প্রতীক ঘোষ
ফ্রান্স
১
ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি ঝরা ২০১২ সালের এক সন্ধ্যেতে আমরা যখন লোয়া নদীর পার ধরে নঁথ শহরে প্রথমবার পৌঁছলাম তখন ক্লান্তিতে দিনের আলো এলিয়ে পড়েছে মেঘের কোলে। আমদের যাত্রার শুরু প্রায় চব্বিশ ঘন্টা আগে সুদূর ময়ুরপঙ্খী রঙিন সাগরঘেরা চিরবসন্তের দ্বীপ মরিশাস থেকে। এমিরেটসে দুবাই হয়ে প্লেন বদলে প্যারিসের শার্ল-দ্য-গল এয়ারপোর্ট। তারপর লটবহর, বাক্সপেঁটরা ভাড়া গাড়ীতে ভরে চার ঘন্টায় পৌঁছানো গেল চারশো কিলোমিটার দূরে ফ্রান্সের পশ্চিম উপকূলবর্তী নঁথ শহরে। আমাদের বড়ো কন্যা এখানে ডাক্তারি পড়বে। ন’দশ বছরের ধাক্কা। তাকে থিতু করে বসানোর জন্যে আসা নঁথে।
আমাদের ছাত্রী-নিবাসোপযোগী ছিমছাম ফ্ল্যাটটি লোয়ার ধারে, নঁথ শহরের মাঝখানে। উত্তর থেকে এর্দ নদী আর পুব থেকে লোয়ার সঙ্গমে রোমান আমলের শহর নঁথ। সেকালের স্মৃতিচিহ্ণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যদিও কালের স্রোতে আর জার্মান বোমায় বেশির ভাগই হারিয়ে গেছে। জুলিয়াস সীজার খৃষ্ট জন্মের ৫৬ বছর আগে গ্যল বা এখনকার ফ্রান্স দখলকালে পৌঁছেছিলেন এখানে। রোমান সভ্যতা ছিল নগরকেন্দ্রিক। পরিকল্পিত, ছকবাঁধা রাস্তাঘাট, সমাবেশস্থল, স্নানঘর, মন্দির। তবে অধিকৃত অঞ্চলের ব্যাপ্তি অনুসারে সুশাসন আর স্থায়ী কর্তৃত্বের জন্য অনেকগুলি কেন্দ্র তৈরি হত। এর ফলে কোন কেন্দ্রদায়িত্বপ্রাপ্ত সামন্তের ল্যাজ মোটা হয়ে বিদ্রোহী হবার সম্ভাবনাও কমে যেত। সীজার গ্রাম-গঞ্জ সংস্কার করে পাঁচটি রোমান কেন্দ্র প্রতিষ্ঠান করেন এদিকে। তারমধ্যে আজও আঞ্চলিক রাজধানী হিসেবে রেইন, ভান আর নঁথ স্বমহিমায় বর্তমান। খৃষ্টধর্মের হাত ধরে নঁথ হয়ে ওঠে একটা ধর্মীয় শিক্ষাস্থান, যার অধিকর্তা হতেন পোপের নিযুক্ত একজন বিশপ। মাঝে একবার হুনদের হানা ছাড়া নঁথ প্রায় ৯০০ বছর মধ্য য়ুরোপের ডামাডোল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। কিন্তু স্যাক্সন আর ফ্র্যাঙ্কদের বর্ধিষ্ণুতার খবর পৌঁছতে লাগল ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেনে। ভাইকিং উপজাতিদের জাহাজ সুদূর স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে চড়াও করতে থাকল পশ্চিমে ইংল্যান্ডের নর্থহাম্ব্রিয়া, ওয়েসেক্স, মেরসিয়ায় আর দক্ষিণে ফ্রাঙ্কিয়ায় যা আজকের জার্মানী আর ফ্রান্স। জলপথে সাম্রাজ্য বিস্তারের বীজ রোপিত হল ইংল্যান্ড, ফ্রান্স আর স্পেনের শাসক মহলে। আর বদলে যেতে থাকল লোয়ার তীরে নঁথের গুরুত্বও।
