Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

আমার সিংগাপুর ভ্রমণ 

হোমায়ারা বেগম 

দ্বীপরাষ্ট্র সিংগাপুরে একবার একটা  প্রফেশনাল প্রশিক্ষণে অংশ নেবার জন্য আমার দপ্তরপ্রধান আমাকে  মনোনয়ন দেন। যথারীতি দায়িত্বপ্রাপ্ত  অফিসার চিঠি ইস্যু করেন এবং তা আমার হাতে এসে পৌছায়। হাতে খুব বেশি সময় না থাকায় আমি দ্রুত গোছগাছ শুরু করে দেই। নির্দিষ্ট দিনে শাশুড়ি আর আমার ছেলেদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ি। আমার স্বামী আমাকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত সঙ্গ দেন। সকল ফর্মালিটি সেরে অন্য যাত্রীদের সাথে আমিও নির্ধারিত ফ্লাইটে উঠে পড়ি। ঢাকা টু মালয়েশিয়া এয়ার বাসের ভিতরের পরিবেশ দেখে এটা বাংলাদেশিদের জন্য রিজার্ভ করা ফ্লাইট। বেশিরভাগ যাত্রী বাংলাদেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। তারা নানারকম কাজ করার জন্য মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছে। তাদের উচ্ছ্বাস ভরা কথাবার্তা শুনে আমার বেশ ভাল লাগছিল। ছেলেদেরকে বাসায় রেখে একা বিদেশ চলে যাচ্ছি বলে আমার মন খানিকটা খারাপ ছিল। সহযাত্রীদেরকে হাসিখুশি দেখে আমার মনের মেঘ ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকল এবং কিছুক্ষণের ভিতর সেই বিষন্নতা কেটে গেল। দেশী ভাইদের সাথে কথাবার্তা বলা শুরু করলাম। 

তাদের ভিতর একজন আমার উইনন্ডো সিটে বসে ছিল। কেবিনের দায়িত্বে থাকা ভদ্রমহিলা তার এবং আমার টিকেট দেখে আমাকে আমার নির্ধারিত সিটে বসিয়ে দিল। এরপর আমি বেশ কিছুক্ষণ বাইরের নানারকম দৃশ্য দেখতে পেয়েছিলাম। আর কিছু সুন্দর ছবি তুলতে পেরেছিলাম। মেঘের খেলা, সবুজের হাতছানি, সাগরের সুন্দর পানি বারবার আমাকে মুগ্ধ করল। প্লেন খানিক দূর যাবার পর খাবার সার্ভ করা শুরু হল। চৌকষ এয়ারহোস্টেস খাবারের অপশন চাইলে আমি ফিস আইটেম দিতে বললাম। এদের মাছের প্রিপারেশন কেমন সেটা চাখতে মন চাইল। যদিও অর্ডার দিয়ে দেবার পর মনের ভিতর ভয় লাগছিল, এই জিনিস খেতে পারব তো! গন্ধ টন্ধ লাগবে কিনা আল্লাহ মাবুদ জানেন। তবে খাবার সময় সেটার স্বাদ অনেক ভাল লাগল। খেতে খেতে আমার সহযাত্রীর সাথে কিছু কথাবার্তা হল। সে যশোরের ঝিকরগাছা এলাকার ছেলে। মালয়েশিয়ায় কাজ করতে এসেছে তিনবছর আগে। েক মালয়েশীয় মেয়েকে বিয়ে করেছে। আমাকে তার বাসায় যাবার জন্য দাওয়াত করল। আমাকে বারবার নিশ্চিত করল সেখানে আমার কোন অসুবিধা হবে না। আমি তার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হলাম। এরপর তাকে জানালাম যে, আমি একটা অফিসিয়াল প্রোগ্রাম এটেন্ড করতে সিংগাপুর যাচ্ছি। মালয়েশিয়াতে আমার ট্রানজিট মাত্র দুই ঘন্টার জন্য। আমি সেই সময়ে এয়ারপোর্টের ভিতরে থাকব। বাইরে কোথাও বের হব না। একথা শুনে সে একটু মনমরা হয়ে গেল। বাংলাদেশি বোনকে তার আতিথেয়তা দেয়ার সুযোগ হলনা। ইতিমধ্যে আমাদের খাওয়া শেষ হল। তখন সে আরেকটা অস্বাভাবিক কথা বলল। খাবারের সাথে স্টেইনলেস স্টিলের যে ছুরি আর কাটাচামচ দিয়েছে , ওগুলো আমি ব্যাগে করে নিয়ে যেতে পারি। সে পুরুষ মানুষ, তাই নিতে পারবে না। আর আমি ‘মহিলা’ তাই কেউ আমাকে চেক করবে না।  তার কথাবার্তা শুনে আমার মাথার ভিতর এলোমেলো লাগতে শুরু করল। তাকে বললাম এসব কাজ কখনো করবেন না। এতে বিদেশিদের কাছে আমাদের দেশকে ছোট করা হয়। আমাদের দুর্নাম হয়। কিন্তু ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী’। অগত্যা প্রসঙ্গ পাল্টালাম। 

