্কেল ও বোমং সার্কেলে বিভক্ত করেছিলেন যা ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তারা একটি‌  একক জেলা গঠন করেছিলেন , কিন্তু পরবর্তীতে তাদের তিনটি পৃথক জেলায় বিভক্ত করা হয়েছিল । মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি বিস্তৃত পাহাড়ি এলাকা যেখানে বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর  বাসস্থান যেটির আয়তন  ১৩,২৯৫ বর্গকিলোমিটার  জুড়ে বিস্তৃত ও  এটি একটি বিস্তৃত পাহাড়ি এলাকা এবং দেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল  যা এই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার  ৪৯% প্রায়  ।  বস্তুত ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করেন যা চাকমা ও বোমাং এবং মং  আর পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা যা বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়িতে একটি  রাজতন্ত্র ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যেখানে বোমাং সার্কেল বান্দরবানে ও  চাকমা সার্কেল রাঙ্গামাটিতে এবং মং সার্কেল খাগড়াছড়িতে অবস্থিত ।  এই তিনটি জেলার রাজারা তিন রাজা নামে সুপরিচিত ও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ তিন রাজার আদেশ অনুসরণ করে আসছেন ,  সুতরাং বলা যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের একটি এলাকা  যা বর্তমানে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি এই তিনটি জেলা নিয়ে গঠিত এবং চট্টগ্রাম বিভাগের এই এলাকা পাহাড় ও উপত্যকায় পূর্ণ বলে এর নামকরণ হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ১৮৬০ সালের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম জেলার অংশ ছিল ।২০২২  সালের আদমশুমারি অনুসারে রাঙ্গামাটি জেলা ও খাগড়াছড়ি জেলা এবং বান্দরবান জেলার মোট জনসংখ্যা ছিলেন ১,৮৪২,৮১৫ জন যাদের মধ্যে ৯২০,২৪৮জন (৪৯.৯৪%) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোক ছিলেন। তাছাড়া আরেকটি বিষয় হলো জুম্ম জনগোষ্ঠী বলতে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার আদিবাসী উপজাতি জনগণকে সামগ্রিকভাবে বোঝানো হয়ে থাকে এবং এদের মধ্যে রয়েছেন চাকমা , মারমা ,  ত্রিপুরা , তনচংগা , চক ,  পাংখো , মুরং , বম , লুসাই , খিয়াং ও রাখাইন এবং খুমি জনগোষ্ঠীর লোকজন । 

জুম্ম শব্দটি  বাঙালিদের দ্বারা পাহাড়িদের এই  নামে ডাকা হয় যা সাধারণত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীদের  বোঝানো হয়ে থাকে ও জুম্ম শব্দটি  জুম চাষ থেকে আগত যেটি বাংলায় জুম্ম এবং  জুম চাষ হলো এক ধরনের স্থানান্তরিত কৃষিপদ্ধতি ও এটি মূলত জঙ্গল কেটে পুড়িয়ে চাষ করা হয়ে থাকে ও আবার সেই স্থানে জমির উর্বরতা কমে গেলে পূর্বের স্থান হতে কৃষি জমি স্থানান্তরিত করে অন্যত্র আবার কৃষি জমি গড়ে উঠে ও পাহাড়ের গায়ে ঢালু এলাকায় এই চাষ করা হয়ে থাকে এবং এই পদ্ধতির চাষে বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়  এবং জুম চাষ পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীদের জীবন জীবিকার প্রধান অবলম্বন বলা যায় । চাকমা মারমা ও ত্রিপুরা ছাড়াও অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর মানুষের মাঝে জুম চাষ বেশ জনপ্রিয় এবং  পাহাড়ি পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩টির বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস ও জুম চাষকে Shifting Cultivation অথবা স্থানান্তরিত চাষাবাদ পদ্ধতিও বলা যেতে পারে। পার্বত্য শব্দের অর্থ হলো  পর্বতময়  আর  ২০২২ সালের বাংলাদেশী আদমশুমারি অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামই বৃহত্তম ধর্ম (৪৪.৫২%) , কিন্তু তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর  বাসিন্দারা মূলত বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী (৪১.৭৪%)। 

পার্বত্য চট্টগ্রামের  জনগোষ্ঠীদের মধ্যে চাকমা হলেন বাংলাদেশের বৃহত্তম নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও চাকমাদের সবচেয়ে বড় জাতিগত উৎসব বিঝু যা বাংলা বছরের শেষ দুদিন ও নতুন বছরের প্রথম দিন এই উৎসব পালন করা হয়ে থাকে এবং বাংলা বছরের শেষ দিনের আগের দিনকে বলা হয়ে থাকে ফুল বিঝু ও শেষ দিনকে বলা হয় চৈত্র সংক্রান্তি বা মূল বিঝু আর 

চাকমাদের বর্ষবরণ উৎসবের নাম বৈসাবি যেটি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান ৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমাজের বর্ষ বরণ উৎসব ও এটি তাদের প্রধান সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোর একটি ।  বস্তুত বিজু চাকমা  সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান আনন্দ উৎসব যা বাংলা বছরের শেষ দুদিন ও নতুন বছরের প্রথম দিন , অর্থাৎ ফুল বিজু ও মূল বিজু এবং ১লা বৈশাখ বা গজ্যাপজ্যা বিজু ।  উৎসবের প্রথম দিনে নদী বা  ছড়া অথবা ঝরনাসহ বিভিন্ন স্থানে ফুল ভাসিয়ে সুন্দর পৃথিবীর জন্য মঙ্গল কামনা করে থাকেন নারী ও পুরুষ আর শিশুরাও ফুল বিজুর দিন গভীর অরণ্য থেকে ফুল সংগ্রহ করে ঘরবাড়ি সাজায়  ও নদীতে ফুল দিয়ে পুরোনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় বলা যায় ।   চাকমারা বিশ্বাস করেন এই ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে পুরোনো বছরের গ্লানি মুছে গিয়ে নতুন বছরে বয়ে আনে সুখ এবং শান্তি ও সমৃদ্ধি আর ফুল বিজুতে চাকমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী কালো লাল রঙের পিনন হাদি পরেন নারীরা ।  ছেলেরা ধুতি – ফতুয়া বা পাঞ্জাবি পরে ফুল বিজু উৎসবে মেতে উঠেন । ফুল বিজুর পরের দিন শুরু হয়ে থাকে মূল বিঝুর পর্ব  যেখানে রাতে বসে পরের দিনের পাচন তরকারি রান্নার জন্য সবজি কাটতে বসেন যা কমপক্ষে ৫টি আর বেশি হলে ৩২ রকম সবজি মিশেলে রান্না করা হয়ে থাকে ও 

মূল বিঝুর দিন সকাল বেলা চাকমারা ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে ফুল দিয়ে সাজান ও  বুড়োবুড়িদের গোসল করান এবং  তাদেরকে নতুন কাপড় প্রদান করে থাকেন ও এইদিন চাকমা তরুণ তরুণীরা খুব ভোরে উঠে কলা পাতায় করে কিছু ফুল গঙ্গার উদ্দেশ্যে নদীর পাড়ে দিয়ে থাকেন এবং তারপর সবাই বিশেষ করে ছোটোরা নতুন জামা কাপড় পরে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে থাকেন।  নতুন বছর বা গয্যে পয্যে  দিনে সবাই বৌদ্ধ মন্দিরে যান আর খাবার দান করে থাকেন ও ভালো কাজ করে বৃদ্ধদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেন আর 

ইদানীং বিঝুতে রেলি করা হয়ে থাকে যেখানে দেশ বিদেশের অনেক লোক বিঝু রেলিতে যোগ দেওয়ার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করেন বলা যায়। 

তাছাড়া চাকমারা ৩১টি বংশ বা গোত্রে বিভক্ত ও এই সম্প্রদায়ের প্রধান হলেন চাকমা রাজা যাঁরা উপজাতি প্রধান হিসেবে মর্যাদা ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ ভারতের সরকার এবং বাংলাদেশের সরকার কর্তৃক স্বীকৃত বলা যায় । চাকমা বা চাংঘমা জনগণ  ভারতীয় উপমহাদেশ এবং পশ্চিম মায়ানমারে বসবাসকারী একটি জাতিগত গোষ্ঠী ও জাতি এবং তারা বৃহত্তম আদিবাসী গোষ্ঠী এবং সেইসাথে দক্ষিণপূর্ব বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী আর মিজোরামের চাকমা স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদেও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ও চাকমা সার্কেল  যা চাকমা রাজ নামেও পরিচিত যা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি বংশগত রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার  একটি ও  চাকমা সার্কেল রাঙামাটি জেলা এবং খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা ও বান্দরবান জেলার রাজস্থলী উপজেলার অংশ জুড়ে বিস্তৃত ও এই রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সদস্যরা চাকমা বংশোদ্ভূত এবং বর্তমান রাজা দেবাশীষ রায়  বাংলাদেশের বৃহত্তম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ‌ সম্প্রদায় চাকমা সার্কেলের রাজা । গঙ্গা ও চাকমা ভাষায় গাঙ্ , গঙা , গঙ্গি প্রভৃতি  শব্দ নদী অর্থে বোঝানো হয়ে থাকে এবং  চাকমাদের জল দেবীর নামও গঙা ও এইসব শব্দ নিঃসন্দেহে গঙ্গানদী এবং হিন্দুদের গঙ্গাদেবীকে নির্দেশ করে থাকে আর হিন্দু ভাবধারার সাথে সম্পৃক্ত যে সব পূজা পার্বণ চাকমা সমাজেও অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায় এবং তার প্রায় সবগুলোতেই গঙা বা গঙ্গাদেবীর স্থান সর্বোচ্চ। তাছাড়া চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী আর সেই কারণে চাকমাদের অধিকাংশ আচার অনুষ্ঠান পুরোপুরি বৌদ্ধধর্মভিত্তিক এবং এমনকি মৃত সৎকার ও শ্রাদ্ধাদি অনুষ্ঠানেও ধর্মীয় প্রভাব সুস্পষ্ট ও পাশাপাশি এমন কিছু আচার অনুষ্টানও বেশ কয়েকটা দেখা যায় যেগুলো বৌদ্ধ আদর্শের পরিপন্থী আর এর কারণ হলো সম্ভবত  এককালে ধর্মের অবনতির যুগে বৌদ্ধধর্ম হিন্দুদের তান্ত্রিক মতবাদের সাথে মিশে তন্ত্রযান ,  মন্ত্রযান , বজ্রযান ইত্যাদি নানান  ধর্মের রুপ নেয় আর সেই সঙ্গে হিন্দুদের বহুু দেবদেবী ও হিন্দু আচার অনুষ্ঠানও এই ধর্মে অনুপ্রবেশ করে বলা যায় । ভারতে ধর্মীয় অবনতির যুগ বলতে বোঝানো হয়ে থাকে বিশেষ করে দ্বাদশ শতকে পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর বৌদ্ধধর্মের প্রভাব কমে যায় ও তা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায় , কিন্তু পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্ম উত্তর ভারত এবং তিব্বত ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল ও  পরবর্তীতে উনবিংশ শতাব্দীতে অনাগরিক ধর্মপাল এবং মহাবোধি সোসাইটির মাধ্যমে ভারতে বৌদ্ধধর্মের পুনরুজ্জীবন ঘটে  এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকে । অনাগারিক ধর্মপাল ( ১৭ সেপ্টেম্বর ১৮৬৪ – ২৯ এপ্রিল ১৯৩৩) ছিলেন একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং ধর্মপ্রচারক যিনি ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে ও উপাসনালয় গড়ায় বিশেষ অবদান রেখেছেন এবং তিনি শ্রীলঙ্কায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আণ্দোলনের একজন জাতীয়তাবাদী নেতা এবং অহিংস আন্দোলনের পুরোধাদের একজন আর মহাবোধি সোসাইটি হলো অনাগারিক ধর্মপাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি বৌদ্ধ সংগঠন ও যার মূল লক্ষ্য হলো ভারতে বৌদ্ধধর্মের পুনরুজ্জীবন ঘটানো এবং বোধগয়া ,  সারনাথ ও কুশীনগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ তীর্থস্থানগুলোর পুনরুদ্ধার ও সংস্কার করা ও  ১৮৯১ সালে শ্রীলঙ্কায় ধর্মপাল এটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর মাধ্যমে ভারতে বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । ধর্মের অবনতির যুগে বৌদ্ধধর্ম ছিল মূলত বৌদ্ধধর্মের মূল শিক্ষা ও অনুশীলনের অবক্ষয় এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং অন্যান্য ধর্মের যা বিশেষ করে হিন্দুধর্মের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের শিকার হওয়ার একটি সময়কাল ও  এই সময়ে কিছু অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের পতন ঘটে , কিন্তু অনাগারিক ধর্মপালের মতো ব্যক্তিত্বদের প্রচেষ্টায় ভারতে বৌদ্ধধর্মের পুনরুজ্জীবন ঘটে এবং ১৯ শতকের শেষদিকে এর সংরক্ষণ ও প্রসারের কাজ শুরু হয় ।  ভারতবর্ষে ধর্মের অবনতির কোনো একক নির্দিষ্ট যুগ বিদ্যমান নেই , এটির কারণ হলো বিভিন্ন ধর্মের পতন বা অবনতি বিভিন্ন সময়ে ঘটে  উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময় হিন্দুধর্ম ও  সংস্কৃতির পুনরুত্থানের ফলে বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মের অবনতি ঘটে ও সপ্তম থেকে দশম শতাব্দী পর্যন্ত রাজনৈতিক বিশৃংঙ্খলার কারণে অনেক রাজ্যে ধর্মের পতন দেখতে পাওয়া যায়  যা মুসলিম বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল ।  ভারতবর্ষে মুসলিম বিজয়ের সময়কাল প্রধানত অষ্টম থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত আর ভারতবর্ষে মুসলিম বিজয়ের সময়কাল বললে বলতে হয় ৭১২ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু ও মুলতান জয় করে ভারতবর্ষে প্রথম মুসলিম শাসনের সূচনা করেন ও ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ ঘোরির দিল্লি বিজয়ের মাধ্যমে ভারতে একটি স্থায়ী মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় ও 

 ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে কুতুব উদ্দীন আইবেক দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন যা ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনকে আরও বিস্তৃত করে ও  ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে বাবর মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তীকালে ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী মুসলিম সাম্রাজ্য হয়ে উঠে , কিন্তু ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর ভারতে মুসলিম শাসনের পতন ঘটে । মূলত ভারতবর্ষে  মুসলিম বিজয় বলতে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার চেয়ে বরং  একটি দীর্ঘ সময়কাল যা ৭১২ সালে শুরু হয়ে প্রায় ৭০০ বছর ধরে চলেছিল বলা যায় এবং পাল সাম্রাজ্যের সময়কাল ছিল আনুমানিক ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১৬১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত যা প্রায় চার শতক ধরে চলেছিল ও পাল সাম্রাজ্য একটি বৌদ্ধ সাম্রাজ্য ছিল ও পাল রাজবংশের শাসকেরা বৌদ্ধধর্মের মহাযান ও তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের অনুসারী ছিলেন এবং তাঁদের শাসনামলে বৌদ্ধধর্ম  জ্ঞানবিজ্ঞান ও শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল যার মধ্যে সোমপুর মহাবিহার ও বিক্রমশীল মহাবিহারের মতো বিখ্যাত বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রও ছিল আর অপরদিকে 

গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়কাল ছিল আনুমানিক ৩২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৫৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত যা প্রায় ২৩০ বছর ধরে বিস্তৃত ছিল ও এই সময়কালে ভারতীয় উপমহাদেশের বেশিরভাগ অঞ্চল এই সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং এটি ভারতের স্বর্ণযুগ হিসাবে পরিচিত এবং  গুপ্ত সাম্রাজ্যে প্রধানত হিন্দুধর্মের প্রসার ঘটেছিল এবং এটি ছিল একটি ধর্মীয়ভাবে সহিষ্ণু যুগ ও  ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনর্জাগরণ ঘটে এবং হিন্দুধর্ম রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে , তবুও বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের মতো অন্যান্য ধর্মগুলোও সমাজে বিদ্যমান ছিল এবং তাদেরও সহাবস্থান ছিল ।  ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণগুলো হলো গ্রামীণ জনগণের হিন্দু সংশ্লেষণে আগ্রহ ও তুর্কি আক্রমণ ও রাজকীয় এবং বণিকদের আর্থিক সহায়তার অভাব এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর হিন্দু ব্রাহ্মণ্য শক্তির পুনরুদ্ধার এবং পাল রাজবংশের পতন আর এই কারণগুলো একত্রিত হয়ে খ্রিস্টীয় ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব হ্রাস করে আর ১২শ শতাব্দীর মধ্যে হিন্দুধর্ম দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় ।  আবার এটিও তুলে ধরা প্রয়োজন ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ধর্মের উত্থানের মূল সময়কাল হলো আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ বা ৫ম শতাব্দীতে ও এই সময়ে গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ও দর্শনের উপর ভিত্তি করে এই ধর্মটির উৎপত্তি হয় এবং তিনিই এই ধর্মের মূল কেন্দ্র মগধ রাজ্যে যা বর্তমান ভারতের বিহারে জীবনযাপন করেন ও ভগবান বুদ্ধের জীবদ্দশাতেই তাঁর ধর্মের প্রচার শুরু হয় এবং এটি দ্রুত মগধের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।  তাছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের অবক্ষয় বৌদ্ধধর্ম  যা ভারতে উদ্ভূত হয়েছিল তা খ্রিস্টীয় ৪র্থ-৬ষ্ঠ শতাব্দীতে শুরু করে ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে শুরু করে এবং প্রায় ১২শ শতাব্দীতে হিন্দুধর্ম দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় যা শতাব্দীর দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ও হিন্দুধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি এবং তার সাথে আপস করা বৌদ্ধধর্মের নিজস্ব পরিচয় ক্ষুণ্ণ করে আর  শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মের অগ্রগতির সাথে সাথে জৈন ধর্মের প্রভাবও কমে আসে ও হিন্দুধর্মের সাথে আপস করা এবং এর সঙ্গে জাতিভেদ ও রীতিনীতির মিল থাকা সত্ত্বেও এটি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়নি এবং আজও এর অনুসারী রয়েছেন ।  সর্বোপরি বলা যায়  যখন একটি নির্দিষ্ট ধর্মের পতনকে ধর্মের অবনতির যুগ হিসেবে উল্লেখ করা হয় , তখন বৌদ্ধধর্মের অবক্ষয়কেই প্রায়শই এই সময়ের মধ্যে ধরা হয়। পাশাপাশি এটিও বলা যায় হিন্দুধর্ম মতে বর্তমানে কলিযুগ চলছে যা চতুর্যুগের শেষ এবং কলহ ও পাপে পরিপূর্ণ একটি যুগ ও এই যুগে কল্কি অবতারের আগমন ঘটবে এবং এর পরেই নতুন সত্যযুগের সূচনা হবে এবং হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী যুগচক্র চারটি যুগে বিভক্ত যেখানে সত্যযুগ  এটি প্রথম এবং পবিত্রতম যুগ‌ যা  ধর্ম পূর্ণরূপে বিরাজ করত। ত্রেতাযুগ ও এই যুগে ধর্মের পতন শুরু হয়। দ্বাপরযুগ  এটিও চতুর্যুগের অংশ যেখানে কলিযুগের আগের অবস্থা বিরাজ করত। কলিযুগ এটি চতুর্যুগের শেষ যুগ যা অন্ধকার ও পাপ এবং কলহ দ্বারা পূর্ণ ও কলিযুগকে পাপের যুগ বা অন্ধকারের যুগ  বলা হয় এবং এই যুগে কল্কি অবতারের আগমন ঘটবে বলে বিশ্বাস করা হয় ও 

কলিযুগের সমাপ্তির পর নতুন সত্যযুগের সূচনা হবে যা যুগচক্রের একটি নতুন পর্ব শুরু করবে। কলিযুগের বর্ণনা এই তথ্যগুলো মূলত পদ্মপুরাণ ও অন্যান্য পৌরাণিক গ্রন্থে পাওয়া যায় এবং ভাগবত ও কল্কি পুরাণেও এর বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে আর গৌতম বুদ্ধের অবস্থান হলো হিন্দুধর্মের বৈষ্ণব সম্প্রদায় অনুসারে গৌতম বুদ্ধ বিষ্ণুর নবম অবতার যিনি কলিযুগে মানুষের মধ্যে অহিংসা ও জ্ঞানের বার্তা দিতে এসেছিলেন ও কলিযুগে বৈদিক ধর্ম থেকে মানুষকে বিভ্রান্তি দূর করতে এবং শান্তি ও মুক্তি পৌঁছে দিতে বুদ্ধের রূপে বিষ্ণুর আবির্ভাব ঘটেছিল বলা হয়ে থাকে ও ভগবান গৌতম বুদ্ধ কলিযুগের অবতার নন বরং তিনি বিষ্ণুর নবম অবতার যিনি কলিযুগের ঠিক আগে আবির্ভূত হয়েছিলেন ।  কলিযুগের অবতার হলেন কল্কি যিনি ভবিষ্যতে আসবেন আর ভারতবর্ষে ধর্ম অবনতির যুগ বললে  হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে কলিযুগ থেকেই ধর্ম অবনতির যুগ শুরু বলা হয় । কলিযুগের প্রকৃতি হলো এই যুগকে সবচেয়ে খারাপ যুগ হিসেবে গণ্য করা হয় যেখানে মানুষ পাপ ও মিথ্যার দিকে ঝুঁকে পড়বেন এবং ধর্মীয় ও নৈতিক পতন ঘটবে এবং ভগবান কৃষ্ণের মৃত্যু ও কলিযুগের সূচনা‌ যেখানে পুরাণ অনুসারে শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু দ্বাপর যুগের সমাপ্তি ঘটায় এবং কলিযুগের সূচনা করে আর এই ঘটনার মাধ্যমে ধর্মের অবনতি শুরু হয় বলে বিশ্বাস করা হয় ও 

মানবতার পতন যেখানে কলিযুগে মানবতা অধঃপতিত হবে এবং পৃথিবীতে শান্তি ও ন্যায় ও ধর্মের অভাব দেখা যাবে আর এটি এমন একটি সময় যেখানে মানুষের নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা হ্রাস পাবে। তাছাড়া 

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু ঘটেছিল ১৮ ফেব্রুয়ারি ,  ৩১০২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ও তাঁর মৃত্যু ভালকা, সৌরাষ্ট্র রাজ্যে (বর্তমান ভেরাভাল , গুজরাত ,  ভারত) হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। পাশাপাশি বলা যায় ভগবান শব্দের অর্থ হলো এমন এক সত্তা যিনি ১/ ঐশ্বর্য (ধনসম্পদ) 

২/ বীর্য (শক্তি ও ক্ষমতা) ৩/ যশ (খ্যাতি ও সম্মান) 

৪/ শ্রী (সৌন্দর্য ও আকর্ষণ) ৫/ জ্ঞান (সর্বজনীন জ্ঞান) 

৬/ বৈরাগ্য (প্রকৃতিগত সত্তা ও আসক্তি থেকে মুক্তি) এই এই ছয়টি গুণের অধীশ্বর ও ভগবান শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ভগবান (Bhagavān) থেকে আগত এবং 

ছয়টি গুণ  যেখানে এই শব্দের মূল অর্থ হলো ছয়টি গুণের অধিকারী । কলিযুগের ধারণাটি হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মীয় শাস্ত্রে পাওয়া যায় ও অনেক সময় বুদ্ধের জন্ম ও কর্মকে কলিযুগের সাথে সম্পর্কিত করে দেখা হয় , এটির কারণ তিনি কলিযুগে সনাতন ধর্মের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয় ,  তবে এই ধারণাটি মূলত পরবর্তীকালের সংযোজন বলা হয়ে থাকে এবং এর ঐতিহাসিক ভিত্তি গৌতম বুদ্ধের প্রকৃত জন্মকালের চেয়ে ভিন্ন ও যারা মনে করেন গৌতম বুদ্ধ কলিযুগে জন্মগ্রহণ করেন তাদের ধারণাটি একটি জনপ্রিয় বিশ্বাস মাত্র যা ঐতিহাসিক তথ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং কিছু পুরাণে বলা হয় যে তিনি বৈদিক জ্ঞানকে অস্বীকারকারীদের ভিন্ন পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য জন্মগ্রহণ করেছিলেন যা কলিযুগের প্রেক্ষাপটের সাথে যুক্ত আর  অনেক পুরাণে তাঁকে কলিযুগের রক্ষাকর্তা হিসেবে বর্ণনা করা হলেও এটি একটি পরবর্তীকালের সংযোজন বলে ধারণা করা হয় এবং কলিযুগের অনেক আগেই তাঁর জন্ম হয়েছিল । বিভিন্ন ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় তথ্যসূত্রমতে গৌতম বুদ্ধ খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ বা ৫ম শতকে কলিযুগের অনেক আগে জন্মগ্রহণ করেন। ঐতিহ্যগত ধারণা বৌদ্ধ এবং হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী কলিযুগের শুরু সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ থাকলেও গৌতম বুদ্ধের জীবনকাল কলিযুগের অনেক আগের ঘটনা। হিন্দুধর্মের বৈষ্ণব সম্প্রদায় বুদ্ধকে ভগবান বিষ্ণুর একজন অবতার হিসেবে সম্মান করে থাকেন ও এই ধারণাটি বিষ্ণুর দশাবতারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত যেখানে বুদ্ধকে নবম অবতার হিসেবে উল্লেখ করা হয় ও যারা বৈদিক জ্ঞানকে অস্বীকার করে তাদের পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে বিষ্ণু বুদ্ধ রূপে জন্মগ্রহণ করেন । তাছাড়া হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী ভগবান বিষ্ণু একজন সনাতন ও চিরন্তন সত্তা তাঁর কোনো নির্দিষ্ট জন্মসাল নেই , এটির কারণ তিনি মহাজাগতিক শৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীতে অবতার হিসেবে আবির্ভূত হন যা নির্দিষ্ট কোনো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী হয় না ।   হিন্দু দর্শন অনুসারে বিষ্ণু হলেন এমন এক সত্তা যিনি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি ও রক্ষা এবং রূপান্তরের জন্য 

 দায়িত্বপ্রাপ্ত ও তিনি সবসময় বিরাজমান থাকেন যা 

সনাতন ও চিরন্তন সত্তা এবং  যখনই মহাজাগতিক ভারসাম্য নষ্ট হয় বা অন্যায় বৃদ্ধি পায়  তখন বিষ্ণু ধর্ম এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করতে মানব বা অন্য কোনো রূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন যা অবতার নামে পরিচিত এবং এই অবতারগুলো কোনো নির্দিষ্ট বছরের হিসাব অনুযায়ী হয় না, বরং এটি সময় ও পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে এবং অসংখ্য অবতার যেখানে বিষ্ণুর এমন অনেক অবতার রয়েছেন যা 

বিভিন্ন যুগে আবির্ভূত হয়েছেন আর ভগবান বিষ্ণুর দশ অবতার হলেন ১/ মৎস্য ২/  কূর্ম ৩/ বরাহ ৪/  নৃসিংহ ৫/ বামন ৬/ পরশুরাম ৭/  রাম‌ ৮/  বলরাম ৯/ বুদ্ধ এবং ১০/ কল্কি ও এই অবতারগুলো বিভিন্ন যুগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে ধর্ম রক্ষা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও মহাজাগতিক শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন করবেন। 

         চাকমাদের উৎসবের বেলায়  চাকমা সমাজে কোন শিশু ভূমিষ্ট হলে  কোন প্রকার মাঙ্গলিক অনুষ্টানই তার জন্মে অপেক্ষা করা থাকেনা , কিন্তু যখন নবজাতকের নাভি ঝরে যায় তখন একটা অনুষ্টান পালন করা হয়ে থাকে যার মাধ্যমে নবজাতকসহ প্রসূতি পরিশুদ্ধি হয়ে হেঁসেলে ঢোকার অনুমতি পান আর এই অনুষ্টানের নাম কজই পানি লনাহ্ ও হেঁশেল  শব্দের অর্থ হলো রান্নাঘর  ।  চাকমা বিশ্বাস মতে  সন্তান প্রসবের পর প্রসূতির এক ধরণের অশুচিতা জন্মে ও সেই কারণে এই অনুষ্টান এবং এই উপলক্ষ্যে দু একজন লোককে খাওয়ানোও  হয়ে থাকে এবং অশুচিতা জন্মে শব্দগুচ্ছের অর্থ হলো অপবিত্রতা বা পবিত্রতার অভাব সৃষ্টি হয় আর এটি সাধারণত কোনো ব্যক্তির জন্ম বা মৃত্যুর কারণে ঘটে যা অশৌচ বা অপবিত্রতার সময়কাল নির্দেশ করে থাকে যেখানে ব্যক্তি ও তার পরিবারকে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম পালন করতে হয় অবশ্যই ,  তাছাড়া শিশুর নামকরণেও কোন আনুষ্ঠানিকতার প্রচলন নেই বলা যায় ।  ‌চাকমারা উত্তরপূর্ব ভারতের তিব্বতী বর্মণ গোষ্ঠীগুলোর সাথে জিনগত প্রগাঢ়তার মিল রয়েছে এবং এদের মূল ভূখণ্ডের ভারতীয়দের সাথে জিনগত উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি বা মিলও রয়েছে আর উত্তরপূর্ব ভারতে তিব্বতী বর্মণ বলতে তিব্বত বর্মন ভাষাভাষী গোষ্ঠীগুলোকে বোঝানো হয়ে থাকে যা মূলত তিব্বত বর্মন ভাষার অন্তর্গত এবং এই অঞ্চলের চাকমা, লুসাই, তঞ্চঙ্গ্যা, এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় ও এই ভাষাগুলো ভারত , বাংলাদেশ , মায়ানমার এবং দক্ষিণপশ্চিম চীনের কিছু অংশে প্রচলিত ।  তিব্বতী বর্মণ ভাষা এটি সিনোতিব্বতী ভাষা পরিবারের একটি শাখা ও এই ভাষাগুলো তিব্বত এবং বার্মিজ ভাষাভাষী গোষ্ঠীগুলোর সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং তিব্বত বর্মন ভাষার মধ্যে প্রাচীনতম লিখিত রূপ হলো তিব্বতী ভাষা ।  চীনা তিব্বতি ভাষা হলো একটি ভাষা পরিবার যাদের অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৪০০টি ভাষা বিদ্যমান আছে এবং এইগুলো পূর্ব এশিয়া , দক্ষিণপূর্ব এশীয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে ব্যবহৃত হয়ে থাকে আর ভাষাভাষীর দিক থেকে ইন্দোইউরোপিয়ান ভাষা পরিবারের পরই এটির  অবস্থান  । তিব্বতী বর্মণ এই ভাষাগুলোর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য  আছে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়  এদের মধ্যে চাকমা ভাষা একটি ইন্দোইউরোপীয় বা ইন্দোআর্য ভাষা ও  চাকমা জনগণের জিনগত প্রগাঢ়তা উত্তরপূর্ব ভারতের অন্যান্য তিব্বত বর্মণ গোষ্ঠীগুলোর সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায় যা এই গোষ্ঠীর একটি বিশেষত্ব ও

 এই অঞ্চলে প্রচলিত অনেক ভাষার মধ্যে তিব্বত বর্মণ ভাষার প্রভাব দেখতে পাওয়া যায় আর তিব্বত বর্মণ ভাষা ও গোষ্ঠী হলো চীন তিব্বতি পরিবার যেখানে তিব্বত বর্মণ ভাষাগুলো মূলত চীন তিব্বতি ভাষা পরিবারের অংশ ও  এই গোষ্ঠীগুলোকে উত্তরপূর্ব ভারতের আসাম ,  নাগাল্যান্ড ,  মণিপুর এবং মেঘালয়ের মতো রাজ্যে দেখতে পাওয়া যায় ও উল্লেখযোগ্য গোষ্ঠীর কথা বললে বলতে হবে আসামের তিওয়া (লালুং) এবং মনিপুরের কিছু গোষ্ঠী এই ভাষার অংশ ও  এই ভাষাগুলো উত্তরপূর্ব ভারতের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বলা যেতে পারে । ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কথা বললে বলতে হয় এই গোষ্ঠীগুলোর আগমন এবং বিভিন্ন সময়ে তাদের বসতি স্থাপন উত্তর পূর্ব ভারতের ঐতিহাসিক বিবর্তনকে প্রভাবিত করেছে এবং অনেক তিব্বত বর্মণ গোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবেই এই অঞ্চলে বসবাস করে আসছেন এবং তারা স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে গেছেন ও তিব্বতী বর্মণ বলতে চীনা তিব্বতি (Sino Tibetan) ভাষা পরিবারের একটি বৃহৎ শাখা বোঝায় যার মধ্যে তিব্বতি ও বর্মী ভাষা ছাড়াও দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার প্রায় ৪০০টিরও বেশি ভাষা অন্তর্ভুক্ত ও এই ভাষাগুলো মূলত জোমিয়া নামে পরিচিত দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ম্যাসিফ অঞ্চল থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে প্রচলিত এবং প্রায় ৬০ মিলিয়ন মানুষ এই ভাষাগুলোয় কথা বলে থাকেন এবং এই ভাষা গোষ্ঠীর প্রধান সদস্য হিসেবে তিব্বতি ও বর্মী ভাষা দুটি ব্যাপক সাহিত্যিক ঐতিহ্য বহন করে থাকে ।  চাকমা ভাষা ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের অন্তর্গত একটি ইন্দোআর্য ভাষা ও এটি পূর্ব ভারতীয় ভাষা গোষ্ঠীর একটি সদস্য যা বাংলা অসমীয়া উপদলের অন্তর্ভুক্ত ও পূর্ব ভারতীয় ভাষা যা চাকমা ভাষা এই উপদলভুক্ত যা প্রতিবেশী অনেক ভাষার সাথে সাধারণ বৈশিষ্ট্য ধারণ করে থাকে উদাহরণ হিসেবে বলা যায় চাটগাঁইয়া ।  ইন্দো ইউরোপীয় পরিবার এটি বিশ্বের বৃহত্তম ভাষা পরিবারগুলোর মধ্যে একটি এবং ইন্দো আর্য শাখা  এই শাখাটি ইন্দোইউরোপীয় পরিবারের একটি অংশ যার মধ্যে বাংলা ও হিন্দি এবং অন্যান্য অনেক ভারতীয় ভাষা অন্তর্ভুক্ত ।  তাছাড়া উল্লেখিত ম্যাসিফ অঞ্চল বলতে একটি বৃহৎ ও সুসংহত পর্বত বা পার্বত্য অংশকে বোঝায় যেখানে একটি বা একাধিক শৃঙ্গ বা পর্বতের চূড়া থাকে এবং ভূতাত্ত্বিকভাবে এটি একটি বিশাল ভূখণ্ডের অংশ যেখানে ভূতাত্ত্বিক একক হিসেবে একটি বড় প্রস্তরখণ্ড গঠিত হয় যা সাধারণত একটি পর্বতমালার প্রধান অংশ বা একটি পৃথক পর্বতের মূল ভরকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে ,  সুতরাং আবারো বলা যেতে পারে তিব্বতী বর্মণ বলতে চীনা তিব্বতি (SinoTibetan) ভাষা পরিবারের একটি বৃহৎ শাখাকে বোঝানো হয়ে থাকে এবং এই গোষ্ঠীতে আরও অনেক ছোট ছোট সম্প্রদায় দ্বারা ব্যবহৃত ভাষা অন্তর্ভুক্ত যা এই ভাষার বৈচিত্র্যকে নির্দেশ করে থাকে এবং 

তিব্বত বর্মণ গোষ্ঠীর দুটি উল্লেখযোগ্য ভাষা হলো তিব্বতি ভাষা ও বর্মী ভাষা যাদের নিজস্ব সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্য বিদ্যমান আছে এবং এই ভাষাগুলো মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে পূর্ব গোলার্ধের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে উদাহরণ হিসেবে বলা যায় মিয়ানমার (বার্মা) ও বালিস্টান এবং চীনের বিভিন্ন অংশে প্রচলিত । Baltistan বা বাল্টিস্তান হলো ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাঞ্চলে পাকিস্তানের পরিচালিত একটি পার্বত্য অঞ্চল আর এটি গিলগিট বালতিস্তান প্রশাসনিক অঞ্চলের অংশ যা কারাকোরাম পর্বতমালায় অবস্থিত এবং কেটু পর্বতের কাছাকাছি এর অবস্থান ও এই অঞ্চলটি সিন্ধু ও শ্যাওক নদীর মতো উপনদী দ্বারা গঠিত একটি উচ্চ লাদাখ মালভূমি  আর চাকমারা উত্তরপূর্ব ভারতের তিব্বতীবর্মণ গোষ্ঠীগুলোর সাথে জিনগত প্রগাঢ়তার মিল বিদ্যমান আছে বলা হয়ে থাকে ।  

চাকমা শব্দটি সংস্কৃত শব্দ শক্তিমান থেকে আগত আর বর্মী রাজত্বের শুরুর দিককার সময়ে বর্মী রাজারা এই চাকমা নামকরণের প্রচলন করেন আর বর্মী রাজত্বের ইতিহাস বলতে মিয়ানমার (পূর্বের বার্মা) রাজ্যের উত্থান ও পতন এবং ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসকে বোঝানো হয়ে থাকে যা প্রাচীন পাইয়ু নগররাষ্ট্র থেকে শুরু হয়ে মধ্যযুগীয় রাজ্য এবং ব্রিটিশ দখলদারিত্বের মধ্য দিয়ে আধুনিক মিয়ানমারে পরিণত হয় ও এই ইতিহাসে পাগান রাজ্য ও কনবাউং সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ বার্মার মতো বিভিন্ন পর্যায় অন্তর্ভুক্ত বলা যায়। পাইয়ু ছিল বর্তমান মিয়ানমার অঞ্চলে গড়ে উঠা প্রথম দিকের নগররাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম যা খ্রিস্টপূর্ব ২ শতকে গঠিত হয় এবং তিব্বতীয়-বর্মণ ভাষাভাষী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ও 

এই নগররাষ্ট্রটি বার্মিজ ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। বার্মার প্রথম দিকের রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রধান ছিল প্যাগান রাজ্য যা ১০৪৪ থেকে ১২৯৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। প্যাগান রাজ্যের পতন এবং বিভিন্ন রাজ্যে বিভক্ত হওয়ার পর আভা রাজ্য (১৩৬৪-১৫২৭ সাল) এবং পরে তৌঙ্গু রাজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। 

তৌঙ্গু রাজ্য  ছিল মিয়ানমারের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্মী রাজবংশ যা ১৪৮৬ থেকে ১৭৫২ সাল পর্যন্ত ছিল । কনবাউং সাম্রাজ্য ছিল বার্মার (মিয়ানমার) শেষ রাজবংশ যা ১৭৫২ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত বার্মাকে শাসন করেছিল এবং এটি বার্মার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও বিশাল সাম্রাজ্যগুলোর একটি ছিল । ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্থানের সময় কনবাউং সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ১৮২৪ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যে ব্রিটিশরা বার্মার উপর আগ্রাসন চালিয়ে বার্মার সার্বভৌমত্বের পতন ঘটান ও ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হওয়ার পর কনবাউং রাজবংশ ও বার্মার স্বাধীনতা শেষ হয় ,  অর্থাৎ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে পরাজয় তাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শেষ করে দেয়। তাছাড়া বার্মার (বর্তমানে মিয়ানমার) প্রাচীন যুগ প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২ শতক থেকে শুরু হয় । নবম শতকে বার্মার জনগোষ্ঠী ইরাবতী উপত্যকায় এসে বসবাস শুরু করেন এবং এর ফলে বেগান রাজ্যের সৃষ্টি হয় ও 

বেগান রাজ্য (১০৪৪-১২৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) ছিল মিয়ানমারের

 মিয়ানমারের একটি ঐতিহাসিক রাজ্য যা ইরাবতী নদীর অববাহিকায় গঠিত হয়েছিল এবং বর্মি ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ও এই সময়কালে বর্মী ভাষার বিকাশ ঘটে এবং এটি বার্মার  সংস্কৃতির উত্থানকে ত্বরান্বিত করে। বেগান রাজ্যের পতনের পর আভা ও  হান্তাওয়ারি এবং মারুক ইউ এর মতো অন্যান্য রাজ্য প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। হান্তাওয়ারি রাজ্য ছিল মধ্যযুগে মায়ানমারের (তখন বার্মা নামে পরিচিত) একটি শক্তিশালী রাজ্য যা ১২৮৭ সালের মঙ্গোল আগ্রাসনের পর গঠিত হয় ও এটি পরবর্তীকালে আভা রাজ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এবং বহুজাতিগত একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে ও এই সময়েই বার্মিজ সংস্কৃতি ও সাহিত্যের একটি স্বর্ণযুগ দেখা যায় ও বিভিন্ন আইনের কোড তৈরি হয়। ১২৮৭ সালে প্রথম মঙ্গোল আগ্রাসনের পর বেগান রাজ্য দুর্বল হয়ে যায় এবং বিভিন্ন স্বাধীন রাজ্য যেমন আভা ,  হান্তাওয়ারি এবং মারুক ইউ (সমূহ) গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।  ম্রাউক-ইউ (আরাকান) রাজ্য ১৪৩০ থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৫০ বছর ধরে বিদ্যমান ছিল এবং এটি রাখাইন রাজ্যে (তখন আরাকান নামে পরিচিত) অবস্থিত ছিল এবং এর রাজধানী ছিল ম্রাউক-উ শহর যা বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি অবস্থিত ছিল ও এই রাজ্যটি আধুনিক বাংলাদেশ এবং মায়ানমারের কিছু অংশ জুড়ে শাসন করত ও অতীতকালে এই অঞ্চলটি আরাকান নামে পরিচিত ছিল যা বর্তমানে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ঐতিহাসিক নাম ও ১৪৩০ সালে ম্রাউক-উ শহরকে আরাকান রাজ্যের রাজধানী ঘোষণা করা হয়। 

তাছাড়া বার্মার মধ্যযুগ বলতে সাধারণত পাগান রাজ্যের পতনের পর থেকে ম্রাউক উ রাজ্যের প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত সময়কে বোঝানো হয় যা প্রায় ১১শ থেকে ১৪শ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ,  তবে মধ্যযুগের নির্দিষ্ট কালসীমা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্নমত থাকতে পারে , কারণ এটি একটি বিস্তৃত ও পরিবর্তনশীল সময়কাল। তারপরও বার্মার মধ্যযুগের সময়কাল প্রায় ১১শ শতক থেকে ১৪শ শতকের মধ্যে ধরা যেতে পারে। 

পাশাপাশি বার্মার আধুনিক যুগের সঠিক সময়কাল সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন, তবে সাধারণত ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের পর থেকে আধুনিক যুগ শুরু হয় ,  অর্থাৎ ১৯ শতকের প্রথম দিকে থেকে আর দেশটি ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বার্মা নামে পরিচিত ছিল এবং ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে একটি দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ও সামরিক শাসনের অধীনে ছিল এবং আধুনিক যুগ বলতে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝায় যার মধ্যে রয়েছে উপনিবেশিক আমল এবং স্বাধীনতার পরবর্তী পর্যায়। 

প্রাচীন যুগ ও রাজ্যগুলোর উত্থান কথা বললে বলতে হবে পাইয়ু নগররাষ্ট্র যা মিয়ানমারে প্রথম বসতি স্থাপনকারী তিব্বতীয় বার্মান ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর দ্বারা পাইয়ু নামক নগররাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ও আরাকান রাজ্য যা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রথম ভারতীয়কৃত রাজ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল আর 

ভারত কর্তৃক ভারতীকৃত রাজ্যগুলোর মাধ্যমে ভারত কখনো আরাকান রাজ্য জয় করেননি ,   ভারতীকৃত রাজ্যগুলো হলো এমন অঞ্চল যেখানে ভারতের সংস্কৃতি ও ভাষা প্রভাবশালী ও ভারতীয়কৃত শব্দটি দ্বারা এমন কিছু অঞ্চলকে বোঝানো হয় যেখানে ভারতীয় সংস্কৃতি ও ভাষা বা প্রভাব বিস্তার লাভ করেছে ,  কিন্তু এর মানে এই নয় যে সেই অঞ্চলগুলো ভারতের অংশ এবং আরাকান রাজ্য মূলত মিয়ানমারের অংশ ও ভারতের সাথে এর সীমান্ত থাকলেও আরাকান রাজ্য কখনো ভারতের ভূখণ্ড ছিল না বা ভারত কর্তৃক জয় করা হয়নি ও আরাকান ছিল দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার একটি ভারতীয়কৃত রাজ্য যা বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য নামে পরিচিত আর আরাকানের ইতিহাসে অনেক স্বাধীন রাজ্য ছিল যার মধ্যে ধন্যাবাদী , বৈথালি , লেমরো  এবং ম্রাউক উ উল্লেখযোগ্য ও এই অঞ্চলটি ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাবে পড়েছিল এবং ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব এখানে এতো ব্যাপকভাবে দেখা যেত যা এখানকার রাজ্যগুলোর শাসনে প্রতিফলিত হতো ও ভারতীয়কৃত রাজ্য হিসেবে আরাকান একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস বহন করে যা সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে এবং বর্তমানে রাখাইন রাজ্য নামে পরিচিত। আরকান রাজ্য  এটি ১৪২৮ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ম্রাউক উ শহর থেকে শাসিত হতো ও মধ্যযুগীয় বর্মী সাম্রাজ্যের কথা বললে বলতে হবে টংগু রাজবংশের কথা ও এই রাজবংশটি বার্মিজ ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং কনবাউং রাজবংশ  এই সম্প্রসারণবাদী রাজবংশ দ্বিতীয় বার্মিজ সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন ও  মণিপুর ,  আরাকান ,  আসাম , পেগু এবং সিয়ামসহ প্রতিবেশী অঞ্চল জয় করে তৃতীয় বার্মিজ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন ।  ব্রিটিশ শাসন ও স্বাধীনতার কথা বললে বলতে হয় অ্যাংলো বর্মী যুদ্ধ যা প্রথম ও দ্বিতীয় অ্যাংলো বর্মী যুদ্ধের পর আরাকান এবং তেনাসেরিমসহ বার্মার কিছু অংশ ব্রিটিশরা দখল করে নেন এবং ব্রিটিশ বার্মা যেখানে ১৮৬২ সালে এই অঞ্চলগুলো ব্রিটিশ বার্মা নামে একটি প্রধান কমিশনারের প্রদেশ হিসেবে মনোনীত হয় আর  ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে ও ১৯৮৯ সালে দেশটি বার্মা থেকে মিয়ানমার নামে পরিচিত হয় এবং 

বর্তমানে এটি একটি আধুনিক রাষ্ট্র যার নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো বিদ্যমান আছে , সুতরাং দেখতে পাওয়া যায় বর্মী বা মায়ানমারের রাজত্বের ইতিহাসের সময়কাল নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন ,  তবে এর প্রথম পরিচিত বসতি ছিল প্রায় ১৩,০০০ বছর আগে এবং এর লিখিত ইতিহাস তিব্বত বর্মন ভাষী জনগণের দ্বারা পিউ নগররাজ্য প্রতিষ্ঠার সময় থেকে শুরু হয় ও এই রাজ্যগুলো খ্রিস্টপূর্ব ১০০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এরপর বৌদ্ধ সাম্রাজ্য ও অ্যাংকর সাম্রাজ্যের পতন ও উত্থান ঘটে আর ১৯ শতকে ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় যা মিয়ানমারকে ভারতের অংশ করে তোলে ,  যদিও এটি একটি পৃথক উপনিবেশ হিসেবেই পরিচালিত হতো। 

       তাছাড়া বর্মী বা মায়ানমারের রাজত্বের ইতিহাসে 

প্রারম্ভিক ইতিহাস যা খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ – ৮৫০ খ্রিস্টাব্দে 

প্রথম বসতি ও ভাষা যেখানে মিয়ানমারে প্রথম পরিচিত মানব বসতি ছিল প্রায় ১৩,০০০ বছর আগে ও পরবর্তীকালে তিব্বতবর্মন ভাষী মানুষেরা পিউ নগররাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন যা প্রথম লিখিত ইতিহাস হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে এবং প্রথম সাম্রাজ্যের সময়কাল হলো ১১শ থেকে ১৫শ শতক যেখানে 

পাগান সাম্রাজ্য  ১১শ থেকে ১৩শ শতকে Pagan সাম্রাজ্য মিয়ানমারের প্রথম উল্লেখযোগ্য বর্মী সাম্রাজ্য ছিল ও এই সাম্রাজ্য বৌদ্ধধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত করেন এবং এর স্থাপত্য ও শিল্পকলা আজও বিদ্যমান বলা যায় ।  দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের সময়কাল হলো ১৫শ থেকে ১৮শ শতক পর্যন্ত এবং তৃতীয় সাম্রাজ্যের সময়কাল হলো ১৮শ থেকে ১৯শ শতক পর্যন্ত এবং 

ঔপনিবেশিক যুগের সময়কাল হলো ১৮২৪ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত আর বর্তমান মিয়ানমারের কথা বললে বলতে হয় ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর মিয়ানমারে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৯৬২ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসন বলবৎ থাকে এবং বর্তমানে মিয়ানমার একটি সংস্করণ যা এই ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে গঠিত । 

