প্রসূন আচার্য
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
(এক)
ফ্ল্যাটের বেল বাজাতে একজন এসে দরজা খুলে দিল। ভিতরে ঢুকে বসলাম।
তৎক্ষণাৎ বৃদ্ধ ভদ্রলোক ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, বসো। একলা ভালো লাগছে না। একটু গল্প করি। চা খাবে তো? বললাম, হ্যাঁ।
নিজেই বারান্দার একটি টেবিলের উপর রাখা হিটারে জল গরম করতে দিলেন। চা বানালেন নিজের হাতে। ওই হিটারেই পাউরুটি সেঁকে দিলেন।
সন্ধ্যা হয়েছে। খিদে পেয়েছে। চা পাউরুটি দিয়ে সামনে সাধারণ একটা চেয়ারে বসে বললেন, রাজনীতি কি বুঝছ? অবশ্য তোমার এই বয়েসে কি বা বুঝবে ?
সামনে বসা ভদ্রলোক নব্বই পেরিয়েছেন। আমি তেইশ। উনি পাঁচ বছর বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। আঠেরো বছরের মত মন্ত্রী। তিন বছর সাংসদ। গান্ধীবাদী নেতা নামে দেশ জুড়ে খ্যাত। তাঁর নামে এক সময় সিপিএম কত কিছুই না বলেছে। তিনি নাকি স্টিফেন হাউস কিনেছিলেন। কিন্তু নব্বইতেও অনেক দিনই নিজে ভাত ফুটিয়ে খান। কথায় কথায় সেটাও জানিয়ে দিলেন। আমার সাংবাদিকতার বয়স তখন এক বছর মাত্র!
আজও ভাবি, এই সাঁইত্রিশ বছর সাংবাদিকতার পরে। একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কি ভাবে ওই রকম অতি সাধারণ মানুষের মত জীবন কাটাতে পারেন।
বৃদ্ধ ভদ্রলোকের নাম প্রফুল্ল সেন। বিধান রায়ের মন্ত্রিসভায় দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন। বিধান রায়ের পরে ৬২-৬৯ বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।
কোনো একটা সাক্ষাৎকার। রাজনৈতিক লেখার। বিষয়টি আজ আর মনে নেই। কিন্তু বিস্ময়টা আজও রয়ে গিয়েছে।
(দুই)
খালিস্থান আন্দোলনের উত্তাল দিনে তিনি ছিলেন পাঞ্জাবের গভর্নর। ফিরে এসে কলকাতায় আবার জমিয়ে প্র্যাকটিস করছেন। নকশাল নিধন, সিপিএম আমলের অত্যাচারের কাহিনী ছোটবেলা থেকে শুনে তাঁর প্রতি আমার একটা নেতিবাচক মনোভাব ছিল। কিন্তু রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পরে তাঁর অস্থিকলস গঙ্গাসাগর বিসর্জনের জন্য অফিস থেকে যখন নির্দেশ এলো ওঁর সঙ্গে যেতে হবে, কিছু করার ছিল না।
বেলতলার বাড়িতে গিয়ে দেখলাম দেখলাম এক লম্বা সুপুরুষ মানুষ। একই এম্বাসেডর গাড়িতে পাশাপাশি। তখন সাগর যাওয়া এত সহজ ছিল না। ওই গাড়িতে (জানি না কি করে এতজন ধরেছিল) সোমেন মিত্র, প্রদ্যুৎ গুহ, সৌগত রায় এবং আরও একজন। সঙ্গে নিরাপত্তা কর্মী। আসলে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের সঙ্গে সবাই একই গাড়িতে যেতে চান।
আমার তৎকালীন কাগজের সম্পাদক বরুণ সেনগুপ্তের সঙ্গে তাঁর অহি নকুলের সম্পর্ক। জরুরী শাসনের সময় বরুণদাকে তিনি জেলে ভরেছিলেন।
