আজমল হুসেন
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
_____
শুরুতেই নিজের ব্যাপারে কিছু কথা বলা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। এতে আশা করি লেখার এই বিষয়টা কেন বেছে নিলাম তা পাঠকের বোধগম্য হবে। আমি দুজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মীর সন্তান। তাঁরা দুজনই পেশায় শিক্ষক। বরাবরই এঁদের একজনের উপার্জন আমাদের ভাইবোনদের লালন পালনে, আর অন্যজনের উপার্জনের প্রায় পুরোটাই পরিবারের বাইরে অন্যের প্রয়োজন মেটানোর জন্য, বিশেষ করে আশেপাশে বসবাসকারী সুবিধাবঞ্চিত মানুষের হিতার্থে খরচ হতে দেখে এসেছি।
অন্য শিশুরা যেমন মা-বাবাকে সবসময় কাছে পেয়ে থাকে, শৈশবে আমি কিন্তু তাঁদেরকে ঠিক তেমনভাবে কাছে পাইনি। তাঁরা মনে করতেন নিজের বাড়িতে থাকলে আমার শিক্ষা-দীক্ষা সঠিকভাবে হবে না, কারণ বাড়ির পরিবেশটা পড়ার উপযোগী ছিল না। তাই আমার থাকার ব্যবস্থা ছিল অন্যত্র। বোধোদয়ের পর প্রথম দুটো দশক তাঁদেরকে কাছে না পেয়ে আমার অভিমান ছিল পাহাড়প্রমাণ। অফুরন্ত ক্ষোভ ও অভিমানের মধ্যেও আমার মন বাড়ির বাইরে ঠিক এঁদেরকে নিয়েই ভাবত। এঁদেরকেই খুঁজতাম আমি মানুষের মধ্যে। যথারীতি এঁদের মতো মানুষের সঙ্গেই আমার আবেগ জড়িয়ে থাকত সর্বাধিক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষকরাই এই আবেগের জায়গা জুড়ে থাকতেন। এঁদের একেকজন ছিলেন অত্যন্ত যত্নবান, অসম্ভব স্নেহপরায়ণ এবং ছাত্রবৎসল। এঁরাই আক্ষরিক অর্থে ছিলেন ‘প্যারেন্টস এওয়ে ফ্রম হোম।‘ কর্মজীবনের প্রারম্ভে অনেক সময় বর্ষীয়ান সহকর্মীরা সেই জায়গা নিতেন। আর আজকের দিনে যখন তিন দশকের কর্মজীবন পেছনে রেখে এসে আমি নিজেই বর্ষীয়ান, আমার মনের সেই আবেগের জায়গা নিয়েছেন এমন কিছু মানুষ, যাঁরা দীর্ঘ কর্মজীবনের গৌরবময় অধ্যায় পেরিয়ে এখন অবসরোত্তর জীবনে পুরোদস্তুর সমাজকর্মী হিসেবে রাস্তায় নেমে একেবারে তৃণমূল স্তরে এসে জনহিতাৰ্থে কাজ করছেন। ঠিক যেমনটা করতে দেখেছি নিজের মাতাপিতাকে, ঠিক যেমনটা কাজ করছেন আমাদের এই দ্বিতীয় বৃত্তের কর্ণধার ড. পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় – যিনি কিনা আমার মতো অনেকের পরমপ্রিয় দাদা।
তবে এই ধারাবাহিকে আমার প্রথম লেখাটা অন্য একজনকে নিয়ে। তিনি হলেন এরকম আরেকজন অগ্রজ বন্ধু, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, নাট্যকার, বাচিক শিল্পী, গায়ক, অভিনেতা এবং সর্বোপরি সমাজকর্মী ড. অরিন্দম গুপ্ত। তাঁকেও আমি দাদা বলেই সম্বোধন করি এবং মন থেকেও তাই মানি। অরিন্দমদার শিকড় ওপার বাংলার বরিশালে হলেও জন্মেছেন ভারতের জামশেদপুরে। অত্যন্ত বৈভবের মধ্যে বেড়ে উঠলেও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি দরদ এবং তার সঙ্গে জুড়ে থাকা সমাজসেবা যেন অস্তিমজ্জায়। এটাকে ওঁর পারিবারিক ঐতিহ্যও বলা যায়। আগের প্রজন্ম ওপার বাংলার এক সম্প্রীতিময় সহাবস্থানের পরিবেশে কাটিয়ে তারপর দেশভাগের অভিশাপ বুকে বয়ে নিয়ে এদেশে পাড়ি দেন। তবে এদেশে ওঁর উচ্চশিক্ষিত বাবা্র কর্মসংস্থানের অভাব হয়নি। টাটা আয়রন অ্যান্ড ষ্টীল কোম্পানীতে এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজেও নিজেকে জড়িয়ে রাখতেন।