কুয়ালালামপুরে দুই ঘন্টার ট্রানজিট। সেখানে নেমে গেইট নাম্বার আট খুঁজে পাইনা। একে তাকে বারবার জিজ্ঞাসা করে করে এগিয়ে যাই। এর মাঝে সাইন দেখলাম আমার পরবর্তী ফ্লাইট ওপেন হয়েছে। একপাশে ইলেকট্রিক ট্রেন দেখতে পেলাম। ওখানে কাজ করছিল এক বাংলাদেশি ভাই। আমার অবস্থা বুঝতে পেরে ট্রেনে উঠতে বলেন। খানিকটা এগোতেই ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। অগত্যা এস্কেলেটরে উঠলাম। পরে দেখা গেল আমাকে আসলে অন্য একটা বিল্ডিং এ যেতে হবে। অগত্যা ঘুরে আবার ট্রেনের কাছে এলাম। এর আগে দুই একটা দেশে গেছি। সেখানে এয়ারপোর্টের ভিতরে ছোট গাড়ি বা বাসে করে চলাচল করেছি। এবার প্রথম ট্রেনে ওঠার অভিজ্ঞতা হল। স্যুভেনির শপ থেকে কিছু কিনতে মন চাইছিল। কিন্তু হাতে সময় কম। অগত্যা ভাবলাম ফেরার পথে কিনব। এসবের মধ্যে কখন যেন দুই ঘন্টার ট্রানজিট শেষ হয়ে গেল। হোটেলে যাবার পর জানা গেল আমার জন্য বরাদ্দকৃত রুমের নাম্বার ‘বারশো চার’। লিফটে উঠে বারো লেখা বাটন প্রেস করি। রুমের সামনে গিয়ে কি-হোলে চাবি ঢুকাই। কিন্তু লক খোলেনা। আবার রিসেপশনে ফেরত আসি। মেয়েটি বলে এমন তো হবার কথা নয়। চাবি লিফটে কাজ করছে। কিন্তু রুমের দরজা খোলা যাচ্ছে না। চল গিয়ে দেখি। সে রুমের দরজায় চাবি ঢুকিয়ে মুহুর্তের ভিতরে লক খুলে ফেলে। আমি তো স্তম্ভিত। এ কি কারসাজি! আসলে চাবিটা ‘কি-হোলে’ ঢুকিয়ে সাথে সাথে বের করে নিতে হয়। তখন সবুজ বাতি জ্বলে ওঠে। কত কিছু অজানা রে!

ডাবল বেডের রুমে প্রথমে চোখে পড়ে লম্বা কাচের ড্রেসিং টেবিল। কয়েকটা চেয়ার, ফ্রিজ,আলমারি, স্লিপিং গাউন, ওয়ান টাইম স্যান্ডেল, লকার, এল ই ডি টিভি, ছাতা, টেলিফোন সেট, পানির বোতল, টয়লেট্রিজ সাজানো। দুটো পেইন্টিংস দেয়ালে ঝুলছে। ফ্রেস হয়ে ইজিচেয়ারে বসে কিছু বাদাম খে

খেয়ে নিলাম। পরে ঘন্টাখানেক ইন্টারনেট ব্রাউজ করে ঘুমানোর কথা ভাবছি, তখন মনে হল সকালের ড্রেসগুলো সামনে রাখি। বিদেশে এলে প্রথা অনুযায়ী আমি প্রথমদিন শাড়ি পরি। বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহি একটা শাড়ি নিয়ে এসেছি। কাল সকালে ওটা পরব। ইন্টারকমে নাস্তা খাবার সময় জেনে ঘুমাতে গেলাম। সকালে ডাইনিং এ এলাহীভোজ হল। তারপর রেডি হয়ে হলরুমে একত্রিত হবার পালা। ওখানকার একজন টিম মেম্বার আমাদের সকলকে নিয়ে গ্রুপ ছবি উঠালেন। তারপর চলে গেলাম সেশনরুমে। সন্ধ্যায় রুমে ফিরে আজকের সেশনে দেয়া লেকচার শিটগুলো উলটে পালটে দেখলাম। বাংলাদেশের ফাইনান্সিয়াল মার্কেট আর ফাইনানশিয়াল ইন্সট্রুমেন্ট বিষয়ে কিছু ধারণা দিতে হয়েছে। সকল দেশের অফিসাররা তাদের দেশ সম্পর্কে বলেছে। এভাবে সেশন করে হোটেলের ভিতরটা ঘুরে ফিরে দেখলাম। পরে ডিনার করে ঘুম দিলাম। এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। এখানকার বেশিরভাগ ব্যবস্থা খুব ভাল। তবে দুপুরে নামাজ পড়ার সময় অসুবিধায় পড়তে হত। বেসিনে ওজু করে পা ধোয়ার জায়গা নেই। ওয়ান টাইম গ্লাস বা বোতল রেখে গেলে সেগুলো ক্লিনার ফেলে দেয়। কি মুশকিল! আমি তাই লাঞ্চব্রেকে হোটেলে ফিরে যেতাম। এখানে আসার পর ভাত খাওয়া হয়নি। আটচল্লিশ ঘন্টা পার হয়েছে। ভেতো বাঙ্গালি মন ভাত খেতে চাইছে। ভারতীয় বা পাকিস্থানি মেট রা কোন এলাকার সন্ধান দিতে অপারগ হল। পরে ট্রেনিং সুপারভাইজার এলিজাবেথের শরণাপন্ন হলি আমরা। সে প্রাথমিকভাবে জানায়, খবর নিয়ে আমাদেরকে জানাবে। বুঝলাম, ততক্ষণ পর্যন্ত নুডুলস, পিজ্জা খেয়ে পেট ভরাতে হবে। 

