Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

দেবু মুর্মু : এক বিস্ময়কর শিল্পী

শুভময় রায়

সেবাপল্লী, শান্তিনিকেতন, বীরভূম

দেবু মুর্মু তাঁর নিজের বাড়ির উঠোনের খাটিয়ায় বসে বলেন, ‘আমাদের গ্রামের উত্তরের মাঠে আমরা গুপি কড়া[1]র দল গাই-মেরম[2] চরাতে যেতাম। ওই মাঠের কোণে ছিল বিশাল ঝাঁকড়া মাথার এক তেঁতুল গাছ। গাছটা ছিল খুব পুরনো দিনের। আমরা বলতাম, বোঙ্গা দারে[3]। তখন আমার বয়স অনেক কম ছিল, কথায় কথায় তীর ছুঁড়তাম।  নিশেনও ছিল খুব। একদিন ওই মাঠে একলা গরু-ছাগল নিয়ে গিয়ে দেখি তেঁতুলের ঝোপের আঁধারে দুটো পেঁচা। ওরা জুড়িপাড়ি[4] ছিল। আমার খুব লোভ হল। তীর ছুঁড়ে দিলাম। জোড়ের মদ্দটার বুকে লাগল। নিচে পড়ে  গেল। আর মেয়ে পাখিটা ভয় পেয়ে উড়ল বটে কিন্তু দূরে গেল না। আমি বোঙ্গা দারের শিকড়ের উপর থেকে মরা পাখিটা তুলতে গিয়ে তুলতে পারলাম না। মনটায় ধাধোস লেগে গেল। সেদিন গাই-মেরম চরানো হল না। অনেকক্ষণ বোঙ্গা দারের নিচে চুপচাপ বসে থাকলাম। ঘরে এসে বাপকে বললাম, আমাকে কামারশাল থেকে একটা ত্রিশূল এনে দে। সেই থেকে আমি আর তীর ধরি না গো। ১৩৮৪, ৭ই জ্যৈষ্ঠ শনিবার দিন থেকে আমার জীবনটা বদলে গেল’।

দেবু মুর্মু একজন সাধক এবং মরমী শিল্পী। কবিও। বছর ৬৩র দেবু মুর্মুর প্রথম সাঁওতালি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে ক’বছর আগে-“বীরবাহা চাম্পা”। বাংলায় যার অর্থ ‘অরণ্যের দেবী’। এই বছর তাঁর আরও একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হতে চলেছে – “অক্ত সেটের কান” (সময় ঘনিয়ে এসেছে)। সাঁওতালি ছাড়াও দেবু বাংলা ভাষাতেও কবিতা লেখেন আর লেখেন নাটক, যাত্রাপালা। তাঁর লেখা যাত্রাপালার অভিনয় হয়েছে ঝাড়খণ্ড, বর্ধমান, বীরভূমের বিভিন্ন উৎসবে, অনুষ্ঠানে। তাঁর পালাগানের নট-নটীদের তিনি তৈরি করতেন নিজেই। মঙ্গলডিহি, কুড়মিঠা গাঁয়ের শিল্পীরা অভিনয় করতেন তাঁর সামাজিক পালাগানে।

দেবু মুর্মুর জন্ম শান্তিনিকেতনের অদূরে কোপাই পেরিয়ে সরপুকুরডাঙা গ্রামে, ১৯৬২ সালের ৫ই জুন। দেবু মুর্মুর বাড়িতে কে কে থাকেন এ প্রশ্নের উত্তরে দেবু অকপটে বলে যান,‘বাড়িতে মা,দিদি, দিদির মেয়েরা, বোন, বৌদি, দুটো কুকুর আর কয়েকটা বেড়াল আর গাছ ভরতি পাখপাখালি থাকি গো’। বাবা ফোগড়া মুর্মু আর ছোটবোনের স্মৃতি আজও অমলিন দেবুর মনে। “বাংলা ১৩৯৫ সালের সরস্বতী পুজোর দিন বাপ মারা গেল, ছোটবোনটা মারা গেল বজ্রাঘাতে জমিতে মেরম চরাতে গিয়ে”। দেবুর মা শ্রীমতী মুর্মুর বয়স একশো পেরিয়েছে, ছেলের শিল্পকাজে পরামর্শদাত্রী, নাটক রচনায় সহযোগী।

