অরূপ ঘোষ
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
_____
নকুল বললো, ‘দাদা খাওয়াটা একটু কমাও।’ শুনে ভীম একটু ক্ষুণ্ন হলেন মনে হল। কিন্তু এসব আবালদের কথা বিশেষ কানে তুলতে নেই তাই খাসির মাংসের বাটিটা ভাতের ওপর ঢেলে মাখায় মনোনিবেশ করলেন।
দ্রৌপদীর এই এক ঢং হয়েছে, আজকাল খাসির মাংসে আলু দেয় না। খাসির মাংসে আলু না দিলে পোষায়!? নকুল আবার বললো, ‘দাদা এত রেড মিট খেও না’।
এবার আর ধৈর্য্য রাখতে পারলেন না ভীম। একে মাংসে আলু নেই, ওদিকে এই নকুল বেটা ডাক্তারের পোলা বলে নিজেকে বিরাট পন্ডিত ভাবে। হুংকার ছেড়ে বললেন, ‘এই চুপ থাক। তুই ক্ষত্রিয়? চেহারা দেখেছিস? মারবো কানের গোড়ায় এক, জ্ঞান দেওয়া বেরিয়ে যাবে।’
‘ও বৌদি, বৌদি, তুমি মাইরি মাংসে আলু দিচ্ছ না কেন?’
আসলে বিয়ের পর দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামী জোটার জন্য একটা নিয়ম করা হয়েছিলো। যে সময় উনি যার সঙ্গে থাকবেন সেই অনুযায়ী বাদবাকি ভাই সম্বোধন করবেন। ওই টার্মটায় দ্রৌপদী যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে থাকতেন, তো সেই সময় দ্রৌপদী বাকিদের বৌদি।
ওদিকে দ্রৌপদী এদিক ওদিক দেখে, পড়ে মাটন রোগান জুস বানিয়েছেন বেশ মন দিয়ে। আর জুস না জোস, যাই হোক ওটায় তো আলু দেবার কথা নেই। এই ভীমটা একথালা ভাত ছাড়া ক্রেটিভিটি বোঝেও না। একগাদা ভাতে মাংসের ঝোল মেখে পাতি লেবু টিপে না খেলে নাকি বাবুর রোববারের দিবানিদ্রাটা ঠিক হয় না।
যেমন আর পাঁচটা বৌদি দেওরদের মুখ ঝামটা দেয়, অমনি উনিও মুখঝামটা দিলেন। ‘খালি খালি আলু খেয়ে তো আলুর মত হচ্ছ। আজ বাদে কাল যুদ্দু হবে, তখন এরকম চেহারা নিয়ে পারবে ছুটোছুটি করতে? নকুল ঠিকই বলেছে, একটু কম খাও। দেখেছো আমার অর্জুনকে, কেমন সিক্স প্যাক বানাচ্ছে। সকালে জিম করে প্রোটিন শেক। তারপর স্মুদি। দুপুরে চিকেন সেদ্ধ এক কাপ ভাত। আর ডিমের কুসুম ফেলে ডিম। বিকেলে টিপ প্র্যাকটিস করে আবার প্রোটিন শেক। রাতে শুধু চিকেন সেদ্ধ। ডায়েট এরকম না হলে সিক্স প্যাক হবে?’
‘রাখো তোমার সিক্স প্যাক, গদা তুলতে পারবে?’ — এই বলে ভীম বললেন, ‘এই যে ভরা রাজসভায় বলে এলাম দুর্যোধনকে, উড়ু মানে ইয়ে থাই ভেঙে দেব, সেটা কি গান্ডিব দিয়ে ভাঙব?”
এটাও কথা।
এতক্ষণ যুধিষ্ঠির চুপ করে খাচ্ছিলেন। ইদানিং তিনি ভেগান হয়েছেন। আসলে সবাই প্যাঁক দিচ্ছিলো — ধর্মপুত্র প্রাণী হত্যা করে খায়, দুও দুও। উনিও ভেবে দেখলেন, হ্যাঁ কথাটা তো ঠিক। তো সেদিন থেকে উনি দ্রৌপদীকে বলে দিয়েছিলেন, ‘আমি আজ থেকে ভেগান।’
দ্রৌপদীর আইডিয়া ছিল না। উনি ভেবেছেন নতুন কোনো গান মানে বন্দুক ইমপোর্ট করবেন। ওটাই চালাবেন যুদ্ধে। কিন্তু তারপর যুধিষ্ঠির পুরোটা বুঝিয়ে দেবার পর দ্রৌপদীর তো মাথায় হাত।
বলে কি গো, গরুর দুধও নাকি খেতে পারবে না!? তাতেও নাকি হিংসে! আর কি এক হতচ্ছাড়া নাম বললো, আমন্ড মিল্ক না কি — সেটার কি দাম! একে জমি জমা সব ভোগে পাঠিয়ে দিয়েছে জুয়া খেলে, বলে কিনা জমানো টাকায় সংসার চলছে — এর মধ্যে এসব বাড়তি খরচ!’
