Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও ‘বাঙ্গলার কথা’

অভিষেক রায়

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ

একেবারে শুরুতেই বলে দিতে চাই যে এই লেখা দেশবন্ধুর জীবনী নয়। এই লেখায় তুলে ধরতে চাই তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কিছু বিশেষ দিক, যা আজকের এই সন্ধিক্ষণে খুব প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। সারা দেশে বেশ কিছুকাল ধরেই এখন হিন্দুত্বের জোয়ার। বিবিধের দেশে, বহুত্বের দেশে আজ সংখ্যালঘুরা প্রবলভাবে নিরাপত্তাহীন। স্বাভাবিক ভাবেই ধর্মনিরপেক্ষতা আজ গভীর সংকটে। প্রশ্ন উঠেছে গণতন্ত্রের স্থায়ীত্ব নিয়েও। দেশের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও আমূল বদলে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। চলছে এক ধর্মকে কেন্দ্র করে এক ভয়ঙ্কর রাজনীতি। এইসব করছে দেশের বর্তমান শাসক দল।

ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে যখন আমাদের লড়াই চলছিল, তখন রাজনীতির মূল আবহাওয়াটাই ছিল অন্যরকম। ১৮৫৭ সালের মহা বিদ্রোহ, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ পর্যায়ের পরে ১৯২০ সালে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এক নতুন মোড় ঘুরল। বললে অসত্য হবে না যে ১৯২০ সালের পর থেকেই মূল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা হল। যে আন্দোলন থেকে নির্মাণ হল আমাদের জাতীয় অস্মিতা। ঠিক তখন থেকেই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর। কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে জোয়ার আনলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। তাঁর রাজনীতির সঙ্গে এসেছিল এক প্রাদেশিক আবেগের জোয়ার, যা গোড়া থেকেই আঞ্চলিক ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করা। চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্ব বাংলার মানুষকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর এক দশকেরও কম সময়ের রাজনৈতিক জীবনে তিনি খুব কম সময়েই প্রকৃত অর্থেই সকলের ‘দেশবন্ধু’ হয়ে উঠেছিলেন। চিত্তরঞ্জনের হাত ধরে যে প্রাদেশিক জাতীয়তাবাদের সূচনা হয়েছিল, তার বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মীয় পরিচয়কে বাদ দিয়ে শুধু ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসকে কেন্দ্র করে এক শক্ত জাতিভিত্তিক অস্মিতা নির্মাণ। যে অস্মিতা নিজের মাটির সাথে প্রথিত কিন্তু যা জাতীয় অস্মিতার পরিপন্থী নয়। সঙ্কীর্ণ নয়। এই জাতিভিত্তিক অস্মিতার রাজনীতি মজবুত হলে পরবর্তীকালে দেশভাগের পূর্বে বিচ্ছিন্নতা, সাম্প্রদায়িকতা তৈরি হত না। আটকানো যেত দেশভাগ। পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে মুজিবর রহমান যখন বাংলা ভাষার দাবিতে লড়ছেন তখন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ছিলেন তাঁর প্রেরণা। তাঁর সাক্ষাৎ শিষ্য নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু।

আজ যখন ‘এক দেশ এক ধর্ম এক ভাষা’র রাজনীতির প্রবল আগ্রাসন, এক আগ্রাসী রাজনীতি ধ্বংস করে দিচ্ছে ভারতের হাজার বছরের বৈচিত্র্য ও বহুত্ব, তখন এই ইতিহাস বারবার ফিরে দেখার সময়। ২০২০ সালে ছিল দেশবন্ধুর জন্মের সার্ধশতবর্ষ আর এই বছর ১৬ জুন পূর্ণ হল তাঁর মৃত্যু শতবর্ষ।

ফিরে দেখলে বোঝা যায় যে, দীর্ঘ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছিল সমগ্র ভারত, সব প্রদেশকে একসাথে করা। ঐ সময়ে বহু জাতীয়তাবাদ একত্রিত হয়েছিল। বাংলার মতো বাল গঙ্গাধর তিলকের নেতৃত্বে মহারাষ্ট্রে মরাঠা জাতিভিত্তিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তবে বাংলায় দেশবন্ধুর বাংলা জাতীয়তাবাদ যতটা সর্বব্যাপী (inclusive) ছিল, হিন্দু মুসলমানের যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, মহারাষ্ট্রে ঠিক তা হয়নি। মরাঠা জাতিসত্তা ছিল একচেটিয়া ভাবে বর্ণ হিন্দুদের। আজকের বিচ্ছিন্নতার রাজনীতির সময়ে ঐরকমই জাতিসত্তা নিয়ে আলোচনা বিশেষভাবে জরুরী হয়ে পড়েছে।