দেবু বলে চলেন, সরপুকুরডাঙা গ্রামের ইতিহাস। কোপাই নদী পারের ছোট্ট গ্রাম মূলত কৃষিভিত্তিক। দেবুর ছোটবেলায় গ্রামের বাইরের দিকে দিগন্তরেখা পর্যন্ত ছিল ফসলের মাঠ, মাঠ পেরিয়ে উঁচু-নিচু ডাঙা জমি তারপর এঁকে বেঁকে বয়ে চলেছে কোপাই। তখনও নদীর উপর কোন ব্রিজ তৈরি হয়নি। বাঁশপুকুর গ্রামের রতন মিদ্দ্যার খেয়ায় নদী পেরিয়ে গোয়ালপাড়া তনয়েন্দ্র প্রাথমিক স্কুলে যেতেন দেবু। সেইসব দিন মনে পড়ে। মৃতপ্রায় কোপাই নদীর এখনকার দুর্দশা দেখে মন ভার হয়ে আসে। গোয়ালপাড়া স্কুলের পড়া শেষ করে ১৯৭৪ সালে ক্লাস ফাইভে দেবু ভর্তি হন বাঁধনবগ্রাম গান্ধী বিদ্যাপীঠে। সময়টা নকশাল পর্বের। ১৯৭৬ সালে স্কুলে আগুন লাগাল কারা যেন! আবছা আবছা সব মনে আছে। বাঁধনবগ্রাম স্কুলেই ক্লাস সেভেনের বার্ষিক পরীক্ষার শংসাপত্রে লাল কালিতে লেখা “অনুত্তীর্ণ” শব্দটি দেবুর জীবনের চাকা অন্যপথে গড়িয়ে দেয়। প্রথম প্রথম শব্দটি তাঁকে কষ্ট দিলেও দেবু বেশিদিন পর্যন্ত সেই লাল কালির ভার বহন করে বেড়ালেন না। সাধক দেবু বলে ওঠেন, “সেই স্কুল ছাড়লাম বটে কিন্তু মনে মনে জানলাম, আমি ‘বিশেষ’ তাইতো ঈশ্বর আমায় লাল কালিতে দাগিয়ে দিয়েছেন”। এই সময় থেকেই দেবুর মনের মধ্যে দুটি টান প্রবল হয়ে দেখা দেয়। একটি তাঁর আধ্যাত্মিক জগত, অপরটি তাঁর অপরূপ শিল্পীসত্ত্বা।

যে তেঁতুল গাছের ডালে পাখী শিকার করেছিলেন সেই গাছের শেকড় দিয়ে সবার প্রথম বানিয়েছিলেন মেয়েদের হাতের বালা। বাদামী, ধূসর রঙা শেকড়ের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে মিলিয়ে সবুজ কচি শেকড়ের চলনে তৈরি হল বোঙ্গা কুড়ির হাতের বালা। দেবুর মতে এ দৈবনির্দিষ্ট। কিশোর শিল্পীর সেই কাজ মন কেড়েছিল গ্রামের মেয়েদের। নিজের লেখা ও সুর করা গানে দেবু বলেন –

“সোনা রূপা দ গঞ চিকা আগ তোয়াদারে

সিরম সাকম গে চ সোনা বাড়াক…”

(একটি মেয়ে তার মাকে বলছে, মাগো! সোনা-রূপোর গয়না চাই না। এই ঘাসের গয়নাই আমার কাছে সোনার গয়নার চেয়েও দামি)

ধীরে ধীরে দেবুর তৈরি গয়নার কদর বাড়ে। বাড়ে চাহিদাও। এরপর দেবু খুঁজতে শুরু করেন অন্য উপাদান। ক্রমে বেনাঘাস, তালপাতা, খেজুর পাতা, শালপাতা দিয়ে তৈরি হয় অপরূপ সব গয়না। সেসব গয়নার গড়ন, আদল, রঙ সবই নতুন রকম বা হয়ত খুব পুরাতন। সেই যখন দেবুদের পূর্বপুরুষেরা থাকতেন শ্বাপদসংকুল অরণ্যময় পাহাড়ি গ্রামে। হয়ত সে গ্রামের মেয়েরা যেসব গয়না পরে রাতের বেলা চেতান কুলহিতে নাচতে যেতেন সেইসব গয়নার আদল, গড়ন দেবু জানতে পেরেছেন সে কোন এক মন্ত্রবলে কিংবা পুরনো বুড়োবুড়িদের গান শুনে। ধীরে ধীরে দেবু বুনতে শুরু করেন বীজের মালা,কানের দুল, নাকের ফুল, খোঁপার গয়না, মাথার  চূড়া। চন্দন বীজ, গড়গণ্ডা, পদ্মবীজ, বাঘনখ, বাঘিন, পানিফল। শুধু মালাই গাঁথেন না দেবু, সে বীজের মালা কারও হাতে তুলে দিতে দিতে বলতে থাকেন সে বীজের ঔষধি গুণাগুণ। এ যেন তাঁর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত সেই চিরায়ত জ্ঞান, যা একদিন সাঁওতাল মানুষের মুখে শোনামাত্র লুফে নিয়েছিলেন খ্রিস্টান মিশনারিরা। দেবু বলেন, “আমাদের হাড়াম বুডহিদের[5] কাছে শোনার রান[6] গো, এর গুণ অনেক”।

