Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

বাবাকে নিয়ে কিছু কথা

ইমানুল হক

কলকাতা, ভারত

১)

‘তোমাকে চাকরি বা রোজগার করতে হবে’, এই কথাটা আমার বাবা কোনো দিন বলেননি। মাও বলেছেন বলে মনে পড়ে না।  মধ্যবিত্ত বলতে যা বোঝায়, আমার বাবা সে-রকম চিন্তা ভাবনার মানুষ ছিলেন না। ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করবে যাত্রা নাটক করবে পার্টি করবে, এই ছিল বাবার চিন্তা। 

অবাক লাগে, চাকরির চেষ্টা কর — এই কথাটা বাবা ও মা একবারও বলেননি। কেন?.

বাবার কথা ছিল, আমার দায়িত্ব গ্রাজুয়েট করানোর। তারপর এক পয়সা দেবও না, এক পয়সা নেবও না । 

একবার আমার ভারতীয় বায়ুসেনার প্রকৌশলী ভাইয়ের থেকে টাকা নেন। ভাই পিএফ থেকে ৩% সুদে ঋণ নিয়েছেন জেনে টাকা ফেরৎ দেওয়ার সময় ৩% সুদ সমেত ফেরৎ দেন। 

২)

আমার বাবা।। সারাজীবন ঠোঁট কাটা এবং গরিব আদিবাসী দলিতের বন্ধু ছিলেন। আড়ালে আবডালে বলা হতো — সাঁওতাল বাগদি মুচি ছোটলোকদের নেতা। প্রকাশ্যেই বলতেন অনেকে: ছোটলোকদের মাথায় তুলছে। 

গরিব মানে ৭০ এবং আশির দশকের মাঝ পর্যন্ত ছিল ‘ছোটলোক’। গরিবপাড়াকে মধ্যবিত্তরা বলতেন, ‘ছোটলোকদের পাড়া’। 

বাবাদের সংগ্রাম ছিল একে বদলানো। তাই মুচিপাড়া হল দাসপাড়া। বাগ্দিপাড়া রসপুকুর। সাঁওতাল পাড়া প্রথমে আদিবাসী পাড়া পরে খাবড়িগড়।

#

সমানে তর্ক করেছি তাঁর সঙ্গে। ছোট থেকেই। তিনিই শিখিয়েছিলেন তর্ক।  তিনিই বলেছিলেন, যুক্তি ছাড়া কিছু মানবে না। আমি বললেও না। বলতেন, ‘আগাছা হয়ো না গাছ হয়ো।  বঞ্চিতদের পাশে থেকো। নিন্দা প্রশংসার মুখাপেক্ষী হয়ো না।’

#

আর একটা কথাও বলতেন– বন্ধু মহলে– বিচারসভায়।

‘চুলে কখনও ছেলে আটকায় না।’

চুলের হিন্দি প্রতিশব্দটি ব্যবহার করতেন, বলাই বাহুল্য।

বলতেন, ‘দোষহীন মানুষ হয় না। কম বা বেশি দোষ। তবে সৎ মানুষ হওয়া যায়। চুরি না করেও বাঁচা যায়।’ 

বন্ধু কৌশিক ভট্টাচার্য মনে করালেন কবিতার কথা। কবিতা লিখতেন। গান করতেন । সুর দিতেন।

এক অনিন্দ্য ব্যানার্জি ছাড়া একসঙ্গে কারও এত গুণ আমি চেনা বৃত্তে দেখিনি।

#

 আমার দেখা সেরা কমিউনিস্ট। জমি বেচে পার্টি করেছেন।

১৯৫৭ তে পার্টির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৮৭ তে পার্টি সদস্যপদ ছেড়ে দেন। চিঠি লিখে বলেন, ‘আমি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়ার যোগ্য নই, কারণ আমার কিছু জমি আছে।’ 

পরের পংক্তি ছিল: ‘এই পার্টির কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ দেওয়ার যোগ্যতা নেই। কারণ এই পার্টিটা কমিউনিস্ট পার্টি আর নেই । বড়লোকের ধামাধরা হয়ে উঠছে।’

#

সারা বছর পার্টিকে গাল দিতেন। ভোট এলেই জানপ্রাণ দিয়ে পার্টিকে বাঁচানোর জন্য খাটতেন।

