Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

লতাজী ও পান্থ পাখির গল্প

মহিবুল আলম 

অস্ট্রেলিয়া

।। এক ।। 

নিজের গল্প দিয়েই শুরু করি। ছোটবেলায় আমি ছিলাম খুব বাবার নেওটে। ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়েও আমি বাবার কাঁধে উঠে ঘুরেছি। গোমতী নদী ছিল আমাদের বাড়ি সংলগ্ন। ছোটবেলায় বাবা বাড়িতে এলে তিনি বিকেল বেলা প্রায়ই আমাকে কাঁধে তুলে গোমতী নদীর তীরে হাঁটতে যেতেন। গোমতী নদী বেয়ে দূরে-বহুদূরে বিকেলের লাল টকটকে সূর্যটা টুপ করে ডুবে যাওয়া দেখতে কী চমৎকারই না লাগত। একবার বর্ষায় গোমতীর ওপারে নদী-আইলের ভাঙন হয়। ভরাট বর্ষার জলে নদীর ওপার পুরোপুরি ভেসে যায়। ঠিক তখনই বাবা তাঁর কর্মস্থল সিলেট থেকে বাড়িতে আসেন। এক বিকেলে বাবা আমাকে কাঁধে তুলে গোমতী নদীর আইল ধরে হাঁটতে বের হন। নদীর ওপারের পাড়-ভাঙা দিগন্ত বিস্তৃত দেখে আমি ঝুঁকে বাবাকে জিজ্ঞেস করি, ‘বাবা, নদীর ওপারে এত পানি যে, নদীর ওপারে কী আছে?’

বাবা উত্তর দেন, ‘নদীর ওপারে সাগর দেশ আছে’। 

আমি বাবার কথা বিশ্বাস করি। ভাবি, সত্যি বুঝি নদীর ওপারে সাগর দেশ আছে। কিন্তু বাংলাদেশ থাকতে যে কোনো কারণেই হোক আমার কখনো সাগর দেখা হয়নি। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করার পরপরই ১৯৯৭ সালে নিউজিল্যান্ড চলে আসি। তখন ইন্টারনেটের যুগ ছিল না। তাই গুগুলে সার্চ দিয়ে কোনোকিছু দেখার উপায়ও ছিল না। আসার আগে আমি দেশে বসে নিউজিল্যান্ড সম্বন্ধে ভাবতাম, দেশটা বুঝি সম্পূর্ণভাবে বরফে ঢাকা। ব্রিটিশ কাউন্সিল বা কোথাও একটা বইতে নিউজিল্যান্ডকে খুঁজতে গিয়ে তেমনই কয়েকটা বরফ ঢাকা ছবি দেখেছিলাম। আমার মামা আগে থেকেই নিউজিল্যান্ডে থাকতেন। তিনিও একবার চিঠির ভেতর তার বরফে হেলান দেওয়া একটা ছবি পাঠিয়েছিলেন।

১৯৯৭ সালের জানুয়ারির পাঁচ তারিখ বাংলাদেশ ছেড়ে জানুয়ারির আট তারিখ মধ্যদুপুরে নিউজিল্যান্ডে এসে পৌঁছই। এয়ারপোর্ট থেকে অকল্যান্ডে হয়ে সরাসরি মাউন্ট মাঙ্গানুই শহরে মামার বাসায় চলে আসি। মাউন্ট মাঙ্গানুইতে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়।

বন্ধুরা, মাউন্ট মাঙ্গানুই শহরটা সম্বন্ধে একটু বলে নিই। আমার দেখা এযাবৎ সবচেয়ে সুন্দর শহরগুলোর একটা হলো মাউন্ট মাঙ্গানুই। খুব বেশি বড় নয়। পাশের তাওরাঙ্গা শহরটাকে আলাদা করলে মাউন্ট মাঙ্গানুই বেশ ছোটই। একটা সমুদ্র সৈকত ও একটা পাহাড়কে কেন্দ্র করে শহরটা গড়ে উঠেছে। লোকসংখ্যাও খুব বেশি নয়। কিন্তু পৃথিবীর সেরা দশটা সমুদ্র সৈকতের একটা হলো মাউন্ট মাঙ্গানুই সমুদ্র সৈকত। বড়দিন ও ইংরেজি নববর্ষের সময় শহরের লোকসংখ্যা চার-পাঁচগুণ বেড়ে যায়। 