        এই ইতিহাস তুলে ধরার কারণে হলো বার্মা ও আরাকান এবং চাকমা সম্প্রদায়ের সম্পর্ক হলো চাকমা জনগোষ্ঠী মূলত বার্মার (মিয়ানমার) আরাকান অঞ্চলে একসময় বসবাস করতেন এবং পরবর্তীতে তারা সেখান থেকে পালিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে আসেন । চাকমা জনগোষ্ঠী আরাকানীদের কাছে পরাজিত হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয় নেন এবং সেখানেই তাদের বসতি স্থাপন করেন। তাছাড়া চাকমা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করার পাশাপাশি কিছু অংশ মিয়ানমারে (বার্মা) এবং উত্তরপূর্ব ভারতের কিছু অংশেও বসতি স্থাপন করেছেন। তাছাড়া বার্মা (মিয়ানমার) এবং বিশেষ করে আরাকান অঞ্চলটি চাকমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেখান থেকে তারা তাদের বর্তমান ঠিকানায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন আর এছাড়াও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কিছু সম্পর্কিত বিষয়তো আছেই যা তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি । বস্তুত চাকমা শব্দটি বর্মী রাজত্বের শুরুর দিককার সময়ে বর্মী রাজারা এই চাকমা নামকরণের প্রচলন করেন ও বার্মায় প্রচলিত চাকমাদের নাম সংক্ষেপ সাক শব্দটি সংস্কৃত শব্দ শক্তিমানের বিকৃত রুপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে এবং এরই এক পর্যায়ে জনগোষ্ঠীটির নাম সাকমা  এবং পরবর্তীতে বর্তমান চাকমা নামটি গ্রহণযোগ্যতা পায় বলা যেতে পারে। তাছাড়া তখনকার সময়ে বর্মী রাজারা  চাকমাদের রাজার পরামর্শক ও মন্ত্রী এবং পালি ভাষার বৌদ্ধধর্মের পাঠ অনুবাদকের কাজে নিয়োগ প্রদান করতেন ও  রাজা কর্তৃক সরাসরি নিয়োগকৃত হওয়াতে বর্মী রাজ দরবারে চাকমারা বেশ প্রভাবশালী ছিলেন যেটি ইতিহাসে দেখতে পাওয়া যায়। মূলত বর্মী রাজারা বলতে মিয়ানমার বা বার্মার বিভিন্ন রাজবংশের শাসকদের বোঝানো হয়ে থাকে উদাহরণ হিসেবে বলা যায় আভা রাজবংশ এবং আলাউংপায়া রাজবংশ ও তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাজা হলেন বেইন্নাউং যিনি আধুনিক মায়ানমারে একজন কিংবদন্তী হিসেবে স্মরণীয় আর এছাড়াও মিনডন মিন এবং মিয়ানমারের শেষ রাজা থিবাউর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজাও ছিলেন এবং উদাহরণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য বর্মী রাজা ও রাজবংশের কথা বললে বলতে হয় বেইন্নাউং তিনি তোনগু রাজবংশের একজন শক্তিশালী রাজা ছিলেন যিনি থাইল্যান্ডে দশ দিকনির্দেশনার বিজয়ী হিসেবে পরিচিত ও তাঁকে বার্মার শ্রেষ্ঠ রাজাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়   আর মিয়ানমারে আভা রাজবংশের শাসন ছিল ও এই বংশের রাজা মিনডন মিন ছিলেন ও যার পর তাঁর সৎ ভাই পাগান সিংহাসনে বসেছিলেন এবং আলাউংপায়া রাজবংশ যা অষ্টাদশ শতকে এই রাজবংশের অধীনে মিয়ানমার একটি শক্তিশালী সম্প্রসারণবাদী যুগে প্রবেশ করেছিলেন এবং বার্মার শেষ রাজা হিসেবে ছিলেন থিবাউ ও তিনি এবং তাঁর রানী সুপায়ালাত ক্ষমতা হারানোর পর থিবাউকে নির্বাসিত করা হয় আর অন্যভাবে বললে রানী সুপায়ালাত  থিবাউয়ের রানী ছিলেন এবং তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিলেন ।   বস্তুত বার্মা যার বর্তমান নাম মিয়ানমার এটি একসময় একটি রাজতন্ত্র ছিল আর ঐতিহাসিকভাবে বর্মী রাজারা চাকমাদের নিয়োগ দিতেন এবং রাজদরবারে তাদের প্রভাব ছিল  । তাছাড়া চাকমাদের বিজক অনুসারে চাকমারা বুদ্ধের শাক্য বংশের অংশ ছিলেন ও তারা ধীরে ধীরে আরাকানে চলে আসেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের নিকটবর্তী পাহাড় পর্যন্ত তাদের অঞ্চল বিস্তৃত করেন ।  বিজক শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো বীজ  বা ছোট্ট চারা ও  চাকমা ভাষায় বিজক (বিজগ্রি) শব্দের অর্থ হলো কুলপঞ্জী বা ইতিহাস ও রাজা বিজয়গিরি (বিজগ্রি) এই রাজার সময় থেকেই চাকমাদের ইতিহাসের মূলধারা সৃষ্টি হয় বলে মনে করা হয়ে থাকে এবং বিজক চাকমাদের ইতিহাস ও কুলপঞ্জী বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে ।  রাজা বিজয় গিরি চাকমা সার্কেলের ১৫ তম চাকমা রাজা ছিলেন ও বর্তমানে চাকমা সার্কেলের ৫১তম রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় আর পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি ১৯০০ সালের আইনের ৪৮ ধারা মতে সার্কেল প্রধান বা রাজার পদে অভিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন সরকার।    

       তাছাড়া শাক্য  দক্ষিণ এশিয়ার উত্তরপূর্ব অঞ্চলের একটি প্রাচীন ইন্দো আর্য বংশ ছিলেন যাদের অস্তিত্ব লৌহ যুগে প্রমাণিত হয় ও লৌহ যুগের সময়কাল হলো  আনুমানিক  ১২০০  – আনুমানিক  ৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ  এবং  শাক্য প্রজাতন্ত্রের সময়কাল হলো আনুমানিক  ৭ম শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বাব্দ – আনুমানিক ৫ম শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ।‌  শাক্যরা ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে বৃহত্তর মগধ সাংস্কৃতিক অঞ্চলে পূর্ব ইন্দো গাঙ্গেয় সমভূমির প্রান্তে ছিলেন ও  মগধ প্রাচীন দীর্ঘ একটি এলাকা এবং রাজ্য ছিল যা গাঙ্গেয় সমভূমিতে ছিল ও Indo Gangetic Plain ( ইন্দো গাঙ্গেয় সমভূমি ) যেটিকে বলা হয়ে থাকে 

সিন্ধু গাঙ্গেয় সমভূমি যা  উত্তর ও পূর্ব ভারত এবং পূর্ব পাকিস্তান এবং দক্ষিণে নেপাল ও প্রায় সমগ্র বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে এবং এই অঞ্চলের দুটি প্রধান নদী ব্যবস্থা হলো সিন্ধু এবং গঙ্গা যার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ।  শাক্যদের রাজধানী ছিল 

কপিলাবস্তু যা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্ব গাঙ্গেয় সমভূমিতে অবস্থিত একটি প্রাচীন শহর যা লৌহ যুগের শেষের দিকে  এবং   গৌতম বুদ্ধ শাক্য বংশের ছিলেন ও তিনি শাক্য প্রজাতন্ত্রের ক্ষত্রিয় রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যাঁরা কপিলবস্তু শাসন করতেন যা ভারত ও নেপাল সীমান্তের কাছে অবস্থিত ছিল এবং 

শাক্য বংশে জন্মগ্রহণ করার কারণে তাঁকে শাক্যসিংহ বলা হয়ে থাকে এবং শাক্যরা ছিলেন একটি প্রাচীন ইন্দোআর্য গোষ্ঠী যারা একটি গণসংঘ বা অভিজাত অলিগ্যার্কিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে পরিচিত ছিলেন । 

Oligarchic শব্দের অর্থ হলো গোষ্ঠীশাসন সংক্রান্ত বা অল্প সংখ্যক লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা বোঝানো হয়ে থাকে ও এটি এমন এক সরকার বা শাসনব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে থাকে যারা তাদের সম্পদ ও বংশমর্যাদা বা অন্য কোনোভাবে ক্ষমতা অর্জন করেন ও 

আরাকানি জনগণ চাকমাদেরকে সাক বা থেক বা থাইখ নামেও অভিহিত করতেন ।  চাকমারা হলেন নিজস্ব সংস্কৃতি , লোককাহিনী  , সাহিত্য এবং ঐতিহ্যের অধিকারী মানুষ এবং  চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী অস্থায়ী ঘরগুলোকে মাওনোগাওর বলা হয়ে থাকে যা বাঁশ এবং খড় দিয়ে তৈরি করা হয়ে থাকে ও কাঠের কাঠের উপর স্থাপিত হয় । তাছাড়া ঐতিহ্যবাহী পোশাক প্রায় প্রতিটি সংস্কৃতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আর চাকমা মহিলারা পিনন হাদি পরেন যা বিভিন্ন নকশার সাথে রঙিন হাতে বোনা হয়ে থাকে এবং চাকমাদের অধিকাংশই থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের অনুসারী  যে ধর্ম তারা শতাব্দী ধরে পালন করে আসছেন ও  চাকমাদের একটি সংখ্যালঘু অংশ খ্রিস্টধর্ম পালন করে থাকেন ।   চাকমা সমাজে যে সব পূজা অনুষ্ঠান প্রচিলত আছে তার মধ্য অনেকগুলোই মানসিক পূজা উদাহরণ হিসেবে বলা যায় অহ্হিয়া , আহ্জার বাত্তি , চামনী‌ , চুমুলাং , ধর্মকাম , সিন্দি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য আর  

মানসিক  এর অর্থ হলো মানসিক বা কল্পিত  যা মন থেকে আসে ও পূজা  এর অর্থ হলো উপাসনা বা শ্রদ্ধা বা সম্মান প্রদর্শন যেটিকে বলা হয়ে থাকে  Mental Worship ও বিপদে পড়লে প্রায় সবধর্মের লোকই বিপদ উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য হরহামেশা কিছু না কিছু মানত করে থাকেন এবং বিপদ কেটে গেলে তারপর একসময় মানত শোধ করা হয়ে থাকে এবং অনেকে পান তামাকও মানত করেন আর বিপদ কেটে না যাওয়া পর্যন্ত এইসব জিনিস স্পর্শ করেননা আর 

এটা এক ধরনের ব্রতপালন বলা যেতে পারে এবং বৌদ্ধধর্মে এটাকে শীলব্রত পরামর্শও বলা হয়ে থাকে । 

      ব্রতপালন মানে কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে উপবাস বা সংযম পালন করা যেখানে আহার ও আচরণের উপর বিশেষ নিয়ম মেনে চলা হয়‌  এবং  যার মাধ্যমে উপাসক তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক মঙ্গলের জন্য দেবদেবীর কাছে প্রার্থনা করেন এবং সেই উদ্দেশ্যে কিছু খাদ্য ও আচরণিক নিয়ম পালন করেন  এবং শীলব্রত  বৌদ্ধধর্ম অনুযায়ী এমন কিছু বিধিবদ্ধ নীতি বা নিয়ম যা সৎ স্বভাব ও চরিত্র গঠনের জন্য প্রবর্তন করা হয়েছে এবং শীল শব্দের অর্থ হলো স্বভাব বা চরিত্র এবং ব্রত বলতে প্রতিজ্ঞা বা নিয়ম বোঝায় যা একত্রে সৎ জীবনযাপনের জন্য গৃহীত নীতিমালাকে নির্দেশ করে থাকে । আবার চাকমাদের মালক্ষী মা পূজা ও থানমানা পূজা এই দুটি  অনুষ্ঠানে ত্রিপুরা সস্প্রদায়ের সাথে কিছুটা মিল থাকলেও পূজা পদ্ধতিতে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান আছে ।  মা লক্ষ্মী হলেন হিন্দুধর্মে সম্পদ , সৌভাগ্য , সৌন্দর্য , উর্বরতা ও সমৃদ্ধির দেবী আর থান মানে স্থান বা জায়গা এবং মানা মানে সম্মান এবং তাই এর আক্ষরিক অর্থ হলো স্থানকে সম্মান জানানো যা নদী বা জলাশয়ের তীরে এই পূজা করা হযে থাকে । বস্তুত থানমানা পূজা হলো ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী চাকমা সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী পূজা আর এই পূজা 

 গঙ্গা পূজা বা গাং পূজা নামেও পরিচিত ও এই পূজার সাথে থানমানা নৃত্য নামে একটি বিশেষ নৃত্য পরিবেশিত হয়ে থাকে ,  যদিও চাকমারা প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, তবুও তারা বুদ্ধের পাশাপাশি অন্যান্য দেবদেবীরও পূজা করে থাকেন এবং এই পূজা তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী একটি অংশ , কিন্তু  পূজা পদ্ধতিতে অনেক পার্থক্য আছে ।  তাছাড়া 

চাকমা সমাজের  পূজা পার্বণের কথা বললে বলতে হয় 

গঙাত ভাতজরা দেনা যেখানে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের জ্বরজারি হলে চাকমা জননী সন্তানের রোগমুক্তির জন্য গঙা অর্থাৎ নদী বা ছড়ার জলে একমুঠি ভাত ছিটিয়ে দিয়ে আসেন ।  চামনী যেখানে 

মরণাপন্ন ছেলের আরোগ্য লাভ কামনায় অনেক সময় চাকমা জনক জননী ছেলের জন্য চামনী মানত করে থাকেন আর  ছেলে ভালো হয়ে গেলে একদিন ঘটা করে তাকে বিহারে নিয়ে শ্রামণ্য ধর্মে দীক্ষিত করা হয়ে থাকে এবং চামনীর মাধ্যমে বোঝানো হয়ে থাকে শ্রামণ্যব্রত ও

শ্রামণ্য ব্রত হলো বৌদ্ধধর্মে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধর্মীয় জীবনে ব্রত পালন করা  যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি শীল (নৈতিকতা) পালন করেন ও ব্রহ্মচর্য আচরণ করেন ও এটি মূলত বৌদ্ধ ধর্মের নৈতিক শিক্ষা লাভের একটি পদ্ধতি যেখানে একজন ব্যক্তি সাময়িকভাবে নিজের প্র্যত্যাহিক জীবন ত্যাগ করে বিহারে (মঠ) অবস্থান করেন ও ধর্মীয় অনুশীলন করেন এবং এটি একটি তপস্যা বা সাধনা যা জীবনে অন্তত একবার হলেও  পালন করা হয়ে থাকে যেমনটি চাকমা সমাজে প্রচলিত ।   চুমুলাং যেটি হলো 

যখনই কোন চাকমা বিপদে পরেন তখন বিপদে রক্ষা পাওয়ার জন্য চুমুলাং মানত করে থাকেন আর দূর্যোগ কেটে গেলে তখন সে ঘটা করে চুমুলাং পূজা করেন ও চুমুলাং আসলে বিয়ের পূজা এবং চুমুলাং পূজা  চাকমা  জাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ  পূজা যা বিশেষত বিবাহ অনুষ্ঠান ও অন্যান্য সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে ।  অহ্ইয়া যেখানে অপুত্রক ব্যাক্তি কামনা বা অনেকগুলো পুত্র সন্তানের পর একটি মেয়ে পাওয়ার বাসনায় বা আর্থিক সমৃদ্ধি কিংবা কোন বিপদ থেকে মুক্তির জন্য লোকে এই পূজা মানত করেন আর যদি মানস পূর্ণ হয় সে ঘটা করে এই পূজার অনুষ্টান করে থাকেন ।   সিন্দি এবং চাকমা ভাষায় সিন্দি আর বাংলায় শিরনি  তখনকার দিনে চাকমাদের প্রায় ঘরে ঘরে হিন্দুদের দেখাদেখি সত্য নারায়ণের নামে শিরনি দেওয়া হতো এবং  শিরনি মূলত স্রষ্টার প্রতি নিবেদন করা হয়ে থাকে এবং এর মাধ্যমে  পুণ্য লাভ এবং বিপদ আপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে ও শিরনি বিতরণের মাধ্যমে মানুষ তাদের ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ঈশ্বরের কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন যা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে করা হয়ে থাকে আর  সত্যনারায়ণ হলেন হিন্দু দেবতা বিষ্ণু নারায়ণের একটি বিশেষ রূপ যিনি সত্যের মূর্ত প্রতীক ও তিনি কলিযুগে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে বিবেচিত হন এবং তাঁকে সম্মান জানিয়ে সত্যনারায়ণ পূজা বা সত্যনারায়ণ ব্রত করা হয়ে থাকে এবং এই পূজা জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসে বলে বিশ্বাস করা হয় এবং পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে তিনি সত্যপীর নামেও পরিচিত আর সত্যনারায়ণ পূজা মূলত ভগবান বিষ্ণুকে উৎসর্গীকৃত একটি ধর্মীয় আচার ও এই পূজাকে সত্যনারায়ণ ব্রত কথা বা সত্যনারায়ণের ব্রতকথা হিসেবেও উল্লেখ করা হয় এবং এটি এমন একটি পূজা যা সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে ভগবান বিষ্ণুকে সম্মান জানানো হয়  এবং এর মাধ্যমে ভক্তরা ঐশ্বরিক আশীর্বাদ ও শান্তি কামনা করেন ।  ফানাচ্ বাত্তি যেখানে ফানুস বাতি উড়ানো কোনো নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একক ঐতিহ্য নয় , বরং এটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি সাধারণ প্রথা যা শুভ প্রবারণা পূর্ণিমায় তথা আশ্বিনী পূর্ণিমায় পালিত হয়ে থাকে এবং চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষ এই পূর্ণিমা তিথিতে গৌতম বুদ্ধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও ধর্মীয় রীতির অংশ হিসেবে ফানুস উড়িয়ে থাকেন এবং 

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী গৌতম বুদ্ধ আশ্বিনী পূর্ণিমায় তাঁর মাথার একমুঠো চুল কেটে আকাশে উড়িয়ে দিয়েছিলেন ও এই ঘটনাকে স্মরণ করে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ফানুস উড়িয়ে বুদ্ধকে শ্রদ্ধা জানান এবং 

 এটি কেবল চাকমাদের মধ্যেই নয়, বরং অন্যান্য বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের  মধ্যেও প্রচলিত একটি ঐতিহ্য বলা হয়ে থাকে ও ফানুস বাতি হলো এক প্রকার কাগজের উষ্ণ বায়ু বেলুন যা বৌদ্ধধর্মীয় উৎসবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে এবং এই লণ্ঠনগুলোর নিচে একটি ছোট অগ্নিশিখা থাকে যা গরম বাতাস তৈরি করে বেলুনটিকে আকাশে উড়তে সাহায্য করে এবং এটি মূলত পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ধর্মীয় আচারে ব্যবহৃত একটি ঐতিহ্যবাহী আকাশ প্রদীপ ও 

বুদ্ধের জন্মদিন বা অন্যান্য বৌদ্ধ উৎসবে ফানুস উড়িয়ে উৎসব পালন করা হয় এবং স্থানীয় দেবদেবীদের  সম্মান জানানোর জন্যও এটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে ।   আহ্জার বাত্তি যেখানে বিপদমুক্তি কিংবা রোগমুক্তির কামনায় লোকে আহ্জার বাত্তি মানত করে থাকেন ও এটি আসলে ভগবান বুদ্ধের উদ্দেশ্য প্রদীপ পূজা এবং এই অনুষ্ঠান বৌদ্ধ বিহারে কিংবা স্বগৃহে সম্পন্ন করা যায় , এই পূজার একাধিক নাম আছে যা হলো ধর্মকাম ,  জাদিপূজা, শিবপূজা, সীবলী পূজা ইত্যাদি এবং এটি আসলে  বুদ্ধের শিষ্য লাভী শ্রেষ্ঠ সীবলী মহাস্থবিরের পূজা এবং এই পূজা এখন বৌদ্ধশাস্ত্র সম্মতভাবে বিহারে অথবা স্বগৃহে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে আর সীবলী মহাস্থবিরের ইতিহাস বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটকের সাথে সম্পর্কিত এবং তিনি পূর্বজন্মে লাভীশ্রেষ্ঠ হওয়ার বর প্রার্থনা করেছিলেন যা তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনে ধনসম্পদ ও প্রাচুর্যের কারণ হয়েছিল‌ ও তাঁকে লাভারী হিসেবে সম্মান করা হয় যিনি তাঁর পূর্বজন্মে একবার বুদ্ধের কাছে এমন বর চেয়েছিলেন ও তাঁর এই বর প্রার্থনা এবং পরবর্তী জীবনে এর ফল হিসেবে তিনি লাভীশ্রেষ্ঠ হিসাবে পরিচিত হন ।   থান্ মানা এটি একটি সমষ্টিগত পূজা এবং পাড়ার প্রত্যেক গৃহস্থই এতে অংশ গ্রহণ করে থাকেন ।  মালেইয়া এটি ঠিক কোন পূজা পার্বণ নয় , বরং এটি চাকমাদের একটি প্রাচীন সামাজিক রীতি যা এখন প্রায় লোপ পেতে চলছে এবং এতে কোন দেবতার পূজা হয় না আর কোন গৃহস্থ যদি কোন কাজে পিছিয়ে থাকেন ইচ্ছে করলে সে পাড়ার লোকের সাহায্য নিতে পারেন ,  কোন কারণে কারও জুম কাটা দেরি পড়ে গেছে ঠিক সময়ে জঙ্গল কাটা না হলে কাটা জঙ্গল শুকাবেনা ও ভালোভাবে পোড়া যাবেনা ফলে ভাল ফসলও হবে না , তখন পাড়া পড়শীর সাহায্য নিয়ে সে কাজে সমতা আনতে পারেন এবং সেক্ষেত্রে সে পাড়ার ঘরে ঘরে গিয়ে সাহায্য আবেদন জানিয়ে আসেন এবং তার পরদিন প্রতি বাড়ি থেকে দা ও কুড়াল নিয়ে এক একজন লোক এসে তার কাজটা একদিনে সম্পন্ন করে দিয়ে যান , কিন্তু এদের কোন মজুরী দিতে হয় না শুধু খানাটা দিলে চলে ও  অবশ্যই একটু ভালোই দেওয়ার রেওয়াজ আছে এবং তখন এই উপলক্ষে সেই বাড়িতে ছোটখাট একটা ভোজের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় ,  কিন্তু গৃহস্থের অসচ্ছলতা থাকলে  অনেক সময় এমনিই সবাই কাজ করে দিয়ে আসেন এবং জুমে নিড়ানি দেওয়ার বেলায় কিংবা ফসল কাটার সময়ও মালেইয়া ডাকা হয়ে থাকে। আহল্ পালানী যেখানে 

প্রত্যেক বছর ৭ আষাঢ় অম্বুবাচী প্রবৃত্তি থেকে তিন দিন চাকমারা হালচাষ বন্ধ রাখেন এবং হিন্দুমতে এই সময় বসুমতি ঋতুমতী হয় আর তার উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পেয়ে শস্যধারণ ক্ষমতা জন্মে ও এই কয়দিন হালকর্ষণ কিংবা কোন প্রকার মাটি খোঁড়াখোঁড়ি নিষিদ্ধ বলা যায়। তাছাড়া বৌদ্ধ হিসেবে চাকমারা বেশ কয়েকটি ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করে থাকেন উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১/  কঠিন চীবর দান ২ / বৈশাখী পূর্ণিমা ৩ / মাঘী পূর্ণিমা ৪ / মধু পূর্ণিমা, ৫/ ওয়া ধরানা (বর্ষাবাস গ্রহণ)  ৬ /  ওয়া ভাঙানা (বর্ষাবাস শেষকরণ)  ৭ /  ব্যুহ চক্র ৮ / ফানাস বাত্তি উড়ানা (ফানুস উড়ানাে) ৯ / গাড়ি টানা ১০/  আহ্জার বাত্তি জ্বালানা (হাজার বাতি প্রজ্জ্বলন করা)  ১১/ মহাসংঘ দান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য । চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও তাদের মধ্যে এখনও প্রকৃতি, ভূত, প্রেত, দেবতা ইত্যাদি অতিপ্রাকৃতিক শক্তিরও বিশ্বাস আছে এবং চাকমারা সাধারণত বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারী হলেও ধর্মান্ধ নন ,   প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সহজসরল বৈশিষ্ট্যই সম্ভবত তাদেরকে যুগ যুগ ধরে তাদের প্রাচীন ধর্ম বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুগত ও বিশ্বস্ত রেখেছে ,  তাই তারা উল্লেখযােগ্য হারে কখনােই ধর্মান্তরিত হননি। তবে নানা কারণে বিভিন্ন সময় কিছু কিছু চাকমা অনেকটাই পরিস্থিতির শিকার হয়ে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছেন যেখানে  বর্তমানে জীবন জীবিকার অনিশ্চয়তা ,  চরম দরিদ্রতা , কর্মসংস্থানের অভাব ইত্যাদি কারণে চাকমাদের একটা অংশের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি 

চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও হিন্দু ধর্মের কিছু কিছু প্রভাব  লক্ষণীয় ও কিছু কিছু দেবদেবীর পূজাও  তাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে , কিন্তু বর্তমানে অবশ্য এসবের তেমন একটা প্রচলন নেই এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কখনাে সখনাে পালন করা হয় মাত্র এবং এসব পূজার মধ্যে অন্যতম হলাে ১ /  ভাতদ্যা পূজা ২  /  থানমানা পূজা ৩ /  ধর্মকাম ৪ / গঙাত ভাতজরা দেনা ৫ / মা লক্ষীমা পূজা ৬ /  ঐয়া পূজা ৭ /  চুঙুলাং পূজা ৮ / মাধাধনা ৯ / জুমমারানা   ১০ /  কুলুক মারানা ১১ /  ভুদা পূজা  ১২ /  শিজি পূজা ১৩ / এদা দাগানা ১৪ /  সিন্দি পূজা যেগুলো সংক্ষিপ্তভাবে পূর্বেই কিছুটাংশ তুলে ধরেছি । আরেকটি কথা বলে রাখা উচিত  চাকমাদের উৎসব অতীতের তুলনায় পরিবর্তিত হয়েছে , যদিও মূল ঐতিহ্যগুলো এখনও পর্যন্ত টিকে আছে ও প্রধান পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলা লিপির ব্যবহার এবং আধুনিক জীবনধারার প্রভাব যা উৎসব পালনের ধরন ও গভীরতাকে প্রভাবিত করেছে বলা যায়। পাশাপাশি পরিবর্তনের কারণসমূহের কথা বললে বলতে হয়  আধুনিকতার প্রভাব যেখানে 

আধুনিক শিক্ষা এবং প্রযুক্তি ও শহুরে জীবনের সংস্পর্শ চাকমাদের জীবনধারায় পরিবর্তন এনেছেন যা তাদের ঐতিহ্যবাহী উৎসবেও প্রভাব ফেলেছে। ভাষার পরিবর্তন যেখানে চাকমাদের নিজস্ব ইন্দোআর্য ভাষা থাকলেও বর্তমানে তারা বাংলা লিপি ব্যবহার করে থাকেন এবং এই পরিবর্তন ভাষার ঐতিহ্য এবং উৎসবে এর প্রয়োগে ভিন্নতা এনেছে বলা যায় ।  অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন যেখানে কৃষিভিত্তিক জুম চাষের উপর নির্ভরশীলতা কমে যাওয়ায় এবং বিভিন্ন পেশার সুযোগ তৈরি হওয়ায় উৎসবের প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন এসেছে বলা যায় আর আধুনিকতার সাথে সাথে চাকমাদের উৎসবগুলো কিছুটা হলেও পরিবর্তিত হয়েছে বৈকি ,  তবে বিজু উৎসবের মতো প্রধান ঐতিহ্যগুলো এখনও তাদের সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে  বলা যায় । চাকমা পরিবারে পিতা প্রধান হিসেবে বিবেচিত হন কারণ চাকমা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক , তবে চাকমা সার্কেল বা সম্প্রদায়ের প্রধান হিসেবে চাকমা রাজা নেতৃত্ব দেন যা একটি বংশানুক্রমিক পদ । তাছাড়া চাকমাদের গ্রাম প্রধানকে কারবারি বলা হয়ে থাকে এবং কয়েকটি পরিবার নিয়ে একটি গ্রাম বা পাড়া গঠিত হয় আর সেই পাড়ার প্রধানই কারবারি হিসেবে পরিচিত ।‌ আবার কয়েকটি পাড়া বা আদাম নিয়ে একটি মৌজা গঠিত হয় এবং সেই মৌজার প্রধানকে হেডম্যান বলা হয়ে থাকে।   চাকমারা  বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তারা একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী  হিসেবে পরিচিত ও আদিবাসী এবং উপজাতি বিতর্ক হলো বাংলাদেশ সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বলা হয় যে বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই ,  বরং মূল বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিপরীতে এই অবাঙালি জনসমষ্টিকে  উপজাতি ,  ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠী নামে অভিহিত করা হয়েছে। তবে  চাকমারা জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণা ২০০৭ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ১০৭ ও ১৬৯ নং কনভেনশনের ঘোষণা অনুযায়ী নিজেদের আদিবাসী দাবি করেন এবং উপজাতি নামটি মনেপ্রাণে অপমানকর মনে করেন। তাছাড়া আরাকান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসায় বাংলাদেশ তাদেরকে আদিবাসী স্বীকৃতি দেয়নি , কিন্তু তবে বর্তমানে পাঠ্যবইয়ে উপজাতি শব্দের বদলে ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী লেখা হয় । আদিবাসীর বৈশিষ্ট্য হলো প্রাচীনতম বাসিন্দা যেখানে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের আদিম বা প্রাচীনতম বাসিন্দাদের সরাসরি বংশধর হিসেবে নিজেদের দাবি করেন এবং স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ভাষা যেখানে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, এবং ভাষা রয়েছে যা তারা সংরক্ষণ করেন এবং সাংস্কৃতিক ও জাতিগত স্বতন্ত্রতা যেখানে তারা মূল স্রোতের সমাজ থেকে আলাদা এবং নিজস্ব সামাজিক কাঠামো বজায় রাখেন । আদিবাসী 

এই শব্দটি মূলত ভারতের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি সম্মিলিত পরিচিতি তৈরি করার জন্য ব্যবহৃত হয় যেখানে আদি অর্থ শুরু থেকে এবং বাসী  অর্থ বাসিন্দা ।  আন্তর্জাতিকভাবে আদিবাসী বলতে এমন জাতিগোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যারা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের আদিবাসী বলে দাবি করে এবং নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন বা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখেন আর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এর সংজ্ঞা অনুযায়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠী হলেন সেই সব জাতিগোষ্ঠী যারা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা এবং যাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয়ের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে । বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আদিবাসী শব্দটি সাধারণত উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত জনগোষ্ঠীদের জন্য ব্যবহৃত হয় যাদের অনেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য অঞ্চলে বসবাস করেন , কিন্তু বাংলাদেশে এই শব্দটির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে যেখানে সরকার আদিবাসী পরিচয়ের স্বীকৃতি দিতে চান না, কারণ তাদের মতে বাংলাদেশের আদিবাসী হলেন বাঙালিরা । 

বস্তুত চাকমা শব্দটি বর্মী রাজত্বের শুরুর দিককার সময়ে বর্মী রাজারা এই চাকমা নামকরণের প্রচলন করেন ও বার্মায় প্রচলিত চাকমাদের নাম সংক্ষেপ সাক শব্দটি সংস্কৃত শব্দ শক্তিমানের বিকৃত রুপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে এবং এরই এক পর্যায়ে জনগোষ্ঠীটির নাম সাকমা  এবং পরবর্তীতে বর্তমান চাকমা নামটি গ্রহণযোগ্যতা পায় বলা যেতে পারে। তাছাড়া তখনকার সময়ে বর্মী রাজারা  চাকমাদের রাজার পরামর্শক ও মন্ত্রী এবং পালি ভাষার বৌদ্ধধর্মের পাঠ অনুবাদকের কাজে নিয়োগ প্রদান করতেন ও  রাজা কর্তৃক সরাসরি নিয়োগকৃত হওয়াতে বর্মী রাজ দরবারে চাকমারা বেশ প্রভাবশালী ছিলেন যেটি ইতিহাসে দেখতে পাওয়া যায়। মূলত বর্মী রাজারা বলতে মিয়ানমার বা বার্মার বিভিন্ন রাজবংশের শাসকদের বোঝানো হয়ে থাকে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়  আলাউংপায়া রাজবংশ ও তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাজা হলেন বেইন্নাউং যিনি আধুনিক মায়ানমারে একজন কিংবদন্তী হিসেবে স্মরণীয় ।  এছাড়াও মিনডন মিন এবং মিয়ানমারের শেষ রাজা থিবাউর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজাও ছিলেন । আলাউংপায়া রাজবংশ যা অষ্টাদশ শতকে এই রাজবংশের অধীনে মিয়ানমার একটি শক্তিশালী সম্প্রসারণবাদী যুগে প্রবেশ করেছিলেন এবং বার্মার শেষ রাজা হিসেবে ছিলেন থিবাউ ও তিনি এবং তাঁর রানী সুপায়ালাত ক্ষমতা হারানোর পর থিবাউকে নির্বাসিত করা হয় আর অন্যভাবে বললে রানী সুপায়ালাত  থিবাউয়ের রানী ছিলেন এবং তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ছিলেন ।  তাঁদের পরিচয় তুলে ধরি থিবাও মিন ( ১ জানুয়ারী ১৮৫৯ – ১৬ ডিসেম্বর ১৯১৬) ছিলেন বার্মার (মিয়ানমার) কোনবাউং রাজবংশের শেষ রাজা ও দেশটির ইতিহাসের শেষ বার্মিজ রাজা এবং সুপায়ালয় বা  সুপায়ালাত (  ১৮৬৩ –  ১৯১২) ছিলেন কনবাউং রাজবংশের একজন কনিষ্ঠ রাণী সহধর্মিণী ও ১৮৭৮ সালে তাঁর সৎ ভাই থিবাও মিনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন , যিনি রাজবংশের শেষ রাজা ছিলেন ও তাঁদের  প্রত্যন্ত উপকূলীয় শহর রত্নগিরিতে নির্বাসিত করা হয় যেখানে তারা ৩০ বছরও বেশি সময় ধরে বসবাস করেন আর তাছাড়া থিবাও মিনের অন্য দুজন 

সহধর্মিনী হলেন সুপায়াগি (১৮৫৪ –  ১৯১২) ও সুপায়ালাত বা সুপায়ালয় ( ১৮৫৯ –  ১৯২৫) , অর্থাৎ তাঁর তিন জন পত্নী ও রত্নগিরির সেই ইটের প্রাসাদ এখনো  বিদ্যমান আছে যেখানে  রাজপরিবারকে নির্বাসিত করা হয়েছিল । আলাউংপায়া রাজবংশ 

 ছিল মায়ানমারের (বার্মা) শেষ শাসক রাজবংশ যা ১৭৫২ সাল থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন । রাজা আলাউংপায়া এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সম্রাট যিনি ১৭৫২ সালে মিয়ানমারকে পুনরায় একত্রিত করেন ও কোনবাং রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন ও রাজবংশটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে পরাজিত হওয়ার আগ পর্যন্ত মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছিলেন । অবশ্য কিছু সূত্র আলাউংপায়া রাজবংশকে কোনবাং রাজবংশ নামেও উল্লেখ করেন বিশেষ করে রাজা বোদাওপায়া থেকে শুরু হওয়া সময়ের ক্ষেত্রে। রাজা 

বোদাপ্পায়া (  ১৭৪৫ –  ১৮১৯) ছিলেন বার্মার কোনবাউং রাজবংশের ষষ্ঠ রাজা ও তৃতীয় বর্মিজ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা আলাউংপায়ার চতুর্থ পুত্র আর 

আলাউংপায়া (  ১৭১৪ –  ১৭৬০) ছিলেন বার্মার কোনবাউং রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম সম্রাট । 

মিয়ানমারের ইতিহাসে সম্প্রসারণবাদী প্রভাব ছিল তবে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রসারণবাদী যুগ হিসাবে কোনো একক সময়কাল নির্দিষ্ট করা কঠিন । সুতরাং 

মিয়ানমারের কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রসারণবাদী যুগ নেই যা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় ,  এটির মিয়ানমারের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে সম্প্রসারণবাদী নীতির প্রভাব দেখা গেছে বিশেষ করে প্যাগান সাম্রাজ্যের সময় (৯ম থেকে ১৩শ শতাব্দী) যা আধুনিক মিয়ানমারের একীকরণের ভিত্তি স্থাপন করে ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে আর মিয়ানমারের স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস মূলত গৃহযুদ্ধ ও সামরিক শাসন ও নৃগোষ্ঠীগত সংঘাত দ্বারা চিহ্নিত । মূলত 

প্যাগান সাম্রাজ্য যা ৯ম থেকে ১৩শ শতাব্দী 

এই সময়ে প্যাগান Kingdom একটি শক্তিশালী রাজ্য হিসেবে আবির্ভূত হয় যা মিয়ানমারকে একীভূত করে ও 

এই রাজ্যের আধিপত্য আধুনিক মিয়ানমারের ভিত্তি স্থাপন করে ও আধিপত্যের সূচনা করে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বা ব্রিটিশ শাসনামলেও সম্প্রসারণবাদী নীতি লক্ষ্য করা যায় যখন বার্মা প্রদেশকে একটি পৃথক রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয় এবং 

অন্যান্য সময়কালে স্বাধীনতা লাভের পর মিয়ানমার দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ও সামরিক শাসনের অধীনে ছিল ও

এই সময়েও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীগত সংঘাত দেখা গেছে যা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে । বস্তুত ১৮৮৫ সালে সম্পূর্ণ বার্মা ব্রিটিশ উপনিবেশভুক্ত হয় ও তখন থেকে এটি ব্রিটিশ ভারতের একটি প্রদেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৩৭ সালের মধ্যে ব্রিটিশরা বার্মা প্রদেশটিকে ভারত থেকে আলাদা একটি প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে ঘোষণা করেন , যদিও তখন এটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল না। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি বার্মা স্বাধীনতা আইন ১৯৩৭ এর অধীনে একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ও যুক্তরাজ্যের শাসন থেকে বেরিয়ে আসে। মূলত বার্মা প্রদেশকে ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশরা একটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন যা ভারতের অংশ ছিল না ও এরপর ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি বার্মা যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করেন এই হলো বার্মা প্রদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট । 

রাজা মিনডন মিন বা মিন্ডন মিন (  ১৮০৮ – ১৮৭৮)  ১৮৫৩ সাল থেকে ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত বার্মার (মিয়ানমার) রাজা ছিলেন ও পঞ্চম বৌদ্ধ পরিষদে তাঁর ভূমিকার কারণে তিনি বার্মার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধেয় রাজাদের একজন ছিলেন । তাঁর সৎ ভাই রাজা প্যাগানের অধীনে ১৮৫২ সালে দ্বিতীয় অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কর্তৃক নিম্ন বার্মা দখলের মাধ্যমে শেষ হয় । মিন্ডন এবং তাঁর ছোট ভাই কানৌং তাঁদের সৎ ভাই রাজা প্যাগানকে উৎখাত করেন। মিন্ডন মিন 

তাঁর রাজত্বের বেশিরভাগ সময় ব্রিটিশ দখলদারিত্ব থেকে তাঁর দেশের উপরের অংশকে রক্ষা করার ও তাঁর রাজ্যকে আধুনিকীকরণের চেষ্টা করে কাটিয়েছেন। 

প্যাগান মিন ( ১৮১১ – ১৪ মার্চ ১৮৮০) ছিলেন বার্মার কোনবাউং রাজবংশের নবম রাজা ও  দ্বিতীয় অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বা  বা দ্বিতীয় বার্মা যুদ্ধের সময়কাল হলো ৫ এপ্রিল ১৮৫২ – ২০ জানুয়ারী ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত যেখানে যুদ্ধের ফলে বৃটিশ বিজয় লাভ করে বার্মিজ এবং ভূখন্ড আরো অধিকর্তার সাথে যুক্ত হয় আর এই যুদ্ধটিকে দ্বিতীয় ইঙ্গ-বর্মী যুদ্ধও বলা হয় যা অ্যাংলো-বর্মী যুদ্ধের অংশ । অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধ ছিল দুটি সম্প্রসারণশীল সাম্রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং কনবাউং রাজবংশের মধ্যে একটি সশস্ত্র সংঘাত যা ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘতম যুদ্ধে পরিণত হয় ।  প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের সময়কাল হলো ১৮২৪ থেকে ১৮২৬ সাল পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের সময়কাল হলো ১৮৫২ থেকে ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত এবং 

তৃতীয় অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধ ১৮৮৫ সালে অনুষ্ঠিত হয়।  অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধ হলো দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ইউরোপীয় উপনিবেশের অংশ আর দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের ( European colonisation of Southeast Asia  ) প্রথম পর্যায়টি ষোড়শ ও  সপ্তদশ শতাব্দী জুড়ে ঘটেছিল যেখানে নতুন ইউরোপীয় শক্তিগুলো মশলা ব্যবসায়ের উপর একচেটিয়া অধিকার অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতা করেছিলেন ।  এটির কারণ হলো মরিচ , দারুচিনি , জায়ফল এবং লবঙ্গের মতো বিভিন্ন মশলার চাহিদার কারণে এই বাণিজ্য ইউরোপীয়দের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান ছিল ও  এই চাহিদার ফলে পর্তুগিজ , স্প্যানিশ , ডাচ , ফরাসি এবং ব্রিটিশ সামুদ্রিক মশলা ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটে বাস্তবিক অর্থে।  নিম্ন বার্মা বা নিম্ন মায়ানমার অথবা লোয়ার মায়ানমার  মিয়ানমারের একটি ভৌগলিক অঞ্চল । ছোট ভাই কানৌং বা কানউং মিন্থা অথবা কানৌং মিন্থা (  ১৮২০ – ১৮৬৬) ছিলেন বার্মার যুবরাজ ও বার্মার রাজা মিন্ডনের ছোট ভাই আর তিনি ১৮৪৬ সালে তাঁর ভাই মিন্ডনের সাথে রাজা প্যাগান মিনকে উৎখাত করেন এবং ১৮৬৬ সালে তাঁর হত্যার আগ পর্যন্ত উত্তরাধিকারী ও আধুনিকীকরণ প্রভাবশালী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । মূলত পঞ্চম বৌদ্ধ পরিষদ  রাজা মিন্ডনের পৃষ্ঠপোষকতায় মান্দালয়ে অনুষ্ঠিত হয় ও এই সভার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের পালি ক্যানন অনুসারে গৌতম বুদ্ধের সমস্ত শিক্ষা পাঠ করা ও সেগুলোর কোনওটি পরিবর্তিত বা বিকৃত বা বাদ দেওয়া হয়েছে কিনা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা ।  মান্দালয়  হলো ইয়াঙ্গুনের পরে মায়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ,  সর্বোপরি বলা যায় আবারো মিন্ডন মিন  জন্মগ্রহণ করেন  ৮ জুলাই ১৮০৮ সালে ইনওয়া কোনবাং কিংডম আর মারা যান ১ অক্টোবর ১৮৭৮ (বয়স ৭০) মান্দালয় কনবাউং রাজ্য । ইনওয়া  মায়ানমারের মান্দালয় অঞ্চলে অবস্থিত  ১৪শ থেকে ১৯শ শতাব্দী পর্যন্ত ধারাবাহিক বার্মিজ রাজ্যের একটি প্রাচীন সাম্রাজ্যিক রাজধানী আর কনবাউং রাজবংশ  ছিলেন শেষ রাজবংশ যেটি ১৭৫২ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত বার্মা শাসন করেছিলেন এবং এটি বার্মা ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম । তাছাড়া বার্মার প্রাথমিক ও কিংবদন্তি রাজাদের তালিকায় যা বার্মার (মায়ানমার) আদি ও কিংবদন্তিরাজদের একটি তালিকা আছে যেখানে বিভিন্ন রাজকীয় ইতিহাস ,  উচ্চ বার্মা ,  নিম্ন বামা এবং আরাকানের প্রাথমিক রাজ্যের রাজাদের অন্তর্ভুক্ত করে থাকে। এরপর প্যাগান রাজ্য যা ৮৪৯ থেকে ১২৯৭ সাল পর্যন্ত।‌ তারপর ছোট রাজ্য যেখানে মাইনসাইং (১২৯৭–১৩১৩) ,  পিনিয়া (১৩১৩–১৩৬৪) , সাগাইং (১৩১৫–১৩৬৪) ,  আভা (১৩৬৪–১৫৫৫ ) ,  

হানথাওয়াদ্দি (১২৮৭-১৫৩৯ ও ১৫৫০-১৫৫২) , ম্রাউক-উ(১৪২৯–১৭৮৫) ও প্রোম(১৪৮২–১৫৪২) সহ বিভিন্ন রাজ্য এবং পর্যায় অন্তর্ভুক্ত । অতঃপর 

টুঙ্গু সাম্রাজ্য ১৫১০ থেকে ১৭৫২ সাল পর্যন্ত । তারপর 

কনবাউং সাম্রাজ্য ১৭৫২ সাল থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত। 

সবশেষে ১৮৮৫ সাল থেকে বার্মিজ সিংহাসনের ভানকারীরা ও একজন ভানকারী হলেন এমন একজন যিনি নিজেকে একটি দেশের সঠিক শাসক বলে দাবি করেন যদিও বর্তমান সরকার দ্বারা স্বীকৃত নয় ও শব্দটি প্রায়শই হয় ক্ষমতাচ্যুত রাজতন্ত্রের বংশধরকে বোঝাতে বা বৈধ নয় এমন দাবির জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে । আর ১৮৮৫ সাল থেকে বার্মিজ সিংহাসনের ( Pretenders to the Burmese throne since 1885 ) ভানকারীরা হলেন কনবাউং রাজবংশের যেখানে ১/ রাজা থিবাও (১৮৮৫–১৯১৬) ২/ রাজকুমারী মায়াত ফায়া লাত ( ১৯১৬ – ১৯৫৬ ) ৩/ প্রিন্স তাও ফায়া ( ১৯৫৬ – ২০১৯ ) ৪/ রিচার্ড তাও ফায়া মায়াট জি ( ২০১৯ – বর্তমান) । পাশাপাশি এটিও বলা প্রয়োজন চাকমাদের ইতিহাস জানতে বার্মার ( মিয়ানমার ) ইতিহাস জানাও আবশ্যক যেখান থেকে 

হয়তোবা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া সম্ভব , এটির কারণ হলো তাদের একটি বড় অংশ অতীতে আরাকান যা বর্তমানে মায়ানমারের অংশ অঞ্চলে বসবাস করতেন ও

তাদের ইতিহাসের সাথে মিয়ানমারের ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে যা বিশেষ করে একসময় আরাকানে বসতি স্থাপন করে শাসন করেছিলেন ও তাদের ইতিহাস মগধ থেকে আরকানে স্থানান্তরের সাথে জড়িত বলা হয়ে থাকে ।   আরকান বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য নামে সুপরিচিত ও ১৯৮৯ সালে বার্মিজ সামরিক জান্তা এই অঞ্চলের নাম পরিবর্তন করে রাখাইন রাজ্যের নামকরণ করেন এবং 

 বার্মা থেকে মায়ানমার নাম পরিবর্তনের অংশ হিসেবে এর রাজনৈতিক প্রশাসনিক নাম আরকান থেকে রাখাইন করা হয় আর বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য রাখাইন জনগণের বাসস্থান এবং এটি দেশটির একটি উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক অঞ্চল আর তাছাড়া একই বছরে বার্মা মায়ানমার নামে এবং রেঙ্গুন ইয়াঙ্গুন নামে পরিচিত হয় ।‌ তাছাড়া বর্তমানে মিয়ানমারে সামরিক শাসন ব্যবস্থার ১৯৬২ সালে চালু হয় এবং এটি ২০১১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল । এরপর ২০২১ সালে পুনরায় শুরু হয়। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থানের  মাধ্যমে দেশটিতে ক্ষমতার দখল করেন ও একটি সামরিক নিয়ন্ত্রিত একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।  মূলত ২০২১ সালে ১ ফেব্রুয়ারি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার মাধ্যমে মিয়ানমারে আবারও সামরিক  শাসন শুরু হয়।

মূলত বার্মার ( মিয়ানমার ) সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার আগে দেশটি একটি গণতান্ত্রিক জাতি হিসেবে ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতার লাভ করে যার ভিত্তি ছিল বার্মা ইনডিপেন্ডেন্ট আর্মি। ১৯৫৮ সালে প্রথম একটি অস্থায়ী সামরিক শাসন চালু হয়েছিল ,  কিন্তু ১৯৬২ সালে নে উইন কর্তৃক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরাসরি সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় যার ফলে একটি সামরিক একনায়কতন্ত্র তৈরি হয় , অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের পর থেকে ১৯৬২ সালে সামরিক শাসন পর্যন্ত। বস্তুত বার্মা ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি ( BIA ) দেশটিতে নিজস্ব সেনাবাহিনী যা স্বাধীনতার আগে থেকেই এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল আর স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলমান ছিল। তাছাড়া ১৯৬২ সালে পর থেকে দেশটি একটি সামরিক একনায়কতন্ত্রের অধীনে আসে যা বার্মা সোশালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে । বার্মার ( মিয়ানমারে )

দীর্ঘস্থায় গৃহযুদ্ধের মূল কারণগুলো হলো জাতিগত সংঘাত , সামরিক শাসনের অধীনে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর শাসন , ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণের জন্য মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনী ( তাতমাডোর) সাথে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী গুলো লড়াই আর এই সংঘাত ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে শুরু হয়েছে যা এখনো পর্যন্ত চলমান । মায়ানমারে প্রায় ১৩৫ টি জাতি গোষ্ঠী বসবাস করে থাকেন যাদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতি ও  ভাষা  ও ধর্মীয় পার্থক্য বিদ্যমান । এই জাতিগত বৈচিত্রের কারণে প্রায়শই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যায় ।

সরকার কর্তৃক জাতিগত নীতি যা বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীকে প্রান্তিক করে তোলে এবং যার ফলে এই দ্বন্ধকে আরো বাড়িয়ে তোলে । ১৯৬২ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বার্মার সামরিক শাসন বলবৎ ছিল আর এই সময়ে সামরিক সরকার জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোর উপর দমন পীড়ন চালান ও তাদের অধিকার হরণ করেন যা সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্ম দেয় । 

পাশাপাশি স্বাধীনতার পরবর্তী সংকট যেখানে ১৯৪৮ সালের ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীগুলো স্বাধীনভাবে নিজস্ব অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনী ( তাতমাডোর) হাতে তাদের সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । আর এই ছাড়া মায়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও সংঘাতের একটি অন্যতম কারণ । সর্বোপরি বলা যায় 

এই সম্মিলিত কারণ গুলোর ফলে মায়ানমার একটি বহু জাতিগত সংঘাতপূর্ণ  দেশে পরিণত হয়েছে যা এখনো চলমান । তাছাড়া বার্মার তাতমাডোর ( মিয়ানমার সেনাবাহিনী ) হলো মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর একটি অংশ যা মূলত ভূমি ভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করে থাকেন এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম সক্রিয় সামরিক শক্তি । বার্মা ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রতিরোধ গোষ্ঠী যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য গঠিত হয়েছিল । বার্মা ইনডিপেন্ডেন্ট আর্মি ( BIA ) এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে যেটি ১৯৪১ সালে গঠিত হয়েছিল। বর্তমানে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নাম হলো তাতমাডো ও এটি মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দ্বারা পরিচালিত হয় এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনী ,  নৌবাহিনী ও  বিমান বাহিনী নিয়ে গঠিত । তাতমাডো বা তাতমাদাও যা সিসট্যাট নামেও পরিচিত আর এই নামটি বার্মিজ ভাষায় সশস্ত্র বাহিনীকে বোঝায় যেখানে এটি দেশটির সেনাবাহিনী ব্যাপক কর্তৃত্বের প্রতীক । তাতমাদাও দেশটির একটি অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালী সংস্থা বলা যেতে পারে। আবারো আলোচনায় আসি  বেইন্নাউং ও তোনগু রাজবংশ এবং বেইন্নাউং অথবা বেইন্নাউং কিয়াওতিন নওরাহতা  ( ১৫১৬ – ১৫৮১) ৩০ এপ্রিল ১৫৫০ থেকে ১৫৮১ সালে মৃত্যু পর্যন্ত  টুঙ্গু রাজবংশের শাসনামলে বার্মার রাজা ছিলেন ও তাঁর রাজত্বকালকে বার্মার ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় এক হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে যাঁকে বার্মায় দেখা মানব শক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ বিস্ফোরণ হিসেবে বিখ্যাতভাবে বর্ণনা করা হয় ও তাঁর শাসনামলে তিনি দক্ষিণপূর্ব এশীয় ইতিহাসের বৃহত্তম সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন  ও টুঙ্গু রাজবংশ যা নিয়াউংইয়ান রাজবংশ নামেও পরিচিত  ছিল যেটি ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ১৭৫২ সাল পর্যন্ত বার্মার (মায়ানমার) শাসক রাজবংশ যেটির সময়কাল হলো ১৫১০–১৭৫২ সাল পর্যন্ত। বেইন্নাউং একটি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন যা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বার্মার শক্তি ও প্রভাবকে সুসংহত করে ও 

তিনি টুংগু রাজবংশের অধীনে বার্মাকে একীভূত করেন এবং তাঁর রাজ্যকে মিয়ানমারের অন্যতম শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত করেন ও তিনি বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) , শান স্টেটস এবং সিয়াম (বর্তমানে থাইল্যান্ড) সহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম সাম্রাজ্যকে একত্রিত করেছিলেন ও শান স্টেট হলো মিয়ানমারের পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত একটি রাজ্য যা মিয়ানমারের মোট এলাকার প্রায় একচতুর্থাংশ এবং 