২০০৯ সালে যখন পার্টির ব্রাঞ্চ সদস্যরাও তৃণমূলের কাছে মুচলেকা দিয়ে দিল,  তিনি বলেছিলেন, ‘কাউকে মুচলেকা দিতে শিখিনি।’ একঘরে করা হয়েছিল। কিন্তু দমানো যায়নি।

১৯৮৭ তে পার্টি ছাড়ার পর কারো কারো মদতে পুকুরে বিষ, পালুইয়ে আগুন দেওয়া হয়েছিল। আর ২০০৯ থেকে একঘরে।মানুষ কথা বলত লুকিয়ে।

২০১৩ যে পার্টি পঞ্চায়েত নির্বাচনে যখন ভয়ে প্রার্থী দেবে না বলে ঠিক করল, নিজে ক্যান্সার রোগী হয়ে গ্রামে গ্রামে  বেরিয়ে পড়লেন ৭৯ বছর বয়সে প্রার্থী খুঁজতে। যেখানে পঞ্চাশ ষাট ও সত্তর দশকে পার্টি গড়েছিলেন। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে হারা আসনে জেতালেন পার্টিকে। প্রচারক দুজন। আমার বাবা। আর পার্টি/ সমাজসেবা করে সম্পত্তি উড়িয়ে দেওয়ার জন্য দৈনিক গাল দেওয়া আমার মা। একাই লিখে বেড়ালেন দেওয়াল। একাই গেলেন গণনাকেন্দ্রে।

মুসলিম ছাড়া কোনও দিন প্রার্থী করেনি যে আসনে কোন পার্টি সেখানে দাঁড় করালেন এক চর্মকারের সন্তানকে। জেতালেন।

গোটা থানায় কোন লাল পতাকা উড়ত না। শুধু আমাদের বাড়িতে। ২০১৩ ভোটে জেতানোর পাঁচ মাস পর চলে গেলেন বাবা।

মা সেই পতাকা রেখেই ছিলেন উড়িয়ে।

কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর কোন নেতা এলেন না। যাঁরা সত্তর দশকে আশ্রয় নিয়েছিলেন। 

কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু কমিউনিস্ট মতাদর্শ এবং গরিবের পাশে থাকা ভুলিনি।

#

বাবা নাটক যাত্রা থিয়েটার করতেন। সাঁওতালদের সঙ্গে নাচতেন। খেলতেন সব ধরনের খেলা।

সত্যম্বর অপেরায় যাত্রা করতে উৎপল দত্তের সংস্পর্শে আসেন। গ্রামে কংগ্রেসীদের সঙ্গে নিয়েই একযোগে সবাই মিলে, জুনিয়র হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।‌সহযোগী ছিলেন আমার বড় মামা। কংগ্রেসের দাপুটে শিক্ষক নেতা। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল অটুট। মুখে যদিও বলতেন, বন্ধুর চেয়ে পার্টি বড়। 

কাজে ব্যক্তিগত সম্পর্কে বিশ্বাসী ছিলেন।

আমার ভাইয়ের বিয়ের সময় বউয়ের নাম/ পদবী বদলাতে হবে বলায় আপত্তি করেন।  আর এক মিশ্র বিবাহে অত্যন্ত প্রিয় এক আত্মীয় বলেন, ‘হিন্দু নাম থাকলে আমরা কেউ খাব না। নাম বদলে মুসলিম নাম করতে হবে। কলমা পড়াতে হবে। না হলে না খেয়েচলে যাব!’ বাবা উত্তর দেন, ‘এটা তোর ব্যাপার। নমস্কার। আসুন।’ 

তাঁরা চলে গেলেন। বাবা একবারও অনুরোধ করলেন না।

আমাদের খারাপ লাগছিল।

কিন্তু বাবার হ্যাঁ তো হ্যাঁ না তো না।

যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে যা বুঝবেন তাই করবেন।

নাড়ায় কার সাধ্য।

তিনি বলতেন, আমি মানবধর্মে এবং নবীর কথায় বিশ্বাসী। আমার ধর্ম আমার কাছে তোমার ধর্ম তোমার কাছে।

একবার একজন রাগের মাথায় তালাক দিয়ে দেন। দিয়ে খুব কষ্ট পান। তিনি খুব ধর্মবিশ্বাসী। তাঁর বাবা এবং স্ত্রীও ধর্মপ্রাণ।

