Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

জলের মতো আলো

(La luz como el agua)

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

অনুবাদ — শুক্তি রায়

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ

বড়দিনের সময় বাচ্চারা আবার চেয়ে বসল একটা দাঁড়টানা নৌকা। ‘ঠিক আছে’, ওদের বাবা বললেন, ‘আমরা যখন কার্তাখেনায় ফিরে যাব, তখন কিনে দেব’। ন’ বছরের তোতো আর সাত বছরের খোয়েল ঠিক বুঝতে পেরে গিয়েছিল যে বাবা ঠিক কী বলবেন, তাই ওরা সমস্বরে বলে ওঠে, ‘না, আমাদের এখনই চাই ! এখানেই চাই !’

‘দেখো,’ ওদের মা বোঝাবার চেষ্টা করেন, ‘এখানে তো অত জল নেই। শাওয়ারের জলে তো আর তোমরা নৌকা চালাতে পারবে না’।
বাচ্চাদের বাবা মা ঠিকই বলছিলেন। ওদের কার্তাখেনা দে ইন্দিয়াস-এর বাড়িতে একটা বড় উঠোন ছিল। সেই উঠোনের একটা দিকে ছিল একটা ঘাট আর সেই ঘাট নেমে যেত সমুদ্র থেকে ঢুকে আসা একটা খাঁড়ির মধ্যে। সেই ঘাটে একটা নয়, দুটো নৌকা বেঁধে রাখারও কোনো অসুবিধা ছিল না। অন্যদিকে, এইখানে মানে মাদ্রিদে একটা পরিবারকে ঠাসাঠাসি করে থাকতে হয় ৪৭ নম্বর, পাসেও দে লা কাস্তেয়্যানা নামক রাস্তাটার উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটা সস্তার আবাসনের পাঁচ তলার ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাচ্চাদের বাবা মাকে মেনে নিতে হল ওদের দাবি। বাচ্চাদের যে ওঁরা কথা দিয়েছিলেন যদি ওদের পরীক্ষায় ভালো ফল হয়, তবে ওদের একটা পুরো দস্তুর দাঁড়টানা নৌকা কিনে দেওয়া হবে। তাতে সেক্সট্যান্ট আর কম্পাস দুইই থাকবে যেমন কথা ছিল। ওরা পরীক্ষায় খুবই ভালো করেছে। কাজেই বাবা মায়েরও তাদের কথা রাখা ছাড়া কোনো গত্যন্তর রইল না। মাকে কোনো কিছু না জানিয়ে ওদের বাবাই কিনে আনলেন জিনিসটা কারণ ধার করে বাচ্চাদের খেলনা কেনার ব্যাপারে মায়ের খুবই আপত্তি ছিল। নৌকাটা অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি আর তার গায়ে টানা সোনালি রঙের রেখা, যেটা দিয়ে বোঝা যাবে যে নৌকার চারপাশের জল কতটা গভীর।

‘নৌকাটা গ্যারাজে’, দুপুরের খাওয়া খেতে খেতে বাবা জানালেন, ‘কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে ওটাকে কীভাবে আমাদের ফ্ল্যাট পর্যন্ত নিয়ে আসা যাবে, তাই নিয়ে। ওটাকে পাঁচ তলা পর্যন্ত নিয়ে আসার মতো চওড়া কোনো সিঁড়ি নেই, লিফটেও আঁটবে না ওটা আর আমাদের গ্যারেজে জায়গাও খুবই কম’। বাচ্চাদের আনন্দ কিন্তু বাঁধ মানল না। শনিবার ওরা ডেকে আনল ওদের স্কুলের বন্ধুদের। ওরা সবাই মিলে নৌকাটাকে টানতে টানতে নিয়ে এল ওই ওদের ফ্ল্যাটের ঠিক লাগোয়া কাজের লোকের থাকার ঘরটা পর্যন্ত। ‘বাহ্‌ ! অভিনন্দন ! কিন্তু এর পর ?’ ওদের বাবা জিজ্ঞেস করলেন ওদের। ‘এর পর ? এর পর আর কী ? কিচ্ছু না’, ওরা বলল, ‘আমরা এটাই চেয়েছিলাম যে আমাদের আবাসনে একটা নৌকা থাকবে। সেটা হয়ে গেল। ব্যস !’

