Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার : বৈষম্যের শিকার নারী

শাহানা পারভীন লাভলী

ঢাকা, বাংলাদেশ

প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করা হয়। যদিও ঘোষণার আগে পর্যন্ত যাঁরা নোবেল পাবেন তাদের নামগুলো কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়। ফলে, ঘোষণার আগে জানা যায় না এই পুরস্কার কারা পাচ্ছেন। তারপরও এরই মধ্যে কারা নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন তা নিয়ে কানাঘুষো শুরু হয়ে গেছে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা কিংবদন্তী ক্রিকেটার ইমরান খান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আরও অনেকের নাম জোরেসোরে উচ্চারিত হচ্ছে। তবে, এখন পর্যন্ত কোনো নারীর নাম সেভাবে আলোচনায় আসছে না।

নোবেল পুরস্কারের জনক আলফ্রেড নোবেল

‘নোবেল’ সম্পর্কে সকলেরই কম-বেশি ধারণা আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং সম্মানজনক পুরস্কার হচ্ছে ‘নোবেল’। ১৮৯৫ সালে সুইডিস বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের করে যাওয়া একটি উইল অনুসারে ‘নোবেল পুরস্কার’র প্রচলন করা হয়। যদিও সেটার বাস্তবায়ণ করা হয় ১৯০১ সালে। ফলে, আলফ্রেড নোবেল সেটা দেখে যেতে পারেননি। ১৮৯৬ সালের ২১ নভেম্বর আলফ্রেড নোবেল তাঁর নিজ গ্রাম ইতালির স্যান রিমোয় যান এবং ১০ ডিসেম্বর সকালে মাত্র ৬৩ বছর বয়সে এইপৃথিবী ছেড়ে চলে যান। ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে স্যান রিমোয় সমাহিত করা হয়।

মৃত্যুর আগে আলফ্রেড নোবেল যে উইলের মাধ্যমে এই পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা করে যান, তাঁর মৃত্যুর পর ১৮৯৭ সালের ২৬ এপ্রিলের আগে পর্যন্ত নরওয়ে সেই উইল অনুমোদন করেনি। উইল অনুমোদনের পর ‘নরওয়ে নোবেল কমিটি’ নামে একটি নোবেল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়।নোবেল ফাউন্ডেশনের কাজ ছিল তাঁর সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ ও নোবেল পুরস্কার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা।

নারী-পুরুষের সম-অধিকার নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। বাংলাদেশ-সহ বিশ্বের অনেক দেশে নারী-পুরুষের সম-অধিকার ঘোষণা করাও হয়েছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে ‘কাজির গোরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ এরকম সেটা শুধু ঘোষণা এবং প্রচার-প্রোপাগান্ডায় সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, চাকরি, ব্যবসা-বানিজ্য সবখানেই নারী বঞ্চিতও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্বেও চাকরিটা নারী না পেয়ে পুরুষ পেয়ে যাচ্ছে। নারীকে এখনও কোটা পেতে হচ্ছে। কোটা কোনো অধিকার নয়। আমার মনে হয়, অধিকাংশ নারীই কোটা চান না। তাঁরা যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান অধিকার চান।

যাইহোক, ‘নারী অধিকার’ একটি বড় পরিসরে আলোচনার বিষয়। এর ব্যপকতার কথা মাথায় রেখেই এখানে বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না। আজকের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব নোবেল প্রাপ্তিতে নারীর বৈষম্য বিষয়ে। ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২৩ বছরের ইতিহাসে ৯৭৫ জন নোবেলবিজয়ীর মধ্যে মাত্র ৬৫ জন নারী ৬৬ বার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এ থেকেই নারীর প্রতি বৈষম্য দেখা যায়। সঠিক মূল্যায়ন হলে নোবেলেও আরো অনেক যোগ্য নারীর নাম যুক্ত হতে পারে এবং আগামীতে তা হবে বলে আমার বিশ্বাস।

প্রথম এবং দুবার নোবেল পুরস্কার পাওয়া নারী পোল্যান্ডের ম্যারি স্কোডোস্কা ক্যুরি (১৯০৩ সালেপদার্থ বিজ্ঞানে এবং ১৯১১ সালে রসায়নে), ২০২৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া সর্বশেষ নারী দ. কোরিয়ার হ্যান ক্যাং এবং যে কোনো সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল পাওয়া নারী পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই।

১৯০০ সালে সুইডেনের রাজা অস্কার নোবেল ফাউন্ডেশনের একটি বিধিমালা তৈরি করেন।১৯০১ সাল থেকে সুইডেনের স্টকহোম থেকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। তবে, শুধুমাত্র শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় নরওয়ের অসলো থেকে। ১৯০১ সাল থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র, সাহিত্য ও শান্তি এই ৫টি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। আলফ্রেড নোবেল তাঁর উইলে অর্থনীতির কথা উল্লেখ করে না গেলেও নোবেল প্রবর্তনের ৬৮ বছর পর ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। 