এদিকে যুধিষ্ঠির কিছুতেই শুনবেন না। আওয়াজ দিয়েছে লোকজন, ব্যাস গেছে সব মাথায় উঠে। আজ কৃষ্ণ আসলে ব্যাপারটা বলতে হবে। সে গেছে পাঁচটা গ্রাম চাইতে। যদি দুর্যোধন দিয়ে দেয়, তাহলে চুলগুলো বিউটি পার্লারে গিয়ে কেটে আসা ছাড়া উপায়ও থাকবে না।
সহদেব বলেছে, ‘বৌদি তোমার চুলগুলো রাফ হয়ে গেছে। একটা স্পা করাতেই হবে!’ যা চার্জ হয়েছে এখন বিউটি পার্লারগুলোর! এদের তো আর সংসার চালাতে হয় না। বাড়ির বউকেই সব দিকে নজর রাখতে হয়। এদের আর কী? ওদিকে ফিক্সডের ইন্টারেস্ট দিন দিন কমছে, আর এদের বায়নাক্কা বাড়ছে।
আজ আসুক কৃষ্ণ, একটা পরামর্শ করতেই হবে।
এসব ভাবতে ভাবতেই হন্তদন্ত হয়ে কৃষ্ণের প্রবেশ হলো। ‘দেবে না,’ বললে কৃষ্ণ।
যুধিষ্ঠির কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, ‘ডাইরেক্ট রিফিউজ করে দিল?’
অর্জুনের মন বিক্ষিপ্ত ছিলো। গোলমরিচের গুঁড়ো খতম হয়ে গেছে। চিকেনসেদ্ধ গোলমরিচের গুঁড়ো ছাড়া পোষায় না! আর যদি কিছু বলতে যাও তো দ্রৌপদী বলে দেবে, ‘নিজে করে নাও।’
তো সে ক্ষেপে উঠে বললো, ‘এই সব তোমার জন্য দাদা। একটা জুয়াড়ি কী করে ধর্মপুত্র হয় কে জানে। সমাজের কী মোরালিটি! ওদিকে এবার সব দায় আমার। ভীমদা তাও দুর্যোধনকে দেখে নেবে। তুমি তো যুদ্ধে ঢপ মারা ছাড়া কিছুই করবে না আর ওই সখী দুটো! শালা সব দায় আমার।’
কৃষ্ণ বেগতিক দেখে বললেন, ‘আরে ভাই চাপ নিচ্ছিস কেন! আমি তো আছি!’
‘তুই কি যুদ্ধ করবি, বল?’ অর্জুন জিজ্ঞাসা করলো।
“না তা নয় কিন্তু আমিই তো সব, আমি তো তোদেরই দলে। ও ঠিক ম্যানেজ করে নেব। যা বলব করে যাবি চুপচাপ।’
‘হ্যাঁ তোর আর কি, শালা ওদের দেখেছিস সব কটা আছে আর এদিকে আমি, পুরো মার্বেল গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে একা আমি। না ভাই আমার হাতফাত কাঁপছে । দাদা চলো, বেকার দেবে না যখন বনে চলে যাই। এমনিও বনে ভালোই ছিলাম।’
ভীম চিৎকার করে উঠলেন, ‘শালা ছোটলোক, দ্রৌপদীর অপমানকে ভুলে গেলি, তোর লজ্জা করে না!’
‘ও শালা! চাইতে তো গেছিলি ৫টা গ্রাম! দিয়ে দিলে কোথায় যেত দ্রৌপদীর অপমান।’
কৃষ্ণ দেখলো বেগতিক। যে ভাবে এগোচ্ছে, কুরুক্ষেত্র তো এখানেই শুরু হয়ে যাবে। এমনিতে অসুবিধা নেই, কিন্তু তাহলে আমার গীতার কি হবে!