ওই বুধবার সব বুধবারের মতোই বাচ্চাদের বাবা আর মা গেছেন সিনেমা দেখতে আর বাচ্চারা হয়ে উঠেছে বাড়ির মালিক আর সংসারের কর্তা। ওরা ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে খেলতে খেলতে একটা জ্বলন্ত বাল্‌ব ভেঙে ফেলল। ভাঙা বাল্‌বের ভিতর থেকে যেন জলের মতো বেরিয়ে এল সোনালি রঙের আলোর ফোয়ারা। ওরা ওই আলোটার মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল যতক্ষণ না ওদের পা দুটো প্রায় তিন ফুট পর্যন্ত ডুবে যায় আলোর মধ্যে। তারপর ওরা আলোর সুইচ বন্ধ করে ওদের দাঁড়টানা নৌকাটাকে বের করে আনল আর ওটায় চেপে বাড়ির মধ্যেকার দ্বীপগুলোকে আবিষ্কার করতে বেরিয়ে পড়ল।

ওদের এই অত্যাশ্চর্য অভিযান আসলে একটা সেমিনারে আমারই হালকা মেজাজে বলা একটা কথার ফলশ্রুতি। আমি বাড়িতে ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র নিয়ে কথা বলছিলাম ওই সেমিনারে। তোতো আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘সুইচ টিপলেই কেন আলো বন্ধ হয়ে যায় ?’ ওর প্রশ্নটা নিয়ে তলিয়ে ভাবার মতো সাহস আমার ছিল না। তাই উত্তর দিয়েছিলাম, ‘আলোও তো জলের মতোই। কল খুললে জল পড়ে আর কল বন্ধ করে থেমে যায় জল পড়া’।

এইভাবেই প্রতি বুধবার ফাঁকা বাড়িতে চলতে থাকল ওই বাচ্চাদুটোর নৌকা অভিযান। ওরা নিজেদের চেষ্টাতেই শিখে ফেলল সেক্সট্যান্ট আর কম্পাসের ব্যবহার। ওদের বাবা মা সিনেমা দেখে ফিরে এসে দেখতেন যে তাঁদের ছেলেরা শুকনো মাটিতে নিষ্পাপ মুখে ঘুমিয়ে আছে এক জোড়া দেবদূতের মতো। কয়েক মাস পর ওরা হাজির হল ডাইভিংয়ের সাজ সরঞ্জামের দাবি নিয়ে। ওদের এবার ডাইভিং স্যুট চাই, চাই ডাইভিং মাস্ক, পায়ে পরার ফিন, পিঠে নেওয়ার অক্সিজেন ট্যাংক আর কম্প্রেসড এয়ার রাইফেল !

‘একদম না !’ ওদের বাবা এক কথায় নাকচ করে দিলেন ওদের দাবি, ‘যথেষ্ট হয়েছে ! অত বড় একটা নৌকা কিনে তোমরা সেটা ফেলে রেখেছ কাজের লোকের ঘরে আর এখন আবার ডাইভিংয়ের জিনিসপত্র চাইছ!’ ‘আচ্ছা বাবা, আমরা যদি আমাদের ফার্স্ট সেমেস্টারে গোল্ড গার্ডেনিয়া পুরস্কারটা পাই ?’ খোয়েল জিজ্ঞেস করে। ‘না,’ মা সঙ্গে সঙ্গে বলেন, ‘হবে না !’