চিত্তরঞ্জন দাশের জন্ম ১৮৭০ সালের ৫ নভেম্বর কলকাতা শহরে। তিনি জন্মেছিলেন এক সম্ভ্রান্ত পূর্ববঙ্গীয় বাঙালি ব্রাহ্ম পরিবারে। বাবা ভুবনমোহন দাশ ছিলেন আইনজীবী এবং এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্ম। মা নিস্তারিণী দেবীর দয়ালু মনের খুব প্রভাব পড়েছিল চিত্তরঞ্জনের ওপর। উনিশ শতকের মধ্যভাগে যখন ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলন চলছে সেই সময়ে দাশ পরিবার নিয়েছিল এক উল্লেখযোগ্য প্রভাবশালী ভূমিকা। বিশেষ করে ভুবনমোহনের মধ্যমাগ্রজ, চিত্তরঞ্জনের জ্যাঠামশাই দুর্গামোহন দাশ এবং তাঁর সহধর্মিণী ব্রহ্মময়ী দেবী। নারী শিক্ষার প্রসার, বিধবা বিবাহ এবং মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠায় এক অসাধারণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন দুর্গামোহন দাশ। এইসব উদ্যোগে দাদার পাশে ছিলেন ভুবনমোহন। তিনি ব্রহ্ম সঙ্গীত রচনা করতেন। তাই শৈশব থেকেই কাব্য সাহিত্যের প্রতি এক গভীর অনুরাগ ছিল চিত্তরঞ্জনের।

সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দুর্গামোহন দাশ। ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়েরও তিনি এক পৃষ্ঠপোষক। তিনি এতটাই র‍্যাডিকেল ছিলেন যে নিজের তরুণী বিমাতার দ্বিতীয়বার বিবাহ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করলে হিন্দু পরিবার থেকে বিতাড়িত হতে হত। তাই বহু ব্রাহ্ম পরিবার অন্যান্যদের আশ্রয় দিত। অভিভাবকের অকাল মৃত্যু হলে অন্য ব্রাহ্ম পরিবারের লোকেরা অনাথ শিশুদের দায়িত্ব নিত। দুর্গামোহনের স্ত্রী ব্রহ্মময়ী অনেকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ব্রহ্মময়ীর অকাল মৃত্যুর পরে তাঁর সন্তানদের এবং অন্য আশ্রিতদের লালন পালনের ভার গ্রহণ করেছিলেন চিত্তরঞ্জন-জননী নিস্তারিণী। তাই একদিকে ব্রাহ্ম ধর্মের মতো ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন, সমাজ সংস্কার, শিক্ষা প্রসার, স্ত্রী শিক্ষা এবং অন্যদিকে পরহিতে, পরের সেবা চিত্তরঞ্জনের মনে এক গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

পরবর্তীকালে আমরা দেখেছি, রাজনীতিবিদ হিসেবে চিত্তরঞ্জন যতটা জনপ্রিয়, তাঁর দানের জন্যেও ঠিক ততটাই। নিজের বসত ভিটে, এমনকি শেষ বস্ত্রটুকু পর্যন্ত দান করে যান। দাশ পরিবার বাংলার একটি অন্যতম বিদগ্ধ পরিবার। দুর্গামোহনের ছয় সন্তানের তিনজন বিখ্যাত শিক্ষাবিদ, প্রতিষ্ঠান নির্মাতা। জ্যেষ্ঠা কন্যা সরলা রায় আজীবন নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত গোখলে মেমোরিয়াল স্কুল ও কলেজ । মধ্যমা কন্যা লেডি অবলা বসু বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর সহধর্মিণী রূপেই বিশেষ পরিচিত। সারা দেশে মেয়েদের মধ্যে প্রথম মেডিক্যাল পড়া অবলা বসুও সারাজীবন নারী শিক্ষা ক্ষেত্রে কাজ করে গেছেন। ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ের সচিব ছিলেন আড়াই দশকের বেশী এবং প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নারী শিক্ষা সমিতি, যে সংগঠন সারা বাংলায় প্রায় একশোর মতো বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। এক পুত্র সতীশরঞ্জন দাশ দুন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। বাঙালি সমাজ এই পরিবার থেকে বিখ্যাত সব আইনজীবীও পেয়েছে।