এরকমই সমাজমুখী এবং সহমর্মিতার বাতাবরণে অরিন্দমদার জন্ম ৪ এপ্রিল ১৯৫৩ সালে। এলাকাবাসী সবাই ছিলেন ওপার বাংলা থেকে আগত, তাই জায়গার নাম হয়ে যায় ‘ইস্ট বেঙ্গল কলোনী’। প্রারম্ভিক শিক্ষা জামশেদপুরের অমল সঙ্ঘ নামক স্থানীয় এক প্রতিষ্ঠানে। তারপর রামকৃষ্ণ মিশনে তৃতীয় থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। স্কুল জীবনের শিক্ষা সমাপ্ত হয় পিপলস আকাদেমি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে। উচ্চশিক্ষার জন্য এরপর জামশেদপুর থেকে চলে আসেন কলকাতায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর কিছুদিন কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৯৭৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েই ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য গবেষণা গ্রন্থ জমা দেন। তারপর কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭৬ সালে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। এখানে কর্মরত অবস্থাতেই ১৯৭৮ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রিও লাভ করেন। দীর্ঘ এই কর্মজীবনে দেশে বিদেশে বহু জায়গায় গবেষণা পত্র পড়া কিংবা বক্তৃতা দেওয়ার জন্য ডাক আসত। একইভাবে বেশ কিছু সমাজসেবী সংস্থার সঙ্গেও কর্মজীবনেই নিবিড় যোগাযোগ হয়, এবং বিভিন্ন সময়ে এসব কাজে সক্রিয়ভাবে সাহায্যও করেন। অধ্যাপনার চাকরি থেকে অবসর নেন ২০১২ সালে।
কর্মজীবনে অরিন্দমদা সহকর্মী ও ছাত্রদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। এঁদেরকে ঘিরেই ছিল ওঁর সবকিছু। কিন্তু অবসরের পর প্রথমবারের মতো নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হয়। সেই নিঃসঙ্গতা কাটাতেই প্রান্তিক শিশুদের জন্য একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার ভাবনা আসে। এদিক ওদিক অনেক দেখাশোনা ও কথাবার্তার পর জমি পাওয়া যায় পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জে। এভাবেই Assay Indian Model School (AIMS) এর গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১২ সালে। পাঁচ বছর পর ট্রাস্টিদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং স্থানীয় সমাজমুখী শিক্ষাপ্রেমী মানুষের সক্রিয় সহযোগিতায় ৪২ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে AIMS এর যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালে। এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিযুক্তির ক্ষেত্রে সমাজসেবার দিকে ঝোঁক আছে কি না সেটা বাছাইয়ের একটি অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে ধরা হত, আজও তাই হয়।
প্রথমদিকে ছাত্রছাত্রী যোগাড় করা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল। তার মূল কারণ স্কুলের আশেপাশে মুসলমান এবং রাজবংশী অধ্যুষিত এলাকায় শিক্ষা সচেতনতার অভাব। বিশেষত, মুসলমানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে ছিল শুধু মসজিদ আর খারিজি মাদ্রাসা। ওসবে ধর্মীয় শিক্ষা আর কোরান পাঠ ছাড়া আর কিছুই হত না। খারিজি মাদ্রাসাগুলির সরকারি অনুমোদন নেই, যথারীতি সরকারি অনুদানও নেই। তবে এই মাদ্রাসা পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু গরিব মুসলিম পরিবারের সন্তানদের জন্য বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করে চলেছে বলে অনেকেরই দাবি৷