সিয়াম দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার একটি ঐতিহাসিক নাম যা বর্তমানে থাইল্যান্ড  নামে পরিচিত ও থাইল্যান্ড শহরটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সিয়াম নামে পরিচিত ছিল ,  কিন্তু পরে ১৯৩৯ সালে এটি থাইল্যান্ডে ( মুক্ত দেশ) পরিবর্তিত হয় । তাছাড়া আরেকটি বিষয় হলো টুঙ্গু (Toungoo) রাজ্যের নামের বানানে বিভিন্নতা দেখা যায় কারণ এটি মূলত একটি বিদেশি নাম যা বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্নভাবে উচ্চারিত ও লিখিত হয়েছে এবং এই রাজ্যের মূল নাম Toungoo যা ইংরেজি ভাষাতে ব্যবহৃত হতো , কিন্তু পরে বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের কাছে এবং তাদের লিখিত সূত্রে এই নামটির ভিন্ন ভিন্ন রূপ তৈরি হয় উদাহরণস্বরূপ টুং বা টুঙ্গু এর মতো বাংলা বানানে এটি পরিচিতি লাভ করে আর Toungoo নামটি মূলত একটি বার্মিজ বা বর্মী নাম যা বিভিন্ন ইউরোপীয় ও এশীয় ভাষায় ভিন্নভাবে উচ্চারিত ও লিখিত হতো ও ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে Toungoo সাম্রাজ্য বিস্তারের সময় বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে এর নাম ভিন্ন ভিন্ন রূপে উচ্চারিত হয় ও সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন অভিধান ও ঐতিহাসিক লেখায় Toungoo কে বিভিন্নভাবে লেখার প্রচলন শুরু হয় যা এই বানানের ভিন্নতার কারণ হয় আর এই কারণেই টুঙ্গু নামের বিভিন্নতা দেখা যায় যা মূলত Toungoo নামেরই ভিন্ন ভিন্ন রূপ এবং  তাছাড়া বিভিন্ন নামের বানানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য ।  বস্তুত বার্মা যার বর্তমান নাম মিয়ানমার এটি একসময় একটি রাজতন্ত্র ছিল আর ঐতিহাসিকভাবে বর্মী রাজারা চাকমাদের নিয়োগ দিতেন এবং রাজদরবারে তাদের প্রভাব ছিল  । তাছাড়া চাকমাদের বিজক অনুসারে চাকমারা বুদ্ধের শাক্য বংশের অংশ ছিলেন ও তারা ধীরে ধীরে আরাকানে চলে আসেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের নিকটবর্তী পাহাড় পর্যন্ত তাদের অঞ্চল বিস্তৃত করেন ।  বিজক শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো বীজ  বা ছোট্ট চারা ও  চাকমা ভাষায় বিজক (বিজগ্রি) শব্দের অর্থ হলো কুলপঞ্জী বা ইতিহাস ও রাজা বিজয়গিরি (বিজগ্রি) এই রাজার সময় থেকেই চাকমাদের ইতিহাসের মূলধারা সৃষ্টি হয় বলে মনে করা হয়ে থাকে এবং বিজক চাকমাদের ইতিহাস ও কুলপঞ্জী বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে ।  রাজা বিজয় গিরি চাকমা সার্কেলের ১৫ তম চাকমা রাজা ছিলেন ও বর্তমানে চাকমা সার্কেলের ৫১তম রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়  ।  তাছাড়া শাক্য  দক্ষিণ এশিয়ার উত্তরপূর্ব অঞ্চলের একটি প্রাচীন ইন্দো আর্য বংশ ছিলেন যাদের অস্তিত্ব লৌহ যুগে প্রমাণিত হয় ও লৌহ যুগের সময়কাল হলো  আনুমানিক  ১২০০  – আনুমানিক  ৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ  এবং  শাক্য প্রজাতন্ত্রের সময়কাল হলো আনুমানিক  ৭ম শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বাব্দ – আনুমানিক ৫ম শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ।‌  শাক্যরা ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে বৃহত্তর মগধ সাংস্কৃতিক অঞ্চলে পূর্ব ইন্দো গাঙ্গেয় সমভূমির প্রান্তে ছিলেন ও  মগধ প্রাচীন দীর্ঘ একটি এলাকা এবং রাজ্য ছিল যা গাঙ্গেয় সমভূমিতে  ও Indo Gangetic Plain ( ইন্দো গাঙ্গেয় সমভূমি ) যেটিকে বলা হয়ে থাকে সিন্ধু গাঙ্গেয় সমভূমি যা  উত্তর ও পূর্ব ভারত এবং পূর্ব পাকিস্তান এবং দক্ষিণে নেপাল ও প্রায় সমগ্র বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে এবং এই অঞ্চলের দুটি প্রধান নদী ব্যবস্থা হলো সিন্ধু এবং গঙ্গা যার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ।  শাক্যদের রাজধানী ছিল কপিলাবস্তু যা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্ব গাঙ্গেয় সমভূমিতে অবস্থিত একটি প্রাচীন শহর যা লৌহ যুগের শেষের দিকে  এবং   গৌতম বুদ্ধ শাক্য বংশের ছিলেন ও তিনি শাক্য প্রজাতন্ত্রের ক্ষত্রিয় রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যাঁরা কপিলবস্তু শাসন করতেন যা ভারত ও নেপাল সীমান্তের কাছে অবস্থিত ছিল এবং শাক্য বংশে জন্মগ্রহণ করার কারণে তাঁকে শাক্যসিংহ বলা হয়ে থাকে এবং শাক্যরা ছিলেন একটি প্রাচীন ইন্দোআর্য গোষ্ঠী যারা একটি গণসংঘ বা অভিজাত অলিগ্যার্কিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে পরিচিত ছিলেন ।  Oligarchic শব্দের অর্থ হলো গোষ্ঠীশাসন সংক্রান্ত বা অল্প সংখ্যক লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা বোঝানো হয়ে থাকে ও এটি এমন এক সরকার বা শাসনব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে থাকে যারা তাদের সম্পদ ও বংশমর্যাদা বা অন্য কোনোভাবে ক্ষমতা অর্জন করেন ও আরাকানি জনগণ চাকমাদেরকে সাক বা থেক বা থাইখ নামেও অভিহিত করতেন ।  চাকমারা হলেন নিজস্ব সংস্কৃতি , লোককাহিনী  , সাহিত্য এবং ঐতিহ্যের অধিকারী মানুষ এবং  চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী অস্থায়ী ঘরগুলোকে মাওনোগাওর বলা হয়ে থাকে যা বাঁশ এবং খড় দিয়ে তৈরি করা হয়ে থাকে যা  কাঠের উপর স্থাপিত হয় । তাছাড়া ঐতিহ্যবাহী পোশাক প্রায় প্রতিটি সংস্কৃতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আর চাকমা মহিলারা পিনন হাদি পরেন যা বিভিন্ন নকশার সাথে রঙিন হাতে বোনা হয়ে থাকে এবং চাকমাদের অধিকাংশই থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের অনুসারী  যে ধর্ম তারা শতাব্দী ধরে পালন করে আসছেন ও  চাকমাদের একটি সংখ্যালঘু অংশ খ্রিস্টধর্ম পালন করে থাকেন ।   চাকমা সমাজে যে সব পূজা অনুষ্ঠান প্রচিলত আছে তার মধ্যে অনেকগুলোই মানসিক পূজা উদাহরণ হিসেবে বলা যায় অহ্হিয়া , আহ্জার বাত্তি , চামনী‌ , চুমুলাং , ধর্মকাম , সিন্দি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য আর  মানসিক  এর অর্থ হলো মানসিক বা কল্পিত  যা মন থেকে আসে ও পূজা  এর অর্থ হলো উপাসনা বা শ্রদ্ধা বা সম্মান প্রদর্শন যেটিকে বলা হয়ে থাকে  Mental Worship ও বিপদে পড়লে প্রায় সবধর্মের লোকই বিপদ উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য হরহামেশা কিছু না কিছু মানত করে থাকেন এবং বিপদ কেটে গেলে তারপর একসময় মানত শোধ করা হয়ে থাকে এবং অনেকে পান তামাকও মানত করেন আর বিপদ কেটে না যাওয়া পর্যন্ত এইসব জিনিস স্পর্শ করেননা আর এটা এক ধরনের ব্রতপালন বলা যেতে পারে এবং বৌদ্ধধর্মে এটাকে শীলব্রত পরামর্শও বলা হয়ে থাকে । ব্রতপালন মানে কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে উপবাস বা সংযম পালন করা যেখানে আহার ও আচরণের উপর বিশেষ নিয়ম মেনে চলা হয়‌  এবং  যার মাধ্যমে উপাসক তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক মঙ্গলের জন্য দেবদেবীর কাছে প্রার্থনা করেন এবং সেই উদ্দেশ্যে কিছু খাদ্য ও আচরণিক নিয়ম পালন করেন  এবং শীলব্রত  বৌদ্ধধর্ম অনুযায়ী এমন কিছু বিধিবদ্ধ নীতি বা নিয়ম যা সৎ স্বভাব ও চরিত্র গঠনের জন্য প্রবর্তন করা হয়েছে এবং শীল শব্দের অর্থ হলো স্বভাব বা চরিত্র এবং ব্রত বলতে প্রতিজ্ঞা বা নিয়ম বোঝায় যা একত্রে সৎ জীবনযাপনের জন্য গৃহীত নীতিমালাকে নির্দেশ করে থাকে । আবার চাকমাদের মালক্ষী মা পূজা ও থানমানা পূজা এই দুটি  অনুষ্ঠানে ত্রিপুরা সস্প্রদায়ের সাথে কিছুটা মিল থাকলেও পূজা পদ্ধতিতে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান আছে ।  মা লক্ষ্মী হলেন হিন্দুধর্মে সম্পদ , সৌভাগ্য , সৌন্দর্য , উর্বরতা ও সমৃদ্ধির দেবী আর থান মানে স্থান বা জায়গা এবং মানা মানে সম্মান এবং তাই এর আক্ষরিক অর্থ হলো স্থানকে সম্মান জানানো যা নদী বা জলাশয়ের তীরে এই পূজা করা হয়ে থাকে । বস্তুত থানমানা পূজা হলো ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী চাকমা সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী পূজা আর এই পূজা 

 গঙ্গা পূজা বা গাং পূজা নামেও পরিচিত ও এই পূজার সাথে থানমানা নৃত্য নামে একটি বিশেষ নৃত্য পরিবেশিত হয়ে থাকে ,  যদিও চাকমারা প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, তবুও তারা বুদ্ধের পাশাপাশি অন্যান্য দেবদেবীরও পূজা করে থাকেন এবং এই পূজা তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী একটি অংশ , কিন্তু  পূজা পদ্ধতিতে অনেক পার্থক্য আছে ।  তাছাড়া চাকমা সমাজের  পূজা পার্বণের কথা বললে বলতে হয় গঙাত ভাতজরা দেনা যেখানে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের জ্বরজারি হলে চাকমা জননী সন্তানের রোগমুক্তির জন্য গঙা অর্থাৎ নদী বা ছড়ার জলে একমুঠি ভাত ছিটিয়ে দিয়ে আসেন ।  চামনী যেখানে মরণাপন্ন ছেলের আরোগ্য লাভ কামনায় অনেক সময় চাকমা জনক জননী ছেলের জন্য চামনী মানত করে থাকেন আর  ছেলে ভালো হয়ে গেলে একদিন ঘটা করে তাকে বিহারে নিয়ে শ্রামণ্য ধর্মে দীক্ষিত করা হয়ে থাকে ।  চামনীর মাধ্যমে বোঝানো হয়ে থাকে শ্রামণ্যব্রত ও শ্রামণ্য ব্রত হলো বৌদ্ধধর্মে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধর্মীয় জীবনে ব্রত পালন করা  যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি শীল (নৈতিকতা) পালন করেন ও ব্রহ্মচর্য আচরণ করেন ও এটি মূলত বৌদ্ধ ধর্মের নৈতিক শিক্ষা লাভের একটি পদ্ধতি যেখানে একজন ব্যক্তি সাময়িকভাবে নিজের প্র্যত্যাহিক জীবন ত্যাগ করে বিহারে (মঠ) অবস্থান করেন ও ধর্মীয় অনুশীলন করেন এবং এটি একটি তপস্যা বা সাধনা যা জীবনে অন্তত একবার হলেও  পালন করা হয়ে থাকে যেমনটি চাকমা সমাজে প্রচলিত।

চুমুলাং যেটি হলো যখনই কোন চাকমা বিপদে পরেন তখন বিপদে রক্ষা পাওয়ার জন্য চুমুলাং মানত করে থাকেন আর দূর্যোগ কেটে গেলে তখন সে ঘটা করে চুমুলাং পূজা করেন ও চুমুলাং আসলে বিয়ের পূজা এবং চুমুলাং পূজা  চাকমা  জাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ  পূজা যা বিশেষত বিবাহ অনুষ্ঠান ও অন্যান্য সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে ।  অহ্ইয়া যেখানে অপুত্রক ব্যাক্তি কামনা বা অনেকগুলো পুত্র সন্তানের পর একটি মেয়ে পাওয়ার বাসনায় বা আর্থিক সমৃদ্ধি কিংবা কোন বিপদ থেকে মুক্তির জন্য লোকে এই পূজা মানত করেন আর যদি মানস পূর্ণ হয় সে ঘটা করে এই পূজার অনুষ্টান করে থাকেন ।   সিন্দি এবং চাকমা ভাষায় সিন্দি আর বাংলায় শিরনি  তখনকার দিনে চাকমাদের প্রায় ঘরে ঘরে হিন্দুদের দেখাদেখি সত্য নারায়ণের নামে শিরনি দেওয়া হতো এবং  শিরনি মূলত স্রষ্টার প্রতি নিবেদন করা হয়ে থাকে এবং এর মাধ্যমে  পুণ্য লাভ এবং বিপদ আপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে ও শিরনি বিতরণের মাধ্যমে মানুষ তাদের ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ঈশ্বরের কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন যা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে করা হয়ে থাকে আর  সত্যনারায়ণ হলেন হিন্দু দেবতা বিষ্ণু নারায়ণের একটি বিশেষ রূপ যিনি সত্যের মূর্ত প্রতীক ও তিনি কলিযুগে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে বিবেচিত হন এবং তাঁকে সম্মান জানিয়ে সত্যনারায়ণ পূজা বা সত্যনারায়ণ ব্রত করা হয়ে থাকে এবং এই পূজা জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসে বলে বিশ্বাস করা হয় এবং পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে তিনি সত্যপীর নামেও পরিচিত আর সত্যনারায়ণ পূজা মূলত ভগবান বিষ্ণুকে উৎসর্গীকৃত একটি ধর্মীয় আচার ও এই পূজাকে সত্যনারায়ণের ব্রতকথা হিসেবেও উল্লেখ করা হয় ।  এটি এমন একটি পূজা যা সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে ভগবান বিষ্ণুকে সম্মান জানানো হয়  এবং এর মাধ্যমে ভক্তরা ঐশ্বরিক আশীর্বাদ ও শান্তি কামনা করেন । তাছাড়া  শিরনি একটি ফারসি শব্দ যা মূলত মিষ্টি বা খাদ্যবস্তুকে বোঝায় যা বিতরণের উদ্দেশ্য হলো এটি বরকত বা আশীর্বাদ লাভের আশায় বিভিন্ন মুসলিম সমাজে প্রচলিত একটি রেওয়াজ যেখানে অনেকে মসজিদ বা মাদ্রাসা বা দরগাহ-মাযারগুলোতে এটি বিতরণ করে থাকেন ।  শিরনির খাবারের উপাদানগুলোর মধ্যে থাকে শিরনি চাল , আটা , দুধ , চিনি এবং কলার মতো বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়ে থাকে। ইসলামের দৃষ্টিতে শিরনি বিতরণের বিধান হলো যদি শিরনি বিতরণের মূল উদ্দেশ্য হয় যে এই খাবারটি অলৌকিক ক্ষমতা রাখে বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন ,  তাহলে এটি শিরকের পর্যায়ে পড়ে ,  কিন্তু আল্লাহর একত্ব যেখানে ইসলামে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সাহায্য বা বরকত চাওয়াকে শিরক (আল্লাহর সাথে অংশীদার করা) বলে গণ্য করা হয় যা ক্ষমার অযোগ্য একটি পাপ , সুতরাং ইসলামে শিরনি নিজে কোনো নিষিদ্ধ কাজ নয় মোটেও,  তবে এর পেছনের বিশ্বাস যদি শিরক বা আল্লাহর একত্ববাদের পরিপন্থী হয় ,  তবে তা ইসলামে বৈধ নয়।  ইসলামে শিরনি বলতে সাধারণত আল্লাহ বা পীর-আওলিয়ার উদ্দেশে নিবেদিত মিষ্টান্ন বা চাল ,  আটা ,  দুধ , কলা ,  চিনি ইত্যাদি দিয়ে তৈরি খাবার বোঝানো হয়ে থাকে যা বরকত ও পুণ্য লাভের আশায় বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিতরণ করা হয় ।   তবে শিরনি বিতরণের সঙ্গে যদি এই বিশ্বাস থাকে যে এর মাধ্যমে বিশেষ কোনো বরকত বা ক্ষমতা লাভ হবে, তবে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি শিরক (আল্লাহর সাথে অংশীদারিত্ব) হিসাবে গণ্য হতে পারে  যা ইসলামে অত্যন্ত বড় একটি পাপ। মূলত ইসলামে আল্লাহর একত্ববাদ তাওহীদ নামে পরিচিত যার অর্থ  আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় হিসেবে বিশ্বাস করা। এই বিশ্বাসে আল্লাহর নাম ,  গুণাবলী , সৃষ্টি ,  পরিচালনা ও উপাসনা সবকিছুর ক্ষেত্রে তাঁকে একক ও সার্বভৌম হিসেবে স্বীকার করা হয় এবং অন্য কোনো কিছুর বা কারো সাথে শরীক করা হয় না। তাওহীদ হলো ইসলামের মৌলিক আকিদা ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু যা সকল নবী-রাসূলের দাওয়াতের মূল বার্তা ছিল। মূলত তাওহীদের মূল দিকসমূহ হলো একত্ব ও অদ্বিতীয়তা যেখানে আল্লাহ তাঁর সত্তায় এবং কাজে ও গুণাবলিতে এক ও অদ্বিতীয় ও তাঁর কোনো অংশীদার নেই এবং প্রভুত্ব যেখানে আল্লাহ একাই বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা এবং নিয়ন্ত্রণকারী ও  উপাসনায় যেখানে সকল ইবাদত আর উপাসনা একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে এবং নাম ও গুণাবলী যেখানে আল্লাহ যে নাম ও গুণাবলী নিজের জন্য বর্ণনা করেছেন সেগুলোকে বিনা উপমায় বা কোনো তুলনা ছাড়াই বিশ্বাস করতে হবে। তাওহীদের গুরুত্ব হলো ইসলামের ভিত্তি যেখানে তাওহীদ হলো ইসলামের প্রাণসত্তা এবং এর মূল ভিত্তি ও সকল নবীর দাওয়াত যেখানে আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত সকল নবী-রাসূলের দাওয়াতের মূল কথাই ছিল তাওহীদ এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক সফলতা যেখানে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা অর্জনের জন্য তাওহীদের বিশ্বাস স্থাপন অপরিহার্য এবং শির্কের বিপরীত যেখানে তাওহীদ হলো শিরক বা অংশীদার স্থাপন করার বিপরীত যা ইসলামে সর্বোচ্চ পাপ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে ।  সর্বোপরি বলা যায়  আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহীদ হলো এমন এক বিশ্বাস যা আল্লাহকে তাঁর প্রভুত্ব, নাম ও গুণাবলী এবং উপাসনার ক্ষেত্রে একক ও অদ্বিতীয় হিসেবে স্বীকার করে এবং এই বিশ্বাসই একজন মুমিনের জীবনের চালিকাশক্তি , সুতরাং শিরনি বা শিন্নি বিতরণ ইসলামে ততক্ষণ পর্যন্ত জায়েজ  যতক্ষণ এর সাথে শিরক বা আল্লাহর সাথে অংশীদার করার মতো কুফর বা ভ্রান্ত বিশ্বাস না থাকে , আর ইসলামে শিরনি বা শিন্নির সঠিক বিশ্বাস হলো যদি এটি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বিতরণ করা হয় যেখানে খাবারটি কেবল একটি মাধ্যম আর তাহলে তা জায়েজ হতে পারে । আবারো আলোচনায় আসি তাছাড়া  ফানাচ্ বাত্তি যেখানে ফানুস বাতি উড়ানো কোনো নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একক ঐতিহ্য নয় , বরং এটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি সাধারণ প্রথা যা শুভ প্রবারণা পূর্ণিমায় তথা আশ্বিনী পূর্ণিমায় পালিত হয়ে থাকে এবং চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষ এই পূর্ণিমা তিথিতে গৌতম বুদ্ধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও ধর্মীয় রীতির অংশ হিসেবে ফানুস উড়িয়ে থাকেন এবং প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী গৌতম বুদ্ধ আশ্বিনী পূর্ণিমায় তাঁর মাথার একমুঠো চুল কেটে আকাশে উড়িয়ে দিয়েছিলেন ও এই ঘটনাকে স্মরণ করে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ফানুস উড়িয়ে বুদ্ধকে শ্রদ্ধা জানান এবং এটি কেবল চাকমাদের মধ্যেই নয় ,  বরং অন্যান্য বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের  মধ্যেও প্রচলিত একটি ঐতিহ্য বলা হয়ে থাকে ও ফানুস বাতি হলো এক প্রকার কাগজের উষ্ণ বায়ু বেলুন যা বৌদ্ধধর্মীয় উৎসবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে এবং এই লণ্ঠনগুলোর নিচে একটি ছোট অগ্নিশিখা থাকে যা গরম বাতাস তৈরি করে বেলুনটিকে আকাশে উড়তে সাহায্য করে এবং এটি মূলত পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ধর্মীয় আচারে ব্যবহৃত একটি ঐতিহ্যবাহী আকাশ প্রদীপ ও বুদ্ধের জন্মদিন বা অন্যান্য বৌদ্ধ উৎসবে ফানুস উড়িয়ে উৎসব পালন করা হয় এবং স্থানীয় দেবদেবীদের  সম্মান জানানোর জন্যও এটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে ।  মূলত ভগবান 

গৌতম বুদ্ধ সংসার ত্যাগ করার পর অনুমা নদীর তীরে এসে রাজকীয় চুলের গোছা তরবারি দিয়ে কেটে আকাশে উড়িয়ে দেন ও  তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন যে যদি তিনি বুদ্ধ হওয়ার মতো গুণ অর্জন করতে পারেন তাহলে এই চুল নিচে না পড়ে আকাশে স্থির হয়ে থাকবে এবং তাঁর সংকল্প পূর্ণ হওয়ায় চুলগুলো মাটিতে পড়েনি ,  বরং দেবতারা সেগুলোকে সংগ্রহ করে তাবেতিংস স্বর্গে একটি চুলামনি নামক স্তূপ তৈরি করেন ও তাবতিংস স্বর্গ হলো বৌদ্ধধর্মের একটি স্বর্গীয় স্থান যেখানে ইন্দ্ররাজা বুদ্ধের কেশ ধারণ করে চুলামনি চৈত্য নির্মাণ করেছিলেন ও এই স্থানটি দেবতারা পূজা করে থাকেন আর এছাড়াও বুদ্ধ তাঁর মাতৃদেবীকে অভিধর্ম দেশনা করার জন্য এই তাবতিংস স্বর্গে গিয়েছিলেন । অনুমা নদীটি প্রাচীন ভারতের কপিলাবস্তুর কাছে ছিল যা উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর জেলার আউমি নদীর সাথে শনাক্ত করা হয়েছে । 

দেবরাজ ইন্দ্র হলেন একজন হিন্দু দেবতা যিনি প্রধানত আকাশ ,  বজ্রপাত ,  ঝড় ,  বৃষ্টি এবং যুদ্ধের দেবতা হিসেবে পরিচিত ও তিনি স্বর্গের রাজা এবং দেবগণের নেতা। বৃত্র নামে এক অসুরকে বধ করার জন্য তিনি বৃত্রহন্তা নামেও পরিচিত ও তাঁর বাহন হলো শ্বেতহস্তী ঐরাবত এবং স্ত্রী হলেন শচী। ভগবান বুদ্ধ স্বর্গে তাঁর মা মায়া উনার সাথে দেখা করেছিলেন আর এই ধারণাটি বৌদ্ধধর্মের একটি প্রাচীন ও জনপ্রিয় কাহিনি অনুসারে বর্ণিত। এই কাহিনিতে বলা হয়েছে যে বুদ্ধ তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর তুষিত স্বর্গে (Tushita heaven) তাঁর মা মায়া দেবীর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন যিনি সেখানে পুনর্বাসিত হয়েছিলেন ও সেখানে বুদ্ধ তাঁর মাকে অভিধর্ম  (Abhidharma) নামক এক বিশেষ ধর্মোপদেশ দিয়েছিলেন । অভিধর্ম হলো বৌদ্ধধর্মের ত্রিপিটকের একটি অংশ যা বুদ্ধের শিক্ষার বিস্তারিত বিশ্লেষণ এবং সংগঠিত রূপ। এটিতে বৌদ্ধ মতবাদের সূক্ষ্মতর ও দার্শনিক দিকগুলি ব্যাখ্যা করা হয়েছে  যেখানে সাধারণ শিক্ষাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে পুনর্বিন্যাস করে একটি সুসংবদ্ধ বৌদ্ধ মনোবিজ্ঞান এবং অধিবিদ্যা (metaphysics) হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বুদ্ধ তাঁর মা মহামায়াকে  মৃত্যুর পর দেবরাজ ইন্দ্রের ত্রায়স্ত্রিংশ স্বর্গে অভিধর্ম প্রচার করেছিলেন। মহামায়া বুদ্ধের জন্মের সাত দিন পর মারা যান এবং পরে এই স্বর্গে পুনর্জন্ম লাভ করেন। বুদ্ধ সেখানে তাঁর মা এবং অন্যান্য দেবদেবীদের উদ্দেশ্যে অভিধর্ম বা উচ্চতর ধর্ম শিক্ষা দিয়েছিলেন।  ত্রায়স্ত্রিংশ এবং তাবতিংস স্বর্গ একই কথা যা বৌদ্ধ সৃষ্টিতত্ত্বে তেত্রিশজন দেবতার আবাসস্থল। ত্রায়স্ত্রিংশ সংস্কৃত শব্দ যা তেত্রিশ থেকে এসেছে এবং তাবতিংস হলো পালি ভাষায় এর প্রতিরূপ যা একই স্থানকে নির্দেশ করে থাকে ।  গৌতম বুদ্ধ জীবিত অবস্থায় তাঁর মায়ের সাথে স্বর্গে দেখা করেছিলেন যা বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলোতে বর্ণিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আহ্জার বাত্তি যেখানে বিপদমুক্তি কিংবা রোগমুক্তির কামনায় লোকে আহ্জার বাত্তি মানত করে থাকেন ও এটি আসলে ভগবান বুদ্ধের উদ্দেশ্যেই প্রদীপ পূজা এবং এই অনুষ্ঠান বৌদ্ধ বিহারে কিংবা স্বগৃহে সম্পন্ন করা যায় । এই পূজার একাধিক নাম আছে যা হলো ধর্মকাম ,  জাদিপূজা ,  শিবপূজা ,  সীবলী পূজা ইত্যাদি।   বুদ্ধের শিষ্য লাভী শ্রেষ্ঠ সীবলী মহাস্থবিরের পূজা এবং এই পূজা এখন বৌদ্ধশাস্ত্রে সম্মতভাবে বিহারে অথবা স্বগৃহে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে আর সীবলী মহাস্থবিরের ইতিহাস বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটকের সাথে সম্পর্কিত এবং তিনি পূর্বজন্মে লাভীশ্রেষ্ঠ হওয়ার বর প্রার্থনা করেছিলেন যা তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনে ধনসম্পদ ও প্রাচুর্যের কারণ হয়েছিল‌ ও তাঁকে লাভারী হিসেবে সম্মান করা হয় যিনি তাঁর পূর্বজন্মে একবার বুদ্ধের কাছে এমন বর চেয়েছিলেন ও তাঁর এই বর প্রার্থনা এবং পরবর্তী জীবনে এর ফল হিসেবে তিনি লাভীশ্রেষ্ঠ হিসাবে পরিচিত হন । থান্ মানা এটি একটি সমষ্টিগত পূজা এবং পাড়ার প্রত্যেক গৃহস্থই এতে অংশ গ্রহণ করে থাকেন ।  মালেইয়া এটি ঠিক কোন পূজা পার্বণ নয় , বরং এটি চাকমাদের একটি প্রাচীন সামাজিক রীতি যা এখন প্রায় লোপ পেতে চলছে এবং এতে কোন দেবতার পূজা হয় না আর কোন গৃহস্থ যদি কোন কাজে পিছিয়ে থাকেন ইচ্ছে করলে সে পাড়ার লোকের সাহায্য নিতে পারেন । মূলত কোন কারণে কারও জুম কাটা দেরি পড়ে গেছে , তাছাড়া সঠিক সময়ে জঙ্গল কাটা না হলে কাটা জঙ্গল শুকাবেনা ও ভালোভাবে পোড়া যাবেনা ফলে ভাল ফসলও হবে না , তখন পাড়া পড়শীর সাহায্য নিয়ে সে কাজে সমতা আনতে পারেন এবং সেক্ষেত্রে সে পাড়ার ঘরে ঘরে গিয়ে সাহায্য আবেদন জানিয়ে আসেন এবং তার পরদিন প্রতি বাড়ি থেকে দা ও কুড়াল নিয়ে এক একজন লোক এসে তার কাজটা একদিনে সম্পন্ন করে দিয়ে যান , কিন্তু এদের কোন মজুরী দিতে হয় না শুধু খাওয়াটা দিলে চলে ও  অবশ্যই একটু ভালোই দেওয়ার রেওয়াজ আছে এবং তখন এই উপলক্ষে সেই বাড়িতে ছোটখাট একটা ভোজের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় ,  কিন্তু গৃহস্থের অসচ্ছলতা থাকলে  অনেক সময় এমনিই সবাই কাজ করে দিয়ে আসেন এবং জুমে নিড়ানি দেওয়ার বেলায় কিংবা ফসল কাটার সময়ও মালেইয়া ডাকা হয়ে থাকে। আহল্ পালানী যেখানে প্রত্যেক বছর ৭ আষাঢ় অম্বুবাচী প্রবৃত্তি থেকে তিন দিন চাকমারা হালচাষ বন্ধ রাখেন এবং হিন্দুমতে এই সময় বসুমতি ঋতুমতী হয় আর তাঁর উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পেয়ে শস্যধারণ ক্ষমতা জন্মে ও এই কয়দিন হালকর্ষণ কিংবা কোন প্রকার মাটি খোঁড়াখোঁড়ি নিষিদ্ধ বলা যায়। তাছাড়া বৌদ্ধ হিসেবে চাকমারা বেশ কয়েকটি ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করে থাকেন উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১/  কঠিন চীবর দান ২ / বৈশাখী পূর্ণিমা ৩ / মাঘী পূর্ণিমা ৪ / মধু পূর্ণিমা ৫/ ওয়া ধরানা (বর্ষাবাস গ্রহণ)  ৬ /  ওয়া ভাঙানা (বর্ষাবাস শেষকরণ)  ৭ /  ব্যুহ চক্র ৮ / ফানাস বাত্তি উড়ানা (ফানুস উড়ানাে) ৯ / গাড়ি টানা ১০/  আহ্জার বাত্তি জ্বালানা (হাজার বাতি প্রজ্জ্বলন করা)  ১১/ মহাসংঘ দান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য । চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও তাদের মধ্যে এখনও প্রকৃতি ,  ভূত ,  প্রেত ও দেবতা ইত্যাদি অতিপ্রাকৃতিক শক্তিরও বিশ্বাস আছে এবং চাকমারা সাধারণত বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারী হলেও ধর্মান্ধ নন মোটেও , বরং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সহজসরল বৈশিষ্ট্যই সম্ভবত তাদেরকে যুগ যুগ ধরে তাদের প্রাচীন ধর্ম বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুগত ও বিশ্বস্ত রেখেছে ,  তাই তারা উল্লেখযােগ্য হারে কখনােই ধর্মান্তরিত হননি ।  তবে নানান কারণে বিভিন্ন সময় কিছু কিছু চাকমা অনেকটাই পরিস্থিতির শিকার হয়ে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছেন যেখানে  বর্তমানে জীবন জীবিকার অনিশ্চয়তা ,  চরম দরিদ্রতা , কর্মসংস্থানের অভাব‌ ইত্যাদি কারণে চাকমাদের একটা অংশের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে ।  পাশাপাশি চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও হিন্দু ধর্মের কিছু কিছু প্রভাব  লক্ষণীয় ও কিছু কিছু দেবদেবীর পূজাও  তাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে , কিন্তু বর্তমানে অবশ্য এসবের তেমন একটা প্রচলন নেই এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কখনাে সখনাে পালন করা হয় মাত্র এবং এসব পূজার মধ্যে অন্যতম হলাে ১ /  ভাতদ্যা পূজা ২  /  থানমানা পূজা ৩ /  ধর্মকাম ৪ / গঙাত ভাতজরা দেনা ৫ / মা লক্ষীমা পূজা ৬ /  ঐয়া পূজা ৭ /  চুঙুলাং পূজা ৮ / মাধাধনা ৯ / জুমমারানা   ১০ /  কুলুক মারানা ১১ /  ভুদা পূজা  ১২ /  শিজি পূজা ১৩ / এদা দাগানা ১৪ /  সিন্দি পূজা যেগুলো সংক্ষিপ্তভাবে পূর্বেই কিছুটাংশ তুলে ধরেছি । আরেকটি কথা বলে রাখা ভালো চাকমাদের উৎসব অতীতের তুলনায় পরিবর্তিত হয়েছে , যদিও মূল ঐতিহ্যগুলো এখনও পর্যন্ত টিকে আছে ও প্রধান পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলা লিপির ব্যবহার এবং আধুনিক জীবনধারার প্রভাব যা উৎসব পালনের ধরন ও গভীরতাকে প্রভাবিত করেছে বলা যায়। পাশাপাশি পরিবর্তনের কারণসমূহের কথা বললে বলতে হয়  আধুনিকতার প্রভাব যেখানে 

আধুনিক শিক্ষা এবং প্রযুক্তি ও শহুরে জীবনের সংস্পর্শ চাকমাদের জীবনধারায় পরিবর্তন এনেছে  যা তাদের ঐতিহ্যবাহী উৎসবেও প্রভাব ফেলেছে। ভাষার পরিবর্তন যেখানে চাকমাদের নিজস্ব ইন্দোআর্য ভাষা থাকলেও বর্তমানে তারা বাংলা লিপি ব্যবহার করে থাকেন এবং এই পরিবর্তন ভাষার ঐতিহ্য এবং উৎসবে এর প্রয়োগে ভিন্নতা এনেছে বলা যায় ।  অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন যেখানে কৃষিভিত্তিক জুম চাষের উপর নির্ভরশীলতা কমে যাওয়ায় এবং বিভিন্ন পেশার সুযোগ তৈরি হওয়ায় উৎসবের প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন এসেছে বলা যায় আর আধুনিকতার সাথে সাথে চাকমাদের উৎসবগুলো কিছুটা হলেও পরিবর্তিত হয়েছে বৈকি ,  তবে বিজু উৎসবের মতো প্রধান ঐতিহ্যগুলো এখনও তাদের সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে  বলা যায় । চাকমা পরিবারে পিতা প্রধান হিসেবে বিবেচিত হন কারণ চাকমা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক , তবে চাকমা সার্কেল বা সম্প্রদায়ের প্রধান হিসেবে চাকমা রাজা নেতৃত্ব দেন যা একটি বংশানুক্রমিক পদ । তাছাড়া চাকমাদের গ্রাম প্রধানকে কারবারি বলা হয়ে থাকে এবং কয়েকটি পরিবার নিয়ে একটি গ্রাম বা পাড়া গঠিত হয় আর সেই পাড়ার প্রধানই কারবারি হিসেবে পরিচিত ।‌ আবার কয়েকটি পাড়া বা আদাম নিয়ে একটি মৌজা গঠিত হয় এবং সেই মৌজার প্রধানকে হেডম্যান বলা হয়ে থাকে ।  চাকমারা  বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তারা একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী  হিসেবে পরিচিত ও আদিবাসী এবং উপজাতি বিতর্ক হলো বাংলাদেশ সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বলা হয় যে বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই ,  বরং মূল বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিপরীতে এই অবাঙালি জনসমষ্টিকে  উপজাতি ,  ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠী নামে অভিহিত করা হয়েছে। তবে  চাকমারা জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণা ২০০৭ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ১০৭ ও ১৬৯ নং কনভেনশনের ঘোষণা অনুযায়ী নিজেদের আদিবাসী বলে দাবি করেন এবং উপজাতি নামটি মনেপ্রাণে অপমানকর মনে করেন। তাছাড়া আরাকান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসায় বাংলাদেশ তাদেরকে আদিবাসী স্বীকৃতি দেয়নি , কিন্তু তবে বর্তমানে পাঠ্যবইয়ে উপজাতি শব্দের বদলে ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী লেখা হয়ে থাকে । আদিবাসীর বৈশিষ্ট্য হলো প্রাচীনতম বাসিন্দা যেখানে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের আদিম বা প্রাচীনতম বাসিন্দাদের সরাসরি বংশধর হিসেবে নিজেদের দাবি করেন এবং স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ভাষা যেখানে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ভাষা রয়েছে যা তারা সংরক্ষণ করেন এবং সাংস্কৃতিক ও জাতিগত স্বতন্ত্রতা যেখানে তারা মূল স্রোতের সমাজ থেকে আলাদা এবং নিজস্ব সামাজিক কাঠামো বজায় রাখেন । আদিবাসী এই শব্দটি মূলত ভারতের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি সম্মিলিত পরিচিতি তৈরি করার জন্য ব্যবহৃত হয় যেখানে আদি অর্থ শুরু থেকে এবং বাসী  অর্থ বাসিন্দা ।  আন্তর্জাতিকভাবে আদিবাসী বলতে এমন জাতিগোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যারা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের আদিবাসী বলে দাবি করেন এবং নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন বা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখেন আর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এর সংজ্ঞা অনুযায়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠী হলেন সেই সব জাতিগোষ্ঠী যারা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা এবং যাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয়ের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে । বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আদিবাসী শব্দটি সাধারণত উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত জনগোষ্ঠীদের জন্য ব্যবহৃত হয় যাদের অনেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য অঞ্চলে বসবাস করেন , কিন্তু বাংলাদেশে এই শব্দটির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে যেখানে সরকার আদিবাসী পরিচয়ের স্বীকৃতি দিতে চান না, কারণ তাদের মতে বাংলাদেশের আদিবাসী হলেন বাঙালিরা । ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বলা হয়ে থাকে চাকমারা মগ (বার্মীজ)দের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আরাকান থেকে  বাংলাদেশে এসেছিলেন ও এই ঘটনাটি চাকমাদের বাংলাদেশে আগমন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের স্থায়ী বসতি স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে পর্তুগিজ মানচিত্র প্রণেতা লাভানহা অঙ্কিত বাংলার সর্বাপেক্ষা পুরাতন মানচিত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের  চাকমাদের সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায় ও কর্ণফুলি নদীর তীর বরাবর চাকমাদের বসতি ছিল ।  চাকমাদের ইতিহাস সম্পর্কে দুটি তাত্ত্বিক অভিমত প্রচলিত আর উভয় অভিমতে মনে করা হয়ে থাকে চাকমারা বাইরে থেকে এসে তাদের বর্তমান আবাসভূমিতে বসতি স্থাপন করেন ও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তাত্ত্বিক অভিমত অনুযায়ী চাকমারা মূলত ছিলেন মধ্য মায়ানমার ও আরাকান এলাকার অধিবাসী আর এ ছাড়াও তারা চট্টগ্রাম ও আরাকানের পাহাড়ি অঞ্চলে এককালে বসবাসকারী সাক (চাক ও ঠেক) নামে এক জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও সম্পর্কিত ছিল। তাছাড়া অপর তাত্ত্বিক অভিমতটির সমর্থনে কোনো ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না ও এই অভিমতে বলা হয় চাকমারা উত্তর ভারতের চম্পকনগর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অভিবাসী হিসেবে আসেন । চাকমারা উত্তর ভারতের চম্পকনগর থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন এমন দাবির পক্ষে ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই , তবে কিছু ঐতিহাসিক সূত্র মতে চাকমারা পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে উত্তর ত্রিপুরা থেকে দক্ষিণ পূর্ব দিকে সরে এসে পঞ্চদশ শতকের শেষ নাগাদ পার্বত্য চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়েন। আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী তারা মধ্য মায়ানমার এবং আরাকান এলাকার অধিবাসী ছিলেন আর সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে ( ১৬১২ সালে) আরাকানে পরাজিত হয়ে চট্টগ্রামে এসেছিলেন বলা হয়ে থাকে । চাকমা ঐতিহাসিক বিরাজ মোহন দেওয়ানের বই অনুসারে ১৪১৮ খ্রিস্টাব্দে তারা আরাগান থেকে চট্টগ্রামে আসেন। আবার অশোক কুমার দেওয়ানের মতে চাকমারা উত্তর ত্রিপুরা থেকে পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সরে আসতে শুরু করেন ও পঞ্চদশ শতকের শেষ নাগাদ পার্বত্য চট্টগ্রামের ছড়িয়ে পড়েন। লাভানহার মানচিত্র ও স্যার লাভানহা  একজন পর্তুগিজ মানচিত্র প্রণেতা ছিলেন যিনি আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে বা কিছু পরে বাংলার একটি মানচিত্র অঙ্কন করেন ও এই মানচিত্রটিই হলো বাংলার সবচেয়ে পুরাতন এবং এই পর্যন্ত টিকে থাকা মানচিত্র যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাদের সম্পর্কে উল্লেখ আছে দেখতে পাওয়া যায় ও মানচিত্রটিতে কর্ণফুলি নদীর তীর বরাবর চাকমাদের বসতি থাকার তথ্য পাওয়া যায় যা ওই সময়ের চাকমাদের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দেয় ।  তাছাড়া এশিয়ায় পর্তুগিজদের উপস্থিতি ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে  যোগাযোগের প্রথম সূচনার জন্য দায়ী ছিলেন যা ২০ মে , ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামার নেতৃত্বে ভারতের কালিকট যা আধুনিক ভারতের কেরালা রাজ্যে  ভ্রমণের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল  আর জন ব্যাপটিস্ট লাভানহা বা Joao Baptista Lavanha   ( ১৫৫০ – ১৬২৪) একজন পর্তুগিজ মানচিত্রকার ও গণিতবিদ এবং ভূগোলবিদ ছিলেন ও তাঁর কাজ থেকে বাংলার ইতিহাস ও ভূগোল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় এবং তাঁর মানচিত্রটি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিম বসতি সম্পর্কে প্রথম ঐতিহাসিক লিখিত তথ্যের একটি উৎস বলা যেতে পারে । পাশাপাশি  ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী চাকমা সম্প্রদায় সম্পর্কে বিভিন্ন মতের সৃষ্টি হয়েছে মূলত তাদের ইতিহাস , নৃতাত্ত্বিক উৎস এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্থান এবং পতন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ থাকার কারণে যা বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ভিন্নতার ফল বলা যায় উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বিভিন্ন মতের মূল কারণসমূহ হলো নৃতাত্ত্বিক উৎস যেখানে চাকমাদের প্রকৃত নৃতাত্ত্বিক উৎস নিয়ে বিভিন্ন তাত্ত্বিক মত রয়েছে। কিছু নৃতাত্ত্বিক মনে করেন তারা ইন্দো-তিব্বতীয় বা মন-খেমার মানব গোষ্ঠীর বংশোদ্ভূত যা তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা সমর্থিত ও  মন-খেমার  মানব গোষ্ঠী হলেন যারা প্রধানত কম্বোডিয়া ,  লাওস ,  থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামে বসবাস করেন ও এই গোষ্ঠীটি বিভিন্ন উপজাতি নিয়ে গঠিত যাদের মধ্যে পাহাড়ি মন-খেমার বা মাউন্টেন মন-খেমার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও 

তারা মূলত অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষা পরিবারের অন্তর্গত এবং তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি বিদ্যমান আছে এবং  মন-খেমাররা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত‌ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।  অনেক গবেষণায় তাদের ইন্দোআর্য ভাষা  পালি ও চিটাগোনিয়ান ভাষার সঙ্গে সম্পর্কের উল্লেখ করা হয়েছে যা একটি ভিন্ন ধারার ইঙ্গিত দেয় এবং ঐতিহাসিক ঘটনার ব্যাখ্যা যেখানে আরাকানে রাজত্ব এবং কিছু ঐতিহাসিক তথ্যমতে চাকমারা অতীতে আরাকানে রাজত্ব করে বসবাস করেছেন , কিন্তু পরবর্তীকালে ১৬১২ সালের দিকে আরাকানে পরাজিত হয়ে তারা চট্টগ্রামের আলিকিয়াংদং (বর্তমান আলিকদম) এ এসে বসতি স্থাপন করেন বলে মনে করা হয় ,  কিন্তু এই ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ফলাফল নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। তাছাড়া ভাষা পরিবর্তন যেখানে অতীতে একটি বড় জনগোষ্ঠীর সাথে ক্ষমতা একত্র করার জন্য চাকমারা নিজেদের ভাষা পরিবর্তনের মাধ্যমে ইন্দো-আর্য ভাষা গ্রহণ করেন আর এই পরিবর্তনের পেছনে কারা ছিলেন এবং এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কী ছিল তা নিয়েও ভিন্নমত রয়েছে । নামকরণের উৎপত্তি যেখানে চাকমা নামের উৎপত্তি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে ,  কেউ কেউ মনে করেন এটি সাকমা থেকে এসেছে যা ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিকদের মধ্যে প্রচলিত ছিল বলা হয়ে থাকে এবং 

চাকমা নামটি ছাকমা থেকে এসেছে যেখানে ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিক রিজলে এই উৎপত্তির সঙ্গে একমত ছিলেন ও 

ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিক রিজলে ছিলেন ব্রিটিশ-ভারতের একজন ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা এবং নৃতত্ত্ববিদ যিনি ১৯০১ সালের আদমশুমারিতে ভারতীয়দের শ্রেণীবিন্যাস এবং বর্ণপ্রথার আনুষ্ঠানিক শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং তিনি ভারতীয়দের মধ্যে শারীরিক নৃতাত্ত্বিক গবেষণার সূচনা করেন এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর দৈহিক পরিমাপ সংগ্রহ করেন । পামেলা গুটম্যানের মতে চাকমা  শব্দটি সংস্কৃত শক্তিমান থেকে এসেছে ও যার অর্থ শক্তিশালী এবং মহান আর পামেলা গুটম্যান (Pamela Gutman) ছিলেন একজন অস্ট্রেলিয়ান গবেষক ,  শিল্প ইতিহাসবিদ এবং সরকারি কর্মচারী যিনি প্রাচীন বার্মিজ শিল্পের উপর বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং এই বিষয়ে একজন প্রামাণিক ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন। তিনি বার্মার প্রথম অস্ট্রেলিয়ান পণ্ডিত যিনি এশীয় শিল্পের উপর একটি ডক্টরেট ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিলেন ও তাঁর প্রকাশিত কিছু কাজের মধ্যে Burma’s Lost Kingdoms: Splendours of Arakan বইটি অন্যতম ও তাঁকে এশীয় শিল্পের উপর প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি সম্পন্নকারী অস্ট্রেলিয়ান পণ্ডিত হিসাবে গণ্য করা হয়। বার্মিজ প্রভাব  যেখানে একটি মত অনুসারে বাগান যুগে একজন বার্মিজ রাজা চাকমাদের এই নামটি দিয়েছিলেন। কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন চাকমা এবং সাক বা চাক নামে পরিচিত একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক ছিল। ঐতিহাসিক এবং ভাষাগত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে এই শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে একাধিক তত্ত্ব রয়েছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। আবার চাকমারা নিজেদের চাঙমা বলে পরিচয় দেন যা চাকমা শব্দের একটি ভিন্ন উচ্চারণ।  কিছু সাম্প্রতিক তত্ত্বে বলা হয় এই নামটি সংস্কৃত শক্তিমান শব্দ থেকে এসেছে যা মিয়ানমারের রাজা দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়। তবে ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে মিয়ানমারের রাজা কেন সংস্কৃত নাম দেবেন ,  তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে ,  কারণ বর্মি বা ম্রনমা ভাষা ( মারমা ভাষা ) তিব্বতি-চীনা ভাষা পরিবারভুক্ত । মারমা ভাষা হলো মারমাদের নিজস্ব ভাষা ও এটি তিব্বত-বর্মী পরিবারের অন্তর্গত একটি ভাষা এবং এর নিজস্ব বর্ণমালা আছে যা বার্মিজ লিপির উপর ভিত্তি করে তৈরি এবং যাদের মূল বাসভূমি মিয়ানমারে ও তারা ম্রাইমা থেকে মারমা নামে পরিচিতি লাভ করেন এবং এই ভাষাটি মারমা ভাষা নামেই পরিচিত । আবার অস্পষ্ট ও সীমিত ইতিহাস যেখানে চাকমাদের প্রাচীন ইতিহাস এবং তাদের উৎস সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও বিস্তারিত তথ্য না থাকার কারণে বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও গবেষক ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। অপ্রতুল গবেষণা যেখানে ব্রিটিশ শাসনামলে বা তার আগে চাকমাদের জাতিগত পরিচয় এবং তাদের ইতিহাস নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি , যার ফলে তাদের সম্পর্কে অনেক অমীমাংসিত বিষয় রয়ে গেছে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাথে মিশ্রণ যেখানে চাকমা সম্প্রদায় ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে আরও অনেক ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী আছেন  যেমনঃ মারমা , ত্রিপুরা এবং তঞ্চঙ্গ্যাদের বসবাস রয়েছে আর এই মিশ্রিত পরিবেশ এবং সময়ের সাথে সাথে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান তাদের মধ্যে ভিন্নতার সৃষ্টি করেছে বৈকি এবং 

ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থান যেখানে চাকমাদের একটি অংশ বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে ,  একটি অংশ ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরায় এবং কিছু অংশ পশ্চিম মায়ানমারেও বসবাস করেন আর এই ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থান তাদের মধ্যে স্থানীয়ভাবে স্বতন্ত্র পরিচয়ের জন্ম দিয়েছে যার ফলে তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত প্রচলিত। সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্য যেখানে  চাকমা সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভিন্ন উপগোষ্ঠীর অস্তিত্ব দেখা যায় যারা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈশিষ্ট্য ধারণ করে থাকেন এবং এই বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিচয়ও তাদের মধ্যে বিভিন্ন মতের জন্ম দেয়। তাছাড়া ভিন্ন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা যেখানে কিছু তাত্ত্বিক চাকমাদের মঙ্গলীয় উৎস সম্পর্কে ধারণা দেন ,  আবার কেউ কেউ তাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে অন্য ব্যাখ্যা দেন উদাহরণস্বরূপ  তাদের সঙ্গে বিহারের মগধ অঞ্চলের মানুষের চেহারার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না বলে অনেক গবেষক দাবি করেন । বস্তুত 