ও হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম। অকল্যান্ড এয়ারপোর্টে নামার পর আমার ধারণা পুরোপুরি পাল্টে যায়। কোথায় বরফ, কোথায় কী? তখন নিউজিল্যান্ডে গ্রীষ্মকাল চলছিল। চারদিকে চকচকে সোনালি রোদ। দক্ষিণের হিলহিল বাতাস কেমন ভালবাসার স্পর্শ দিচ্ছিল। 

সে রাতে মাউন্ট মাঙ্গানুই ফিরে পরদিন বিকেল মাউন্ট মাঙ্গানুই শহরটা দেখতে মামার বাসা থেকে বের হই। একাই। ছোট্ট শহর। মামার বাসা ছিল শহরের ঠিক উপকণ্ঠে, টিনাইও রোডে। 

টিনাইও রোড থেকে মাউন্ট মাঙ্গানুই সৈকত ছিল মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটার পথ।

আমি মাউন্ট মাঙ্গানুই শহরটা ঘুরে সমুদ্র সৈকতে যখন আসি, তখন সূর্যটা অনেকটাই পশ্চিমে হেলে পড়েছে। আমি সৈকত ঘেঁষা একটা বড় পাথরের উপর বসি। সমুদ্রে তখন জোয়ারের টান ছিল। প্রশান্ত মহাসাগরের জল পাথরে এসে আছড়ে পড়ছিল- ছলাৎ ছলাৎ, ছলাৎ ছলাৎ। আমার দৃষ্টির সামনে দিগন্ত বিস্তৃত জল আর ঢেউয়ের পর ঢেউ। আমার সেই প্রথম সমুদ্র দেখা। তা-ও আবার বিদেশবিভূঁই, কোন দূরদেশের শহরে। পাথরে বসে থাকতে থাকতেই সূর্যটা টকটকে লাল হয়ে একসময় টুপ করে সাগরের জলে ডুব দেয়। মাথায় উপর দিয়ে একদল পাখি উড়ে যায়। সন্ধ্যাটা নামে। সৈকতে বসে পান্থ পাখিদের উড়ে যাওয়া দেখে আমার লতাজীর সেই গানটার কথা মনে পড়ে যায়। ‘নিঝুম সন্ধ্যায়, পান্থ পাখিরা, বুঝি বা পথ ভুলে যায়। কুলায় যেতে যেতে, কী যেন কাকলী, আমারে দিয়ে যেতে চায়।’

আমি সেদিন খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে আমার বাড়ির কথা মনে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে বাবার কথাও। ভাবি, সত্যি কি আমি বাবার বলা সেই নদীর ওপারে সাগর দেশে এসে গেছি? মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানদের স্বপ্ন হুট করে সত্য হয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেও অনেক সময় বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।  