ওদের বাবা বিরত করেন ওদের মাকে। ‘দেখো, এমনিতেই ওদের পড়াশোনার চেয়ে খেলার দিকে বেশি মন। আর ওই প্রাইজটা যেটা অত সহজ নয়। ওরা পারবে না শেষমেশ। তবু যদি ওই লোভ দেখালে একটু পড়াশোনা করে’, উনি বলেন। ‘ওরা কিন্তু খুব সেয়ানা !’ ওদের মা বলেন, ‘এমনি সময় ওদের পড়াশোনায় মন নেই কিন্তু ভালো রেজাল্ট করে যদি কিছু আদায় করা যায় সে ব্যাপারে ওটা সাংঘাতিক চৌখস, দেখতে পাবে। এই ভাবে কোনো দিন দেখো ওরা ওদের টিচারের চেয়ারও দখল করে নিতে পারে’।

শেষ পর্যন্ত ওদের বাবা ওদের হ্যাঁ বা না কিছুই বললেন না কিন্তু সময় এলে দেখা গেল যে যতই অবিশ্বাস্য লাগুক, তোতো আর খোয়েল দুজনেই ওদের স্কুলের সেরা ফলাফলের পুরস্কার জিতে নিয়েছে। সেই বিকেলেই চাইবার আগেই ওরা নিজেদের ঘরে, নিজেদের বিছানার উপর পেয়ে গেল ডাইভিংয়ের যাবতীয় সরঞ্জাম। পরের বুধবার যখন ওদের বাবা মা ‘লাস্ট তাঙ্গো ইন প্যারিস’ দেখতে গেলেন, ওরা ওদের ঘরটা প্রায় পুরোটাই ভরে ফেলল আলো দিয়ে আর তার মধ্যে নেমে পড়ল ডাইভিংয়ের পোশাক পরে। ঘরের আসবাবপত্র আর বিছানার তলা দিয়ে ওরা সাঁতার কাটতে লাগল এক্কেবারে হাঙরের মতো স্বচ্ছন্দে আর খুঁজে নিয়ে আসতে পারল সেই সমস্ত জিনিসপত্র যেগুলো বহু দিন আগে হারিয়ে গিয়েছিল।

বার্ষিক পরীক্ষায় ওই দুই ভাই নির্বাচিত হল স্কুলের সেরা ছাত্র হিসেবে এবং লাভ করল পুরস্কার আর সার্টিফিকেট। এবার কিন্তু ওরা কোনো কিছুই চাইল না। ওদের বাবা মা ওদের কাছে জানতে চাইলেন যে ওরা কী পেলে খুশি হবে ? তার উত্তরে ওরা জানাল যে ওরা ওদের বন্ধুদের বাড়িতে ডেকে একটা পার্টি দিতে চায়।

ওরা যে সময় বাড়িতে ছিল না ওদের বাবা খুশিয়াল হয়ে ওদের মাকে বললেন, ‘ছেলেরা বড় হচ্ছে। ওদের বুদ্ধিও পাকছে এবার! ’তাই যেন হয়!’ মা হাসতে হাসতে উত্তর দেন।

পরের বুধবার যখন ওদের বাবা মা ‘দ্য ব্যাট্‌ল অফ অ্যালজিয়ার্স’ সিনেমাটা দেখতে গেলেন, সেই সময় হঠাৎ করে পাসেও দে লা কাস্তেয়্যানা দিয়ে হাঁটতে থাকা পথচলতি মানুষের চোখে পড়ল গাছেদের মধ্যে প্রায় লুকিয়ে থাকা একটা পুরোনো ফ্ল্যাটবাড়ির পাঁচ তলা থেকে যেন ঝাঁপিয়ে নেমে আসছে এক আলোর ঝর্ণা। সেই আলো ওই ফ্ল্যাটের ব্যালকনি ছাপিয়ে নেমে আসছে রাস্তায় আর রাস্তার উপর দিয়ে গুয়াদাররামার দিকে বয়ে চলেছে তীব্র স্রোতে।

