শওকত আহসান ফারুক
ঢাকা, বাংলাদেশ
গভীর রাতে হৃদি হাসানের মুঠোফোন বেজে ওঠে! অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসলে সচারাচর সে রিসিভ করে না তদুপরি এতরাতে, কয়েকবার রিং হয়ে থেমে যায়। অল্প বিরতি দিয়ে আবার বেজে ওঠে। কোন জরুরি কল হতে পারে ভেবে হৃদি ফোন রিসিভ করে।
‘হৃদি হাসান বলছেন।’
‘জি আমি হৃদি বলছি।’
‘একটা কবিতা শুনুন’ এই বলে, একটা কবিতা পড়ে শোনালেন।
হৃদি অবাক!
‘এটা তো আমার কবিতা! কোথায় পেলেন, কে আপনি?’
এত চমৎকার পাঠ হৃদি কখনও শোনেনি, ভরাট গলা, দারুণ কণ্ঠস্বর। নিজের কবিতার এত সুন্দর উপস্থাপন, হৃদি হতবাক!
‘আমি সুমন রহমান, নিউ ইস্কাটন থাকি। গত পরশু আপনার হারিয়ে যাওয়া একটি ব্যাগ আমার হস্তগত হয়েছে।’
‘জি, ফার্মগেট কোচিং থেকে ফেরার পথে রিকশা ভুলে ফেলে এসেছি।’
‘যাক সে কথা. আপনি কোথায় থাকেন? ব্যাগে তেমন মূল্যবান কিছুই নেই, শুধু আপনার অসম্ভব সুন্দর কতগুলো কবিতা ছাড়া। ডাইরিতে আপনার নাম ও সেল নাম্বার ছিল সেই সূত্রে যোগাযোগ করলাম, এত রাতে কল করেছি বলে কিছু মনে নিবেন না। মিডিয়ায় জব করি তাই একটু রাতে বাড়ি ফিরি।’
‘ধন্যবাদ সুমন সাহেব, আমি সেন্ট্রাল রোডে থাকি, আপনার সাথেযোগাযোগ করে ব্যাগ নিয়ে নিবো।’
শুধু এতটুকু কথাই সেই রাতে হয়েছিল। হৃদির ঘুম চটে গেল।
মাস কয়েক হয়েছে হৃদি ঢাকায়। এইচএসসি শেষ ভার্সিটির ভর্তির কোচিং চলছে। হৃদি মফস্বল শহরের মেয়ে, বাবা ব্যাংকের উর্ধতন কর্মকর্তা। বেশ ভালোই চলছিল তিনজনের দিনকাল। নাটোরে বেড়ে উঠা। মায়ের কাছে হাতেখড়ি গল্প কবিতার। মা রুমানা ইয়াসমিন সংষ্কৃতিমনা মানুষ, নান্দনিক গুণাবলীর অধিকারী। ছাত্রজীবনে গল্প কবিতা লিখেছেন, বিভিন্ন সাহিত্য সমাবেশে কবিতা পড়েছেন। মেয়ে হৃদি হাসানের মাঝে সেই ধারা প্রবাহিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে অনার্স সহ মাস্টার্স, তুলনামূলক সাহিত্যে। বিয়ের পর পাল্টে গেল জীবন ধারা। স্বামী তোফাজ্জল হাসান অন্য মেরুর বাসিন্দা । রুমানা গল্প কবিতা লিখবে, সাহিত্য সভায় যাবে এটা তার মোটেই পছন্দ করেন না। রুমানা ইয়াসমিন এখন রুমানা হাসান, ভিন্ন মানুষ।এইসবের ধারে কাছেও নেই, অভিমানে নিজকে গুটিয়ে নিয়েছেন, শামুকবাস। ঘরসংসার নিয়ে আছেন। মেয়ে হৃদির মাঝে নিজেকে খোঁজেন। স্থানীয় একটি কলেজে শিক্ষকতা করেন।
রজত রায়, গল্প লেখে। বিশ্ববিদ্যালয় বার্ষিক সাহিত্য সভায় রুমানা ইয়াসমিনের সাথে পরিচয়, অর্থনীতি নিয়ে পড়ছে, কোন দীনতা নেই। যথেষ্ট বিনয়ী। সম্পর্কের গভীরতা ক্রমশ বাড়ছে। বিকেলে দুজনে প্যারিস রোডে হাঁটতে যায়, কখনো যায় পদ্মার পাড়ে। তাদের বন্ধুত্ব হিংসা করার মতো। রজত রায়ের বাড়ি যশোহরের নাভারন। সেবার পূজার ছুটিতে কয়েক বন্ধু মিলে বেড়াতে গিয়েছিল নাভারন, খুব সুন্দর বাড়ি। স্বচ্ছল পরিবার বাবা বেনাপোলে সিএনএফ ব্যবসায়ী। আপ্যায়নে