কী হবে? খুব শোরগোল।

শহর আর গ্রাম বা বস্তি এক নয়।

সবাই সবকিছুতে যোগ দেয়। হিন্দু-মুসলমান মিলে লোকে লোকারণ্য।

বাবা খবর পেয়ে এলেন। দুজনকে টেনে দোতলায় নিয়ে গিয়ে ঘরে ঢুকে দিনে দুপুরে শিকল তুলে দিয়ে বললেন, যা।  মেটা ঝামেলা।

সেকালে বিশ্বাস ছিল, স্বামী স্ত্রীর সব ঝামেলা বিছানায় মেটে।

নারীবাদীরা রাগবেন না। তাঁরা এখন সুখী দম্পতি। তাঁদের নাতনির বিয়ে হল বছরখানেক আগে। নাতনির বাচ্চাও হয়েছে। 

আরেকজন বাবার খুব ভক্ত। দাবা খেলার পার্টনার। রেগে তালাক দিয়ে বসলেন। বউকে মা মা বলে ডাকলেন। বললেন, তুই আমার মা। আমার বৌ নোস। 

 কী হবে এবার? খুব চিন্তা। 

বাবা বললেন, ‘তুমি তো কমিউনিস্ট পার্টি করো। তোমার আবার তালাক ফালাক কী?’

‘আর ধর্মেও তিন তালাক নাই। আমি বাংলায় কোরান পড়েছি।’

‘যাঁরা পড়েনি তাদের কথা শুনো না। তারা না পড়ে বড্ড বেশি ফরফরায়। আর সব বউ তো স্বামীর এক অর্থে মা। না হলে স্বামীদের এত অনাচার অত্যাচার সহ্য করে কী করে? ‘

৩)

আর যাঁরা আমাকে তৃণমূলের দালাল বলে আনন্দ পান– তাঁদের জন্য, আমার বাবার গায়ে লাল পতাকা জড়িয়ে দিয়েছিলাম ধর্মীয় নেতা আর তৃণমূলের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে। কেউ কেউ বলেছিলেন, বাবার সঙ্গে আমাকেও কবরে পুঁতে দেবে গাঁয়ে ২০০৯ এর পর লাল পতাকা বের করায়‌। ২০১৬ তে আক্রান্ত হয়েছি শাসকদলের অন্যায় কাজের বিরোধিতা করায় জন্মভূমিতে। ২০১৮ তে দুবার কর্মক্ষেত্রে। 

কাজ করে দেখাতে হয়। ফেসবুকে বাণী দিয়ে নয়।

৪)

১৯৮০র দশক থেকেই অল্প অল্প করে কনজিউমারিজম ঢুকতে লাগল পার্টিতে। সম্মেলনগুলোতে মাছ ভাতের বদলে মাংস ভাত খাওয়ালে অভ্যর্থনা সমিতির লালসেলাম একটু বেশি হত। নেতাদের দেখা গেল, মিল মালিকের ছেলের বাইকের পিছনে ঘুরতে। ১৯৮০ সালের একটা কথা মনে আছে। রায়নায় পার্টির লোকাল কমিটির সম্মেলন। তখন জোনাল কমিটি এরিয়া কমিটি এসব নাম কেউ শোনেননি। একটা থানা এলাকায় একটাই লোকাল কমিটি। রায়না বিরাট এলাকা। দুটো পঞ্চায়েত সমিতি। ভারতের শস্যাগার বলা হয় বর্ধমানকে। বর্ধমানের শস্যাগার রায়না। ধান আলু সব্জি বিশেষ করে খাসকানি চাল বা সুগন্ধি গোবিন্দভোগ চাল এখানকার সুবিখ্যাত। যিনি খেয়েছেন তিনি ভুলতে পারবেন না। দামোদরের বন্যার ফলে জমিও ছিল খুবই উর্বর। আলু চাষ দুর্দান্ত। ধান আর বান দুইই ছিল বৈশিষ্ট্য। ১৯৭৮ সালের পর সেভাবে আর বন্যা হয়নি দীর্ঘদিন। তো এই এলাকায় মিল মালিকরাই ছিলেন বড়লোক। বালি খাদ, সার, সিমেন্ট, মিল ব্যবসায় তখনও কংগ্রেসের দাপট। সিপিএম দাঁত ফোটাতে পারেনি।