।। দুই ।। 

লতা মঙ্গেশকরের সাথে পরিচয় সেই ছোটবেলা থেকে। আসলে লতাজীর সঙ্গে নয়, লতাজীর কণ্ঠের সঙ্গে। আমাদের বাড়িতে ইয়া বড় বড় গাড়ির বৃত্তাকার হেডলাইটের মতো দেখতে দুটো সাউন্ডবক্সের প্যানাসনিক ক্যাসেট প্লেয়ারে লতাজীর গান বাজতো প্রায়ই। লতাজীর গান সবচেয়ে বেশি বাজত যখন বাবা সিলেট থেকে বাড়িতে আসতেন। বিশেষ করে ঈদের সময়। আমাদের বাড়িটি ছিল ছোট্ট মফঃস্বল শহর মুরাদনগরে। মুরাদনগর থানা শহর হলেও একে একটা গ্রামও বলা যায়। বাবা ছিলেন লতাজীর গানের খুব ভক্ত। সেই পুরোনো দিনের হিন্দি গান। লতাজীর বাংলা গান তো ছিলই। আমি যখনকার গল্প বলছি সেটা আশির দশকের প্রথম দিকের। তখন গ্রামেগঞ্জে বা ছোট ছোট শহরগুলোতে ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না। তবে ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল। বিশেষ করে যারা মধ্যপ্রাচ্যে যেত, আসার সময় তারা বড় বড় লাগেজের সঙ্গে ইয়া বড় একটা ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে আসত। তখন সেই ক্যাসেট প্লেয়ারের সঙ্গে লতাজীর দুই-চার দশটা ক্যাসেট থাকত না, তা নয়। লতাজীর গান বাজত খুব জোরে জোরে। বাড়িতে যে একটা ক্যাসেট প্লেয়ার আছে ওটা জানান দেওয়ার জন্যই হয়তো। ঈদে বা বিয়ে-পার্বণে মাইক লাগিয়ে গ্রামোফোনে রাতভর লতাজীর গানের কথা বাদই দিলাম। গ্রামের ডোবা অঞ্চলে বিয়ের নৌকায় মাইক লাগিয়ে লতাজীর গান বাজাতে বাজাতে বর যাচ্ছে বিয়ে করতে বা নতুন বউ নিয়ে বাড়ি ফিরছে, এ দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসে।

আশির দশকের প্রথম দিকেই আমাদের বাড়িতে টেলিভিশন আসে। সাদাকালো আটাশ ইঞ্চির ফিলিপস টেলিভিশন। তখন মুরাদনগর উপজেলা সদরে চারটা বা পাঁচটা টেলিভিশন ছিল। বছরে তখন দুটো কি তিনটে বাংলা সিনেমা দেখাত। আর দুই-তিন মাস পরপর বাংলা সিনেমার গান, যাকে বলে ছায়াছন্দ। সেই ছায়াছন্দ গানের অনুষ্ঠানে কলকাতার নায়ক বিশ্বজিৎ ও বাংলাদেশের নায়িকা সুলতানার ‘ও দাদা ভাই, দাদা ভাই, মূর্তি বানাও, নাক মুখ চোখ সবই বানাও, হাতও বানাও, পা-ও বানাও, বুদ্ধ যীশু সবই বানাও, মন বানাতে পারো কি, একটা ছোট্ট, বোন বানাতে পারো কি?’ গানটা যে কতবার শুনেছি। নায়িকা সুলতানা তেমন কোনো বড় নায়িকা ছিলেন না। সিনেমায় ছোটখাটো চরিত্র, বড় জোড় নায়কের বোন বা এ ধরণের চরিত্রে অভিনয় করতেন। কিন্তু এই গানটার জন্য তিনি কী পরিচিতিই না পেয়েছিলেন। পরে শুনেছি, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে লতাজীর এই একটাই মাত্র গান। অবশ্য তাতে কিছু যায়-আসে না। তিনি অনেক বাংলা গান তো গেয়েছেন। এক সাক্ষাৎকারে তাঁর মুখ থেকেই শুনেছি, বাংলা নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা। সত্যি তো তাই। দেশের বাইরে না এলে বুঝতেই পারতাম না আমাদের ভাষা কত মিষ্টি ভাষা। 

একটা গল্প না বললেই নয়, আমার মায়ের গল্প। তখন আমাদের বসবাসের ঘর থেকে রান্না করার ঘরটা আলাদা ছিল। মা এক দুপুরে রান্না করছেন। সেদিন স্কুল বন্ধ ছিল কি না জানি না। আমিও বাড়িতে। নিজের রুমে কিছু একটা করছিলাম। টেলিভিশন চালু করা। এমনিই। কেউ দেখছিল না। 

