দেবযানী হালদার, বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ
গোটা সিদ্ধ নিয়ে লিখতে বসার আগে বেশ কিছু বিষয়-বহির্ভূত অথচ প্রাসঙ্গিক কথা আলোচনা করতে হবে। নাহলে যারা জানেন না, তাঁদের মূল সূত্রটি ধরতে সমস্যা হতে পারে।
গোটা সিদ্ধ একেবারেই একটি ঘটি আচার। বিশেষত রাঢ় বাংলায় বহুল প্রচলিত। বর্ধমান, হাওড়া, হুগলি, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ জেলায় সব ঘটি বাড়িতে যথেষ্ট উৎসাহের সঙ্গে গোটা সিদ্ধ রান্না হয়। আমরা মানে আমার বাপের বাড়ি বাঙাল হলেও গোটা সিদ্ধ রান্না হয়। আমার দাদু স্বাধীনতার আগে বর্ধমান ও বীরভূমের সীমান্ত একটি ছোট গ্রামে বসবাস শুরু করেন চাকরি সুত্রে। আদতে অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার বাসিন্দা ছিলেন। আমার মা হুগলি জেলার ঘটি।
আমাদের বাড়িতে ঘটিদের অনেক নিয়ম কানুন মেনে চলা হয়। মূলতঃ ঠাকুমার নির্দেশ। এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্য আমার কাছে খুব যুগোপযোগী মনে হয়। ঠাকুমা বলতেন, প্রথমতঃ যেখানে থাকবে সেখানকার নিয়ম না মানলে স্থানীয় মানুষ বিদেশী ভাববে, এড়িয়ে চলবে। দ্বিতীয়তঃ যে নিয়ম যেখানে প্রচলিত, সেটা বহুদিন ধরে চলছে। অর্থাৎ কিছু কারণ তো ছিল। পরিবেশ, পরিস্থিতি অনুযায়ী রীতিনীতির আবির্ভাব ঘটে। কাজেই সেই নিয়ম পালন করলে কোন বিপরীত প্রক্রিয়া হবে না। তৃতীয়তঃ বাড়ির ছেলেমেয়ের কাছেও এটা সমস্যা কারণ তারা সোশ্যালাইজ করতে পারবে না। সবাই সেই নিয়ম পালন করবে, সেই মত খাওয়া দাওয়া হবে, অন্যরা বঞ্চিত হবে। এর ফলে বিভেদ সৃষ্টি হবে। আর মা ঘটি বলে আরও উৎসাহের সঙ্গে আমাদের বাড়িতে মোটামুটি সব ঘটি আচার পালন হয়।
এবার আসি গোটা সিদ্ধ কি সেই বিষয়ে। নামেই বোঝা যাচ্ছে, গোটা সবজি সিদ্ধ। পাঁচ রকমের গোটা কলাই, মটরশুঁটি, আলু, বেগুন, সীম, রাঙালু দেওয়া হয়। অনেকে শীষ সমেত পালং শাক, আবার অনেকে কচুও দেয়। ঘটিদের সরস্বতী পুজো ও তার পরের দিন মানে শীতলা ষষ্ঠীতে নিরামিষ খাওয়া দাওয়া হয়। আবার বাঙালদের জোড়া ইলিশ আসে অনেকের। আমাদের বাড়িতে মাছ রান্না হত, যদিও ইলিশ দেখি নি কখনো। হয়তো বীরভূম বা বর্ধমানে পাওয়া যেত না বলে।
সরস্বতী পুজোর দিন আমরা তো স্কুলে চলে যেতাম। যাবার আগে দেখতাম কুয়োর পাড়ে অনেক গোটা মাছ, তা প্রায় কিলো পাঁচেক তো হবেই। মা আর বাবার জন্য সকালে খিচুড়ি রান্না হত, আমরা স্কুলেই খেয়েছি বরাবর। খিচুড়ি রান্নার পরে শুরু হত মাছ ভাজা, বাবাই ভাজতেন। সন্ধ্যা বেলায় হত পরের দিনের জন্য রান্না। শীতলা ষষ্ঠীর দিন ছিল অরন্ধন। পঞ্চমীর সন্ধ্যায় মাছের মাথা দিয়ে বাঁধাকপির তরকারি, ফুলকপি ও আলু দিয়ে মাছের ঝোল, মাছের টক তেঁতুল দিয়ে, প্রতি