চিত্তরঞ্জন নিজে ছিলেন জাতীয় স্তরের বিখ্যাত ব্যারিস্টার। ভ্রাতা প্রফুল্লরঞ্জন দাশ ও ছিলেন অন্যতম বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, বিচারপতি এবং জুরিস্ট। বোন অমলা দাশ ছিলেন প্রতিভাময়ী গায়িকা, রবীন্দ্রনাথের প্রিয় এই গায়িকা গ্রামাফোনে প্রথম রবীন্দ্র সঙ্গীত রেকর্ড করেন। আরেক বোন ঊর্মিলা দেবী অসহযোগ আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ঊর্মিলা দেবী ও দেশবন্ধু-পত্নী বাসন্তী দেবী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে মেয়েদের মধ্যে প্রথম কারাবরণ করেন।

লন্ডন মিশনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে, প্রেসিডেন্সি কলেজের পাঠ শেষে চিত্তরঞ্জন ইংল্যান্ডে পাড়ি দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল আই.সি.এস হওয়া। কিন্তু সেই সময় ভারতীয় ছাত্রদের রাজনৈতিক আখড়া ‘মজলিস’ এর সাথে জড়িয়ে পড়লেন তিনি। বরাবরই ছিলেন বাগ্মী। দাদাভাই নওরোজি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সভ্য নির্বাচিত হবেন, সেই উৎসাহে লেগে পড়লেন। পার্লামেন্টের সভ্য ও প্রার্থী জে. ম্যাকলিন সমগ্র ভারতীয়দের ‘গোলামের জাতি’ বলায় চিত্তরঞ্জন গর্জে উঠে তাঁকে ‘কীট’ বলে উল্লেখ করেন। এই রাজনৈতিক উদ্দীপনার ফলে আর আই. সি. এস হওয়া হল না তাঁর। লন্ডনের মিডল টেম্পল থেকে সাফল্যের সাথে পাশ করে ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরলেন। ভাগ্যিস তাই হয়েছিল। তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের পক্ষে আই. সি. এস হয়ে ব্রিটিশের গোলামী করা সম্ভব হত না। বরং তাঁর মতো আইনজীবীর প্রকৃতই প্রয়োজন ছিল পরাধীন ভারতে।

আলিপুর বোমা মামলা, ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলা,বন্দেমাতরম মামলা, নোয়াখালী নোট মামলা এবং এরকম আরও অসংখ্য মামলায় চিত্তরঞ্জন ছিলেন বিপ্লবীদের প্রধান ভরসা। দেশে ফিরে যখন কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করবেন সেই সময়ে দাশ পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব সংকটে। এক ব্যক্তিকে বিশ্বাস করে প্রচুর ধার নিয়ে শেষ পর্যন্ত টাকা শোধ করতে না পেরে পিতা ভুবনমোহন আদালতে ‘দেউলিয়া’ প্রতিপন্ন হয়ে গেলে পিতার সমস্ত ঋণ পুত্র চিত্তরঞ্জন শোধ করেছিলেন। এর মধ্যেই বিবাহ বিক্রমপুরের নওগাঁওয়ের বাসিন্দা, অসমের বিজনী এস্টেটের দেওয়ান বরদাচরণ হালদারের কন্যা বাসন্তী দেবীর সঙ্গে। তিন সন্তান – অপর্ণা, চিররঞ্জন, কল্যাণী।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ছাত্রাবস্থাতেই চিত্তরঞ্জন কাব্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন। এবং সেই কাব্যচর্চা করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের সাথে, যখন তিনি তাঁর ‘রবি কাকা’। তাঁর প্রথম কাব্য ‘মালঞ্চ’ প্রকাশিত হওয়ার পরে ব্রাহ্মসমাজে তাঁকে ‘মাতাল’ আখ্যা শুনতে হয়েছিল। পরে প্রকাশিত হয়েছে ‘সাগর সঙ্গীত’ কাব্য। পরবর্তীকালে বৈষ্ণব রসশাস্ত্র ও সাহিত্যের প্রবল অনুরাগী হয়ে পড়েন তিনি এবং যথারীতি চৈতন্যদেবের বিশেষ ভক্ত। মনে করতেন অসহযোগের প্রথম প্রবর্তক হলেন চৈতন্যদেব। বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রিয় লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর মতে, ‘বঙ্কিমই মাতৃপূজামন্ত্রে জাতীয়তাবোধকে জাগিয়ে তুলে চোখ খুলে দিয়েছেন।’ বাংলা এমনই এক কবিকে পেয়েছিল তাঁদের সর্বভারতীয় নেতা রূপে। এখানে উল্লেখ্য, পরবর্তী জীবনে চিত্তরঞ্জন ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করে পরম বৈষ্ণব হয়ে পড়েন। হিন্দু সমাজে তিনি বর্ণ হিন্দুদের মধ্যে অসবর্ণ বিবাহ প্রথায় উদ্যোগী হন। চেয়েছিলেন কায়স্থ, বৈদ্য, ব্রাহ্মণ একসাথে মিশে না গেলে বর্ণভেদ গুচবে না। নিজের ভ্রাতা, কন্যা, পুত্র, ভাগ্নীর অসবর্ণে বিবাহ দেন।