[মানচিত্র — লেখকের আঁকা।]
আমাদের কলকাতার মত নঁথও নদীবন্দর, তবে সমুদ্র থেকে আরও কাছে – ৫০ কিমি মাত্র। ফ্রান্সের দক্ষিণ পুবের জেরবিয়ে-দ্য-জঙ্ক পাহাড় থেকে নেমে উত্তর-মধ্য ফ্রান্সের জোয়ান-অফ-আর্কের শহর অরলেওনে পশ্চিমে বাঁক নিয়ে ব্লোয়া, তুঢ়, অঁজে, নঁথ হয়ে, গঙ্গা যেমন বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মেশে, লোয়া হাজার কিমি বয়ে গিয়ে পড়ে বে-অফ-বিস্কেতে। অতলান্তিকের কোলে বিস্কে এক দামাল ছেলে। এখনও নাবিকরা বিস্কে উপসাগরে ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকে। কখন মন বিগরে গিয়ে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে আর অতলান্তিক থেকে ঢেউ পর্বতসমান হয়ে এলোপাথাড়ি ছুটে বেড়াবে বিস্কে জুড়ে যেন “বাহিরেতে চায় দেখিতে না পায় কোথায় কারার দ্বার”। উপকূলবর্তী সামুদ্রিক বন্দরগুলিরও রেহাই নেই সেই তাণ্ডব থেকে। এই জন্যেই আদিযুগ থেকে বন্দর হিসেবে নামডাক লোয়ার স্নেহচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা নঁথের । সদাগরী জাহাজ উপকূল বেয়ে না গিয়ে ফ্রান্সের নদী পথে স্পেন থেকে তামা, টিন ইংল্যান্ডে নিয়ে যেত আর ইংল্যান্ড থেকে নিয়ে আসত লোহা, পশম। নঁথের অনতিদূরে উত্তরে শঁতোসো গঞ্জে লোয়া একটু সরু হয়ে যেখানে বাঁক নিচ্ছে, সেইখানে সদাগরী জাহাজ আটকে করের নামে “হফতা” নিত সেখানকার সামন্ত। নদীর দুই পারে গম্বুজে বাঁধা থাকত লোহার শিকল। কর না দিয়ে জাহাজ যেতে গেলেই দুদিক থেকে শিকল ধরে টান। নদীর জলের ভিতর থেকে শিকল উঠে জাহাজ আটকে দিত। তখন কর না দিয়ে যাবে কোথায়! কিন্তু বিস্কেতে ডুবে মরার চেয়ে সে ঢের শ্রেয়। আজও গম্বুজ আছে। গঞ্জ নেই। নিরিবিলি নদীতটে কিছু ছোট নৌকো দোল খাচ্ছে, স্থানীয় দুয়েকজন জেলে ছিপ ফেলে মাছ ধরছে আর ওপারে সবুজ নিঃস্পন্দ বনানী। টিজিভি ট্রেণে দুঘন্টায় মধ্য প্যারিসের মোপারনাস স্টেশন থেকে নঁথে পৌঁছনো যায়। দিনে দু-তিন বার। লন্ডনের গ্যাটউইক থেকে ইজিজেটে মাত্র একঘন্টা। নাঃ! সুপারসনিক গতিতে পৌঁছে যাচ্ছি আধুনিক কালে । ফিরে যাই আদিযুগে।
২