এখানে পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক ছবিটার উপর কিছুটা আলোকপাত প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। এই রাজ্যে মূলত তিন ধরনের মাদ্রাসা রয়েছে৷ এক, সরকারি অনুমোদন ও আর্থিক অনুদান প্রাপ্ত ৷ দুই, সরকারের স্বীকৃতি পেলেও অনুদান থেকে বঞ্চিত এবং তিন, সরকারি অনুমোদন নেই ও অনুদান পায় না এমন মাদ্রাসা ৷ এই তৃতীয় ধারাটিই খারিজি বা নিজামিয়া মাদ্রাসা নামে পরিচিত৷ রাজ্যে প্রথম শ্রেণির মাদ্রাসাগুলি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থারই অংশ৷ সরকারি অনুমোদন ও অনুদান দুটোই পায় ৷ এসব মাদ্রাসার মধ্যে সর্বাধিক আছে ‘হাই মাদ্রাসা’ বেশ কিছু সংখ্যক সিনিয়র মাদ্রাসা এবং অল্প সংখ্যক জুনিয়র হাই মাদ্রাসা৷ এ সব হাই মাদ্রাসা পরিচালনা করে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড৷ অন্যান্য মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীরা যা পড়ে তার সবকিছুই পড়ানো হয় এখানে, আর বাড়তি ইসলাম ধর্ম ও আরবি ভাষা শিক্ষার সুযোগ থাকে এইসব মাদ্রাসায়৷ তবে হাই মাদ্রাসায় উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ইসলামিক শিক্ষার সুযোগ নেই, কারণ এই পর্যায়টি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ পরিচালনা করে৷ বেশ কিছু হাই মাদ্রাসাও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে উন্নীত হয়েছে৷ যাইহোক, আমার এই লেখায় খারিজি মাদ্রাসাই মূলত প্রাসঙ্গিক৷ এইসব মাদ্রাসাকে ঘিরে বারবার প্রশ্ন ওঠে, বিতর্ক হয়, রাজনীতিও সরগরম হয় ৷ কিন্তু রাজ্যের মোট জনসংখ্যার মোটামুটি এক-চতুর্থাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের আর তাদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে এই মাদ্রাসাগুলির উপযোগিতার কথা অনেকেই দাবি করেন ৷ অথচ সরকারি অনুদান ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া পরিচালিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত মান নিয়ে বলার মতো তেমন ইতিবাচক কিছু নেই ৷ বিশেষত, কর্মসংস্থানের মূল স্রোতের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষারও তেমন কোনো সম্পর্ক নেই।
মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসার আগে আরও কিছু কথা বলা দরকার। সচ্ছল মুসলিমদের জাকাত বা দানের টাকায় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি চলে৷ এগুলোতে মূলত ধর্মীয় শিক্ষাই দেওয়া হয়, দরিদ্র মুসলিম পরিবারগুলি যার উপর সঙ্গত কারণেই নির্ভরশীল৷ গরিব মুসলিম পরিবারে অভিভাবকদের কাছে মূলস্রোতের বিদ্যালয় বা এরকম ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভাজন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই৷ মসজিদ লাগোয়া ছোট ঘরে যে পঠনপাঠন চলে, তার উপরই ভরসা রাখে এইসব গরিব মুসলমান পরিবার৷ এইসব কারণেই অরিন্দমদার মতো নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবী শিক্ষকের কাছেও প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাসকারী গরিব মুসলমান অভিভাবকদের কাছ থেকে ভরসা আদায় করে ছেলেমেয়েদের স্কুলমুখী করা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল। বিশেষত, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিকাঠামো এখনও সে অর্থে গড়ে ওঠেনি, তেমন প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে ধর্মাশ্রিত এই ব্যবস্থার উপরই সরল ধর্মপ্রাণ মানুষের প্রাথমিক আস্থা থাকে৷ এছাড়াও অন্নসংস্থানের একটা বড় সুবিধা থাকে এইসব প্রতিষ্ঠানে৷ গরিব ঘরের সন্তানরা আবাসিক খারিজি মাদ্রাসায় গিয়ে পড়াশোনার সঙ্গে পেট ভরে খেতে পেলে সহজে তা ছেড়ে আসতে চায় না ৷ এর সঙ্গে ধর্মীয় গোঁড়ামি তো আছেই। অনেক অভিভাবক প্রজন্ম পরম্পরায় এই শিক্ষাব্যবস্থার শরিক থাকায় নতুন প্রজন্মকেও তাঁরা খারিজি মাদ্রাসায় পাঠাতে পছন্দ করেন৷ আবার কেউ কেউ সচেতনভাবেই সন্তানকে হাফেজ, মৌলানা, ইমাম বা মোয়াজ্জেম বানিয়ে পরম্পরায় বহমান ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে জড়িত রাখতে চান৷ ধর্মীয় সংখ্যালঘু-মানসে সমষ্টি চেতনা আরেকটা বিরাট সমস্যা, আর পশ্চিমবঙ্গের পিছিয়ে পড়া মুসলমানরা এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নন৷ এতসব সমস্যার মোকাবিলা করেও অরিন্দমদার মতো মানুষ নিরলস প্রয়াস চালিয়ে গেছেন বছরের পর বছর। সময়ান্তরে তাঁর নেতৃত্বে গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘদিনের এই অধ্যবসায় ও নিরন্তর পরিশ্রমের ফলস্বরূপ অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্যও এসেছে। এরকম সাফল্যের কিছু ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করছি এখানে।
বর্তমানে স্থায়ী বাসস্থান কলকাতার টালিগঞ্জ চত্বরে হলেও অরিন্দমদার মূল কর্মস্থল ওঁর এবং সহযোগীদের দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমের ফল রায়গঞ্জের এই মডেল স্কুল। AIMSএ বর্তমান প্রজন্মের সকল ছাত্রছাত্রী অরিন্দমদাকে ‘স্যার দাদু’ বলে ডাকে। আর ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের স্যার দাদুর আদরের নাতি-নাতনি। এ এক অনন্য শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক, যার ভিত্তি এক অনন্য শিক্ষানীতি। এই শিক্ষানীতি অনুযায়ী শিক্ষাদানের পদ্ধতিটাও অভিনব, যেখানে স্নেহ-ভালবাসা আর বাৎসল্যই শিক্ষাদানের প্রাথমিক মাধ্যম।
উত্তর দিনাজপুরের কামারতোর গ্রামের ছেলে তৌকির রেজা। ওর বাবা একজন মৌলানা, বাড়ি থেকে চার কিলোমিটার দূরে বিহার সীমান্তের ওপারে একটি মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষক। ওঁর যৎসামান্য রোজগার, ওইটুকু দিয়েই চলে টানাটানির সংসার। এরকম পরিস্থিতিতে নিজস্ব রোজগারে সন্তানদের মূলস্রোতের শিক্ষায় শিক্ষিত করার কেবল স্বপ্নই দেখা যায়, বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো যোগ নেই। এক সময় AIMS-এর ছাত্র তৌকির ও ওর ছোট ভাই তৌহিদ তাদের স্যার দাদুর কাছেই পড়ত। ওঁরই স্নেহে আদরে দুজন বড় হয়েছে। তাদের স্যার দাদুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর নিজেদের অধ্যবসায়কে সম্বল করেই তৌকির ও তৌহিদ আলামীন মিশনের মতো উৎকৃষ্ট মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেয়েছে। বর্তমানে তৌকির সাঁতরাগাছি আল আমিন মিশনে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। আর তৌহিদ বেলপুকুর আল আমিন মিশনে নবম শ্রেণির ছাত্র।