সেটা আশির দশকের মাঝামাঝি। আমাদের মুরাদনগর ত্রিপুরার কাছাকাছি বলে টেলিভিশনে ভারতের দূরদর্শন ধরতে শুরু করেছে। কিন্তু ঢাকা বা অন্য কোথায় দূরদর্শন ধরত না। সেদিক দিয়ে আমরা নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে করতাম। দূরদর্শনের দৌলতে ভালো ভালো হিন্দি ছবি দেখতে পারতাম। তখন রামায়ণ ও মহাভারত সিরিয়াল ছিল আমাদের এলাকায় চরম জনপ্রিয়। যখন সিরিয়াল শুরু হত তখন লোকজনে আমাদের উঠোন ভরে যেত। টেলিভিশনটা দরজার কাছে নিয়ে আসতে হত যাতে সবাই দেখতে পারে। 

ও হ্যাঁ, সেদিনের দুপুরের গল্পটা বলছিলাম। আমি আমার রুমে আর মা রান্নার ঘরে রান্না করছিলেন। সাধারণত দুপুরের দিকে দূরদর্শনের ভালো কোনো প্রোগ্রাম থাকত না। তাই টেলিভিশন চালু করা থাকলেই দেখার মানুষ থাকত না। হঠাৎ ঠিক সেই সময় কারও মুগ্ধ করা মিহি গলার গান টেলিভিশন থেকে ভেসে এল। হিন্দি গান। এত মুগ্ধ করা গলা যে, আমি আমার রুম থেকে চলে এলাম। আর চুলো জ্বালিয়ে রেখেই মা রান্না ঘর থেকে দৌড়ে এলেন। টিভি রুমে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে গায় এত সুন্দর গান, কার এত মধুর গলা? আমি রান্না ঘরে আর থাকতে পারলাম না!’

আমি টেলিভিশনের পর্দায় তাকিয়ে বললাম, ‘মা, লতা মঙ্গেশকর গাচ্ছেন’। 

মা বললেন, ‘এ জন্যই তো বলি! এত সুন্দর গলা, এত মধুর সুরের গান লতা মঙ্গেশকর বাদে আর কে গাইতে পারবেন?’

।। তিন ।। 

লেখাটা শুরু করেছিলাম নিজের গল্প দিয়ে। আবার নিজের গল্পটাই বলি। নিউজিল্যান্ডে আসার তিনদিনের মাথায় এক অপূর্ব সুন্দর যুবতীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ওর নাম শশী। আমি অবশ্য পরে তাকে কেইট উইন্সলেট বলে ডাকতাম। হলিউডের টাইটানিক ছবির সেই নায়িকা কেইট উইন্সলেট। কারণ দেখতে সে কেইট উইন্সলেটের মতোই মায়াবী চেহারার ছিল। চেহারার মিলও ছিল বেশ।সেই সাতানব্বই সালে আমার বয়সই বা কত ছিল? তখনও ছাত্রত্বের গন্ধ আমার শরীর থেকে যায়নি। 

শশী আমার মামার বাসার তিনটা স্ট্রিট পরেই থাকত। সে থাকত তার মার সঙ্গে। তার বাবা নিউজিল্যান্ডে এসে মন টিকছে না বলে বছর খানেক থেকে দেশে ফিরে গেছেন। শশীরাও দেশে ফিরে যাবে এমন প্রস্তুতি নিচ্ছিল। শশীর বাবা ও খালু ছিলেন মামার বন্ধু, তাই আগে থেকেই তাদের মামার বাসায় আসা-যাওয়া ছিল। আমি নিউজিল্যান্ডে আসার আগেই আমার কথা শুনেছে। আমি টুকটাক লেখালেখি করি ওটাও সে জেনেছে।

শশী সেদিন মামার বাসায় এসে সরাসরি কোনো ভূমিকা ছাড়াই আমার রুমে ঢুকে বলে, ‘শোনেন, আমি আপনার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি’। 

আমি তো প্রথমে থতমত খেয়ে যাই। এমন একজন অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে আমার সঙ্গে যেচে কথা বলতে এসেছে, কে সে? 