১৮৯৭ সালে নোবেল পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হবার চার বছর পর ১৯০১ সালে প্রথমবারের মতো নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হলেও দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে নোবেল প্রদানের প্রথম বছরে কোনো নারীকে নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচিত করা হয়নি। প্রথম বছরে যে ছয় জনকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় তাঁরা সবাই পুরুষ। এমনকি পরের বছর ১৯০২ সালেও কোনো নারী নোবেল পুরস্কারে মনোনীত হননি। ১৯০৩ সালে প্রথমবার একজন নারীকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়, তিনি আরেক নোবেল লরিয়েট পিয়েরে ক্যুরির স্ত্রী ম্যারি ক্যুরি। পিয়েরে ক্যুরি এবং ম্যারি ক্যুরি স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সেই বছর একসঙ্গে  পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। যদিও পিয়েরে ক্যুরি ও ম্যারি ক্যুরি ছাড়াও আরো চার দম্পতি রয়েছেন যাঁরা একই বিষয়ে এবং একসঙ্গে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। এছাড়া আলভা মিরদাল ও গুনার মিরদাল দম্পতিও নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তবে, তাঁরা একসঙ্গে বা এক বিষয়ে পাননি। ম্যারি ক্যুরি হচ্ছেন একমাত্র নারী যিনি (১৯০৩ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে এবং ১৯১১ সালে রসায়নে) দুবার নোবেল পেয়েছিলেন। ১৯০১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি ছাড়া আর মাত্র তিনজন দু’বার নোবেল পুরস্কার জিতেছেন। তারা হলেন লিনাসপাউলিং, জন বারডিন ও ফ্রেডরিক স্যাঙ্গার।  

১৯১৩ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম বাঙালি তথা প্রথম ভারতীয় এবং প্রথম এশিয়ান হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পান। ২০২৪ সালে শেষ নারী হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান দক্ষিণ কোরিয়ার হ্যান ক্যাং।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত পুরস্কার প্রদান বন্ধ ছিল। প্রতিবছর পুরস্কারপ্রাপ্তদের প্রত্যেকে একটি স্বর্ণপদক, একটি সনদ ও নোবেল ফাউন্ডেশন প্রদত্ত বিপুল পরিমানের নগদ অর্থ পেয়ে থাকেন। ২০১২ সালে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ৮০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা। বর্তমানে এই অর্থের পরিমাণ এক কোটি সুইডিশ ক্রোনারও বেশি। যা আমাদের দেশের এগারো কোটি টাকার বেশি।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২৩ বছরের নোবেলের ইতিহাসে পদার্থ বিজ্ঞানে-চার, রসায়নে-১০, সাহিত্যে-১৮, শান্তিতে-১৯, চিকিৎসা বিজ্ঞানে ১৩ ও অর্থনীতিতে দু’জন নারী নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। পুরুষের তুলনায় যা নিতান্তই অপ্রতুল।  

গুগল, উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়ার তথ্যমতে, বিশ্বের যে ৩০টি দেশের ৬৫ জন নারী নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধিক ১৭ জন নারী এই পুরস্কার পেয়েছেন। ফ্রান্সের মাদাম ক্যুরি একমাত্র নারী, যিনি দুবার নোবেল পেয়েছেন। এ ছাড়া ফ্রান্সের পাঁচ জন, জার্মানির চার জন, অস্ট্রিয়া ও পোল্যন্ডের তিন জন, যুক্তরাজ্য, ইতালি, কানাডা, হাঙ্গেরি সুইডেন, নরওয়ে, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও লাইবেরিয়ার দুজন করে, রোমানিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, বেলারুশ, দক্ষিণআফ্রিকা, চিলি, গুয়াতেমালা, কেনিয়া, ইরান, ইরাক, চীন, দ. কোরিয়া, পাকিস্তান, ভারত, ইয়েমেন, মায়ানমার, ইসরায়েল এক জন করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এ পর্যন্ত মোট ১৮ জন নারী সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন।

নোবেল পুরস্কার পাওয়া মাত্র চার জন মুসলিম নারী হলেন  ইরানের শিরিণ এবাদি ও নার্গিস মোহাম্মদি, ইয়েমেনের তাওয়াক্কেল কারমান ও পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই। পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই ১৭ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে তিনি নোবেল শান্তি পুরষ্কার লাভের ইতিহাস গড়েন। ২০২৪ সালে ১১ জন ব্যক্তি ও একটা প্রতিষ্ঠানকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। এই ১১ জনের মধ্যে মাত্র এক জন নারী রয়েছেন। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার হ্যান ক্যাং। যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া ১৮তম এবং নারী হিসেবে ৬৫তম ও শেষ  নারী। এ থেকেই বোঝা যায়, এখানেও কতটা বৈষম্যের শিকার নারী।  

অনেকে হয়তো বলতে পারেন, মেধা ও যোগ্যতার দিক দিয়ে পুরুষের থেকে নারীরা পিছিয়ে রয়েছেন। কিন্তু আমি অন্তত মনে করি আজকে নারীরা পুরুষের থেকে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন। ফলে, নারী বলে বা কোটায় নয়, যোগ্যতার বিচারে নারীকে মূল্যায়ণ করা হোক। আমার বিশ্বাস, তাতেও নারী্রা নিজের যোগ্যতায় সমান অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষমতা রাখেন।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x