চাকমা সম্প্রদায় সম্পর্কে বিভিন্ন মত দেখা যায় কারণ তাদের ইতিহাস ও উৎস এবং ঐতিহ্য নিয়ে অনেক বিতর্ক ও গবেষণা রয়েছে আর পাশাপাশি তাদের মধ্যে বিভিন্ন উপগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও বিবর্তিত সাংস্কৃতিক পরিচয়ও এই মতভেদের কারণ আর ঐতিহাসিক তথ্য ও আধুনিক গবেষণা এবং ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিকোণ থেকে এই সম্প্রদায়ের ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে বলা যায় । মূলত  আরাকান হলো মিয়ানমারের বর্তমান রাখাইন রাজ্যের (পূর্বের বার্মা) একটি ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক নাম যা বঙ্গোপসাগরের উত্তরপূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত ও  বার্মা কর্তৃক রাখাইন রাজ্যের নাম পরিবর্তন না করা পর্যন্ত এটি আরাকান নামেও পরিচিত ছিল আর এই অঞ্চলে বসবাসকারী জনগণের নাম আরাকানি বলা হয়ে থাকে এবং বর্তমান বার্মা যা মিয়ানমার নামে পরিচিত যেটি সাতটি রাজ্য ও সাতটি অঞ্চল যেখানে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ও স্বশাসিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত ।  সাতটি রাজ্য হলো ১/ চিন ২/  কাচিন ৩/ কায়া ৪/  কাইন (কারেন) ৫/  মোন ৬/ রাখাইন (আরাকান) ৭/  শান ও  এই রাজ্যগুলো মূলত জাতিগত সংখ্যালঘুদের বাসভূমি ।  সাতটি অঞ্চল হলো ১/ আয়েয়ারওয়াদি (ইরাবতী) ২/  ম্যাগওয়ে‌ ৩/ মান্দালয় ৪/  বাগো (পেগু) ৫/ সাগাইং ৬/  তানিনথারি (তেনাসেরিম) ৭/  একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আর মায়ানমারের একমাত্র কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল হলো নেপিডো ( Naypyidaw ) যা দেশটি রাজধানীও । মায়ানমারে স্বশাসিত অঞ্চল গুলোর মধ্যে রয়েছে চিন , কাচিন , কারেন , কায়া , মন ,  রাখাইন ও শান রাজ্য এবং এই রাজ্যগুলো জাতিগতভাবে গঠিত এবং কিছু স্বায়ত্বশাসন ভোগ করে থাকেন । বর্তমানে ইয়াঙ্গুন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র ও এটিকে প্রায়শই মায়ানমারের প্রবেশদ্বার বলা হয় । তাছাড়া মায়ানমার বাংলাদেশের প্রায় ৪.৭ গুণ বড় ও মায়ানমারের আয়তন প্রায় ৬ ,৭৬ , ৫৫২ বর্গ কিলোমিটার আর ২০২৪ সালের অক্টোবরে পরিচালিত একটি আদমশুমারি অনুযায়ী মিয়ানমারের জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ১৩ লক্ষ ।  পাশাপাশি এটিও তুলে ধরা প্রয়োজন প্রাচীন মায়ানমারের সাথে চট্টগ্রামের মূল সম্পর্ক ছিল আরাকান রাজ্যের মাধ্যমে যা বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য নামে পরিচিত । ১৫৮১ সাল থেকে ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত আরাকান রাজ্য চট্টগ্রামকে নিজেদের শাসনাধীনে রেখেছিলেন ও এই সময়কালে পর্তুগিজ  জলদস্যুতের উৎপাত ও আরাকান রাজার দ্বারা তাদের দমন করার ঘটনাও ঘটেছিল । পরে ১৬৬৬ সালে মোগলরা আরাকানিদের পরাজিত করে চট্টগ্রাম দখল করে নেন ও এর নাম রাখেন ইসলামাবাদ । বস্তুত ১৬৬৭ সালে শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে মোঘল বাহিনী আরাকানিদের পরাজিত করে চট্টগ্রাম দখল করে নেন। শায়েস্তা খান বা মির্জা আবু তালিব তিনি দু’দফায় মোট ২২ বছর ১৬৬৪ সাল থেকে ১৬৮৮ সাল পর্যন্ত বাংলা সুবেদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাছাড়া তাঁর সময়ে ঢাকা শহর ও প্রদেশের মুঘল ক্ষমতা সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটেছিল আর তাঁর বিখ্যাত কাজের মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম জয় এবং তাঁর সময়ে ঢাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নির্মিত হয়েছিল যা এখনো পর্যন্ত বিদ্যমান ।  প্রাচীন মায়ানমারের সাথে চট্টগ্রামের  মূল সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুঘলদের নিয়ন্ত্রণ যেখানে ১৬৬৬ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধের পর আরাকান চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ হারান আর প্রাচীন মায়ানমারের সাথে চট্টগ্রামের মূল সম্পর্কের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক হলো একীভূত ভূখন্ড বলা যেতে পারে ও ঐতিহাসিকভাবে আরাকান (বর্তমান রাখাইন) ছিল চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে একই ভূখণ্ডের অংশ এবং সাংস্কৃতিক আদান প্রদান যেখানে আরাকান রাজ্য সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় পূর্ব থেকেই আরব দেশসহ অন্যান্য দেশের সাথে এর ভালো যোগাযোগ ছিল ও এর ফলে তাদের ব্যবসায়িক লেনদেনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল আর  চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের প্রাচীন সম্পর্ক ছিল মূলত আরাকান রাজ্যের মধ্য দিয়ে  যেখানে একটি দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক সংযোগ বিদ্যমান ছিল ।  তাছাড়া আরাকানের ইতিহাসে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হলো ভারতের সাথে সম্পর্ক যেখানে আরাকান ছিল দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রথম ভারতীয়কৃত রাজ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম যেখানে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব ছিল এবং ম্রাউক উ রাজ্য যেখানে আনুমানিক ১৪২৮ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ৩৫৬ বছর ধরে আরাকান ম্রাউক উ শহর থেকে শাসিত হতো যা ভারতীয় ও বর্মী সংস্কৃতির এক মিশ্রণ ছিল বলা যেতে পারে এবং বার্মিজ বিজয় যেখানে ১৭৮৪ সালে বর্মী রাজা বোধোপয়া আরাকান জয় করেন যা সেখানকার রাখাইন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে এবং বহু লোক বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন ।  আরাকানের বর্তমান অবস্থা হলো এটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল যেখানে ঐতিহাসিকভাবে আরাকান বাংলাদেশের কিছু অংশ যা চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল যা বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত ও রাখাইন রাজ্য যেখানে মিয়ানমারের পশ্চিম উপকূলে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত এই রাজ্যটিই এখন রাখাইন রাজ্য নামে পরিচিত যা আগে আরাকান নামে পরিচিত ছিল ।  তাই দেখতে পাওয়া যায় বাংলা ও মিয়ানমারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও সম্পর্ক ছিল যা বিশেষত আরকান রাজ্য এবং বাংলা উপকূলের মধ্যে ও ১৯৭২ সালে ১৩ জানুয়ারী মিয়ানমার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক শুরু হয় বলা যায়। তাছাড়া প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলার সাথে আরাকান রাজ্যের সম্পর্ক ছিল নিবিড় ও বহুমুখী যেখানে রাজনৈতিক , 

সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিদ্যমান ছিল । আবার এটিও দেখতে পাওয়া যায় আরাকান একটি ভাসাল রাজ্য হিসেবে বাংলার অধীনে ছিল ও বাংলা সুলতানদের সমর্থন ও প্রভাব গ্রহণ করতেন । সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আরাকান রাজসভা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন ও অনেক আরাকানি শাসক ইসলামিক উপাধি গ্রহণ করতেন যা বাংলার ইসলামিক সংস্কৃতির প্রভাবের একটি নিদর্শন। রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক হলো ১৪৩০ সাল থেকে আরাকান বাংলার একটি আশ্রিত বা অধীন রাজ্য ছিল ।  আরাকান রাজ্য ১৪৩০ সাল থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত এই সময়কালের ইতিহাসে এই রাজ্য সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা লাভ করা যায় এবং আরাকানের অনেক বৌদ্ধ রাজা মুসলিম উপাধি গ্রহণ করতেন ও মুদ্রায় আরবি-ফার্সি অক্ষর ব্যবহার করতেন যা বাংলার 

সুলতানদের  প্রতি আনুগত্যের প্রতীক ছিল । ভাসাল রাজ্য হলো এমন একটি রাজ্য যা কোন শক্তিশালী রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত থাকে ও এর বিনিময় কিছু সুবিধা পায়। এই ব্যবস্থায় ভাসাল রাজ্যের শাসক তাঁর অধিপতির প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করেন এবং বিনিময়ে নিজস্ব রাজ্য শাসনের অনুমতি পান , তবে তাঁকে অবশ্যই অধিপতিকে সামরিক সহায়তা বা শ্রদ্ধা বা অন্য যেকোন ভাবে সেবা প্রদান করতে হবে ।‌ ভাসাল রাজ্য এটি একটি মধ্যযুগীয় সামন্ত প্রথার একটি অংশ ছিল যেখানে অধিপতিকে সুজারেন ( Suzerain) বলা হতো। বাংলা সালতানাত ও বাংলার শাহী আমল বলতে 

সাধারণত ১৩৩৮ থেকে ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বিভিন্ন সুলতানি রাজবংশ কর্তৃক বাংলা শাসন কে বোঝানো হয়ে থাকে যা প্রায় বাংলা সালতানাত নামে পরিচিত । এই সময়ে ইলিয়াস শাহী , গণেশ ও হোসেন শাহী বংশের মতো শক্তিশালী রাজবংশগুলো বাংলা শাসন করেন যা প্রশাসন , অর্থনীতি , ধর্ম , সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে উল্লেখযোগ্য ভাবে প্রভাব ফেলেছে ও এই যুগটি বাংলার ইতিহাসে মধ্যযুগ হিসেবে সুপরিচিত আর এটি ছিল একটি সুন্নি মুসলিম শাসিত রাজ্য । তাছাড়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজবংশের কথা তুলে ধরি ইলিয়াস শাহী বংশ ১৪৫ বছর ধরে বাংলা শাসন করেন যা প্রায় ১৩৪২ সাল থেকে ১৪৮৭ সাল পর্যন্ত। গণেশ বংশ ও ইলিয়াস শাহী বংশের মাঝে গণেশ বংশ প্রায় ২১ বছরের জন্য বাংলা শাসন করেন । হোসেন শাহী বংশ ১৪৯৪ সাল থেকে ১৫৩৮ সাল পর্যন্ত এই বংশ বাংলা শাসন করেন যেটি একটি স্বর্ণযুগ হিসেবে সুপরিচিত। তাছাড়া শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এর সময়কালে বাংলা একটি একক রাজ্যে একত্রিত হয়েছিল যেখানে শাহ – ই – বাঙ্গালাহ উপাধি ধারণ করে নিজেকে মধ্যযুগীয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল যা প্রায় দুইশত বছর ১৩৩৮ সাল থেকে ১৫৩৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল ও এই যুগের সূচনা করেন ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ যিনি সোনারগাঁও স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বাংলা স্বাধীন সুলতানি আমল সমাপ্তি ঘটে মুঘলদের বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে ও মোঘলরা ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলা বিজয় সম্পন্ন করেন। মূলত সম্রাট আকবর ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে রাজমহলের যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলায় মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা করেন ও বাংলাকে মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসেন । মূলত ১৩৩৮ সালে ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের সময় থেকে স্বাধীন সুলতানি আমল শুরু হয়  ও ১৫০০ সালের দিকে বাংলা , বিহার , আসাম ও আরাকানের অংশবিশেষ নিয়ে শাহী বাংলা গঠিত ছিল । বস্তুত সামন্ত প্রথা ছিল মধ্যযুগীয় ইউরোপের একটি সামাজিক ,  অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে ভূমির বিনিময়ে সেবা বা শ্রম প্রদান করা হতো এবং সম্পর্ক গড়ে উঠতো । এই ব্যবস্থায় রাজা ছিলেন ভূমির মালিক এবং তাঁর অধীনে অভিজাতরা (সামন্ত) জমি ভোগ করতেন ও বিনিময়ে তাঁরা রাজার প্রতি আনুগত্য ও সামরিক সেবা দিতেন যা একটি পিরামিডীয় কাঠামো তৈরি করতো ও পিরামিডীয় কাঠামো বলতে এমন একটি জ্যামিতিক গঠনকে বোঝায় যার একটি বহুভুজভিত্তিক তল থাকে এবং এর পাশের প্রতিটি তল ত্রিভুজাকার হয়ে উপরের একটি বিন্দুতে মিলিত হয় উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে  মিশরের পিরামিডগুলো এর একটি বিখ্যাত উদাহরণ যেখানে পাথর বা ইট দিয়ে নির্মিত একটি বিশাল কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল  যা পাথরের তৈরি এবং আয়তাকার ভিত্তি ও ত্রিভুজাকার পার্শ্ববিশিষ্ট ।

     সর্বোপরি যেটি বলা যায় মায়ানমারের বর্মী রাজাদের ইতিহাস তিব্বতীয় বর্মন ভাষী পাইয়ু নগররাষ্ট্র থেকে শুরু হয় যা পরে বাগানের সাম্রাজ্যে একত্রিত হয় এবং ১১শ শতাব্দীতে একীভূত রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয় ও পরবর্তীতে বাগান সাম্রাজ্য ভেঙে যাওয়ার পর কনবাউং রাজবংশ মায়ানমারকে একীভূত করেন আর এই সাম্রাজ্যগুলো তাদের ক্ষমতা ও অর্থনীতি এবং বৌদ্ধধর্মের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন , কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের অধীনে আসে।  মায়ানমারের বর্মী রাজাদের ইতিহাস তিব্বতীয় বর্মন ভাষী পাইয়ু নগররাষ্ট্র  শুরুর দিকের সময়কাল ও পিয়ু রাজ্য যেখানে মায়ানমারের ভূখণ্ডে প্রথম মানব বসতি স্থাপন হয়েছিল প্রায় ১৩,০০০ বছর আগে ও এর প্রাচীন অধিবাসীরা ছিলেন তিব্বতীয় বর্মন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী যারা প্রথম একটি নগররাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেন যা পাইয়ু নামে পরিচিত ছিল এবং বাগান সাম্রাজ্য ও প্রথম একীকরণ যেখানে ১০৫৭ সালে থাটনের সোমকে পরাজিত করে বাগান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটিই প্রথমবার সমগ্র মায়ানমারকে এক রাজার অধীনে একত্রিত করেন ও বাগান সাম্রাজ্য ছিল মায়ানমারের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী সময়  যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ছিল এবং  কনবাউং রাজবংশ ও শেষ যুগ যেখানে পরবর্তীতে কনবাউং রাজবংশ নামে পরিচিত একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য মায়ানমারকে পুনরায় একত্রিত করতে সক্ষম হয় ও এই রাজবংশের সময়কালে দেশ স্থিতিশীলতা অর্জন করে এবং এটি মায়ানমারের ইতিহাসে একটি দীর্ঘস্থায়ী পর্যায় ছিল এবং উপনিবেশবাদ ও পতন যেখানে পরবর্তীতে ব্রিটিশরা মায়ানমার আক্রমণ করেন এবং তাদের ঔপনিবেশিক শাসনে অধীনে নিয়ে আসেন যা বর্মী রাজাদের শাসনের অবসান ঘটায় আর ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশটির নাম পরিবর্তন করে মায়ানমার রাখা হয় যা আগে বার্মা নামে পরিচিত ছিল ।  থাটোন রাজ্য বা সুবর্ণভূমি  বা থুউন্নাভুমি  অথবা ছিল একটি মন রাজ্য  যা কমপক্ষে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত নিম্ন বার্মায় বিদ্যমান ছিল বলে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে। এটি হলো আধুনিক দিনের নিম্ন বার্মা এবং থাইল্যান্ডে বিদ্যমান অনেক মন রাজ্যের মধ্যে একটি ও রাজ্যটি মূলত থাটোন শহরকে কেন্দ্র করে একটি নগররাজ্য ছিল ।  মন বা সোম হলো একটি জাতিগত গোষ্ঠী যাদেরকে সোম মানুষ‌ও বলা হয়ে থাকে । সোম রাজ্য বা মোন রাজ্যগুলি ছিল বর্তমান মায়ানমার ও থাইল্যান্ডের কিছু অংশে মোনভাষী লোকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাজ্য যা বর্তমানে উত্তর থাইল্যান্ডের দ্বারবতী এবং হরিপুঞ্জয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ মায়ানমারের থাটোন ,  হান্থাবাদি (১২৮৭-১৫৩৯) এবং পুনরুদ্ধার করা হান্থাবাদি (১৭৪০-১৭৫৭) পর্যন্ত রাজ্যগুলো বিস্তৃত ছিল । মোন ভাষা  যা পূর্বে পেগুয়ান এবং তালাইং নামে পরিচিত ছিল যা এটি একটি অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষা যা মোন জনগণের দ্বারা কথিত । থাটোন হলো  দক্ষিণ মায়ানমারের টেনাসেরিম সমভূমিতে অবস্থিত মোন রাজ্যের একটি শহর । থাটন রাজ্যের সময়কাল হলো 

৪০০ খ্রিস্টাব্দ – ১০৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত । বাগান হলো  মায়ানমারের মান্দালয় এবং একটি প্রাচীন শহর ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান ।  নবম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত শহরটি প্যাগান রাজ্যের প্রশাসন ছিল  যা প্রথম রাজ্য যা পরবর্তীতে মায়ানমার অঞ্চলগুলোকে একীভূত করে । একাদশ থেকে ত্রয়োদশর ক্ষমতার রাজ্যগুলোর মধ্যে উচ্চতার সময় শুধুমাত্র বাগান ভূমিতে ১০, ০০০ টিরও বেশি বৌদ্ধ মন্দির , প্যাগোডা এবং মঠ নির্মিত হয়েছিল  যার মধ্যে ২২০০ টিও বেশি মন্দির ও প্যাগোডার অবশিষ্ট অংশ আছে । প্যাগান রাজ্য বা পৌত্তলিক রাজ্য যা প্যাগান রাজবংশ নামেও পরিচিত  ছিল যা প্রথম বার্মিজ রাজ্য যারা পরবর্তীতে আধুনিক মায়ানমার গঠনকারী অঞ্চলগুলোকে একত্রিত করেছিলেন। প্যাগান রাজ্যের সময়কাল হলো ৮৪৯ থেকে ১২৮৭ সাল পর্যন্ত যেটি  দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ডে থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করেছিল । দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ড ঐতিহাসিকভাবে ইন্দোচীন এবং ইন্দোচীন উপদ্বীপ নামে পরিচিত যা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মহাদেশীয় অংশ হিসেবে বিবেচিত যেখানে 

 কম্বোডিয়া , লাওস , মায়ানমার , সিঙ্গাপুর , থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনাম দেশগুলোর পাশাপাশি উপদ্বীপীয় মালয়েশিয়াও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ।  মান্দালয় অঞ্চল  মায়ানমারের একটি প্রশাসনিক বিভাগ । এক কথায় বলা যায় বাগানের অবস্থান হলো  মায়ানমারে ও 

অঞ্চল হলো মান্দালয় ও  প্রতিষ্ঠিত হয় 

নবম শতকের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে ।   পাশাপাশি মিয়ানমারের ইতিহাস ও ইতিহাসের বিভিন্ন দিক আলোচনায় ও পর্যালোচনায় এই সূত্রটি ব্যবহার করা যেতে পারে আর তা হলো প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাস  > পিয়ু নগররাষ্ট্র > মোন রাজ্য > পাগান বংশ (৮৪৯-১২৯৭) > ক্ষুদ্র রাজ্য > টঙ্গু বংশ (১৫১০–১৭৫২) > কোনবাউং রাজবংশ (১৭৫২-১৮৮৬) > ব্রিটিশ শাসন > দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও জাপানের দখলদারিত্ব > স্বাধীনতা > স্বাধীনতার পরবর্তীকালে মিয়ানমার (১৯৪৮-১৯৬২) > মিয়ানমারে সমাজতন্ত্র (১৯৬২-১৯৮৮) > সামরিক শাসন (১৯৮৮-২০১১) > ২০১১ থেকে বর্তমান । পাশাপাশি সাথে রাখতে পারেন  বার্মায় প্রথম মঙ্গোল আক্রমণ ( First Mongol invasion of Burma ) ও 

 মোঘল এবং বার্মার সম্পর্ক ( মিয়ানমার ) ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও বার্মায়  মুসলিম জনগোষ্ঠীর আগমনের ইতিহাস ,  আর বাহাদুর শাহ দ্বিতীয় (জন্মঃ ২৪ অক্টোবর ,  ১৭৭৫ ,  দিল্লি, ভারত— মৃত্যুঃ ৭ নভেম্বর , ১৮৬২ ,  রেঙ্গুন ,  বার্মা ) ছিলেন ভারতের শেষ মুঘল সম্রাট ও শাসনকাল হলো ১৮৩৭ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত যিনি বার্মায়  মারা যান । 

      বর্মী শব্দের অর্থ হলো বার্মা দেশের অধিবাসী ,  ভাষা ,  সংস্কৃতি বা বার্মার সাথে সম্পর্কিত কিছু অথবা বর্ম পরা বা বর্ম দ্বারা আবৃত ও বর্ম  শব্দটির অর্থ হলো বর্ম বা কবচ যা অস্ত্রাঘাত থেকে শরীরকে রক্ষা করার জন্য পরা হয়ে থাকে এবং বর্মী শব্দটি বার্মার সাথে সম্পর্ক হলো বর্মী শব্দটি মিয়ানমার যা আগে বার্মা নামে পরিচিত ছিল দেশটির অধিবাসী ও সেখানকার ভাষা বা সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে বস্তুত এবং বর্মধারী যেখানে বর্মী শব্দটি সেই ব্যক্তিকেও বোঝাতে পারে যিনি বর্ম পরিধান করেন ,  অর্থাৎ শরীরে বর্ম বা কবচ বা সাঁজোয়া পরিহিত বলা যেতে পারে। তাছাড়া বর্মী ভাষা  এটি বার্মার একটি ভাষা এবং বর্মী বা বার্মিজ একটি ভাষার নাম যা মূলত মিয়ানমারের প্রধান ভাষা ও অন্যদিকে মগ বা মাঘ  শব্দটি একটি জনগোষ্ঠী বা জাতিগোষ্ঠীকে বোঝায়  বিশেষ করে রাখাইন বা মারমাদের জন্য ব্যবহৃত হতো ও  এটিকে একসময় জলদস্যু অর্থেও ব্যবহার করা হতো। মগ শব্দটি এখন আর মারমা বা রাখাইনরা নিজেদের পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করেন না এবং এটি তাদের কাছে একটি মর্যাদাহানিকর শব্দ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।  বর্মী শব্দের সাথে মগ শব্দের সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য হলো ভৌগোলিক সংযোগ যেখানে মগ জনগোষ্ঠী (রাখাইন ও মারমা) ও বর্মী ভাষাভাষীদের (মিয়ানমারের) মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক বিদ্যমান আছে । এটির কারণ হলো এরা একই অঞ্চলের অধিবাসী এবং সাংস্কৃতিক মিলন যেখানে রাখাইনদের ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্য বর্মী ভাষার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ও  তাদের সংস্কৃতি ও পোশাকেও বার্মার সাথে অনেক মিল দেখতে পাওয়া যায় আর বৈসাদৃশ্য হলো ভাষাগত ও জাতিগত ভিন্নতা যেখানে বর্মী বলতে মিয়ানমারের প্রধান ভাষা ও সংস্কৃতিকে বোঝানো হয়ে থাকে আর অপরদিকে মগ একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর নাম  যা এখন আর ব্যবহৃত হয় না বা বিলুপ্ত বলা যেতে পারে এবং শব্দের অর্থ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বর্মী একটি ভাষার নাম ,  কিন্তু মগ শব্দটি বাঙালির দ্বারা মারমা বা রাখাইনদের জলদস্যু হিসেবে আখ্যায়িত করার জন্য ব্যবহৃত হতো  । আরেকটি বিষয় আবারো তুলে ধরি চাকমারা প্রধানত বিভিন্ন গোত্র বা বংশে  বিভক্ত, কিন্তু এই সংখ্যা বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে উল্লেখ করা আছে এবং কোনো সূত্রে ৪৬টি গোজা ও বিভিন্ন গুত্তি আর আবার কোনো সূত্রে ৩১টি বংশ বা গোত্র , তাছাড়া এই বিভক্তগুলো তাদের সামাজিক কাঠামো ও পারিবারিক পরিচয়ের অংশ বলা যেতে পারে এবং গোত্র ও গুত্তি একি কথা আর  চাকমা ভাষায় গোজা ও গুত্তি  সমার্থক নয় মোটেও ,  এটির কারণ হলো গোজা হলো গোত্রের নাম যা বংশ বা গোষ্ঠীর পরিচয় বহন করে উদাহরণস্বরূপ লারমা গোজা  আর গুত্তি হলো একই গোজার অন্তর্গত আরও নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা উপগোষ্ঠী যা গোজার একটি অংশকে বোঝানো হয়ে থাকে, অর্থাৎ গোজা একটি বড় বিভাগ আর গুত্তি তার থেকে একটি ছোট উপবিভাগ এবং গোজা একটি বড় গোত্রীয় পরিচয় বহন করে থাকে ,  অপরদিকে গুত্তি সেই গোজার অন্তর্গত আরও ছোট ভাগ বা উপগোষ্ঠী উদাহরণস্বরূপ চার্ব্য গুত্তি ।  সুতরাং যেটি দেখতে পাওয়া যায়  গোজা হলো একটি বিস্তৃত বংশ পরিচয়ের নাম  আর গুত্তি হলো সেই গোজার ভেতরের একটি সুনির্দিষ্ট বা ছোট অংশ ও তাছাড়া সাধারণত পিতৃকূল নিয়ে গোষ্ঠী আর সম্প্রদায় নিয়ে গোজার অর্থ‌ও বহন করে থাকে এবং এই গোষ্ঠী মূলত সম্ভ্রান্ত বা নামীদামী কোন একজন লোক থেকে উৎপত্তি হয়ে থাকে, আবার এমনও হয়েছে বিভিন্ন গোষ্ঠীর লোক নিয়ে গোজার সৃষ্টি হয়েছে ,   চাকমাদের সমাজে পরিচয়ের ক্ষেত্রে প্রথমেই গোজার অনুসন্ধান করতে হয় আর গোজার সংখ্যাও কম নয় মোটেও ।  গোজা শব্দটি পদ বাচক সংস্কৃত গুচ্ছ শব্দের একই অর্থ বহন করে থাকে ।‌ বস্তুত চাকমাদের বংশ বা গোষ্ঠীর বিবরণ বিশ্লেষণ করা কিছুটা অসুবিধা , চাকমাদের বহুল গোজার কথা উল্লেখ রয়েছে এবং চাকমারা জাতি হিসেবে ক্ষুদ্র হলেও তাতে আবার বহু গোষ্ঠীর সন্ধান দেখতে পাওয়া যায় উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে তৈন্যা গোজা ও এই দলপতির নাম কুর্য্যা এবং তিনি এক সময়ে তিনমুড়ি নদীর তীরে বাস করতেন বলে তা হতে তৈন্যা গোজা নামে পরিচিত আর গোষ্ঠী হলো কুর্য্যা এবং   লার্মা গোজা যা বর্তমান লামার একস্থানে পিড়াভাঙ্গা বংশীয় লার্মা নামে এক সর্দার ছিলেন ও তাঁরই নামানুসারে লার্মা গোজার নামকরণ হয় ,  আবার মতান্তারে কোন স্থান হতে নেমে গিয়েছিলেন বলে লার্মা গোজার নাম হয়েছে ও বর্তমান লার্মা সেটারই নামান্তর এবং  পূর্বনাম হলো পিড়াভাঙ্গা আর গোষ্ঠী হলো চায্যা, বগা, ভবা, ঠদেগা, সমঝা ইত্যাদি ও সন্তু লারমা (জন্ম ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪) হলেন বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের একাংশের নেতা ও তাঁর পুরো নাম জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ,  তবে সন্তু লারমা নামেই তিনি অধিক পরিচিত ও তিনি বাংলাদেশের অন্যতম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী লারমা সম্প্রদায়ের সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি । তাছাড়া আরো উল্লেখপূর্বক বলা যেতে পারে ওয়াংঝা গোজা আর রাঙ্যা কাউর ও কালা কাউরের বংশধর গাবুর ওয়াংঝা ও বুড়া ওয়াংঝা নামে ওয়াংঝা গোজা নামে সুপরিচিত ও  গোষ্ঠী হলেন কাঁকড়া, শেঠ্যা, পুংঝা ইত্যাদি এবং ওয়াংঝা গোজার প্রধান হলেন চাকমা রাজাগণ আর মহামান্য রাজা দেবাশীষ রায় ( জন্ম ৯ এপ্রিল ১৯৫৯) মহোদয়  একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী ও তিনি বাংলাদেশের বৃহত্তম আদিবাসী সম্প্রদায় চাকমা সার্কেলের  রাজা ও তিনি  ওয়াংঝা গোজা । পাশাপাশি ঠিক এই ধরনের আরো বললে বলতে হবে  রাঙী গোজা ও গোষ্ঠী হলেন লৌহ ঝাত্তোয়া , বুংচেগে , কাল , মেন্দর , চেগে , ভেঙেয়া ইত্যাদি এবং  খ্যংজয় গোজা ও গোষ্ঠী হলেন চৈয়দনী , সেম , ধ্বজা , বেদ্দু , বাঙ্গালী , নাপিটা , চকই ও কবাল্যা যা মোট ৮টি এবং  চেক্কবা গোজা , কিন্তু এটির গোষ্ঠী নেই এবং  তৈন্যা গোজা ও গোষ্ঠী হলেন কুর্য্যা , ধূর্য্যা , মুলিয় , পৈয়ব ইত্যাদি এবং  বুংছা গোজা ও গোষ্ঠী হলেন কাঁকড়া , মোছচড়া , চগদা ইত্যাদি এবং  মুনিয়া গোজা ও গোষ্ঠী হলেন ধাবান ,  মিঠা, নোয়ান্যা , কলা , বামুন , চেগে , পচা , সল্যা , চাদং , বাদালি , রাঙাছিলন্যা এবং  বাবুরোগোজা ও গোষ্ঠী হলেন বাবুরো , গজাল্যা , মানাইয়া , লৌহকদ্দা , ভগতপ ইত্যাদি এবং বোম গোজা ও গোষ্ঠী হলেন আমু , জাদি , বাদালি , পারবোয়া ইত্যাদি ছাড়াও আরো বহুবিধ গোজা ও গোষ্ঠী বিদ্যমান আছে বলা যায় । 

       তাছাড়া উল্লেখযোগ্য চাকমা জনগোষ্ঠী বসবাস করে থাকেন বাংলাদেশ ও ভারত  এবং মায়ানমারে যেখানে ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী  মিজোরামে ৯২,৮৫০ জন ,   ত্রিপুরায় ৮৪,২৬৯ জন ,   অরুণাচল প্রদেশে ৪৭,০৭৩ জন ,  আসামে ৩,১৬৬ জন ,  পশ্চিমবঙ্গে ১৭৫ জন ,  মেঘালয়ে ১৫৯ জন ও  নাগাল্যান্ডে ১৫৬ জন আর সর্বমোট  ভারতে আছেন ২২৮,২৮১ ও মায়ানমারে আছেন ৪৩,১০০ জন ( প্রায় ) এবং ২০২২ সাল মোতাবেক বাংলাদেশে আছেন ৪৮৩,২৯৯ জন এবং চাকমা জনগণের উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা উল্লেখিত স্থানেই বিদ্যমান । তাছাড়া  প্রবাসে চাকমা সম্প্রদায়ের লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন যা  বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ,  কানাডা ,  যুক্তরাজ্য ,  ফ্রান্স ,  অস্ট্রেলিয়া ও জাপান সহ বিশ্বের অনেক দেশেই রয়েছেন। তাছাড়া চাকমারা মঙ্গোলীয় নৃগোষ্ঠীর একটি শাখা ও নৃতাত্ত্বিক বিচারে চাকমারা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য কিছু নৃগোষ্ঠীর সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য রয়েছে ও মঙ্গোলীয় নৃগোষ্ঠী বলতে পূর্ব ও উত্তরপূর্ব এশিয়ার এমন একটি বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়ে থাকে যারা মঙ্গোলিক ভাষায় কথা বলেন ও  একটি অভিন্ন পূর্বপুরুষ থেকে এসেছেন ও এরা সাধারণত চওড়া মুখ ,  বাদামী কালো চামড়া এবং লম্বা কানযুক্ত হয়ে থাকেন ও এই জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম অংশ মঙ্গোল এবং তারা মঙ্গোলিয়া ও চীনের অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়া অঞ্চলে বাস করে থাকেন , কিন্তু  যুদ্ধ ও অভিবাসনের কারণে তারা মধ্য এশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছেন আর বাংলাদেশে চাকমা ,  মারমা ,  ত্রিপুরা , খাসি ,  গারো , মণিপুরি ও রাখাইন সহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত আর নৃগোষ্ঠীর মূল বৈশিষ্ট্য হলো সাধারণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যেখানে নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি ,  ঐতিহ্য , পোশাক ,  ভাষা ,  ধর্ম এবং রীতিনীতি ভাগ করে নেন এবং একাত্মতার অনুভূতি যেখানে তারা একটি সাধারণ পরিচয়ের ভিত্তিতে একত্রিত থাকেন ও নিজেদের মধ্যে একটি সামাজিক ঐক্য অনুভব করেন এবং নিজস্ব পরিচিতি যেখানে 

এই গোষ্ঠীগুলো একটি বৃহৎ সমাজের অংশ হলেও নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে থাকেন ও অন্য গোষ্ঠী থেকে নিজেদের আলাদা মনে করেন এবং 

 ভাষাগত বন্ধন যেখানে অনেক ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ভাষা তাদের একত্রিত হওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকে এবং সাধারণ পূর্বপুরুষ ও বংশ যেখানে একটি নির্দিষ্ট পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত হওয়ার ধারণা এবং বংশগত সম্পর্ক একটি নৃগোষ্ঠীর অংশ হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বলা হয়ে থাকে আর সর্বোপরি নৃগোষ্ঠীর মূল বৈশিষ্ট্য হলো তাদের  সামাজিক অভিজ্ঞতা ও অভিন্ন কিছু বৈশিষ্ট্য যা তাদেরকে অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে আলাদা করে তোলে ও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে সাধারণ পূর্বপুরুষ ,  ঐতিহ্য , সংস্কৃতি , ভাষা , ধর্ম , নিজস্ব সামাজিক রীতিনীতি , পোশাক ,  খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রা আর এই বৈশিষ্ট্যগুলো বংশ পরম্পরায় সঞ্চালিত হয়ে থাকে এবং নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে একাত্মতার অনুভূতি তৈরি করে থাকে ও নৃগোষ্ঠী বলতে এমন একটি মানব সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়ে থাকে যাদের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট ও অভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান যা তাদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় প্রদান করে থাকে ও তাদের নিজেদের মধ্যে একাত্মতা তৈরি করে থাকে । মঙ্গোলীয় বলতে মঙ্গোলিয়া ও চীন এবং রাশিয়ার বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে বোঝায় যারা মঙ্গোলিক ভাষায় কথা বলেন এবং যাদের পূর্বপুরুষরা প্রোটোমঙ্গোল নামে পরিচিত আর ঐতিহাসিক ও আধুনিক উভয় প্রেক্ষাপটেই  মঙ্গোল শব্দটি ব্যবহৃত হয় যেখানে আধুনিক মঙ্গোলিয়া দেশের নাগরিক ও সেই দেশ ও তার আশেপাশের অঞ্চলের আদিবাসীদেরও বোঝায় এবং তাছাড়া মঙ্গোলীয়দের পরিচয়ের মধ্যে আছে তারা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী যেখানে মঙ্গোলীয়রা পূর্ব এশিয়া ,  উত্তর এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের অনেক মঙ্গোলিক ভাষাভাষী জাতিগোষ্ঠীর একটি সংগ্রহ এবং 

পূর্বপুরুষ যেখানে এদের পূর্বপুরুষদের প্রোটোমঙ্গোল হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে এবং ভাষাগত পরিচয় যেখানে এরা মঙ্গোলিক ভাষায় কথা বলে থাকেন । পাশাপাশি মঙ্গোলীয়দের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কথা বললে বলতে হয় তারা যাযাবর জাতি যেখানে 

ঐতিহাসিকভাবে মঙ্গোলরা ছিলেন ইউরেশিয়ার অনেক যাযাবর জাতির একটি অংশ এবং মঙ্গোল সাম্রাজ্য যেখানে চেঙ্গিস খানের অধীনে তারা একটি বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম বিধ্বংসী সাম্রাজ্য ছিল আর তাছাড়া মঙ্গোলীয়দের বর্তমান প্রেক্ষাপটের কথা বললে বলতে হবে মঙ্গোলিয়া তথা বর্তমান মঙ্গোলিয়া দেশের নাগরিক ও মঙ্গোলিয়ার ভূমির আদিবাসীদের মঙ্গোল বলা হয়ে থাকে এবং ভৌগলিক বিস্তার যেখানে 

বর্তমানে এরা মঙ্গোলিয়া ছাড়াও চীন ও রাশিয়ার বিভিন্ন স্থানে বসবাস করে থাকেন । পাশাপাশি আরেকটি বিষয় তুলে ধরি প্রোটোমঙ্গোলরা এমন একটি অঞ্চল থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন যেখানে 

৪৫ , ০০০ বছর আগে উচ্চ প্যালিওলিথিক সময় মানুষ বসবাস করেছিলেন আর সেখানকার লোকেরা ব্রোঞ্জ ও লৌহ যুগের মধ্য দিয়ে গেছেন ও উপজাতীয় জোট গঠন করেছেন ও মানুষ তৈরি করেছেন ও কেন্দ্রীয় সমভূমিতে প্রাথমিক রাজনীতির সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছেন ।  উচ্চ প্যালিওলিথিক যুগ ছিল প্যালিওলিথিক যুগের একটি বিশেষ পর্যায়  যা প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৪০,০০০ বছর আগে থেকে শুরু হয়ে ১০,০০০ বছর আগে শেষ হয় ও এই সময়ে আধুনিক মানুষের বিস্তার ঘটে ও উন্নত পাথরের সরঞ্জাম এবং গুহাচিত্র ও হাড়ের তৈরি শিল্পকলা তৈরি করা হয়ে থাকে , সর্বোপরি বলা হয়ে থাকে চাকমারা মঙ্গোলীয় নৃগোষ্ঠীর একটি শাখা এবং চাকমা  জনগণ  ভারতীয় উপমহাদেশ ও  পশ্চিম মায়ানমারের একটি জাতিগত গোষ্ঠী ও জাতি ও তারা দক্ষিণপূর্ব বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বৃহত্তম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী  । 

    ‌‌ চাকমা ভাষা ইন্দোইউরোপীয় ভাষা পরিবারের ইন্দোইরানী ভাষার শাখার একটি পূর্ব ইন্দোআর্য ভাষা ও যার বক্তারা চাকমা বা দাইংনেট জনগণ নামে পরিচিত ও Daingnet জনগণ  যারা Thetkama জনগণ  নামেও পরিচিত ও তারা মায়ানমারের উত্তর রাখাইন রাজ্যের আদিবাসী একটি জাতিগত গোষ্ঠী ।  চাকমা ভাষার উপভাষা হলো তঞ্চাঙ্গ্যা এবং ডেইংনেট আর Daingnet ও চাকমা জনগণের ভাষা পারস্পরিকভাবে বোধগম্য ও দাইংনেট জনগণ ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে একটি যাদের মায়ানমার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে মায়ানমারের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন ও দাইংনেটরা তিব্বতি বর্মণ উপজাতিদের মধ্যে একটি এবং বংশগতভাবে তারা তিব্বতি এবং বর্মণ ও রাখাইনদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত এবং তাদের উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা সহ অঞ্চলগুলো  মায়ানমার ( রাখাইন রাজ্য ) এবং তাদের সম্পর্কিত জাতিগত গোষ্ঠী হলেন চাকমা , বর্মী , রাখাইন ও মারমা আর তাদের ভাষাসমূহ চাকমা  ও বার্মিজ এবং ধর্ম হলো থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম । মূলত দাইংনেটরা নিজেদেরকে দাইংনেট বলেন না ,  বরং তারা বাংলাদেশ এবং উত্তরপূর্ব ভারতের নিকটবর্তী চাকমা জনগণের মতো নিজেদের থাইখমা বলেন ও তাদের ভাষা তানচ্যাংগ্যা ( দাইংগ্যা গোজা ও তানচ্যাংগ্যার উপগোষ্ঠী) এর সাথে মিল রয়েছে আর দাইংনেট শব্দটি মূলত রাখাইনদের দ্বারা ব্যবহৃত একটি প্রতিশব্দ আর রাখাইন ভাষায়  দাইংনেটের অর্থ হলো ঢাল যোদ্ধা  বা সাঁজোয়া যোদ্ধা । বস্তুত Daingnet জনগণ চেহারার দিক থেকে তারা রাখাইনদের থেকে আলাদা নন ,  তবে Daingnet জনগণের একটি স্বতন্ত্র ভাষা এবং সংস্কৃতি রয়েছে আর রাখাইন জনগণ বা রাখাইন ( বর্মী এবং রাখাইন ) বা আরাকানিজ হলেন মায়ানমার (বার্মা) এর একটি দক্ষিণপূর্ব এশীয় জাতিগত গোষ্ঠী যারা বর্তমান রাখাইন রাজ্যের (পূর্বে আরাকান নামে পরিচিত ) উপকূলীয় অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ । অপরদিকে  তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা  পার্বত্য চট্টগ্রাম , মিজোরাম , ত্রিপুরা এবং রাখাইন রাজ্যে কথিত এগারোটি আদিবাসী ভাষার মধ্যে একটি ও এটি একটি তিব্বতি বর্মণ ভাষা বলে প্রচলিত বিশ্বাস সত্ত্বেও , এটি একটি ইন্দোআর্য ভাষা হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়ে থাকে এবং এটি চাকমা ও চট্টগ্রামের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত আর এটি মূলত তঞ্চঙ্গ্যাদের দ্বারা কথিত । তঞ্চঙ্গ্যা মানুষ বা তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী  বা তঞ্চঙ্গ্যা  হলেন চিনউইন উপত্যকা বংশোদ্ভূত একটি জাতিগত গোষ্ঠী যারা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম  ,  ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্য এবং মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাস করে থাকেন আর  চিনউইন উপত্যকা যেটিকে বলা হয়ে থাকে চিন রাজ্য যা পশ্চিম মায়ানমারের একটি রাজ্য । তাছাড়া তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর সম্পর্কিত জাতিগত গোষ্ঠী হলেন 

চাকমা , ডাইংনেট , চাক , রাখাইন , বার্মার  বার্মিজ  ও তারা মূলত বৌদ্ধধর্ম  ও খ্রিস্টধর্ম পালন করে থাকেন এবং  ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুসারে বাংলাদেশে ৪৫,৯৭২ জন তঞ্চঙ্গ্যা রয়েছেন  ।  তাছাড়া তঞ্চঙ্গ্যার উৎপত্তি ও বিকাশ এবং বর্তমান সম্পর্কে তঞ্চঙ্গ্যার কোনও ইতিহাস প্রকাশিত হয়নি , কিন্তু চাকমা জাতির ইতিহাসে  তঞ্চঙ্গ্যাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস দেখতে পাওয়া যায় এবং অনুমানমূলক তথ্যের ভিত্তিতে তঞ্চঙ্গ্যাদের চাকমা জাতির একটি শাখা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে এবং চাকমারাও তঞ্চঙ্গ্যাদের চাকমাদের একটি শাখা হিসেবে স্বীকৃতি দেন  এবং এমনকি চাকমারাও তঞ্চঙ্গ্যাকে আদি চাকমা বলে দাবি করে থাকেন , কিন্তু চাকমাদের গোজা গোষ্ঠীর সাথে তঞ্চঙ্গ্যাদের বারোটি গোজা গোষ্ঠীর নামের মধ্যে কোনও মিল বিদ্যমান নেই বলা যায় আর তাদের লেখার পদ্ধতি তঞ্চাঙ্গ্যা বর্ণমালা যা  কাপাত নামেও পরিচিত , সর্বোপরি যেটি দেখতে পাওয়া যায় চাকমা ভাষার উপভাষা হলো তঞ্চাঙ্গ্যা এবং ডেইংনেট । বস্তত উপভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো আঞ্চলিকতা যেখানে এটি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা এলাকার মানুষের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং 

অনন্য বৈশিষ্ট্য যেখানে উপভাষার নিজস্ব শব্দভাণ্ডার ও উচ্চারণ এবং ব্যাকরণগত গঠন থাকে এবং প্রমিত ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত যেখানে উপভাষা সাধারণত একটি প্রমিত ভাষারই ভিন্ন রূপ যা মূল ভাষার সঙ্গে মিল রেখেও নিজস্ব পরিচয় বহন করে থাকে এবং 

সৃষ্টির কারণ হলো ভৌগোলিক দূরত্ব , যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব , অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক ও ধর্মীয় কারণে উপভাষার সৃষ্টি হয়ে থাকে আর প্রমিত ভাষা হলো কোনো ভাষার একটি আদর্শ ও মানসম্মত রূপ যা একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করে এবং সর্বজনীন যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং এটি আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষার সীমাবদ্ধতা দূর করে যাতে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ সহজে একে অপরের কথা বুঝতে পারেন এবং একটি অভিন্ন ভাব বিনিময়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়ে থাকে বলা যায় । পাশাপাশি উপভাষা  কোনো প্রমিত ভাষার (standard language) সাথে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর দ্বারা প্রচলিত কথ্য ভাষার একটি রূপ যার নিজস্ব শব্দভাণ্ডার , উচ্চারণ  ও ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য থাকে আর পৃথিবীর সব অঞ্চলের ভাষাতেই উপভাষা প্রচলিত যা ভৌগোলিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক কারণে তৈরি হয় এবং প্রমিত ভাষার সাথে ধ্বনি ,  রূপমূল ও ব্যাকরণগত কাঠামোর দিক থেকে কিছুটা ভিন্ন হয় এবং উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে 

বাংলা উপভাষা যেখানে বাংলাদেশের পূর্ববঙ্গীয় অঞ্চলের মানুষেরা যে উপভাষায় কথা বলেন তাকে বাঙ্গালী উপভাষা বলা হয়ে থাকে যা বাংলা ভাষার একটি উপভাষা এবং একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অংশে প্রচলিত রাঢ়ি উপভাষা বাংলা ভাষার একটি উল্লেখযোগ্য উপভাষা ও উপভাষা  একটি ভাষার স্বাভাবিক ও জীবনধর্মী রূপ যা সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করে থাকেন । পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণপূর্বাঞ্চল  কলকাতা ও এর আশেপাশে এবং বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিম অঞ্চল কুষ্টিয়া অঞ্চলে রাঢ়ী উপভাষার ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়।‌ রাঢ়ী উপভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কেন্দ্রীয় বাংলা যেখান কেন্দ্রীয় বাংলা উপভাষার একটি অংশ যা বাংলা ভাষার আদর্শ বা প্রমিত রূপের ভিত্তি ও এই উপভাষার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অভিশ্রুতি ও স্বরসংগতি । 

অভিশ্রুতি (Umlaut)  এটি তখন ঘটে যখন বিপর্যস্ত স্বরধ্বনি পূর্ববর্তী স্বরধ্বনির সাথে মিলে যায় ও পরবর্তী স্বরধ্বনির পরিবর্তন ঘটায় উদাহরণ হিসেবে বলা যায় 

করিয়া > (অপিনিহিতির প্রভাবে) কইরা > (অভিশ্রুতির ফলে) করে ,  মানিয়া > (অপিনিহিতির প্রভাবে) মাইন্যা > (অভিশ্রুতির ফলে) মেনে , খুঁড়িয়া > (অপিনিহিতির প্রভাবে) খুইড়্যা > (অভিশ্রুতির ফলে) খুঁড়ে  ,  তাছাড়া 

অপিনিহিতির ( Epenthesis ) প্রধান প্রভাব হলো শব্দের মধ্যে ই বা উ ধ্বনির স্থান পরিবর্তন এবং এর ফলে পরবর্তী ধাপে অভিশ্রুতি নামক অন্য একটি ধ্বনি পরিবর্তনের সৃষ্টি হওয়া ও এর ফলে শব্দে পরিবর্তন আসে ও  এটি মূলত বাংলা উপভাষার একটি ধ্বনিতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া।  স্বরসংগতি হলো একটি শব্দের কোনো একটি স্বরধ্বনির প্রভাবে ওই শব্দেই অবস্থিত অন্য স্বরধ্বনির পরিবর্তন ঘটলে উদাহরণস্বরূপ দেশি থেকে দিশি ,  বিলাতি থেকে বিলিতি ,  মুলা থেকে মুলো , অর্থাৎ প্রথম স্বরধ্বনির প্রভাবে দ্বিতীয় বা শেষ স্বরধ্বনির পরিবর্তন হয় যা স্বরসংগতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলা যায় এবং স্বরসংগতি বাংলা ব্যাকরণের একটি ধ্বনি পরিবর্তন প্রক্রিয়া ও এখানে একটি স্বরধ্বনির প্রভাবে একই শব্দের মধ্যে থাকা অন্য স্বরধ্বনি পরিবর্তিত হয় , সুতরাং রাঢ়ী উপভাষা এবং এই উপভাষার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অভিশ্রুতি ও স্বরসংগতি ( Consonance ) । পাশাপাশি এটিও বলা প্রয়োজন উপভাষা ও স্থানীয় ভাষার মধ্যে পার্থক্য হলো উপভাষা এটি একটি ভাষার একটি আঞ্চলিক বা সামাজিক রূপ ও এর নিজস্ব স্বতন্ত্র শব্দভাণ্ডার , ব্যাকরণ এবং উচ্চারণ থাকে ও একটি ভাষার অনেক উপভাষা থাকতে পারে , অপরদিকে স্থানীয় ভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা এটি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন কথোপকথনে ব্যবহৃত ভাষা এবং এটি উপভাষারই একটি রূপ যা একটি অঞ্চলের ভৌগোলিক ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তৈরি হয়ে থাকে এবং উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে বাংলা ভাষার একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রচলিত রূপকে আমরা বাংলা উপভাষা বলতে পারি হতে পারে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন রাজশাহী , সিলেট ,  চাটগাঁয় ( চট্টগ্রাম) প্রচলিত ভাষাগুলো বাংলা ভাষার বিভিন্ন উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা । কিন্তু উপভাষা এবং স্থানীয় ভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা  এক নয় , তবে এরা সম্পর্কিত ।   চাকমা ভাষা  এটি চাটগাঁইয়া ভাষার সাথে পারস্পরিকভাবে বোধগম্য  আর চট্টগ্রামীয় বাংলা বা  চাটগাঁইয়া ভাষা অথবা চিটাইঙ্গা একটি ইন্দোআর্য ভাষা যা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু অংশে কথিত আর চাটগাঁইয়া ভাষা ও চাকমা ভাষার মধ্যে সাদৃশ্যের প্রধান কারণ হলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগের ফলে চাকমা ভাষার উপর চাটগাঁইয়া ভাষার (বাংলা ভাষার একটি উপভাষা) ব্যাপক প্রভাব পড়ে ও মূল চাকমা ভাষা তিব্বতি বর্মণ ভাষা পরিবারের অন্তর্গত হলেও  বাংলা ভাষার প্রভাবের কারণে এর শব্দভাণ্ডার এবং ধ্বনিতত্ত্ব ও শব্দার্থিক কাঠামোতে অনেক মিল দেখতে পাওয়া যায় ।  তাছাড়া ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সান্নিধ্য যেখানে চাকমারা ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করলেও  তাদের একটি বড় অংশ  চাটগাঁইয়া ভাষাভাষীরা চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাশাপাশি অবস্থান করার কারণে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছে এবং বাংলা ভাষার প্রভাব যেখানে চাকমা ভাষার উপর বাংলা ভাষার প্রভাব এতটাই গভীর যে অনেক ভাষাবিদ একে পূর্ব ইন্দোআর্য ভাষা পরিবারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন ।  বাংলা ভাষার অনেক ধ্বনি চাকমা ভাষায়ও দেখতে পাওয়া যায় এবং সাংস্কৃতিক আদান প্রদান যেখানে প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের ভাষার শব্দ‌ ,  বাগধারা এবং অন্যান্য ভাষাগত উপাদান গ্রহণ করার ফলে উভয় ভাষার মধ্যে সাদৃশ্য তৈরি হয় ও এই মিথস্ক্রিয়ার ফলে চাকমা ভাষা মূল তিব্বতি বর্মণ ভাষার বৈশিষ্ট্য ধরে রাখলেও তা চাটগাঁইয়া ভাষার দ্বারা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হয় যেখানে অনেক শব্দ এবং শব্দার্থিক গঠনে  চাটগাঁইয়া ভাষার সঙ্গে চাকমা ভাষার মিল দেখতে পাবেন আর চাকমা ভাষার লেখার পদ্ধতি হলো চাকমা লিপি ও তঞ্চঙ্গ্যা বর্ণমালা ।  মূলত