মামী তখনই আমার রুমে এসে শশীকে পরিচয় করিয়ে দেন। মামীর সঙ্গে শশীর মাও ছিলেন।

পরিচয় পর্ব শেষে মামী ও শশীর মা রুম থেকে চলে গেলে শশী সাবলীল গলায় বলে, ‘আমি কিন্তু আসলে আপনার সঙ্গে গল্প করতে আসিনি। আমি আপনাকে দেখতে এসেছি’। 

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘কেন?’

শশী বলে, ‘আপনি একজন কবি, তাই’।

আমি বলি, ‘আসলে আমি তো কবি নই। আমি গল্প লিখি। কথাসাহিত্যিক’। 

শশী বলে, ‘ওই একই কথা। আমার নানু ডা: লুৎফর রহমানের বন্ধু ছিলেন’। 

‘কে, মহৎ জীবনউন্নত জীবন-এর লেখক ডা: লুৎফর রহমান?’

‘জি,তিনিই। আমার নানু শুধু তাঁর কথাই বলতেন না, আরও অনেক কবি-সাহিত্যিকদের গল্প করতেন। আসলে আমি খুব কাছ থেকে কখনও কবি-সাহিত্যিক দেখিনি তো, তাই আপনাকে দেখতে এসেছি’।

শশীর সঙ্গে সেই থেকে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে যায়। সে উনিশ বছরের যুবতী হলেও বেশ দার্শনিক কথাবার্তা বলত। তবে সে খুবই উচ্ছ্বল ও মিশুক ছিল। আমার মামীও তাকে খুব পছন্দ করতেন। সে প্রায় প্রতিদিনই আমাদের বাসায় চলে আসত। এসেই মামীকে বলত, ‘আন্টি, আমি আপনার রান্না করা ডাল দিয়ে ভাত খেতে এসেছি’। 

মামী মনে হয় ইচ্ছে করেই অন্যান্য তরকারির সঙ্গে বাড়তি হিসেবে শশীর জন্য ডাল রান্না করে রাখতেন। 

আসলে শশী আসত আমার সঙ্গে মাউন্ট মাঙ্গানুই সৈকতে একটু বৈকালিক ভ্রমণ করতে। আমরা প্রায়ই বিকেলে সৈকতে হাঁটতে যেতাম। বালির সৈকতে উঁকি মারা বড় বড় পাথরে পাশাপাশি বসে সুর্যাস্ত দেখতাম। দিঘল দৃষ্টির ভেতর পশ্চিমের প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল বপুতে লাল টকটকে সূর্যটা টুপ করে ডুবে যেত। তারপর নিঝুম সন্ধ্যা নামত। আমরা নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিদের উড়ে যাওয়া দেখতাম। দুই-চারবার লতাজীর সেই- ‘নিঝুম সন্ধ্যায়, পান্থ পাখিরা, বুঝি বা পথ ভুলে যায়’ গানটা গেয়েও ওঠি। শশী আমার সঙ্গে সুর দেয়। যদিও আমার বেসুরো গলা। 

শশীর সঙ্গে একদিন মাউন্ট মাঙ্গানুই সিনেমা হলে হিন্দি সিনেমা দেখতে যাই। শাহরুখ খান, মাধুরী দীক্ষিত ও কারিশমা কাপুরের ‘দিল তো পাগল হে’। তখন মাউন্ট মাঙ্গানুই সিনেমা হলে সবসময় হিন্দি সিনেমা চলত না। মাঝেমধ্যে চলত। তাও কোনো নামকরা সিনেমা হলে। 

