ফারজানা নাজ শম্পা
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, কানাডা
বাংলাদেশ ও বাংলার মানুষ উৎসবপ্রিয় জাতি। উৎসব মানে কী? সংস্কৃতে অনুষ্ঠানকে ‘উৎসব’ বলা হয়। ‘উৎ’ অর্থ ওঠানো বা উত্তোলন করা, ‘সব’ অর্থ সকল। জীবনসংগ্রামে রত মানুষের জীবনের উৎসব বয়ে আনে বৈচিত্র্য, সম্প্রীতি ও শান্তি আর আনন্দের ফল্গুধারা। ঈদ, দুর্গাপূজা, বৌদ্ধ পূর্ণিমা, বইমেলা, কারুশিল্প উৎসব , পহেলা বৈশাখ—এই উৎসবগুলো বাংলাদেশের জনজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এছাড়া বছরব্যাপী সারাদেশে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রতি মাসে নাটক, থিয়েটার, পথনাটক, নৃত্যানুষ্ঠান, স্কুল-কলেজের বার্ষিক উৎসব, কবিতা উৎসব , বিজ্ঞান মেলা, বৃক্ষ মেলা ইত্যাদি বিভিন্ন আয়োজন উদযাপিত হয়। এই উৎসব. আমাদের আত্মপরিচয়, সামাজিক বন্ধন ও সৃজনশীলতার প্রতীক। বাংলাদেশের সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উৎসব নিয়ে সামান্য আলোকপাত করা হলো।
ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে আসে বাংলাদেশের দুটি ঈদ। মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ঈদুল ফিতর রমজান মাসের শেষে শাওয়ালের প্রথম দিনে পালিত হয়। এক মাস রোজা রাখার পর এই দিনটি আসে আত্মশুদ্ধির আনন্দ নিয়ে। ঈদের সকালে ঈদগাহে নামাজ আদায়, নতুন পোশাক পরা, সেমাই-হালুয়া খাওয়া, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও দান-খয়রাতের, যাকাতের মাধ্যমে সমাজে দানশীলতা আর ভ্রাতৃত্ববোধ জাগে।ঈদুল আজহা কুরবানির ঈদ নামে পরিচিত। জিলহজ মাসের দশম দিনে এটি পালিত হয়। হজরত ইব্রাহিম (আ.)–এর আত্মত্যাগের স্মরণে পশু কুরবানি করা হয়। কুরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করে আত্মীয়, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এই উৎসব সামাজিক সমতা ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়। চাঁদরাত, শবে কদর, শবে বরাত, আখেরি চাহার শোম্বা ইত্যাদি ইসলামী সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ঈদের আবহকে আরও বর্ণিল করে তোলে।
বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত এই উৎসব চলে। দেবী দুর্গার আগমন ও অসুর নিধনের পৌরাণিক কাহিনিকে কেন্দ্র করে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপ সাজানো, আরতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রসাদ বিতরণ—সব মিলিয়ে এটি এক মহোৎসব। দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় নয়, এটি সামাজিক মিলনমেলা। মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সব সম্প্রদায়ের মানুষ এই উৎসবে অংশ নেয়। কালীপূজা, সরস্বতী পূজা, রথযাত্রা, দোলযাত্রা, লক্ষ্মীপূজাও হিন্দু ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে।
বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রধান ও পবিত্রতম ধর্মীয় উৎসব। এই দিনে বাংলাদেশের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহার ও মঠে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—বুদ্ধের উদ্দেশে ফুল পূজা, প্রদীপ প্রজ্বালন, বুদ্ধমূর্তি দান ইত্যাদি। রাজবন বিহার, চট্টগ্রামের নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহার, কক্সবাজারের বিভিন্ন বিহার এবং ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার (সবুজবাগ, বাসাবো) ও মেরুল বাড্ডার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে বিশেষ আয়োজন থাকে।
বড়দিন বা ক্রিসমাস খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব, যা পালিত হয় ২৫ ডিসেম্বর। যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন হিসেবে এটি উদযাপন করা হয়। গির্জায় প্রার্থনা, ক্যারল গান, উপহার বিনিময়, আলোকসজ্জা ও ক্রিসমাস ট্রি সাজানো হয়। বাংলাদেশে খ্রিস্টান সম্প্রদায় ছাড়াও অনেক মানুষ বড়দিনে অংশ নেয়। শান্তি, প্রেম ও মানবতার বার্তা বহন করে। বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোর চার্চ, হোটেল ও সামাজিক পর্যায়ে বড়দিন উপলক্ষে নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় l
অমর একুশের বইমেলা—জ্ঞান, সাহিত্য ও ভাষার উৎসব। বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা থেকে জন্ম নেওয়া এ অসাধারণ উৎসবটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাহিত্য উৎসব। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে মেলা শুরু হয় ১৯৭২ সালে আর আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮৪ সালে। একুশের বইমেলায় প্রকাশক, লেখক, পাঠক, গবেষক, সাংবাদিক—সবাই একত্রিত হন। নতুন বই প্রকাশ, লেখক-পাঠক আড্ডা, আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ, শিশু চত্বর—সব মিলিয়ে এটি এক বর্ণিল সাংস্কৃতিক আয়োজন। বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি ভাষা, জ্ঞান ও মুক্তচিন্তার প্রতীক।