বছর এক মেনু। সঙ্গে থাকত নানা রকম ভাজাভুজি। সব রান্না শেষ হলে রান্নাঘর ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে গোটা সিদ্ধ বসানো হত একটা বড় হাঁড়িতে। এই দিন শিল নোড়া খুব ভাল করে ধোয়া হত। তারপর তাকে মুছে একদম শুকনো করা হত। এরপর হলুদ জলে একটা সাদা নতুন কাপড় চুবিয়ে নিংড়ে সেটা দিয়ে শিল নোড়া ঢাকা দেওয়া হত। তারপর তার সামনে রাখা হত জোড়া কুল, জোড়া সীম, জোড়া মটরশুঁটি ও জোড়া বাঁশপাতা। এরপর গোটা সিদ্ধ হয়ে গেলে ওই ঢাকা দেওয়া শিল নোড়ার সামনে রেখে দেওয়া হত একটা চুপড়ি চাপা দিয়ে। কোন তরকারিই ফ্রিজে রাখা হত না। খুব ছোট বেলায় দেখেছি ভাতটাও করা থাকত। পরে অবশ্য ষষ্ঠীর দিন আমাদের জন্য গরম ভাত বাবা করে দিতেন। মা আগের রাতের জল দেওয়া ভাত খেতেন দই সহযোগে, তার নাম দই পান্তা। পরের দিন সকালে মা দই হলুদের ফোঁটা দিতেন আর হলুদ সুতো বেঁধে দিতেন আমার আর ভাইয়ের হাতে। মনে আছে, সেদিন মা আমাদের তেল মাখিয়ে স্নান করাতেন না। শীতলা ষষ্ঠীর দিন সন্তানকে ভয়ঙ্কর বসন্তের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই মায়েরা এই ব্রত করতেন। অনেকে সজনা ফুল রান্না করে্ন যা খুব ভাল অ্যান্টি ভাইরাল। আসলে গ্রাম বাংলায় বসন্তের প্রকোপ ছিল সাংঘাতিক। তার থেকে বাঁচবার জন্য একটা প্রস্তুতি বা প্রতিষেধক বলা যায় গোটা সিদ্ধ রান্নার পুরো আচারকে।
এখানে শিল নোড়ার পুজোর মধ্যেও যথেষ্ট কারণ আছে। পুরানো দিনের শিল ছিল বিরাট ভারী ভারী। প্রতিদিন তোলা সম্ভব ছিল না। শিল সারা বছর পাতা থাকত। প্রতিদিন রান্না হত বলে শিল সবসময় ভিজে থাকত, যৌথ সংসার, লোকজনের সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। এই পুজোর মধ্যে দিয়েই শিলকে দাঁড়া করানো, ভাল করে শুকনো করার ব্যবস্থা করা হয় যা পরে লোকাচার বা ব্রতের নিয়মে পরিণত হয়েছে।
সেদিন চা আর দুধ ছাড়া কোন গরম খাওয়া নিষেধ ছিল। পাড়ার কত লোকজন আসত আমাদের বাড়িতে খেতে! সকাল বেলা হালকা রোদে গ্রিল বারান্দায় মাদুর পেতে বসে গোটা সিদ্ধ দিয়ে মুড়ি খেতাম, কপালে থাকত ঠাণ্ডা একটা ফোঁটা আর বাঁ হাতে থাকত ঠাণ্ডা সুতো যার পরতে পরতে ছিল মঙ্গল কামনার উষ্ণতা। আজ সেই মঙ্গল কামনা কখন যেন হিমশীতল হয়ে হারিয়ে গেছে সময় আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস।
আমার এত কিছু লেখার মূল উদ্দেশ্য, ঘটি বা বাঙাল নয়, বাঙ্গালী হয়ে বাঁচতে হবে আমাদের। যতটা সম্ভব আচার পালন করতে হবে। আচার পালনে তো কোন ক্ষতি নেই। যে কোনো আচার অনুষ্ঠান পালন ধর্ম পালনের একটি অংশ। যখন দেখা যায় সবাই একসাথে ঐক্যবদ্ধ ভাবে একটি নির্দিষ্ট আচার পালন করছে, এর মধ্য দিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়!