‘দিল তো পাগল হে’ সিনেমায় লতাজীর কণ্ঠের গানগুলো আমাদের খুব ভাল লেগে যায়। লতাজীর গান এত ভাল লাগে জেনে শশী কোথা থেকে যেন আমার জন্য বেশ কয়েকটা গানের ক্যাসেট সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। এগুলোর মধ্যে লতাজীর হিন্দি গানের ক্যাসেটের পাশাপাশি বাংলা গানের ক্যাসেটও ছিল। আমাদের বাসায় ক্যাসেট প্লেয়ার থাকলেও সে নোয়েল-লেমিং থেকে একটা ওয়াকম্যান কিনে আমাকে উপহার হিসেবে দেয়।

একদিন শশী আর আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদিন ঘুরি। সেদিন সে আমার প্রিয় রং কচুপাতা রঙের শাড়ি পরেছিল।আমরা দিঘল মাউন্ট মাঙ্গানুই সৈকত, মাউন্ট মাঙ্গানুইর উঁচু পাহাড়, হারবার ধরে দিঘল পথ পাশাপাশি হাঁটি। সন্ধ্যা অবধি আমরা ঘোরাঘুরি করি। সেটাই ছিল আমাদের শেষ ঘোরাঘুরি। এর চার দিনের মাথায় শশী ও তার মা স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য বাংলাদেশ চলে যায়। 

মাউন্ট মাঙ্গানুই ও তাওরাঙ্গা শহরের বাঙালি কমিউনিটির সবাই ভাবত, শশী ও আমার বুঝি প্রেম ভালোবাসা চলছে। প্রায়ই আমাদেরকে বিকেলে মাউন্ট মাঙ্গানুই সৈকতে ঘুরতে দেখে। বে অব প্লেন্টি শপিং মলেও আমাদেরকে একসঙ্গে দেখে। ওরা ধরেই নিয়েছিল যে আমাদের বিয়েটা শুধু সময়ের ব্যাপার। কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা যে ছিল শুধুমাত্র বন্ধুত্বের। আমি জানতাম ওরা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে চলে যাবে। শশীও সেভাবেই মানসিক প্রস্তুত ছিল। তবে হয়তো আমাদের সম্পর্কটা অন্যভাবে মোড় নিত। হয়তো শব্দটা এজন্য বলছি, আমাদের পরিচয় পর্ব থেকে বন্ধুত্ব মাত্র পাঁচ মাসের ছিল। যদিও শশী বাংলাদেশ গিয়ে আমাকে কয়েকবার ফোন দিয়েছে। আমিও নিউজিল্যান্ড থেকে ফোন দিয়েছি। তারপর যার যার মতো বিয়ে করে সংসার পেতে সেই কবে সংযোগ হারিয়ে ফেলি। 

।। চার ।। 

লতাজীকে নিয়ে লিখব বলে শত ব্যস্ততার মধ্যেও খাতাকলম নিয়ে বসেছিলাম। কিন্তু লিখতে বসে নিজের গল্পটাই বেশি করছি। কিন্তু সত্য বলতে লতাজী তো আমাদের মধ্যবিত্ত ঘরের সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনার একজন। 

আবারও শশীর কথায় ফিরে যাই। হোম সিকনেস বলে একটা কথা আছে। দূর প্রবাসে এসে শশীর বন্ধুত্ব পেয়ে বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব ও দেশের প্রতি যে হাহাকার, তা অনেকটা প্রশমিত হয়ে গিয়েছিল। শশী সত্যি আমার জন্য অন্যরকম এক অনুভূতি নিয়ে এসেছিল। তার আবেশ-হিল্লোল পুরো পাঁচটা মাস আমাকে মোহিত করে রেখেছিল। কিন্তু শশী বাংলাদেশ চলে গেলে আমি একা হয়ে যাই। দেশের প্রতি হাহাকার আবার বেড়ে যায়। বাবা-মা, ভাই-বোন ও বন্ধু-বান্ধবদের কথা খুব বেশি মনে পড়তে শুরু করে। আমি প্রায় বিকেলে একা মাউন্ট মাঙ্গানুই সৈকতে গিয়ে বসে থাকি। চারিদিকে গোধূলির আলো ফুটিয়ে সূর্যটাকে প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাল সমুদ্রে ডুবে যেতে দেখি। তারপর সন্ধ্যা নামে। নিঝুম সন্ধ্যা। সন্ধ্যার পাখিদের উড়ে যেতে দেখে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। কী এক হতাশা আমার মনে ঝেঁকে বসে। কোনো কোনো সন্ধ্যায় দেশের কথা মনে করে কেঁদেছি কি না মনে নেই। তবে কিছু কিছু কান্না আছে, যে কাঁদে সেই শুধু অনুভব করে। বাইরের মানুষ সেই কান্না দেখে না। আমার ভেতরের কান্নাটা সেরকমই ছিল। আমি শশীর কিনে দেওয়া সেই ওয়াকম্যানে লতাজীর একই গান বারবার শুনতাম, ‘নিঝুম সন্ধ্যায়, পান্থ পাখিরা, বুঝি বা পথ ভুলে যায়…। কুলায় যেতে যেতে, কি যেন কাকলী, আমারে দিয়ে যেতে চায়…’। 