দেবু মুর্মুর শিল্পকাজের মধ্যে যে সৃষ্টিগুলি তাঁকে বিশেষ করে তোলে তা হল শালপাতা দিয়ে গড়া কলসি, বেনা ঘাসের খড়গ, টোপর, হাঁসুলি ইত্যাদি। তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত পাতার কলসির খ্যাতি রাজ্যজোড়া। এ কলসির জাদুতে মজেছেন প্রাক্তন রাজ্যপাল শ্রদ্ধেয় গোপালকৃষ্ণ গান্ধী থেকে, রাজ্যের প্রাক্তন ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সহ রাজ্য হস্তশিল্প মেলার সঙ্গে যুক্ত সরকারি আমলা থেকে কর্মী সকলেই। প্রতিবছর শহর কলকাতার বুকে অগণিত মানুষ সবিস্ময়ে দেখেন বীরভূমের দেবু মুর্মুকে। শালপাতার কলসির গায়ে তালপাতা কেটে কেটে বসিয়ে রূপ দিয়েছেন সাঁওতালি নাচের, গ্রামজীবনের। সে কলসি দূর থেকে দেখলে মাটির তৈরি বলে ভ্রম হতে পারে।

দেবু তাঁর শিল্পের পসরা নিয়ে কখনও ভিন রাজ্যে, কখনও রাজধানী দিল্লি আবার কখনও আমাদের রাজ্যের নানান প্রান্তে ছুটে বেড়ান। ১৯৯৯ সালে ন্যাশনাল মেরিট পেয়েছেন কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে, ১৯৯৪-৯৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজ্য পুরস্কার, ২০০৬ সালে পেয়েছেন “পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু স্মৃতি পুরস্কার”, বিশ্বভারতীর শিল্পসদন থেকে পেয়েছেন “শিল্পী সংবর্ধনা”। ঘোষালডাঙা আদিবাসী সেবাসংঘ থেকে পেয়েছেন “বাহা পুরস্কার” – এইরকমই কোনও এক সভায় একবার মহাশ্বেতা দেবী তাঁকে “প্রকৃত শিল্পী” বলে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সেকথা স্মরণ করে শিল্পীর গর্বিত মুখে প্রত্যয় জেগে ওঠে।

দেবু মুর্মুর জীবন জুড়ে শিল্পের চালচিত্র আঁকা হয়ে আছে। সেই কোন যুবক বয়সে মনিপুরী নাচের তালিম নেবেন বলে ভর্তি হয়েছিলেন বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনে। তখন ১৯৯০ এর দশক। সেই সময়ে সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন শান্তিদেব ঘোষের। রোজ রোজ সেই কোন সরপুকুর গাঁ থেকে দুপুর রৌদ্রে এক সাঁওতাল যুবা ধুতি-ফতুয়া পরে, খালি পায়ে সাইকেল চালিয়ে নাচের তালিম নিতে আসে এই দেখে শান্তিদেব কৌতূহলী হয়ে পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। সেই শুরু। তারপর আমৃত্যু শান্তিদেব ঘোষের স্নেহ লাভ করেছেন দেবু। শান্তিদেব তাঁকে উৎসাহিত করেছিলেন নিজের সমাজ, নিজের গ্রাম, নিজের মানুষদের ইতিহাস বিষয়ে সচেতন হতে, ইতিহাস খুঁজতে। সেই খুঁজে চলার ধারাবাহিকতা আজও অক্ষুণ্ণ রেখেছেন শিল্পী।

সারা পৃথিবীর বদলের খোঁজ রাখেন দেবু মুর্মু তাঁর সরপুকুরডাঙার বাড়ির নিভৃত ছায়ায় বসে। চাষের কাজ, শিল্পকাজের ফাঁকে ফাঁকে রেডিও শোনেন, টেলিভিশনেও চোখ রাখেন। আর একটু একটু করে নিজের বাড়ির দেওয়াল জুড়ে ফুটিয়ে তোলেন ফ্রেস্কো, ম্যুরাল। তাতে সাঁওতাল বিদ্রোহের ছবি। তাঁর শিল্পের উত্তরসূরি হিসাবে তৈরি করছেন বনের পুকুর ডাঙার জনৈক সাঁওতাল যুবককে। শুকনো ঝরে পড়া পাতা, গাছের শেকড়, নানারকম বীজ, গাছের বাকল দিয়ে তৈরি শিল্পের ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে সাধক দেবু মুর্মু স্মিত হেসে বুঝিয়ে দেন তাঁর কোনও ভবিষ্যৎ ভাবনা বা পরিকল্পনা নেই। বহমান নদীর মত তাঁর শিল্প, যা বয়ে চলে খুব গভীরে। শহর যন্ত্রনায় নদীর মৃত্যু হয় ঠিকই কিন্তু তাঁর মানস বহমানতা আটকায় এত সাধ্য মানুষের নেই। প্রকৃতির সন্তান শিল্পী দেবু মুর্মুও ঠিক সেইরকম নদীর নিয়মেই যেন বয়ে চলেন।

_____

[1] গুপি কড়া – রাখাল বালক

[2] গাই-মেরম – গরু-ছাগল

[3] বোঙ্গা দারে – অলৌকিক গাছ

[4] জুড়িপাড়ি – যুগল/দম্পতি

[5] হাড়াম বুডহি – বুড়োবুড়ি

[6] রান – ওষুধ

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x