সবে তিন বছর ক্ষমতায় এসেছে। তো সেবার রায়নায় পার্টির সম্মেলন। সম্মেলন হলে তো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবেই। এবং কবি সম্মেলন।
কিশোর কবি হিসেবে আমার একটু খ্যাতি হয়েছে। পার্টি সম্মেলনের স্মরণিকায় পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কাকাবাবু মুজফফর আহমেদের ওপর একটা বড় কবিতা বের হয়েছে। জামার অদৃশ্য কলার একটু উঁচুতে। নবম শ্রেণিতে পড়ি। পাশে হাপুরে মায়ের খালাতো বোনের বাড়িতে রাতে থাকা। ওখানেই বেশ কিছু চমৎকার পুঁথি দেখেছিলাম। ওই গ্রামেই আমাদের বাড়িতে কাজ করতেন এমন একজনের বোনের বাড়ি ছিল। সেই বাড়িতেও পুঁথি দেখেছি। চালের বাতায় গোঁজা। সোরাব রুস্তমের কাহিনি নিয়ে পুঁথি। ডানদিক থেকে বামদিকে ছাপা। আরবি রীতিতে।
এখন যে টাইপোগ্রাফি খুব জনপ্রিয় হয়েছে প্রচ্ছদ এবং পোস্টারে, সেই মতো হরফ ছিল্। একটু বড় আকারের।
তো সেই সম্মেলন স্থল চট দিয়ে ঘেরা। হঠাৎ শুনি বাবার গলা। মাইকে।

আমার বাবা ছিলেন সহৃদয় কিন্তু অতি ঠোঁট কাটা। সেজন্যই বোধহয় জাগতিক আর্থিক সুখ তেমন পাননি। মানসিক শান্তি ছিল প্রচুর। কিন্তু পার্টিতে তাঁর অনেক পরে আসার দর বড় বড় পদ পেলেও তাঁকে দিতে নেতারা ভয় পেতেন। এলাকার বিধায়ক রামনারায়ণ গোস্বামীর খুব প্রিয় ছিলেন। সর্বভারতীয় কৃষক সমিতির নেতা করে তাঁকে দিল্লি না পাঠালে হয়তো বাবার পক্ষে একটু বেশি ভাল হত।


যাক, বাবার গলা শুনে চিন্তিত হলাম। কিছুদিন আগেই একটা মিলে চারজন শ্রমিক পুড়ে মারা গেছে। বাবা বারবার বলা সত্ত্বেও তেমন আন্দোলন করছে না পার্টি। কিছুদিন আগে বাড়িতে একটা ব্রাঞ্চ মিটিং হয়েছে। চাপা স্বরে কথা। কিছু শুনতে পাইনি। আর বাবা দাদা এঁরা তখনকার রীতি অনুযায়ী পার্টির ভেতরের কথা বাড়িতে বা বন্ধু দের কাউকে বলতেন না। খালি মিটিং শেষে এক পার্টি নেতার কথা শুনলাম, বাবাকে বলছেন, ‘এনাম (নিকটজনেরা এই সংক্ষিপ্ত নামেই ডাকতেন বাবাকে), পার্টিতে আমার শিকড় অনেক ভিতরে। তুমি কিছু করতে পারবে না।’

চারজন শ্রমিক বয়লারে পুড়ে মরলেন! তারপর? পরে জেনেছি লোকমুখে ওই নেতাসহ দুই নেতার ছয় বিঘা করে জমি বেড়েছে। তা বাবা কী বলেন, সেই নিয়ে খুব ভয় ছিল। বাবার প্রতি আক্রোশ ছেলেমেয়েদের ওপরও নামত তো।
শুনছি বাবা বলছেন, ‘এই পার্টি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়বে বলেছিল, নেতারাই দুর্নীতির কবলে।’
লোকাল কমিটির ২০ জনের মধ্যে মাত্র তিনজন সৎ।
পার্টি সদস্যদের মধ্যে বাবার খুব জনপ্রিয়তা ছিল। রসিক মানুষ, যাত্রা, থিয়েটা্‌ দাবা, তাস এবং আড্ডা ও খাওয়ানোয় দরাজ দিল মানুষ।
আমাদের এলাকার মানুষ মাটির মতোই খুব রসিক।
কয়েকজন চেঁচিয়ে উঠলে্‌ ‘ভাই টীকা লাগে।’
বাবার গলা একটু উঠল।