চিত্তরঞ্জন দাশ যে সময়ে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করলেন সেই সময় কংগ্রেসে পুরনো দিনের নেতৃত্বের মধ্যে উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ও প্রভাব কমেছে, বিপিনচন্দ্র পালের প্রভাবও কম, যদিও তিনি প্রথমদিকে চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে ছিলেন। এক নতুন ধরণের রাজনীতি নিয়ে এসেছিলেন তিনি। কংগ্রেস যে আমজনতাকে ছুঁতে পারছেনা, তা গান্ধীর মতো তিনিও অনুভব করেন। একজন বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার হয়েও পূর্বতন নেতাদের অভ্যাস ত্যাগ করে চিত্তরঞ্জন স্বদেশী বেশ ধুতি, চাদর পরিধান হিসেবে গ্রহণ করে বাংলায় বক্তৃতা করলেন। ১৯১৭ য় প্রদেশ কংগ্রেস অধিবেশনের সভায় তাঁর বক্তৃতা ‘বাঙ্গলার কথা’ অনেকটাই তাঁর পলিটিক্যাল ম্যানিফেস্টো বলে মনে হয়। ঐ বক্তৃতায় তিনি বাংলার প্রাকৃতিক রূপ, ইতিহাস, ভূগোল, বৈচিত্র্য, ধর্মীয় সমন্বয়ের কথা তুলে ধরেন। ঐ বিখ্যাত ভাষণের একটি অংশ তুলে দেওয়ার লোভ সংবরণ করতে পারছিনা।

“বুঝিলাম, বাঙ্গালী হিন্দু হউক, মুসলমান হউক, খৃষ্টান হউক, বাঙ্গালী বাঙ্গালী। বাঙ্গালীর একটা বিশিষ্ট রূপ আছে, একটা বিশিষ্ট প্রকৃতি আছে, একটা স্বতন্ত্র ধর্ম আছে। এই জগতের মাঝে বাঙ্গালীর একটা স্থান আছে, অধিকার আছে, সাধনা আছে, কর্তব্য আছে। বুঝিলাম, বাঙ্গালীকে প্রকৃত বাঙ্গালী হইতে হইবে। বিশ্ববিধাতার যে অনন্ত বিচিত্র সৃষ্টি, বাঙ্গালী একটি বিশিষ্টরূপ হইয়া ফুটিয়াছে। আমার বাঙ্গলা সেই রূপের মূর্তি। আমার বাঙ্গলা সেই বিশিষ্টরূপের প্রাণ। যখন জাগিলাম, মা আমার আপন গৌরবে তাঁহার বিশ্বরূপ দেখাইয়া দিলেন। সে রূপে প্রাণ ডুবিয়া গেল। দেখিলাম, সে রূপ বিশিষ্ট, সে রূপ অনন্ত! তোমরা হিসাব করিতে হয় কর, তর্ক করিতে চাও কর- আমি সে রূপের বালাই লইয়া মরি।”