বাংলাদেশের উপজাতীয় উৎসব পাহাড়ি সংস্কৃতির রঙ ও বৈচিত্র্যের স্বরূপ তুলে ধরে। ময়মনসিংহ, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত গারো, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎসব রয়েছে। বৈসাবি (বৈসু, সাংগ্রাই, বিজু) চাকমা-মারমা সম্প্রদায়ের নববর্ষ উৎসব। জুম উৎসব, ফল উৎসব, নৃত্য উৎসব, ধর্মীয় পূজা—সব মিলিয়ে পাহাড়ি সংস্কৃতি বৈচিত্র্যময়। এসব উৎসব আদিবাসী পরিচয়, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক ও সামাজিক ঐক্য প্রকাশ করে।
পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব। প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এটি উদযাপিত হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা, পান্তা-ইলিশ, হালখাতা, গ্রামীণ মেলা, লোকসংগীত, নৃত্য, আলপনা—সব মিলিয়ে এটি এক প্রাণবন্ত উৎসব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কো কর্তৃক Intangible Cultural Heritage হিসেবে স্বীকৃত। গ্রামে-গঞ্জে হালখাতা ও মেলা আয়োজনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা নতুন বছরের সূচনা করেন। পহেলা বৈশাখে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে সবাই অংশগ্রহণ করে। এই উৎসব জাতীয় ঐক্য, সংস্কৃতি ও আনন্দের প্রতীক।
বাংলাদেশের মরমী সাধক হাসন রাজার গানকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরই বিশেষ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসবের উদ্দেশ্য হাসন রাজার আধ্যাত্মিকতা, মানবিক চেতনা, লোকজ ও মরমী সংগীতকে শ্রদ্ধা জানানো এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তার দর্শনকে পৌঁছে দেওয়া। সুনামগঞ্জের তেঘরিয়ার জমিদারবাড়িতে এ আয়োজন হয়। বিদেশেও, যেমন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে এ উৎসব পালিত হয়।
বাংলাদেশের বাউল সম্রাট লালন শাহ স্মরণে লালনমেলা কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত বছরে দুইবার—দোল পূর্ণিমা ও লালনের তিরোধান দিবসে (১৭ অক্টোবর)—এ আয়োজন হয়। দেশ-বিদেশের হাজারো ভক্ত এতে অংশ নেয়। এই মেলা পরিণত হয় লনের দার্শনিক বাণী, মানবতাবাদ ও মরমী গানের অনন্য ।
বাংলাদেশের প্রাচীন বাংলার রাজধানী রুপে খ্যাত সোনারগাঁয়ে ‘বাংলাদেশের লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন’ প্রতিবছর মাসব্যাপী কারুশিল্প মেলার আয়োজন করে।বাংলাদেশের জামদানি শাড়ি , হস্তশিল্প , তাঁতজাত পণ্য, মৃৎশিল্পসহ, খাদ্যসামগী নানা ঐতিহ্যবাহী পণ্য প্রদর্শিত ও বিক্রি হয়। গ্রামীণ মেলার আবহে এই বর্ণিল উৎসব শিশু, কিশোর, নারী-পুরুষ—সবাইকে আকর্ষণ করে।
বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় লোকজ উৎসব হল নৌকা বাইচ। বর্ষাকালে নদী ও খালে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ভোলা, বরিশাল, মাদারীপুর, কুমিল্লা, সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এটি স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ। দর্শকদের উল্লাস, ঢাক-ঢোল, গান, নৃত্য—সব মিলিয়ে তা এক প্রাণবন্ত উৎসব। এটি গ্রামীণ ঐতিহ্য ও দলগত চেতনার প্রতীক।
বাংলাদেশের বিভিন্ন উৎসবের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য অপরিসীম। বৈচিত্র্যময় উৎসবগুলো শুধু আনন্দ নয়, এগুলো সামাজিক বন্ধন, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা ও জাতীয় ঐক্যের বাহক। ঈদে দান-খয়রাত, পূজায় প্রসাদ বিতরণ, বইমেলায় চিন্তার বিনিময়, বর্ষবরণে অসাম্প্রদায়িকতা—সব মিলিয়ে এগুলো সমাজকে শুদ্ধ মানবিক বোধ কে দৃঢ ও সংহত করে। পাশাপাশি গ্রামীণ ও শহুরে জীবনের মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধন রচনা করে। শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষ উৎসবে অংশ নিয়ে নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকে।
আলোচনার শেষ কথায় বলা যায়—বাংলাদেশের এই উৎসবগুলো আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম ও সহনশীলতা ,মানবিকতাকে একত্রিত করে। ঈদ আমাদের শান্তি ত্যাগ ও ভ্রাতৃত্ব শেখায়, পূজা সৌন্দর্য ও ঐক্য, বড়দিন বুদ্ধ পূর্ণিমা উৎসব এ শান্তির বার্তা ধারণ করে , বইমেলা জ্ঞান ও ভাষা, বর্ষবরণ আমাদের বাঙালিয়ানা শিক্ষায় পূর্ণতা দেয় । বাংলার উৎসবগুলো এইভাবে আমাদের জীবনের রঙ, হৃদয়ের সুর এবং সমাজের বন্ধনের অবিচ্ছদ্য প্রতীক হয়ে আছে l