আল আমিন মিশনের প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী তৌকির শুধু যে লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী, তা কিন্তু নয়। ও নাকি নাচ গান খেলাধুলো সবেতেই চৌকস। এক সময় কচি শৈশবের সেই আদর-গেলা কোঁৎকা তৌকির আস্তে আস্তে চোখে মুখে বুদ্ধিদীপ্তি নিয়ে হয়ে ওঠে অপরূপ সুন্দর এক কিশোর। কিন্তু সে তখনও স্যার দাদুর আদুরে গোপাল হয়েই থাকে। ছুটি পেলেই ওর সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্য স্যার দাদুর কলকাতার বাড়ি। দাদু-নাতি উভয়েরই মধুর কণ্ঠস্বর। লেখাপড়ার পাশাপাশি মাঝে মাঝে স্বাদ বদলের জন্য তৌকির ও ওর স্যার দাদু পরস্পরকে যথাক্রমে কোরান কেরাত (সুরেলা আবৃত্তি) ও গীতা পাঠ করে শোনান।

মানুষের কাছে পরস্পরকে ভালোবাসার মতো একটা মন থাকলে তবেই পরস্পরকে জানা সম্ভব। আর ঠিক এভাবেই একে অন্যের কৃষ্টি-সংস্কৃতির ব্যাপারে স্বচ্ছ এবং নির্মোহ ধারণা করা সম্ভব। স্যার দাদু আর তাঁর প্রাণগোপালরা ঠিক এমনই এক দৃষ্টান্ত রাখতে পেরেছেন তাঁদের সম্পর্কের মাধ্যমে, এক অমোঘ অটুট বন্ধনের নজির স্থাপন করে।
এক গরিব ধার্মিক মুসলমান পরিবারের ছেলে তৌকির তার পরমপ্রিয় স্যার দাদু অরিন্দম গুপ্তর কাছে আসে পঁচিশে ডিসেম্বর বড়দিন উদযাপন করতে! সম্প্রীতি, সহমর্মিতা বা শান্তিপূর্ণ আনন্দময় সহাবস্থানের এমন নজির দেখার পর এ ব্যাপারে আর কীই বা বলার থাকে! কুরবানির ছুটিতেও তৌকির চলে আসে কলকাতায় তার স্যার দাদুর বাড়িতে। গভীর রাত অবধি জেগে পড়াশোনা করে, তাই ওর পড়ার ঘর আলাদা করে দেন স্যার দাদু। যে কটা দিন ওঁর সঙ্গে থাকে, তৌকিরের জন্য স্যার দাদুকে দিনে বেশ কয়েকবার কফি বানাতে হয়, কারণ ও কফি খেতে খুব ভালবাসে।
মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করেও স্যার দাদুর প্রাণগোপাল, সোনা নাতি তৌকির তাঁরই বাড়িতে আসে ছুটি কাটাতে। ওঁর কাছে উচ্চ মাধ্যমিকের পড়া শুরু করে দিতে চায় উচ্চ মেধার ছাত্র তৌকির। শিশুকাল থেকেই স্যার দাদুর কাছে ওর লেখাপড়া। তৌকিরের স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া। একাদশ শ্রেণি থেকেই মেডিকাল জয়েন্টের প্রস্তুতি নিতে চায় সে। তাই ওর স্যার দাদু আগাম ওকে প্রয়োজনীয় বইপত্র কিনে দিয়ে পড়া শুরু করিয়ে দেন ।

আল আমিন মিশনের ছাত্রছাত্রীরা ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষায় বেশ কয়েক বছর ধরে সারা ভারতের মধ্যে সেরা ফল করে চলেছে। এই মিশনে কেবল মুসলমান নয়, সব ধর্মের ছাত্রছাত্রীরাই লেখাপড়া করে। তৌকিরের কথায়, বায়োলজি আর কেমিস্ট্রিতে নাকি প্রথম থেকেই ভীষণ জোর দেওয়া হয়। তাই এখানে সাফল্যের হার এত ভাল। দিনে সাড়ে পাঁচ ঘন্টা পড়াশুনো, এছাড়া স্কুলের ক্লাসগুলো তো আছেই।