১৯০৬ সালে ঢাকায় স্থাপিত হয় মুসলিম লীগ। ১৯০৯ সালে মার্লে মিন্টো সংস্কার আইন পাশ হল। এই সংস্কারের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা হয়, যা ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিল। কংগ্রেসে সেই সময় নেতৃ বৃন্দের মধ্যে সিংহভাগ উচ্চবর্ণীয় হিন্দু। বাংলাতেও কট্টর হিন্দুরা মনে করলেন হিন্দুদের ও একটি পৃথক সংগঠন দরকার। কংগ্রেসেরই অন্যতম সর্বভারতীয় নেতা মদন মোহন মালব্য ১৯১৫ তে প্রতিষ্ঠা করলেন হিন্দু মহাসভা। দুই পক্ষের মধ্যেই এক ধর্মীয় উত্তেজনার মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে এক গভীর সংকট দেখা দিয়েছিল এবং এতে বিশাল সুবিধা পেয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসক যাদের উদ্দেশ্যই ছিল হিন্দু মুসলমানের বিভাজন। রবীন্দ্রনাথ এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং তাঁর কাব্য সাহিত্যে বিষয়গুলোর মোকাবিলা করেছেন। এখানে আরেকটি কথা না বললেই নয়, দুর্ভাগ্যবশত রবীন্দ্রনাথ ও চিত্তরঞ্জন একসাথে কাজ করতে পারেননি যখন তাঁদের একসাথে কাজ করার বিশেষ প্রয়োজন ছিল। এক অদৃশ্য বিভেদ তাঁদের পৃথক করে দেয়। যদিও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে দুজনের মতামত সমতুল্য ছিল, চিত্তরঞ্জন প্রকাশ্যেই রবীন্দ্র বিরোধী হয়ে উঠেছিলেন।

যাইহোক, রাজনীতিতে মোহনদাস গান্ধীর আবির্ভাব, অসহযোগ আন্দোলন এবং খিলাফৎ আন্দোলন হিন্দু মুসলমান ঐক্য গড়তে অনেকটাই সমর্থ হয়েছিল কিছুকালের জন্যে, যদিও তা সুদূরপ্রসারী বা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ঠিক সেই সময়ে চিত্তরঞ্জন দাশ রাজনীতিতে এলেন এবং প্রথম থেকেই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও ঐক্য গড়ার কাজে বিশেষ গুরুত্ব দিলেন। জাতীয় কংগ্রেস থেকে কিছুটা সরে এসে স্বরাজ্য দল তৈরি করে তিনি ও তাঁর অনুগামীরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। জাতীয় কংগ্রেসের একজন নেতা হয়েও চিত্তরঞ্জন দাশ অনুভব করেছিলেন, যে নতুন করে কিছু করতে গেলে কংগ্রেসে থেকে তা করা সম্ভব হবেনা। কংগ্রেস তার নিজস্ব চিরাচরিত পথে চলবে। ১৯২২ এর গয়া কংগ্রেস অধিবেশনের পরে এই উপলব্ধি আরো স্পষ্ট হয়। সেবার তিনি কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। যদিও এখানে বলা প্রয়োজন, ১৯২১ সালে গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলে চিত্তরঞ্জন সাথে সাথে যোগ দেন এবং বাংলায় গান্ধী এবং অসহযোগ আন্দোলনের গুরুত্বকে প্রাসঙ্গিক করেন। দেশবন্ধুর ডাকে বহু মানুষ এসে যোগ দেন।

বাংলায় গান্ধীকে প্রাসঙ্গিক করতে চিত্তরঞ্জনের ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। সেই বছরই ইংল্যান্ডের রাজকুমার প্রিন্স অব ওয়েলসের ভারত আগমন উপলক্ষে গান্ধীজী বয়কটের ডাক দিলে, চিত্তরঞ্জন দাশ ও তাঁর অনুগামীরা সারা শহর জুড়ে পিকেটিং করেন। স্ত্রী বাসন্তী দেবী, ভগ্নী ঊর্মিলা দেবী এবং পুত্র চিররঞ্জন গ্রেফতার বরণ করেন। গান্ধীর চরকা ও খাদিকে জনপ্রিয় করেছিলেন নিজে খাদি বস্ত্র পরিধান করে। নিজেও একাধিকবার কারাবরণ করেছেন। জেলে থাকার সময়েই তিনি কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। প্রথমবার কারাবরণের সময়ে পুলিশ অফিসারকে গ্রেফতারি বিষয়েএমন কিছু আইনী প্রশ্ন করেন যে অফিসার পালাবার পথ পাননি।