কোন ত্রুটি ছিল না। সম্পর্ক গভীর হলেও কেউ কাউকে বলেনি ‘ভালোবাসি’। রুমানার রক্ষণশীল পরিবার, সীমা অতিক্রম করতে ভয় পায়। স্বপ্ন দেখে ঘর বাঁধার, কিন্তু সেকি স্বপ্ন ছুঁইতে পারে। রজত রায় কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে আমেরিকা চলে গেছে, যাবার আগে রুমানাকে বলেছিল, চলো পালিয়ে ঘর বাঁধি। যদি এখানে সম্ভব না হয় ওপারে চলে যাব। কলকাতায় আমাদের সবকিছু আছে, তুমি শুধু হ্যাঁ বলো। রুমানা সেদিন পালাতে পারেনি, এতটা সাহস রুমানার ছিল না।
তোফাজ্জল হাসান সাধারণ মানুষ, ব্যাংক কর্মকর্তা। পাঠ্যবই ছাড়া কোন গল্প-কবিতা পড়েননি। নাটোরে নিজ বাড়িতে থাকেন। জীবনের হিসেব নিকেশ তাঁর কাছে অন্যরকম। অফিস, ক্লাব নিয়ে ব্যস্ত। পুরো সংসার একাই সামল দিচ্ছে রুমানা হাসান। মেয়ের পড়াশোনা, রান্নাবান্না, শিক্ষকতা এসব নিয়ে মোটামুটি ব্যস্ত। নিজের শহর আসেপাশে অনেক আত্মীয় স্বজন আছে দিনকাল মন্দ কাটছে না। তবুও কোথায় যেন একটা অতৃপ্তি, পরিশীলিত মন চায় কী আর সে করছেই বা কী! ইতিমধ্যে হৃদি স্কুল পেরিয়ে কলেজে উঠেছে। হৃদির গৌরবর্ণ, ঘন কালো চুল, উচ্ছল হাসিমুখে যখন কলেজে যায়, রুমানা তাকিয়ে দেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। চোখের সামনে কেমন বড় হয়ে যাচ্ছে। অসম্ভব প্রকৃতি প্রেমি। ফুল, পাখি ভালোবাসে। নরম মন, মায়ের মতো মননশীল, বাড়িতে ফুলের বাগান করেছে, নানা রঙের ফুলের সমারোহ সেখানে।
রাত ক্রমে গভীর হয়, হৃদির চোখে ঘুম নেই। সেই কণ্ঠ তাকে মোহগ্রস্ত করেছে। কয়েকবার মোবাইল তুলে নিয়েছে হাতে সুমনকে কল করবে বলে কিন্তু কী ভাববে ভেবে আর কল করেনি। পরদিন রাতে একটা রিং হতেই হৃদি ফোন ধরে, যেন অপেক্ষায় ছিল। কুশলাদি বিনিময়ের পর সুমন অন্য একটি কবিতা পড়ে শোনায়, হৃদি হতবাক! গত শীতে সে কক্সবাজার গিয়েছিল পরিবারের সাথে। সেখানে লিখেছিল এই কবিতা।
নাটোর থেকে একটা ট্রমা নিয়ে ঢাকায় এসেছে হৃদির পরিবার। স্বভাবিক জীবনে ফিরতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। একটু সুযোগ পেলেই হৃদিকে নিয়ে বেড়াতে যায় ওর পিতা মাতা। ইতিমধ্যে শ্রীমঙ্গল চায়ের বাগান ঘুরে এসেছে।পাহাড়ি জনপদ হৃদির ভালো লাগে। পাহাড়ে গিয়ে রুমানা হাসান কিছুটা আবেগে আপ্লূত হয়ে বলেছে, ‘হৃদি, জীবনকে জানতে হলে প্রকৃতির কাছে ধরা দিতে হয়।’ মায়ের অনেক কথাই হৃদির অজানা।
এভাবেই চলতে থাকে দুজনের কথোপকথন। হৃদি উত্তরায় একটি ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে, ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে পড়ছে। বয়সে কিছুটা বড় হলেও সুমন সুদর্শন আর অসম্ভব ভদ্রলোক। মাঝে মধ্যে ওরা ধানমন্ডি একটি কফি শপে দেখা করে, গল্প করে। এভাবে বছর দুয়েক কেটে গেল। সেদিন ফাল্গুনের এক সন্ধ্যায় হৃদি সুমনকে প্রপোজ করে। সুমন জানিয়ে দেয় সে এই নিয়ে ভাবছে না। সে জাস্ট ফ্রেন্ড ছাড়া অন্য কিছু না। হৃদি সামনে অন্ধকার দেখে।