পরিস্থিতি দেখে লোকে খবর দিল দমকল বাহিনীকে। দমকলের লোকেরা পাঁচ তলার ওই ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে দেখল এক অদ্ভুত দৃশ্য। গোটা ফ্ল্যাটটা মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত ভরে আছে আলোয় আর সেই আলোর মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে চিতাবাঘের মতো ছাপ দেওয়া সোফা, বার কাউন্টারের যাবতীয় বোতল, ম্যানিলা শাল দিয়ে ঢাকা গ্র্যান্ড পিয়ানো। শালটা ওই আলোর ধারার মধ্যে পতপত করছে ডুবে যাওয়ার আগে। গৃহস্থালির জিনিসগুলোর যেন পাখনা গজিয়েছে আর তারা রান্নাঘরের জানালা দিয়ে উড়ান দিয়েছে আলোয় ধোয়া রাতের আকাশে। সব মিলিয়ে যেন এক কবিতার মতো দৃশ্য। বাচ্চাদের মায়ের অ্যাকোয়ারিয়াম থেকে বেরিয়ে এসেছে রং বেরঙের মাছেরা আর তারা উচ্ছ্বসিত হয়ে সাঁতার কেটে চলেছে গাঢ় আলোর মধ্যে। তারাই যেন ওই ঘরের মধ্যে একমাত্র জীবনের স্পন্দন। বাথরুম থেকে ভেসে আসছে, সকলের টুথব্রাশ, মায়ের মুখে মাখার ক্রিম আরো অনেক টুকিটাকি জিনিস। বাবা মায়ের শোওয়ার ঘর থেকে ভেসে আসছে ওদের টেলিভিশন সেটটা যেটাতে মাঝ রাতে বড়দের সিনেমার টাইম ফিক্স করা ছিল। ফ্ল্যাটটার শেষ প্রান্তে ওই আলোর মধ্যে মুখে মাস্ক পরে দাঁড়টাকে চেপে ধরে নৌকা চালাচ্ছিল তোতো। ওর পিঠের সিলিন্ডারটায় যেন খুব বেশি অক্সিজেন আর নেই। পাগলের মতো একটা লাইটহাউস খুঁজছিল সে। নৌকার ঠিক সামনেটায় সেক্সট্যান্ট হাতে ধ্রুবতারার অবস্থান খুঁজছিল খোয়েল। গোটা বাড়ি জুড়ে এখানে ওখানে সর্বত্র ভাসছিল সাঁইত্রিশটা স্কুলের বাচ্চা। তারা কেউ জেরেনিয়াম ফুলের টবে পেচ্ছাপ করছিল, কেউ স্কুলের প্রার্থনাসঙ্গীতের প্যারডি গাইছিল হেডমাস্টারমশাইকে নিয়ে ফক্কুড়ি করে, কেউ বা ওদের বাবার ব্র্যান্ডির বোতল খুলে গলায় ঢেলে পরখ করছিল তার স্বাদ। ওরা সবাই মিলে এত আলো জ্বালিয়েছিল যে ওই পুরোনো এবং সস্তার আবাসনের পাঁচ তলার ফ্ল্যাটটা তাতে ভেসে গিয়েছিল আর তার মধ্যে ডুবে গিয়েছিল সেন্ট জুলিয়ান স্কুলের প্রাথমিক বিভাগের দু দুটো ক্লাসের মোট সাঁইত্রিশটা ছেলে। ঘটনাটা ঘটেছিল স্পেনের মাদ্রিদ শহরের ৪৭ নম্বর পাসেও দে লা কাস্তেয়্যানাতে, যে শহরে না আছে কোনো নদী না আছে সমুদ্র; শহরের তীব্র গরম এবং হিমেল শীতে অভ্যস্ত মানুষজন সমুদ্রযাত্রা সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না।

Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Nilay Baran Som
Nilay Baran Som
10 months ago

গ্যাব্রিয়েল, জাদু বাস্তবতা ধারার লেখক। আমার মতো সাধারণ পাঠকের পাঠ অভিজ্ঞতা বোঝা না বোঝার মাঝামাঝি , তবে দৃশ্যকল্পগুলো ভাবতে ভালো লাগে। অনুবাদ সাবলীল হয়েছে। তবে , বাবা ‘খুশিয়াল হয়ে ‘ একটু চোখে লাগলো। 

কুশল নন্দী
কুশল নন্দী
10 months ago

টিপিক্যাল মার্কেজ, কল্পনা আর বাস্তবের হাত ধরাধরি করে চলা। সাবলীল অনুবাদ – ভালো লাগলো

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x