একদিন ট্রেনিং শেষে হোটেলে ফিরছি। পথে আমাদের সাথে একই বিভাগে কাজ করা দুজন জুনিয়র কলিগকে দেখতে পেলাম। ওরা অন্য একটা ট্রেনিং এ এসেছে। ওদের সাথে গিয়ে তেনজুং পাগার এম,আর,টি স্টেশন থেকে বারো সিং ডলার দিয়ে একটা কার্ড কিনলাম। যা দিয়ে বাসে বা ট্রেনে চলাচল করা যাবে আট ডলার পর্যন্ত। বাকিটা কার্ডের দাম। শুনে হতাশ হলাম। দুই বছর আগে কার্ডের জন্য কোন দাম দিতে হতনা। যাক, কি আর করা! রোমে গেলে রোমানদের মত আচরণ করতে হয়! ওরা অবশ্য একটা অপশন রেখেছিল। দুই বছর পর্যন্ত এই কার্ড ব্যবহার করা যাবে। এটা মন্দের ভাল। আগেরবার সিংগাপুরে এসে যেখানে ছিলাম সেই শেরাঙ্গুন রোডে যেতে ইচ্ছে করল। হোটেল ব্রডওয়ে আর মোস্তফা সেন্টার দেখতে মন চাইছে। অনেকদিন ছিলাম তো, একটা মায়া পড়ে গেছিল। এবার ঠিক করা হল ট্রেনে যাব। রাতে ফেয়ার প্রাইসের দোকানে খেলাম। আর কিছু বোল নুডুলস কিনলাম। মাঝে মাঝে এটা দিয়ে রাতে ডিনার করা যাবে। জানা গেল কাছেই ‘আকবর হোটেলে” ভাত, রুটি, সবজি, ডাল, বিরিয়ানি এসব সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। রাতে ওখানে খেলাম। বেগুন আর টমেটো দিয়ে ঝাল ঝাল করে রান্না করা ডাল বেশি মজা লেগেছিল। 

পরদিন শনিবার।  প্রথম হলিডে। পরদিন ইটকা নামের মেয়েটি আমার সংগী হল। আমরা অল্পসল্প কেনাকাটা করলাম। সে হঠাত জানতে চাইল আমরা কোথাও বেড়াতে যেতে পারি কি? আমার আপত্তি নেই জানালাম। তখন দুজনে মিলে ঠিক করলাম সেন্তোসা আইল্যান্ড যাওয়া যায়। এটা সিংগাপুরের অন্যতম আকর্ষনীয় পর্যটন স্থান। আমরা ট্রেনে করে সেখানে গেলাম। ভিতরে একটা মনোরেল আছে। তাতে কয়েকটা মাত্র বগি । নানা পশুপাখির ছবি আকা আছে  সেখানে। বাচ্চারা মহা আনন্দে সেই ট্রেনে চড়ে হাসছে। আমরা দুজন টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। অনবদ্য সময় কেটেছিল সেদিন।সিনিওয়র সিটিজেন আর বাচ্চাদের জন্য তখন টিকিটে দশ ডলার ছাড় ছিল। অপূর্ব সিস্টেম। সেখানকার টাওয়ারে উঠে সমুদ্রগামি জাহাজ আর চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। ওয়াকওয়েতে আর অটোমেটিক ওয়াকারে চড়ে যার যার ইচ্ছামত ঘুরছে। আর একটা খাতা ছিল। সেখানে কমেন্ট আর সাজেশন চাওয়া হয়। কি সুন্দর সিস্টেম! এতোদিনে নিশ্চয় আরো নতুন নতুন কিছু জিনিস যোগ হয়েছে। কাজের অবসরে সেসব উপভোগ করার মত সময় আর সুযোগ আমাদেরকে করে নিতে হবে।  

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x