স্নিগ্ধা মুখার্জী
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
খুব কি যাবার তাড়া ছিল?
এত তাড়াতাড়ি উঠে চলে গেলে?
যে কেয়ারি করা ফুল নিজের বাগান
থেকে ছিঁড়ে নিয়ে এলে
তার নামটুকু শুধোবার অবসর
দিলে না তো!
না, না, এ আমার বাতুলতা
নিশ্চিত জানি, ও ফুল গাছ থেকে
ছিন্ন কর নি তুমি, ও তোমার নাপসন্দ চিরকাল,
ও ছিল ভূমি লুণ্ঠিতা,
ধন্য ছিল সে মাটির পরে।
তারপর আমি ধন্য হলুম তার সুবাস টুকু অঙ্গে মেখে,
কিন্তু …. তার নাম টা জিগ্যেস করা হলো না।
চেনা ফুল, তবু আজ অচেনা লাগলো কেমন
ফলসা রঙেতে ছিটে সাদার বুনন।
কিছু বলার কি ছিল?
তাই এমন অসময়ে একাকী…
না, মানে এমনি বললাম সে কথা
ওই সময়ে এখন আর কেউ আসে না তো!
ইস্তিরির কাপড় সেও তো নিয়ে গেল একটু আগেই; সব কাজ সারা হ’লে বন্ধ দুয়ারে
আমার একাকী রাজত্ব চলে আজকাল।
এই একটু লেখাপড়া, কাগজ, বই, সুডোকু, জাম্বল ওয়ার্ড,
শব্দ জব্দের কাটাকুটি আর ঘর গেরস্থালি ।
ফাঁকে ফাঁকে বন্ধু, প্রিয়জনের সাথে ছোটখাট কথোপকথন, তা’ও নির্বাচিত সংলাপে।
কলেজের মত আর অত যুক্তি তক্কো করিনা আমি,
সকলের সাথে।
তাই নিজের সাথে যাপনের অমলিন সুখ।
মগজধোলাই এর থেকে অনেক আরাম এর ।
এ অবশ্য শুধু সাত কাহন নিজের, নিজের।
ঠিক তখনই দরজার ঘন্টির আওয়াজ,
উঠে যাই চটপট, দরজা খুলি।
অবাক করা খুশি নিয়ে তুমি ওপারে,
কী কাণ্ড! কতদিন পর, আরে আরে এসো এসো, ভেতরে এসো,
বসো আরাম করে।
বাইরে যে বৃষ্টি অঝোর,
ভিজলো নাকি পোষাকপরিচ্ছদ?
ছাতার অভ্যেস, সে তো ছিলোনা কোনোকালেই।
যাক গে, যাক গে সে সব।
সেদিন, আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে
তোমার আগমন,
উজ্জয়িনীর কবি কথা হল কিছুক্ষণ,
তারপর টুকটাক পৃথিবীর আর কিছু খবরাখবর।
বলার মত তেমন কিছু ই ছিলনা অবশ্য।
ধর্ম, যুদ্ধ, হত্যা, ধর্ষণ,
রাজনীতি, দূষণ…
এসব …এসব …
চক্ষুর সম্মুখে যেন গলিতের শব।
রসহীন কিছু কথা চালাচালি, ইতঃস্তত, এলোপাথাড়ি।
ক্লান্ত করে মন, তবু তো সচেতন নগর জীবন।
বললুম, থাক না আজ ওসব …
হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বীর থেকে, আষাঢ়ের আকাশ যে ঢের নির্মল।
তাই তো বলতাম এককালে, আমরা দুজন।
এখন কি তবে তিনকাল গিয়ে …..
নিপুণিকা, চতুরিকা, মালবিকার দল তারাও তো কবেই উধাও তাদের কবির সাথে ;
বেশ তবে, বাদ থাক আজ সে কথাও ।
তবে কি ঘটছে যাহা তাহাই ঘটুক
সয়ে যাই শব্দহীন চুপ
মায়া বিষাদের ছায়া সঘনিয়ে আসে
স্বপ্নময়, প্রেমময় অনন্ত আকাশে।
জানিনে ঠিক ! শুধু দেখা পাওয়া, শুধু ছুঁয়ে যাওয়া?
ব্যাস, এটুকুই?
তাও এক কাপ লিকারেই শেষ?
দার্জিলিংয়ের ফার্স্ট ফ্লাশ, অরেঞ্জ পিকো,
পছন্দের ছিল তোমার খুব
তাও কোনো বিশেষণ, ভিজেছিল কতক্ষণ,
ফ্লেভারের সুবাস কিংবা লিকারের রং …
উঁহু, আনমনা কেমন !
কোথাও কি ঘটেছিল ছন্দ পতন?
তা বেশ, সব তো বলা হয় না,
সব কথা বলাও যায় না
আকাশের কালো মেঘ, অশান্ত ধরণীর
বুক চিরে নামে যে ‘সভ্যতার আঁধার’
তাতে সব কথা শোভাও পায় না,
তবে এ একরকম ভালোই হলো
এমন হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন
তারই হঠাৎ পাওয়ায় চমকে দিলে মন
তারপর ‘আজ চলি,’ বলে উঠে চলে গেলে তুমি ।
তোমাকে এগিয়ে দিয়েএসে
দরজা বন্ধ করে সোফায় আলগোছে পিঠ রেখেছি সবে,
আরে, এতো আমারই নোট প্যাড থেকে ছিঁড়ে নেওয়া একটুকরো সাদা কাগজে ,
কী চমৎকার হাতের লেখায়
লিখে রেখে গিয়েছ তুমি,
তোমার না বলা যত বাণী
তোমারই প্রিয় কবির বয়ানে,
“পৃথিবীর গভীর গভীরতম অসুখ এখন
তবুও মানুষ ঋণী পৃথিবীর কাছে।”
ঝিম ধরে বসে থাকি কিছুক্ষণ
বৃষ্টি বুঝি আরও ঘন হয়ে আসে,
বেল বাজে দরজায়
উঠে যাই, দরজা খুলি
তারপর আবার
সেই গতানুগতিক জীবন।