কী করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। একটা ইয়লো ক্যাব ডেকে সেন্ট্রাল রোড বলে হৃদি গাড়িতে উঠে পড়ে। তার মাথা কাজ করছে না, এখন সে কী করবে? কোথায় যাবে? সুমন এতদিন বলেনি কেন সে বিবাহিত? ওদের একটি সন্তান আছে। ‘তাহলে আমার সাথে এতদিন কী করেছে? কখনও বুঝতে দেয়নি।এভাবে ফিরিয়ে দিবে ভাবেনি। উত্তরা এক নাম্বার সেক্টর পার হবার পর সুমনকে কল দেয় হৃদি, সুমন কল কেটে দেয়, আবার কল দিলে, ফোনেরসুইচ অফ, সন্ধ্যা নেমেছে চরাচর জুড়ে।
রিপনের কথা মনে হলো, সহপাঠী, ভালো বন্ধু, একসাথে প্রাইমারিতে পড়েছে আবার দেখা কলেজে। রিপন বেশ বেপরোয়া, ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডার। সেই উশৃংখল জীবন যাপন হৃদির পছন্দ নয়, এই কয়েক বছরে রিপনের অনেক পরিবর্তন।
সেদিন রিপন হৃদির বাসার এসে হাত ধরে বলেছিল,
‘চলো আমার সাথে, আজই কের্টে বিয়ে করব। তুমি যাবে কি না, তাই বলো।’
‘রিপন, তুমি আর ক’দিন অপেক্ষা করো। আমি তো চিরতরে ঢাকা চলে যাচ্ছি না। বাবা ঢাকা বদলি হয়েছে, আমি ওখানে গিয়ে পড়ব। আমাদের সামনে অনেক সময়, সবে ইন্টারমিডিয়েট পড়ছি। রিপন সেদিন হৃদির কথায় আস্থা রাখতে পারেনি। পরদিন আবার এসে বাড়ির সামনে হৈচৈ বাঁধিয়ে বসে। কণ্ঠ সপ্তমে, তুমি থেকে তুইতে নেমে আসে। ‘হৃদি, তুই যাবি কি না বল? আমি তোকে সত্যি ভালোবাসি। তোর বাপ আমার কাছ থেকে তোকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তুই এটাও বুঝিসনি।’ আরও অকথ্য ভাষায় কথা বলেছিল। রিপনের এহেন আচরণ হৃদি মেনে নিতে পারেনি।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে হৃদি বলেছিল, ‘তুই আমার ছোটবেলার বন্ধু, আমি তোকে কখনও ভালোবাসিনি। তুই এতটা নিচে নেমেছিস্, আমাদের মানসম্মান নিয়ে একটু ভাবলি না!” ততক্ষণে সেখানে লোকজন জড়ো হয়েছে।
‘তুই চলে যা রিপন, আর কখনও আমার সামনে আসবি না, আই হেট ইয়ু।’
রিপন আর কোনদিন আসেনি। এক মুঠো ঘুমের বড়ি মুখে পুরে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়ে। শত চেষ্টা করেও রিপনকে বাঁচানো যায়নি।
হঠাৎ কী হলো হৃদির মাথা কোন কাজ করছে না! সবকিছু এলোমেলো। সুমনকে আবার কল করে সুইচড অফ। ইয়োলো ক্যাব এয়াপোর্টের সামনে আসতেই ডান দিকের ডোর খুলে ব্যস্ত রাস্তায় ঝাঁপ দিলো, শুধু টের পেলো কতগুলো গাড়ির ব্রেকের শব্দ, একটি গাড়ির চাকা হৃদির পায়ের উপর দিয়ে চলে গেছে। ব্যস্ত রাস্তা থমকে গেল, চারিদিকে অন্ধকার।
দীর্ঘ একত্রিশ দিন পরে কোমা থেকে হৃদির জ্ঞান ফিরেছে। হাসপাতালে চোখ খুলে হৃদি হাসান দেখতে পায় রুমানা ইয়াসমিন, তোফাজ্জল হাসান, সুমন রহমান উৎকন্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শরীরের নিচের অংশ কাজ করছে না।বেডের পাশে একটি হুইলচেয়ার দাঁড়িয়ে আছে।