আর পাঁচটি ঔপনিবেশিক শক্তির মত ইংরেজরা যেমন অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের সুসভ্য বানাতে গিয়ে প্রায় নির্বংশ করে ফেলেছিল তেমন ভাবেই রোমানরা ইংল্যান্ডে পৌঁছে এমন অত্যাচার, উৎপীড়ন শুরু করল যে এক কেলটিক উপজাতি ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমের কর্ণওয়েল আর ডেভন থেকে ইংলিশ চ্যানেলের ঠিক উল্টোপারে ফ্রান্সের উত্তর পশ্চিমে আর্মোরিকা অঞ্চলে পালিয়ে এসে থাকতে শুরু করে প্রায় ৩০০ সাল থেকে। ব্রিটেন থেকে আসায় এদের পরিচিতি ব্রতঁ। রোমানো-ব্রিটিশ কি করে জার্মানিক অ্যাংলো-স্যাক্সন হল তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কিন্তু পুব থেকে তাদের আর উত্তর থেকে স্কটিদের জ্বালায় ৮০০ সাল অবধি বাস্তুহারা ব্রতঁদের ঢল এমন নামে ফ্রান্সে যে আর্মোরিকার নামই হয়ে যায় ব্রতাইন বা ইংরেজীতে বৃটানী। ৮৫১ সালে এই ব্রতঁরা নঁথ দখল করে বাড় বাড়াতে থাকায় শুরু হয় ফ্র্যাঙ্কদের সঙ্গে ব্রতঁদের রেশারেশি, যা আধুনিক ফ্রান্সে আজও চলেছে। নঁথে গুছিয়ে বসার দুশো বছর বাদে ডিউক- অফ-নরম্যান্ডি উইলিয়াম-দ্য-কনকারারের নর্ম্যান আর বেলজিয়াম থেকে ফ্ল্যান্ডারদের সঙ্গে ব্রতঁ সৈন্য ইংল্যান্ড জয় করে পরবর্তী প্রায় সত্তর বছরের (১০৬৬-১১৩৫) নর্ম্যান শাসনের অংশীদার হয়। তারপর মধ্য লোয়ার শহর ব্লোয়ার স্টেফেন কুড়ি বছর ইংল্যান্ডে রাজত্ব করার আর আরও দশ বছর অরাজকতার পর নঁথ থেকে ১০০ কিমি দূরে অঁজে শহরের রাজবংশোদ্ভুতরা প্রায় অবিচ্ছিন্ন ভাবে ১১৫৪ থেকে ১৪৮৫ ইংল্যান্ডের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিল।
ঐতিহাসিক যুগ নির্ধারণের সুবিধার্থে ক্রমানুসারে অঁজুভ্যাঁ, প্ল্যান্টাজেনেট, ইয়র্ক আর ল্যাঙ্কাস্টার রাজত্বকাল হিসেবে এই সাড়ে তিনশ বছর বিভক্ত। অঁজের বিশাল দুর্গ আজও অতন্দ্রপ্রহরী ফ্রান্সের সবচেয়ে লম্বা নদী লোয়া আর সবচেয়ে ছোট নদী মেঁন সঙ্গমে। অঁজু রাজাদের পরে ওয়েলসের টুডোর রাজারাও বৃথনিক কেলটিক জাতভাই ব্রতঁদের ফ্রান্স থেকে সমর্থনেই রাজ্যলাভ করে। ইয়র্ক আর ল্যাঙ্কাস্টারের একশ বছরের গোলাপ-যুদ্ধের শেষের দিকে প্রায় কুড়ি বছর নঁথের শেষ স্বাধীন অধিকর্তা দ্বিতীয় ফ্রান্সিস তৃতীয় রিচার্ডের রোষ থেকে বাঁচাতে ন’বছরের হেনরী আর তাঁর কাকা জাসপারকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। টুডোর পরবর্তী স্টুয়ার্ট বংশের পূর্বসূরীও নর্ম্যানদের সঙ্গে আসা এক ব্রতঁ। এই সরাসরি ফরাসী পরম্পরা চলে ১৭১৪ সাল অবধি, যখন জার্মান বংশোদ্ভুত স্যাক্স-কোবার্গ ও গোথা পরিবার রাজাসনে বসেন। এঁরাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বিরূপ জনমত সামলাতে নাম পরিবর্তন করে আজকের উইন্ডসার নাম নেন। কিন্তু মজার