কিন্তু গয়া কংগ্রেসে গান্ধীর সঙ্গেই প্রধান বিরোধ উপস্থিত হয়। এছাড়া গান্ধীজী আইন সভা বর্জনের দাবী তুলেছিলেন। কিন্তু সংবিধানবাদী চিত্তরঞ্জন চাইলেন আইন সভায় প্রবেশ করে আইনসভার সমস্ত স্বায়ত্তশাসনের প্রতিষ্ঠানগুলির নির্বাচিত আসন দখল করতে হবে। আইনসভায় অংশগ্রহণ করে সরকারি ক্ষমতার অধিকার নিয়ে সরকারি কাজে বাধাদানের মাধ্যমে অচলাবস্থা তৈরি করতে হবে এবং গঠনমূলক কাজ করতে হবে। কংগ্রেসের মধ্যে সেই সময়ে দুটো দল সক্রিয় ছিল। একটা পরিবর্তনকামী, অন্যটা পরিবর্তন বিরোধী। চিত্তরঞ্জনের পক্ষে পরিবর্তনকামীদের মধ্যে সর্বপ্রথমেই নাম করতে হয় মতিলাল নেহেরুর। চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহেরু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এক কিংবদন্তী জুটি। অন্যরা হলেন মদনমোহন মালব্য, বিঠলভাই প্যাটেল, সত্যমূর্তি জয়কার এবং হাকিম আজমল খান । অন্যদলে ছিলেন ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ, বল্লভভাই প্যাটেল, রাজা গোপালাচারী, ডঃ আনসারি প্রমুখ। ১৯২২ সালে গয়া কংগ্রেস অধিবেশনে দুই দলের মধ্যে প্রবল তর্কবিতর্ক ও বিরোধ শুরু হয়। চিত্তরঞ্জনের নেতৃত্বে পরিবর্তনকামীরা যে প্রস্তাব দেয় তা গান্ধীর অনুগামী পরিবর্তন বিরোধীরা নাকচ করে দেয়। পাল্লায় কিছুটা ভারী হওয়ায় তারা আগে থেকেই জোট বেঁধে প্রস্তাব রোখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ত্রিশের শেষে এই দলই ঘোঁট পাকিয়ে ত্রিপুরী কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্র বসুর বিরুদ্ধে গিয়ে গান্ধী-সুভাষ মতান্তর চরমে তুলে তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। প্রস্তাব খারিজ হলে চিত্তরঞ্জন দাশ তৎক্ষণাৎ পদত্যাগ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগ করেন মতিলাল নেহেরু। ১লা জানুয়ারি ১৯২৩ চিত্তরঞ্জন দাশ স্বরাজ্য দল প্রতিষ্ঠা করেন। চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহেরু দুই নেতা যথাক্রমে দলের সভাপতি ও সম্পাদক নিযুক্ত হন। স্বরাজ্য দল খুব কম সময়ে প্রভুত সাফল্য পেয়েছিল। দলের সদস্যরা সারা দেশব্যাপী প্রচার চালায়। স্বরাজ্য দলের প্রধান কর্মসূচি র মধ্যে ছিল — (১) নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভায় যোগদান করে সভার কাজকর্মে অবিরাম বাধাদান করে প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি। (২) সরকারি বাজেট প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় বাজেট গ্রহণে সরকারকে বাধ্য করা। (৩) নানা প্রকার বিল ও প্রস্তাব উত্থাপন করে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদের অগ্রগতি ঘটাতে সাহায্য করা। (৪) জাতীয় স্বার্থে নতুন অর্থনীতি রচনা করে বিদেশি অর্থনৈতিক শোষণ বন্ধ করা। (৫) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থেকে স্বায়ত্ত শাসনের অধিকার লাভ করা প্রভৃতি। কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে স্বরাজ্য দল অভূতপূর্ব সাফল্য পায়। চিত্তরঞ্জন দাশ হন কর্পোরেশনের মেয়র। চিত্তরঞ্জন ছিলেন আপদামস্তক এক বাস্তববাদী রাজনীতিবিদ।

জাতীয় রাজনীতির এই জটিল সময়ে হিন্দু মুসলমান ঐক্য সাধনে চিত্তরঞ্জন দাশের অন্যতম কীর্তি ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’। ১৯২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বরাজ্য পরিষদ দলের এক সভায় চুক্তিটির শর্তাবলি গৃহীত হয়। ১৮ ডিসেম্বর সভায় চুক্তি অনুমোদন লাভ করে। চুক্তিটির বিভিন্ন শর্ত একবার দেখে নেওয়া যাক –

১. বঙ্গীয়-আইন সভায় প্রতিনিধিত্ব পৃথক নির্বাচক মন্ডলীর মাধ্যমে জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

২. স্থানীয় পরিষদসমূহে প্রতিনিধিত্বের অনুপাত হবে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের শতকরা ৬০ ভাগ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শতকরা ৪০ ভাগ।

৩. সরকারি চাকরির শতকরা পঞ্চান্ন ভাগ পদ পাবে মুসলমান সম্প্রদায় থেকে। যতদিন ঐ অনুপাতে না পৌঁছানো যায়, ততদিন মুসলমানরা পাবে শতকরা আশি ভাগ পদ এবং বাকি শতকরা কুড়ি ভাগ পাবে হিন্দুরা।