চাকমা জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে হিমালয়ের পাদদেশে বসতি স্থাপনকারী একটি মঙ্গোলীয় গোষ্ঠী (

Mongoloid ) যারা তিব্বতি সম্পর্কিত ভাষায় কথা বলতেন , কিন্তু ধীরে ধীরে আর্য শব্দভাণ্ডারকেও অন্তর্ভুক্ত করেন ও প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের সাথে সাংস্কৃতিক আদান প্রদানের মাধ্যমে ইন্দোআর্য ও আরাকানিজ শব্দ দুটোই গ্রহণ করা হয় ।  গবেষণা থেকে জানা যায় যে চাকমা ভাষাটি মূলত তিব্বতি বর্মণ ভাষা ছিল , কিন্তু পরবর্তীতে এটি একটি ভারতীয় ভাষায় রূপান্তরিত হয় আর এর থেকে বোঝা যায় যে প্রাচীনকাল থেকেই চাকমারা ভারতীয় উপমহাদেশে বিদ্যমান । পাশাপাশি  চাকমা ভাষায় প্রচুর শব্দভাণ্ডার ব্যবহৃত হয়ে থাকে যা ইন্দোআর্য বা তিব্বতি বর্মণ ভাষাগত গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত নয়  যা সম্ভবত তাদের পূর্বপুরুষের ভাষা থেকে উদ্ভূত ও চাকমাদের পূর্বপুরুষেরা একটি নির্দিষ্ট একক ভাষা না থাকলেও  তাদের ভাষার বিবর্তনে তিব্বতবর্মীয় এবং ইন্দোআর্য ভাষার মিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায় , তাছাড়া কিছু গবেষণায় দেখা যায় চাকমা ভাষার মূল শব্দগুলো তিব্বতবর্মীয় ভাষার সাথে সম্পর্কিত হতে পারে যা বোঝায় যে তাদের পূর্বপুরুষেরা একসময় এই ভাষা গোষ্ঠীভুক্ত ছিলেন ।  ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে  চাকমাদের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য না থাকলেও ভাষাগত গবেষণায় দেখা যায় যে তারা সম্ভবত মগধ অঞ্চল থেকে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় স্থানান্তরিত হয়েছিলেন যা তাদের ভাষায় ভারতীয় আর্য প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করে ও সময়ের সাথে সাথে চাকমা ভাষা ভারতীয় আর্য বা ইন্দোআর্য ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হয় ,  সর্বোপরি বলা যায় চাকমাদের পূর্বপুরুষের ভাষার সম্ভাব্য হলো তিব্বতবর্মীয় উৎস ও 

আর্য ভাষায় রূপান্তর এবং পাশাপাশি দ্বৈত প্রভাব ।  

     বস্তুত সংস্পর্শ সম্পর্কের মাধ্যমে ভাষা প্রবাহিত হয় প্রধানত ভাষার যোগাযোগ ও মিশ্রণের মাধ্যমে যেখানে ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ঘটে আর যার ফলে একটি ভাষা অন্য ভাষার উপর প্রভাব ফেলে ও শব্দ বা ব্যাকরণ বা শব্দভান্ডারের আদান প্রদান ঘটে থাকে ও এটি মূলত বাণিজ্যিক অথবা সামাজিক বা রাজনৈতিক কারণে হতে পারে যার ফলে একটি ভাষার শব্দ অন্য ভাষার শব্দভান্ডারে প্রবেশ করে আর ভাষাকে সমৃদ্ধ করে বা কখনও কখনও একটি ভাষা বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যায় । সংস্পর্শ সম্পর্কের মাধ্যমে ভাষা প্রবাহের প্রক্রিয়া ও শব্দ এবং শব্দভান্ডারের আদান প্রদান যেখানে যখন বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ একসঙ্গে কাজ করেন বা বসবাস করেন তখন তারা একে অপরের ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করে থাকেন যেখানে মধ্যযুগে মুসলিম শাসনের সময় বাংলা ভাষায় অনেক তুর্কি ,  আরবি ও ফারসি শব্দ প্রবেশ করে এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজি শব্দও প্রবেশ করে এবং ব্যাকরণ ও কাঠামোর প্রভাব যেখানে শুধু শব্দ নয় , বরং একটি ভাষা অন্য ভাষার ব্যাকরণ বা বাক্য গঠনেও প্রভাব ফেলতে পারে এবং যোগাযোগের মাধ্যম যেখানে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ভাষা ব্যবহৃত হয়ে থাকে ও এই যোগাযোগের ফলে একে অপরের ভাষার সংস্পর্শ ঘটে এবং উপনিবেশিকতার প্রভাব যেখানে ঔপনিবেশিক শাসকরা তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং যার ফলে স্থানীয় ভাষাগুলো তাদের ভাষা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে ও তাদের শব্দভাণ্ডারে বহু বিদেশী শব্দ যুক্ত হয় এবং বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক আদান প্রদান যেখানে প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ব্যবসাবাণিজ্য বা সাংস্কৃতিক আদান প্রদানের মাধ্যমে একে অপরের সংস্পর্শে এসেছেন যা ভাষার বিকাশে সাহায্য করেছে বলা যায় এবং ভাষার ভৌগোলিক বিস্তার যেখানে ভাষাগত ভূগোল বা উপভাষা ভূগোল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেখায় কীভাবে প্রাকৃতিক বাধা ( পর্বত বা নদী) ভাষাগত বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে এবং কীভাবে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষা সময়ের সাথে সাথে ভৌগোলিকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে আর এইসবগুলোই সংস্পর্শ সম্পর্কের মাধ্যমে ভাষা প্রবাহের উপাদান বলা যায় ।  আবার এটিও ঠিক সংস্পর্শ সম্পর্কের মাধ্যমে  ভাষা বিলুপ্তি বা মিশ্রণ ঘটে আর যখন কোনো একটি ভাষার সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রতিপত্তি অন্য ভাষার চেয়ে বেশি হয় তখন উচ্চ সামাজিক মর্যাদার ভাষাটি নিম্ন সামাজিক মর্যাদার ভাষাটিকে প্রতিস্থাপন করতে পারে ও এটি ভাষার মিশ্রণ বা বিলুপ্তির দিকে পরিচালিত করতে পারে ।  আবার  চাকমা ভাষার শব্দভাণ্ডারের একটি বড় অংশ থেকে দেখতে পাওয়া যায় চাকমা ভাষা প্রাচীনতম রূপটি ইন্দোআর্য এবং তিব্বতিবর্মণ দুই ভাষা থেকে ভাগ ছিল বলে মনে হয়  যা দুই ভাষাগত শব্দের সাথে খুব বেশি দৃশ্যমান নয় ও এটি ইঙ্গিত দেয় যে পরবর্তী প্রভাবগুলো এর বিকাশকে রূপ দেওয়ার আগে প্রাথমিক চাকমারা একটি বিচ্ছিন্ন বা কম প্রমাণিত ভাষাগত বংশের অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারেন ।  বস্তুত ঐতিহাসিক অভিবাসনের ধরণ থেকে জানা যায় যে চাকমা জনগণ সম্ভবত পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপনের আগে মগধ (আধুনিক বিহার ভারত) থেকে আরাকানে (রাখাইন রাজ্য মায়ানমার) চলে এসেছিলেন ও এই যাত্রার সময় তাদের ভাষা পালি এবং সংস্কৃতের উপাদানগুলোর মুখোমুখি হয়েছিলেন ও তাদের আত্মীকরণ করেছিলেন যা বিশেষ করে ধর্মীয় ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে আর একই সময়ে বার্মিজ ও আরাকানি ভাষাভাষীদের সাথে মিথস্ক্রিয়ার ফলে ধ্বনিগত ও কাঠামোগত অভিযোজন শুরু হয়েছিল ,  যদিও মূল শব্দভাণ্ডারটি স্বতন্ত্র ছিল ।  বস্তুত 

প্রাচীন ভাষার শব্দগুলোর রূপান্তর ঘটে কারণ ভাষা একটি পরিবর্তনশীল সত্তা যা ভৌগোলিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বিভিন্ন কারণ দ্বারা প্রভাবিত হয় আর যোগাযোগ ,  অভিবাসন ,  প্রযুক্তি , উদ্ভাবন ,  উচ্চারণগত আরাম ও বিবর্তনের মতো বিষয়গুলো শব্দভান্ডার ,  ধ্বনি এবং ব্যাকরণগত কাঠামোকে পরিবর্তন করে যার ফলে সময়ের সাথে সাথে শব্দের রূপ বদলে যায় আর সংস্কৃত ও মাঘদি প্রাকৃত এবং পালির সাথে চাকমা ভাষার মিল লক্ষ্য করা যায় আর যেখান থেকে আমরা বুঝতে পারি এটি একটি ধ্রুপদী ভাষা ।  ধ্রুপদী ভাষাগুলো সাধারণত বিলুপ্ত প্রায় ভাষা ও একটি বিলুপ্ত ভাষা বা মৃত ভাষা হলো এমন একটি ভাষা যেখানে কোনও জীবিত স্থানীয় ভাষাভাষী নেই । আবার একটি সুপ্ত ভাষা হলো একটি মৃত ভাষা যা এখনও একটি জাতিগত গোষ্ঠীর জাতিগত পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে কাজ করে থাকে এবং এই ভাষাগুলো প্রায়শই পুনরুজ্জীবনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় । তাছাড়া একটি ধ্রুপদী ভাষা হলো এমন যেকোনো ভাষা যার একটি স্বাধীন সাহিত্যিক ঐতিহ্য ও প্রাচীন লিখিত সাহিত্যের একটি বিশাল অংশ রয়েছে আর সংস্কৃত  হলো ইন্দোইউরোপীয় ভাষার ইন্দোআর্য শাখার অন্তর্গত একটি ধ্রুপদী ভাষা এবং প্রাকৃত  হলো স্থানীয় ধ্রুপদী মধ্য ইন্দোআর্য ভাষার একটি দল যা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ৫ ম শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১২শ শতাব্দী পর্যন্ত ব্যবহৃত হতো আর মাগধী প্রাকৃত ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে প্রচলিত একটি মধ্য ইন্দোআর্য ভাষা যা প্রাচীন মগধ অঞ্চলের ভাষা ছিল এবং পরবর্তীকালে বাংলা ,  অসমীয়া ,  ওড়িয়া , ভোজপুরী ও মৈথিলি ভাষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ও এটি পালি ভাষার পরবর্তী একটি আঞ্চলিক ভাষা ছিল ও কিছু প্রাচীন বৌদ্ধ ও জৈন নাটক এবং সংলাপে ব্যবহৃত হতো ও মাগধী প্রাকৃত প্রাচীন মগধ অঞ্চলে (অধুনা পূর্ব ভারত‌ ও বাংলাদেশ ও নেপাল) প্রচলিত ছিল ও এটি সংস্কৃত থেকে বিকশিত একটি মধ্য ইন্দোআর্য ভাষা ছিল‌ যা পালি ভাষার পতনের পর প্রচলিত হয় ও এটি ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের ভাষাগুলোর আদি রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে এবং পালি  ভারতীয় উপমহাদেশের একটি ধ্রুপদী মধ্য ইন্দোআর্য ভাষা । 

তাছাড়া চাকমা ভাষায় কথা বলেন এমন মানুষ প্রায় ১০ লক্ষ ভাষাভাষী রয়েছেন আর যার  মধ্যে  ৬০% বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে ও ৩৫ % ভারতের অরুণাচল প্রদেশ , আসাম , মিজোরাম এবং ত্রিপুরা জুড়ে ও বাকি ৫%  মায়ানমারে বাস করে  থাকেন আর 

চাকমা ভাষা দক্ষিণ এশীয় চাকমা জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ও এটির ভাষা পরিবার হলো ইন্দোইউরোপীয় > ইন্দোইরানীয় > ইন্দোআর্য > 

পূর্ব দল > বাংলা–অসমীয় > চাকমা ।   বস্তুত ভাষা পরিবার হলো পূর্বপুরুষ যেখানে ভাষা পরিবারের মূল ধারণা হলো একটি সাধারণ আদিভাষা থেকে বিভিন্ন ভাষার উদ্ভব ঘটে এবং বৈশিষ্ট্যের মিল যেখানে একটি পরিবারভুক্ত ভাষাগুলোর মধ্যে শব্দভাণ্ডার ও ব্যাকরণের দিক থেকে যথেষ্ট মিল দেখা যায় এবং প্রকারভেদ যেখানে বিশ্বজুড়ে অনেকগুলো ভাষা পরিবার বিদ্যমান হতে পারে ইন্দো-ইউরোপীয় ,  আফ্রোএশীয় বা জার্মানিক ভাষা অথবা দ্রাবিড় ভাষা পরিবার বা সিনোতিব্বতি ভাষা পরিবার আর 

একটি ভাষা পরিবার একটি প্রোটোভাষা থেকে উদ্ভূত হয়ে থাকে যা সময়ের সাথে সাথে ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে বিভিন্ন ভাষা উপভাষায় বিভক্ত হয়ে স্বতন্ত্র ভাষায় পরিণত হয় ও এই ভাষাগুলো জিনগতভাবে সম্পর্কিত এবং এদের মধ্যে সাধারণ ব্যাকরণগত ও শব্দার্থিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায় আর 

প্রতিটি ভাষা পরিবারে অনেক ভাষা অন্তর্ভুক্ত থাকে  যা সময়ের সাথে সাথে বিকশিত হয় ও আনুমানিক 

পৃথিবীতে প্রায় ১০০টির‌ও  বেশি ভাষা পরিবার বিদ্যমান ।   কিন্তু এই সংখ্যাটি প্রায়শই পরিবর্তিত হয়ে থাকে ও এটির কারণ হলো ভাষা বিজ্ঞানীরা নতুন ভাষা পরিবারের সন্ধান পান বা বিদ্যমান ভাষাগুলোকে নতুনভাবে শ্রেণীবদ্ধ করেন ও প্রতিটি ভাষা পরিবার একই আদিভাষা থেকে উদ্ভূত এবং বংশগতভাবে সম্পর্কিত ভাষাগুলো নিয়ে গঠিত হয় ও আদি ভাষা হলো একটি সাধারণ পূর্বসূরি ভাষা (প্রোটোভাষা) যা থেকে একটি ভাষা পরিবার বা ভাষাগোষ্ঠীর উৎপত্তি হয় এবং অন্যভাবে বললে আদি ভাষা হলো এমন একটি ভাষা যা থেকে সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন নতুন ভাষার জন্ম হয়ে থাকে এবং 

আদি ভাষা থেকে উদ্ভূত ভাষাগুলোই একটি ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে ও ভাষাবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ভাষার মধ্যে মিল খুঁজে বের করার মাধ্যমে এই আদি ভাষার ধারণা তৈরি করেন এবং প্রমাণ করেন যে বিভিন্ন ভাষা একটি সাধারণ উৎস থেকে আগত ও উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ইন্দোইউরোপীয় ভাষা এটি এমন একটি ভাষা পরিবার যার আদি উৎস থেকে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, জার্মানসহ অনেক ভাষার উদ্ভব হয়েছে ও এই ভাষা পরিবারটি বর্তমান ইউরোপ ও ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক ভাষার একটি সাধারণ উৎস যা থেকে এই ভাষাগুলোর বিবর্তন ঘটেছে ।  কিন্তু আদি ভাষার নির্দিষ্ট সময়কাল বলা সম্ভব নয় , তার কারণ হলো এটি মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসের একটি অংশ এবং ভাষার পরিবর্তনের জন্য এর নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই ,  তবে  প্রোটো- ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা (যা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর সাধারণ পূর্বপুরুষ) আনুমানিক ৪০০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রচলিত ছিল বলে ধারণা করা হয়ে থাকে এবং আদি ভাষার ধারণা বললে বলতে হয় এটি অনির্দিষ্ট উৎস যেখানে ভাষার উৎপত্তি বা গ্লটোগনি একটি জটিল বিষয় যার উপর নির্ভরযোগ্য তথ্য খুব কম ।  গ্লটোগনি (Glottogony) বলতে ভাষার উৎপত্তি বা ভাষার জন্ম সংক্রান্ত ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনাকে বোঝানো হয়ে থাকে এবং এটি ভাষার উৎস এবং বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে যা বিশেষ করে কীভাবে মানুষের মধ্যে আকার ইঙ্গিতের নির্বাক বা প্রাকভাষা থেকে মৌখিক ভাষার জন্ম হয়েছিল ও 

এই ধারণাটি ভাষার উৎস (Origin of Language) এর সাথে সম্পর্কিত যা ভাষার সৃষ্টি ও বিবর্তনকে কেন্দ্র করে আলোচনা করে থাকে ,  যদিও ভাষার পরিবর্তনশীলতার জন্য এর প্রাচীন রূপ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন, কিন্তু গ্লটোগনি এই ধারণা নিয়ে কাজ করে যে মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে একসময় আকারইঙ্গিত থেকে একটি মৌখিক ভাষার উদ্ভব হয়েছিল । তাছাড়া আদি ভাষার ধারণায় প্রোটো-ভাষা বলতে একটি নির্দিষ্ট ভাষা পরিবারের মূল বা সাধারণ পূর্বপুরুষ ভাষাকে বোঝানো হয়ে থাকে এবং আবারো  বলা যায় উদাহরণস্বরূপ প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার সময়কাল প্রায় ৪০০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে ছিল বলে মনে করা হয়ে থাকে , সুতরাং আদি ভাষার একটি নির্দিষ্ট সময়কাল নেই ,  তবে প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার মতো কিছু প্রাচীন ভাষার সময়কাল সম্পর্কে ধারণা করা যায় আর ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের একটি অংশ হলো ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবার যার মধ্যে বাংলাসহ অনেক ভাষা অন্তর্ভুক্ত ।‌ সর্বোপরি বলা যায় ভাষা পরিবার হলো কতগুলো ভাষার সমষ্টি যারা একটি সাধারণ পূর্বপুরুষের ভাষা থেকে বংশগতভাবে উদ্ভূত ও এই ভাষাগুলো একটি গাছের মতো যেখানে আদি ভাষাটি মূল কাণ্ড এবং বিভিন্ন শাখা থেকে ভাষাগুলোর উৎপত্তি হয়েছে ও ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ভাষাগুলোর শব্দভাণ্ডার এবং ব্যাকরণে অনেক মিল থাকে আর সহজভাবে বলতে গেলে একটি ভাষা পরিবার হলো এমন কিছু ভাষার পরিবার যারা একটি সাধারণ উৎস থেকে এসেছে ঠিক যেমন একটি গাছের মূল কাণ্ড থেকে বিভিন্ন শাখা বের হয়ে থাকে আর ভাষা উদ্ভাবন ও ভাষার গঠন , প্রকৃতি এবং এর পরিবর্তন নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ভাষাবিজ্ঞান (Linguistics) বলে ।  ভাষাবিজ্ঞানীরা ভাষার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে থাকেন উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ভাষাতত্ত্ব (Linguistics) যেখানে ভাষাবিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত একটি ক্ষেত্র হিসাবেও দেখা হয় এবং এটি ভাষা অধ্যয়নের একটি পৃথক ক্ষেত্র ও ভাষাবিজ্ঞান (Linguistics) এই বিদ্যা ভাষার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করে থাকে যেখানে ভাষার উদ্ভব ও গঠন ও পরিবর্তন এবং কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা করা হয়ে থাকে । চাকমা ভাষা বা চাঙমা হধা বা চাঙ্মা ভাচ্ এটির লিখন পদ্ধতি হলো বাংলা লিপি ও চাকমা বর্ণমালা এবং 

অন্যান্য ভাষার সাথে ভাষাটির সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা চাটগাঁইয়া ও তঞ্চঙ্গ্যা এবং আরাকানি ও অন্যান্য । 

 তাছাড়া চাকমা ভাষার নিজস্ব বর্ণমালাকে চাকমা ভাষায় অজপাত বা অজাপাত বা অঝাপাত বলা হয়ে থাকে এবং এটি একটি শব্দীয় বর্ণমালা লিপি যা বর্তমানে পালি ভাষার জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় লেখার জন্যেও এই বর্ণমালার কিছুটা পরিবর্তিত রূপ ব্যবহৃত হয় ও বার্মিজ ভাষার বর্ণমালার সাথে এর যথেষ্ট মিল রয়েছে আর চাকমা বর্ণমালার 

লিপির ধরন হলো শব্দীয় বর্ণমালা লিপি । শব্দীয় বর্ণমালা লিপি হলো এমন লিপি পদ্ধতি যেখানে স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ আলাদা হয়ে থাকে  আর প্রতিটি অক্ষরের পরিচিতি তার স্বরের মূল্যের ভিত্তি হয় ও বর্ণমালা পরিচয়ে স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ আলাদা করে তালিকাভুক্ত করা থাকে , ঠিক বিপরীতে অশব্দীয় বর্ণমালা লিপি হলো এমন লিপি পদ্ধতি যেখানে স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ আলাদা হয়ে থাকে, কিন্তু প্রতিটি অক্ষরের পরিচিতি তার স্বর দিয়ে না হয়ে  বদলে তাদের পরিচিতি আলাদা নাম দিয়ে হয়ে থাকে । তাছাড়া আরো বললে বলা যায় অশব্দীয় বর্ণমালা লিপির 

মূল বৈশিষ্ট্য হলো পৃথক পরিচিতি যেখানে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে ও প্রতিটি অক্ষরের আলাদা নাম থাকে এবং অর্ধস্বরবর্ণের অনুপস্থিতি যেখানে এই ধরনের লিপিতে অর্ধস্বরবর্ণের ধারণা থাকে না এবং ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণ যেখানে 

ব্যঞ্জনবর্ণগুলো সহজাত স্বর (যেমন অ )  ছাড়াই উচ্চারিত হয়ে থাকে যা শব্দীয় বর্ণমালা লিপির (যেমন বাংলা) বিপরীত আর উদাহরণ হিসেবে বলা যায় 

রোমান লিপি বা লাতিন লিপি হলো অশব্দীয় বর্ণমালা লিপির একটি বহুল ব্যবহৃত উদাহরণ যা ইংরেজি ,  জার্মান ,  ফরাসি , স্প্যানিশ ইত্যাদি অনেক ইউরোপীয় ভাষা লিখতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে ।  সর্বোপরি বলা যায় 

অশব্দীয় বর্ণমালা লিপি এমন এক লিপি পদ্ধতি যেখানে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয় , কিন্তু প্রতিটি অক্ষরের পরিচিতি তার স্বর দিয়ে নয় , বরং একটি নিজস্ব নাম দিয়ে হয়ে থাকে ও এই লিপিতে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ একসাথে তালিকাভুক্ত থাকে যার ফলে কোনো অর্ধস্বরবর্ণ থাকে না ও ব্যঞ্জনবর্ণগুলো সহজাত স্বর ছাড়া উচ্চারিত হয় । পাশাপাশি শব্দীয় বর্ণমালা লিপির মূল বৈশিষ্ট্য হলো 

স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণের পৃথকত্ব যেখানে স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে এবং সহজাত স্বরধ্বনি যেখানে প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে একটি অন্তর্নিহিত স্বর (যেমন অ )  যুক্ত থাকে যা সেই ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণে আসে উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ব্রাহ্মী লিপি থেকে উদ্ভূত বাংলা ও দেবনাগরী এবং খরোষ্টী লিপি হলো শব্দীয় বর্ণমালা লিপি ও বাংলা লিপিটি প্রাচীন ভারতে প্রচলিত ব্রাহ্মী লিপি থেকে উদ্ভূত আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ব্রিটিশ শাসনের সময় বাংলা লিপিকে আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং বাংলা লিপির ব্যঞ্জনবর্ণগুলো (যেমন ক, খ, গ) একটি সহজাত অ স্বর বহন করে থাকে যা সেগুলোকে শব্দাংশ ভিত্তিক বা আংশিক শব্দাংশ ভিত্তিক করে তোলে ।  সর্বোপরি বলা যায় আবারো শব্দীয় বর্ণমালা লিপি এমন এক লিখন পদ্ধতি যেখানে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ আলাদাভাবে থাকে এবং প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণে একটি সহজাত স্বরধ্বনি সাধারণত অ  যুক্ত থাকে এবং এই লিপিতে প্রতিটি অক্ষরের নিজস্ব স্বরমূল্য থাকে ,  অর্থাৎ ব্যঞ্জনবর্ণগুলো নিজস্ব স্বর বহন করে এবং স্বরবর্ণগুলো তাদের স্বতন্ত্র স্বর নির্দেশ করে থাকে আর বাংলা লিপি একটি শব্দীয় বর্ণমালা লিপি  এবং চাকমা বর্ণমালার লিপির ধরন‌ও 

শব্দীয় বর্ণমালা লিপি আর  চাকমা লিপি একটি শব্দীয় বর্ণমালা লিপি যা ব্রাহ্মী লিপির অন্তর্গত এবং বর্মী লিপির থেকে উদ্ভুত হয়েছে এবং বর্মী লিপি আবার এসেছে পল্লব লিপি থেকে ও চাকমা বর্ণমালার 

সম্পর্কিত লিপি ও উদ্ভবের পদ্ধতিটি দেখে নিতে পারি যা হলো প্রোটো-সিনাইটিক বর্ণমালা > ফিনিশীয় বর্ণমালা > আরামাইক বর্ণমালা > ব্রাহ্মী বর্ণমালা > চাকমা বর্ণমালা । 

       এইবার অন্য প্রসঙ্গে আসি  প্রায় প্রত্যেক চাকমা গ্রামে বৌদ্ধ মন্দির বা হিয়োং দেখতে পাওয়া যায় ও বৌদ্ধ সন্যাসীদের বৌদ্ধ ভিক্ষু বা ভান্তে বলা হয়ে থাকে এবং তাঁরা ধর্মীয় উৎসব ও অনুষ্ঠান তত্ত্বাবধান করে থাকেন ও গ্রামবাসী বা অনুসারীরা ভিক্ষুদের খাদ্য (সিয়োং) এবং বস্ত্র (চীবর) এবং বাসস্থান (হিয়োং/কুটির) এবং ওষুধসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে জীবনধারণে সাহায্য করে থাকেন আর বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের জীবন সম্পূর্ণ সাধারণ মানুষের উপর নির্ভরশীল ও তাঁদের মূল কাজ হলো বুদ্ধ প্রজ্ঞাপিত নিয়ম মেনে নিজের আধ্যাত্মিক উন্নতি বা দুঃখমুক্তির কাজ করে যাওয়া ।  পাশাপাশি আরেকটি বিষয় আবারো তুলে ধরি বেশির ভাগ চাকমা শত শত বছরের পুরাতন থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্ম অনুসরণ করেন ও তাদের বৌদ্ধ ধর্ম পালনের মধ্যে হিন্দুধর্ম ও অন্যান্য প্রাচীন ধর্মের মিল দেখতে পাওয়া যায় আর আগে চাকমারা হিন্দু দেবদেবীর পূজাও করতেন উদাহরণস্বরূপ বলা যায় লক্ষীদেবীকে চাষাবাদের ফলন বেশি পাওয়ার জন্য পূজা করা হতো ও চাকমারা ভূত প্রেত বিশ্বাস করেন এবং তাদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য ছাগল, মুরগী, হাঁস ইত্যাদি বলি দেয়া প্রচলন ছিল , কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের নবজাগরণকারী বৌদ্ধভিক্ষু পরম পূজ্য সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তের অক্লান্ত পরিশ্রমে এইসব কুসংস্কার বর্তমানে প্রায় নেই বললেই চলে ,  তাছাড়া  বৌদ্ধ বিশ্বাসমতে পশুবলি সর্ম্পূণ নিষিদ্ধ । বনভান্তে নামে অধিক পরিচিত সাধনানন্দ মহাস্থবির (৮ জানুয়ারি ১৯২০ – ৩০ জানুয়ারি ২০১২) ছিলেন একজন বৌদ্ধ ধর্মীয় আধ্যাত্মিক গুরু ও  তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং  একজন বৌদ্ধ ধর্মীয় আধ্যাত্মিক গুরু ও তাঁর জীবন নিয়ে ধর্মীয় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় যা তাঁর জীবন এবং কর্মকে স্মরণ করিয়ে দেয় বলা যায় । তাছাড়া থেরবাদ হলো বৌদ্ধধর্মের শাখা যা প্রাচীনতম বিদ্যমান সম্প্রদায় আর সপ্তম ও অষ্টম শতকে বাংলাদেশের কয়েকটি অঞ্চলে মহাযানের প্রচলন ছিল বলে অনেকে মত প্রকাশ করে থাকেন , কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের বাঙালি ও উপজাতীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায় বিশুদ্ধ থেরবাদ বৌদ্ধধর্মেরই অনুশীলন করেন আর শুধু একটি মাত্র মতাদর্শই বাংলাদেশের সর্ব অঞ্চলের বৌদ্ধদের মধ্যে বিরাজিত এবং তাই বাংলাদেশের বৌদ্ধদের বলা হয়ে থাকে থেরবাদী বৌদ্ধ । পাশাপাশি এটিও বলে রাখা দরকার বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান হলো একটি প্রধান সম্প্রদায় বা মহা যান  যা বৃহৎ যান  নামে পরিচিত যা বৌদ্ধ দর্শন ও অনুশীলনের একটি বিশেষ ধারার পরিচায়ক ও এটি থেরবাদ সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বৌদ্ধধর্মের দুটি প্রধান শাখাগুলোর মধ্যে একটি।  মহাযান সম্প্রদায় প্রাথমিক বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা ছাড়াও বিভিন্ন নতুন মতবাদ ও সূত্র এবং বোধিসত্ত্ব পথে জোর দেয় যা থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন না। পাশাপাশি 

থেরবাদ বনাম মহাযানের কথা বললে বলতে হয় 

থেরবাদ হলো  বৌদ্ধধর্মের আরেকটি প্রধান শাখা এবং প্রাচীনদের পথ  বোঝায় যেখানে থেরবাদীরা মূলত গৌতম  বুদ্ধের মূল শিক্ষাকে অনুসরণ করে থাকেন , বিপরীতে মহাযান  এটি থেরবাদের চেয়ে বেশি আধুনিক মতবাদ ও অনুশীলন ধারণ করে থাকেন এবং 

মহাযানীরা বোধিসত্ত্বের পথে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী যেখানে সবাই বোধি লাভ করতে পারেন ও অন্যদেরও নির্বাণ লাভে সাহায্য করতে পারেন এবং মহাযানীরা বুদ্ধের আদি শিক্ষার পাশাপাশি নতুন সূত্র ও দর্শন গ্রহণ করেন যা তাদের নিজস্ব ধারার অংশ এবং মহাযান অপেক্ষাকৃত আধুনিক যা আনুমানিক খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে ভারতে বিকশিত হয়েছিল যেখানে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গুরুত্ব অর্জন করে ও 

মহাযানীরা বুদ্ধের মূর্তিপূজা এবং মন্ত্রের উপর বিশ্বাস রাখেন যেখানে বুদ্ধকে একজন দেবতা হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে ও মহাযান থেকে বিভিন্ন তান্ত্রিক শাখা উদ্ভূত হয়েছে যার মধ্যে মন্ত্রযান ও তন্ত্রযান ও বজ্রযান অন্যতম । তাছাড়া থেরবাদ হলো বৌদ্ধধর্মের একটি ঐতিহ্যবাহী শাখা  যার অর্থ হলো প্রাচীনদের পথ ও  এই মতবাদ অনুসারে এটি সরাসরি ঐতিহাসিক বুদ্ধের শিক্ষা ধারণ করে থাকেন ও  এর অনুসারীরা পালি ত্রিপিটককে বৌদ্ধধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিশ্বাস করেন ও নিজেদেরকে সবচেয়ে কর্তৃত্বপূর্ণ শাখা মনে করে যেখানে লক্ষ্য হলো সত্তার মুক্তি ও নির্বাণ লাভ করা ও থেরবাদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি 

আদিম ঐতিহ্য যেখানে থেরবাদকে বৌদ্ধধর্মের সবচেয়ে প্রাচীন ও মৌলিক শাখা হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে যা সরাসরি গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ও নীতির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এবং পালি ভাষা যেখানে গৌতম বুদ্ধের দেওয়া শিক্ষাগুলো মূলত পালি ভাষায় সংরক্ষিত ছিল ও  থেরবাদীরা এই পালি ধর্মগ্রন্থগুলোকে অনুসরণ করে থাকেন এবং ত্রিপিটক যেখানে 

থেরবাদীরা পালি ত্রিপিটককে তাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করেন ও এর কঠোর নিয়মাবলি অনুসরণ করে থাকেন এবং নির্বাণ ও অর্হৎ যেখানে এই মতবাদ অনুসারে জীবনের মূল লক্ষ্য হলো নির্বাণ লাভ করা ,  অর্থাৎ জন্ম এবং মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া ও এই নির্বাণ অর্জনের জন্য অর্হৎ (একজন পরিপূর্ণ ব্যক্তি) হওয়ার পথ অনুসরণ করতে হয় আর তাছাড়া 

থেরবাদ অনুযায়ী  নির্বাণ লাভ করার জন্য ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ও ধ্যানের মাধ্যমে আত্মিক শুদ্ধি অর্জন করতে হয়। তাছাড়া বোধিসত্ত্ব হলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি নিজের জ্ঞানার্জনের পথে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছেন এবং বুদ্ধত্ব লাভের জন্য প্রস্তুত ও মহাযান বৌদ্ধধর্ম অনুসারে তিনি নিজের নির্বাণ বিসর্জন দিয়ে অন্য সকল জীবের  মুক্তির জন্য পৃথিবীতে অবস্থান করেন ও এই পথে তিনি অপরিসীম করুণা ও ত্যাগের মাধ্যমে অন্যদের আলোকিত ও সাহায্য করতে বদ্ধপরিকর ও 

থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম এই মতবাদ অনুসারে বুদ্ধ তাঁর অতীত জীবনে নিজেকে বোধিসত্ত্ব বলতেন এবং পূর্ণ জ্ঞান লাভের পরেই নিজেকে বুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেন আর গৌতম বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বের মধ্যকার সম্পর্ক হলো মূলত বোধিসত্ত্ব শব্দটি সাধারণত সিদ্ধার্থ গৌতমকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে যিনি বহু জন্ম ধরে বোধিসত্ত্ব হিসেবে সাধনা করে অবশেষে বুদ্ধত্ব লাভ করেন বলা যায়। চাকমাদের একটা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ও তারাই বাংলাদেশের বৃহত্তম বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী ও সংস্কৃতিগত দিক থেকে চাকমারা যতো না দক্ষিণ এশীয় তার চেয়েও বেশি দক্ষিণপূর্ব এশীয়।  দক্ষিণ এশিয়া হলো এশিয়ার দক্ষিণাঞ্চল যা ভৌগোলিক ও জাতিগত সাংস্কৃতিক উভয় পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত আর এই অঞ্চলটি আফগানিস্তান , বাংলাদেশ , ভুটান , ভারত , নেপাল , পাকিস্তান , শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপ  নিয়ে গঠিত । অপরদিকে  দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মোট ১১টি দেশ রয়েছে আর এই দেশগুলো হলো ব্রুনাই ,  কম্বোডিয়া ,  পূর্ব তিমুর ,  ইন্দোনেশিয়া ,  লাওস ,  মালয়েশিয়া ,  মিয়ানমার ,  ফিলিপাইন ,  সিঙ্গাপুর ,  থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনাম । 

      চাকমা জাতির একটি দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং সামাজিক কাঠামো রয়েছে যা তাদের বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ  জনগোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায় । তাছাড়া এই জাতির  একটি সমৃদ্ধ ও  প্রাচীন ইতিহাস বিদ্যমান যা  কম করে হলেও ১৪০০ বছরের পুরোনো বলে অনুমান করা হয়ে থাকে (প্রায় ) । তাছাড়া আলোচনা ও পর্যালোচনা এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে এইটুকু অনুমেয় অন্তত পক্ষে হাজার বছরের কমতো নয় আর চাকমা জাতির সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলো সেই  নির্দেশনাই প্রদান করে থাকে , কিন্তু ব্যাপার হলো চাকমাদের প্রকৃত উৎপত্তিকাল ও আদি নিবাস এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের আগমনের বিষয়ে ষোড়শ শতকের আগের কোনো সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যায় না। ১৬শ শতকের আগে তাদের সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায়নি এবং তারা কখন প্রথম পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করেন তার‌ও কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নেই । সর্বোপরি আবারো বলা যায় চাকমাদের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে দুটি তত্ত্ব প্রচলিত আছে তার মধ্যে একটি প্রভাবশালী তত্ত্ব অনুসারে চাকমারা প্রাচীন ভারতীয় রাজ্য মগধ (বর্তমান বিহার) থেকে আরাকানে (বর্তমান মায়ানমার) স্থানান্তরিত হয়েছিলেন ও সেখান থেকে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করেন।  আরেকটি ধারণা অনুযায়ী বর্মী রাজত্বের প্রাথমিক পর্যায়ে চাকমারা বর্মী রাজাদের অধীনে পরামর্শক ও মন্ত্রী বা অনুবাদক হিসেবে কাজ করার সূত্রে এখানে আসেন এবং বর্মী রাজারা এই চাকমা নামকরণের প্রচলন করেন ।  চাকমাদের আদি ইতিহাস সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না এবং তাদের উৎপত্তি নিয়ে এখনো বিতর্ক বিদ্যমান রয়েছে , কিন্তু এই তত্ত্বগুলো থেকে বোঝা যায় যে চাকমারা কোনো একটি নির্দিষ্ট সময় বা স্থান থেকে না  , বরং বিভিন্ন পথে তাদের বর্তমান আবাসভূমিতে এসে বসতি স্থাপন করে থাকতে পারেন , কিন্তু  বেশিরভাগ চাকমা আরাকান (বর্তমান মায়ানমার) থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছিলেন বলে মনে করা হয়ে থাকে । বস্তুত  মধ্য মায়ানমার ও আরাকান অঞ্চলের একদা বসবাসকারী সাক বা ঠেক জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের সম্পর্ক রয়েছে এবং একটি প্রচলিত মতানুসারে মগধের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে চাকমা জনগোষ্ঠী আরাকান থেকে  এসে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করেন। মূলত সাক বা ঠেক জনগোষ্ঠী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাস করেন , যদিও বাংলাদেশেও তাদের একটি অংশ রয়েছে। বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চাক বা ঠেকদের দেখা যায়। আবার  সাক বা ঠেক ভাষাও সিনো-টিবেটান পরিবারের তিব্বতিবর্মণ শাখার একটি অংশ আর বাংলাদেশের চাক জনগোষ্ঠী এই ভাষায় কথা বলেন। সাক শব্দটি সংস্কৃত শক্তিমানের একটি বিকৃত রূপ এবং এটি থেকেই চাকমা নামের উৎপত্তি ও চাকমারা একসময় মধ্য মায়ানমার ও আরাকান এলাকার অধিবাসী ছিলেন এবং চট্টগ্রাম ও আরাকানের পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী সাক নামে পরিচিত এক জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত ছিল । আবার চাকমারা মনে করেন যে তারা বুদ্ধের শাক্য বংশের অংশ ছিলেন এবং সম্ভবত এই কারণেও তাদের সাক বা থেক নামে অভিহিত করা হতো। তাছাড়া খিয়াংদের মতো অন্যান্য জনগোষ্ঠীও চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের সাক নামে উল্লেখ করতেন এবং 

খিয়াং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যারা মূলত বান্দরবান ও রাঙামাটি জেলায় বসবাস করেন ও ঐতিহ্যগতভাবে তারা একসময় আরাকানের ইয়োমা উপত্যকা থেকে এই অঞ্চলে এসেছিলেন বলে মনে করা হয়ে থাকে ও 

খিয়াং উপজাতি চাকমাদের চাকমা সাক  বলে সম্বোধন করেন ।  আরাকান ইয়োমা হলো পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম মিয়ানমারের একটি পর্বতমালা যা হিমালয়ের একটি সম্প্রসারিত অংশ। এটি বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় আরাকান (রাখাইন) অঞ্চলকে মধ্য মিয়ানমারের ইরাবতী নদী অববাহিকা থেকে পৃথক করেছে এবং উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত আর 

ইরাবতী নদীকে বর্মী ভাষায় আইয়ারওয়াদি (Ayeyarwady) বলা হয়ে থাকে এবং এটি উত্তর মায়ানমারের পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয় এবং দেশের কেন্দ্রস্থল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষে মার্তাবান উপসাগরে পতিত হয় ও  এটি মায়ানমারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে এবং দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলা যায় । 

মার্তাবান উপসাগর  বা মোত্তামা উপসাগর বার্মার দক্ষিণ অংশে আন্দামান সাগরের একটি বাহু আর 

আন্দামান সাগর ঐতিহাসিকভাবে বার্মা সাগর নামেও সুপরিচিত। সুতরাং দেখতে পাওয়া যায়  চাকমাদের ইতিহাস সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় না ,  এটির কারণ তাদের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব রয়েছে । যদিও বিশ্বে ইতিহাস লেখার চর্চা মূলত লিখন পদ্ধতির আবিষ্কারের মাধ্যমে শুরু হয় যা প্রাচীন প্রামাণ্য ইতিহাসের সূচনা করে এবং এর প্রথমিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন হেরোডোটাস ও থুসিডাইডিসের মতো প্রাচীন গ্রিক ঐতিহাসিকরা খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে ও মূলত প্রাচীনতম লিখিত ইতিহাসের শুরুটা ঘটে চীনের ওরাকল হাড় লিপিতে (Oracle bone script) প্রায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে ইতিহাস লেখা হয়েছিল ও জুও জহুয়ান (Zuozhuan) নামক যে আখ্যানটি পাওয়া গেছে সেটি খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে রচিত এবং বিশ্বের প্রথম লিখিত আখ্যান হিসেবে বিবেচিত। হেরোডোটাস ও ইতিহাসের জনক  যেখানে গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৪-৪২৫) যাঁকে প্রায়শই ইতিহাসের জনক হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে এবং তিনি হিস্টোরিস (Histories) নামক গ্রন্থটি রচনা করেন যা যুদ্ধের একটি বিবরণ এবং এই ক্ষেত্রে প্রথম প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত বলা যায়। আবার বৈজ্ঞানিক ইতিহাসের সূচনা যেখানে থুসিডাইডিসকে বৈজ্ঞানিক ইতিহাসের জনক বলা হয়ে থাকে এবং তিনি তাঁর নিজস্ব পদ্ধতি ও যুক্তি ব্যবহার করে ইতিহাস রচনা করেন যা আধুনিক ইতিহাস লেখার ভিত্তি স্থাপন করে ,  সুতরাং এই ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি প্রামাণ্য ইতিহাস লেখার ধারণাটি প্রাচীন গ্রীসে বিকশিত হলেও মানব ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করার পদ্ধতিটি আরও আগে চীনে শুরু হয়েছিল। কিন্তু কথা হলো আধুনিক ইতিহাস লেখার সূচনা মূলত মধ্যযুগ পরবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে যা ১৬শ শতাব্দী থেকে শুরু হয় যখন ইউরোপে রেনেসাঁস এবং আবিষ্কারের যুগ শুরু হয়েছিল ও এরপর মধ্য ১৮শ শতাব্দীতে পরবর্তী আধুনিক যুগ শুরু হয় যা ফরাসি বিপ্লব এবং প্রথম শিল্প বিপ্লবের মতো ঘটনার জন্ম দেয় ।  আধুনিক ইতিহাস লেখার সূচনাতে  উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো রেনেসাঁস ও আবিষ্কারের যুগ (Renaissance) যেখানে ১৫শ শতাব্দীতে ইউরোপে রেনেসাঁস ও আবিষ্কারের যুগ শুরু হয় যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ও কনস্টান্টিনোপলের পতন (১৪৫৩) যেখানে এই ঘটনা আধুনিক যুগের একটি ইঙ্গিত দেয় এবং পশ্চিমা বিশ্বে অনেক বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে ও 

নতুন বিশ্ব আবিষ্কার (Discovery of New World) যেখানে ১৪৯২ সালে নতুন বিশ্ব আবিষ্কার আধুনিক ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলা যায়। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক ইতিহাসেই  লেখার পদ্ধতিগত উন্নয়ন ঘটে যেখানে বস্তুনিষ্ঠতা ও মৌলিক উপাদানের ব্যবহার যা আধুনিক ইতিহাস লেখায় বস্তুনিষ্ঠতা ও ঐতিহাসিক উপাদানগুলোর যথাযথ ব্যবহার একটি নতুন পদ্ধতি নিয়ে আসে ।  এডওয়ার্ড গিবন এবং ১৮শ শতাব্দীর ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গিবন আধুনিকতার প্রথম দিকে ইতিহাস রচনার পদ্ধতিকে নতুন দিকে নিয়ে আসেন এবং উইলিয়াম স্টাবস  ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজি ইতিহাসের উদীয়মান বিদ্যালয়ের জন্য মানদণ্ড স্থাপনকারী । প্রায়শই বলা হয়ে থাকে আধুনিক ইতিহাসের জনক হিসেবে জার্মান ইতিহাসবিদ লিওপোল্ড ফন র‍্যাঙ্কে (Leopold von Ranke) পরিচিত যিনি ১৭৯৫ থেকে ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন ও  তাঁকে আধুনিক ইতিহাসের জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয় ও তিনি বিশ্বাস করতেন যে ইতিহাস হলো প্রকৃতপক্ষে যা ঘটেছিল তার অনুসন্ধান এবং তার সত্য বিবরণ। উইলিয়াম স্টাবস তিনি একজন ইংরেজ ইতিহাসবিদ ও আইনজ্ঞ ছিলেন এবং ইংরেজি আইনি ইতিহাসের আধুনিক জনক হিসেবে পরিচিত । এডওয়ার্ড গিবন ছিলেন একজন অষ্টাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত ইংরেজ ইতিহাসবিদ ,  প্রাবন্ধিক ও রাজনীতিবিদ যিনি তাঁর রোমান সাম্রাজ্যের পতন ও পতনের ইতিহাস (The History of the Decline and Fall of the Roman Empire) বইটির জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও তাঁর লেখাটি গদ্যের উৎকর্ষ ,  বিদ্রুপাত্মক রচনাশৈলী এবং প্রাথমিক উৎস ব্যবহারের জন্য বিখ্যাত যিনি একজন একাধারে ইতিহাসবিদ ও প্রাবন্ধিক ও ব্রিটিশ সংসদ সদস্য। তাই দেখতে পাওয়া যায় আধুনিক ইতিহাস লেখার চর্চা মোটামুটি ১৬শ শতাব্দী থেকে শুরু হয় যা ইউরোপে রেনেসাঁ এবং আবিষ্কারের যুগ দিয়ে চিহ্নিত। তবে এই ধারণার মূল বিকাশ ঘটে মূলত ১৮শ শতাব্দীতে যখন আলোকিতকরণের যুগ (Age of Enlightenment) এবং শিল্প বিপ্লব শুরু হয়। তাছাড়া আধুনিক ইতিহাসের মূল পর্যায় যেখানে প্রথম আধুনিক যুগ (প্রায় ১৬শ শতাব্দী) যা ইউরোপে এই সময়কালে রেনেসাঁ এবং আবিষ্কারের যুগ শুরু হয় যা আধুনিক ইতিহাসের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। পরবর্তী আধুনিক যুগ (প্রায় মধ্য ১৮শ শতাব্দী) যেখানে এই সময়ে আলোকিতকরণের যুগ এবং শিল্প বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আধুনিক ইতিহাসের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো বিকশিত হয় ও এই সময়ে ইতিহাসকে শুধুমাত্র ঘটনা বা কাহিনী হিসেবে না দেখে বরং একটি নিয়মতান্ত্রিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করার ধারণা তৈরি করার পদ্ধতি হিসেবেও বলা যেতে পারে ।  সুতরাং আধুনিক ইতিহাস লেখার সূচনা খুব বেশি দিনের নয় মোটেও , ফলে বিচার বিশ্লেষণ ,  যাচাই-বাছাই ,  অতীতকে বোঝা , সত্যনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য বা তথ্য উপাত্তের অভাব এবং সঠিক অনুমান বা অনুমানের নির্ভরযোগ্যতা ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা সিদ্ধান্তহীনতা এইসব কিছু থাকবেই থাকবে। তাছাড়া আরো বললে বলতে হয় আধুনিক ইতিহাস না থাকলে যা ঘটতো তা হলো ঐতিহাসিক তথ্যের অভাব যেখানে মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগের যে পরিবর্তনগুলো ঘটেছিল তার সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেত না যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও প্রভাবিত করতো ও প্রচলিত ধারণায় সীমাবদ্ধতা যেখানে শুধু কিংবদন্তী বা মুখের কথার উপর ভিত্তি করে ইতিহাসকে বুঝতে হতো ,  যা সঠিক নয়। এরপর ঐতিহাসিক পদ্ধতি না থাকলে ইতিহাসের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরি হতো না এবং অপব্যাখ্যা ও ভুল তথ্যের বিস্তার যেখানে আধুনিক ইতিহাস লেখার পদ্ধতি শুরু না হলে  অনেক ঘটনা বিকৃত বা ভুলভাবে উপস্থাপিত হতো  যা সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতো ও ঐতিহাসিক সচেতনতার অভাব যেখানে আধুনিক ইতিহাস লিখন পদ্ধতি না থাকলে আমরা আমাদের অতীত থেকে শিখতে পারতাম না যার ফলে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা কঠিন হতো। সর্বোপরি বলা যায়  আধুনিক ইতিহাস শুধু ঘটনা লিপিবদ্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তথ্য বিশ্লেষণ করে থাকে এবং যুক্তির যুগ (আলোকিতকরণের যুগ) যা ১৭শ ও ১৮শ শতাব্দীতে যুক্তির বিকাশ এবং যুক্তিভিত্তিক চিন্তাভাবনার প্রসার আধুনিক ইতিহাস লেখার পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে নিঃসন্দেহে বলা যায় । এটি তুলে ধরার কারণ হলো আধুনিক ইতিহাস লেখা একটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক বিষয় ও  এর সূচনাকে কোনো একক ঘটনার পরিবর্তে সময়ের সাথে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সমষ্টি হিসাবে দেখা হয়। আবারো আলোচনায় আসি  সাক শব্দটি চাকমাদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং খিয়াংরা এই শব্দ দিয়েই তাদের সম্বোধন করে থাকেন। সর্বোপরি চাকমারা  মধ্য মায়ানমার ও আরাকান এলাকার আদিবাসী ছিলেন আর তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে  যার মধ্যে বৌদ্ধ ধর্ম পালনের প্রচলন উল্লেখযোগ্য ও চাকমা সমাজ একটি রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণ করে থাকেন যেখানে রাজা বংশানুক্রমিক পদ ধারণ করেন যেখানে তাঁদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা ও নিজস্ব শাসনব্যবস্থা রয়েছে আর তাঁদের একটি দীর্ঘ ও ঐতিহ্যপূর্ণ ইতিহাস রয়েছে  যা বিদ্রোহ ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে বলা যেতে পারে ।  চাকমা রাজবংশের উৎপত্তির সময়কাল নিয়ে বিভিন্ন মত আছে এবং যার মধ্যে একটি হলো ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগ ও চাকমা বিজক (১৮৭৬-১৯৩৪) একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি যা চাকমা ইতিহাসের একটি সংকলন বলা যায়। এই রাজবংশের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে যেমনি ঠিক তেমনি এর ইতিহাস নিয়ে লেখা বিভিন্ন বইতেও তথ্যগত পার্থক্য দেখতে পাওয়া যায় । কিন্তু ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে চাকমা রাজবংশের উত্থান সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায় সেটি ঐতিহ্যবাহী ধারণা ও মৌখিক ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়ে থাকতে পারে , এটির কারণ এতে ঐতিহাসিক যথার্থতা নিয়ে বিস্তারিত এবং প্রতিষ্ঠিত গবেষণার অভাব রয়েছে। তাছাড়া এই সময়কালে চাকমা রাজবংশের অস্তিত্বের কোনো সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই যা এই তথ্যটিকে নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি মৌখিক ইতিহাস ও কিংবদন্তি যেখানে চাকমা রাজবংশের ইতিহাস মূলত মৌখিক ঐতিহ্য ও কিংবদন্তির মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে এসেছে ও এই তথ্যটি এমন একটি গল্প থেকে এসেছে যা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ছিল এবং প্রামাণিক তথ্যের অভাব যেখানে চাকমা রাজবংশের উত্থানের বা কোনো সুনির্দিষ্ট রাজা থাকার সময়কাল হিসেবে ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগকে উল্লেখ করা হলেও এই সময়ের কোনো ঐতিহাসিক দলীল বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং ঐতিহাসিক গবেষণা ও অন্যান্য উৎস যেখানে ক্যাপ্টেন টি এইচ লুইনের মতো ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের কাজ এবং পরবর্তী সময়ে রচিত কিছু ঐতিহাসিক গ্রন্থে চাকমা জাতির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ,  কিন্তু সেখানেও এই নির্দিষ্ট সময়কালের উল্লেখ নেই এবং কালের ব্যবধান যেখানে পরবর্তীকালে যখন ইতিহাস লেখা হয় তখন অনেক তথ্যের বিশুদ্ধতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে বিশেষ করে যখন তা দীর্ঘকালের মৌখিক ঐতিহ্য থেকে আসে । অতএব ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে চাকমা রাজবংশের উত্থান একটি ঐতিহ্যবাহী ধারণা হলেও এটিকে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ নেই । তাছাড়া ক্যাপ্টেন থমাস হার্বার্ট লুইন (Thomas Herbert Lewin) ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন বিখ্যাত ব্রিটিশ কর্মকর্তা যিনি ভাষাবিদ ও নৃতাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৮৬৫ থেকে ১৮৭২ সাল পর্যন্ত তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সুপারিন্টেন্ডেন্ট ও ডেপুটি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চাকমা এবং কুকি ও লুসাই উপজাতিদের জীবনযাপন ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করেন এবং তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে A Fly on the Wheel নামক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করেন যার একটি অংশ থাংলিয়ানা নামে বাংলায় অনূদিত হয়েছে । ক্যাপ্টেন লুইনের লেখা গ্রন্থগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস ,  ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন উপজাতি সম্পর্কে জানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। লুসাইদের থাংলিয়ানা নাম যেখানে উপজাতিদের মধ্যে তিনি থাংলিয়ানা নামে পরিচিত ছিলেন যা তিনি লুসাই উপজাতিদের কাছ থেকে অর্জন করেছিলেন। থাংলিয়ানা  তাঁর রচিত ইংরেজি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ A Fly on the Wheel এর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক অধ্যায়গুলোর বাংলা অনুবাদ আর এই বইয়ে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে তাঁর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ও অভিযান লিপিবদ্ধ করেছেন। বস্তুত স্যার ক্যাপ্টেন টি এইচ লুইন  তিনি ১৮৬০ সালে সৃষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ডেপুটি কমিশনার ছিলেন এবং এই পদে থাকা প্রথম ব্রিটিশ কর্মকর্তা ছিলেন। মূলত ১৮৬০ সালের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম জেলার অংশ ছিল। ১৮৬০ সালে চট্টগ্রামকে ভেঙে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা গঠন করা হয় যার সদর দপ্তর ছিল রাঙামাটি। ১৯৮৪ সালে এরশাদ সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভেঙে খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নামে নতুন দুটি জেলা গঠন করা হয় এবং এর বাকি অংশ রাঙামাটি জেলা নামে পরিচিতি লাভ করে ।  ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে চাকমাদের রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল অনেক পরে যা আনুমানিক ১৫শ বা ১৬শ শতাব্দীর শেষের দিকে বা তারপর , যদিও তাদের পূর্বপুরুষরা হয়তো আরও আগে থেকেই এই অঞ্চলে ছিলেন। তাছাড়া ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে যেখানে চম্পক নগরের রাজা সাংবুদ্ধের গল্প বা ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করা হলেও এই সময়কালকে অনেক ক্ষেত্রেই চাকমা রাজবংশের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠা হিসেবে ধরা হয় । মূলত  রাজা সাংবুদ্ধ নামটি চাকমা রাজবংশের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত যেখানে আনুমানিক ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে চম্পক নগরের রাজা সাংবুদ্ধের উল্লেখ আছে। তিনি ছিলেন চাকমা রাজবংশের অন্যতম রাজা এবং তাঁর দুই পুত্র ছিলেন ।    রাজা সাংবুদ্ধ চাকমা রাজবংশের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন এবং তাঁর সময়কাল আনুমানিক ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগ বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে এবং তাঁর রাজধানী ছিল চম্পক নগর।   তাঁর নাম চাকমা রাজবংশের ইতিহাসের একটি অংশ হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে।  রাজা সাংবুদ্ধের দুই ছেলের নাম ছিল বড় ছেলে  বিজয়গিরি ও ছোট ছেলে  সমরগিরি । বড় ছেলে বিজয়গিরি ছিলেন একজন যুবরাজ এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী যিনি রাজ্য জয় ও বিস্তারের স্বপ্ন দেখতেন। সর্বোপরি বলা যায় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে রাজা সাংবুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত গল্প পাওয়া যায় না ,  তবে Jumjournal এর একটি নিবন্ধ অনুসারে চম্পক নগরের রাজা সাংবুদ্ধের একটি ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় যেখানে তাঁর দুই ছেলে বিজয়গিরি ও অন্যান্যদের কথা বলা হয়েছে ও চাকমা রাজবংশের ইতিহাস  Jumjournal এর নিবন্ধ অনুযায়ী আনুমানিক ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে চম্পক নগরের রাজা সাংবুদ্ধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ও এই তথ্যটি চাকমা রাজবংশের ইতিহাসের একটি অংশ । Jumjournal হলো একটি অনলাইন আর্কাইভ ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম যা বিশ্বজুড়ে আদিবাসী সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা ও প্রচার করে থাকে আর এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করা হয় এবং তাদের সংস্কৃতি ও ধারণাগুলো একটি একক স্থানে সংরক্ষণ ও ভাগ করে নেওয়া যায় এবং Jumjournal এটি আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী করে ও বিভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও প্রসারের মাধ্যমে বিশ্বকে সমৃদ্ধ করে থাকে আর 