কথা হল যে ইংল্যান্ডের রাজা হওয়ার সুবাদে ফরাসী সম্পর্কের জোরে ফরাসী বংশোদ্ভুত ইংরেজ রাজারা ফ্রান্সের সিংহাসনের দাবীদার হয়ে উঠত। শুরু হত যুদ্ধ। মোট ৫৬টি যুদ্ধ হয় দু দেশের মধ্যে। দুটি ছাড়া সব যুদ্ধই ফরাসী মাটিতে। নর্ম্যান্ডি উপকূলে আর লোয়ার আশেপাশে। আবার ফ্রান্সের উত্তর ও দক্ষিণের মাঝের বিভাজনও লোয়া। উমায়াদ খলিফার আরবি সেনাবাহিনী দক্ষিণে তুলুস শহর এবং এগারো বছর পরে ৭৩২ সালে প্যারিস থেকে মাত্র ২০০ কিমি দূরে তুঢ় শহরে পৌঁছেছিল। লোয়া উপত্যকা তাই যেন ফ্রান্সের রাজপুতানা। দুর্গের পর দুর্গ। যদিও বেশীর ভাগ আসলে উচ্চবর্গীয়দের প্রাসাদবাড়ী। প্রায় তিনশোর ওপর নয়নাভিরাম প্রাসাদ। সবচেয়ে বড় আর চমকপ্রদ হল ব্লোয়া শহরের কাছে লিওনার্ডো ভিঞ্চির অনুপ্রাণিত শাতো দ্য শঁবো। শেনোসো, শোমঁ, শেভরনি, অঁবোয়াস, ভিলন্দ্রি – সবই লোয়ার তীরে চিত্তাকর্ষক দুর্গ।
নঁথের দুর্গ দ্বিতীয় ফ্রান্সিসের মেয়ে তখনকার বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী বলে খ্যাত অ্যান-অফ-ব্রতঁর নামে। বাবার মৃত্যুর সময় অ্যানের বয়স মাত্র এগারো। কিন্তু বিশাল রাজত্বের আর রূপের জন্যে তাঁর পাণিগ্রহণে আগ্রহীর অভাব ছিল না। যদিও বাবার ইচ্ছে ছিল অ্যানের বিয়ে হোক তাঁর আশ্রিত ইংল্যান্ডের সম্ভাব্য রাজার ছেলের সঙ্গে। কিন্তু সে গুড়ে বালি ফেলে ফ্রান্সিসের মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রধানমন্ত্রী পিয়ের লঁন্ডে হেনরিকে ইংরেজদের হাতে তুলে দেবার চেষ্টা করেন। হেনরি আর কাকা জেসপার ফ্রান্সের রাজা অষ্টম চার্লসের কাছে কোনোমতে পালিয়ে বাঁচেন এবং তাঁর সহায়ার্থে তৃতীয় রিচার্ডকে যুদ্ধে হারিয়ে ইংল্যান্ডের রাজা হন। তাঁর ছেলে অষ্টম হেনরি পোপের সঙ্গে তাঁর একাধিক বিবাহ ও বিচ্ছেদের বিবাদ নিয়ে রাজাকে চার্চের উপর অগ্রাধিকার দিয়ে ইংল্যান্ডে নিয়ে আসেন আমূল পরিবর্তন । এদিকে অ্যান ফ্রান্সের হাত থেকে ব্রতঁ কে বাঁচানোর চেষ্টায় খাতায় কলমে অস্ট্রিয়ার প্রথম ম্যাক্সিমিলানকে বিয়ে করেন। কিন্তু ফ্রান্সের রাজা অষ্টম চার্লস মানবার পাত্র নন। দুবছর বাদে নিজ-শর্তে অ্যান চার্লসকে বিয়ে করে ফ্রান্সের মহারাণী হন। নিঃসন্তান চার্লস মারা যাবার পর অ্যান আবার ব্রতঁর স্বাধীনতা রক্ষাত্রে চার্লসের তুতো ভাই ফ্রান্সের পরবর্তী রাজা দ্বাদশ লুইকে বিয়ে করে একমেবাদ্বিতীয়ম, যিনি দ্বিতীয় বারের জন্য ফ্রান্সের মহারাণী হন। ব্রতঁর স্বাধীনতা আবার