Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

যুক্ত সাধনার সন্ধানে

মেঘনা বন্দোপাধ্যায়

বোলপুর, পশ্চিমবঙ্গ

ভারত তথা পৃথিবীতে আজ দাঁড়িয়ে থেকে অহরহ ঘটে যাওয়া ধর্মীয় সংঘাত, অসহিষ্ণুতা ও ধর্মের নামে বিভাজন দেখে একটা নাম বার বার মনে আসে। ক্ষিতিমোহন সেন। তাঁর পরিচয় অনেক সময়েই শুধু থেমে থাকে তাঁর উত্তর পুরুষ অমর্ত্য সেনের নামের সাথে জুড়ে, তবে এখন সময় এসেছে ক্ষিতিমোহন কে তাঁর জীবন আর চর্চার মধ্যে দিয়ে জানার। 

ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন একজন বিশিষ্ট সংস্কৃতজ্ঞ ও ধর্মতত্ত্ববিদ, যিনি ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনের ইতিহাস বিশ্লেষণে এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি এনেছিলেন। তিনি মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে শান্তিনিকেতনে আসেন, রবীন্দ্রনাথের অনুরোধেই তিনি সন্ত কবির, দাদু প্রমুখ সুফি সাধকদের সাথে বাংলার মানুষদের পরিচয় করান। তাঁর রচিত গ্রন্থ ‘ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা’ একাধারে ইতিহাসচর্চা, সমাজবিশ্লেষণ ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপের এক মূল্যবান নিদর্শন। এখানে তিনি ভারতীয় সংস্কৃতিতে হিন্দু ও মুসলমানদের পারস্পরিক আদানপ্রদান, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং যুগপৎ সাধনার অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন।

ক্ষিতিমোহনের মূল ভাবনা ছিল, ভারতবর্ষের ধর্মীয় ইতিহাসকে কেবল বিভাজনের ইতিহাস হিসেবে না দেখে, একে মিলনের, সম্পৃক্তির ও পারস্পরিক প্রভাবের ইতিহাস হিসেবে দেখা। তিনি দেখিয়েছেন, ভারতীয় সংস্কৃতি কোনও একক ধর্মীয় ধারা থেকে গঠিত হয়নি; বরং হিন্দু ও মুসলমান সাধকদের যৌথ সাধনার ফলে এর গভীরতা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যযুগে ভারতীয় উপমহাদেশে যে ভক্তি ও সুফি আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা ছিল এক ধরনের আত্মিক মিলনের ক্ষেত্র, যেখানে ধর্মীয় বিভাজনের প্রাচীর ভেঙে পড়েছিল। কবীর, রবিদাস, শেখ ফরিদ, দারা শিকোহ প্রমুখদের জীবন ও সাধনায় এই মিলনের ছাপ স্পষ্ট।

এই গ্রন্থে ক্ষিতিমোহন সংস্কৃতির আদান-প্রদান প্রসঙ্গে বলেন, হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় কেবল বাইরের অনুকরণ নয়, বরং একধরনের আত্মিক গ্রহণ। তিনি জানান, ভাষা, সংগীত, খাদ্যাভ্যাস এমনকি দৈনন্দিন জীবনচর্চাতেও এই পারস্পরিক প্রভাব ব্যাপক ছিল। উর্দু ভাষার বিকাশ, বাংলা কবিগানের মধ্যে সুফি ভাবনা, বা হিন্দু ঘরানার মিউজিকাল চর্চায় মুসলিম অবদান—এসবই এই যুগপৎ সাধনার দৃষ্টান্ত।

তাঁর দৃষ্টিতে, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ বা সহিংসতার ইতিহাস যতটা বড় করে দেখা হয়েছে, ততটাই অবহেলিত হয়েছে তাদের ঐক্যবদ্ধ মানবিক ও ধর্মীয় সাধনার ইতিহাস। এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল এক ঐতিহাসিক পুনর্মূল্যায়ন নয়, বরং আজকের সমাজে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও সহাবস্থানের জন্য এক নতুন পথের দিশা।

বর্তমান সময়ে যখন ধর্মীয় মেরুকরণ ও বিভাজনের রাজনীতি সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তখন ক্ষিতিমোহনের এই চিন্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভারতের আত্মা নির্মিত হয়েছে বহু ধর্মের যুক্ত সংলাপ ও সাধনার মধ্য দিয়ে। তাঁর লেখায় আছে সেই অন্তরদৃষ্টি, যা হিন্দু-মুসলমান বিভেদের দেওয়ালের বদলে মিলনের সেতু নির্মাণে সাহায্য করে।

বর্তমান বিশ্বে ধর্মীয় সংঘাত, অসহিষ্ণুতা ও ধর্মের নামে বিভাজন বেড়েই চলেছে। ভারতের মতো বহুধর্মীয় সমাজে এই পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ (inter-religious dialogue) কেবল প্রাসঙ্গিক নয়, অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে। এই সংলাপের মূল লক্ষ্য হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া ও সহাবস্থান।  বইটিতে ক্ষিতিমোহন সেন ভারতের বিভিন্ন সময়পর্বে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি চৈতন্য মহাপ্রভু ও কবিরের মতো সাধক-দার্শনিকদের উল্লেখ করেন, যাঁদের চিন্তায় ধর্মীয় সীমা ভেঙে সমন্বয়ের বাণী উচ্চারিত হয়। কবিরের বাণী, “হিন্দু কোথা মুসলমান কোথা, দোমোহিন রূপ দেখাও”—এই ধরনের ভাবধারায় আন্তঃধর্মীয় সংলাপের ছায়া স্পষ্ট। আবার সুফি-সন্ত সংস্কৃতি, যেমন খ্বাজা মইনউদ্দিন চিশতি কিংবা শেখ ফরিদ, হিন্দু সমাজে ব্যাপকভাবে শ্রদ্ধেয় ছিলেন এবং তাঁদের দরগায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষ সমানভাবে যেতেন।

সেন এইসব উদাহরণ তুলে ধরে বলেন যে, এই মিলন কেবল সামাজিক বা সাংস্কৃতিক নয়, আধ্যাত্মিকও। এই আধ্যাত্মিক সংযোগই আন্তঃধর্মীয় সংলাপের মূল। শেষে এই কথা স্পষ্ট, ‘ভারতে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা’ শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক পাঠ নয়, এটি এক মানবিক আহ্বান—যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ মানুষকে আপন করে নেওয়ার চেষ্টা করে। আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জন্য  ক্ষিতিমোহনের এই অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি পথনির্দেশ এবং একমাত্র পরিত্রাণের উপায়।

Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Azmal Hussain
Azmal Hussain
6 months ago

ঠিক কীভাবে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনাতে আমাদের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল? আজকের দিনে যখন বিভেদ আর বিদ্ধেষের অপসংস্কৃতিকে তোল্লাই দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বহু জায়গায়, তখন আমাদের এই যুক্ত সাধনায় গড়ে ওঠা সংস্কৃতির ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেওয়াটা অবশ্যই দরকার। লেখক ঠিক সেই চেষ্টাটাই করেছেন।

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x