কলকাতা থেকে সাগর আপ ডাউন অস্থি বিসর্জন সব মিলিয়ে প্রায় ছ ঘণ্টার ব্যাপার। দেখলাম মানুষটা হো করে হেসে কথা বলেন। রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে খাবার কেনেন। আর পাঞ্জাব নিয়ে ওখানকার উগ্রপন্থী সমস্যা, পাঞ্জাবের যুবকদের বেকারত্ব নিয়ে আমার অতি উৎসাহী প্রশ্নের জবাব দিয়ে গেলেন গোটা পথ। বললেন, এসব কথা লেখা থাকলে ডকুমেন্ট হলে ভালো হয়। কিন্তু তোমার সম্পাদক তো আমার কোনও খবর করবে না। তাই তোমার মত একটা বাচ্চা রিপোর্টারকে পাঠিয়েছে। তাও জানি।
ফিরে আসার পর ওঁর ওই গাড়িতেই ড্রাইভারকে বললেন অফিসে ছেড়ে আসতে। সত্যি লেট নাইট এডিশনে তিন চার লাইন খবর হয়েছিল।
এর মধ্যে সিদ্ধার্থবাবু বিধানসভা ভোটে জিতে বিরোধী দলনেতা হলেন। আবার কোথায় একটা যেতে হবে। জেলায় কিছু হয়েছে। উনি যাবেন। সেই আমাকে যেতে হবে। কিন্তু বরানগরে আমার বাড়ি থেকে বেলতলায় যেতে এত দেরি হল যে ওঁর গাড়ি বেরিয়ে গিয়েছিল।
অফিসে কি বলব! ভাবছি। ওঁর সচিব বললেন, উনি ফিরলে ফোন করবেন। তাই করলাম। রাতে। সব বলে দিলেন। খবর লিখলাম। পরের দিন ফোন। সেই হাসি। আরে তোমার কাগজে তো দারুন খবর হয়েছে। মায়াকে (স্ত্রী) সকালেই বললাম। কাল পরশু সময় করে বাড়ি এস। ফিসফ্রাই খাওয়াব।
গিয়েছিলাম ফিসফ্রেই খেতে।
(তিন)
তাঁকে এত বার দেখেছি। নানা সময়ে প্রশ্ন করেছি। উনি হয় উত্তর দিয়েছেন। অথবা তাঁর স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বে উপেক্ষা করেছেন। বহু সভা কভার করেছি। আমার রিপোর্টিং এর ফলে টি এন শেষন নির্বাচন কমিশনার থাকার সময় তাঁর এলাকায সাতগাছিয়ায় ভোটের আগে রাস্তা সরানো, উন্নয়নের কাজ বন্ধ হয়েছে। উনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন — ওঁর আপ্ত সহায়ক জয়কেষ্ট ঘোষ সে কথা আমাকে বলেছেন। কিন্তু উনিও একদিন প্রাক্তন হলেন।
জ্যোতি বসু।
অবসর নেওয়ার পরে উনি জেলা সফরে বেরোলেন। মুর্শিদাবাদ। উনি উঠেছেন সার্কিট হাউস। আমি অন্য হোটেলে। পরের দিন দেখা আজকাল এর অরুন্ধতী মুখার্জির সঙ্গে। গেলাম সার্কিট হাউস। লুঙ্গি পরে বসে আছেন।
প্রথমেই দেখা হতে, কি সকালে কিছু খাওয়া হয়েছে? আমরা এসেছি খবরের জন্য। উনি কোথায় যাবেন, কী করবেন ইত্যাদি।
কিন্তু ওঁর এক কথা। সকালে না খেলে দুপুরের খাওয়াটা কিন্তু এখানে। জয়দাকে নির্দেশ। ওই বেলা এগারোটায় মিষ্টি! খেতেই হল। নাকি দারুণ মিষ্টি। এবং না খেলে স্বাদ বুঝবো কি করে? এবং তারপর দুপুরে। আমি গাঁইগুঁই করতেই বললেন, এই তো বয়স। এখন খাবে না তো কখন খাবে? ফলে দুপুরে খেতেই হল। এবং একাধিক মাছ। কই’টা মনে আছে। বললাম , বেরোবেন না? বললেন, আরে আমি তো এখন মুখ্যমন্ত্রী নয়। তেমন কাজ নেই। ওরা (পার্টির লোকেরা) আসবে দেখা করতে। কী সব সংবর্ধনা দেবে। এখানে গঙ্গা কত সরু হয়ে গিয়েছে সেটা দেখেছো!!