বজায় থাকে। অ্যান নিজের হাতে ব্রতঁর শাসন ভার তুলে নেন। সুশাসনের সঙ্গে কলা কৃষ্টিতে ব্রতঁ সম্বৃদ্ধ হতে থাকে। ১৫১৪ সালে মাত্র ৩৬ বছরের অ্যানের মারা যাবার পর অ্যান আর লুইয়ের বড় মেয়ে তাঁর তুতো ভাই ফ্রান্সের প্রথম ফ্রান্সিসকে বিয়ে করে ফ্রান্স আর ব্রতঁর সম্মিলন ঘটিয়ে আজকের সমন্বিত ফ্রান্সের রূপ দেন। বুদ্ধিমতী, বিচক্ষণা, সৃজনশীলা এবং স্বাধীনচেতা অ্যান আজও ব্রতঁ জাতীয়তাবাদের প্রতীক। তাঁর হৃদপিণ্ড আজও সংরক্ষিত নঁথের ডাচেস-অ্যান যাদুঘরে।
৩
১৪৯২ তে কলম্বাসের আমেরিকার দোড়গোড়ায় পৌঁছোনোর পর নতুন বিশ্বের দরজা ততদিনে খুলে গেছে। যে সময়ে দিল্লিতে মুঘল রাজত্বের সূত্রপাত ঘটান বাবর, প্রথম ফ্রান্সিস ঠিক সেই সময়তেই ১৫২৪ সালে ফ্রান্সের ঊপনিবেশ অন্বেষণ শুরু করেন। স্প্যানিশ, পর্তুগীজ, ওলন্দাজ আর ইংরেজদের সঙ্গে টক্কর দিয়ে ফরাসী জাহাজ হানা দিতে থাকল সারা বিশ্বে উপনিবেশ স্থাপনের জন্য। আরো একশ বছর পরে ত্রয়োদশ লুই এর পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয় আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে সস্তায় মানুষ কিনে, অতলান্তিক পার হয়ে চড়া দামে বেচার ত্রিকোণ বাণিজ্য। লিভারপুল, বৃস্টলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নঁথের বর্ধিষ্ণু বণিকেরা দাদন দিয়ে জাহাজ পাঠাতে শুরু করে। আমেরিকায় নিঊ অরলেন্স, দক্ষিণ আমেরিকায় গায়েনা, ক্যারেবিয়ানে হাইতি, গুয়াডালুপ, মার্টিনিক থেকে ভারত মহাসাগরে মরিশাস, রিয়ুনিয়ানে ক্ষেতে আখের চাষ করাতে ক্রীতদাসের চাহিদা এমনই বাড়ল যে ১৫% মানব “স্টক” নষ্ট হলেও মুনাফার পয়সায় নঁথ আর অন্যান্য বন্দর শহরের জৌলুস বাড়তেই থাকল।
পরের দুশো বছরে সাড়ে পাঁচ লাখ ক্রীতদাস শুধু নঁথ থেকে আয়োজিত ১,৭১৪টি সফরে চালান দেওয়া হয়। ফ্রান্সের বাকি পনেরো লাখ ক্রীতদাস ল্য হাভ, লা রোশেল, বোর্দো, আর বাদবাকি তেরোটি ফরাসী বন্দর ১,৬০৩টি সফরে যোগান দেয়। ১৬৮৫ তে চতুর্দশ লুই কালো চামড়ার মানুষের সঙ্গে মানবিক ভাবে ব্যবহার করার রীতিনীতি জানিয়ে কোড-নোয়া পাশ করেন। অনেকটা কসাইখানায় মানবিক ভাবে জবাই করার জন্য যেমন নিয়ম আছে এখন। হাতের তালুর মাপের এক কপি কোড-নোয়া নঁথের মিউজিয়ামে পড়া যাবে। ফ্রান্সের ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায়কে তার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সঙ্গে আগামী প্রজন্ম যেন জানতে পারে তারজন্য লোয়ার