বললেন, ‘আগে দেখতাম পার্টির লোকাল সম্পাদক আমাদের মতোই সাইকেলে ঘোরেন। সেদিন পলাশন বাজারে দেখা। দাঁড়িয়ে আছেন। ভাবলাম, বাসে যাবেন। ভাল।
একটু অবাক হলাম ছয় কিলোমিটার রাস্তা সাইকেলে গেলে চার আনা পয়সা বাঁচে পার্টির। তো শরীর খারাপ বোধহয়। আমিও মিটিংয়ে যাব। বললাম, ‘সাইকেলের পেছনে ওঠেন কমরেড।’
উনি বললেন, ‘না অশো… আসবে।’
তা ওঁর ছেলের নাম।
ওমা একটু পর দেখি মিল মালিকের ছেলে অশো.. রাজদূত মোটর সাইকেল নিয়ে হাজির।
তাঁর বাইকের পেছনে চড়লেন।
তো যাঁরা দেখলেন, তাঁদের কাছে কী বার্তা গেল।
মিল মালিকরা আমাদের শ্রেণি মিত্র হয়ে গেছে? আর বিবাদ নাই?
আবার আওয়াজ বাকিদের কী দোষ?
সে তো আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন। এখন বিড়ি খেতে লজ্জা চারমিনার ক্যাপস্টান খাচ্ছেন। তা পয়সা আসছে কোথা থেকে?
আগে এত ইস্ত্রি করা জামাকাপড় পরা নেতা দেখিনি।
সবাই জ্যোতি বসু হতে চাইছেন।
ভদ্দরনোক।

প্রসঙ্গত, আমার বাবা জ্যোতি বসুকে একদম দেখতে পারতেন না। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে দেখার পর একটু মনোভাব বদলায়। সদয় হোন।
বাবার কথা ছিল, জ্যোতিবাবু পার্টিটাকে মধ্যবিত্তের পার্টি বানিয়ে দিচ্ছেন। নিজের ছেলেকে পার্টিতে আনেননি।
সেই দেখে নেতাদের ছেলেমেয়েরাও কেরিয়ার গড়ছে। বিপ্লবের স্বপ্ন দেখছে না।

বাবা সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছিলেন, বাবার এক অতি ঘনিষ্ঠ খেতমজুর কমরেড যখন ২০০ টাকার পার্টি হোলটাইমার হয়ে জমিতে কাজ করা ছেড়ে মাড় দেওয়া ইস্ত্রি করা ধুতি পাঞ্জাবি পরে ঘুরতে লাগলেন। বললেন, তপন সিংহকে কংগ্রেসের লোক বলি। উনিই কমিউনিস্টদের আসল শিল্পী।
‘সাগিনা মাহাতো’ দেখো।
কেমন করে বদলে যায় পার্টি নেতা।
‘আতঙ্ক’ ছবি তাঁকে খুব ভাবিয়েছিল।
‘আপনি কিন্তু কিছু দেখেননি মাস্টারমশাই।’

লোকে মনোযোগ দিয়ে শুনতেন সেসব। উশখুস করতেন না।
তবে ওই সময় থেকেই দেখলাম, পার্টির মধ্যে ইংরেজি বলার প্রবণতা বেড়ে গেল। 

৫)

আমার বাবার গল্প শুনতে চেয়েছেন  বন্ধু। পৃথিবীর সব বাবার মতোই আমার বাবা স্বভাবে ভুলোমনা । বাড়ির কথা মনে থাকে না, কিন্তু যখন থাকে তখন খুব মুশকিল। যা করবেন ১০০ শতাংশ। যা ছাড়বেন তাও একশো শতাংশ। খালি সামাজিক কাজ আর পড়া লেখার অভ্যাস ছাড়তে পারেন নি। মৃত্যুর দিন সকালেও বই পড়েছেন। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে গুনগুন করে গান গেয়েছেন। আলিপুর কমান্ড হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে এপিটাফ লিখেছেন।