।। পাঁচ ।। 

১৯৯৭ সাল থেকে ২০২২ সাল। পঁচিশ বছর। পঁচিশ বছর দীর্ঘ সময়। এখন জীবনে কত ব্যস্ততা! লেখালেখি তো আছেই, তার ওপর ছেলেমেয়ে ও সংসারধর্ম। চাকরি-বাকরিও করতে হয়। এখন ঠিকমতো গান শোনার সময় কই? নিউজিল্যান্ড ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া এসে বসবাস করছি বেশ অনেক বছর হয়ে গেল। নিউজিল্যান্ডের স্মৃতিগুলোও আস্তে আস্তে ঝাপসা হচ্ছে। আর আমাদের বয়সও তো হচ্ছে। 

কিন্তু হঠাৎ যখন লতাজীর মৃত্যুর সংবাদ শুনলাম তখন সেই পঁচিশ বছর আগের পুরোনো আবেগ এসে আবার আষ্টেপৃষ্ঠে এসে জড়িয়ে ধরল। লতাজী নেই! আমি খবরটা শোনার পর বিকেল হতেই হেঁটে হেঁটে আমার বাসার পাশে টাসকি রাইজের মাথায় পাহাড়ের উপর গিয়ে বসলাম। পুরো প্যাসিফিক পাইনস সাবার্বটা উঁচুনিচু পাহাড়ে ঘেরা। পাহাড়ের ধার বেয়ে নেমে আসা সবুজ ভ্যালি দেখলে এমনিতেই চোখ জুড়িয়ে যায়। 

টাসকি রাইজের পাহাড়ের উপর বসার খানিকক্ষণ পরই পশ্চিমের দূরে টেউ খেলানো পাহাড়ের আড়ালে সুর্যটা টুপ করে লুকিয়ে পড়ল। সূর্যটা লুকিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোধূলির আলো পশ্চিমের সমস্ত আকাশে জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। তারপর সন্ধ্যা নামল। নিঝুম সন্ধ্যা। পান্থ পাখিদের উড়ে যেতে দেখে মন হাহাকার করে উঠল। সে কি হাহাকার! এখন টেকনোলোজির যুগ। মোবাইল হাতেই। আমি মোবাইলে লতাজীর সেই গানটা শুনতে শুরু করলাম, ‘…নিঝুম সন্ধ্যায়, পান্থ পাখিরা, বুঝিবা পথ ভুলে যায়…। কুলায়ে যেতে যেতে, কী যেন কাকলী, আমারে দিয়ে যেতে চায়…’। 

আমার চোখ সত্যি সত্যি এবার ভিজে এল।

Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
Admin

খুবই সুন্দর লেখা। বিউটিফুল এমন নস্ট্যালজিয়া আমাদের মতো প্রবাসী বাঙালিদের জীবনের পাথেয়। 

ফারজানা নাজ
ফারজানা নাজ
7 months ago

সহমত ডঃ পার্থ বন্দোপাধ্যায়

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
2
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x