Jumjournal একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা কমিউনিটি যা বিশ্বজুড়ে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য কাজ করে থাকে এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট স্থান থেকে প্রকাশিত হয় না ,  বরং একটি অলাভজনক অনলাইন সংরক্ষণাগার ও  কমিউনিটি হিসেবে কাজ করে থাকে এবং এটি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, ধারণা এবং চিন্তাভাবনা তুলে ধরে যা এটিকে একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম করে তোলে। তাছাড়া আপনি এই প্ল্যাটফর্মে আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বিষয়বস্তু খুঁজে পেতে পারেন ও নিজের ধারণাও শেয়ার করতে পারেন। চম্পকনগর ও চাকমাদের সাথে সম্পর্কিত চম্পকনগর বর্তমানে মায়ানমার (বার্মা) অঞ্চলে অবস্থিত বলে জানা যায়। চম্পকনগর চাকমাদের একটি ঐতিহাসিক রাজ্য বা রাজধানী ছিল বটে ,  কিন্তু এর সঠিক ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে এখনও বিতর্ক বিদ্যমান রয়েছে । 

চাকমা লেখক সুপ্রিয় তালুকদার স্যার তাঁর চম্পক নগরের পথে পথে বইয়ে চম্পকনগর খুঁজতে মায়ানমারে ভ্রমণের কথা উল্লেখ করেছেন ও তিনি মায়ানমারের ইয়াংগুন, নেপিড ও মান্ডাল হয়ে চম্পকনগর পৌঁছেছেন যা থেকে বোঝা যায় এটি বর্তমান মায়ানমারের পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত । সুপ্রিয় তালুকদার ছিলেন একজন বিদগ্ধ ইতিহাস গবেষক ও রাঙ্গামাটি উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউটের পরিচালক যিনি বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করতেন এবং তাঁর গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল মায়ানমারে চাকমাদের চম্পকনগর যাত্রা ও তিনি  ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান ইতিহাস গবেষক ও কবি যিনি রাঙ্গামাটির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন ,  সুতরাং চম্পকনগরের বর্তমান অবস্থা হলো চম্পকনগর বর্তমানে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে মায়ানমারে অবস্থিত ও এর সঠিক ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলা যায়। বস্তুত চাকমা রাজবংশের ইতিহাস আধুনিককালে রাজা শেরমস্ত খাঁর আমল থেকে দেখতে পাওয়া যায় ও তাঁর শাসনকাল  ১৭৩৭ থেকে ১৭৫৩ সাল পর্যন্ত  আর সেই সময় আরাকানিদের অত্যাচারে তিনি মোগল নবাবের সঙ্গে মিত্রতা করেন ।  ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর চট্টগ্রাম প্রত্যাবর্তন ও মুঘলদের প্রতি বশ্যতা স্বীকার করার পর থেকেই রাঙ্গুনিয়ায় চাকমাদের ধারাবাহিক লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায়। রাজা শেরমস্ত খাঁ ছিলেন চাকমা রাজা  যিনি ১৭৩৭ সালে রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া ও কোদালা এলাকার কিছু পাহাড়ি ভূমি বন্দোবস্ত নিয়েছিলেন ও রাজ্য পরিচালনার জন্য পদুয়ায় একটি জমিদার বাড়ি স্থাপন করেন ও তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পোষ্যপুত্র শুকদেব রায় রাজা হন। তাছাড়া রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইতিহাস বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে আপনি আরো স্বয়ংসম্পূর্ণ ইতিহাস জেনে নিতে পারেন । রাঙ্গুনিয়ায় শুকদেব রায় , শের জব্বর খাঁ ও শের দৌলত খাঁ ও জান বক্স খাঁ এই অঞ্চল রাজত্ব করেন। জান বক্স খাঁ রাজা থাকাকালীন ইংরেজদের বিরুদ্ধে পার্বত্যবাসী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লে ব্রিটিশ সেনা অভিযান চালিয়ে পদুয়ার জমিদারবাড়িটি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। জান বক্স খাঁ একপর্যায়ে সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং চুক্তির শর্তানুযায়ী পাহাড়ি  এলাকা ত্যাগ করে কর্ণফুলী নদীর উত্তর পারে বর্তমান দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নে নতুন জমিদারবাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন আর দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়ন বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার অন্তর্গত একটি ইউনিয়ন ও এটি চট্টগ্রাম বিভাগের অধীনে অবস্থিত আর রাঙ্গুনিয়া বৃহত্তর রাজানগরের রাজা প্রথা ও জনপদের নামকরণ ইতিহাসে এইসব কিছুই বিস্তৃতভাবে পরিলক্ষিত হয় । মূলত তদানিন্তন চাকমা রাজার ঐতিহ্য অনুসারে এই ইউনিয়নের নামকরণ করা হয় রাজানগর।  রানীর নামানুসারে উপজেলার সর্ববৃহৎ গ্রোথ সেন্টার রানীরহাট বাজারের নামকরণ করা হয়।  গ্রোথ সেন্টার হলো গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্র যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আনার জন্য গড়ে তোলা হয় ও এটিকে গ্রামীণ হাটবাজারগুলোকে আধুনিক রূপ দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া হিসেবেও দেখা হয়ে থাকে যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সম্ভাবনা থাকে । রাঙ্গুনিয়ার রানীর হাট বাজার রাঙ্গামাটি থেকে আট মাইল দূরে রানী কালিন্দীর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আর রানী কৃষিকাজের সুবিধার জন্য একটি নতুন বাজার স্থাপন করেন যা বর্তমানে রানীর হাট নামে পরিচিত। তাছাড়া বাজারের উত্তরপূর্বে তিনি একটি বসতিও গড়ে তোলেন যা কালিন্দপুর নামে পরিচিত।  ১৮৭৪ সালে চাকমা রাজা হরিশচন্দ্র রায় রাজধানী রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর হতে রাঙ্গামাটিতে স্থানান্তরিত করেন। রাঙ্গুনিয়া বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা যা চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এই উপজেলাটি আয়তনের দিক থেকে চট্টগ্রাম জেলার ষষ্ঠ বৃহত্তম এবং জনসংখ্যার দিক থেকে নবম জনবহুল উপজেলা। রাজা শেরমস্ত খাঁর সময় থেকেই চাকমা রাজবংশের ইতিহাস লিখিতভাবে শুরু হয় এবং তাঁর পরবর্তী শাসক রাজা শুকদেব রায়ের সময় থেকে তাঁরা মোঘলদের কাছ থেকে রায় উপাধি ও পদবি লাভ করেন।  রাজা শেরমস্ত খাঁ আরাকান রাজদরবারে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গোলযোগের কারণে আনুমানিক ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম প্রত্যাবর্তন করেন এবং মুঘলদের বশ্যতা স্বীকার করেন ও এই ঘটনাটি চাকমা রাজবংশের আধুনিক ইতিহাসের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে বলা যায়। তাছাড়া লিখিত ইতিহাসের শুরু যেখানে শেরমস্ত খাঁর সময় থেকেই রাঙ্গুনিয়ায় চাকমাদের ধারাবাহিক লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায়। রাজা শুকদেব রায়ের ভূমিকা হলো শেরমস্ত খাঁর কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় তাঁর ভাই শেজ্জান খাঁর পুত্র শুকদেব পরবর্তী রাজা হন। মূলত রাজা শুকদেব রায়ের কার্যকলাপে সন্তুষ্ট হয়ে মোঘলরা তাঁকে রায় উপাধি ও একটি তরফ বন্দোবস্ত প্রদান করেন যা চাকমা রাজবংশের আধুনিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক । তরফ শব্দটি দ্বারা সাধারণত নির্দিষ্ট পক্ষকে বোঝানো হয়ে থাকে এবং বন্দোবস্ত মানে কোনো কিছুর আয়োজন, বিলিব্যবস্থা বা ব্যবস্থাপনা আর প্রদান মানে দেওয়া বা বরাদ্দ করা আর তরফ বন্দোবস্ত প্রদান হলো জমি বা ভূমি সংক্রান্ত একটি ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে সরকার বা ভূমি কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট শর্তে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে জমি বরাদ্দ করেন ও এই বন্দোবস্তের মাধ্যমে কেউ নির্দিষ্ট রাজস্ব প্রদান করে ভূমির উপর অধিকার লাভ করেন আর এই প্রথা সাধারণত খাস জমি বরাদ্দ ও ভূমি ব্যবস্থাপনার একটি অংশ যেখানে ভূমিহীন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কৃষি বা অকৃষি জমি সরবরাহ করা হয়ে থাকে । আবার এটিও দেখতে পাওয়া যায় মোঘলরা রায় উপাধিটি চাকমাদের প্রথাগত উপাধি হিসেবে প্রদান করেননি ,  বরং রায়  উপাধিটি ব্রিটিশ শাসনামলে চাকমা রাজাদের দেওয়া হয়েছিল উদাহরণ হিসেবে বলা যায় রাজা ভুবনমোহন রায়কে ১৮৯৭ সালে রায় বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং পরে রাজা নলিনাক্ষ রায়কে ১৯৩৯ সালে রাজা উপাধি প্রদান করা হয়ে থাকে,  মূলত মোঘল আমলে চাকমা রাজাদের উপাধি হিসেবে খাঁ প্রচলিত ছিল ,  সুতরাং এই ক্ষেত্রে মোঘলরা চাকমাদের রায় উপাধিটি প্রদান করেননি , এটি ব্রিটিশ শাসনামলে প্রচলিত হয়েছিল। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে চাকমা রাজা শুকদেব রায় মোঘল আমলের শেষ রাজা ছিলেন  । তিনি ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে চাকমাদের রাজা ছিলেন এবং তিনি হিন্দু ধর্মের প্রতি উদার ছিলেন ও যার ফলস্বরূপ ত্রিপুরা মহারাজা তাঁকে কিছু ত্রিপুরা প্রদান করেন।  ত্রিপুরা মহারাজার সাথে চাকমা রাজাদের সম্পর্ক ছিল একটি সঠিক ঐতিহাসিক ঘটনা ও  এটি একটি বিশেষ রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক যা উভয় জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে বলা যায় এবং এই সম্পর্ক চাকমা এবং ত্রিপুরা উভয় রাজ্যেই ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে থাকে এবং এই সম্পর্কের ফলে চাকমা ও ত্রিপুরার মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। তাছাড়া ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হলো চাকমা জনগোষ্ঠী প্রথমে বার্মার আরাকান পাহাড়ে বাস করতেন এবং পরবর্তীকালে ত্রিপুরায় বসতি স্থাপন করেন ও তাদের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে চলে আসেন আর ত্রিপুরা মহারাজা ও চাকমা রাজাদের সম্পর্ক ছিল জটিল এবং এর মধ্যে সহযোগিতা ও বিরোধ উভয়ই দেখা যায় যেখানে চাকমারা প্রথমে ত্রিপুরা রাজ্যের অধীনে ছিলেন ও পরে তারা নিজেদের স্বতন্ত্রতা প্রতিষ্ঠা করেন । ত্রিপুরার রাণীরাও চাকমা রাজবংশের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন এবং কখনো কখনো ত্রিপুরা মহারাজা চাকমা রাজাকে উপঢৌকন হিসেবেও দিয়েছিলেন ,  সর্বোপরি বলা যায় 

মোঘলরা রায় উপাধিটি চাকমাদের প্রথাগত উপাধি হিসেবে প্রদান করেননি , বরং রায় উপাধিটি ব্রিটিশ শাসনামলে চাকমা রাজাদের দেওয়া হয়েছিল , সুতরাং এই ক্ষেত্রে মোঘল আমলে চাকমা রাজাদের উপাধি হিসেবে খাঁ প্রচলিত ছিল । উপাধির ইতিহাসে দেখতে পাওয়া যায়  ১৯৩৯ সালে রাজা নলিনাক্ষ রায়কে ব্রিটিশ সম্রাট ষষ্ঠ জর্জের জন্মদিবস উপলক্ষে রাজা উপাধি প্রদান করা হয় ও  এটি ব্রিটিশ শাসনামলে চাকমা রাজাদের মধ্যে একটি সম্মানসূচক উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত হতো আর রাজা নলিনাক্ষ রায় ও ত্রিদিব রায়  তাঁদেরও রায় উপাধি ছিল যা পরবর্তী সময়ে বংশানুক্রমে চলে আসে । রায় ( Rai ) এটি ভারতীয় উপমহাদেশে রাজকীয়তা ও আভিজাত্যের একটি ঐতিহাসিক উপাধি ছিল ও এই উপাধিটি রাজা বা রাজপুত্র বা প্রধান থেকে এসেছে ও এটি মূলত হিন্দু সমাজে রাজকীয় শাসক ও প্রধানদের দ্বারা ব্যবহৃত হতো। পাশাপাশি খাঁ (Khan) এর মূল উৎপত্তি মঙ্গোলীয় ও তুর্কি ভাষায় ও এর আক্ষরিক অর্থ হলো সেনানায়ক ,  নেতা বা শাসক এবং এটি গোত্রপতিদেরও বোঝাতে ব্যবহৃত হতো আর  দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার মুসলিম ও তুর্কিমঙ্গোলীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে এই উপাধিটি প্রচলিত ও রায় এবং খাঁ উপাধির মধ্যে মূল পার্থক্য হলো তাদের উৎস ও অর্থের ক্ষেত্রে। ভারতবর্ষে রায় উপাধি সরাসরি কেউ প্রদান করতেন না , কারণ এটি মূলত একটি ঐতিহাসিক উপাধি বা পদবি যা রাজকীয়তা ও আভিজাত্যের সাথে যুক্ত। বিভিন্ন সময়ে এটি শাসকেরা গ্রহণ করতেন এবং ব্রিটিশ আমলে সম্মানসূচক উপাধি হিসেবেও ব্যবহৃত হতো ।  রায় এই উপাধির কিছু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হলো প্রারম্ভিক ব্যবহার যেখানে বাবর যখন হিন্দুস্তান  জয় করেন তখন তিনি অনেক হিন্দু রাজ্য খুঁজে পান যেখানে অনেক rulers (শাসক) রায় উপাধি ব্যবহার করতেন এবং ব্রিটিশ শাসনামল যেখানে ব্রিটিশরা এই উপাধিকে সম্মান দেখানোর জন্য ব্যবহার করতেন উদাহরণ হিসেবে বলা যায় রায় বাহাদুর ছিল ব্রিটিশদের দেওয়া একটি উপাধি আর  বাংলায়ও এই উপাধি দেখা যেত এবং এটি ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণ এবং ভূমিহারদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল ও সর্বোপরি বলা যায় রায় উপাধি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ঐতিহ্যবাহী ও সম্মানসূচক পদবি যা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গোষ্ঠী ও শাসনকর্তারা ব্যবহার করতেন। তাছাড়া বাবর ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিলের পানিপথের প্রথম যুদ্ধে দিল্লি সালতানাতের শাসক ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে হিন্দুস্তান জয় করেন এবং মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন ও এই বিজয়ের মাধ্যমে বাবর আগ্রা ও দিল্লির শাসনভার অর্জন করেন এবং তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ হয় বলা যায়। ১৯৩৯ সালের ৮ জুন ব্রিটিশ সম্রাট ষষ্ঠ জর্জের জন্মদিবস উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা রাজা নলিনাক্ষ রায়কে রাজা উপাধি প্রদান করা হয় ও

এই উপাধি চাকমা রাজবংশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আর  রাজা নলিনাক্ষ রায় ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা রাজা ও  এই উপাধি পাওয়া তাঁর পিতা ও মাতা উভয়েরই এক ঐতিহ্য ছিল আর 

 এটি একটি বিশেষ সম্মান ছিল যা ব্রিটিশ সরকার দ্বারা প্রদত্ত হয়েছিল। সর্বোপরি বলা যায় রায় উপাধিটি ব্রিটিশরা প্রদান করেননি বরং এটি চাকমা সমাজে একটি ঐতিহ্যবাহী ও বংশগত উপাধি ছিল এবং এর প্রচলন অনেক আগে থেকেই ছিল যা প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হতো। মূলত ১৯৩৯ সালে ইংরেজ সম্রাট কর্তৃক নলিনাক্ষ রায়কে রাজা উপাধি প্রদান যা তাঁদের রাজকীয় অবস্থানকে আরও জোরদার করে ও এই উপাধিটি পরবর্তী রাজাদের মধ্যেও প্রচলিত হয়। বস্তুত রায় উপাধিটি রাজকীয়ভাবে এবং প্রশাসনিকভাবে ব্যবহৃত হতো যা মূলত মোঘল আমল থেকেই প্রচলিত ছিল। আবার এটিও দেখতে পাওয়া 

 চাকমা রাজা হরিশচন্দ্রকে রায় বাহাদুর উপাধি প্রদান করা হয়েছিল ও  ব্রিটিশ ভারত সরকার হরিশচন্দ্রকে এই উপাধি দিয়েছিলেন তাঁর সেবার স্বীকৃতি হিসেবে ও 

রাজা হারিশ চন্দ্র রায় ছিলেন চাকমা সার্কেলের ৪৭তম রাজা এবং তাঁর পূর্বসূরি কালিন্দী রানী ও উত্তরসূরি হলেন ভুবন মোহন রায় আর  তিনি ১৮৭৩ সালে প্রধান এবং ১৮৭৪ সালে রাজা হন । রাজা হারিশ চন্দ্র রায় তাঁর জন্ম ১৮৪১ পার্বত্য চট্টগ্রাম ,  ব্রিটিশ ভারত ও মৃত্যু ১৮৮৫ সালে আর তাঁর দাম্পত্য সঙ্গী হলেন দয়া ময়ী । তাছাড়া ষষ্ঠ জর্জ ১৯৩৬ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের রাজা হিসেবে ছিলেন ও তাঁর মৃত্যু পরবর্তীকালে রাজ্যভার অর্পিত হয় তাঁর সুযোগ্যা জ্যেষ্ঠা কন্যা রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের কাঁধে ও তাঁর ৭০ বছর ২১৪ দিনের রাজত্ব ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ইতিহাসে দীর্ঘতম এবং তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় যাবত ক্ষমতায় থাকা নারী রাষ্ট্রপ্রধান ও তিনি ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের রানি ছিলেন আর তাঁর মৃত্যুর পর তৃতীয় চার্লস বা চার্লস ফিলিপ আর্থার জর্জ হলেন যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য ১৪টি কমনওয়েলথ রাষ্ট্রের বর্তমান রাজা।  

রায় উপাধি প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ আমল থেকে পরবর্তী রাজাদের দেওয়া হতো এবং রায়বাহাদুর  ছিল ভারতে ব্রিটিশ শাসনামলে প্রদত্ত একটি সম্মানসূচক উপাধি যা সাম্রাজ্যের প্রতি অসামান্য সেবা বা জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য ব্যক্তিদের দেওয়া হতো এবং এই উপাধিটি প্রধানত হিন্দুদের দেওয়া হতো , তবে একই ধরনের উপাধি মুসলিম ও পার্সি প্রজাদের জন্য ছিল যা খান বাহাদুর এবং শিখদের জন্য ছিল সর্দার বাহাদুর ও রায় বা রাও শব্দের অর্থ রাজা এবং বাহাদুর শব্দের অর্থ হলো সাহসী ও  ১৯১১ সাল থেকে এই উপাধির সাথে একটি সম্মানসূচক পদক (টাইটেল ব্যাজ) দেওয়া হতো। দেখতে পাওয়া যায় খুবই সম্ভবত ব্রিটিশ শাসনামলে  ভুবনমোহন রায়ের রাজত্বের সময় থেকে সরকারিভাবে রায়  উপাধি যুক্ত হতে শুরু করে যা পরবর্তীতে রাজা নলিনাক্ষ রায় এবং রাজা ত্রিলোক্যনাথ রায় এবং রাজা ত্রিদিব রায়ের মতো রাজাদের নাম ও পরিচয়ের সাথে যুক্ত হয়ে একটি প্রথা হিসেবে স্থায়ী হয় ।   ১৯ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ সরকার যখন পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি পৃথক জেলা হিসেবে গঠন করেন তখন থেকে রাজাদের উপাধির ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন আসে বলা যায় এবং প্রথাগত স্থিতিশীলতা যেখানে এই সরকারি উপাধি পরবর্তীতে একটি প্রথা হিসেবে গৃহীত হয় যা পরবর্তী চাকমা রাজাদের নাম ও পরিচয়ে রায় উপাধি যুক্ত হতে সাহায্য করে আর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হলো এই উপাধি গ্রহণের ফলে চাকমা রাজাদের একটি 

  নির্দিষ্ট ব্রিটিশ সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ও এটি তাঁদের পরিচয় ও ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছিল যা ব্রিটিশদের সাথে তাঁদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তোলে আর ব্রিটিশরা এই অঞ্চলের ক্ষমতাশালী ব্যক্তি বিশেষ করে যাঁরা তাদের বশীভূত হতেন তাঁদের এই ধরনের উপাধি দিয়ে সম্মানিত করতেন যা তাঁদের সামাজিক মর্যাদা ও স্বীকৃতি বাড়াতেন বলা যেতে পারে । পাশাপাশি এটিও বলা যায় রায় হিন্দু সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল প্রচলিত উপাধি যা একদিকে যেমন রাজকীয় ঐতিহ্য বহন করে থাকে আবার অন্যদিকে সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক পরিচয়কেও নির্দেশ করে ও অনেক প্রভাবশালী পরিবারে বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের পরিবারে এই উপাধির ব্যবহার দেখা যায়  উদাহরণস্বরূপ বলা যায় রাজা রামমোহন রায়ের পরিবারে নবাব সরকার প্রদত্ত রায় উপাধির ব্যবহার প্রচলিত ছিল এবং  এটি সম্মান বা মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হতো আর রাজা রামমোহন রায় ( ১৭৭২ –  ১৮৩৩) একজন ভারতীয় সমাজ সংস্কারক ও তিনি ১৮২৮ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের একটি সামাজিক ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন ব্রাহ্মসভার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ও মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ তাঁকে রাজা উপাধি দিয়েছিলেন ও তিনি একাধারে ভারতীয় ধর্মীয় ও সামাজিক এবং শিক্ষা সংস্কারক ।  নবাব সরকার  বলতে সম্ভবত ভারতীয় উপমহাদেশে  মুঘল সুবেদারদের দ্বারা গঠিত নব্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়ে থাকে যেখানে মুঘল সম্রাটদের অধীনস্থ আঞ্চলিক প্রশাসক বা নবাবরা নিজেদের শাসনাধীনে থাকা অঞ্চলগুলোর শাসনভার গ্রহণ করেন ও এই ব্যবস্থাটি নবাবি আমল নামে পরিচিত এবং এটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থানের আগে পর্যন্ত টিকে ছিল যার চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটে পলাশীর যুদ্ধের পর ও 

 রাজা রামমোহন রায়ের পরিবারের রায় উপাধি ব্যবহারের কারণ ছিল তাদের পূর্বপুরুষের সরকারি পদবি যা বাদশাহ ফররুখশিয়ারের আমলে তাঁর প্রপিতামহ সুবেদারের অধীনে আমিনের কাজ করতেন যা থেকেই রায় উপাধির প্রচলন হয় এবং বাদশাহ ফররুখশিয়ার ছিলেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রপৌত্র এবং ১৭২১ থেকে ১৭২৯ সাল পর্যন্ত মুঘল সম্রাট ছিলেন ও তিনি ১৭১৩ সালে তাঁর চাচা জাহান্দার শাহকে পরাজিত করে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ফররুখশিয়ার ফরমান জারি করেন যা ভারতীয় স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলেছিল ও  ১৭১৯ সালে সাইয়্যেদ ভাইয়েরা তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং পরে হত্যা করেন ও ফররুখশিয়ার ফরমান (১৭১৭ সাল ) যেখানে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলায় ও বিহারে এবং উড়িষ্যায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সুযোগ দিয়ে তিনি একটি ফরমান জারি করেন যা এটি ইংরেজদের বাণিজ্যিক আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করে এবং ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় ।  নবাবী আমল ছিল বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যা পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল এবং এই আমলের শাসন ও সামাজিক প্রভাব বাঙালি হিসেবে ইতিহাসের শেকড় বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলা যায় এবং মুর্শিদকুলি খান বাংলা নবাবী রাজবংশের সূচনা করেন যিনি ১৭১৭ সাল থেকে ১৭২৭ সাল পর্যন্ত শাসন করেন ও ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় এর সমাপ্তি নির্দেশ করে এবং  এই সময়কালে বাংলার নবাবরা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা অঞ্চলের প্রকৃত স্বাধীন শাসক ছিলেন ও এটির 

মূল বৈশিষ্ট্য হলো প্রকৃত স্বাধীনতা যেখানে ১৭০৪ সালের পর থেকে সুবাকে নিজামত বলা হতো এবং সুবাদারের বদলে নাজিমরা এখানকার শাসক হতেন

 যা মুঘল সম্রাটদের কাছ থেকে শুধু অনুমোদন নিয়ে কার্যকর হতো ।  সুবেদার পদের ইতিহাস মুঘল সাম্রাজ্যে শুরু হয় যেখানে এটি একটি প্রদেশের গভর্নরকে বোঝাতো। ব্রিটিশ শাসনামলে এই পদটি একজন ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তার জন্য অধিনায়কের সমতুল্য একটি পদবিতে রূপান্তরিত হয়। 

নাজিম বলতে মূলত নায়েব নাজিমদের বোঝানো হয়ে থাকে যারা মুঘল শাসনামলের পরবর্তীকালে বাংলার নবাবের অধীনে ঢাকা থেকে শাসন পরিচালনা করতেন আর আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের পতন শুরু হলে মুর্শিদকুলী খান বাংলায় একটি অর্ধস্বাধীন শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন যা নবাবী শাসন নামে পরিচিত ও এরপর ১৭০৭ সাল থেকে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত ঢাকাতে নায়েব নাজিমরা রাজস্ব সংগ্রহ ,  বিচারকার্য পরিচালনা এবং সামরিক ও নৌবাহিনীর দেখাশোনা করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন যা ঢাকার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।  সুবাকে নিজামত বলতে মুঘল আমলে সুবার (প্রদেশ) প্রশাসনিক ব্যবস্থা বোঝায় যেখানে রাজস্ব আদায়ের জন্য দীউয়ানি এবং আইনশৃঙ্খলা ও শাসনের জন্য নিজামত নামক দুটি প্রধান বিভাগ ছিল আর নিজামত বিভাগটি সুবার প্রধান নাজিম  বা সুবাদার দ্বারা পরিচালিত হতো যিনি প্রদেশের শাসনকার্যের জন্য দায়ী ছিলেন ও এই ব্যবস্থাটি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোর একটি অংশ ছিল আর এই দুটি বিভাগ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতো এবং মুঘল সাম্রাজ্যের সুশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করতো । 

সর্বোপরি বলা যায় আবারো নবাবী আমল বলতে বাংলায় অষ্টাদশ শতাব্দীর মুঘল শাসনের সুবা নিজামত বা নওয়াবি শাসনকে বোঝায় যা মুর্শিদকুলি খান কর্তৃক ১৭১৭ সালে এর সূচনা হয় এবং ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ও ব্রিটিশদের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটে ।  রাজা রামমোহন রায়ের পরিবারের  পূর্বপুরুষেরা বাদশাহ ফররুখশিয়ারের আমলে তাঁর প্রপিতামহ সুবেদারের অধীনে আমিনের কাজ করতেন যা থেকেই রায় উপাধির প্রচলন হয় আর সুবেদার বা সুবাদার হলেন মোঘল আমলে প্রদেশের প্রশাসক বা গভর্নর ও এই পদে থাকা ব্যক্তিকে নাজিম বা সাহিব-ই-সুবাহ নামেও ডাকা হতো এবং তিনি সামরিক বাহিনীর অধিনায়কও ছিলেন ।  আমিনের কাজ বলতে সাধারণত জমি পরিমাপ ,  ভাগবন্টন এবং সীমানা নির্ধারণের কাজকে বোঝায় যেখানে আমিনরা বিশ্বস্ততার সাথে শুদ্ধভাবে এই কাজটি করে থাকেন এবং তারা ভূমি জরিপে সহায়তা করেন এবং তাদের কাজ মূলত একটি নির্দিষ্ট এলাকার জমির সঠিক মাপ ,  অংশ নির্ধারণ এবং সীমানা চিহ্নিত করার সাথে জড়িত থাকে । প্রকৃতপক্ষে  রায় মূলত ভারতীয় উপমহাদেশে রাজকীয়তা ও আভিজাত্যের একটি ঐতিহাসিক শিরোনাম যা রাজা বা প্রধানদের দ্বারা ব্যবহৃত হতো এবং হিন্দুদের ক্ষেত্রে রায় এমন একটি উপাধি যা রাজকীয়তা ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং এটি অনেক হিন্দু পরিবারে পদবি হিসেবে প্রচলিত । তাছাড়া বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী  যেখানে বাঙালি কায়স্থ ছাড়াও অন্যান্য কিছু জাতি যেমনঃ  বর্মন ,  বৈদ্যব্রাহ্মণ ,  মাহিষ্য এবং কিছু তপশিলি জাতির মধ্যেও এই পদবি দেখা যায় আর  সত্যজিৎ রায়ের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিরাও এই উপাধি ব্যবহার করেন এবং  ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রায় উপাধিটি রাজন্যবর্গ এবং প্রধানদের দ্বারা ব্যবহৃত হতো। উল্লেখিত বর্মন বলতে বিভিন্ন ঐতিহাসিক রাজবংশ ,  উপাধি  বা উপজাতিকে বোঝানো হয়ে থাকে ও এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কামরূপ রাজ্যের বর্মন রাজবংশ  যা পুষ্যবর্মণ প্রতিষ্ঠা করেন ও পুষ্যবর্মণ (রাজত্বকাল ৩৫০-৩৭৪ খ্রিস্টাব্দ) কামরূপ রাজ্য শাসনকারী বর্মণ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম রাজা ছিলেন এবং  বৈদ্য ব্রাহ্মণ বলতে এমন একটি প্রাচীন বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়কে বোঝানো হয় যারা মূলত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক বা কবিরাজ হিসেবে পরিচিত আর তাদের মধ্যে একটি প্রচলিত মতানুসারে তারা প্রাচীনকালে ব্রাহ্মণ হওয়ার পাশাপাশি আয়ুর্বেদ চর্চা করতেন এবং মাহিষ্য হলো বাংলার একটি হিন্দু সম্প্রদায় যারা মূলত কৃষিপ্রধান ছিলেন এবং অবিভক্ত বাংলায় অন্যতম বৃহত্তম সম্প্রদায় গঠন করেছিলেন আর ঐতিহাসিকভাবে এই সম্প্রদায়কে মধ্যম শূদ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় ও এটি বিভিন্ন পেশা ও সামাজিক স্তরের মানুষ নিয়ে গঠিত আর বাংলার ইতিহাসে মাহিষ্যরা একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ ও প্রভাবশালী সম্প্রদায় ছিলেন ও এঁদের মধ্যে রাণী রাসমণির মতো ব্যক্তিত্বও রয়েছেন আর রাসমণি দাস  যিনি লোকমাতা রানী রাসমণি নামেও পরিচিত (  ১৭৯৩ –  ১৮৬১) ছিলেন একজন ভারতীয় ব্যবসায়ী ,  উদ্যোক্তা ,  জমিদার , সমাজসেবী ও কলকাতার দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা এবং  তফসিলি জাতি হলো ভারতের সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত কিছু নির্দিষ্ট সম্প্রদায় যারা ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে ছিলেন ও ব্রিটিশ শাসনামলে এদের অনুন্নত শ্রেণি (Depressed classes) হিসেবে চিহ্নিত করা হতো ও তফসিলি জাতি (Scheduled Castes) বা এসসি (SC) ও তফসিলি জনজাতি (Scheduled Tribes) বা এসটি (ST) যেখানে ভারতে তাদের স্বার্থ রক্ষা এবং উন্নতির জন্য বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প ও আইন রয়েছে এবং  সত্যজিৎ রায় ছিলেন একজন প্রখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক ,  চিত্রনাট্যকার ,  লেখক ও সঙ্গীত পরিচালক যিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত ,  সুতরাং রায় পদবী ভারতে অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ,  যদিও এর ব্যবহার বিভিন্ন সময়ে ও অঞ্চলে ভিন্ন ছিল ও এটি একটি ঐতিহাসিক উপাধি যা ভারতীয় উপমহাদেশে রাজকীয়তা ও আভিজাত্যের প্রতীক ছিল এবং  রায় পদবীটি বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত আছে এখনো ও এটি ব্রিটিশ শাসনামলে সম্মানসূচক উপাধি হিসেবে  ব্যবহৃত হতো। পাশাপাশি এটিও বলা প্রয়োজন ভারতবর্ষে মুসলিমদের সম্মানসূচক ও ঐতিহ্যবাহী উপাধিগুলোর মধ্যে শেখ ,  সৈয়দ , চিশতি ,  খান , মজুমদার , সরকার , তালুকদার , প্রামাণিক এবং মন্ডল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আর এর মধ্যে শেখ একটি আরবি শব্দ যা মূলত একজন গোত্রপ্রধান ও ধর্মীয় পণ্ডিত বা সমাজের বড্যকে বোঝায় ও সৈয়দ উপাধিটি দ্বারা নবী মুহাম্মদ (সাঃ) উনার বংশধরদের বোঝানো হয়ে থাকে এবং অন্যান্য পদবিগুলো যেমন মজুমদার , সরকার , তালুকদার ইত্যাদি প্রশাসনিক এবং জমিজমা মালিকানা সম্পর্কিত ভূমিকা থেকে উদ্ভূত আর সমাজের কাঠামো বা বড্য বলতে বোঝানো হয়ে থাকে মানুষের সংঘবদ্ধ জীবন , সাধারণ উদ্দেশ্য , 

অভিন্ন নিয়মকানুন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক স্তরবিন্যাস ও সামাজিক সম্পর্ক । পাশাপাশি এটিও বলা যায় ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক উপাধি হলো চিশতি এবং আউলিয়া । তাছাড়া প্রশাসনিক ও জমি মালিকানা সম্পর্কিত উপাধি হলো মজুমদার যিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও 

সরকার যিনি প্রশাসনিক বা বিচারিক কাজের সাথে সম্পর্কিত ও প্রামাণিক যিনি সমাজের শৃঙ্খলা ও বিচারিক ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি ও মন্ডল যিনি গ্রামের প্রধান বা মোড়ল ও তালুকদার যিনি তালুকের মালিক বা ভূমির মালিক । আবার কিছু সম্মানসূচক উপাধি হলো শেখ যেখানে এটি একটি আরবি শব্দ যার অর্থ প্রধান, শিক্ষক বা বয়স্ক ব্যক্তি এবং সৈয়দ যেখানে এই উপাধিটি নবীজি মুহাম্মদ (সাঃ) উনার বংশধরদের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং খান যেখানে এটি একটি সম্মানসূচক উপাধি যা সাধারণত শাসক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বোঝাতো এবং হাকিম যেখানে এটি ডাক্তার বা বিচারক অর্থে ব্যবহৃত হতো। আবার ভারতবর্ষে হিন্দুদের জন্য সম্মানজনক উপাধির মধ্যে রয়েছে গুরু ,  জগদ্গুরু , রাজজয়ী , রায়মুকুট , মহাচার্য এবং বিভিন্ন পেশাভিত্তিক উপাধি । এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রেক্ষাপটে দাস বা দেবী শব্দগুলোও ব্যবহার করা হতো যা ভক্তি বা শ্রদ্ধার প্রকাশ বলা যেতে পারে । আবার এর মধ্যে সম্পর্কযুক্ত পেশা ও পদভিত্তিক উপাধি ও রাজকীয় উপাধি ও অন্যান্য উপাধি  তো আছেই । তাছাড়া ভারতবর্ষে বৌদ্ধদের জন্য আচার্য একটি সম্মানজনক উপাধি যা মূলত পণ্ডিত ও শিক্ষাবিদদের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে  ।  সর্বোপরি বলা যেতে পারে উপাধির প্রচলনের ইতিহাস

প্রাচীন যুগ বা ভারতীয় সভ্যতার প্রাচীনতম পর্যায়ে , কিন্তু সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতায় উপাধি ব্যবহারের কোনো প্রমাণ নেই ।  আবার  প্রাচীন ভারতে উপাধির প্রচলন ছিল ,  তবে আধুনিক কালের মতো এত ব্যাপক ছিল না । কিন্তু  মধ্যযুগের শেষের দিকে অর্থাৎ প্রায় ১৫ শতকের দিকে মানুষেরা তাদের নামের সঙ্গে গ্রাম ,  পিতা বা পেশার নাম যুক্ত করতে শুরু করেন যা ছিল উপাধি ব্যবহারের প্রথম পর্যায়। আর আধুনিক যুগে সময়ের সাথে সাথে এই প্রথাটি আরও বিস্তৃত হয় এবং বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত কারণে মানুষ উপাধি গ্রহণ করতে শুরু করেন ও উপাধির উৎস হলো 

উপাধি মূলত তিন ধরনের হতে পারে যা 

ক/ গ্রাম বা স্থানের নাম যেখানে কোনো নির্দিষ্ট গ্রামের নাম থেকে উপাধি তৈরি হওয়া এবং খ/ পেশা যেখানে নির্দিষ্ট পেশা থেকে আসা উপাধি ও গ/  পিতার নাম যেখানে পিতার নামের সাথে প্রত্যয় যোগ করে উপাধি তৈরি করা হতে পারে রাজীবের পুত্র থেকে রাজীবী বা অন্য কোনো উপাধি । বস্তুত ভারতবর্ষে উপাধি ব্যবহারের নির্দিষ্ট কোনো সময়কাল চিহ্নিত করা কঠিন ,  তবে মধ্যযুগের শেষের দিকে এবং পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে উপাধি বা পদবি ব্যবহারের প্রচলন বাড়ে। শুরুর দিকে মানুষ পেশা বা জন্মস্থান বা পিতার নাম নামের সঙ্গে যোগ করতেন এবং ধীরে ধীরে এগুলো স্থায়ী উপাধিতে রূপ নেয় , সুতরাং উপাধি ব্যবহারের নির্দিষ্ট একটি সময়কাল বলা সম্ভব না হলেও মধ্যযুগ থেকে এটি প্রচলিত হতে শুরু করে এবং আধুনিক যুগে এর ব্যবহার আরও ব্যাপক ও সুসংহত হয় বলা যায় আর 

আধুনিক কালের পদবীর প্রচলন হয় মূলত মধ্যযুগে । তাছাড়া ভারতবর্ষে মধ্যযুগের সময়কাল সাধারণত ৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ধরা হয় , তবে এর শুরু ও শেষ নিয়ে কিছু ভিন্নমত আছে ও এই সময়কালকে প্রাথমিক মধ্যযুগ (৫০০-১০০০ খ্রিস্টাব্দ) ও শেষ মধ্যযুগে (১০০০-১৫০০ খ্রিস্টাব্দ) ভাগ করা যায় এবং এটি শেষ হয় মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থানের সাথে সাথে। পাশাপাশি ভারতবর্ষে প্রাচীন যুগের সময়কাল প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু হয়ে প্রায় গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত অর্থাৎ আনুমানিক ৫০০ খ্রিস্টীয় সাল পর্যন্ত বিস্তৃত বলে মনে করা হয়ে থাকে এবং এই সময়কালের মধ্যে সিন্ধু সভ্যতা (৩৩০০-১৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) ও বৈদিক যুগ এবং মৌর্য ,  কুষাণ ,  গুপ্ত সাম্রাজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া ভারতবর্ষের আধুনিক যুগের সময়কাল মূলত ১৮শ শতাব্দী থেকে শুরু করে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত বলে ধরা হয়ে থাকে, যদিও এই সময়সীমা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক মতভেদ‌ও দেখা যায় ও মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে , এটির মূল কারণ হলো এই সময়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলো ভারতে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করতে শুরু করেন এবং মুঘল যুগের অবসান ঘটান ।  তাছাড়া চাকমাদের পদবীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দেওয়ান ,  রায় ,  খাঁ , খীসা ও তালুকদার । আবার এটিও দেখতে পাওয়া যায় চাকমা প্রধানদের বংশধারা ১১শ শতক বা ১৬শ শতকের মধ্যভাগে শুরু হয়েছে বলে ধারণা করা হয় আর চাকমা লোককাহিনী এবং ঐতিহ্য অনুযায়ী চাকমাদের উৎপত্তি ভারতের আধুনিক ভাগলপুর এলাকার যোদ্ধা বর্ণ থেকে ও বিশ্বাস করা হয় যে কিংবদন্তিতুল্য রাজা বিজয় গিরি (প্রায় ১৬৩০) চাকমা জনগণের পূর্বপুরুষদের নাফ নদীর উত্তরে নিয়ে আসেন এবং রাখাইন জনগণের সাথে আন্তর্বিবাহের মাধ্যমে চাকমারা শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধধর্মে ধর্মান্তরিত হন , বস্তুত বিদ্যমান ঐতিহাসিক রেকর্ডগুলো ১৭০০ সালের দিকের। মূলত দেখতে দেখতে পাওয়া যায় মোগল সাম্রাজ্যের চাকমা অঞ্চল সম্প্রসারণের পর চাকমা প্রধানরা বিনিময়ে খাজনা প্রদানের শর্তে মোঘল নাম এবং উপাধি ( খান) গ্রহণ করেন। মূলত ভারতের আধুনিক ভাগলপুর এলাকার যোদ্ধা বর্ণের সুনির্দিষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না ।  ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে ভাগলপুর অঞ্চলের যোদ্ধা বর্ণের কোনো নির্দিষ্ট নাম বা পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি , তাই এই তথ্যটি লোককাহিনী ও ঐতিহ্য থেকে প্রাপ্ত হতে পারে। ভাগলপুর একটি ঐতিহাসিক শহর এবং এটি প্রাচীন বিক্রমশিলা মহাবিহারের জন্য পরিচিত ,  যদিও ভাগলপুর ও এর আশেপাশের অঞ্চল ইতিহাসে বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী ,  তবুও নির্দিষ্ট কোনো যোদ্ধা বর্ণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। ভাগলপুর বিক্রমশিলা মহাবিহার ছিল পাল রাজা ধর্মপাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি বিখ্যাত বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র যা নালন্দার সমতুল্য ছিল এবং এটি বর্তমানে বিহারের ভাগলপুর জেলার অন্তিচক গ্রামে অবস্থিত। পাল সাম্রাজ্যের সময় এটির মাধ্যমে প্রায় এক হাজার ছাত্র ও শতাধিক শিক্ষকসহ একটি বৃহত্তম মহাবিহার ছিল।  পাল রাজবংশের রাজা ধর্মপাল এই মহাবিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন।  খ্রিস্টীয় ৮ম শতাব্দীর শেষের দিকে এবং ৯ম শতাব্দীর প্রথম দিকে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদানের স্তরে হ্রাসের প্রতিক্রিয়ায় ধর্মপাল বিক্রমশিলা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আর  এই মহাবিহারটি তাঁর প্রতিষ্ঠাতা রাজা ধর্মপালের বিক্রমশীল উপাধির নামে পরিচিত ও এটি বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যের ভাগলপুর জেলার অন্তিচক গ্রামে অবস্থিত আর 

 নালন্দার পাশাপাশি বিক্রমশিলাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র ছিল এবং এটি ভারত ও এর বাইরেও সুপরিচিত ছিল আর বিক্রমশীলা মহাবিহারের স্মৃতি রক্ষার্থে এর কাছেই ভাগলপুর-অন্তিচক গঙ্গা নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে যা বিক্রমশীলা সেতু নামে পরিচিত এবং সর্বোপরি এই শিক্ষাকেন্দ্রটি ছিল প্রাচীন ভারতের বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র । মূলত পাল রাজবংশের দ্বিতীয় এবং সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন ধর্মপাল যিনি তাঁর পিতা গোপাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজ্যকে শক্তিশালী করে উত্তর ভারতে পালদের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। 

 তাঁর সুদীর্ঘ রাজত্বকালে (আনুমানিক ৭৭৫-৮১০ খ্রিষ্টাব্দ) ধর্ম , শিক্ষা ,  শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে এবং তিনি বাংলায় একটি সুবর্ণযুগ এনে দেন আর তিনি ছিলেন একজন সুনিপুণ যোদ্ধা ও কূটনীতিজ্ঞ এবং  শিল্প ,  সাহিত্য ও স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন বলা যায় । তিনি পাল সাম্রাজ্যকে উত্তর ভারতে শক্তিশালী করে তোলেন ও 

তাঁর সময়ে ধর্ম , শিক্ষা ,  শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয় এবং  ধর্মপালকে পাল বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে যেখানে তিনি বাংলায় পাল যুগের সুবর্ণযুগের সূচনা করেন এবং তিনি ছিলেন বৌদ্ধধর্মের মহাযান শাখার অনুগামী। তাছাড়া পাল সাম্রাজ্যের সময়কাল ছিল আনুমানিক আট শতকের মাঝামাঝি থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ,  অর্থাৎ প্রায় চার শতাব্দী ধরে। এই রাজবংশ বাংলা ও বিহার অঞ্চলে শাসন করেছিলেন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গোপাল ও  এই সাম্রাজ্যের নামকরণ করা হয় এই সাম্রাজ্যের শাসক পাল রাজবংশের নামানুসারে যার অর্থ হলো রক্ষাকর্তা । 

পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা গোপাল যিনি প্রায় ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত  পাল রাজবংশের প্রথম রাজা ছিলেন এবং তিনি বাংলার অরাজক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে গৌড়ের আঞ্চলিক নেতাদের দ্বারা নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং সিংহাসনে আরোহণ করেন ও তাঁর শাসনের সময়কাল ছিল প্রায় ৭৫০ – ৭৬৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আনুমানিক। বস্তুত শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় যে দীর্ঘকালীন অরাজকতা চলছিল তা থেকে মুক্তি পেতে বাংলার প্রবীণ নেতারা গোপালকে রাজপদে নির্বাচিত করেন এবং গোপাল বাংলায় একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন যা পরবর্তীকালে পাল সাম্রাজ্য নামে পরিচিত হয় আর 

তাঁর পুত্র ধর্মপাল পরবর্তীকালে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং পাল সাম্রাজ্যের গৌরব বৃদ্ধি করেন বলা যায়। মূলত শশাঙ্ক কোনো বংশের রাজা ছিলেন না ,  তিনি ছিলেন প্রাচীন বাংলার গৌড় রাজ্যের প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজা। তিনি গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন যা বাংলা অঞ্চলের ইতিহাসে বাঙালীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রথম স্বাধীন রাজ্য হিসেবে পরিচিত । তাছাড়া গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা হলো শশাঙ্ক বাংলার বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদকে একত্রিত করে সুবিশাল গৌড় রাজ্য গড়ে তোলেন ও  তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ যা বর্তমান মুর্শিদাবাদে অবস্থিত ছিল এবং 

তিনি আনুমানিক ৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ৭ম শতাব্দীর প্রথম দিকে রাজত্ব করেছিলেন ও যার মধ্যে ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দের একটি সময়কালও ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেন।  সুতরাং চাকমা লোককাহিনী এবং ঐতিহ্য অনুযায়ী চাকমাদের উৎপত্তি ভারতের আধুনিক ভাগলপুর এলাকার যোদ্ধা বর্ণ থেকে আর ভাগলপুর  ভারতের বিহার রাজ্যের ভাগলপুর জেলার একটি শহর ও পৌর কর্পোরেশনাধীন এলাকা ।  যোদ্ধা বর্ণ শব্দটি ক্ষত্রিয় বর্ণকে বোঝায় যা প্রাচীন হিন্দু সামাজিক বর্ণপ্রথার একটি অংশ ও এই বর্ণ সাধারণত শাসক ,  যোদ্ধা এবং প্রশাসন বা সামরিক পেশার ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হতো বলা যায়।  প্রাচীন ভারতে শুরুতে বর্ণ ব্যবস্থা মূলত বর্ণকে কেন্দ্র করে ছিল যেখানে ব্রাহ্মণ (পুরোহিত) ও ক্ষত্রিয় (শাসক এবং যোদ্ধা)  তারপরে বৈশ্য (ব্যবসায়ী ও বণিক) এবং অবশেষে শূদ্র (শ্রমিক) ছিলেন । ভারতের বর্ণ ব্যবস্থা হলো বর্ণের উপর ভিত্তি করে সামাজিক শ্রেণীবিভাগের একটি আদর্শ নৃতাত্ত্বিক উদাহরণ ।  বর্ণ (  Caste )  বা জাত অথবা জাতি হলো একটি নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠী যেখানে একজন ব্যক্তি সামাজিক স্তরবিন্যাসের একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন যা একটি জাতি ব্যবস্থা । ভারতে বর্ণ প্রথা ( Caste system in India )  এর উৎপত্তি প্রাচীন ভারতে এবং মধ্যযুগীয় ও  আদি আধুনিক এবং আধুনিক ভারতে বিশেষ করে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন এবং ব্রিটিশ রাজ প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা রূপান্তরিত হয়েছিল । যোদ্ধা বর্ণ বলতে সনাতন হিন্দু সমাজের চারটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক শ্রেণীর একটি হলো ক্ষত্রিয়কে বোঝানো হয়ে থাকে যা মূলত শাসক ও যোদ্ধা এবং সমাজরক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব করে। এই বর্ণ তাদের জন্য নির্ধারিত যারা যুদ্ধ করেন ও রাজ্য পরিচালনা করেন এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখেন । সহজ ভাষায় যখন যোদ্ধা বর্ণ শব্দটি ব্যবহৃত হয় তখন এটি ক্ষত্রিয় বর্ণকে নির্দেশ করে যারা ভারতের ঐতিহ্যবাহী বর্ণব্যবস্থার একটি অংশ এবং যাদের প্রধান কাজ ছিল সমাজের যোদ্ধা ও শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা।  কিন্তু ভারতের আধুনিক ভাগলপুর এলাকার যোদ্ধা বর্ণ এবং চাকমা জাতির মধ্যে প্রত্যক্ষ ও সরাসরি কোনো ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে বলে তথ্য পাওয়া যায় না। চাকমা জাতি মূলত মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত এবং দক্ষিণপূর্ব এশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গভীর আর তাদের ইতিহাস ও বসবাসের এলাকা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ভারতের আসাম ,  ত্রিপুরা ও অন্যান্য অঞ্চলে সীমাবদ্ধ যেখানে তারা তাদের নিজস্ব ভাষা এবং রীতিনীতি ও ধর্ম পালন করেন। ভাগলপুর এলাকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও এখানকার যোদ্ধা বর্ণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই আর চাকমা জাতির ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব মূলত দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ও ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সীমাবদ্ধ  ,  সুতরাং বলা যায়  চাকমাদের সাথে ক্ষত্রিয় সম্পর্কের ধারণাটি তাদের নিজস্ব কিংবদন্তী ও সাংস্কৃতিক উৎস থেকে উদ্ভূত যা তাদের একটি বিজয়ী গোষ্ঠীর অংশ হিসাবে উল্লেখ করে ,  কিন্তু সরাসরি কোনো ক্ষত্রিয় সম্প্রদায়ের সাথে তাদের জাতিগত সম্পর্ক স্থাপন করে না । আবার একেবারে সম্পর্ক নেই তাও বলা যায়না ,  কারণ  চাকমাদের পূর্বপুরুষেরা প্রাচীন শাক্য বংশ বা ক্ষত্রিয়দের একটি অংশ থেকে উদ্ভূত বলে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতবাদ প্রচলিত আছে আর এই মত অনুসারে চাকমারা বুদ্ধের শাক্য বংশের সাথে সম্পর্কিত ও  তাদের ইতিহাস নেপালের কপিলাবস্তু নগরী ও বৌদ্ধ ধর্মের সাথে যুক্ত হতেও পারে ।  চাকমাদের নিজেদের বিশ্বাস ও তাদের ঐতিহ্যগত বিজক (ইতিহাস) এবং গেংখুলী (চারণকবি)দের সূত্র অনুযায়ী তারা নিজেদেরকে সূর্যবংশী ও ক্ষত্রিয় শাক্যদের বংশধর হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন ।  সূর্যবংশী হলো সেই সকল ক্ষত্রিয় যাঁরা নিজেদের সূর্য থেকে আগত বলে বিশ্বাস করেন ও ইক্ষ্বাকু রাজবংশের অন্তর্ভুক্ত যাঁর প্রতিষ্ঠাতা ইক্ষ্বাকু ও  বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম বুদ্ধ এবং তাঁর বংশধরদের যাঁরা ক্ষত্রিয় ছিলেন তাঁরা নিজেদের সূর্যবংশী মনে করতেন । ইক্ষ্বাকু ছিলেন সূর্য রাজবংশ বা ইক্ষ্বাকু বংশের প্রথম রাজা এবং প্রতিষ্ঠাতা ও তিনি বৈবস্বত মনুর পুত্র এবং সূর্য দেবতা থেকে অনুপ্রাণিত ছিলেন বলে মনে করা হয়ে থাকে এবং এই রাজবংশ পরবর্তীতে অযোধ্যায় নিজেদের রাজধানী স্থাপন করেন এবং মহাকাব্য রামায়ণের ভগবান রাম এই বংশের একজন উল্লেখযোগ্য সদস্য ছিলেন । বৈবস্বত মনু হলেন মানবজাতির পূর্বপুরুষ ও সৃষ্টিচক্রের বর্তমান কল্পের সপ্তম মনু। তিনি সূর্যদেব বিবস্বান ও সরণ্যুর পুত্র যিনি শ্রদ্ধাদেব ও সত্যব্রত নামেও পরিচিত। হিন্দু সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে তিনি বিষ্ণুর মৎস্য অবতার কর্তৃক মহাপ্রলয় থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন এবং তিনি মানবজাতির সূচনা করেন।  সূর্যবংশ বা সৌর রাজবংশ মূলত ইক্ষ্বাকু কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাচীন রাজবংশ যাঁরা সূর্যকে তাঁদের পূর্বপুরুষ এবং ঈশ্বর হিসেবে গণ্য করেন। সর্বোপরি বলা যায় ক্ষত্রিয় শাক্যের (Kshatriya Shakya) উৎপত্তি তথা শাক্য বংশ ছিলেন সূর্যবংশী রাজা ইক্ষ্বাকুর বংশধরদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাচীন গোত্র আর  শাক্য বংশের সবচেয়ে বিখ্যাত সদস্য হলেন ভগবান গৌতম বুদ্ধ যিনি শাক্য বংশীয় রাজপুত্র সিদ্ধার্থ নামে পরিচিত ছিলেন এবং  ইক্ষ্বাকু কর্তৃক কোশল রাজ্যে বনবাসে পাঠানো ইক্ষ্বাকুর বংশধররা হিমালয়ের পাদদেশে শাক্য বংশ প্রতিষ্ঠা করেন । কথা থাকে যে ইক্ষ্বাকুর চার পুত্র ও চার কন্যাকে তাঁদের সৎ মাতার ষড়যন্ত্রের কারণে হিমালয়ের পাদদেশের পাহাড়ে বনবাসে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। বনবাসে থাকাকালীন ইক্ষ্বাকুর বংশধরেরা নিজেদের মধ্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ও এর মূল উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা , অর্থাৎ তাঁদের বংশের মর্যাদা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা আর  এই পরিস্থিতিতে তাঁরা হিমালয়ের পাদদেশে কপিলাবস্তু এবং কলি নামে দুটি নতুন নগরের প্রতিষ্ঠা করেন ও  এই নবপ্রতিষ্ঠিত বংশের উত্তরাধিকারীরাই পরবর্তীতে ইতিহাসে শাক্য বংশ নামে পরিচিতি লাভ করেন ,  অর্থাৎ শাক্য বংশের উদ্ভব ঘটে। 

কপিলাবস্তু ছিল প্রাচীন শাক্য বংশের রাজধানী ও গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান যেখানে তিনি তাঁর জীবনের প্রথম ২৯ বছর কাটিয়েছিলেন। এই শহরটি বর্তমানে নেপালে অবস্থিত এবং এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত। আবারো দুই লাইন যুক্ত করি যেখানে দেখতে পাওয়া যায় ভগবান গৌতম বুদ্ধ ও বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে কপিলবস্তু ছিল প্রাচীন শাক্য রাজ্যের রাজধানী যেখানে গৌতম বুদ্ধের জন্ম ও বাল্যকাল অতিবাহিত হয় এবং এটি ঋষি কপিলের নামে পরিচিত। কলি রাজ্য ছিল তার নিকটবর্তী একটি ক্ষত্রিয় রাজ্য যা একসময় কোশল রাজ্যের অংশ ছিল এবং কপিলরাজ্যের সাথে এর সম্পর্ক ছিল। কলি রাজ্যের পৌরাণিক ইতিহাসে  কপিলাবস্তুর কাছেই কলি নামক আরেকটি ক্ষত্রিয় জনপদ ছিল। এই রাজ্যের নামকরণও মহর্ষি কপিলের নামে হয়েছে বলে মনে করা হয়। অনেক সময় কপিলাবস্তু এবং কলি রাজ্যকে একই বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে, কিন্তু কিছু পৌরাণিক কাহিনীতে এদের ভিন্নতা দেখা যায়। তাছাড়া 

এই রাজ্যগুলোর ইতিহাস প্রাচীন ও এর সাথে বৌদ্ধ ধর্মের উত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। 

কপিলাবস্তুর পৌরাণিক ইতিহাসে  ইক্ষ্বাকু বংশের চার পুত্র ও পাঁচ কন্যা বিমাতার চক্রান্তে নির্বাসিত হয়ে মহর্ষি কপিলের আশ্রয়ে যান। মহর্ষির কৃপায় তাঁরা একটি রাজধানী স্থাপন করেন। কপিলপ্রদত্ত হওয়ায় সেই রাজ্য ও রাজধানী কপিলাবস্তু নামে পরিচিত হয়। 

 খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ বা পঞ্চম শতাব্দীতে কপিলাবস্তু ছিল শাক্য প্রজাতন্ত্রের রাজধানী । ঋষি কপিল ছিলেন একজন প্রভাবশালী বৈদিক ঋষি এবং সাংখ্য দর্শনের প্রবর্তক। তিনি হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে ব্রহ্মার পৌত্র এবং ভাগবত পুরাণ সহ বিভিন্ন পুরাণে বিষ্ণুর অবতার হিসেবেও পরিচিত। তাঁর আশ্রম গঙ্গাসাগরের সাথে বিশেষভাবে জড়িত। কপিল মুনির আশ্রম গঙ্গাসাগরের তীর্থস্থানের সঙ্গে যুক্ত যেখানে প্রতি বছর কপিল মুনির আশ্রমকে কেন্দ্র করে গঙ্গাসাগর মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে । হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে তিনি ব্রহ্মার পৌত্র এবং মনুর বংশধর।  বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে তাঁকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে । কলি রাজ্যের কথা বললে বলতে হয় এটি সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট তথ্য দেখতে পাওয়া যায় না , কলি রাজ্য বলতে কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজ্য বোঝায় না ,  বরং এটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়। আবার  পৌরাণিক কলিযুগ এবং কলি জাতির ইতিহাস দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট আর কলি জাতিরা প্রধানত গুজরাট ও হিমাচল প্রদেশে বসবাস করেন ও  তাদের নিজস্ব ভাষা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সংস্কৃতি রয়েছে। আবার কলি  এটি কোনো প্রাচীন শহর বা রাজ্য হতেও পারে যার তথ্য বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার কিছু তথ্য অনুসারে  কলাপ নগর নামে পরিচিত ছিল যেখানে পরবর্তীতে রাজা চম্পক একটি নতুন সুন্দর রাজ্য স্থাপন করেন এবং বৌদ্ধ মঠ ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন ।  

বর্তমানে কলাপ নগরের ইতিহাস সংক্রান্ত বিশদ তথ্য পাওয়া কঠিন ,  তবে এটি চম্পক নগরের ইতিহাসের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। কলাপ নগর ছিল রাজা চম্পকের পরলোকগমন এবং রাজা শ্যামলের সিংহাসন গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ইতিহাস।

চাকমা ইতিহাস অনুযায়ী যখন রাজা শ্যামল পরলোকগমন করেন তখন কলাপ নগরের শাসকেরা এই নগরীর ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে যান। চাকমা ইতিহাসে এটিই প্রথম চম্পক নগর হিসেবে পরিচিত ও 

এটি অচিরাবতী বা ঐরাবতী গঙ্গা নদীর পূর্বাংশে অবস্থিত ছিল। রাজা চম্পক ও চম্পক নগরের ইতিহাসে দেখতে পাওয়া যায় রাজা চম্পক তিনি ছিলেন একজন সৌন্দর্যপ্রেমী এবং সভ্যতার অনুসন্ধানী রাজা । রাজ্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য তিনি বহু সুদৃশ্য বৌদ্ধ মঠ ও মন্দির নির্মাণ করেন ও একটি বিশাল রাজপ্রাসাদ তৈরি করেন যার সঙ্গে মনোরম উপবন ছিল আর তাঁর নামানুসারে এই নগরের নাম রাখা হয় চম্পক নগর । সর্বোপরি আবারো বলা যায় এক কথায় 

রাজা চম্পক ছিলেন একজন সভ্যতার অনুসন্ধানী ও সৌন্দর্যপ্রেমী রাজা যিনি তাঁর নিজের নামে চম্পক নগর নামক একটি সুন্দর শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আর এই নগরটি অচিরাবতী বা ঐরাবতী গঙ্গা নদীর পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল যেখানে তিনি অনেক বৌদ্ধ মঠ ,  মন্দির এবং মনোরম উপবন তৈরি করেছিলেন  যা চাকমা ইতিহাসে প্রথম চম্পক নগর হিসেবে পরিচিত। অচিরাবতী বা ঐরাবতী একটি ঐতিহাসিক নদী যা প্রাচীনকালে চম্পক নগরের কাছাকাছি প্রবাহিত হতো ও  এই নদীর তীরে অনেক ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় ঘটনা ঘটেছিল যার মধ্যে একটি ছিল গৌতম বুদ্ধের ধর্মোপদেশ দান। এটিও বলা প্রয়োজন রাজা চম্পক ও কলাপ নগরের ইতিহাস সম্পর্কিত তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্যের অভাব রয়েছে কারণ এই নামটি সাধারণত প্রচলিত ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত নয়। তবে চম্পক নগর গৌতম বুদ্ধের সময়ের একটি প্রাচীন শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং রাজা চম্পক সম্ভবত এই নগরীর একজন কিংবদন্তি বা ঐতিহাসিক রাজা হতে পারেন , কিন্তু এটির ঐতিহাসিক বিবরণ বা প্রমাণ পাওয়া কঠিন কারণ এই নামটি প্রচলিত ইতিহাসের অংশ নয়। রাজা চম্পক ও কলাপ নগরের ইতিহাস সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না তাই এটি লোককথা বা কিংবদন্তীর অংশ হতে পারে। কলি নগরের ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা এবং আধুনিক অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন ।  বর্তমানে একটি কলি স্থান দেখতে পাওয়া যায় যা ভারতের গুজরাত রাজ্যর  অমদাৱাদ জেলার শহর । সুতরাং বর্তমানে রাজা চম্পক বা কলাপ নগর নিয়ে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন । এটি কোনো প্রাচীন গল্প বা কিংবদন্তীর অংশ যেখানে এই নামগুলো এসেছে এমনটিও হতে পারে ।  বস্তুত পৌরাণিক কাহিনী ও  এই কাহিনীর মাধ্যমে একটি সমাজের সৃষ্টি ,  সংস্কৃতি ,  নৈতিকতা এবং বিশ্বদর্শন বোঝা যায়। আবার এইগুলো কেবল গল্প নয় ,  বরং একটি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি এবং মানুষের জীবনবোধের প্রতিফলন বলা যায়। যদিও এইগুলো কাল্পনিক, কিন্তু প্রাচীনকালের মানুষের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি ও প্রকৃতির বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যা এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে। মূলত পৌরাণিক কাহিনীগুলোতে ভালোমন্দ এবং ন্যায়অন্যায় ও আধ্যাত্মিক উন্নতি ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়ে থাকে যা মানুষের জীবনদর্শনের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাছাড়া বিশ্বজুড়ে সাহিত্য ও শিল্পকলা এবং অন্যান্য মাধ্যমে পৌরাণিক কাহিনীগুলো বারবার ফিরে আসে যা নতুন নতুন সৃষ্টি ও ব্যাখ্যার জন্ম দেয়।  যে সংস্কৃতিতে কাহিনীটি তৈরি হয় সেখানকার সামাজিক ও রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সময়ের পৌরাণিক কাহিনীগুলোর মধ্যে তুলনা করে মানুষের জীবনবোধ ও সভ্যতার বিবর্তন বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে ।  সার্বিকভাবে বলা যায় পৌরাণিক কাহিনীর মূল্যায়ন শুধু অতীতকে জানাই নয় ,  বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকনির্দেশনাও প্রদান করে থাকে। আবার পৌরাণিক কাহিনীর বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ যেখানে কাহিনীর চরিত্র ,  ঘটনা ,  পটভূমি ও সমাধানগুলো বিশ্লেষণ করে এর অন্তর্নিহিত অর্থ বের করার‌ও আবশ্যকতা আছে । এটির কারণ হলো পৌরাণিক কাহিনীগুলো আমাদের নৈতিক ও সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে থাকে । এইগুলো মহাবিশ্ব ও জীবনের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করে ,  ভালোমন্দের ধারণা দেয় এবং বীরত্ব ,  ভালোবাসা ও ত্যাগের মতো মানবিক গুণাবলীগুলোকে তুলে ধরে যা সমাজে ও ব্যক্তিগত জীবনে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ তৈরিতে সাহায্য করে ।  প্রতিটি সমাজের নিজস্ব পৌরাণিক কাহিনী থাকেই  যা তাদের বিশ্বাস এবং ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করে থাকে আর এর মাধ্যমে একটি সংস্কৃতি তার সদস্যদের মধ্যে একাত্মতা ও পরিচিতি তৈরি করতে পারে । তাছাড়া ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার (১৮৮৮-১৯৮০) ছিলেন একজন প্রখ্যাত বাঙালি ইতিহাসবিদ ও শিক্ষাবিদ যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ও ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর গবেষণার মাধ্যমে বাঙালি পরিচয় ও আদি ভারতের স্বরূপ উদ্ঘাটিত হয় যা তাঁকে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবিদ হিসেবে পরিচিতি দেয় ও তাঁর গবেষণা বাংলার ইতিহাস ও আদি ভারতের ইতিহাস অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন যেখান থেকেও চাকমা জাতির প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণা পাওয়া যেতে পারে ।  পাশাপাশি নীহাররঞ্জন রায় ( ১৯০৩ –  ১৯৮১) ছিলেন একজন ভারতীয় বাঙালি ইতিহাসবিদ যিনি শিল্পের ইতিহাস ও ভারতীয় ইতিহাসের উপর তাঁর রচনার জন্য সুপরিচিত আর তাঁর গবেষণা থেকেও চাকমা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা পাওয়া যেতে পারে। হয়তোবা তাঁরা সরাসরি চাকমা জাতি সম্পর্কে কোন গবেষণা করেননি , কিন্তু তাঁদের গবেষণায় ভারতের ইতিহাস সম্পর্কিত গবেষণা থেকেও আমরা এই জনগোষ্ঠী সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে পারি। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার মূলত ভারতের প্রাচীন ও আধুনিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছেন যেখানে  তিনি প্রাচীন ভারতের ইতিহাস চর্চায় একজন অগ্রণী ইতিহাসবিদ ছিলেন যদিও সেই সময়ে তথ্যের অপ্রতুলতা ছিল বলে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন এবং  প্রাচীন ইতিহাসের পাশাপাশি তিনি আধুনিক যুগের ইতিহাস নিয়েও গবেষণা করেছেন এবং  ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের উপরও তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে এবং তিনি এক বিশাল গবেষণা ধারাবাহিকের অংশ হিসেবে কাজ করেছেন যেখানে ৭৫ জন ইতিহাসবিদ অংশ নিয়েছিলেন এবং তিনি নিজে এর অর্ধেকেরও বেশি অংশ লিখেছিলেন এবং তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়েও কাজ করেছেন এবং বাংলাদেশের ইতিহাস নামে একটি গ্রন্থ‌ও রচনা করেছেন। নীহাররঞ্জন রায় মূলত শিল্পকলা ও প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্যের ইতিহাস ও ভারতীয় ইতিহাস এবং বাঙালির সমাজ ,  সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক জীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি তাঁর শিল্পইতিহাস চর্চার জন্য প্রথম খ্যাতি অর্জন করেন এবং এই বিষয়টি তাঁর ইতিহাসের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে গবেষণার ভিত্তি হয়ে উঠে। তাঁর বিখ্যাত কাজগুলোর মধ্যে বাঙ্গালীর ইতিহাস আদিপর্ব অন্যতম যেখানে তিনি বাঙালির অতীত সমাজ , সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক জীবন তুলে ধরেছেন।  তিনি শিল্পকলা নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন এবং এটি তাঁর কাজের একটি প্রধান ভিত্তি ছিল এবং  তিনি প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্যের ইতিহাস এবং সাহিত্য সমালোচনা নিয়েও কাজ করেছেন এবং  তিনি ভারতীয় ইতিহাস বিশেষ করে বাঙালির সমাজ ,  সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক জীবনের উপর অনেক গবেষণা করেছেন এবং এই বিষয়ে তাঁর খ্যাতি ছিল এবং  ধর্ম ও রাজনীতির ইতিহাস এবং জীবনকাহিনি নিয়েও গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণা মূলত মানব অভিজ্ঞতার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিকগুলো বিশ্লেষণ করে যেখানে তিনি ইতিহাসের সমন্বিত রূপ তুলে ধরেছেন। 

এইবার অন্য প্রসঙ্গে আসি গেংখুলি (চারণকবি)  ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন খ্যাতিমান এবং বয়োজ্যেষ্ঠ লোকসংগীত শিল্পী ও তাঁর প্রকৃত নাম বরণ চাঁন চাকমা। তিনি চাকমা সমাজে লোকগান ও সংগীতচর্চার জন্য পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর গায়কীতে মুগ্ধ হয়ে চাকমা রাজা তাঁকে রমণী মোহন শিল্পী উপাধি দেন। বরণ চান চাকমা স্যার তিনি ১৯৩৬ সালের ২০ এপ্রিল রাঙ্গামাটির বিলাইছড়িতে জন্মগ্রহণ করেন ও  তিনি ২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি পরলোকগমন করেন আর  তিনি গেংখুলিদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।  চারণ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো স্তুতি পাঠক বা স্তোতা যিনি স্তুতিগান করেন। চারণ কবিরা মূলত গান এবং অন্যান্য পরিবেশনার মাধ্যমে জনমানসে প্রভাব ফেলতেন। চারণকবি  এমন কবি যিনি গান গেয়ে ও যাত্রাভিনয় করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান ও মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম ও সংগ্রাম করার প্রেরণা জাগিয়ে তোলেন ।  স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় চারণ কবিদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাঁরা তাদের গান ও নাটক রচনার মাধ্যমে মানুষকে পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে অনুপ্রাণিত করতেন 

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে মুকুন্দ দাস যিনি স্বদেশী ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় বহু বিপ্লবাত্মক গান ও নাটক রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন যিনি একজন বিখ্যাত চারণ কবি ছিলেন। বস্তুত 

মুকুন্দ দাস (  ১৮৭৮ –  ১৯৩৪) ছিলেন একজন বাঙালি কবি ,  গীতিনাট্যকার ,  সুরকার ও দেশপ্রেমিক যিনি গ্রামবাংলায় স্বদেশী আন্দোলনের প্রসারে অবদান রেখেছিলেন ও তাঁর সময়ে তাঁকে সাধারণত চরনকবি (গীতিনাট্যের লেখক) নামে অভিহিত করা হতো। তাছাড়া চাকমা সাহিত্যের প্রাচীন যুগেও চারণ কবিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন বলে মনে করা হয় বিশেষ করে যখন আধুনিক সাহিত্যের লিখিত রূপ ছিল না তখন তাদের মুখনিঃসৃত গানই ছিল সাহিত্যের ধারক ও বাহক । মূলত চাকমা সমাজে চারণ কবিরা তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও গল্প এবং ঐতিহ্যকে গানের মাধ্যমে প্রচার করে থাকেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামেও এই চারণ কবিদের ঐতিহ্য প্রচলিত আছে আর  চাকমা সমাজে লোকগান ,  পালা গান ও ঐতিহ্যবাহী গান গেয়ে বেড়ানো এবং সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে তুলে ধরার কবিদেরকেই চাকমা চারণ কবি বোঝায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সমাজের বিখ্যাত চারণ কবিদের মধ্যে রমণী মোহন গেংখুলি অন্যতম ছিলেন যিনি গেংখুলি রমণী মোহন চাকমা নামেও পরিচিত ও তিনি সম্প্রতি পরলোকগমন করেছেন। চাকমা রাজাদের একটি সম্পূর্ণ ও নির্ভুল তালিকা দেওয়া কঠিন আর চাকমা রাজবংশের ইতিহাস ‍নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও লেখক বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন । বস্তুত রাজতন্ত্র বংশগতভাবে একটি সরকার ব্যবস্থা যা সাধারণত প্রাচীনকালে সামাজিক বা সামরিক প্রয়োজন থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে গোষ্ঠী বা গ্রামের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি যিনি প্রায়শই একজন সামরিক নেতা ছিলেন তাঁকে কেন্দ্র করে এই ব্যবস্থা গড়ে উঠতো আর সময়ের সাথে সাথে এই ক্ষমতা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল রাজতান্ত্রিক কাঠামোর সৃষ্টি হয় । বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতায় রাজতন্ত্র ব্যবস্থা দেখতে পাওয়া যায় যেখানে মিশর ,  মেসোপটেমিয়া ,  সিন্ধু সভ্যতায় ও প্রাচীন ভারতে যা বৈদিক ও পরবর্তী বৈদিক যুগে রাজতন্ত্রের বিকাশ ঘটে যেখানে রাজারা ভূখণ্ডের রক্ষক হিসেবে কাজ করতেন ও পাশাপাশি রাজতন্ত্রের বিবর্তন‌ও দেখতে পাওয়া যায় যেখানে প্রাচীনকালে কিছু অঞ্চলে যেমনঃ প্রাচীন রোম বা এথেন্সে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে প্রজাতন্ত্র বা গণতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল যেখানে নাগরিকরা শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করতেন। আবার পরবর্তীতে কালক্রমে রাজতন্ত্রের ক্ষমতা সীমিত করতে সাংবিধানিক বিধিনিষেধের প্রচলন হয় যা আধুনিক যুগে দেখা যায় । 

তবে অনেক সমাজ প্রাচীনকালে রাজতন্ত্রকে একটি সুসংবদ্ধ ও শক্তিশালী শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন ।  কথিত আছে রাজা ভূবন মোহন রায় ১৮শ শতকের শুরুর দিকে  ইতিহাস চর্চার সূচনা করেন এবং তাঁর লেখা চাকমা রাজ বংশের ইতিহাস বইয়ে ধারাবাহিক ভাবে আটচল্লিশ জন চাকমা রাজার সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায় । রাজা ভুবন মোহন রায় ছিলেন চাকমা সার্কেলের ৪৮তম রাজা। তিনি ১৮৯৭ সালের ৭ মে থেকে ১৯৩৩ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত চাকমা সার্কেলের প্রধান হিসেবে রাজত্ব করেন। তাঁর পূর্বসূরি ছিলেন রাজা হারিশ চন্দ্র রায় এবং তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরি ছিলেন নলিনাক্ষ রায়।  তিনি রাঙ্গামাটিতে চাকমা রাজার নতুন রাজবাড়ি নির্মাণ করেন যা ১৯১৪ সালে নির্মিত হয়েছিল। ভুবন মোহন রায় শ্রীশ্রীরাজনামা এবং চাক্‌মা রাজবংশের ইতিহাস নামক  বই রচনা করেন । আবার  যদিও রাজা বিজয়গিরি নিজে সরাসরি ইতিহাস রচনা শুরু করেছিলেন এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি , তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজ্য এবং তাঁর উত্তরাধিকারই চাকমা জাতির ইতিহাস আলোচনার মূল ভিত্তি স্থাপন করে বলা হয়ে থাকে ।  আমরা  বিজয়গিরি থেকে তাঁর উত্তরসূরীদের তালিকা এক পলকে দেখে নিতে পারি যা হলো ১/ উদয়গিরি ২/ চিরত্তমা চেগ  ৩/  সরন্নামা 

৪/  উলত নামা ৫/ জমু ৬/ কমলা জনু ৭/ উনসা গিরি ৮/মছ্যাগিরি ৯/  কমলা যুগ ১০/ মদন যুগ ১১/ জীবন যুগ ১২/ রত্নগিরি ১৩/ ধনগিরি ১৪/ স্বর্ণগিরি ১৫/বুদ্ধং গিরি  ১৬/ ধর্মগিরি ১৭/ মনোরথ  ১৮/অরিজিৎ ১৯/মৈমাংসা ২০/কেওয়ালা ২১/বৈরিন্দম  ২২/জ্ঞানানু 

২৩/ স্বেইতারাতোর চোতুংজা ২৪/সাকালিয়া  ২৫/ওয়ানগালি শেরধর ২৬/মান্যেগিরি ২৭/মাধলিয়া ২৮/রামতোংজা ২৯/ কমলা চেগে ৩০/রত্ন গিরি  ৩১/হালা তোংজা ৩২/চক্র ধন ৩৩/ফেলা ধাবেঙ ৩৪/ শেরমুত্ত ধাবেঙ ৩৫/ইয়োংজা ৩৬/সূর্যজিৎ ৩৭/ শত্রুজিৎ ৩৮/রামতোংজা ৩৯/মানিকগিরি ৪০/তৈন সুরেশ্বরী ৪১/জনু ৪২/ সত্ত্বা ৪৩/ কাত্ত্ব রাণী ৪৪/ধবনা ৪৫/ ধরম্যা ৪৬/মোগল্যা ৪৭/ যুবল খাঁ ৪৮/ জল্লাল খাঁ ৪৯/ ফতেহ খাঁ  ৫০/ শেরজ্জা খাঁ ৫১/ শেরমুস্ত খাঁ 

৫২/ রাজা শুকদেব রায় ৫৩/শের দৌলত খাঁ ৫৪/ জানবক্স খাঁ ৫৫/তব্বর খাঁ ৫৬/জব্বর খাঁ ৫৭/ধরম বক্স 

৫৮/ রাণী কালিন্দী ৫৯/রাজা হরিশ্চন্দ্র রায় বাহাদুর ৬০/ কোর্ট অফ ওয়ার্ডস – নীল চন্দ্র দেওয়ান এবং ত্রিলোচন দেওয়ান ৬১/ রাজা ভুবন মোহন রায় ৬২/রাজা নলিনাক্ষ রায় ৬৩/রাজা ত্রিদিব রায় ৬৪/ সমিত রায় ৬৫/দেবাশীষ রায় ওয়াংজা এবং  বিজয়গিরির উত্তরসূরী হিসেবে বিবেচিত হলেন সেঙবুদ্ধ ও অন্যান্য রাজাগণ ।  আর তাছাড়া  চাকমাদের রাজবংশে পৌরাণিক রাজারাও অন্তর্ভূক্ত আছেন ,  কিন্তু চাকমাদের পৌরাণিক রাজাদের ইতিহাস নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন , আর তাঁদের শাক্য বংশের সঙ্গে সম্পর্কও বিদ্যমান যা এই বিষয়ে আরও তথ্য ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলা যায়। তাছাড়া এইখানে উল্লেখিত কোর্ট অফ ওয়ার্ডস হলো একটি সরকারি সংস্থা যা নাবালক বা মানসিকভাবে অসুস্থ বা অন্যান্য কারণে সম্পত্তি পরিচালনায় অক্ষম জমিদারদের সম্পত্তি তত্ত্বাবধান করতেন । এর মূল উদ্দেশ্য ছিল এইসব উত্তরাধিকারীর সম্পত্তি রক্ষা করা এবং সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা। এটি মূলত ব্রিটিশ ভারতে এবং পূর্ববর্তী ব্রিটিশ শাসনামলে (যেমন ইংল্যান্ডে) প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবস্থা ছিল যেখানে উত্তরাধিকারীর অনুপস্থিতিতে বা অক্ষমতার কারণে সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে রাখা হতো। পৌরাণিক শব্দের অর্থ হলো  পুরাণসম্বন্ধীয় বা প্রাচীন বা পুরাণবেত্তা ও এটি এমন কিছুকে বোঝায় যা পুরাণের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে পৌরাণিক কাহিনী ,  পৌরাণিক চরিত্র বা পৌরাণিক গ্রন্থ , অর্থাৎ  পুরাণ প্রাচীন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কাহিনী সাথে সম্পর্কিত যা  পুরাতন বা প্রাচীনকালের আর পুরাণবেত্তা হলেন যিনি পুরাণ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন বা যিনি পুরাণকে অধ্যয়ন করেন। পৌরাণিক কাহিনীগুলো সাধারণত সত্য হিসেবে প্রমাণিত হয় না আর কারণ এইগুলো আক্ষরিক অর্থে বাস্তব ঘটনার বিবরণ নয় ,  বরং ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বিশ্বাস এবং নৈতিক শিক্ষার উপর ভিত্তি করে রচিত গল্প। পৌরাণিক কাহিনীগুলো গভীর অর্থ বহন করে এবং বিশ্ব ও মানব জীবন সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করে ,  কিন্তু এইগুলো ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের উপর ভিত্তি করে তৈরি নয়।   পৌরাণিক কাহিনীগুলো অতিপ্রাকৃত ঘটনা ও চরিত্র নিয়ে গঠিত এবং এইগুলো প্রায়শই সমাজের উৎপত্তি বা মৌলিক বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করে , কিন্তু অন্যদিকে  ইতিহাস হলো অতীত ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ ও প্রমাণভিত্তিক বিবরণ।  অবশ্য পৌরাণিক কাহিনীর মধ্যে বাস্তব ঐতিহাসিক ঘটনার কিছু উপাদান থাকতে পারে , কিন্তু  গল্পগুলো প্রায়শই সাহিত্যিক ও প্রতীকী উপায়ে বর্ণিত হয় আর এইগুলোর মধ্যে অনেক কাল্পনিক বিষয়‌ও যুক্ত থাকে । আবার পৌরাণিক কাহিনীগুলোকে রূপক হিসেবে ভাবা যেতে পারে যার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বা আধ্যাত্মিক সত্য তুলে ধরা হয়ে থাকে এবং এইগুলোর সত্যতা আক্ষরিকভাবে না হলেও প্রতীকী অর্থে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বলা যায় হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে ইতিহাস ও পুরাণকে পঞ্চম বেদ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়ে থাকে যা তার গুরুত্বকেই বোঝায় ও পঞ্চম বেদ ধারণাটির মাধ্যমে এমন একটি ধর্মগ্রন্থকে বোঝায় যেটি চারটি আনুশাসনিক বেদের অন্তর্গত না হলেও গুরুত্ব ও মর্যাদার দিক থেকে বেদের সমতুল্য আর মহাভারত কে পঞ্চম বেদ বলা হয় , বেদ যেমন জ্ঞানের ভান্ডার মহাভারতে সেই প্রকার অসংখ্য জ্ঞান গল্পের আকারে দেওয়া আছে । পৌরাণিক যুগকে ঐতিহাসিক যুগ শুরু হওয়ার আগের সময় হিসেবেও ধরা হয় যখন মানুষ ও দেবতাদের কাহিনীগুলো একসাথে বর্ণিত হতো আর কিছু প্রসঙ্গে পৌরাণিক যুগকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় যা মানব ইতিহাসের সেই সময়কালকে অন্তর্ভুক্ত করে যখন লিখিত ইতিহাস শুরু হওয়ার আগে দেবদেবী এবং কিংবদন্তীর গল্পগুলো প্রচলিত ছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগ হলো মানুষের সভ্যতা এবং লিখন পদ্ধতির আবিষ্কারের পূর্বের সময়কাল ও এই সময়ে কোনো লিখিত রেকর্ড না থাকায় আমরা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন যেমন পাথরের হাতিয়ারের উপর নির্ভর করে এই যুগ সম্পর্কে জানতে পারি আর এই যুগকে প্রধানত প্রস্তর যুগ ও ব্রোঞ্জ যুগ এবং লৌহ যুগে ভাগ করা হয়ে থাকে এবং ঐতিহাসিক যুগ হলো মানব ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়কাল যা লিখিত উপাদানের উপর ভিত্তি করে চিহ্নিত করা হয় ও এই সময়কালে সংঘটিত সামাজিক ঘটনা , পরিবর্তন এবং ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করে ইতিহাস রচনা করা হয় ,  তবে সাধারণত ব্রোঞ্জ যুগকে ঐতিহাসিক যুগের শুরু বলে মনে করা হয় যেখানে লিখিত তথ্যের মাধ্যমে সভ্যতার ধারাবাহিকতা বোঝা যায়। আর এমন একটি সময় ছিল যেখানে পৌরাণিক কাহিনীগুলোই অতীতে আমাদের পথ দেখিয়েছে আর এইগুলো শুধু গল্প নয় ,  বরং সমাজের বিশ্বাস ও  উৎপত্তি এবং নৈতিকতা ব্যাখ্যা করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল যা মানুষকে পথ দেখানোর পাশাপাশি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করেছিল আর  পৌরাণিক কাহিনীকে অগ্রাহ্য করা উচিত নয় ,  কারণ এইগুলো কেবল গল্প নয় মোটেও , বরং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এবং সামাজিক রীতিনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বলা হয়ে থাকে। তাছাড়া  পৌরাণিক এবং ঐতিহাসিক রাজাদের মধ্যে পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ , তবে উভয়কেই রাজবংশের ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে এবং  পৌরাণিক বা প্রাচীন যুগের রাজাদের শাসনের বিবরণ পরবর্তী রাজবংশগুলোর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়  বিশেষ করে হিন্দু এবং অন্যান্য ভারতীয় পুরাণগুলোতে যেখানে সূর্যবংশ এবং চন্দ্রবংশের মতো রাজবংশগুলোর বংশবৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ও এই পুরাণগুলোতে প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে সৃষ্টি পর্যন্ত বিভিন্ন রাজন্যবর্গের ইতিহাস , যোদ্ধৃবর্গ , ঋষি এবং উপদেবতাদের বিবরণ‌ও দেওয়া আছে।  আবার 

 অনেক ক্ষেত্রে পৌরাণিক এবং ঐতিহাসিক যুগের মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায় যেখানে পৌরাণিক রাজাদের পর ঐতিহাসিক রাজবংশগুলো রাজ্য শাসন করেন। এই পর্যায়ে আলোচনার ধারাবাহিকতায়  কিছু সূত্র থেকে জানা যায় প্রাচীনকালে চাকমা রাজা বিজয়গিরির একটি রাজ্য ছিল । চাকমা সার্কেলের লোকেরা রোহাং  বা রোয়াং যা বর্তমান রাখাইন রাজ্যে (পূর্বে আরাকান নামে পরিচিত) বাস করতেন এবং তিনি খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর সময়ে এখানে বাস করেছিলেন । রাজা বিজয় গিরি চাকমা সার্কেলের ১৫ তম চাকমা রাজা ছিলেন ও তিনি চতুর্দশ চাকমা রাজা সংবধের পুত্র । আধুনিক যুগে রাজা ভুবনমোহন রায় ও পরে রাজা নলিনাক্ষ রায় চাকমাদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন ।  রাজা ভুবন মোহন রায়ের (৪৮তম ) উত্তরসূরী  হলেন নলিনাক্ষ রায় ও 

দাম্পত্য সঙ্গী দয়াময়ী রায় এবং তাঁর রাজত্বকাল 

৭ মে ১৮৯৭ – ১৬ জুলাই ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত আর 

পূর্বসূরি ছিলেন রাজা হারিশ চন্দ্র রায় বাহাদুর যিনি 

ছিলেন চাকমা সার্কেলের ৪৭তম রাজা। আবার 

হারিশ চন্দ্র রায় তাঁর পূর্বসূরি ছিলেন কালিন্দী রানী যিনি চাকমা সার্কেলের ৪৬ তম শাসক ও চাকমা জনগণের একমাত্র মহিলা শাসক ছিলেন । রানী কালিন্দী তাঁকে  বিয়ে করেছিলেন রাজা ধরম বক্স খান ও তাঁর সময়ে রাজবাড়িটি চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়ার রাজনগরে ছিল।   রানী কালিন্দী ছিলেন একজন মহীয়সী নারী ।  তিনি প্রতিকূলতার মধ্যেও চাকমা সার্কেলের একমাত্র নারী শাসক হিসেবে অত্যন্ত সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সাথে রাজ্য শাসন করেছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতি ও  ষড়যন্ত্র এবং ক্ষমতা দখলের চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি নিজের শাসন ধরে রেখেছিলেন এবং প্রজাদের রক্ষা করেছিলেন।  তাঁর মূল বিশেষত্ত্ব হলো  প্রজাদের সুরক্ষায় কাজ করা  যা তাঁর মহত্ত্বের পরিচয় বহন করে থাকে নিঃসন্দেহে ।  বৌদ্ধ মন্দিরের পাশাপাশি তিনি তাঁর অবৌদ্ধ প্রজাদের জন্য গীর্জা ও মসজিদ এবং হিন্দু মন্দির তৈরিসহ আরো অনেক জনহিতকর কাজ করেছিলেন যার ফলে চাকমাবিহীন জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে চাকমা রাজের প্রতি আনুগত্য ও সমর্থন তৈরি হয়েছিল তাঁর পক্ষে ।  চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া এবং রাজনগরে তাঁর অবদান ছিল অবিস্মরণীয় এবং তাঁকে বলা হয়ে থাকে 

 শেষ স্বাধীন শাসক। রানী কালিন্দীকে শেষ স্বাধীন শাসক বলা হয় কারণ তিনি চাকমা সার্কেলের শেষ শাসক ছিলেন যিনি ব্রিটিশদের সরাসরি আধিপত্যের আগে স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন। ব্রিটিশরা আসার পর চাকমা রাজ্যের স্বাধীনতা খর্ব হয় এবং রানী কালিন্দী তাদের শাসনের অধীনেই রাজ্য পরিচালনা করেন তাই তিনি শেষ স্বাধীন চাকমা শাসক হিসেবে পরিচিত । উনার সম্পর্কিত আরো বিস্তৃত ইতিহাস জেনে নিতে পারেন আর এই মহিয়সী নারীর উপর কালিন্দী শিরোনামে একটি ব‌ই আছে এবং 

 বইয়ের লেখক হলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও তিনি বিংশ শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট ভারতীয় ঔপন্যাসিক এবং তাঁর এই উপন্যাসটি ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮ – ১১৯৭১) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক যাঁর কথা কমবেশি শুনেননি এমনটি হয়তোবা খুঁজেও পাওয়া যাবে না । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের  উপন্যাসটি কালিন্দী নামক নদীর উপর ভিত্তি করে লেখা যা পরোক্ষভাবে রানী কালিন্দীর সময়কালের । তাছাড়া ব‌ইয়ের কথা যখন এসেছে তাই 

কিছু সংখ্যক ব‌ইয়ের নাম তুলে ধরি যা হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমানের লেখা চাকমা জাতির ইতিহাস ,  বিরাজ মোহন দেওয়ান বিরচিত চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত ( ১৯৬৯ ) , চাকমা রাজা  ভুবনমোহন রায়ের চাকমা রাজবংশের ইতিহাস  ( ১৯১৯ ) , মাধব চন্দ্র চাকমা কর্মীর শ্রী শ্রী রাজনামা , 

সতীশ চন্দ্র ঘোষ প্রণীত চাকমা জাতি ( ১৯০৯ ) , 

সুগত চাকমার বাংলাদেশের উপজাতি ( বাংলা একাডেমী , ১৯৮৫ ) , প্রফেসর পিয়ের বেসেইনে প্রণীত 

Tribesmen of Chittagong Hill Tracks ( 1957 – 58) এর অনুবাদ গ্রন্থ পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি ( বাংলা একাডেমি , ১৯৭৭ ) , পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ডেপুটি কমিশনার ক্যাপ্টেন টি এইচ লুইন প্রণীত Willd Races of South – Eastern India ( 1870 ) এর 

জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা কর্তৃক অনুদিত বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের আদিম জনগোষ্ঠী ( উসাই রাঙ্গামাটি , ১৯৯৮ ) , লে , কর্নেল টি এইচ প্রণীত 

A fly on the wheel ( 1912 ) এর জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা কর্তৃক অনুদিত পার্বত্য চট্টগ্রাম ও লুসাই পাহাড় 

( উসাই রাঙ্গামাটি , ১৯৯৬ ) , অশোক কুমার দেওয়ানের চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার শীর্ষক ব‌ইসমূহ পড়েও চাকমা জাতি এবং চাকমা রাজবংশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব। তাছাড়া মহীয়সী নারী চাকমা রাণী কালিন্দী উনার সম্পর্কিত আরো অনেক বিষয়াবলীও উক্ত ব‌ইগুলোর মাধ্যমে জানতে পারবেন আশারাখি। 

শাসক ও শাসন ব্যবস্থার মধ্যে শাসক হলেন রাষ্ট্রের প্রধান বা সরকার প্রধান যিনি আইন ও নীতি অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করেন। অন্যদিকে শাসনব্যবস্থা হলো এমন একটি ব্যবস্থা যা নির্ধারণ করে কীভাবে সরকার গঠিত হবে ও ক্ষমতা কীভাবে বণ্টিত হবে এবং কীভাবে এটি কাজ করবে। শাসন ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য ভূমিকাগুলো হলো আইন বাস্তবায়ন ও দেশ পরিচালনা যেখানে আইন বিভাগ কর্তৃক প্রণীত আইনগুলো বাস্তবায়ন করা এবং সেই অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করা শাসন বিভাগের মূল কাজ এবং  শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা যেখানে দেশের অভ্যন্তরে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং 

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা যেখানে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং বিদেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা শাসন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং জনগণের কল্যাণ নিশ্চিতকরণ যেখানে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং তাদের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা যেখানে প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং 

রাজস্ব আহরণ ও ব্যয় যেখানে দেশের উন্নয়নমূলক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব আহরণ করা এবং তা সঠিকভাবে ব্যয় করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা যেখানে আইনের শাসন নিশ্চিত করা যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বেচ্ছাচারী হতে না পারে এবং মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু কথা হলো রাজ্য পরিচালনায় একজন শাসক সকলের কাছে ভালো হতে পারেন না, কারণ তার নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্ত বা কাজের পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন মতামত থাকবে। ক্ষমতার ব্যবহার নির্ভর করে শাসক কীভাবে তা পরিচালনা করেন তার উপর ও  এটি কারো জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে ,  অন্যদিকে আবার কারো জন্য অভিশাপও হতে পারে। প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থ এবং মূল্যবোধ ভিন্ন হওয়ায় শাসকের যেকোনো ভালো কাজও কারো কারো কাছে খারাপ বা বিতর্কিত মনে হতে পারে । একজন শাসক সকলের কাছে ভালো হতে পারেন না ,  এটির কারণ হলো  বিভিন্ন গোষ্ঠী বা ব্যক্তির স্বার্থের মধ্যে প্রায়শই সংঘাত দেখা যায়। শাসক যখন একটি গোষ্ঠীর জন্য একটি সিদ্ধান্ত নেন, তখন তা অন্য গোষ্ঠীর জন্য খারাপ হতে পারে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ ভিন্ন হয় আর তাই একজন শাসকের কাজকে সবাই একইভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন না ,  যা একজনের কাছে ভালো, অন্যজনের কাছে তাই খারাপ মনে হতে পারে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় কিছু আপস করতে হয় যা সকলের জন্য আনন্দদায়ক হয় না। যদিও একজন শাসকের সহানুভূতিশীল হওয়া জরুরি , তবুও অনেক সময় রাজনৈতিক কৌশলের জন্য তাকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, যা তার ব্যক্তিগত ভালো ইচ্ছার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।  শাসক পদটি জটিল ,  কারণ এটি উচ্চ ক্ষমতা ও বিশাল দায়িত্ব এবং কঠিন নৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। এটি এমন একটি পদ যেখানে শাসককে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হয় এবং ন্যায়পরায়ণভাবে শাসন করতে হয়, কিন্তু এর সঙ্গে ক্ষমতা ও অহংকার এবং অন্যায় করার ঝুঁকিও থাকে । শাসককে জনগণের জন্য নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হয় ও  তাদের অধিকার রক্ষা করতে হয় এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হয়। এটি একটি বিশাল দায়িত্ব যা অনেক সময়ই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। আবার ক্ষমতা অনেক সময় অহংকার এবং ঔদ্ধত্যের জন্ম দিতে পারে যা শাসকের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ আর সর্বোপরি বলা যায় এই সমস্ত কারণের জন্য শাসক পদটি একটি অত্যন্ত জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং পদ। শাসক পদটিতে নেতিবাচক ও ইতিবাচক সমালোচনা থাকবেই থাকবে ,  এমন কোন শাসক পৃথিবীর ইতিহাসে বিদ্যমান নেই যিনি সমালোচিত হননি ,  কিন্তু এরপরও কিছু শাসক রাজ্য পরিচালনায় পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক সুনাম অর্জন করেছেন উদাহরণ হিসেবে বলা যায় পৃথিবীতে অনেক সুনাম অর্জনকারী শাসক ছিলেন যেখানে রাজা সলোমন যিনি জেরুজালেম নগরী প্রতিষ্ঠা করেন ও তাঁর সুবিশাল সাম্রাজ্যের জন্য পরিচিত এবং  সুলতান সুলাইমান যিনি উসমানীয় সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধির সময় শাসন করেন ও কানুনি (আইনপ্রণেতা) ও দ্যা ম্যাগনিফিসেন্ট  নামে পরিচিত এবং সম্রাট অশোক যিনি কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অহিংসা ও ধর্মবিজয়ের নীতি গ্রহণ করেন ।  উনারা সকলের কাছে সমাদৃত তেমনটি যেমন নয় , ঠিক তেমনিভাবে সকলের কাছে অগ্রহণযোগ্য তাও নয় ,  কিন্তু ইতিহাসে ভালো শাসক ও শাসনব্যবস্থার জন্য আজ‌ও‌ স্মরণীয় ,  ঠিক তদ্রূপ এই শাসক ও শাসনব্যবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামের 