ওদিকে দ্রৌপদীও ভাবছেন — আরে কলা! এরা শুরু করেছে কি? এতোবড় চুল প্রতিদিন শ্যাম্পু করতে হচ্ছে। শুকোনোর জন্য ড্রায়ার ইউজ করতে গিয়ে চুল ড্রাই হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধটা চাই। তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গটা অন্যদিকে ঘোরাতে হবে।
উনি কৃষ্ণকে বললেন, ‘তুমি কি জানো যুধিষ্ঠির ভেগান হয়ে গেছে।পনির অবধি খাচ্ছেনা।’
‘সে কি! এ আবার কী ঢং বাপু’, বলেন কৃষ্ণ।
‘না মানে আমি তো ধর্মপুত্র তাই লোভের জন্য প্রাণী হত্যা করব না ভেবেছি।’
‘তুমি ধর্মপুত্র এটা কে বলল ভাই?’ বললেন কৃষ্ণ, ‘আর লোভ যদি না থাকে তো জুয়া খেলতে বসেছিলে কেন? তুমি ক্ষত্রিয়, গাতিয়ে খাবে যুদ্ধ করবে, তোমায় ধর্মের ব্যাপারে কে নাক গলাতে বলেছে?’
‘না মানে লোকজন বলছে, মানুষের দাঁত নাকি মাংস খাওয়ায় উপযুক্ত নয়।’
কৃষ্ণ এবার একটু অসহিষ্ণু হয়েই বললেন, ‘পুরাকাল থেকে মানুষ মাংস খেয়ে আসছে। আগে কাঁচা খেয়ে নিত, তারপর আগুন আবিষ্কার করে রোস্ট করা শিখল। এই তো হালে চাষবাস শুরু হয়েছে, আর বেদ জুড়ে যেখানে বলি আর বলি সেখানে তুই কি নাস্তিক হবি ভেগান হয়ে? এই দেখ, আমার মুখের মধ্যে আমি হাঁ করছি — দেখ, দেখ ইউরোপ আমেরিকা সব মাংস খাচ্ছে। যত্তসব!’
বলে উনি উঠে দাঁড়ালেন, আস্তে আস্তে নিজেকে বাড়াতে লাগলেন।
দ্রৌপদী সঙ্গে সঙ্গে এক ধমক, ‘যা করার বাইরে করো। মাথা গোঁজার একটা ছাদ ভাঙলে আবার একগাদা টাকা বেরোবে।’
‘আচ্ছা চল, তাহলে বাইরেই যাই।’
ওদিকে তখন ধৃতরাষ্ট্রর মনে এক গাদা বিরক্তি নিয়ে পায়চারি করছেন। এই জন্য বলে, সৎসঙ্গে স্বর্গবাস আর অসৎসঙ্গে সর্বনাশ। এই কর্ণর কথায় কি রিস্ক টা নিয়ে নিল! ওর না হয় রক্ষাকবচ আছে, তোর কি আছে! ধুর ধুর, ছাগলের বাচ্চা সব।
এসব ভাবতে ভাবতে উনি সঞ্জয়কে ডাকলেন।
‘এই সঞ্জয় দেখতো, ফেসবুকে পাণ্ডবদের কেউ কোনো নতুন পোস্ট দিলো কিনা! ওরা কি ভাবছে বুঝতেই তো পারছি না।’
সঞ্জয় — ‘নাহ সেরকম কোনো আপডেট নেই। শুধু সহদেব একটা ফটো লাগিয়েছে নিজের, ‘নিউ হেয়ার স্টাইল’ বলে।’
‘হুম। মুস্কিল হলো।’
‘স্যার টেলিস্কোপটা লাগাবো?’
‘লাগা।’
‘হ্যাঁ স্যার দেখতে পাচ্ছি। জঙ্গলে একটা দাড়িওয়ালা লোক মশাল হাতে। এটা আবার কি কেস?’
‘আরে শুয়ার, বাঁ দিকে না — ডান দিকে কানকি মার, গাধা সত্যজিতের সেটে ঢুকে পড়েছে।’
সঞ্জয় — ‘সরি স্যার’ — বলে টেলিস্কোপটা ঠিক করতে যাবে, ওদিকে দুর্যোধনের চিৎকার — ‘ফেসবুক পোস্ট হয়ে গেছে! ভীম করে দিয়েছে — যুদ্ধ!!’
_____
Bhalo laglo.tabe atobar ‘shala’ word ta use na korleo cholto.jatoi modern hok mahabharat sambandhe amader akta durbolata ache.
আচ্ছা পরের বার থেকে খেয়াল রাখবো। ধন্যবাদ
ভালো লাগলো রম্যরচনা! অর্থবহ!