Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

খ্রিষ্ট উৎসব

তপতী ঘোষ

খ্রিষ্ট ধর্মের সর্ববৃহৎ বাৎসরিক উৎসব হলো পঁচিশে ডিসেম্বর, যা বড়োদিন নামে পরিচিত।এই দিন যীশুখৃষ্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর এই জন্মদিনটি নিয়ে নানান বিতর্ক আছে। প্রাচীন কালে রোমানরা ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কখনো বা ডিসেম্বরের শেষে সূর্যের উপাসনা করতেন, সেই উৎসব ‘হানুক্কা’ নামে পরিচিত। ৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কন্সট্যানটাইনের রাজত্ব কালে তাঁরই নির্দেশে পঁচিশে ডিসেম্বর যীশু খৃষ্টের জন্মদিন পালন করা হয়। সেই থেকে বিশ্বব্যাপী ২৫ ডিসেম্বর যীশুখৃষ্টের জন্মদিন পালন হয়ে আসছে। মতান্তরে অনেকেই মনে করেন প্রভু যীশুর জন্মের অনেক আগেই ২৫ ডিসেম্বরের কাছাকাছি সময় রোমান উৎসব ‘স্যাটারনালিয়া’ প্রচলিত ছিল, সেখান থেকেই আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠা, আলো দিয়ে সাজানো, উপহার বিনিময় এই রীতি গুলি গৃহীত হয়েছে এবং ২৫ ডিসেম্বর দিনটিকে যীশুর জন্মদিন হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ভারতবর্ষে বড়দিনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাদে উৎসবের অন্যদিক গুলো আর শুধু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। খ্রিষ্ট উপাসনা গুলো সারা বিশ্বে একই সময়ে একই ভাবে পালন করা হয়। ভ্যাটিকানে পোপ মহাশয় যে ভাবে ‘মিসা’ করেন পৃথিবীর কোনায় কোনায় শহরে ও গ্রামে খ্রিষ্ট ভক্তরা একই ভাবে ‘মিসা’ করেন। শুধু ভাষা ভিন্ন হয় সুর একই থাকে। খ্রিস্টান ধর্মের মূল কথা হলো ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং যীশুর শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে জীবন যাপন করা। বিশেষ করে অন্যেকে ভালোবাসা, ক্ষমা করা এবং মঙ্গল কামনা করা। খ্রিষ্টান রা যে যে ভাবে পারেন আর্তজনের সেবায় নিজেকে নিয়জিত করেন। প্রতিটি খ্রিষ্ট ভক্ত মনে করেন –“ সেবা কর দুঃখি জনে, সেবা কর আর্তজনে সেই তো তোর খ্রিষ্ট সেবা।“
বড়দিনের আগে প্রতিটি খ্রিষ্ট ভক্ত ঘর বাড়ি পরিষ্কার করে।আলোর মালায় সজ্জিত হয়ে ওঠে চারিদিক।অত্যন্ত দরিদ্ররা ও অন্তত একটি করে মোমবাতি জ্বালান। প্রভু যীশু বলেছেন – মনের আলো জ্বালো,অন্তর থেকে অন্তরে আলো জ্বালো। আলো শুধু বাহ্যিক দৃশ্য সুন্দর করার জন্য নয়।
এই একই সুর ধ্বনিত হলো রবীন্দ্রনাথের কন্ঠে। তিনি গাইলেন-“ জ্বালাও আলো আপন আলো, জয় করো এই তামসীরে।এই আলো পাপের অন্ধকার দূর করে আলোয় নিয়ে আসার প্রতীক।
সেদিন আত্মীয় প্রতিবেশী দের মধ্যে নানা রকম উপহার দেওয়া ও কেক চকোলেট ইত্যাদি দেওয়ার চল আছে। বড়দিন খ্রিষ্টীয় ধর্ম উৎসব হলেও অনেক অখ্রিস্টানরা ও ঐ দিন মহাসমারোহে বড়দিনের উৎসব পালন করে। ঐদিন তারাও আলো জ্বালিয়ে বাড়ি সাজায় কেক কাটে, গীর্জায় গীর্জায় তারা ঘুরে দেখেন এবং সকলের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন। বড়দিন এখন বিশ্বব্যাপী উৎসবে পরিনত হয়েছে যা বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কে এক করেছে।
অশান্ত সামাজিক পরিস্থিতির সময়ে যীশু জন্মগ্রহণ করেছিলেন।সমাজের অত্যাচারিত কদর্য রূপটি তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, প্রতিবাদ করেছিলেন সেজন্য তাঁকে ক্রুশে প্রাণ দিতে হয়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন পৃথিবী শান্ত হোক, শান্তির আলো জ্বলুক ঘরে ঘরে, পথে প্রান্তরে, প্রতিটি মানুষের অন্তরে।