তৌকির আর তৌহিদের মতোই আরেক অসম্ভব মেধাবী শিশু শাহবাজ আলম এখন বেলপুকুর আল আমীন মিশনের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। আরও অনেক সুবিধাবঞ্চিত শিশুর মতোই শাহবাজকে অরিন্দমদা প্রথম নিয়ে আসেন তাঁর নিজস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান AIMSএ। শাহবাজের বাবা মহবুল হক ছিলেন একজন অল্প মাইনের সিভিক পুলিশ। কাজ করতেন এন.এইচ ৩৪এ। তাঁর সামর্থ্য না থাকলেও মেধাবী ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। স্বপ্ন দেখতেন তাঁর মেধাবী পুত্র একদিন আল আমিন মিশনে পড়বে এবং পরে ডাক্তার হবে। অরিন্দমদার সঙ্গে ছেলের লেখাপড়া নিয়ে প্রায়ই কথা বলতেন শাহবাজের বাবা। কিন্তু বিধি বাম! ২০২৪ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি এক উদ্দাম দানবীয় ট্রাক হাইওয়ের ওপরে শাহবাজের বাবাকে পিষে দিয়ে চলে যায় । বাবার এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে ছোট্ট শিশু শাহবাজ ভয়ে হতাশায় চুপ করে যায়। শোকে পাথর হয়ে স্নান-খাওয়া বন্ধ করে দেয়। ওর বাবা ওর চোখে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিলেন। সেটা আর হবে না ভেবেই হয়তো এমন চিন্তা থেকে শাহাবাজ একটা সময় কথা বলাও বন্ধ করে দেয়, শোকে বোবা হয়ে যায়। স্কুলে আসা বা লেখাপড়ায়ও শাহবাজ উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।

কিন্তু হতাশায় চুপ হয়ে যাওয়া শাহবাজের স্যার দাদু রোজ ফোন করে ওর সঙ্গে কথা বলতেন, অভয় দিতেন। এমনকি তিনি স্কুলের পরিচালন সমিতির প্রাক্তন কর্ণধার শ্রী শ্যামলাল মাহাতোকেও জানান তাঁর মনের কথা। বলেন যে, শাহবাজের বাবার স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রাখা দরকার যে কোনো মূল্যে।
নিয়মিত কাউন্সেলিং করে অনেক চেষ্টার পর এক সময় তাঁর প্রাণপ্রিয় নাতি শাহবাজকে লেখাপড়ায় ফেরাতে সফল হলেন ওর স্যার দাদু। ওকে আবার জীবনের স্রোতে ফিরিয়ে আনার পর স্যার দাদুর দৃঢ় অঙ্গীকার – দেশের অমূল্য সম্পদ মেধাবী শাহবাজ যতদূর পড়তে চায় তিনি পড়াবেন।
এরপর শাহবাজকে কলকাতায় নিজের কাছে নিয়ে আসেন ওর স্যার দাদু। ওকে অঙ্ক, ইংরেজি এবং ই.ভি.এস পড়াতে শুরু করেন। একসময় ওকে পুরোপুরি তৈরি করে আল আমিন মিশনের অ্যাডমিশন টেস্টে বসান। প্রবেশিকায় অভাবনীয় ফল করে শাহাবাজ। যথাসময়ে ওকে কাউন্সেলিংএ ডাকা হয় এবং ও ভর্তি হয়ে যায় বেলপুকুর আল আমিন মিশনে। শুরু হয়ে যায় শাহবাজের হস্টেল জীবন ওর বাবার স্বপ্নকে সঙ্গী করে। আল আমিন মিশনে শাহাবাজের হস্টেল এবং লেখাপড়ার সমস্ত খরচের দায়িত্ব নিয়েছেন ওর পরমপ্রিয় স্যার দাদু। ওঁর দৃঢ় বিশ্বাস, আগামী ছয় বছরে শাহাবাজ প্রয়োজনীয় প্রবেশিকায় উত্তীর্ণ হয়ে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে যাবে। সম্প্রতি শাহবাজের ছোট বোন সাদিকাও তার দাদার প্রাক্তন স্কুল AIMSএ ভর্তি হয়েছে। অরিন্দমদার বক্তব্য, সাদিকাও নাকি শাহবাজের মতোই বুদ্ধি ধরে।

স্যার দাদুর প্রাণগোপাল শাহবাজের মায়ের চাকরির জন্য শ্যামলাল বাবুও আপ্রাণ চেষ্টা করেন, এবং হালে ওঁর স্বামীর জায়গায় সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরি হয়েও যায়। তার আগে শাহবাজ ও সাদিকা দুর্ঘটনায় পিতৃহারা হওয়ার পর থেকে পুরো পরিবারটারই ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন অরিন্দমদা।
