শহীদুল ইসলাম
সিলেট ও নিউইয়র্ক
গ্রামের নাম জগৎসী।
আজ আমি আমার সেই গ্রামের ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়া দুজন মানুষের কথা কথা বলার চেষ্টা করব। প্রথম জন মহেন্দ্রনাথ দে, যাঁর জন্ম আসামের শিলচর শহরে । বাবা দেওয়ান দোল গোবিন্দ দে একজন জমিদার ছিলেন। মহেন্দ্রনাথরা ছিলেন দুই ভাই। বড় ভাই দিগেন্দ্রনাথ দে পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী মহেন্দ্রনাথ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পরীক্ষাতে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। তাঁর নাকি অনেকগুলো ভাষায় ব্যুৎপত্তি ছিল। উচ্চ শিক্ষা লাভের পর তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং কিশোরগঞ্জ সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
মহেন্দ্রনাথের শিক্ষকতায় যোগদান করার মূল উদ্দেশ্য ছিল পিছিয়ে পড়া সমাজকে সচেতন করে তোলা ও জ্ঞানের আলোকে আলোকিত করা। কিন্তু সেই সময় বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন চলছিল, যার সঙ্গে তিনি জড়িয়ে পড়েন এবং এবং সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সমিতিতে যোগদান করেন। যখন তিনি সেই সমিতির একটা সভায় যোগদান করতে চান, স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁকে সে ব্যাপারে অনুমতি না দেওয়াতে তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। পরে কিছুদিন তিনি একটা বেসরকারি কলেজে চাকরি করেন। সেই কলেজে কর্মরত অবস্থায় তিনি স্বদেশী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন ও স্বামী দয়ানন্দের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এমনকি পৈতৃক ভিটেতে দয়ানন্দের আশ্রমও স্থাপন করেন, যেখানে একসময় স্বদেশীদের প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করা হয় । প্রশিক্ষণের কাজ চলা অবস্থায় আশ্রমে একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, যার জন্য তাঁরই এক আত্মীয় তাঁর বিরুদ্ধে এবং আশ্রমের বিরুদ্ধে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের আদালতে মামলা দায়ের করেন। এই মামলার তদন্ত করতে আসা ব্রিটিশ অফিসার মিস্টার গর্ডন আশ্রম বন্ধ করার আদেশ দেন । কিন্তু স্বদেশীরা তাঁর সেই আদেশ অমান্য করেন। মিস্টার গর্ডনকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে তাঁর মাথার টুপি কুকুরের লেজের সঙ্গে বেঁধে দেন এবং তাঁর ঘোড়ার লেজও কেটে দেন।
অপমানিত অফিসার ফিরে যাওয়ার সময় তাঁদের শাসিয়ে যান। বলেন যে এর বদলা নেওয়া হবে। সেই অনুযায়ী ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ আশ্রম আক্রমণের পরিকল্পনা করেন এবং গ্রামবাসীকে দুই বর্গমাইল এলাকার ভেতর থেকে সরে যেতে বলেন। গ্রামবাসীরা সরে গেলে ব্রিটিশরা যুদ্ধের পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে শূন্য গ্রামে প্রবেশ করে। স্বদেশীদের সাথে ব্রিটিশদের যুদ্ধ চলাকালীন মহেন্দ্রনাথ গুলিতে আহত হন। অনেক স্বদেশী মারাও পড়েন। পরে যাঁরা বেঁচে ছিলেন তাঁরা আত্মসমর্পণ করেন। মহেন্দ্রনাথকে আহত অবস্থায় কয়েদ করে সিলেট শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। সিলেটে তার শরীর থেকে গুলি বের করার সময় অপারেশন টেবিলেই তিনি মারা যান।