বড়দিন মানে দিনটি বড় নয়, বড়দিন মানে মহান দিন বা গ্রেট ডে। বড়দিন হলো নিঃস্ব হয়েও ফুলের মতো বিশ্ব গড়া।

ইস্টার খ্রিষ্ট ধর্মের আর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। যা যীশুখৃষ্টের পুনরুত্থানের স্মরণে পালন করা হয়।
ইস্টার সানডের চল্লিশ দিন আগে হয় ভস্ম বুধবার। গীর্জায় ফাদার প্রতিটি খ্রিষ্ট ভক্তের কপালে ছাই দিয়ে ক্রস করে দেন এর অর্থ –“ মনে রাখবেন আপনি ধূলিকনা এবং ধূলিকনায় ফিরে যাবেন।“
এই দিনটি উপোস এবং প্রর্থনার মধ্যে দিয়ে শুরু হয়।এটি অনুতাপ করার দিন ভুল স্বীকার করার দিন, এই দিন থেকে শুরু হয় প্রায়শ্চিত্ত কাল। এই চল্লিশ দিন খ্রিষ্টভক্তরা একবেলা খান, ত্যাগস্বীকার ও প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে কাটান। একবেলা উপবাসের ফলে সে অর্থ সঞ্চিত হয় সেটা আর্ত পিড়ীত মানুষের সেবার্থে চার্চে দান করা হয়। প্রভুযীশু আর্ত আবহেলিত মানুষের জন্য তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইস্টারের অনুষ্ঠান শুরু হয় Maundy Thursday বা পূণ্য বৃহস্পতিবার থেকে।
এই দিন যীশু তাঁর বারোজন শিষ্যের পা ধুইয়ে দেন, শিষ্যরা এটা পছন্দ করেননি, কিন্তু যীশু তাদের কথা শোনেন নি। তিনি
নিজে এই কাজ করে বুঝিয়েছিলেন কোন কাজই ছোট নয়।এইদিনই যীশু এই বারোজন শিষ্যের সাথে অন্তিম ভোজন করেন যা “লাস্ট সাপার” নামে পরিচিত।
এখনো পূণ্য বৃহস্পতিবারে ফাদাররা বারোজন শিষ্যর পা ধুইয়ে দেন।
তারপর দিন গুডফ্রাই ডে বা পূণ্য শুক্রবার।
খ্রিষ্টানদের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন্।মানব জাতিকে পাপ থেকে মুক্ত করতে যন্ত্রনাময় মৃত্যুর কাছে তাঁর সমর্পিত হওয়ার দিন ।তিনি ক্রুশ কাঠে আত্মবলিদান দিয়েছিলেন। যন্ত্রণাক্লিস্ট রক্তাত্ব যীশু তখনো পরম পিতার কাছে প্রার্থনা করছেন- পিতা তুমি এদের ক্ষমা কোরো….।
প্রভু যীশু জীবন দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন ক্ষমাই পরম ধর্ম। বিশ্বজুড়ে শোকের আবহাওয়ায় এই দিনটি পালন করা হয়। গুড ফ্রাইডের দিন খ্রিষ্ট ভক্তরা ‘ক্রুশের পথ” অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে প্রভু যীশুর যন্ত্রনা ভোগের কথা স্মরণ করে।
পরেরদিন হোলি স্যাটার ডে বা পূণ্য শনিবার।
এই দিন খ্রিস্টানরা “ নিস্তার জাগরনী উপাসনা” করে। এই দিন প্রভু যীশুর যন্ত্রণাময় মৃত্যুর কথা স্মরণ করা হয়,এদিন আত্মোপলব্ধির দিন। এ দিন সন্ধ্যায় খ্রিষ্ট ভক্তরা একে অপরের হাত থেকে মোমবাতি জ্বালায়। প্রার্থনা করে এবং প্রভুযীশুর পুনরুথ্থানের অপেক্ষায় জেগে থাকে।
তারপরদিন ইস্টার সানডে বা পূণ্য রবিবার।এটি খৃষ্ট ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব।যীশুখৃষ্টের পুনরুত্থান বা নবজন্মকে স্মরণ করা হয়। খ্রিস্টানরা এইদিনে মৃত্যুর বিরুদ্ধে যীশুখৃষ্টের বিজয় উদযাপন করে। খৃষ্ট ধর্মিশ্বাসের মূল ভিত্তি যীশুর ক্রুশে জীবন দান এবং গৌরব দীপ্ত পুনরুজীবন। মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে সত্য ও সুন্দর পথে এগিয়ে যাওয়াই খৃষ্টের পুনরুথ্থান দিবসের মূল বানী।