৪. কোন সম্প্রদায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ৭৫ শতাংশের সম্মতি ব্যতিরেকে এমন কোন আইন বা সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করা যাবে না, যা ঐ সম্প্রদায়ের সঙ্গে স্বার্থের পরিপন্থী।

৫. মসজিদের সামনে বাদ্যসহকারে শোভাযাত্রা করা যাবে না।

৬. আইন সভায় খাদ্যের প্রয়োজনে গো-জবাই সংক্রান্ত কোন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে না এবং আইন সভার বাইরে দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সমঝোতা আনার প্রচেষ্টা চালানো অব্যাহত থাকবে। এমনভাবে গরু জবাই করতে হবে যেন তা হিন্দুদের দৃষ্টিতে না পড়ে এবং তা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না করে। ধর্মীয় প্রয়োজনে গরু জবাইয়ের ব্যাপারে কোন হস্তক্ষেপ করা যাবে না।

কিন্তু চুক্তিটি নিয়ে অচিরেই প্রবল বিরোধিতা আসে কংগ্রেসের হিন্দু ব্রিগেডের পক্ষ থেকে। বিরোধিতা করেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিপিনচন্দ্র পাল- যিনি ছিলেন চিত্তরঞ্জনের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ অগ্রজ নেতা। কিছুদিনের মধ্যে কোকনাদ কংগ্রেসে বেঙ্গল প্যাক্ট বাতিল হয়। বেঙ্গল প্যাক্টকে পূর্ণভাবে সমর্থন করেছিলেন একদল নবীন কংগ্রেস নেতা যাঁদের মধ্যে ছিলেন যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, কিরণশংকর রায়, সুভাষচন্দ্র বসু, অনিলবরণ রায়, বীরেন্দ্রনাথ শাসমল এবং প্রতাপচন্দ্র গুহ প্রমুখ। এঁরা ছিলেন একদল তরুণ তুর্কী যাঁদের রাজনৈতিক হাতেখড়ি চিত্তরঞ্জন দাশের হাতে। চিত্তরঞ্জন নিজের ক্ষোভ আটকে রাখেননি। তিনি গর্জে উঠে বলেছিলেন “তোমরা সভার সিদ্ধান্তসমূহ থেকে বেঙ্গল প্যাক্টকে মুছে ফেলতে পার, কিন্তু ভারতের জাতীয় কংগ্রেস থেকে বাংলাকে বাদ দিতে পারবে না…এ রকম শিষ্টাচারহীন রীতিতে বাংলাকে মুছে ফেলা যাবে না। যারা চিৎকার করে বলে যে ‘বেঙ্গল প্যাক্টকে মুছে ফেল’ তাদের যুক্তি আমি বুঝতে পারি না… বাংলা কি অস্পৃশ্য? এ রকম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করার বাংলার অধিকারকে কি তোমরা অস্বীকার করবে? যদি তোমরা তাই কর, বাংলা তার নিজের ব্যবস্থা নিজেই গ্রহণ করতে পারবে। তোমরা অভিমত ব্যক্ত করার ব্যাপারে বাংলার অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করতে পার না”।

এত সহজে হাল ছাড়ার ব্যক্তি ছিলেন না তিনি। জাতীয় কংগ্রেস থেকে প্রত্যাখ্যাত হলেও ১৯২৪ সালের জুন মাসে সিরাজগঞ্জের বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মেলনে তিনি চুক্তিটির শর্তাবলি অনুমোদন করিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন পনেরো হাজারের ওপর মানুষ এবং সভাপতিত্ব করেছিলেন মওলানা মহম্মদ আকরম খাঁ। সম্মেলনে তাঁর ভাষণে বলেছিলেন ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ব্যতীত আমাদের স্বরাজের দাবি চিরকাল কল্পনার বস্তুই থাকিয়া যাবে”। কিন্তু ১৯২৫ এ তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই বেঙ্গল প্যাক্ট সমাধিস্থ হয়। তাঁর একান্ত অনুগামীরা এ বিষয়ে সবিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। সেই ঐতিহাসিক দায় তাঁদের থেকে গেছে। বিশের দশকের শুরুতেই রাজনীতি চিত্তরঞ্জনের অনুসারী হলে পরবর্তীকালে দেশের ইতিহাস অন্যরকম হত। ইতিহাসবিদ রজতকান্ত রায় বলেছেন “ভারতবর্ষের সত্তা কোনও এক ও অখণ্ড সত্তা নয়, এটা চিত্তরঞ্জন ঠিক ধরেছিলেন”। চিত্তরঞ্জন দাশের ওপর সাম্প্রতিক কালের একটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থের সম্পাদক, ইতিহাসবিদ সেমন্তী ঘোষ দাবি করেছেন “নানা গোষ্ঠী ও স্বার্থের মধ্যেকার বিরোধ মিটিয়ে ভারতের সভ্যতা তার বহুত্ব ও একতা অর্জন করেছে। চিত্তরঞ্জনের স্বরাজ চিন্তার মধ্যে এমন এক ‘প্র্যাক্টিক্যালিটি’ ছিল যা গান্ধীর ‘মরালিস্টিক’ হিন্দ স্বরাজ-এ ছিল না। দাশের বিশিষ্ট স্বরাজ্য এক ধরনের ‘রিয়েলপলিটিক’-এর ভিত্তিতে গঠিত হয়”।