বর্তমানে ইটাহার আল আমীন মিশনের ছাত্র আসলামও এরকমই এক অকালে পিতৃহারা শিশু। তৌকির-তৌহিদ-শাহবাজদের মতোই ও আগে AIMSএ পড়ত। ওর বাবা আবু একটা মুড়ি-ঘুগনি-চপের দোকান চালাতেন। কোভিডের সময় হঠাৎ আবুর মৃত্যু হয়। আসলামের মামার বাড়ির লোকজন তেল-ডাল-নুন দিয়ে কোনমতে সংসারটা চালানোর ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু সদ্য পিতৃহারা আসলামের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার মতো সামর্থ্য তাঁদেরও ছিল না। সেটার দায়িত্ব নেন অরিন্দমদা। অসম্ভব মেধাবী আসলাম আরও অনেক সতীর্থদের মতো একদিন আল আমীন মিশনের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ওর পারিবারিক অবস্থার কথা মিশনকে জানানোর পর কর্তৃপক্ষ ওর লেখাপড়ার যাবতীয় খরচ মকুব করে দেন। তবে স্কুলের ড্রেস, বই, খাতাকলম প্রয়োজন অনুযায়ী আসলামের স্যার দাদুকেই কিনে দিতে হয়।

এরকম আরও বহুসংখ্যক সোনা নাতি-নাতনিদের অত্যন্ত প্রিয় এই স্যার দাদু প্রতিবছর পয়লা বৈশাখ ওদের নিয়ে করণ দিঘির মেলায় যান। নতুন পোষাক, হাবিজাবি খাওয়া, নাগরদোলা, মিনি সার্কাস এবং আরও বহু আমোদ ও হৈ হুল্লোড়ে কাটে সারা দিন। একইভাবে আবার খুশির ইদের সময় সোনা নাতি-নাতনিরা তাদের স্যার দাদুর জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকে।
অরিন্দমদাকে দেখে, তাঁর কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানলে মনে হয় মুসলমান সমাজের শিশুদের নিয়ে তিনি অনেক বেশি আগ্রহী। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তাঁর বক্তব্য – এই সম্প্রদায়ে এতসব উচ্চমেধার শিশু রয়েছে যে নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব। অন্যদিকে, গরিব মুসলিম সমাজে পারিবারিক স্তরে শিক্ষা সচেতনতার ভীষণ অভাব। তাই সঠিক সময়ে এদের প্রতি মনোযোগ না দিলে এরা অংকুরেই বিনাশ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আসলামের মা অসম্ভব বুদ্ধিমতী একজন মহিলা। একটা নামী স্কুলে ফার্স্ট গার্ল ছিলেন। কিন্তু স্কুলের শিক্ষকদের হাজার আপত্তি সত্ত্বেও ক্লাস এইটে পড়াকালীনই বাড়ি থেকে ওঁকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। অরিন্দমদার ধারণা, আসলামের মেধা ও বুদ্ধিমত্তা মায়ের দিক থেকেই বংশানুক্রমে এসেছে। এরকম কত প্রতিভা যে বিকশিত হওয়ার সুযোগই পায়নি, কত শিশু বিশেষত কন্যা সন্তান যে শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং আজও হয়ে চলেছে তার ইয়ত্তা নেই। আর এইসব বিষয়ই অরিন্দমদার মতো কিছু মুক্তমনা একনিষ্ঠ সমাজকর্মীকে পিছিয়ে পড়া মুসলমান সমাজের দিকে অধিকতর মনোযোগী করে।
যে সমাজটাকে আজকের দিনে প্রায়শই অকারণে সাম্প্রদায়িক হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণার উৎসবে মাতোয়ারা থাকতে দেখা যায়, সেই সমাজে অরিন্দমদার মতো এরকম ছাত্রবৎসল স্যার দাদু এবং তাঁর সোনা নাতি-নাতনিদের স্নেহমায়ার বন্ধন যেন এক মরূদ্যান । এঁদের উপস্থিতি হাজার হতাশাজনক পরিস্থিতিতেও এভাবেই এক আলোময় ভবিষ্যতের প্রত্যয়ে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, এই কামনাই করি নিরন্তর আন্তরিকতায়।
_____