শান্তিনিকেতনে ও মহাসমারোহে খৃষ্ট উৎসব পালিত হয়। ১৯১০ সালে রবীন্দ্রনাথ আদি উৎসব ছাড়া বিশ্বমানবের আদর্শ জীবনবোধ ও সাধনা নিয়ে প্রথম খৃষ্ট উৎসব শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে যীশু কল্যাণের দূত,সেবা পরায়ণ এবং প্রেমের দীক্ষাগুরু।তাঁর কাছে যীশু ছিলেন আর্ত পীড়িতের মুক্তি দাতা। সম্প্রদায়ের বন্ধন ঘুচিয়ে খৃষ্ট উৎসব শান্তিনিকেতনে হয়ে ওঠে সতন্ত্র উদযাপনের দিন। মোমের আলোয় ও আলপনায় সুসজ্জিত হয়ে ওঠে কাঁচ মন্দির। বড়দিন প্রসঙ্গে রবীন্দ্র নাথ বলেছেন- “ আজ পরিতাপ করার দিন… নিজেকে পরীক্ষা করার দিন।“ ক্রিসমাস ক্যারলসহ শান্তিনিকেতনের প্রথা ও রীতিমেনে উদযাপিত হয় খৃষ্টউৎসব। এখানে উপনিষদের মন্ত্রউচ্চারিত উচ্চারিত হয়,রবীন্দ্রনাথের গান “একদিন যারা মেরেছিল তাঁরে গিয়ে রাজার দোহাই দিয়ে” গাওয়া হয়, বাইবেলের অংশবিশেষ পাঠ করা হয়। খ্রষ্ট উৎসবের উপাসনা শেষ হলে মন্দিরের সামনে শতশত ছাত্রছাত্রী এবং সহস্রাধিক মানুষ মোমবাতী হাতে নিয়ে “ মোর হৃদয়ের গোপন বিজন ঘরে প্রিয়তম হে জাগো জাগো জাগো..” গানটি গাইতে গাইতে ছাতিম তলায় সমবেত হন।
প্রভু যাশুকে হৃদয়ের মধ্যে জাগিয়ে তোলার আবেদনের মধ্যে দিয়েই শেষ হয় শান্তিনিকেতনের খ্রিষ্ট উৎসব।
~~~

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x