একটা আক্ষেপের বিষয় হল ওই গ্রামের বর্তমান প্রজন্মের বেশিরভাগ লোক তাঁর নামই জানে না। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি অনেক আগেই বেদখল হয়ে গেছে। যে আশ্রমকে ঘিরে একসময় বিপ্লব ঘটেছিল, তারও এখন কোনো অস্তিত্ব নেই। যে মহান ব্যক্তি তাঁর জীবন দেশের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন, তাকে স্মরণ করার বা তাঁর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো চেষ্টাই কেউ করেননি বা অদূর করবেন বলেও মনে হয় না।
এই গ্রামের সঙ্গে এরকম আরও অনেক কাহিনী জড়িয়ে আছে যা বলে শেষ করা যাবে না। তবে ছোট করে অবশ্য আরেকটা ইতিহাস বলা যায় যা গ্রামের মানুষের জানা নেই। সেটা হল গ্রামের ঈদগা, যেখানে মুসলমানরা ঈদের নামাজ আদায় করেন, সেই ঈদগার জমিটা যিনি দান করেছিলেন তিনি কোন মুসলমান ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি ছিলেন ওই গ্রামেরই আরেক জমিদার গগন দেবরায়। মুসলমানদের ঈদের নামাজ আদায় করার কোন স্থান না থাকায় মোহাম্মদ আসকির নামে আমার এক আত্মীয় সেই জমিদার বাবুর কাছে যান এবং তাঁর কাছে আবদার করে বলেন, ‘আপনার তো অনেক বড় জমিদারি। আপনি যদি দয়া করে আমাদের ঈদগা বানানোর জন্য কিছু জমি দান করেন তাহলে আমাদের খুবই উপকার হয়।’ অবশ্য মোহাম্মদ আসকির এবং গগন দেবের মধ্যে একটা রক্তের সম্পর্ক ছিল। সম্পর্কে গগন বাবুর খুড়তুতো ভাইয়ের ছেলে মোহাম্মদ আসকিরের পূর্বপুরুষরা ছিলেন ধর্মান্তরিত মুসলমান।
সেই অনুযায়ী গগন বাবু ঈদগার জন্য প্রায় বিশ বিঘা মতো জমি দান করেন। হিন্দুর দান করা জমিতে মুসলমানদের উপাসনাস্থল, এই ব্যাপার নিয়ে পরবর্তীতে যাতে কোনো ধরনের সমস্যা না দাঁড়ায় তাই জমির দাম এক টাকা ধার্য করে গগন বাবু ঈদগার নামে ওই জমি লেখাপড়া করে দেন। জনহিতৈষী এবং দয়ালু গগন বাবু গ্রামের বর্তমান হাই স্কুলের জমিও নাকি দান করেছিলেন। এমনকি স্কুলের ছাত্র সংগ্রহের জন্য তিনি নাকি বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোককে উৎসাহিত করতেন। ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানোর জন্য অভিভাবকদের অনুরোধ করতেন।
বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আগের সম্প্রীতি এবং সৌহার্দের এই কথাগুলো বলা প্রাসঙ্গিক মনে করেই এখানে লিখলাম। এখন বাংলাদেশ থেকে আসা যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর বারবার আমাকে সেই সোনালী অতীতে নিয়ে চলে যায়। একটা সময় ছিল যখন মানুষ এখনকার মত ধর্ম নিয়ে এত উন্মাদ ছিল না। কার কী ধর্ম সেটা কারো কাছে বড় পরিচয় ছিল না। কেউ কাউকে এসব জিজ্ঞাসাই করত না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল সে মানুষ এবং সেভাবেই তারা মানবধর্ম পালন করার চেষ্টা করত। হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে যে সম্প্রীতি ছিল সেটা এখন সংকটের মুখে ।
যেভাবে মানুষকে ধর্ম দিয়ে বিভ্রান্ত করে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়েছে সেটা খুবই লজ্জাজনক ও দুর্ভাগ্যজনক। অথচ আমার বাল্যকালে, আমার কৈশোরে, আমার যৌবনে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে এক ভীষণ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ দেখেছি। সামাজিক কর্মকাণ্ডে যেভাবে সবার অংশগ্রহণ ছিল আজ তা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ধর্মীয় উগ্রবাদ সামাজিক পরিবেশকে এত্টাই দূষিত করেছে যে প্রতিবেশীকে প্রতিবেশীর শত্রু বানিয়ে ফেলেছে। একটা পাশবিক ধর্মীয় উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে মানবিকতার কোনো মূল্য নেই। তবুও আমার আশা, যাঁদের বিবেক এখনও জীবিত ও জাগ্রত আছে, তাঁরা এগিয়ে আসবেন এর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য।