বাবা পার্টির কাজে কয়েকদিন কিন্তু যাত্রা নাটকের কাজে মাসের পর মাস উধাও হয়ে যেতেন। পেশাদারি যাত্রাদলেও একাধিকবার কাজ করেছেন। খ্যাতনামা সত্যম্বর থেকে বর্ধমান বাঁকুড়া মেদিনীপুরের দল শ্রীদুর্গা অপেরা বা আরও কোনো দলে।

রাখাল সিংহ, চণ্ডী কেশ ছিল তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু। যাত্রাপালাকার শম্ভু বাগের সঙ্গে ছিল খুব ভাব। মধু গোস্বামীর সঙ্গেও আলাপ। শেখর গাঙ্গুলী আমাদের গ্রামে যাত্রা করতে এসে বাবা ও মালেকভাইয়ের প্রশংসা করে যান। 

মা খুব রেগে যেতেন। কারণ যাবেন সুস্থ শরীরে ফিরবেন না খেয়ে রাত জেগে যক্ষ্মা বাধিয়ে। আমি মুখ দিয়ে রক্ত পড়ার কথা শুনেছি। দেখিনি। এ-সব ১৯৬৬ র আগের গল্প।

১৯৮৮ তে পার্টির সদস্যপদ ত্যাগ করে আবার চার মাস যাত্রাদলে কাটিয়ে এলেন।

আবার বিচিত্র পেশার গল্পও শুনেছি। পার্টির বই পত্রপত্রিকার বিক্রেতা। আনন্দমেলা নয় কিশোরভারতী পড়াতে হবে। ভূতের গল্প নয় সাহসের বিপ্লবের বিজয় শোনাতে হবে– এই ইচ্ছা।

পার্টির বই পত্রপত্রিকার বিক্রি নামেমাত্র! ঘর থেকেই টাকা শোধ দিতে হত।

একবার এক ভিডিও হল খুলে ফেললেন যৌথভাবে। ভাল ছবি দেখাবেন কেরলের শাস্ত্রসাহিত্য পরিষদের ধাঁচে।

মেহমুদ, দিলীপ কুমার, চার্লি চ্যাপলিন, মেল গিবসনের ছবি দেখাবেন স্বপ্ন।

লোকে দেখতে চায় নীল ছবি। চলল না।

মাথায় এল হোটেল করবেন। ভারতের নানা রাজ্যের ভাল খাবার খাওয়াবেন। বাঙালির ডাল ভাত ছাড়াও পুষ্টিকর খাবার আছে– বোঝাবেন।

মা বললেন, ‘যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাব। ঘরের হোটেল একমাস সামলাও, তারপর।’

মা তো জানেন,  জমি যাবে, লাভ কিছু হবে না।

একবার ঠিক করলেন, ধান ব্যবসা।

একজনকে নিয়ে এলেন, বললেন, এ বড়ো ব্যবসায়ী হবে, দেখে নিও। বাবার পুঁজি তাঁর শ্রম।

বাবার দৃষ্টি ভালই ছিল, বাবার সব পার্টনার বড়লোক হত, বাবাকে কেবল আর কয়েক বিঘা জমি বেচতে হত এই যা।

শেষ বয়সে খুব ইচ্ছে হয়েছিল, একটা ট্রাক্টর কেনার।আমি বলেছিলাম, কিনে দেব।

‘তুই কেন দিবি। দিলেও ধার হিসেবে। সুদ নিতে হবে।’

‘পাগল হয়েছো। সুদ নেব।’

‘নিবি, ব্যাঙ্কে রাখলেও তো পেতিস। তিন পার্সেন্ট দেব।’

‘তাহলে তুমি অন্য লোক দেখো। আমি দেব না।’

‘আচ্ছা নেব। তবে শোধ করে দেব। নিতে হবে।’

‘আচ্ছা দেখা যাবে।’

‘তাহলে নেব না’

‘ঠিক আছে আগে তো ভালো হও ঘরে চলো।’

বাবার ঘরে ফেরা হল না।

অপারেশন করার দিনেই চলে গেলেন।

বারবার ঠকঠক আওয়াজ করে ডাকছিলেন, বাবার সংক্রমণ হয়ে যাবে ভেবে পাশে গেলাম না।

আর শোনা হলো না কী বলতে চেয়েছিলেন।

বলবে আব্বা?

বলবে? 

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x