ধারে শঁচিয়ে-নাভালের ঘাটে হাঁটতে হাঁটতে পায়ের নীচে শানে বাঁধানো কাচের ফলকে পড়া যায় প্রতিটি জাহাজের নাম। কবে, কোথা থেকে, কোথায় তারা চালান দিয়েছে মানবসামগ্রী। ঘাটের নীচে খোলা ক্রীতদাসপ্রথার স্মৃতিগার। একদিকে দেওয়ালে জানার জন্য ইতিহাস, অমূর্ত বেদনা অনুভব করার জন্য কবিতা, পাশে ছোট ছোট খুপরি দিয়ে দেখা যায় বহমানা লোয়া আর শোনা যায় নদীর ছলাৎ ছলাৎ ঠিক যেমন হয়ত জাহাজের খোলে লোহার শিকলে বাঁধা ক্রীতদাসরা শুনতে পেত।
১৭৮৯ সালে ষোড়শ লুইএর গিলোটিনে মুণ্ডচ্ছেদ করে রোবোস্পীয়রের নেতৃত্বে ফরাসী বিপ্লব ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে নিয়ে এল স্বাধীনতা, সমতা আর ভ্রাতৃত্বের বাণী। পুঁজিবাদীর পীঠস্থান নঁথ হয়ে উঠল ফরাসী বিপ্লবের সামনের সারির শহর। জঁ-ব্যাপ্টিস্ত-কারিয়ের নেতৃত্বে সপরিবারে প্রায় পনেরো হাজার রাজপারিষদ, চার্চের আধিকারিক, ক্রীতদাস ব্যবসায়ী, উচ্চবংশীয় নারীপুরুষ, আবালবৃদ্ধ নির্বিচারে এমন কি রাজতন্ত্রের প্রতি সহানুভূতির সামান্য সন্দেহে প্রথমে গিলোটিনে তারপর যখন জেলখানা ভরে উঠতে থাকল তখন জোড়ায় জোড়ায় মুখোমুখি বেঁধে লোয়ার জলে ডুবিয়ে মারা হয়। ১৭৯৪ সালে ফ্রান্সে ক্রীতদাস ব্যবসা বন্ধের আইন হল। যদিও ব্যবসা চলতে থাকে এবং নেপোলীয়ন ১৮০২ সালে আইনটি তুলে দিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্রীতদাস ব্যবসা শুরু করতে অনুমতি দিয়েছিলেন, নঁথের চাকচিক্য কমতে থাকল। ১৮৪৮ সালে দ্বিতীয় এবং শেষবারের মত ফ্রান্সে ক্রীতদাস ব্যবসা বন্ধের পর আর তার কুড়ি বছর বাদে সুয়েজের খাল খোলায় ভূমধ্যসাগরের উপকূলস্থ মার্সেই এর উপযোগিতা ও গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নঁথ ঝিমিয়ে পড়তে থাকল।
কিন্তু সামাজিক সচেতনতার যে জোয়ার নঁথে এসে পড়েছিল তার প্রথম অভিব্যক্তি প্রস্ফুটিত হল অ্যানের পর নঁথের দ্বিতীয় বিশ্ববিখ্যাত নাগরিক জুল ভের্ণের কলমের মাধ্যমে। এই শহরে ১৮২৮ সালে জন্ম কাল্পনিক চরিত্র ভারতীয় রাজপুত্তুর ক্যাপ্টেন নেমো এবং তাঁর নটিলাস ডুবোজাহাজের গল্প টোয়েন্টি থাউসেন্ড লীগস আন্ডার দি সীর লেখক জুল ভের্ণের। নঁথের লোয়ার তীরে বসে তিনি কল্পনা করেছেন ফিলিয়াস ফগের আশি দিনে বিশ্বভ্রমণ কিংবা আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বেলুনে করে উড়ে গিয়ে আজব দ্বীপে ক্যাপ্টেন হার্ডিং আর তাঁর সঙ্গীদের অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী। মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের করা এগুলির অনবদ্য অনুবাদ পড়েই কিশোরকাল থেকে আমি চিরতরে সুদূরের পিয়াসী। নঁথে সর্বত্র জুল ভের্ণের ছায়া। রাস্তার নাম, দোকানপাট, মিউজিয়াম তো আছেই। তার সঙ্গে আছে বৈজ্ঞানিক, সৃজনশীল, খোলা মনের কাজকর্ম, ভাবনাচিন্তা। লোয়া নদী নঁথের ঠিক মাঝে ইল-দ্য-নঁথের ব-দ্বীপের দুপাশ দিয়ে বয়ে গেছে। ডাচেস অ্যান ব্রীজ দিয়ে ইল-দ্য-নঁথে পৌঁছলে ডান দিকে লে-মাশিন-দ্য-লিল – যন্ত্রদ্বীপ। সেখানে চল্লিশ ফুট উঁচু যান্ত্রিক হাতির পিঠে চেপে জল ছিটোতে ছিটোতে ঘুরে বেড়ানোর আর আজব সব যান্ত্রিক সৃষ্টি দেখার জন্য সারা পৃথিবী থেকে লোকের ভীড় উপচে পড়ে। একই সঙ্গে অবিরত প্রচেষ্টা চলেছে পরিবেশ সংরক্ষণের। শহরের মাঝে গাড়ি চলাচল কমিয়ে সাইকেলে যাতায়াতের জন্য সুবিধে বাড়ানো, গণপরিবহনে বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহার। গার-মারিটিমের ঘাটে বাঁধা প্রাচীন যুদ্ধজাহাজটি তাকিয়ে দেখে যাত্রীবাহী সটীমারের পারাপার।
আবার শনিবার সকালে লোয়ার পাশেই পচি-ওলন্দের হাটে গেলে পাই ভিয়েতনাম, কম্বোজ, সেনেগাল, আইভরি-কোস্ট, আলজেরিয়া, মরোক্কো এমন কি অবাক করে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা থেকে আগত অভিবাসী রেইন, ভান থেকে আসা দোকানীদের পাশাপাশি মাছ, মাংস, তরিতরকারি, ফলমূল, মশলাপাতি, চীজ, ওয়াইন, জামাকাপড়ের পসরা সাজিয়ে বসেছে। আরবী থেকে ওলোফে কলকাকলি, দরদাম চলেছে। সুযোগ পেয়ে আমিও বাংলা ঝালিয়ে নিই, যদিও সিলেটি দোকানদারের মন তাতে গলবার নয়। দুটো নাগাদ হাট ভাঙলে কিন্তু আধঘ্ন্টায় সব কিছু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। সৃজনশীলতা, পরিবেশ সচেতনতা আর সমমর্মিতা নঁথকে ধীরে ধীরে করে তুলেছে আজকের ফ্রান্সের সিলিকন ভ্যালি আর য়ুরোপের অন্যতম সবুজ ও নাগরিককেন্দ্রিক বাসযোগ্য শহর।
গ্রীষ্মের সন্ধ্যেতে যুবক-যুবতীরা যখন লোয়ার পাশে ঘাসের গালিচায় গোল করে বসে সাদা, কালো, বাদামী সবাই মিলে বীয়ার বা লোয়া উপত্যকার সুবিখ্যাত গোলাপী ওয়াইন আর ব্রতঁর গালেত খেতে খেতে গল্প করে, পাশে পৌরসংস্থা পরিচর্চিত বার-বি-কিঊ এর সুবাসে বাতাস ম ম করে আর ওপরের চাতালে পৌরসংস্থা থেকে আয়োজিত বাজনার তালে সবাই মিলে ট্যাঙ্গো কি সাম্বা নাচে তখন ঝলমলে নঁথের পাশ দিয়ে সময়ের নীরব সাক্ষী স্রোতস্বিনী লোয়া কি ভাবতে ভাবতে অতলান্তিকের পানে বয়ে চলে কে জানে।