আমি দেখছি, এমন জ্যোতি বাবু আগে দেখিনি।
(চার)
আলিমুউদ্দিনের একেবারে গেটের সামনে তাঁর গাড়ি এসে দাঁড়ালো। তিনি নামলেন। সময় বিকেল পাঁচটা হবে। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় নেমেই ধুতিটা একটু ঠিক করে নিলেন। অন্য দিনের থেকে কিএকটু বেশি গম্ভীর? অথবা ঠোঁটে মৃদু হাসি। অন্যদিনের মতই দেখা হতেই জিজ্ঞাসা করলেন, কী? প্রশ্নসূচক সেই জিজ্ঞাসা।
ততক্ষণে তামাম ভারতের সাধারণ মানুষ জেনে গিয়েছে বাংলায় চৌত্রিশ বছরের কমিউনিস্ট শাসনের অবসান হয়েছে। তিনি নিজেও হেরে গিয়েছেন, একদা তাঁরই অধীনে মুখ্যসচিব থাকা মণীশ গুপ্তের কাছে।
সবাই পথ ছেড়ে দিচ্ছে। আইনত না হলেও তাঁর গায়ে তখন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সিলমোহর পড়ে গিয়েছে।
অন্যদিনের মতই সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন। সঙ্গে আমি। এক ধাপ পিছনে আমার বহু দিনের সহকর্মী মহাকরণে তাঁর ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত শ্যামলেন্দু মিত্র। জিজ্ঞাসা করলাম, এই ফল হবে ভেবেছিলেন? একটু থেমে বললেন, এটা হয়। ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটে। আগেও হয়েছে। আপনি নিজে হারবেন, ভেবেছিলেন? একটু থামলেন। সিঁড়ির ল্যান্ডিং’এ। তারপর বললেন, ইতিহাসের চাকা মাঝে মাঝে পিছনের দিকে ঘোরে। মেনে নিতে হয়।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কোনও দিনই জ্যোতি বসু ছিলেন না। এমনকি সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ও নয়। কিন্তু এই রকম পরাজয়ের পরেও তাঁকে যেন দার্শনিক বলে মনে হচ্ছিল।
পরে এক সময় বুদ্ধবাবুর এক মুখ পাকা দাড়িতে দার্শনিকের মত ই লাগতো। সেই বিষয়েই কথা বলে লেখা শেষ করব।
ব্রিগেড সমাবেশ। পুরো মমতা শাসন চলছে। বুদ্ধবাবু মঞ্চের পিছনে ছাউনিতে বসে। এক আধ জন মোবাইলে ছবি তুলছেন। দেখা হতেই সেই এক কথা। ঠোঁট চাপা হাসিতে, কী? কী খবর ?
বললাম, শেষ অব্দি দাড়ি রাখলেন? দার্শনিক সুলভ একটা লুক এসেছে।
দূর। এসব ব্যাখ্যা কে দেয় বলুন তো! আসলে গালে স্কিন এলার্জি হয়েছে। ইরাপশন। দাড়ি কাটতে পারছি না। যা তা অবস্থা। আমার আবার রোজ সেভ করা অভ্যাস। তাই বাধ্য হয়ে দাড়ি রাখলাম। সময়ও বাঁচলো। ওই সময়ে একটু অন্য কাজ করি।
তারপরেই পাল্টা প্রশ্ন ? কেমন লাগছে? মেয়ে তো বলছে, বাজে লাগছে। আমিও হেসে বলি। ভালই। অন্য রকম লুক।