চিত্তরঞ্জন বাস্তব রাজনীতির এবং বৃহত্তর স্বার্থের প্রয়োজনে জোট গড়ার দিকে জোর দিয়েছিলেন। অসহযোগ ও খিলাফৎ আন্দোলনকে মিশিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। হিন্দু-মুসলমান সহযোগ ছাড়া স্বরাজের দাবি কেবলই একটা স্লোগান, এই সত্যটা দেশবাসীকে উপলব্ধি করাতে চেয়েছিলেন, যার বাস্তব রূপ বেঙ্গল প্যাক্ট।

দেশবন্ধুর জীবন শুধু নয়, তাঁর পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক জীবন চর্চা করতে একাধিক প্রবন্ধ ও গ্রন্থ প্রয়োজন। এখানে শুধু তুলে ধরার চেষ্টা করেছি তাঁর রাজনীতির বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য যা আজও ভীষণ প্রাসঙ্গিক। প্রাদেশিক জাতীয়তাকে মর্যাদা দিয়ে তিনি এক যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারতবর্ষ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন যেখানে সব ধর্মের, বর্ণের, জাতের, ভাষাভাষী, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সমান অধিকার থাকবে। বাংলার এমন এক জাতীয় স্তরের নেতা আজ বিস্মৃতপ্রায় বলা যায়। আশা রাখব মৃত্যু শতবর্ষে তিনি আবার প্রাসঙ্গিক হবেন।

Subscribe
Notify of
guest
6 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
shahidul islam
shahidul islam
6 months ago

very interesting and informative article, I hope you will write more like this about our Dwshbandhu, I am a devout you can say disciple of him, thank you

Abhishek Roy
Abhishek Roy
4 months ago
Reply to  shahidul islam

Thank You very much Mr. Shahidul Islam for your generous comments. Deshbandhu Chittaranjan Das is a great historical personality who deserves a consistent reading and research. He was an ambassador of Hindu- Muslim unity and an eminent representative of Bengal’s multi-plural and syncretic culture and legacy. I have written on him on his 150th birth anniversary in ‘Janata Weekly’, India’s oldest socialist weekly. This time on his death centenary. I firmly believe that he is a great inspiration of all Bengalis of both Bengals and across the continent.

Azmal Hussain
Azmal Hussain
6 months ago

হিন্দু-মুসলমানের যৌথ সাধনায় এই সমাজ গড়ে তোলার ভাবনার প্রাসঙ্গিকতার কথা বলতে গেলে ক্ষিতিমোহন সেনের মতো দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসকেও একই মর্মে স্মরণ করার প্রয়োজন আছে আজকের এই সন্ধিক্ষণে, এবং সেই বিষয়েই আলোকপাত করেছেন লেখক।

Abhishek Roy
Abhishek Roy
4 months ago
Reply to  Azmal Hussain

আজমল হুসেন, দেশবন্ধুর মৃত্যু শতবর্ষে আমার সামান্য প্রয়াস এই প্রবন্ধ। আপনার প্রণিধানযোগ্য তামত আমাকে সমৃদ্ধ করলো।

Nilay Baran Som
Nilay Baran Som
6 months ago

An attempt has been made to track down the political path of one of the leading freedom fighters left a lasting mark in history. A well written article

Abhishek Roy
Abhishek Roy
4 months ago

Thank You, Mr. Nilay Baran Som for your generous comment. It was my small effort on his death centenary year. I have written an article in English five years back in India’s oldest socialist weekly ‘Janata Weekly’ on Deshbandhu’s birth centanery. Deshbandhu’s life and works requires a consistent study.

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
6
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x