চাকমা জাতির একজন মহীয়সী নারী চাকমা রাণী কালিন্দীর কথা আজও স্মরণীয় বলা যায় ও যাঁর কার্যকলাপের ফলেই চাকমাবিহীন জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে চাকমা রাজের প্রতি আনুগত্য ও সমর্থন তৈরি হয়েছিল যেটি তাঁর‌ই কৃতিত্ব অর্জন । ১৮৭৩ সালে তাঁর স্থানে নাতি হরিশ চন্দ্রকে তাঁর জায়গায় পরবর্তী চাকমা রাজা হিসাবে রেখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন । 

     পুনরায় আলোচনায় আসি   রাজা নলিনাক্ষ রায় ছিলেন চাকমা সার্কেলের ৪৯তম রাজা ও তাঁর রাজত্বকাল ৭ মার্চ ১৯৩৫ থেকে ৭ অক্টোবর ১৯৫১ সাল পর্যন্ত আর তাঁর সহধর্মিনী হলেন বেনিতা রায় । রাজমাতা বিনিতা রায় ছিলেন একজন বাংলাদেশী  সাহিত্যিক , কূটনীতিক এবং মন্ত্রী ও তিনি পার্বত্যের চট্টগ্রামের চাকমা সার্কেল ঊনচল্লিশতম রাণী ও ত্রিদেব রায় এবং দেবাশীষ রায়ের রাজত্বকালে রায় রাজমাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ও তিনি ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রথম প্রতিনিধি দলের সদস্য এবং ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। রাজমাতা বা রানী মা  এই শব্দটি ১৫৬০ দশকের গোড়ার দিক থেকে ইংরেজিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ও এটি ইউরোপের বংশগত রাজতন্ত্রগুলোতে উদ্ভূত হয় এবং বিশ্বজুড়ে অইউরোপীয় সংস্কৃতিতে একই রকম কিন্তু স্বতন্ত্র রাজতান্ত্রিক ধারণাগুলো বর্ণনা করতেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে , যদিও এই পদটি সমস্ত রাজার মায়েদের কাছে যায় না। নলিনাক্ষ রায় ও বেনিতা রায় বা বেনিতা সেন তাঁদের  তিন পুত্র যাঁরা হলেন ত্রিদিব রায় , সমিত রায় ,  নন্দিত রায় এবং তিন কন্যা, অমিতি রায় ,  মৈত্রী রায় এবং রাজশ্রী রায় ।   

কমা রাজা ত্রিদিব রায়ের সময়কালে চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত নামক একটি বই প্রকাশিত হয় যা চাকমা জাতির ইতিহাস ও রাজবংশের প্রাচীন ঘটনাবলী নিয়ে লেখা হয়েছিল। বস্তুত এই রাজা নিজে ইতিহাসের চর্চায় আগ্রহী ছিলেন এবং তিনি এই বইটি রচনা করিয়েছিলেন। চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত এই বইটি চাকমা জাতির ইতিহাস ও রাজবংশের প্রাচীন ইতিহাস আর তাঁদের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে। রাজা ত্রিদিব রায় এই বইটির রচনা করানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং এর মাধ্যমে তিনি চাকমাদের ইতিহাস সংরক্ষণে সাহায্য করেন বলা যায়। 

রাজা ত্রিদিব রায়  ( ১৯৩৩ –  ২০১২) ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা উপজাতির ৫০তম রাজা ও তিনি ১৯৫৩ সালের ২ মে থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত  রাজা ছিলেন।  রাজা ত্রিদিব রায়ের সময়কালে চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত বইটি মূলত বিরাজ মোহন দেওয়ান লিখেছেন। এই গ্রন্থটি চাকমা জাতির প্রাচীন ইতিহাস ও  বিভিন্ন ভুল তথ্য সংশোধন এবং ইতিহাস ও ভূগোলের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে বলে এর ভূমিকায় উল্লেখ আছে। 

বিরাজ মোহন দেওয়ান তিনি চাকমা জাতির ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন এবং তাঁর রচিত চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত বইটি চাকমা ইতিহাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহী পাঠকদের মধ্যে বেশ পরিচিত। তাছাড়া বইটিতে চাকমা জাতি সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো দূর করে সঠিক তথ্য উপস্থাপনের একটি প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়।

যদিও রাজা ত্রিদিব রায়ের রাজত্বকালে বইটি রচিত ,  তবে এর লেখক বিরাজ মোহন দেওয়ান, রাজা ত্রিদিব রায় নিজে নন।  বিরাজ মোহন দেওয়ানের এই বইটি চাকমা সার্কেল চিফ (বর্তমান রাজা) দেবাশীষ রায় কর্তৃকও বিশুদ্ধ ও স্বীকৃত বলে জানা যায়। মূলত সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে চাকমা সমাজে সাহিত্যচর্চা শুরুটা বিদ্যমান থাকলেও আধুনিক সাহিত্যরীতি ও লেখালেখির প্রচলন মূলত ১৯শ শতকের শেষভাগে ও ২০শ শতকের শুরুতে হয় বলা যায় এবং যার পেছনে চাকমা রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।  

         তাছাড়া আবারো আরেকটি বিষয় তুলে ধরি  সতীশ চন্দ্র ঘোষ  চাকমাদের ইতিহাস রচনা করেন ১৯০৯ সালে ও তাঁর এই গ্রন্থটি চাক্‌মাজাতি নামে পরিচিত যেখানে চাকমাদের ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা, লিপি এবং ব্রিটিশ শাসনকালের ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে । সতীশ চন্দ্র ঘোষ চাকমা জাতি (১৯০৯ সালে প্রকাশিত) গ্রন্থের লেখক যেখানে তিনি চাকমা জাতির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। বলা হয়ে থাকে এই বইটি চাকমা রাজা ভুবন মোহন রায়ের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হয় এবং এতে তঞ্চঙ্গ্যাদের উৎপত্তি ও চাকমা সম্প্রদায়ের অন্যান্য বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। চাকমা জাতি ব‌ইটি  চাকমা জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপর গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস বলা যায় এবং 

এই বইটি চাকমা সমাজের ঐতিহ্যকে বুঝতে সাহায্য করে এবং এই বইটির মাধ্যমে সতীশ চন্দ্র ঘোষ চাকমা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন বলা যায়। তাছাড়া বলা হয়ে থাকে  এই বইটিতে অনেক তথ্যই ত্রুটিপূর্ণ ছিল যার কারণে তৎকালীন অনেকেই চাকমা সমাজের লোক তাঁর প্রতি বিরূপ ছিলেন , তবে তাঁর লেখা অন্যান্য ইতিহাসবিদদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে ও এটি চাকমা জাতি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক গ্রন্থ ,  যদিও এতে কিছু ভুল তথ্যও রয়েছে । বইটি তঞ্চঙ্গ্যাদের উৎপত্তি সম্পর্কে একই সূত্র অনুসরণ করে যা অন্যান্য ইতিহাসগ্রন্থেও দেখা যায় আর বইটিতে থাকা কিছু ভুল তথ্য পরবর্তীকালে ইতিহাসবিদদের দ্বারা চিহ্নিত হয়েছে । পাশাপাশি বইটি সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরি বইটির নাম হলো  চাকমা জাতি (জাতীয় চিত্র ও ইতিবৃত্ত) ও লেখক সতীশ চন্দ্র ঘোষ এবং প্রকাশকাল ১৯০৯ সাল (প্রথম সংস্করণ) আর প্রকাশনা সারদারচরণ ঘোষ এবং এটির গুরুত্ব হলো চাকমা জাতির ইতিহাস নিয়ে রচিত সবচেয়ে পুরোনো ও প্রাথমিক বইগুলোর মধ্যে এটি একটি যা তাদের জাতীয় চিত্র ও ইতিবৃত্ত তুলে ধরে এবং আপনি এই বইটি Rokomari.com  বা অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে সংগ্রহ করতে পারেন।

      গুরুত্বের কারণে আবারো উল্লেখ করি চাকমা জাতির উপর অনেক লেখকই বই লিখেছেন যেখানে বিরাজ মোহন দেওয়ানের চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত (১৯৬৯) , রাজা ভুবন মোহন রায়ের 

চাকমা রাজবংশের ইতিহাস (১৯১৯) , মাধব চন্দ্র চাকমার চাকমা জাতি সম্পর্কে ও শরদিন্দু শেখর চাকমার চাকমা জাতির ইতিহাস , পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আমার জীবন ,  পার্বত্য চট্টগ্রাম উপনিবেশ আমলে এবং স্বাধীনতা আমলে আর এই বইগুলো চাকমা জাতির ইতিহাস এবং সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে বলা যায়।  পাশাপাশি সারোয়ার হাসান রচিত চাকমা পুরাণ যা চাকমাদের মিথ ও বিশ্বাস নিয়ে লেখা ও আতিকুর রহমান পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক এবং তাঁর লেখায় চাকমা জাতির ইতিহাস  ও প্রিয়জীত দেবসরকার রচিত দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান  যেখানে রাজা ত্রিদিব রায়ের জীবন ও সিদ্ধান্ত নিয়ে রচিত , মুস্তাফা মজিদ তাঁর  চাকমা জনগোষ্ঠী নিয়ে লেখা চাকমা জাতিসত্তা ও চাকমা বই দুটি  ও সিদ্ধার্থ চাকমার পার্বত্য চট্টগ্রাম গ্রন্থে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এবং তাঁদের ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন।  এইছাড়াও  চাকমা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত গবেষণামূলক কাজের জন্যও অনেকেই বই লিখেছেন আর চাকমাদের ইতিহাস ,  সংস্কৃতি ,  ভাষা এবং জীবনধারা নিয়ে অনেক গবেষক , লেখক এবং ঐতিহাসিক কাজ করেছেন বলা যায় এবং চাকমা জনগণের জীবনধারা ,  ইতিহাস  এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে বর্তমানেও অনেক গবেষণা ও বই প্রকাশিত হচ্ছে বলা যেতে পারে ,  কিন্তু কিছু বই তাদের ইতিহাস বিকৃত করার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে । আবার এইখানে এমনো লেখক আছেন যাঁরা পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন । তাছাড়া চাকমা বিজক (১৮৭৬-১৯৩৪) বলতে উক্ত সময়কালের মধ্যে চাকমা ইতিহাসের একটি সংকলন বা ইতিহাস চর্চার সূচনাকে বোঝায়। এই সময়কালে চাকমা  রাজা ভূবন মোহন রায়ের (১৮৭৬-১৯৩৩) নেতৃত্বে ১৯১৯ সালে চাকমা রাজ বংশের ইতিহাস প্রকাশিত হয় যা চাকমা জাতির ইতিহাস চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল। চাকমা বিজকের গুরুত্ব অপরিসীম ও এটির কারণ হলো ইতিহাস চর্চার সূচনা যেখানে এই সময়কালটি চাকমা জাতির মধ্যে ইতিহাস চর্চার সূচনা লগ্নের প্রতিনিধিত্ব করে। রাজা ভূবন মোহন রায়ের উদ্যোগে প্রকাশিত হয় চাকমা রাজ বংশের ইতিহাস নামক  বইটি যা চাকমা রাজবংশের ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরে এবং ‌ঐতিহাসিক তথ্যের সংকলন যেখানে এই বিজক (সংকলন)টি ১৮৭৬ সাল থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত চাকমা সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও তথ্য অন্তর্ভুক্ত করে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যেখানে  ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত চাকমা সার্কেলের প্রশাসনিক ও বিচারিক এবং সামাজিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসে যা এই সময়কালের ইতিহাসের একটি অংশ বলা যায় । আবার এটিও বলা যেতে পারে চাকমা বিজক বা ইতিহাস হলো মূলত চাকমা জনগোষ্ঠীর প্রথাগত ও মৌখিক ইতিহাস যা তাদের পূর্বপুরুষের চম্পক নগর থেকে আগমন ও সেখান থেকে বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন ও রাজ্য প্রতিষ্ঠার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ।  তাছাড়া চাকমা বিজক বা ইতিহাসের মূল বিষয়বস্তু হতে পারে উৎপত্তিকাল ও চম্পক নগর যেখানে চাকমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী তাদের পূর্বপুরুষেরা চম্পক নগর থেকে এসেছিলেন এবং আনুমানিক ৫৯০ অব্দে চাকমা রাজা বিজয়গিরি রাজ্য জয় করে বসতি স্থাপন করেন এবং প্রারম্ভিক বসতি ও রাজ্য যেখানে এর পর তারা বিভিন্ন সময়ে আরাকান ,  পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং  রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন ও শাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং  ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যেখানে ১৭৭৬ সালের পর থেকে ইংরেজদের নানাবিধ শোষণ ও ইজারাদারদের অত্যাচার , খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক অবরোধের প্রতিবাদে চাকমারা বিদ্রোহ করেছিলেন আর এই বিদ্রোহগুলো কার্পাস বিদ্রোহ নামে পরিচিত এবং কাপ্তাই প্রকল্পের প্রভাব যেখানে কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্পের কারণে চাকমাদের বিশাল একটি অংশ তাদের ভিটেমাটি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে স্থানচ্যুত হন যা চাকমা জাতির ইতিহাসে একটি কালবিভাজিকা হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে আর এই সবকিছুই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলা যায় এবং  

ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তো অবশ্যই আছে যেখানে চাকমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাসও বিজকের অংশ যা তাদের ধর্ম , ভাষা ও সামাজিক রীতিনীতি অন্তর্ভুক্ত বলা যেতে পারে ।  বস্তুত 

কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কারণ ও উদ্দেশ্য  হলো 

জলবিদ্যুৎ উৎপাদন যেখানে বাঁধটির মূল উদ্দেশ্য ছিল কর্ণফুলী নদীর উপর জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জ্বালানির চাহিদা পূরণ করতে পারতো । ১৯৫০ এর দশকে পাকিস্তান সরকার আমেরিকার অর্থায়নে এই বাঁধের নির্মাণ কাজ শুরু করেন আর ১৯৬২ সালে তা শেষ হয়। এই বাঁধ নির্মাণ একটি যুগান্তকারী ঘটনা ছিল বটে ,  কিন্তু এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের জীবনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং তারা তাদের ভিটেমাটি হারান। কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যার ফলে কাপ্তাই হ্রদের সৃষ্টি হয় এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। 

চাকমাদের কার্পাস বিদ্রোহের  কারণ হলো অতিরিক্ত কর যেখানে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পার্বত্য অঞ্চলে কার্পাস বা তুলা করের জন্য বহিরাগত ইজারাদার নিয়োগ করেন । এই ইজারাদারদের শোষণ ও অত্যাচারের কারণে চাকমাদের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ইজারাদারদের অত্যাচার যেখানে ইংরেজ শাসকরা ইজারাদারদের মাধ্যমে চাকমাদের উপর বিভিন্ন ধরনের শোষণ ও বর্বর উৎপীড়ন চালালে তা বিদ্রোহের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মূল ঘটনায় যেটি দেখতে পাওয়া যায় ১৭৭৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাজা শের দৌলত ও রামু খাঁর নেতৃত্বে প্রথম বিদ্রোহ শুরু হয়। প্রথম বিদ্রোহের পর ১৭৭৬ থেকে ১৭৮৭ সালের মধ্যে আরও তিনটি বিদ্রোহ সংগঠিত হয়। চাকমা দলপতি রামু খাঁর নেতৃত্বে ইজারাদারদের তুলার গোলা লুট করা হয় এবং কার্পাস কর দেওয়া বন্ধ করা হয়। বস্তুত এই বিদ্রোহগুলো ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে চাকমাদের প্রতিবাদের অংশ ছিল , কিন্তু চাকমা জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ইংরেজদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়।

 সর্বোপরি বলা যায় চাকমাদের কার্পাস বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অতিরিক্ত শোষণ ও কার্পাস (তুলা) কর আদায়ের বিরুদ্ধে ১৭৭৬ সাল থেকে ১৭৮৭ সালের মধ্যে চাকমা জনগোষ্ঠীর একাধিক বিদ্রোহ যা মূলত কার্পাস কর বন্ধ করার ও ইজারাদারদের অত্যাচার বন্ধ করার দাবিতে সংঘটিত হয়। তাছাড়া এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন চাকমা দলপতি রাজা শের দৌলত ও তাঁর সেনাপতি রামু খাঁ। 

চাকমা রাজা শের দৌলত খাঁ ছিলেন ১৭৬৫ থেকে ১৭৮২ সাল পর্যন্ত চাকমা সার্কেলের রাজা।  তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে জানবকস খাঁ রাজা হন। তাঁর রাজত্বকালে তিনি ব্রিটিশদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেন এবং তাদের সাথে শান্তি চুক্তি করেন , তাঁর রাজত্বকাল ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে কর দিতে বাধ্য হওয়ার একটি সময় যা চাকমাদের মধ্যে আরও বিদ্রোহের জন্ম দেয়। আর ঐতিহ্যগতভাবে শের দৌলত খাঁকে শেরমস্ত খাঁ এবং শুকদেব রায়ের পরের রাজা হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। খুবই সম্ভবত শের দৌলত খাঁ ১৭৬৭ সালের কাছাকাছি সময়ে রাঙামাটিতে রাজত্ব স্থানান্তর করেন। তাছাড়া তাঁদের রাজত্বকাল রাজা শুকদেবের ১৭৫৩-১৭৫৮ সাল পর্যন্ত ও রাজা শের জব্বার খাঁর ১৭৫৮-১৭৬৫ সাল পর্যন্ত আর রাজা শের দৌলত খাঁর ১৭৬৫-১৭৮২ সাল পর্যন্ত ও তাঁর পরে রাজা হন জানবক্স খাঁ ও তাঁর সময়কাল হলো ১৭৮২ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত আনুমানিক । রাঙ্গুনিয়ায় চাকমাদের ইতিহাস হলো আদি বসতি ও রাজধানী যেখানে রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলকে একসময় চাকমাদের প্রধান বসতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং এই অঞ্চল ছিল চাকমা রাজাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সপ্তদশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত চাকমা রাজাদের রাজধানী এই অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। মূলত রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলে চাকমাদের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে যেখানে সপ্তদশ শতাব্দীতে এই অঞ্চলে চাকমা রাজাদের একটি রাজধানী ছিল। রাঙ্গুনিয়া  অঞ্চল চাকমাদের প্রধান বসতি ছিল এবং ব্রিটিশ শাসনামলে তারা ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন । রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের রাজাভুবন গ্রামে চাকমা রাজাদের একটি প্রাচীন রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যমান যা এই অঞ্চলের চাকমা ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে থাকে এবং এই বাড়িটি একসময় চাকমা রাজার রাজধানী ছিল এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম । বস্তুত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা পার্বত্য অঞ্চলকে চট্টগ্রাম জেলা থেকে পৃথক করে আলাদা জেলা গঠনের আগে চাকমারা চট্টগ্রাম জেলারই বাসিন্দা ছিলেন। ১৮৬০ সালের পর ব্রিটিশদের সাথে সংগ্রাম শুরু হলে চাকমারা তাদের বসতি রাঙ্গুনিয়ার সমতল এলাকা থেকে পার্বত্য অঞ্চলে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন ।  ব্রিটিশরা চাকমাদের পরিত্যক্ত ভূমি বাঙালী জমিদার ও চাষীদের দিয়ে দেন যার ফলে চাকমাদের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে উঠে । চাকমা বিদ্রোহ ও ১৭৭৬ থেকে ১৭৮৭ সালের ইতিহাস আলোচনায় আরো বিস্তৃতভাবে 

উল্লেখ করা আছে যেটি দেখতে পাওয়া যায়। 

তাছাড়া চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় চাকমা শাসনামলের ১৭৩৭ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘ ইতিহাস বিদ্যমান আছে এবং  রাঙ্গুনিয়া অঞ্চল চাকমাদের ইতিহাসে রাজকীয় রাজধানী ও শাসনের কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যা পরবর্তীকালে ব্রিটিশদের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং চাকমারা পূর্বদিকে পার্বত্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হন। তাছাড়া ১৭৭৬ সালে ব্রিটিশদের নীতির বিরুদ্ধে এবং জীবিকা নির্বাহের কঠিন পরিস্থিতির কারণে প্রথম চাকমা বিদ্রোহ সংঘটিত হয় যা রাজা শের দৌলত ও রামু খাঁর নেতৃত্বে হয়েছিল। পরবর্তীতে  জানবকস খাঁর নেতৃত্বেও বিদ্রোহ হয়। সর্বোপরি বলা যায় রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলে চাকমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এখানকার চাকমা রাজাদের শাসনের ভিত্তি স্থাপন যা প্রায় ১৭৩৭ সাল থেকে রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ রাজানগরকে কেন্দ্র করে চাকমা রাজত্ব বিকশিত হয় যা রাঙ্গুনিয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এখানে সপ্তদশ শতাব্দীতে একটি ঐতিহাসিক রাজবাড়িও নির্মিত হয়েছিল ,  যদিও এটি বর্তমানে বিস্মৃতির পথে। বস্তুত  এই অঞ্চলটি বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলার অংশবিশেষ যেখানে রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় অবস্থিত । 

রাঙ্গুনিয়ার চাকমা রাজবাড়ীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হলো অনেক বিখ্যাত ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এই রাজবাড়ীটি ও বিখ্যাত চাকমা রানি কালিন্দী এই রাজবাড়ীতে বসবাস করতেন আর রাজা হরিশ্চন্দ্র রায় রাজা হওয়ার পর রাঙ্গুনিয়া থেকে রাঙামাটিতে চলে আসেন। তাছাড়া রাজবাড়ীটির বর্তমান অবস্থা হলো কালের বিবর্তনে ও সংরক্ষণের অভাবে রাজবাড়ীর অবকাঠামো জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে যা এটিকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে বলা যায়। বলা হয়ে থাকে চাকমা রাজার রাজধানী প্রথমে পার্বত্য চট্টগ্রামের আলীকদম ছিল সেখান থেকে ১৭৩৭ সালের পর রাঙ্গুনিয়ার রাজানগরে স্থানান্তরিত হয় এবং পরবর্তীতে ১৮৭৪ সালে রাজা হরিশ্চন্দ্র  রাঙ্গামাটিতে রাজধানী স্থানান্তর করেন। বর্তমানে আলীকদম  বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের বান্দরবান জেলার একটি উপজেলা । কথা থাকে যে ১৭৩৭ সালের আগে রাজা সেরমুস্ত খাঁ বান্দরবানের আলীকদমে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন , কিন্তু আরাকানীদের অত্যাচারে আলীকদম ত্যাগ করে সেরমুস্ত খাঁ মোগল নবাবের সাথে মিত্রতা করেন ও নবাব তাঁকে রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন ,  আবার ১৭৩৭ সালে সেরমুস্ত খাঁর উত্তরসূরি সুকদেব রায় রাঙ্গুনিয়ার শিলক নদীর তীরে চাকমা অধ্যুষিত অঞ্চলে রাজত্ব স্থাপন করেন যা রাজানগর নামে পরিচিত ছিল ,  অতঃপর চাকমা রাজা হরিশ্চন্দ্র রায় ১৮৭৪ সালে রাঙ্গুনিয়া থেকে তাঁর রাজধানী রাঙ্গামাটিতে স্থানান্তরিত করেন ও এখানে তিনি একটি নতুন রাজবাড়ি নির্মাণ করেন যা পরে ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্ট হ্রদের পানিতে ডুবে যায় ,  আর বর্তমানে চাকমা রাজবাড়ি বাংলাদেশের রাঙ্গামাটিতে অবস্থিত চাকমা রাজপরিবারের একটি জমিদার বাড়ি ,  বস্তুত 

 ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কারণে রাজবাড়িটি সৃষ্ট কৃত্রিম হ্রদের পানিতে ডুবে যায় ,  ফলে একই বছরে শহরে তৎকালীন রাজা ত্রিদিব রায় আরেকটি রাজবাড়ি নির্মাণ করেছিলেন যা শহরের রাজদ্বীপে নির্মিত রাজবাড়িটি  তৈরি করা হয়েছিল , সর্বোপরি বলা যায় আলীকদম (  বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের বান্দরবান জেলার একটি উপজেলা ) ও রাঙ্গুনিয়া ( বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা) এবং রাঙ্গামাটি ( বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের  একটি শহর এবং প্রশাসনিক সদর দপ্তর ও 

রাঙ্গামাটি জেলা যা চট্টগ্রাম বিভাগের একটি অংশ ) স্থানের ইতিহাস অবলোকনের মাধ্যমে আপনি আরো 

বিস্তৃত এবং নিখুঁত ধারণা পেতে পারেন ,  প্রকৃতপক্ষে আমি যেটি তুলে ধরছি তা খুবই সংক্ষিপ্তভাবে।‌ 

তাছাড়া রামু খাঁ ছিলেন চাকমা দলপতি রাজা শের দৌলতের সেনাপতি এবং তাঁরা আত্মীয় ছিলেন বলা হয়ে থাকে ও তিনি  তিনি রাজার অধীনে সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব দিতেন আর  ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৮ শতকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত চাকমা বিদ্রোহের একজন বীর নেতা ও সেনাপতি । সর্বোপরি রয়েল চাকমা কিংডম বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐতিহ্যগতভাবে চাকমা জনগোষ্ঠীর যে বংশানুক্রমিক রাজা দ্বারা শাসিত অঞ্চল ছিল সেটিকে বোঝায় যেখান থেকে আপনি রাজকীয় চাকমা রাজ্য ৫ম শতাব্দী থেকে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিজক বা চাকমা ভাষার ইতিহাস ও চাকমা জাতির কালানুক্রমিক ইতিহাস পড়ে আপনার ধারাবাহিক ধারণাকে সমৃদ্ধ করতে পারেন ।  সবশেষে যেটি বলা যায় চাকমা জাতির ইতিহাস অন্তত পক্ষে হাজার বছরের সমৃদ্ধময় ইতিহাস তো অবশ্যই যেখানে আরো বিশদ গবেষণার প্রয়োজন যেটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে সবকিছুই বিদ্যমান আছে তাদের মধ্যে ও একটি স্বকীয় ও স্বতন্ত্র ইতিহাস বিদ্যমান আছে যার মধ্যে তাদের রাজ্য শাসনের ইতিহাসও অন্তর্ভুক্ত। তাদের আদি ইতিহাস সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকলেও সম্পূর্ণভাবে ও স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে জানা না গেলেও  তাদের ধর্ম ,  সংস্কৃতি, ভাষা এবং সামাজিক জীবনধারার নিজস্ব ঐতিহ্য ও বিকাশধারা বিদ্যমান । বস্তুত চাকমা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে ঐতিহাসিক গবেষণা আবশ্যক বলা যায় যেখানে চাকমাদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা এখনও প্রাসঙ্গিক , এটির কারণ হলো তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বিকাশধারা এবং বর্তমান বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার প্রয়োজন রয়েছে আর চাকমা জাতি একটি স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ ইতিহাস ধারণ করেন যা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রকাশিত হয় তা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে । তাছাড়া তাদের ইতিহাসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম ,  কাপ্তাই প্রকল্পের কারণে দেশান্তর ,  নিজস্ব সংস্কৃতি ,  ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং সামাজিক কাঠামোর অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে যা তাদের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে।  তাদের সমাজ ব্যবস্থা ও চাকমা রাজা এবং সার্কেল ব্যবস্থার মতো নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো আছে যেটি তাদের ইতিহাসকে আরও সুগঠিত করেছে ।  পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে তাদের দীর্ঘদিনের বসবাস এবং ভারতের মিজোরামে তাদের উপস্থিতি তাদের ইতিহাসকে আরও বিস্তৃত করেছে বৈকি। কাপ্তাই প্রকল্পের প্রভাব যেখানে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চাকমাদের জীবনে এক বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে যার ফলে বহু মানুষ তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন যা তাদের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। সুতরাং  চাকমা জাতির ইতিহাস নিঃসন্দেহে  ঘটনাবহুল আর এই সকল বিষয়গুলো চাকমা জাতির ইতিহাসকে কেবল ঘটনাবহুল নয়, বরং অত্যন্ত  গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে । পাশাপাশি বিশেষ করে তাদের জিনগত সম্পর্ক ও তাদের আদি ইতিহাস এবং মধ্যযুগে চাকমা জনগোষ্ঠী ও ব্রিটিশ শাসনে চাকমা জনগোষ্ঠী এবং চাকমা জনগোষ্ঠীর বর্তমান অবস্থান আর চাকমা জনগণের জীবনযাত্রার নানান দিক তুলে ধরার জন্য ও তাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য ব্যাপক ও আধুনিক গবেষণা অপরিহার্য বলা যায় । যদিও চাকমাদের উপর কিছু গবেষণা হয়েছে যা তাদের ভাষা ,  লোককথা ,  ভূমি অধিকার ,  শিক্ষা , স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর উপর , কিন্তু আরো বিস্তারিত ও আধুনিক গবেষণা প্রয়োজন যা তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অবস্থার উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে আর এছাড়াও   তাদের ইতিহাস ,  সংস্কৃতি ,  সামাজিক পরিবর্তন এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের জীবনযাত্রা যা আরো বিস্তৃতভাবে আলোচনা করার আবশ্যকতা আছে ,  বস্তুত   ব্রিটিশ শাসনামল বা তার পরবর্তীতে তাদের বিষয়ে খুব বেশি একটা চর্চা হয়নি যেখানে তাদের নিজস্ব ইতিহাস ,  সংস্কৃতি ,  ধর্ম ,   ভাষা ,  সামাজিক প্রথা ,  ইতিহাস ও কিংবদন্তি যেগুলো একটি দেশের জন্য অমূল্য সম্পদ। সংস্কৃতি একটি দেশের অমূল্য সম্পদ , কারণ এটির মাধ্যমে  পরিচয় ও ঐতিহ্য যেখানে সংস্কৃতি একটি জাতির জীবনযাপন ,  বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিনীতিকে প্রকাশ করে থাকে যা দেশের নিজস্ব পরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ যেখানে সংস্কৃতি একটি দেশের অতীতকে স্মরণ করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য ঐতিহ্য সংরক্ষণে সাহায্য করে এবং মানবিক মূল্য যেখানে এটি জ্ঞান‌ ,  শিল্পকলা , আইন এবং সামাজিক প্রথা অন্তর্ভুক্ত করে যা সংস্কৃতি সমাজের মানুষের মধ্যে বোধ , বুদ্ধি ,  বিবেক ও চেতনাকে গড়ে তোলে এবং নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে থাকে ,  সুতরাং সংস্কৃতি শুধু একটি দেশের অতীতের স্মৃতি  নয় মোটেও , বরং এটি বর্তমানের চালিকাশক্তি এবং ভবিষ্যতের প্রেরণা যা দেশকে সমৃদ্ধ ও উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলা যায় ও 

 সংস্কৃতিই একটি দেশের  দেশের পরিচয় এবং ঐতিহ্য ও বিশ্বাস ধারণ করে । আরেকটি বিষয় তুলে ধরি 

  ভারতবর্ষের আদিবাসী ইতিহাস বলতে উপমহাদেশের প্রাচীনতম অধিবাসীদের ইতিহাসকে বোঝানো হয়ে থাকে যারা দ্রাবিড় ও ইন্দোআর্যদের আগমনের আগে থেকেই এখানে বাস করতেন । আদিবাসী শব্দটি ২০ শতকে জনপ্রিয় হয় এবং এটি একটি স্বপদবী হিসেবে অনেক সম্প্রদায়ের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে থাকে যা তাদের আসল বাসিন্দা বা ভূমিপুত্র পরিচয় বহন করে। তাদের ইতিহাস প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে  ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের জীবন বিকশিত হয়েছে। 

প্রাচীন বাসিন্দা তথা আদিবাসীরা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম বাসিন্দা এবং তাদের ইতিহাস অনেক সুপ্রাচীন যার প্রভাব নব্য প্রস্তর যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনেও দেখতে পাওয়া যায় ।  আদিবাসী শব্দটি কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বোঝায় না , বরং এটি ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন উপজাতি গোষ্ঠীর সমষ্টিগত নাম। ভারতের প্রধান কয়েকটি আদিবাসী গোষ্ঠী হলেন ভিল ,  গোন্ড , সাঁওতাল , মুন্ডা , খাসি এবং গারো। আদিবাসীদের ইতিহাস শুধু একটি প্রাচীন ইতিহাসই নয় মোটেও বরং তারা দেশের রক্ষায় ও ঐতিহ্যের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তারা নিজেদের সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে টিকিয়ে রাখার জন্য একটি নিরন্তর সংগ্রাম করে চলেছেন যা তাদের ইতিহাসকে আরো শক্তিশালী করে তুলেছে বলা যায়। আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য , সংস্কৃতি ও জীবনযাপন ধারা বজায় রাখেন এবং  তারা সাধারণত নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী বাসস্থান বা পূর্বপুরুষের অঞ্চলে বাস করেন ও নিজেদের একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন এবং  তাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা প্রকৃতির সাথে গভীর ভাবে জড়িত । আবারো বলা যায় আদিবাসী  শব্দের ব্যবহা হলো এই শব্দটি একটি আধুনিক ধারণা যা বোঝায় আসল বাসিন্দা ।  ২০ শতকে এই শব্দটি অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের আসল বাসিন্দা পরিচয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়  বিশেষত ভারতে তফসিলি উপজাতি এবং বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী  হিসাবে । তফসিলি জাতি ও  তফসিলি উপজাতি ( Scheduled Castes and Scheduled Tribes ) হলেন  আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত জনগোষ্ঠী ও ভারতের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত আর্থসামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি ও 

  ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের বেশিরভাগ সময় ধরে  তারা হতাশাগ্রস্ত শ্রেণী হিসাবে পরিচিত ছিলেন । মূলত আদিবাসীরা ইন্দোআর্যদের আগে ছিলেন। ইন্দোআর্যরা বা আর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে এসেছিলেন ও সম্ভবত প্রোটো-ইন্দো-আর্য ভাষা ও সংস্কৃতি চালু করেছিলেন আর এর অর্থ হলো ভারতে ইন্দোআর্যদের আগমনের আগেই এই অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা বসবাস করেন উদাহরণ হিসেবে বলা যায় দক্ষিণ এশিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠী যাদের মধ্যে দ্রাবিড়রা অন্তর্ভুক্ত ও তারা ইন্দোআর্যদের আগমনের অনেক আগে থেকেই এই অঞ্চলে বসবাস করতেন। ইন্দোআর্যদের আগমন যেখানে ইন্দোআর্যরা ছিলেন পশুপালক যারা মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় অভিবাসন করেছিলেন বলে মনে করা হয়ে থাকে এবং এই অভিবাসনের ফলে প্রোটো-ইন্দো-আর্য ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। ঐতিহ্যগতভাবে আর্যদের আগমনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হয়ে থাকে যার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে ইন্দো-আর্য ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচলন ঘটে আর আদিবাসীরা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম বাসিন্দা এবং তাদের পরে ইন্দোআর্যদের আগমন ঘটেছিল। বস্তুত ভারতীয় উপমহাদেশে মানব সভ্যতার শুরু হয় বহু লক্ষ বছর আগে থেকেই। আদিবাসীরা যারা ভারতীয় উপমহাদেশের আদি বাসিন্দা তারা সভ্যতার শুরুর সময় থেকেই এখানে ছিলেন। ইন্দোআর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে অভিপ্রায়ণ করেছিলেন আর এই অভিপ্রায়ণ প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে শুরু হয়েছিল ও তারা নিজেদের সাথে ইন্দোইরানীয় ভাষা নিয়ে এসেছিলেন ,  সর্বোপরি 

বলা যায় আদিবাসীরা ইন্দোআর্যদের আগে ভারতে এসেছিলেন ও ইন্দোআর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে অভিপ্রায়ণ (মাইগ্রেশন) করেন যা প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে শুরু হয়েছিল , আবার অন্যদিকে indigenous people বা আদিবাসীরা ভারতীয় উপমহাদেশে বহু আগে থেকেই বসবাস করতেন। মূলত 

আদিবাসী শব্দটি ১৯৩০ দশকে রাজনৈতিক কর্মীরা ভারতীয় উপমহাদেশের উপজাতিদের জন্য আদিবাসী (আসল বাসিন্দা) পরিচয় তৈরি করতে শুরু করেন ও  ভারতের উপজাতিদের নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরা এবং তাদের অধিকার আদায়ের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই শব্দের ব্যবহার শুরু হয় এবং পরে এটি ভারত ও বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে । 

আদিবাসী শব্দটির ব্যবহারের কারণ ও প্রেক্ষাপট হলো 

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যেখানে ১৯৩০ এর দশকে কিছু রাজনৈতিক কর্মী উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলোকে একটি সম্মানজনক ও নিজস্ব পরিচিতি দিতে এই শব্দটি ব্যবহার শুরু করেন যা ছিল তাদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের একটি কৌশল এবং 

নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠা যেখানে এই শব্দ ব্যবহার করে উপজাতিরা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে তারা এই অঞ্চলের আসল বাসিন্দা এবং বহিরাগত বা দখলদার জনগোষ্ঠীর আগমনের পূর্বেই তারা এখানে বসবাস করতেন এবং আইনি ও শাসনতান্ত্রিক স্বীকৃতি  যেখানে ব্রিটিশ আমলের কিছু শাসনবিধিতে (যেমন ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি) আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল যা পরবর্তীতে এই শব্দের প্রচলন বাড়াতে সাহায্য করে এবং জাতিসংঘের সংজ্ঞা  বা জাতিসংঘের মতে আদিবাসী বলতে এমন সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীকে বোঝায় যাদের প্রাকআক্রমণ ও প্রাকঔপনিবেশিক সমাজগুলোর সাথে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে এবং নিজেদেরকে সেই অঞ্চলের অন্যান্য সমাজের থেকে আলাদা মনে করেন আর 

এই শব্দটির ব্যবহার মূলত আদিবাসী সম্প্রদায়ের নিজস্ব সত্তা ও পরিচয় এবং তাদের ঐতিহাসিক অবস্থানকে তুলে ধরার জন্যই শুরু হয়েছিল যা পরবর্তীতে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। বস্তুত  পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ১৯০০ (১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের আইন – ১) যা পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়াল নামেই অধিক পরিচিত ও  এটি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত সরকার কর্তৃক প্রণীত একটি আইন যা মূলত বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে কীভাবে পরিচালনা করতে হবে সেই সংক্রান্ত নীতিমালা নিয়ে তৈরি। তাছাড়া ১৮৬০ সালে গৃহীত পূর্ববর্তী আইনটি যথেষ্ট নয় সরকারের এই উপলব্ধি থেকেই সেই আইনের জায়গায় এই আইনটি গৃহীত হয়েছিল এবং আইনটি গ্রহণের পর থেকে এটির মাধ্যমে  পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসনকার্য পরিচালিত হতো। বস্তুত ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে চট্টগ্রাম জেলা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক করে একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল যা আসলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আর এই পৃথকীকরণের ফলে ব্রিটিশরা ওই অঞ্চলে নিজস্ব প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন এবং ১৯০০ সালে এই প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ১৯০০ প্রণীত হয়। মূলত ১৮৬০ সালের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্রিটিশ শাসিত চট্টগ্রাম জেলার অংশ ছিল ও ১৮৬০ সালে এটিকে একটি আলাদা জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং প্রশাসনিক উদ্দেশ্য হলো এর মাধ্যমে ব্রিটিশরা পার্বত্য অঞ্চলে নিজেদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করেন এবং পরিবর্তিত শাসনব্যবস্থা যেখানে ১৮৬০ সালে এই পৃথকীকরণ সম্পন্ন হওয়ার পর এই অঞ্চলটি একটি ভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে আসে যা পরবর্তীতে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়াল বা রেগুলেশন দ্বারা আরও স্পষ্ট করা হয়।  তাছাড়া কিছু প্রধান উপজাতীয় গোষ্ঠী হলেন ভিল যারা ভারতের বৃহত্তম উপজাতি গোষ্ঠী যা মহারাষ্ট্র ,  মধ্যপ্রদেশ ,  গুজরাট , রাজস্থান ,  ছত্তিশগড় এবং ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাস করেন। গোন্ড যারা মধ্য ভারত এবং দাক্ষিণাত্য মালভূমির একটি প্রধান উপজাতি। সাঁওতাল যারা পূর্ব ভারতের একটি উল্লেখযোগ্য উপজাতি ও যারা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মুন্ডা যারা মূলত মধ্য ভারতে বসবাসকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজাতি। খাসি ও গারো যারা উত্তরপূর্ব ভারতের মেঘালয় রাজ্যে বসবাসকারী প্রধান উপজাতি । ভুটিয়া যারা ভারতের উত্তরাঞ্চলে বসবাসকারী একটি উপজাতি। আঙ্গামি যারা উত্তরপূর্ব ভারতের নাগাল্যান্ডের একটি উপজাতি ,  সুতরাং ভারতবর্ষে ভিল ,  গোন্ড ,  সাঁওতাল ,  মুন্ডা , খাসি , গারো ,  ভুটিয়া  এবং আঙ্গামি সহ অনেক উপজাতীয় গোষ্ঠী রয়েছেন যেখানে মোট ৭০৫ টির বেশি জাতিগত গোষ্ঠীকে তফসিলি উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ও প্রতিটি উপজাতির নিজস্ব স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনধারা বিদ্যমান  যা ভারতের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে। তাছাড়া তাদের গুরুত্ব হলো বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি যেখানে ভারতের বিভিন্ন উপজাতি গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজস্ব ভাষা , ধর্ম , সংস্কৃতি এবং রীতিনীতি বজায় রাখেন যা দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে এবং ঐতিহাসিক ভূমিকা যেখানে অনেক উপজাতি যেমনঃ সাঁওতাল ,  ভিল , খাসি এবং মিজো  ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবদান যেখানে উপজাতিরা ভারতের অর্থনীতি ও সমাজেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন , যদিও তারা প্রায়ই বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। বস্তুত কোনো জাতিগত গোষ্ঠীকে তফসিলি উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ হলো  সেই গোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক  এবং রাজনৈতিকভাবে অনগ্রসরতা বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য বিশেষ সুবিধা ও অধিকার প্রদান করা ও  এই স্বীকৃতির মাধ্যমে তারা সরকারি বিভিন্ন সুযোগসুবিধা যেমনঃ শিক্ষা ,  কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে অগ্রাধিকার পান যা তাদের মূলধারার সমাজের সাথে একীভূত হতে ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করে থাকে আর সংক্ষেপে বলা যায় তফসিলি উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি একটি গোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অনগ্রসরতা স্বীকার করে নিয়ে তাদের সমাজের মূল স্রোতে উন্নীত করার একটি রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে (বর্তমানে বাংলাদেশে) ব্রিটিশ শাসনকালে চাকমারা বসবাস করতেন এবং ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি স্বতন্ত্র এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল যা বর্তমান ভারত ও বাংলাদেশের চাকমাদের পৃথক অস্তিত্বের একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ছিল ব্রিটিশ ভারতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক আইন যা ১৯৩৫ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হয় এবং এটি ভারতে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করে ও এই আইনের মাধ্যমে একটি সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং এটি ব্রিটিশ ভারতের শেষ সংবিধান হিসেবে পরিচিত আর ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল আর ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন ছিল ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের একটি আইন যা ব্রিটিশ ভারতকে ভারত ও পাকিস্তান এই দুটি স্বাধীন অধিরাজ্যে বিভক্ত করে যা ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটায় আর এই আইনের মাধ্যমে পাঞ্জাব ও বাংলা প্রদেশ দুটি নতুন রাষ্ট্রের মধ্যে ভাগ হয়ে যায় এবং ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই এটি রাজকীয় সম্মতি লাভ করে আর তাছাড়া ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনে পাঞ্জাব ও বাংলা প্রদেশ দুটিকে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনুসারে জেলা ভিত্তিক ভাগ করা হয় যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলো পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো ভারতে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং এই বিভাজন লর্ড মাউন্টব্যাটেন উনার পরিকল্পনা অনুযায়ী জেলাগুলোর হিন্দু বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হয় আর 

পাঞ্জাব প্রদেশের পশ্চিম অংশ পাকিস্তানে এবং পূর্ব অংশ ভারতে যোগ দেয় ও একইভাবে বাংলা প্রদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব অংশ পাকিস্তানে এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিম অংশ ভারতে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং 

 পাঞ্জাব প্রদেশের যে সমস্ত জেলায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল সেগুলো পূর্ব পাকিস্তানের (পরে বাংলাদেশ) অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বাকি অংশ ভারতে যুক্ত হয়। তাছাড়া একইভাবে বাংলা প্রদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলো পূর্ব পাকিস্তানে এবং অমুসলিম (প্রধানত হিন্দু) সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলো ভারতে (পশ্চিমবঙ্গ) যুক্ত হয় , কিন্তু ফলাফল হলো 

এই বিভাজনের ফলে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং এই প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ মানুষ ছিন্নমূল হন ও ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেখা দেয় । লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ছিলেন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর অফিসার এবং ভারতের শেষ ব্রিটিশ ভাইসরয় ও প্রথম গভর্নরজেনারেল ও তিনি ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের বাস্তবায়নের তদারকি করেন এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দেন আর তিনি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য এবং রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্বামী প্রিন্স ফিলিপের মামা ছিলেন আর লর্ড মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা যা ৩ জুন পরিকল্পনা নামেও পরিচিত ছিল যা ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন কর্তৃক উপস্থাপিত একটি প্রস্তাব যা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভক্তি ঘটিয়ে ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছিল। আদিবাসী (Indigenous People) অর্থ হলো আক্ষরিক অর্থে আদিবাসী বা প্রাচীনতম বাসিন্দা এবং বৈশিষ্ট্য হলো একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের প্রাচীনতম অধিবাসী আর বংশগতভাবে বা ঐতিহাসিক কারণে সেই অঞ্চলের মৌলিক বাসিন্দা হিসেবে বিবেচিত আর তাদের নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে।  উপজাতির (Tribe) অর্থ হলো এটি একটি সামাজিক একককে বোঝায় এবং বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্রতর গোষ্ঠী যাদের নিজস্ব আলাদা সংস্কৃতি, ভাষা ও সামাজিক প্রথা বজায় রাখেন ও একটি রাষ্ট্র গঠন করতে পারেননি, কিন্তু নিজস্ব স্বতন্ত্র জীবনধারা অনুসরণ করেন আর মূল পার্থক্য  হলো আদিবাসী একটি অঞ্চলের প্রাচীনতম বাসিন্দা বোঝায় এবং উপজাতি একটি বৃহত্তর সমাজের অংশ হিসেবে একটি সামাজিক বা জাতিগত সম্প্রদায়কে বোঝায়। 

তাছাড়া জাতিগত পরিচয় এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আদিবাসী  ও উপজাতি শব্দগুলোর ব্যবহার ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। চাকমা জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট  এবং এই প্রতিষ্ঠানটি বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ,  বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই কাজগুলো করে থাকে আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট ,  রাঙ্গামাটি ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ও এটি বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ,  পরিচর্যা , উন্নয়ন ও চর্চার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খাগড়াছড়ি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, বান্দরবান‌ও বিদ্যমান আছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হলেন এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা সংখ্যায় কম , নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাস করেন , নিজস্ব স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য  ধারণ করেন ও নিজেদেরকে বৃহত্তর সমাজ বা অন্য সম্প্রদায় থেকে পৃথক মনে করেন ও এই গোষ্ঠীগুলো নিজেদের একটি আলাদা পরিচিতি নিয়ে বৃহৎ সমাজের অংশ হিসেবে টিকে থাকেন আর নৃগোষ্ঠী শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো মানুষের সামাজিক দল বা গোষ্ঠী (নৃ = মানুষ ও গোষ্ঠী = দল) ও সহজভাবে বলতে গেলে এটি এমন একদল মানুষকে বোঝায় যাদের মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য যেখানে ভাষা ,  সংস্কৃতি, ইতিহাস বা সামাজিক অভিজ্ঞতার কারণে একাত্মতা তৈরি হয় এবং তারা নিজেদেরকে অন্য গোষ্ঠী থেকে আলাদা মনে করেন ও নৃগোষ্ঠী একটি সাংস্কৃতিক শব্দ আর  নৃগোষ্ঠী কেবল একটি শব্দ নয় , এটি একটি সামাজিক সাংস্কৃতিক ধারণা যা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীগুলোর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্যকে নির্দেশ করে থাকে । তাছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর গুরুত্ব হলো সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য যেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও রীতিনীতির মাধ্যমে পৃথিবীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন এবং জীববৈচিত্র্য যেখানে অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী প্রকৃতির সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত ও তাদের জীবনযাত্রা ও প্রথাগুলো পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকেন , যদিও বিশ্বজুড়ে প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও গণনা করা অত্যন্ত জটিল একটি কাজ যা বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী বা বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগুলোর তথ্য পাওয়া কঠিন। আবার সংজ্ঞা ও সনাক্তকরণের ক্ষেত্রে কোন একটি সম্প্রদায়কে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে গণ্য করার নির্দিষ্ট ও সার্বজনীন সংজ্ঞা নেই ও বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতিতে এই সংজ্ঞা ভিন্ন হয় যা সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে একটি বড় বাধা ,  তবে বিভিন্ন তথ্য ও উৎস অনুযায়ী এদের সংখ্যা কয়েক হাজার হতে পারে আর ধারণা করা হয়  বিশ্বে প্রায় ৫,০০০ এর বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী  রয়েছেন এবং এরা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে বসবাস করে থাকেন । সর্বোপরি আবারো বলা যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ও  চাকমা জাতি সম্পর্কে আরও বিশদ ও বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে এবং অসম্পূর্ণ ও বিতর্কিত তথ্য যেখানে চাকমা জাতির একটি সঠিক ও গ্রহণযােগ্য ইতিহাস এখনো পর্যন্ত প্রণয়ন করা যায়নি বলে অনেক গবেষক মনে করে থাকেন ও বস্তুনিষ্ঠ বিচার বিশ্লেষণ এবং সঠিক তথ্য উপাত্ত দিয়ে বিষয়গুলো তুলে ধরতে আরও বেশি গবেষণার প্রয়োজন যা বর্তমানকালে অনুপস্থিত বলে মনে করা হয়ে থাকে এবং চাকমাদের উৎপত্তি ও বিস্তার এবং তাদের রাজ্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস আর আরাকানের সাথে তাদের সম্পর্ক এবং ব্রিটিশ ও পাকিস্তান শাসনামলের ঘটনাবলী নিয়ে গভীর অনুসন্ধানের আবশ্যকতা অনস্বীকার্য বলা হয়ে থাকে ও এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও গভীর ও  গবেষণা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জাতির ইতিহাস  সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি হবে এটি আশা করা যায়।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x